সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে কয়েক দশকের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে। জটিল আর অনিশ্চিত সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের হাল ধরেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।
তাঁর নেতৃত্বে ছিল প্রজ্ঞা আর অবিচল দৃঢ়তার মিশেল; তিনি কখনো কারোও কাছে মাথা নত করেননি, কোনো বাধায় পিছু হটেননি। এই আপসহীন মনোভাবই তাঁকে কোটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—সবক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বাক্ষর। শত প্রতিকূলতা ও দমন-পীড়নের মুখেও নিজের অবস্থানে অটল থেকে আপসহীন পথচলাই বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অনিবার্য অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ও দলের চরম সংকটময় মুহূর্তে ঘর থেকে রাজনীতির ময়দানে নামতে হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কিংবা বারবার কারারুদ্ধ হয়েও তিনি কারও সঙ্গে আপস করেননি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। পাশপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হওয়ারও গৌবর অর্জন করেছিলেন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতিটি বাঁকে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অদম্য।
১৫ আগস্ট প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। এবারের জন্মদিনে শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী।
একগুচ্ছ নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে সেই যাত্রার শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীর সেনানী ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতার পর দেশের এক চরম অস্থিতিশীল মুহূর্তে জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন এই চৌকস ও মেধাবী সেনা কর্মকর্তা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ফের দেশের হাল ধরেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বই পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতি গঠনে সচেষ্ট হন তিনি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদত বরণ করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। এই ঘটনা দেশকে এক গভীর নেতৃত্ব সংকটের মুখে ফেলে দেয়। সেই শূন্যতার মাঝেই রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অভিষেক ঘটে। বলা যায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজনীতির এক অচেনা জগতে পা রেখেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী গৃহবধূ খালেদা জিয়া।
তিনি এমন এক সংকটময় সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, যখন দলটির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই যেন শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তৎকালীন বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানেই ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদত বরণের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এমনকি তিনি বিএনপিকে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের মুখে ঠেলে দেওয়ার চষ্টা করেন।
দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেগম খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিএনপির দায়িত্ব নিয়েই বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৮৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল জনসভায় বেগম জিয়া প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হন, যা দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করে। একই বছরের ২৮ অক্টোবর তিনি দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল ‘বাংলাদেশ সচিবালয়’ ঘেরাও কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। যদিও পুলিশ সেই আন্দোলন দমন করে। এই ঘটনার পর তাঁকে কিছুদিনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি রাজপথে সাত-দলীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ ধর্মঘট, ‘ঘেরাও’ কর্মসূচি, ‘গণপ্রতিরোধ দিবস’ এবং ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর মতো ধারাবাহিক কর্মসূচিতেও নেতৃত্বেও সারিতে ছিলেন এই মহিয়সী নেত্রী। ফলশ্রুতিতে ১৯৮৫ সালে বেগম জিয়াকে আবারও গৃহবন্দী করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাত-দলীয় জোট এবং অন্য জোটগুলোর যুগপৎ আন্দোলনের মুখে এরশাদ ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী পাঁচ-দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ আরও ছয়টি দল শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেয়। অপরদিকে, বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।
১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের সেই নির্বাচনের আগে এরশাদ সরকার তাঁকে ফের গৃহবন্দী করে। ব্যাপক কারচুপির ওই নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এরশাদ পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বয়কটের পর বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো অবস্থান ছিল অতুলনীয়।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী :
