মা সন্তানের ভালোবাসা। ছবি: সংগৃহীত
পৃথিবীর মধুরতম ডাক হলো ‘মা’। মাত্র একটি অক্ষরের এই ক্ষুদ্র শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অতলান্ত স্নেহ, মমতা আর চিরন্তন অকৃত্রিম ভালোবাসা। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে বার্ধক্য, আনন্দ-বেদনা, ভয় কিংবা উদ্দীপনা, প্রতিটি মানবিক অনুভূতিতে মিশে থাকে মায়ের নাম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের পরম নির্ভরতা আর সবশেষ নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো মমতাময়ী মায়ের ওই আঁচল।
আজ রোববার (১০ মে), সেই সকল মমতাময়ীর সম্মানে উৎসর্গ করা ‘বিশ্ব মা দিবস’। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে বিশেষ মর্যাদায় পালিত হয় দিনটি । যদিও মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট দিনের ফ্রেমে বন্দি নয়, তবুও ত্যাগের প্রতিচ্ছবি মায়েদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই এই আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রে সূচনা হলেও বর্তমানে সারা বিশ্বেই পালিত হয় দিবসটি। সে হিসেবে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশেও আজ পালিত হবে মা দিবস।
মায়ের মাহাত্ম্য কলমের আঁচড়ে কিংবা শব্দের জালে বন্দি করার সাধ্য পৃথিবীর কোনো লেখকের নেই। তবুও আজ এই বিশেষ দিনে আমার ক্ষুদ্র জীবনের পথচলায় মায়ের সেই বিশাল ছায়ার গল্পটুকু বলতে চাই। মা কেবল আমার জন্মদাত্রীই নন; আমার প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি কীভাবে আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু, বেঁচে থাকার মূল প্রেরণা এবং নিভৃত এক সাইকোলজিস্ট হয়ে উঠেছেন সেই অকৃত্রিম নাড়ির টান ও অনুভূতির আখ্যানই তুলে ধরছি আজ।
আমার মা আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু এবং শ্রেষ্ঠ শুভাকাঙ্ক্ষী। স্বার্থপর এই পৃথিবীতে তিনি একমাত্র মানুষ, যিনি নিজের চেয়েও আমাকে বেশি ভালোবাসেন। মজার ব্যাপার হলো, মা আমাকে মুখে কখনো বলেননি— ‘সাজিদ, আই লাভ ইউ’। কিন্তু তাঁর প্রতিদিনের হাজারো ছোট ছোট কাজ আর আগলে রাখার ধরন প্রমাণ করে দেয়, মা আমায় কতটা ভালোবাসেন। মুখে না বলা সেই না বলা ভালোবাসাই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।
আমার মা আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু
বন্ধুত্বের সংজ্ঞায় বলা হয় বন্ধু সেই, যার কাছে নিজেকে নির্দ্বিধায় প্রকাশ করা যায়, যে বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় এবং যার কাঁধে মাথা রেখে দুঃখের ভার লাঘব করা যায়। আমার মায়ের মাঝে এই সবকটি গুণের পূর্ণ প্রকাশ আমি দেখি। বন্ধুত্বের আসল সার্থকতা তো সেখানেই, যেখানে বিশ্বাস আর সহমর্মিতা থাকে।
আমি আমার জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় ঘটনা মায়ের সাথে শেয়ার করি। বাইরে কোথাও যাওয়া, কিছু কেনা, এমনকি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা কারো প্রেমে পড়ার গল্পও আমি মাকে জানাই। জীবনের কঠিন সময়ে কোনো মোড় থেকে ধোঁকা খেয়ে যখন ফিরে এসেছি, মা তখন বিচারকের আসনে না বসে বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। মা আমাকে বোঝান, দিকনির্দেশনা দেন এবং সবচেয়ে বড় কথা আমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন। একজন বিশ্বস্ত বন্ধু যেমন মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে, মা-ও ঠিক তেমনি আমার প্রতিটি কথাকে গুরুত্ব দেন। তাই আমার মা আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
আমার মা আমার মোটিভেশন ও অনুপ্রেরণা
হতাশা যখন আমাকে ঘিরে ধরে, তখন আমি বাইরে কোনো মোটিভেশনাল স্পিকার খুঁজি না। বরং আমি আমার মায়ের শান্ত মুখটার দিকে তাকাই। মায়ের সেই মুখটিই আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। জীবনের অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত আমি শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে নিতে পেরেছি। অনেক ভুল পথ থেকে নিজেকে সরিয়ে এনেছি কেবল মায়ের কথা ভেবে। যখনই মনে হয়েছে আমি আর পারছি না, তখনই মায়ের ধৈর্য আর পরিশ্রম আমাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে। মা-ই আমার জীবনের সেই অদৃশ্য চালিকাশক্তি, যা আমাকে সবসময় সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আব্রাহাম লিংকনের একটি কথা মনে পড়ে যায়, ‘যার মা আছে, সে কখনোই গরিব নয়’। তাই মা'ই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
