সংগৃহীত ছবি
বন্যার সময় ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নিচে বন্যার ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও তা প্রতিরোধের উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
বন্যার সময় যেসব রোগ হতে পারে
ডায়রিয়া: বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং পচাবাসি খাবার খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। এটি শিশু ও বয়স্কদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। দ্রুত খাবার স্যালাইন ও প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন দিতে না পারলে রোগী তীব্র পানিশূন্যতায় মারা যেতে পারে।
কলেরা: দূষিত পানি ও পচাবাসি খাবারের মাধ্যমে কলেরার জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এতে তীব্র ডায়রিয়া ও বমি হয়। দ্রুত চিকিৎসা না নিলে কলেরার কারণে জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে।
জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই): দূষিত পানির মাধ্যমে এ ভাইরাসগুলো শরীরে প্রবেশ করে যকৃৎ বা লিভারকে আক্রান্ত করে। যদিও এগুলো সবসময় প্রাণঘাতী নয়, তবে শরীরে ব্যাপক দুর্বলতা তৈরি করে।
টাইফয়েড: দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে এই জীবাণু ছড়ায়। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, মাথাব্যথা এবং পেটের সমস্যা দেখা দেয়।
জিয়ারডিয়াসিস: বন্যার সময় পানিবাহিত এই রোগের কারণে পেটের পীড়া এবং আমাশয়ের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ত্বকের সংক্রমণ ও চর্মরোগ: বন্যার পানিতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করলে পায়ে ফোসকা পড়া, খোসপাঁচড়া এবং বিভিন্ন ধরনের ফাংগাল ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা: ভেজা ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় সর্দি, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
মশাবাহিত রোগ: পানি জমে থাকা স্থানে মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: ঘরবাড়ি হারানো, খাদ্য সংকট ও অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধে করণীয়
বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা
বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করা উত্তম। খাওয়ার পানি বিশুদ্ধ করতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তিন পাল্লার ভাঁজ করা পরিষ্কার সুতির কাপড়ে পানি ছেঁকে পান করলে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। নলকূপের মাথায় পলিথিন দিয়ে ভালোমতো বেঁধে রাখতে হবে যেন বন্যার দূষিত পানি পাইপের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা
খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। খাবার সবসময় ঢেকে রাখতে হবে এবং পচাবাসি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। বন্যার পানির সংস্পর্শ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। যদি একান্তই পানিতে নামতে হয়, তবে পায়ে পলিথিন জড়িয়ে বা পানিরোধক জুতা ব্যবহার করতে হবে।
মশা থেকে সতর্ক থাকা
দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ফুলের টব, বালতি, টায়ার বা অন্য কোনো পাত্রে পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
খাবার ও পুষ্টি
ত্রাণে শুকনো ও পুষ্টিকর খাবার যেমন–চিড়া, মুড়ি, ছাতু, ডাল ভাজা, গুড়, গুঁড়া দুধ ও আমসত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পানিশূন্যতা রোধে নিয়মিত পানি পান করতে হবে।
প্রাথমিক চিকিৎসা কিট
বন্যা চলাকালীন একটি প্রাথমিক চিকিৎসা কিট প্রস্তুত রাখা জরুরি। এতে ব্যান্ডেজ, গজ, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, প্যারাসিটামল ও ওআরএস থাকা প্রয়োজন।
সতর্কতা:
যে কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা মা, শিশু এবং নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা উঁচু নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে।
‘ঊনত্রিশ বছর বয়সে এসে মনে হচ্ছে, ঢাকার এই তুমুল ব্যস্ততায় মনের মতো একটা মানুষ খুঁজে পাওয়া লটারির টিকিট পাওয়ার মতো। অনেক ডেটিং অ্যাপে আলাপ হয় ঠিকই; কিন্তু দিন শেষে সেখানে মেকি আবহের শঙ্কা থেকেই যায়। ওদিকে আত্মীয়স্বজন এখন আর আগের মতো সম্বন্ধ খোঁজেন না। শূন্যতায় অদ্ভুত দিন কাটছে’– এসব কথা বলছিলেন ঢাকার বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আশরাফুল ইসলাম।