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর আন্দোলনরত প্রধান তিন রাজনৈতিক জোটের সর্বসম্মত প্রস্তাব ও যৌথ রূপরেখার ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের সরকার ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। এতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সংসদ সংবিধান সংশোধন করে দেশের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১ সালের সরকারকে মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের সময়কাল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এ সময় সরকার বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেয় এবং শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে। নারী শিক্ষার প্রসার এবং বিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তি উৎসাহিত করতে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রয়াত এই প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ক্ষমতার পালাবদল
১৯৯৬ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় নির্বাচিত হলেও তাদের মেয়াদ ছিল সংক্ষিপ্ত। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগ রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পরিপ্রেক্ষিতে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হয়।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বেগম জিয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল বিজয়ী হলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করে সরকার পরিচালনা করেন।
সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে, যা ‘১/১১’ নামে পরিচিত। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করতে বাধ্য করে। পরবর্তী দুই বছর দেশ পরিচালনা করে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার।
এই সরকার বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠায়, তাঁর বড় ছেলে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লন্ডনে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসনে পাঠায়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড ও পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। ২০১৫ সালে আরাফাত রহমান কোকো সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ওই সময়ে বেগম জিয়াকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশই তাঁর একমাত্র ঠিকানা এবং বিদেশে তাঁর কোনো দ্বিতীয় কোনো বাড়ি নেই।
এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চরম মাত্রার দমন-পীড়ন সহ্য করেন। কিন্তু কারও কাছে মাথা নত করেননি। এর মধ্য দিয়ে তাঁর আপসহীন নেতৃত্বের পরিচয়ই ফুটে উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথে আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলোর সংসদ বয়কটের মুখে তাঁর নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ সংসদ ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে।
কিন্তু পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর সংসদে তা বাতিল করে। অথচ এর আগে এই ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগই মরিয়া আন্দোলন করেছিল। বেগম জিয়া এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, এর ফলে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের চর্চা নষ্ট হয়েছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে পক্ষপাতদুষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ বছরের সরকারের সময়ে বেগম জিয়া কঠোর দমন-পীড়ন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ছিল সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করে।
বিশ্লেষকরা জানান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হয়রানির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ সুগম হয়।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বড় জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানায় দেশের অগণিত জনগণ।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমানে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ছবি : সংগৃহীত
অনলাইনে টিন সার্টিফিকেট চাইলেই বাতিল করা যায়। অনেকেই নানান কারণে টিন সার্টিফিকেট করেছেন। কিন্তু তা আর কাজে আসছে না। কিন্তু ঝামেলা বাড়ছে, ই-রিটার্ন দিতে হচ্ছে, সেখানে ভুল হলে পরতে হচ্ছে আইনি ঝামেলায়। ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন হলো করদাতার জন্য নির্ধারিত একটি ইউনিক নম্বর। বাংলাদেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আয়কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে এই নম্বর ব্যবহার করা হয়। করদাতার পরিচিতি হিসেবেও কাজ করে টিআইএন বা টিন সার্টিফিকেট। আয়, কর পরিশোধ এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্যের সঙ্গে করদাতাকে শনাক্ত করতে সরকারের কাছে এর গুরুত্ব রয়েছে।
অনেকেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ভিসার আবেদন কিংবা বিভিন্ন দাপ্তরিক প্রয়োজনের কারণে টিন সার্টিফিকেট করে থাকেন। কিন্তু পরে সেই প্রয়োজন না থাকলেও টিআইএন সক্রিয় থেকে যায়। এর ফলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া নিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। টিআইএন থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। কারো করযোগ্য আয় বা সম্পদ না থাকলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী শূন্য রিটার্ন (জিরো রিটার্ন) দাখিলের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অনেকেই বিষয়টি না জানায় বা ঝামেলা এড়াতে রিটার্ন জমা দেন না। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে টিন সার্টিফিকেট বাতিলের সুযোগ রয়েছে। এর জন্য সাধারণত আলাদা কোনো ফি দিতে হয় না। অবশ্য শুধু টিআইএন আর ব্যবহার করছেন না এমন কারণেই যে সেটি বাতিল করা যাবে, তা নয়। নির্দিষ্ট কারণ ও শর্ত পূরণ করতে হয়।
কোন পরিস্থিতিতে টিন সার্টিফিকেট বাতিল করা যায়?