আমার মা এক অলৌকিক সাইকোলজিস্ট
একজন পেশাদার মনোবিজ্ঞানী দীর্ঘকাল পড়াশোনা আর গবেষণার মাধ্যমে মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার যে দক্ষতা অর্জন করেন, মায়েরা যেন সেই ক্ষমতা নিয়েই জন্মান। একে কোনো জাগতিক বিজ্ঞানের ছকে বাঁধা অসম্ভব; এটি সম্ভবত স্রষ্টার পক্ষ থেকে পাওয়া এক বিশেষ সহজাত প্রবৃত্তি। মা আমার মুখাবয়ব দেখে, চোখের ভাষা পড়ে, এমনকি ফোনের দূরপ্রান্তে আমার কণ্ঠস্বরের সামান্যতম পরিবর্তন শুনেই বলে দিতে পারেন আমার মনের অন্দরমহলে কী চলছে। যে ‘নারী-নক্ষত্র’ একজন দক্ষ সাইকোআ্যানালিস্ট হয়তো কয়েক মাসের সেশনেও বুঝতে পারতেন না, মা তা মুহূর্তেই বুঝে যান। আমি শত মাইল দূরে থাকলেও আমার অসুস্থতা কিংবা কোনো বিপদের আভাস যেন এক অদৃশ্য বেতার তরঙ্গে মায়ের কাছে পৌঁছে যায়। এ এক আত্মিক টেলিপ্যাথি, এক নাড়ির টান। মায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে আমি কখনো নিজের মন খারাপের কথা আড়াল করতে পারিনি। দিনশেষে তাঁর ওই অভ্রান্ত অনুধাবনের কাছে আমাকে হার মানতেই হয়।
আমার মা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিহীন এক মহাজ্ঞানী
আমার মায়ের কোনো একাডেমিক সার্টিফিকেট নেই, নেই উচ্চশিক্ষার কোনো বড় ডিগ্রি। মায়েদের সেই সময়ে পড়াশোনার সুযোগ ছিল বড্ড সীমিত; হয়তো বড়জোর দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ চুকিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জ্ঞানের পরিধি যেকোনো এমবিবিএস অধ্যাপক কিংবা নামজাদা সমাজবিজ্ঞানীর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অভিজ্ঞতার কষ্টিপাথরে যাচাই করা তাঁর প্রতিটি কথা যেন এক একটি জীবনদর্শন। আমি বহুবার দেখেছি, মা যখন কোনো বিষয়ে পরামর্শ দেন কিংবা ভবিষ্যৎবাণী করেন, দিনশেষে ঠিক সেটাই ধ্রুব সত্য হয়ে ধরা দেয়। জীবনের জটিল অংকের সমাধান তিনি অত্যন্ত সহজভাবে করে দেন, যা কোনো তাত্ত্বিক বই পড়ে শেখা সম্ভব নয়। অক্ষরজ্ঞানহীন হয়েও মা আসলে এক মহাজ্ঞানী, যাঁর প্রতিটি কথা আমার জীবনের দিকনির্দেশক হয়ে কাজ করে।
মায়ের মহত্ত্ব নিয়ে লিখে শেষ করার সাধ্য নেই আমার। স্রষ্টার এক নিদারুণ এবং সার্থক সৃষ্টি হলো ‘মা’। পৃথিবীতে সম্পর্কের সমীকরণে নারী হয়তো নানা রূপে আবির্ভূত হন, কিন্তু ‘মা’ হিসেবে তিনি সর্বদা অনন্য এবং অতুলনীয়। একজন সন্তানের কাছে তাঁর মা কেবল একজন মানুষ নন, বরং তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নারী, শ্রেষ্ঠতম আশ্রয়।
আজ বিশ্ব মা দিবসে মনের গহিন থেকে শুধু এই প্রার্থনাই করি ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল মায়েরা, শান্তিতে থাকুক প্রতিটি মমতাময়ী হৃদয়। পৃথিবীর সকল মায়েদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। দীর্ঘজীবী হোক মাজাতি।
মাহবুবের বয়স ২৫ বছর। মাঝে মধ্যে তাঁর বুক ধরফর করা শুরু হয়। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় হাত-পা অবশ হয়ে আসা, বুকে ব্যথা করা। ক্রমশ তাঁর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। মনে হয় এখনই মরে যাবেন। এই ধরনের রোগীরা একটার পর একটা ইসিজি আর ইকোকার্ডিওগ্রাম করতে করতে তাঁর চিকিৎসা ফাইল অনেক বড় করে ফেলেন। চিকিৎসকও বদলাতে থাকেন, তাঁর রোগ ধরতে পারছেন না বিধায়। এর মধ্যে রোগীর গায়ে কিন্তু বড় অসুখের সিল পড়ে গেছে। আত্মীয়স্বজনরা বলতে থাকেন ওকে কোনো বড় কাজে দিও না। ওর বড় জটিল অসুখ। আসলে এটি একটি টেনশন বা অস্থিরতা গ্রুপের রোগ; যাকে আমরা প্যানিক ডিজঅর্ডার বলে থাকি।
কীভাবে বুঝবেন যে প্যানিক ডিজঅর্ডার রোগে ভুগছেন
> হঠাৎ করে বুক ধরফর করা, শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া, মাথা ঝিমঝিম করা ।
> দম বন্ধ হয়ে আসা, বড় বড় করে হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া।
>হাত-পা অবশ হয়ে আসা। শরীরে কাঁপুনি হওয়া।
>বুকের মধ্যে চাপ লাগা এবং ব্যথা অনুভব করা।
>এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো রোগী বলেন, হঠাৎ পেটের মধ্যে একটা মোচর দেয় তারপর ওপর দিকে উঠে বুক ধরফর শুরু হয় সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা অবশ হয়ে যায়। আর কথা বলতে পারেন না।
> বমি বমি ভাব লাগে। পেটের মধ্যে অস্বস্তি বোধ লাগা ও গলা শুকিয়ে আসা।
> পেটের মধ্যে গ্যাস ওঠে, খালি গ্যাস ওঠে এবং বুকে চাপ দেয়।