জীবনে একা থাকার আক্ষেপ বা একাকিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আধুনিক নাগরিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঢাকার শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীর বড় অংশই এখন জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে আস্থার সংকটে ভুগছেন। প্রথাগত ডেটিং অ্যাপের ওপর তীব্র অনীহা।
অন্যদিকে পুরোনো পারিবারিক কাঠামোর অনুপস্থিতি– এ দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের চিরচেনা বিয়ে ও ডেটিং কালচার। প্রযুক্তিকেন্দ্রিক ম্যাচমেকিং কনসালট্যান্সি সাইয়োনিতে নিবন্ধিত তরুণ-তরুণীর মধ্যে পরিচালিত জরিপ ও প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ডেটা বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে চমকে দেওয়া কিছু তথ্য।
আগের ধারণা ছিল, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ডেটিং অ্যাপের বাড়বাড়ন্ত হবে। কিন্তু জরিপ বলছে আরেক কথা। পরিসংখ্যান বলছে, ৫৭ শতাংশ তরুণ-তরুণী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করেছেন। তবে বর্তমানে মাত্র ১৫ শতাংশ সেখানে সক্রিয় আছেন।
জানা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৮ শতাংশ তরুণ-তরুণীই এখন ডেটিং কালচার নিয়ে তীব্র নেতিবাচক ও হতাশাজনক ধারণা পোষণ করেন।
অনেকের কাছে ডেটিং অ্যাপে মোহভঙ্গ, আরেকদিকে সম্পর্কের প্রতারণা– এই দুইয়ের মাঝখানের শূন্যস্থান পূরণ করতে এখন কাজ করছে দায়িত্বশীল ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম। যেখানে পারিবারিক গোপনীয়তা সুরক্ষা পাবে, প্রোফাইল যাচাই করা হবে ও পুরো প্রক্রিয়াটি থাকবে পেশাদার তত্ত্বাবধানে। ধারণার এমন ভিত্তিতেই তৈরি সাইয়োনি।
এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা তানভীর রহমান সমকালকে বলেন, আমি নিজে ঘটকের কাছে প্রতারিত হয়েছি। কিন্তু বেশি কষ্ট পেয়েছি, যখন দেখেছি এটি শুধু আমার গল্প নয়; সমাজে হাজারো শিক্ষিত পরিবারের অভিজ্ঞতা এখন অনেকটা এ রকমই। এই ধারণা থেকেই সাইয়োনি তৈরির কাজ হাতে নেই।
আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে যেখানে আস্থার বড্ড অভাব, সেখানে এমন প্ল্যাটফর্ম আধুনিক প্রযুক্তির মিশেলে আশির দশকের সেই হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক আন্তরিকতা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে। বিয়ে কোনো সাময়িক চুক্তি নয়; এটি দুটি পরিবারের দীর্ঘ পথচলার সেতুবন্ধ। তাই জীবনসঙ্গী খোঁজার এই যাত্রায় আজকের তরুণ প্রজন্ম এমন মাধ্যম খুঁজছে, যেখানে আধুনিক মননশীলতার সঙ্গে মিশে থাকবে চিরন্তন পারিবারিক মূল্যবোধ।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
২০২৫ এবং ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমানদের, বাংলাদেশে পুশ-ইন বা জোরপূর্বক পাঠানোর হচ্ছে। আসাম সরকার মূলত অভিবাসী (আসাম থেকে বহিস্কার) নির্দেশ-(১৯৫০ আইন from Assam Act, 1950) নামক একটি ঔপনিবেশিক আমলের আইন ব্যবহার করে বাংলাভাষী ও কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করছে।
অভিবাসী বহিস্কার আইন-১৯৫০ করার ১০ বছর আগে ১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পিতা শিশির অধিকারী (পূর্বনাম মাখনলাল ভট্টাচার্য) ও মা গায়ত্রী দেবী (পূর্বনাম গায়ত্রী ভট্টাচার্য) নাম পরিবর্তন করে আদি বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বাটাজোর গ্রাম ছেড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। শুভেন্দু অধিকারীও ১৯৭০ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অভিবাসী বহিস্কার আইন-১৯৫০ করার ২০ বছর পর। তাঁর বাবা-মা এখনও জীবিত আছেন।
প্রশ্ন উঠেছে,পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পরিবারও ১৯৫০ সালের অভিবাসী বহিস্কার আইন অনুযায়ী 'অবৈধ অভিবাসী'। কারণ তাঁর বাবা-মা বাংলাদেশের আদি বাড়ি বরিশাল ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে গেছেন ১৯৬০ সালের ঔপনিবেশিক আমলের অভিবাসী বহিস্কার আইন, ১৯৫০, এর ১০ বছর পর। শুভেন্দু অধিকারীও জন্মগ্রহন করেছেন ১৯৫০ সালের অভিবাসী বহিস্কার আইন করার ২০ বছর পর। তাহলে শুভেন্দু অধিকারীর পরিবার 'বাংলাভাসী হিন্দু' বলে অবৈধ অভিবাসী হবে না কেন? বা তাদেরকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা যাবে না কেন? ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল ও মানবাধিকার সনদের অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হয়েও শুধু বাংলাভাষী মুসলমানদের ভারত থেকে তারিয়ে দেওয়ার নামই হচ্ছে 'পুশ ইন'।