টিআইএন বাতিলের ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়। যেমন-
ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট টিআইএন বাতিলের প্রয়োজন হতে পারে।
ভুল করে একাধিক টিআইএন হলে
কোনো কারণে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক টিআইএন তৈরি হয়ে গেলে প্রয়োজনীয় একটি রেখে অন্যটি বাতিল করার আবেদন করা যেতে পারে।
টিআইএন আর ব্যবহার করার প্রয়োজন না থাকলে
কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য টিআইএন নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সেটির আর প্রয়োজন না থাকলে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে।
আয় করসীমার নিচে নেমে গেলে
কোনো ব্যক্তির আয় কমে গিয়ে যদি তিনি করযোগ্য সীমার বাইরে চলে যান এবং টিআইএন রাখার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে বাতিলের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি
কোনো বাংলাদেশি নাগরিক কাজের কারণে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকেন এবং বাংলাদেশে তার কোনো করযোগ্য আয় না থাকে, তাহলে দেশে থাকা অবস্থায় নেওয়া টিআইএন বাতিলের জন্য আবেদন করতে পারেন।
করদাতার মৃত্যু হলে
কোনো করদাতা মারা গেলে তার টিআইএন আর প্রয়োজন না থাকায় সেটি বাতিল করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আবেদন করতে হয়।
তবে মৃত ব্যক্তির নামে কোনো ব্যবসা বা এমন কার্যক্রম থাকলে, টিআইএন বাতিলের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যবসার কাগজপত্রও বাতিল করে নতুন করে করার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারীরা টিআইএন বাতিলের আবেদন করতে পারবেন না এ বিষয়টি আগে যাচাই করা জরুরি।
কীভাবে টিন সার্টিফিকেট বাতিল করবেন?
টিন সার্টিফিকেট বাতিলের প্রক্রিয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অনলাইনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কাগজপত্রের মাধ্যমেও আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে।
অনলাইনে টিআইএন বাতিলের আবেদন
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ই-টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার জন্য একটি সহজ অনলাইন পদ্ধতি চালু করেছে। এজন্য-
প্রথমে এনবিআর nbr.gov.bd ওয়েবসাইটে যান। লগইন করুন। যদি আপনার এনবিআর ই-টিন অ্যাকাউন্ট না থাকে, তাহলে সবার আগে সাইন আপ করে অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। যদি অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে লগইন করুন।
এনবিআর-এর সাইটে গিয়ে টিন বাতিলের জন্য আবেদন ফর্ম পূরণ করুন। এই ফর্মে আপনাকে আপনার টিন নম্বর, পণ্য/সেবা বা ব্যবসার বিবরণ এবং বাতিলের কারণ সহ বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে। ফর্ম পূরণ করার পর সেটি সাবমিট করুন। একবার আবেদন জমা দেওয়ার পর, এনবিআর আপনার আবেদনটি পর্যালোচনা করবে এবং কোনো অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন হলে আপনাকে জানানো হবে।
আবেদন গৃহীত হলে আপনাকে টিন বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হবে।
অফলাইনেও টিন সার্টিফিকেট বাতিল করা সম্ভব
যদি অনলাইনে আবেদন করা সম্ভব না হয়, তবে আপনি স্থানীয় রেজিস্ট্রেশন অফিস বা কাস্টমস অফিসে বাতিলের আবেদন করতে পারেন। এজন্য-
প্রথমে আপনার ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য প্রস্তুত করুন। যেমন: টিন নম্বর, প্রতিষ্ঠানের নাম/ব্যক্তির নাম, ব্যবসার বা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা (বন্ধ/অবসর) ইত্যাদি।
যখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করবেন, তখন আপনাকে নির্দিষ্ট কাগজপত্র জমা দিতে হবে, যেমন-টিন সার্টিফিকেট, প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার বন্ধ হওয়ার ঘোষণা (যদি প্রযোজ্য হয়), আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র।
পর পর কমপক্ষে তিন অর্থ-বছরের শূন্য কর রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তি স্বীকার পত্রের ফটোকপি সঙ্গে দিতে হবে। এই কাগজপত্রগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে দাখিল করার পর, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আপনার আবেদন পর্যালোচনা করবে এবং তারপর টিন বাতিল করা হবে। একবার আপনার টিন সনদ বাতিল হলে, আপনাকে একটি টিন বাতিলের সনদ প্রদান করা হবে, যা আপনি পরে ব্যবহার করতে পারবেন।
টিন সার্টিফিকেট বাতিলের পর কী হবে?