> দুশ্চিন্তা থেকেও মাথাব্যথা হতে পারে। কোনো কোনো রোগী বুকে ব্যথা ও হাত-পায়ের ঝিমঝিমকে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ মনে করে প্রায়ই ছুটে যান হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে চিকিৎসক দেখাতে।
> মৃত্যু ভয় দেখা দেওয়া। মনে হয় যেন এখনই মরে যাবেন রোগ যন্ত্রণায়।
> নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
> বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া / ইসিজি করা।
> দূরে কোথাও গেলে স্বজনদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যান, যেন মাঝখানে অসুস্থ হলে ধরতে পারেন।
> নামাজ পড়তে গেলে একপাশে দাঁড়ান, যেন অসুস্থ হলে তাড়াতাড়ি বের হতে পারেন।
> রোগীর মধ্যে ভয় কাজ করে এই বুঝি আবার একটি অ্যাটাক হতে পারে।
> লক্ষণগুলো হঠাৎ করে শুরু হয়। ১০ থেকে ২০ মিনিট পরে কমে যায়।
> সেফটি বিহেভিয়ার, যেমন অ্যাটাকের সময় বসে পড়া, কোনো কিছু হাত দিয়ে ধরে সাপোর্ট নেওয়া ইত্যাদি লক্ষণ রোগীর মাঝে দেখা দেয়; যা কিনা হৃদরোগীর মাঝে লক্ষণীয় নয়।
রোগীর ভাবনা
> তাঁর হার্টের অসুখ এজন্য বারবার ইসিজি ও ইকোকার্ডিওগ্রাম করে বেড়াচ্ছেন।
> মাথা ঝিমঝিম করছে। মানে স্ট্রোক করে ফেলবেন।
> হাত-পা অবশ হয়ে আসছে; মনে হয় প্যারালাইসিস হয়ে যাবে।
> যে কোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।
কী কী পরিণতি হতে পারে
> সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করালে, এ ধরনের রোগী চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সর্বস্বান্ত হন এবং সব শেষে নিজে একজন হার্টের রোগী বলে কাজকর্ম ছেড়ে দেন।
> বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন।
> নেশায় জড়িয়ে যেতে পারেন।
> এগোরেফোবিয়া নামক আরও একটি সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। তখন রোগী বাইরে বের হতে, হাটবাজার, রেস্টুরেন্ট, ক্যান্টিন ইত্যাদি জায়গায় যেতেও ভয় পান।
> গুমের সমস্যা হতে পারে।
> আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসতে পারে।
> সর্বোপরি এই মানুষটি আর সমস্যার কারণে পরিবার, সমাজ ও জাতির বোঝা হয়ে যেতে পারেন।
চিকিৎসা:
> নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো।
> রোগীকে আশ্বাস দেওয়া। নির্দিষ্ট সময়ান্তে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
সঠিক সময়ে সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এসব রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।
ছবি : সংগৃহীত
টেবিলে দারুণ সুন্দর একটা কেক রাখা। হঠাৎ ঘরময় অন্ধকার হয়ে গেল। কেকের ওপর মোমবাতিতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। তুমি গাল ফুলিয়ে ফুঁউউউ দিয়ে সেই আগুন নেভালে। তারপর সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’।
একটু লজিক দিয়ে চিন্তা করলে পুরো ব্যাপারটা চরম হাস্যকর ও অদ্ভুত মনে হয় না? একটা দারুণ সুস্বাদু খাবারের ওপর আমরা আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছি, আবার পরক্ষণেই নিজের মুখের বাতাস দিয়ে সেটা নেভানোর চেষ্টা করছি। কেন এমন অদ্ভুত কাজ করছি আমরা? হয়তো বলবে, ছোটবেলা থেকেই তো এভাবে করে আসছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আজব প্রথা কে শুরু করেছিল? খাবার জিনিসের ওপর আগুন দিয়ে এই খেলা দেখানোর আইডিয়াটাই কার মাথা থেকে এসেছিল? এর পেছনে নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তির কোনো যুক্তি ছিল। কী সেই যুক্তি?
মজার ব্যাপার হলো, এর একটা নিখুঁত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে। এই মোমবাতি নেভানোর প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন দেব-দেবী, জার্মান শিশুদের উৎসব, সুইস ফোকলোর জার্নাল এবং মিকি মাউস! চলো, তোমাকে সঙ্গে নিয়েই আজ এই অদ্ভুত ইতিহাসের রহস্যটা ভেদ করা যাক।
জন্মদিনের কেকে কি সব সময় মোমবাতি থাকত
এককথায় উত্তর হলো, না। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগে জন্মদিনের কেকে মোমবাতির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ব্যাপারটা একটু অবাক করার মতো। কারণ, মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে ধর্মীয় বা দরকারি কাজে মোমবাতি জ্বালিয়ে আসছে। কিন্তু এতগুলো বছর ধরে কারও মাথাতেই আসেনি যে এই মোমবাতিটাকে তুলে নিয়ে কেকের ওপর গুঁজে দেওয়া যায়!