অপরদিকে, শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলেছেন, "আমার মা বরিশাল থেকে এসেছিলেন, হিন্দু নিপীড়নের যন্ত্রণা আমি বুঝি।" অপরদিকে, শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সেই শুভেন্দু অধিকারীই মমতা ব্যানার্জীকে পরাজিত করে বিজেপি থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হয়েছেন। তিনি বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভা ও রাজনৈতিক সমাবেশে 'আসাম মডেল' অনুসরণ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের চিহ্নিত করার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। গত ১২ মে আসামের গুয়াহাটিতে তিনি বলেছেন, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে অনুপ্রবেশ রোধে যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল, তা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গেও বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি অভিযোগ করেন যে, আগের সরকার অনুপ্রবেশের বিষয়ে উদাসীন ছিল এবং বিএসএফকে বর্ডার অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জমি পর্যন্ত দেয়নি।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) জমি বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে যে, ভারতের প্রাদেশিক সরকার 'অবৈধভাবে বসবাসকারী' ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বন্দুকের মুখে বা জোর করে অনেককে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযানের শিকার হয়ে অনেকেই—যাঁরা দাবি করছেন তাঁরা ভারতেরই নাগরিক—বাংলাদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, মে ২০২৫ সালে ভারত থেকে ১২০০ জনেরও বেশি মানুষকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে এই ধরনের পুশ-ইন প্রচেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ভারতের আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলিমদের 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' হিসেবে চিহ্নিত করার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বা কৌশল হিসেবে এই পুশ-ইন চলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাঁরা মনে করেন, ভারত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ। অনেক ক্ষেত্রেই ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকার উভয় পক্ষই পক্ষপাতহীন আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান করাই কল্যাণকর।
লেখক: এম এ আজিজ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
হলি আর্টিজানে হামলা
২০১৬ সালের ১ জুলাই বিশ্ব তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশের দিকে। কারণ, এ দিনই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নারকীয় জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ। এ হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ নিহত হন মোট ২২ জন। নিহতদের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। জঙ্গিদের গুলি ও বোমায় আহত হন পুলিশের অনেকে। আজ সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো।
ওইদিন রাত ৮টা ৪৫-৫০ মিনিটের দিকে ওয়ারলেস সেটে পুলিশ জানতে পারে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে গোলাগুলি হচ্ছে। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ সেখানে হাজির হয়। এভাবে কয়েক বার প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও স্পর্শকাতর বিবেচনায় রাতে হলি আর্টিজানে অভিযান চালানো থেকে বিরত থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ অবসান হয় জিম্মিদশার, নিহত হয় হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি।
ভয়াবহ ওই জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে জঙ্গিদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নীলনকশা। বিভিন্ন সময় এ হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগসাজসের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
তবে, তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ জানিয়েছে—হামলায় জড়িত জঙ্গিরা সবাই ‘হোম গ্রোন’, অর্থাৎ দেশীয়। জেএমবির কিছু সদস্য নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়, যারা ‘নব্য জেএমবি’ বলে আখ্যায়িত।
নব্য জেএমবির সদস্যদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকলেও হলি আর্টিজানের ঘটনার পর ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গিদের রুখে দিতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব অভিযানে অনেক নব্য জেএমবির সদস্য নিহত হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয় আরও অনেককে।