আবেদন অনুমোদিত হলে টিআইএন বাতিলের সনদ দেওয়া হতে পারে। একবার টিন সার্টিফিকেট বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট টিন ব্যবহার করে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না এবং ওই টিআইএনের সঙ্গে সম্পর্কিত আয়কর নথি বা দায়ও প্রযোজ্যতার ভিত্তিতে আর থাকবে না। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি টিন সার্টিফিকেট একবার বাতিল হয়ে গেলে পুরোনো টিন সার্টিফিকেট পরে আবার ব্যবহার করা যাবে না। ভবিষ্যতে যদি আবার টিন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়, তাহলে নতুন করে টিআইএনের জন্য আবেদন করতে হবে।
তাই শুধু রিটার্ন জমা দেওয়ার ঝামেলা এড়াতে তাড়াহুড়ো করে টিআইএন বাতিলের সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগে নিজের বর্তমান আয়, সম্পদ, ব্যবসা এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনা করা উচিত। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ বা কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
বিশ্বায়নের এই যুগে পড়াশোনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি ও নেতৃত্বের দক্ষতাকে প্রমাণের সুযোগ খুঁজছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলো কেবল মেধা যাচাইয়ের সুযোগই এনে দেয় না, বরং স্কলারশিপ, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ার গঠনের নতুন দুয়ার খুলে দেয়। ২০২৭ সালে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অংশ নেওয়ার জন্য উপযোগী এমনই সেরা পাঁচটি প্রতিযোগিতার বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
ইয়ং ডিপ্লোম্যাট অ্যাওয়ার্ড
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি, Model United Nations এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক ইস্যুতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য BosMUN Young Diplomat Award হতে পারে দারুণ একটি অভিজ্ঞতা। প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত আন্তর্জাতিক বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক রচনা লিখে নিজের যুক্তি ও বিশ্লেষণ তুলে ধরতে হয়।
এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের গবেষণা, যুক্তি উপস্থাপন, লেখালেখি এবং আন্তর্জাতিক বিষয় বিশ্লেষণের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
https://www.bosmun.org/youngdiplomataward
ব্লু ওশান স্টুডেন্ট এন্টারপ্রেনার কম্পিটিশন
উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ রয়েছে এমন হাই স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য এটি দারুণ একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা একা অথবা সর্বোচ্চ পাঁচজনের দল নিয়ে অংশ নিতে পারে। প্রতিযোগিতায় একটি নতুন ব্যবসায়িক ধারণা তৈরি করে ৩-৫ মিনিটের ভিডিও পিচ জমা দিতে হয়। ২০২৭ সালের পিচ জমা দেওয়ার শেষ সময় ২১ ফেব্রুয়ারি। প্রতিযোগিতাটি সম্পূর্ণ অনলাইনে এবং অংশগ্রহণ বিনামূল্যে। হাইস্কুল, GCSE/IGCSE, O-Level, A-Level বা সমমানের প্রি-ইউনিভার্সিটি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিতে পারে।
https://blueoceancompetition.org/
ফিবোনাচ্চি ইন্টারন্যাশনাল রোবট অলিম্পিয়াড ইউরোপভিত্তিক এই সম্মানজনক প্রতিযোগিতাটিতে মূলত স্টেম (STEM), বিজ্ঞান, রোবটিকস ও এন্ট্রাপ্রেনারশিপভিত্তিক প্রজেক্ট মূল্যায়ন করা হয়। আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডের অংশ হিসেবে ইতালি বা ইউরোপের কোনো দেশে অনুষ্ঠিত এই মঞ্চে জাতীয় পর্যায় পার হয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও সরাসরি অংশ নিতে পারে।
বিষয়: ফলিত বিজ্ঞান, রোবটিকস অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনারশিপ।
যোগ্যতা: ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী।
https://fibonacci.international/
ওয়ার্ল্ড ইনভেনশন কম্পিটিশন অ্যান্ড এক্সিবিশন
মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ডব্লিউআইসিই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উদ্ভাবন প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা। সারাবিশ্ব থেকে আসা তরুণ গবেষক ও উদ্ভাবকরা তাদের নিজ নিজ প্রজেক্ট তুলে ধরেন। ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি ও এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের উদ্ভাবনগুলোর জন্য এটি একটি বিশ্বমানের আদর্শ প্ল্যাটফর্ম।
বিষয়: প্রকৌশল, প্রযুক্তি, প্রয়োগিক বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন।
যোগ্যতা: হাই স্কুল ও কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের খুদে গবেষক ও শিক্ষার্থী।
https://www.wice.or.id/
ডায়মন্ড চ্যালেঞ্জ ২০২৭
ব্যবসা ও সামাজিক উদ্ভাবনের ধারণা নিয়ে কাজ করতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য University of Delaware-এর Horn Entrepreneurship পরিচালিত Diamond Challenge গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা দল গঠন করে ব্যবসা বা সামাজিক উদ্যোগের ধারণা উপস্থাপন করতে পারে। ২০২৭ সালের প্রতিযোগিতায় সেপ্টেম্বর থেকে ধারণা তৈরির কাজ শুরু হয় এবং জানুয়ারিতে প্রথম ধাপের সাবমিশন শেষ হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ের Limitless World Summit অনুষ্ঠিত হবে ২৯-৩০ এপ্রিল ২০২৭।
https://diamondchallenge.org/competition
বৈশ্বিক এই প্রতিযোগিতাগুলো কেবল বিজয়ী হওয়ার জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের তরুণদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, লিডারশিপ ও উদ্ভাবনী চিন্তার অনন্য পরিচয় তুলে ধরতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। এসব আন্তর্জাতিক সম্মাননা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ প্রাপ্তি ও উচ্চশিক্ষার পথকেও সুগম করে তোলে। তাই ২০২৭ সালকে সামনে রেখে নিজ নিজ উদ্ভাবন, টিমওয়ার্ক ও বিশ্বজয়ের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনই নিখুঁতভাবে গুছিয়ে নেওয়ার সঠিক সময়।
“সকালে খেয়ে এসেছো বাবা?”
খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন। অথচ এই ছোট্ট প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একজন শিক্ষকের অসীম মমতা। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের বাইরে একজন শিক্ষক যে শিক্ষার্থীর খোঁজ রাখেন, তার ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবেন, এই সম্পর্কের গভীরতা হয়তো এমন কিছু ছোট ছোট মুহূর্তেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়।
শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠ শেখান না, জীবনের পথও দেখান। অক্ষর পরিচয়ের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষাযাত্রার শুরু, সময়ের সঙ্গে সেই যাত্রাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে নীরবে ভূমিকা রাখেন শিক্ষকেরা। ভুল-শুদ্ধের পার্থক্য বোঝানো থেকে শুরু করে কঠিন সময়ে সাহস জোগানো, জীবনের নানা বাঁকে কোনো না কোনোভাবে একজন শিক্ষক হয়ে ওঠেন আমাদের পথপ্রদর্শক।
একজন শিক্ষকের হাত ধরেই শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে ওঠে স্বপ্ন দেখার সাহস। কেউ ভবিষ্যতে চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, গবেষক কিংবা রাষ্ট্রনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নের বীজ বপন করেন শিক্ষকেরাই। তাই শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ে তোলার এক দীর্ঘ দায়িত্ব।
শিক্ষকের এই অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেই পালিত হয় শিক্ষক দিবস। দিনটি শুধু শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপলক্ষ নয়, বরং একজন মানুষের জীবনে শিক্ষকের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে স্মরণ করারও দিন। কারণ, শ্রেণিকক্ষের পাঠ একসময় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু শিক্ষকের দেওয়া শিক্ষা থেকে যায় সারাজীবন।