তাহলে কেক আর মোমবাতি আসার আগে মানুষ জন্মদিন কীভাবে উদ্যাপন করত? ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়জুড়ে জন্মদিন পালনের ব্যাপারটা কোনো পার্টির মতো ছিল না, বরং এটি ছিল অনেকটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো। যেমন ধরো, প্রাচীন রোমানরা অভিজাতদের জন্য রীতিমতো জন্মদিনের আয়োজন করত ঠিকই, কিন্তু সেখানে কোনো হইহুল্লোড় হতো না। সেই আয়োজন ছিল মূলত একজন মানুষের রক্ষাকারী আত্মার প্রতি উৎসর্গ। রোমানদের বিশ্বাস ছিল, এই আত্মা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের ছায়ার মতো পাশে থাকে। অর্থাৎ সেখানে কোনো হ্যাপি বার্থডে গান ছিল না, ছিল শুধুই প্রার্থনা।
মোমবাতির ইতিহাস
প্রাচীনকালের ওই প্রার্থনা থেকে আজকের দিনের এই কেক-মোমবাতি পর্যন্ত আসার রাস্তাটা বুঝতে হলে তোমাকে একদম পুরোনো একটা ধারণায় ফিরে যেতে হবে। প্রাচীন মানুষের কাছে আগুন মানেই ছিল পবিত্র কিছু, দেবতার রূপ!
বেদান্ত আমল থেকে শুরু করে পারস্য, গ্রিস এবং রোম—সব প্রাচীন সংস্কৃতিতেই আগুনকে পবিত্র কিছু হিসেবে মানা হতো। মানুষ যখন সুরেলা গলায় কেক কাটার গান গাইতে শেখেনি, তারও বহু আগে থেকে তারা নিজেদের প্রার্থনালয়ে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে আগুন ব্যবহার করত।
জন্মদিনের মোমবাতি নিয়ে ইন্টারনেটে বা অনেক বইয়ে তুমি খুব জনপ্রিয় একটা গল্প পাবে। বলা হয়, প্রাচীন গ্রিসে চাঁদের দেবী আর্টেমিসকে উৎসর্গ করে একধরনের চিজকেক (যাতে মধু আর ময়দা থাকত) বানানো হতো। চাঁদের আলোর মতো বোঝাতে সেই কেকের ওপর মশাল বা ছোট আগুন জ্বেলে দেওয়া হতো। গল্পটা শুনতে দারুণ। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ‘মুন কেক’-এর সঙ্গে আমাদের আধুনিক জন্মদিনের মোমবাতির কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, এটা পুরোটাই একটা লোককথা বা মিথ।
খ্রিষ্টধর্মের আগমনে পাল্টে গেল জন্মদিনের ধারণা
গ্রিকদের পর দৃশ্যপটে হাজির হলো শুরুর দিকের খ্রিষ্টানরা। তারা এসে জন্মদিনের উৎসবের একেবারে বারোটা বাজিয়ে দিল! শুরুর দিকের চার্চের নেতারা জন্মদিন পালন করার ঘোরবিরোধী ছিলেন। তাঁদের মতে, জন্মদিন পালন করাটা চরম স্বার্থপরতা এবং এটা অনেকটা বিধর্মীদের মতো আচরণ। এর বদলে তাঁরা যিশুর ব্যাপটিজম, ইস্টার এবং শহীদদের মৃত্যুর দিন পালন করা শুরু করলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর দিনটিই হলো স্বর্গে ‘জন্ম’নেওয়ার আসল দিন।
তবে মোমবাতি কিন্তু হারিয়ে যায়নি। চার্চের বিভিন্ন পবিত্র মুহূর্তে ঠিকই মোমবাতি জ্বলত। শুধু কেক বেচারা ওই পার্টি থেকে অনেক লম্বা সময়ের জন্য ছিটকে পড়ে।
কেকের ফিরে আসা
মধ্যযুগের শেষের দিকে এসে কেক আবার উৎসবের খাবারে পরিণত হতে শুরু করে। তবে সেটা শুধু বড়লোকদের বাড়িতে। এরপর ১৬০০ শতকের দিকে মানুষ জন্মদিন বা বিয়ের মতো ব্যক্তিগত জীবনের মাইলফলকগুলো উদ্যাপন করতে শুরু করে।
এখান থেকেই জার্মানির মঞ্চ প্রস্তুত হলো। ১৬৯১ সালে জোহান ক্রিস্টোফ ওয়াগেনসাইল নামে এক জার্মান পণ্ডিত নুরেমবার্গ শহরের শিশুদের জন্মদিনের কেক নিয়ে প্রথমবারের মতো লেখালেখি করেন। তখনো মোমবাতির দেখা মেলেনি ঠিকই, তবে জন্মদিনের কেকের একেবারে প্রথম লিখিত প্রমাণ এটিই!
তাহলে মোমবাতি নেভানোর চল শুরু হলো কবে
মোমবাতি, কেক আর জন্মদিন—এই তিনের জাদুকরি মিলন ঘটেছিল ১৮ শতকের জার্মানিতে। সেখানে শিশুদের জন্য কিন্ডারফেস্ট নামে একটি উৎসব হতো। পপ কালচার ইতিহাসবিদ মারি নিকোলা বলেন, ‘১৬৯১ থেকে ১৭৪০ সালের মাঝামাঝি কোনো একসময়ে মানুষের লজিক ও প্রতীকী চিন্তার দারুণ এক সংমিশ্রণ ঘটে। কেক তো আগে থেকেই উৎসবের অংশ ছিল, মোমবাতি মানে ছিল পবিত্র জীবন, আর শিশু মানেই হলো দারুণ এক সম্ভাবনা। এই তিন জিনিসকে এক করে দেওয়া হলো।’
বিখ্যাত লেখক জোহান উলফগ্যাং ফন গ্যেটে ১৭৪০-এর দশকে একটি জন্মদিনের কেকের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘কেকের চারপাশটা আলো দিয়ে এমনভাবে ঘেরা ছিল, যেন সেটা একটা বেদি বা প্রার্থনার জায়গা!’