স্কুলের পুরোনো ক্লাসরুম, ব্ল্যাকবোর্ডে চকের আঁচড় কিংবা পরীক্ষার আগের ব্যস্ত দিনগুলো মনে পড়লে আজও শৈশবের সেই সময়টুকু চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বই-খাতা আর পরীক্ষার গণ্ডির বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মধ্যে যে মায়া তৈরি হয়, তা সময়ের সঙ্গে সহজে মুছে যায় না।
স্কুলের প্রথম দিনে মায়ের হাত ছেড়ে অচেনা পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির মাথায় যখন শিক্ষক হাত রেখে বলেন, “ভয় নেই, আমি আছি” তখনই হয়তো অচেনা জায়গাটি একটু একটু করে আপন হয়ে ওঠে। ভুল করলে কখনো শাসন, আবার পরক্ষণেই কাছে ডেকে স্নেহ করা, শিক্ষকের এই কঠোরতা ও মমতার মিশেলই ধীরে ধীরে একজন শিক্ষার্থীকে পরিণত করে।
কৈশোরে প্রিয় শিক্ষকের একটি কথাই কখনো কখনো বদলে দিতে পারে আত্মবিশ্বাসের পুরো গল্প। “তুই পারবি” এই সামান্য কয়েকটি শব্দই হয়তো কোনো শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে ওঠে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সাহস।
তবে গল্পের সবচেয়ে করুণ মুহূর্তটি আসে বিদায়বেলায়। যে শিক্ষককে হয়তো ক্লাসে একটু ভয় পাওয়া হতো, কখনো কখনো এড়িয়ে চলার চেষ্টাও ছিল, সেই শিক্ষককে বিদায়ের মুহূর্তে সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় জানাতে গিয়ে চোখের পানি আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষকের চোখেও তখন থাকে গর্ব, ভালোবাসা আর নিজের হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেওয়ার নীরব কষ্ট।
সময়ের সঙ্গে শৈশব পেরিয়ে আমরা জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাই। বদলে যায় ক্লাসরুম, বদলে যায় পরিচিত মুখগুলোও। কিন্তু জীবনের কোনো কঠিন মুহূর্তে হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো উপদেশ, সেই সাহস জোগানো কথাগুলো। তখন বুঝতে পারি স্কুল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলেও শিক্ষকের শিক্ষা কখনো শেষ হয় না।
জীবনের পথে আমরা যত দূরেই যাই, আমাদের ভেতরে কোনো না কোনো শিক্ষকের শেখানো কথা থেকে যায়। তাই শিক্ষক শুধু একটি সময়ের সঙ্গী নন, তিনি আমাদের বেড়ে ওঠার নীরব সাক্ষী, স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা এবং সারাজীবনের এক পথপ্রদর্শক।
ছবি : সংগৃহীত
একটি শিশুর হাসি যেমন একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি, তেমনি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে সেই হাসি ম্লান হয়ে যাওয়া আমাদের সবার জন্য বেদনাদায়ক। বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম রোগের পুনরুত্থান আমাদের সামনে এমনই এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে; যেখানে সামান্য অসচেতনতা বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
কতটা ভয়ংকর এই ‘হাম’?
হাম পৃথিবীর অন্যতম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে গড়ে ১২-১৮ জন অ-টিকাপ্রাপ্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস খুব দ্রুত পরিবার ও সমাজে বিস্তার লাভ করে।
লক্ষণ: প্রথমেই চিনে নিন
> উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া
> চোখ লাল হয়ে যাওয়া
> মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)
> মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া লাল ফুসকুড়ি
জটিলতা: অবহেলার সুযোগ নেই
হাম কখনোই ‘হালকা’ রোগ নয়; বিশেষ করে কিছু শিশুর জন্য এটি জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সম্ভাব্য জটিলতা–
> নিউমোনিয়া
> ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন
> কানের সংক্রমণ
> এনসেফালাইটিস
দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু: তারা কি বেশি ঝুঁকিতে? একজন পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায়; জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুরা হামের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে, বিশেষ করে–
> যাদের হার্টের সমস্যা এখনও সম্পূর্ণ সংশোধন (corrected) হয়নি
> যাদের হার্ট ফেইলিউর বা ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রয়েছে
> অপুষ্ট বা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া শিশু
কেন তারা বেশি ঝুঁকিতে?