কিন্ডারফেস্টের এই উৎসব মূলত শুরু হয়েছিল জার্মানির পায়েটিজম আন্দোলন থেকে। এই প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের মূল কথা ছিল, ঘরই হলো মানুষের নৈতিকতা শেখার আসল জায়গা। মোমবাতিগুলো ছিল শিশুর ভেতরের সুন্দর বিকাশের প্রতীক। শিশুর যত বছর বয়স, কেকে ঠিক ততগুলো মোমবাতি বসানো হতো। তার সঙ্গে যোগ করা হতো বাড়তি একটি মোমবাতি, যার মানে হলো ‘আগামী দিনের বেড়ে ওঠা’।
১৮৮১ সাল নাগাদ এই প্রথা সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে যায়। সুইস ফোকলোর জার্নালে সে দেশের মধ্যবিত্তদের এই কেক ও মোমবাতি প্রথার কথা রেকর্ড করা হয়। আর সেখানেই প্রথম লেখা হয়, কেক খাওয়ার আগে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নেভানো হতো!
ইচ্ছা পূরণের ব্যাপারটা কোথা থেকে এল
পৃথিবীর বহু প্রাচীন ধর্মে এবং বিশ্বাসে মানুষের মুখের বাতাস বা শ্বাসকে তার আত্মা বা জীবনীশক্তির প্রতীক ধরা হতো। মোমবাতি নেভানোর সময় মনে মনে কোনো ইচ্ছা বা প্রার্থনা করাটা আসলে সেই পুরোনো বিশ্বাসের আধুনিক রূপ। তুমি যখন চোখ বন্ধ করে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভাও, তুমি আসলে শুধু এক টুকরা মোমের আগুন নেভাচ্ছ না; তুমি একটা ছোট্ট, ব্যক্তিগত প্রার্থনা করছ। শুধু চার্চের বদলে সেটা হচ্ছে তোমার ড্রয়িংরুমে, আর সঙ্গে ফ্রি পাচ্ছো দারুণ স্বাদের খাবার!
কীভাবে এটা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল
জার্মানির এই কিন্ডারফেস্ট প্রথাকে আটলান্টিক মহাসাগর পার করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল জার্মান অভিবাসীরা। ১৮০০ শতকের দিকে ফিলাডেলফিয়া বা মিলওয়াকির মতো শহরের জার্মান ভাষার পত্রিকাগুলোয় কিন্ডারফেস্টের খবর ছাপা হতো।
১৯০০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে আমেরিকা এবং ব্রিটেনে কেকের ওপর মোমবাতি জ্বালানোটা মধ্যবিত্তদের একটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। ১৯২০-এর দশকে বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো জন্মদিনের বয়স অনুযায়ী বক্সে ভরে মোমবাতি বিক্রি করা শুরু করে।
কিন্তু পুরো দুনিয়াকে এই নিয়মটা পাকাপাকিভাবে কে শেখাল জানো? ১৯৩১ সালে ডিজনির বানানো একটি শর্ট ফিল্ম! সেই ফিল্মে ঠিক আজকের মতো করে একটি জন্মদিনের পার্টি দেখানো হয়েছিল—প্রথমে কেক, তারপর মোমবাতি, তারপর গান, এবং শেষে উইশ করে ফুঁ দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার এই পপ কালচার, মিডিয়া ও সিনেমা পুরো বিশ্বকে এই একই স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করিয়ে দিল।
সবাই কি একই নিয়মে জন্মদিন পালন করে
না, পৃথিবীর সব দেশের মানুষ আমাদের মতো ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভায় না! অনেক দেশের নিজস্ব প্রাচীন প্রথা ছিল। কিন্তু ডিজনির কল্যাণে এই জার্মান-আমেরিকান স্টাইলটা এতই জনপ্রিয় হলো যে ১৯৫০-এর দশকে জাপানও এই প্রথা আপন করে নিল।
তবে এখনো অনেক দেশে ভিন্ন নিয়ম আছে। যেমন ঘানাতে জন্মদিনের সকালে মিষ্টি আলুর তৈরি ওতো (oto) নামে একটি খাবার খাওয়া হয়। রুশরা জন্মদিনে কেকের বদলে বিশেষ একধরনের পাই কাটে। আর চীনারা তো কেক বাদ দিয়ে লম্বা আয়ুর আশায় লংজিভিটি নুডলস খায়!
জার্মানিতেও এখনো একটা নিজস্ব পুরোনো স্টাইল টিকে আছে। অনেক জার্মান পরিবার কেকের মোমবাতি সঙ্গে সঙ্গে ফুঁ দিয়ে নেভায় না। তারা কাঠের তৈরি একটা গোলাকার রিংয়ে মোমবাতি বসিয়ে সারা দিন সেটা জ্বালিয়ে রাখে। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য তারা এটা করে।
শেষ কথা
তাহলে কী বুঝলে? এরপর যখন ঘর অন্ধকার করে, বন্ধুদের হাততালির মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেকের ওপর ফুঁ দেওয়ার জন্য গাল ফোলাবে, তখন মনে রেখো, তুমি শুধু একটা সাধারণ কাজ করছ না। তুমি একটা বিশাল ঐতিহাসিক শেকলের অংশ। প্রাচীন রোমানদের প্রার্থনা, খ্রিষ্টানদের রীতি, জার্মানদের উৎসব আর ডিজনির সিনেমা—সবকিছু পার হয়ে ওই মোমবাতিটা আজ তোমার কেকের ওপর এসে বসেছে।
তাই চোখ বন্ধ করো, মনের সবচেয়ে সুন্দর উইশটা করো। আর হ্যাঁ, একটু সাবধানে ফুঁ দিয়ো, যাতে কেকের ওপর থুথু ছিটে না যায়!
সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে কয়েক দশকের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। জটিল আর অনিশ্চিত সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের হাল ধরেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।
তাঁর নেতৃত্বে ছিল প্রজ্ঞা আর অবিচল দৃঢ়তার মিশেল; তিনি কখনো কারোও কাছে মাথা নত করেননি, কোনো বাধায় পিছু হটেননি। এই আপসহীন মনোভাবই তাঁকে কোটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—সবক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বাক্ষর। শত প্রতিকূলতা ও দমন-পীড়নের মুখেও নিজের অবস্থানে অটল থেকে আপসহীন পথচলাই বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ও দলের চরম সংকটময় মুহূর্তে ঘর থেকে রাজনীতির ময়দানে নামতে হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিংবা বারবার কারারুদ্ধ হয়েও তিনি কারও সঙ্গে আপস করেননি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। পাশপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হওয়ারও গৌবর অর্জন করেছিলেন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য।
১৫ আগস্ট প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এবারের জন্মদিনে শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।
একগুচ্ছ নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে সেই যাত্রার শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর সেনানী ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পর দেশের এক চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন এই চৌকস ও মেধাবী সেনা কর্মকর্তা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ফের দেশের হাল ধরেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বই পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতি গঠনে সচেষ্ট হন তিনি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদত বরণ করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। এই ঘটনা দেশকে এক গভীর নেতৃত্ব সংকটের মুখে ফেলে দেয়। সেই শূন্যতার মাঝেই রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অভিষেক ঘটে। বলা যায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজনীতির এক অচেনা জগতে পা রেখেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী গৃহবধূ খালেদা জিয়া।
তিনি এমন এক সংকটময় সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, যখন দলটির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই যেন শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তৎকালীন বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানেই ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদত বরণের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এমনকি তিনি বিএনপিকে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের মুখে ঠেলে দেওয়ার চষ্টা করেন।
দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেগম খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিএনপির দায়িত্ব নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল জনসভায় বেগম জিয়া প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হন, যা দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে। একই বছরের ২৮ অক্টোবর তিনি দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল ‘বাংলাদেশ সচিবালয়’ ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। যদিও পুলিশ সেই আন্দোলন দমন করে। এই ঘটনার পর তাঁকে কিছুদিনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি রাজপথে সাত-দলীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ ধর্মঘট, ‘ঘেরাও’ কর্মসূচি, ‘গণপ্রতিরোধ দিবস’ এবং ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর মতো ধারাবাহিক কর্মসূচিতেও নেতৃত্বেও সারিতে ছিলেন এই মহিয়সী নেত্রী। ফলশ্রুতিতে ১৯৮৫ সালে বেগম জিয়াকে আবারও গৃহবন্দী করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত-দলীয় জোট এবং অন্য জোটগুলোর যুগপৎ আন্দোলনের মুখে এরশাদ ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী পাঁচ-দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ আরও ছয়টি দল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। অপরদিকে, বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।
১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের সেই নির্বাচনের আগে এরশাদ সরকার তাঁকে ফের গৃহবন্দী করে। ব্যাপক কারচুপির ওই নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এরশাদ পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বয়কটের পর বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো অবস্থান ছিল অতুলনীয়।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী :
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর আন্দোলনরত প্রধান তিন রাজনৈতিক জোটের সর্বসম্মত প্রস্তাব ও যৌথ রূপরেখার ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের সরকার ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। এতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সংসদ সংবিধান সংশোধন করে দেশের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১ সালের সরকারকে মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের সময়কাল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এ সময় সরকার বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেয় এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে। নারী শিক্ষার প্রসার এবং বিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তি উৎসাহিত করতে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রয়াত এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ক্ষমতার পালাবদল
১৯৯৬ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় নির্বাচিত হলেও তাদের মেয়াদ ছিল সংক্ষিপ্ত। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগ রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পরিপ্রেক্ষিতে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হয়।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বেগম জিয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল বিজয়ী হলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করে সরকার পরিচালনা করেন।
সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে, যা ‘১/১১’ নামে পরিচিত। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করতে বাধ্য করে। পরবর্তী দুই বছর দেশ পরিচালনা করে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার।
এই সরকার বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠায়, তাঁর বড় ছেলে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লন্ডনে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসনে পাঠায়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড ও পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকো সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ওই সময়ে বেগম জিয়াকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশই তাঁর একমাত্র ঠিকানা এবং বিদেশে তাঁর কোনো দ্বিতীয় কোনো বাড়ি নেই।
এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চরম মাত্রার দমন-পীড়ন সহ্য করেন। কিন্তু কারও কাছে মাথা নত করেননি। এর মধ্য দিয়ে তাঁর আপসহীন নেতৃত্বের পরিচয়ই ফুটে উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথে আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলোর সংসদ বয়কটের মুখে তাঁর নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ সংসদ ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে।
কিন্তু পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর সংসদে তা বাতিল করে। অথচ এর আগে এই ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগই মরিয়া আন্দোলন করেছিল। বেগম জিয়া এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, এর ফলে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের চর্চা নষ্ট হয়েছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ বছরের সরকারের সময়ে বেগম জিয়া কঠোর দমন-পীড়ন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ছিল সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করে।
বিশ্লেষকরা জানান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হয়রানির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ সুগম হয়।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বড় জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানায় দেশের অগণিত জনগণ।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমানে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ছবি : সংগৃহীত
পরিবেশবান্ধব শিল্প উপকরণের দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব। কৃষিজ বর্জ্যকে মূল্যবান শিল্পপণ্যে রূপান্তরের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। এর খোসা, আঁশ ও বোঁটা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘বায়ো-লেদার’ বা ভেগান চামড়া তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে দেশবিদেশে গবেষণা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ প্রযুক্তি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে প্রয়োগ করা গেলে দেশের চামড়া ও ফ্যাশন শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বিশ্বজুড়ে প্রাণীর চামড়ার বিকল্প হিসেবে ভেগান লেদারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জুতা, ব্যাগ, পোশাক ও আসবাবশিল্পে পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে। এ বাস্তবতায় কাঁঠালের মতো সহজলভ্য কৃষিপণ্য বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হতে পারে। সম্প্রতি আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একদল গবেষক কাঁঠালের খোসা থেকে সেলুলোজ আহরণ করে বায়োডিগ্রেডেবল কম্পোজিট ফিল্ম তৈরিতে সফল হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন শাহ মো. আশিকুজ্জামান নিপু। তার সঙ্গে ছিলেন আকিব রহমান ও মো. শামসুল আলম।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ ড. আবু আলী ইবনে সিনা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিশ্বে এখন কৃত্রিম প্লাস্টিকভিত্তিক বিকল্পের পরিবর্তে উদ্ভিজ উৎস থেকে পরিবেশবান্ধব বায়ো-লেদার তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশের কাঁঠালের খোসা ও আঁশ এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে ফলের বর্জ্য থেকে ভেগান লেদার উৎপাদন শুরু হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ফ্রুটলেদার রটারডাম আম ও আপেলের বর্জ্য ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে বায়ো-লেদার তৈরি করছে। ভারতের কেরালা ও কর্ণাটকের গবেষকরাও কাঁঠালের খোসার সেলুলোজ নিয়ে কাজ করছেন। যদিও কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব চামড়ার উৎপাদন এখনো পরীক্ষামূলক ও সীমিত পর্যায়েই রয়েছে।
গবেষক শাহ মো. আশিকুজ্জামান নিপু তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন, ব্লিচিং ও ক্ষারীয় প্রক্রিয়ায় কাঁঠালের খোসা থেকে প্রায় ২৮ শতাংশ সেলুলোজ আহরণ করা সম্ভব হয়েছে। এই সেলুলোজ দিয়ে জৈবভাবে অবক্ষয়যোগ্য (বায়োডিগ্রেডেবল) প্যাকেজিং ফিল্ম তৈরি করা যায়, যা ভবিষ্যতে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের টেকসই বিকল্প হতে পারে।
প্রযুক্তিবিদ অধ্যাপক ড. খন্দকার সিদ্দিক-ই-রাব্বানী বলেন, কাঁঠালের বর্জ্যকে মূল্যবান শিল্পপণ্যে রূপান্তর করা গেলে তা শিল্প, বাণিজ্য ও রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। এজন্য গবেষণায় বিনিয়োগ, শিল্পোদ্যোক্তা এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও শিল্পায়নের মাধ্যমে কাঁঠালের খোসা থেকে তৈরি ভেগান লেদার ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে গড়ে উঠতে পারে নতুন উদ্যোক্তা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষিজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হবে আরও কার্যকর।
সংগৃহীত ছবি
বন্যার সময় ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নিচে বন্যার ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও তা প্রতিরোধের উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
বন্যার সময় যেসব রোগ হতে পারে
ডায়রিয়া: বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং পচাবাসি খাবার খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। এটি শিশু ও বয়স্কদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। দ্রুত খাবার স্যালাইন ও প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন দিতে না পারলে রোগী তীব্র পানিশূন্যতায় মারা যেতে পারে।