> হামের সময় নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা আগে থেকেই দুর্বল হার্ট ও ফুসফুসের জন্য বিপজ্জনক
> জ্বর ও সংক্রমণের কারণে হার্টের ওপর চাপ বাড়ে
> অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে, যা সায়ানোটিক হার্ট ডিজিজে আক্রান্ত শিশুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে
> ডিহাইড্রেশন ও ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা হার্টের অবস্থা খারাপ করতে পারে অর্থাৎ একটি ‘সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ’ এই শিশুদের জন্য দ্রুত জটিল অবস্থায় রূপ নিতে পারে।
এসব শিশুর জন্য বিশেষ সতর্কতা
> টিকাদানে কোনো বিলম্ব নয়
> নির্ধারিত সময়েই MR টিকা অবশ্যই দিতে হবে
> প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে আগাম সুরক্ষা পরিকল্পনা করা যেতে পারে
> ভিড় বা অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
> পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে শিশুকে আলাদা রাখুন
দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ
> জ্বর, কাশি বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান
> ‘দেখি নিজে নিজে ভালো হয় কিনা’–এই অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে
পুষ্টি ও ফলোআপ নিশ্চিত করা
> অপুষ্টি থাকলে ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে
> নিয়মিত কার্ডিওলজি ফলোআপ বজায় রাখা জরুরি
প্রতিরোধ: টিকাই একমাত্র ঢাল।
হরমুজ প্রণালি
প্রায় ৭ মাস ধরে যুদ্ধ চলছে ইরানের সঙ্গে। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতাও শুরু তখন থেকে। এর মধ্যে নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও। বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ তেলের সরবরাহ চ্যানেলে এভাবে বাধা তৈরি হলেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বাস্তবতা মেনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এগোচ্ছে বিকল্প পথে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কমাচ্ছে চাহিদা। কমাচ্ছে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা। এমন পরিবর্তনের কারণে আগের তুলনায় কম আমদানির পরও সচল রয়েছে দেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি।
রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ ধরনের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করলেও এখন তাতে পরিবর্তন এনেছে। তারপরও বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়নি বাংলাদেশেও। জ্বালানির দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু অন্যতম প্রধান দুটি প্রণালি আক্রান্ত হওয়ার পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠেনি এখনও।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বাজারে যাওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির ১৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। প্রতিদিন যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। হরমুজ দিয়ে যাওয়া এই জ্বালানির প্রায় ৮৯ শতাংশ আসে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বাজারে। আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে এবং সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার অন্যতম পথও এটি।
জেপি মরগ্যানের প্রধান পণ্যবাজার বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তিন কারণে তেলের বাজার ধারণার চেয়ে কম বেড়েছে। তাঁর হিসাবে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর তেলের দাম দেড়শ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে শঙ্কা থাকলেও এখন মনে হচ্ছে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেও তেলের দাম সে পর্যায়ে বাড়বে না। তাঁর সর্বশেষ এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। হুতিদের দ্বারা বিকল্প পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের নাগালের বাইরে থাকা বন্দরে পাঠিয়েছে। এটির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদা আগের তুলনায় কমিয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ ধারণার তুলনায় কম তেল ব্যবহার করেছে তাদের মজুত থেকে। এজন্য যুদ্ধের সময়ে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ভ্রমণ কমে যাওয়া, গণপরিবহন ব্যবহার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার কারণে যেমন তেলের চাহিদা কমেছে, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠানের বাড়ি থেকে কাজের ধারায় ফিরে যাওয়ার কারণেও তা কমেছে।
সরবরাহ চ্যানেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে চাহিদাও কমেছে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিবছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, ফার্নেসসহ ১৬ রকমের তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি। আগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার টন জ্বালানি পণ্য উৎপাদন হলেও এখন হচ্ছে গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টন। উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণও ১৬ থেকে কমে নেমেছে আট থেকে দশে। এই কারখানায় এতদিন কেবল সৌদি আরবের ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হলেও যুদ্ধ শুরুর পর বিকল্প দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার ক্রুড অয়েল ব্যবহারের কথা ভেবেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।