কলেরা: দূষিত পানি ও পচাবাসি খাবারের মাধ্যমে কলেরার জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এতে তীব্র ডায়রিয়া ও বমি হয়। দ্রুত চিকিৎসা না নিলে কলেরার কারণে জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে।
জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই): দূষিত পানির মাধ্যমে এ ভাইরাসগুলো শরীরে প্রবেশ করে যকৃৎ বা লিভারকে আক্রান্ত করে। যদিও এগুলো সবসময় প্রাণঘাতী নয়, তবে শরীরে ব্যাপক দুর্বলতা তৈরি করে।
টাইফয়েড: দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে এই জীবাণু ছড়ায়। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, মাথাব্যথা এবং পেটের সমস্যা দেখা দেয়।
জিয়ারডিয়াসিস: বন্যার সময় পানিবাহিত এই রোগের কারণে পেটের পীড়া এবং আমাশয়ের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ত্বকের সংক্রমণ ও চর্মরোগ: বন্যার পানিতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করলে পায়ে ফোসকা পড়া, খোসপাঁচড়া এবং বিভিন্ন ধরনের ফাংগাল ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা: ভেজা ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় সর্দি, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
মশাবাহিত রোগ: পানি জমে থাকা স্থানে মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: ঘরবাড়ি হারানো, খাদ্য সংকট ও অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধে করণীয়
বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা
বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করা উত্তম। খাওয়ার পানি বিশুদ্ধ করতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তিন পাল্লার ভাঁজ করা পরিষ্কার সুতির কাপড়ে পানি ছেঁকে পান করলে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। নলকূপের মাথায় পলিথিন দিয়ে ভালোমতো বেঁধে রাখতে হবে যেন বন্যার দূষিত পানি পাইপের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা
খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। খাবার সবসময় ঢেকে রাখতে হবে এবং পচাবাসি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। বন্যার পানির সংস্পর্শ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। যদি একান্তই পানিতে নামতে হয়, তবে পায়ে পলিথিন জড়িয়ে বা পানিরোধক জুতা ব্যবহার করতে হবে।
মশা থেকে সতর্ক থাকা
দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ফুলের টব, বালতি, টায়ার বা অন্য কোনো পাত্রে পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
খাবার ও পুষ্টি
ত্রাণে শুকনো ও পুষ্টিকর খাবার যেমন–চিড়া, মুড়ি, ছাতু, ডাল ভাজা, গুড়, গুঁড়া দুধ ও আমসত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পানিশূন্যতা রোধে নিয়মিত পানি পান করতে হবে।
প্রাথমিক চিকিৎসা কিট
বন্যা চলাকালীন একটি প্রাথমিক চিকিৎসা কিট প্রস্তুত রাখা জরুরি। এতে ব্যান্ডেজ, গজ, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, প্যারাসিটামল ও ওআরএস থাকা প্রয়োজন।
সতর্কতা:
যে কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা মা, শিশু এবং নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা উঁচু নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে।
‘ঊনত্রিশ বছর বয়সে এসে মনে হচ্ছে, ঢাকার এই তুমুল ব্যস্ততায় মনের মতো একটা মানুষ খুঁজে পাওয়া লটারির টিকিট পাওয়ার মতো। অনেক ডেটিং অ্যাপে আলাপ হয় ঠিকই; কিন্তু দিন শেষে সেখানে মেকি আবহের শঙ্কা থেকেই যায়। ওদিকে আত্মীয়স্বজন এখন আর আগের মতো সম্বন্ধ খোঁজেন না। শূন্যতায় অদ্ভুত দিন কাটছে’– এসব কথা বলছিলেন ঢাকার বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আশরাফুল ইসলাম।
জীবনে একা থাকার আক্ষেপ বা একাকিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আধুনিক নাগরিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঢাকার শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীর বড় অংশই এখন জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে আস্থার সংকটে ভুগছেন। প্রথাগত ডেটিং অ্যাপের ওপর তীব্র অনীহা।
অন্যদিকে পুরোনো পারিবারিক কাঠামোর অনুপস্থিতি– এ দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের চিরচেনা বিয়ে ও ডেটিং কালচার। প্রযুক্তিকেন্দ্রিক ম্যাচমেকিং কনসালট্যান্সি সাইয়োনিতে নিবন্ধিত তরুণ-তরুণীর মধ্যে পরিচালিত জরিপ ও প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ডেটা বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে চমকে দেওয়া কিছু তথ্য।
আগের ধারণা ছিল, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ডেটিং অ্যাপের বাড়বাড়ন্ত হবে। কিন্তু জরিপ বলছে আরেক কথা। পরিসংখ্যান বলছে, ৫৭ শতাংশ তরুণ-তরুণী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করেছেন। তবে বর্তমানে মাত্র ১৫ শতাংশ সেখানে সক্রিয় আছেন।
জানা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৮ শতাংশ তরুণ-তরুণীই এখন ডেটিং কালচার নিয়ে তীব্র নেতিবাচক ও হতাশাজনক ধারণা পোষণ করেন।
অনেকের কাছে ডেটিং অ্যাপে মোহভঙ্গ, আরেকদিকে সম্পর্কের প্রতারণা– এই দুইয়ের মাঝখানের শূন্যস্থান পূরণ করতে এখন কাজ করছে দায়িত্বশীল ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম। যেখানে পারিবারিক গোপনীয়তা সুরক্ষা পাবে, প্রোফাইল যাচাই করা হবে ও পুরো প্রক্রিয়াটি থাকবে পেশাদার তত্ত্বাবধানে। ধারণার এমন ভিত্তিতেই তৈরি সাইয়োনি।
এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা তানভীর রহমান সমকালকে বলেন, আমি নিজে ঘটকের কাছে প্রতারিত হয়েছি। কিন্তু বেশি কষ্ট পেয়েছি, যখন দেখেছি এটি শুধু আমার গল্প নয়; সমাজে হাজারো শিক্ষিত পরিবারের অভিজ্ঞতা এখন অনেকটা এ রকমই। এই ধারণা থেকেই সাইয়োনি তৈরির কাজ হাতে নেই।
আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে যেখানে আস্থার বড্ড অভাব, সেখানে এমন প্ল্যাটফর্ম আধুনিক প্রযুক্তির মিশেলে আশির দশকের সেই হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক আন্তরিকতা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে। বিয়ে কোনো সাময়িক চুক্তি নয়; এটি দুটি পরিবারের দীর্ঘ পথচলার সেতুবন্ধ। তাই জীবনসঙ্গী খোঁজার এই যাত্রায় আজকের তরুণ প্রজন্ম এমন মাধ্যম খুঁজছে, যেখানে আধুনিক মননশীলতার সঙ্গে মিশে থাকবে চিরন্তন পারিবারিক মূল্যবোধ।