সৌদি ক্রুড অয়েলের অভাবে চলতি বছরের এপ্রিলে পরিশোধন কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল ইস্টার্ন রিফাইনারি। অবশ্য সেই সময়টাতেও কারখানা সংস্কারের বিকল্প কাজ সম্পন্ন করেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারটি। তখন থেকে উৎপাদনের পরিমাণও কমিয়েছে সংস্থাটি। দেশে এলএনজি ও এলপিজির সরবরাহ প্রক্রিয়াতেও সম্প্রতি বাধা তৈরি হয়েছিল।
কারিগরি ত্রুটির কারণে কয়েকদিন সমস্যা হলেও দেশে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়নি মজুতে। কারণ, দাম বেশি পড়লেও বাংলাদেশ বিকল্প দেশ থেকে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সরবরাহ করেছে।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না বাংলাদেশকে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের জন্য বিকল্প উৎসের সহায়তা নিচ্ছি আমরা।’
র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, তেলের দাম আর হু হু করে বাড়বে না। একশ ডলার ছাড়িয়ে দেড় শতকের ঘর এটি আর স্পর্শ করবে না শিগগির। বিশ্ববাজারে মিলছে এর ইঙ্গিতও। বাব আল-মান্দেব হুতিরা নিয়ন্ত্রণে নিলেও গত সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বর মাসের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তেলের দাম ১০৯ ডলারে উঠেছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ এক দিনের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৪ ডলারে নেমে আসে। এরপর সোমবার তেলের দাম ১০১ ডলারে নেমে যায়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করে। এর পর ৩০ এপ্রিল তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত ওঠে। পরে আবার তা কমে আবার বাড়লেও অতিক্রম করেনি ১২৬ ডলারের ঘর।
ছবি : সংগৃহীত
ভোরের আলো ফুটতেই সন্ধ্যা নদীর বুকে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়। চারপাশ থেকে ছুটে আসে শত শত ছোট-বড় ডিঙি ও ট্রলার। নদীর স্নিগ্ধ হাওয়ায় মিশে যায় মানুষের কোলাহল, দাঁড় টানার ছপছপ শব্দ আর ধান-চাল মাপার খসখস আওয়াজ। এক নৌকায় হয়তো চলছে ধানের দরদাম, তো ঠিক পাশে অন্য নৌকায় মাপা হচ্ছে চকচকে চাল।
ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি, বস্তা টানাটানি আর নগদ লেনদেন-সবকিছুই চলছে নদীর বুকে ভাসমান নৌকায়। বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর বুকে বসা ধান-চালের এ ভাসমান হাট কেবল একটি বাজার নয়, এটি যেন আবহমান বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এক জীবন্ত ক্যানভাস।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রমত্তা সন্ধ্যা নদীর তীরে ধান-চালের এই ভাসমান বাণিজ্যের বয়স প্রায় ২০০ বছর। একসময় নদীর দুই পাশে সারি সারি ধান-চালের আড়ত ও চালকল ছিল। মোল্লা, ব্যাপারী, মৃধা, সরদারসহ বিভিন্ন উপাধিধারী ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও নদীর বুকে নৌকায় নৌকায় বেচাকেনার সেই আদি রীতি আজও টিকে আছে।
বানারীপাড়ার নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘বালাম চাল’। সরু, লম্বাটে ও সুগন্ধি এই চালের একসময় দেশজুড়ে ব্যাপক কদর ছিল। বালামের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ধান ও চাল বেচাকেনা হয় এখানে। তবে এই হাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেন ‘কুটিয়াল’রা।
ধান কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে চালে রূপান্তরের কারিগরদের স্থানীয় ভাষায় কুটিয়াল বলা হয়। নৌকায় ধান কিনে প্রথমে তা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর ভোরে বিশাল আকৃতির চুলায় বিশেষ পাত্রে সেই ধান সেদ্ধ করা হয়।
এরপর দুই-তিন দিন কড়া রোদে উঠানে শুকিয়ে চালকলে ভাঙানোর পর মেলে সেই কাঙ্ক্ষিত ঝরঝরে চাল। একসময় বানারীপাড়ার ঘরে ঘরে কুটিয়ালদের ব্যস্ততা ছিল, যা আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ।
বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে নদীপথে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই হাটে। বরগুনার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন যেমন এক নৌকা ধান নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, এখানে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া যায়, আবার ফেরার পথে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের চালও কিনে নেওয়া যায়। যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব বেশি হলেও নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং ব্যবসায়িক বিশ্বস্ততার কারণে তিনি দশকের পর দশক ধরে এই হাটে আসেন।
আগে যেখানে পালতোলা নৌকার আধিক্য ছিল, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে যন্ত্রচালিত ট্রলার বা ইঞ্জিন নৌকা। তবে নদীর বুকে সারি সারি নৌকায় ধান-চালের পসরা সাজানোর সেই চিরায়ত দৃশ্যটি বদলায়নি।
বানারীপাড়ার এই মূল হাট বসে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার। তবে আগের দিনের হাটের রেশ ধরে রবি ও বুধবারও কিছুটা বেচাকেনা চলে, যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘গালার হাট’। হাটের দিনগুলোয় পাইকার, কুটিয়াল আর শ্রমিকদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে এক অন্য রকম প্রশান্তি।