তবে, হলি আর্টিজানে নৃশংস জঙ্গি হামলার ছয় বছরেও শেষ হয়নি মামলার বিচার প্রক্রিয়া। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর এ মামলায় সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে বেকসুর খালাসের রায় দেন আদালত।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—হামলার মূল সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ।
আসামিদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করেন বিচারিক আদালত। আর, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলার অপর আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেওয়া হয়।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, এ ছাড়া র্যাবের অভিযানে বন্ধ হয় হলি আর্টিজানের বীভৎস ছবি তাৎক্ষণিক প্রচার করা আত্-তামকীন ওয়েবসাইট এবং গ্রেপ্তার হয়েছিল অ্যাডমিনসহ বেশ কয়েক জন সদস্য। হলি আর্টিজান ঘটনার পরে অভিযানে র্যাব জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, অর্থদাতা ও বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে জঙ্গি সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে। এখন সে অর্থে জঙ্গিদের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায় না।
সেদিন যা ঘটেছিল
১ জুলাই শুক্রবার। সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে খবর আসে গুলশানে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা গেল—একটি রেস্তোরাঁয় সশস্ত্র হামলাকারী ঢুকে বেশ কয়েকজনকে জিম্মিও করেছে। কিন্তু, ঘটনাটি আসলে কী? গুজব, নাকি সত্যি—সেটি নিশ্চিত হতেও ঘণ্টাখানেক সময় চলে গেল। পরে জানা গেল হামলাকারীরা ওই রেস্তোরাঁয় থাকা বিদেশি নাগরিকসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করেছে। একপর্যায়ে জানা যায়, গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছে।
তখন ওই জোনের দায়িত্বে থাকা ডিএমপির ডিসি আহাদ তখন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে ইউনাইটেড হাসপাতালের পাশে থাকা গুলশান থানার একটি মোবাইল টিম সেখানে পৌঁছায়। একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) নেতৃত্বে মোবাইল টিমটি হলি আর্টিজানের সামনে যাওয়া মাত্রই তাদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়তে থাকে। সন্ত্রাসীদের গুলির জবাবে মোবাইল টিমের সদস্যরাও গুলি ছোড়ে। এরই মধ্যে ওই মোবাইল টিমের দলনেতা হলি আর্টিসানের প্রধান ফটকটি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেন, যাতে সন্ত্রাসীরা বের হয়ে যেতে না পারে। গুলি বিনিময়ের একপর্যায়ে ওই এসআই গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আবদুল আহাদ আরও বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা এবং আশপাশ থেকে আসা মোবাইল টিমগুলো হলি আর্টিসানের দুটি গেটে অবস্থান নিই। এর মধ্যে ডিসি স্যার একটি গেটে, আরেকটিতে আমি। এ সময় প্রচুর গোলাগুলির আওয়াজ আসছিল হলি আর্টিসানের ভেতর থেকে। গোলাগুলির শব্দ শুনে আমাদের মনে নানা ধরনের সন্দেহ জাগছিল। তখনও আমরা নিশ্চিত ছিলাম না—এটি জঙ্গি হামলা কি না। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আমাদের একাধিকবার গুলি বিনিময় হয়। তারা বাইরে বের হতে চেয়েছিল, কিন্তু, আমাদের প্রতিরোধের কারণে তারা বের হতে পারেনি।
এভাবে রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের কয়েকশো সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়। গণমাধ্যমকর্মীরাও ৭৯ নম্বর রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন। রাত সোয়া ১১টার দিকে হাসপাতালে মারা যান বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম নিহত হন।
এর মধ্যে পুলিশের আইজিপি ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে তৎকালীন র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, হলি আর্টিসানের ভেতরে অন্তত ২০ জন বিদেশিসহ কয়েকজন বাংলাদেশিও আটকা পড়েছেন। ভেতরে যাঁরা আছেন, তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাঁরা বিপথগামীদের সঙ্গে কথা বলতে চান। রাত ৪টা পর্যন্ত অস্ত্রধারীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যেরা।
আইএসের দায় স্বীকার
রাতেই ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা বলে পরিচিত ‘আমাক’ এ গুলশান হামলার দায় স্বীকার করে ২০ জন নিহত হওয়ার কথা জানায়। আইএস-এর পক্ষ থেকে হামলাকারীদের মধ্যে পাঁচজনকে তাদের ‘সৈনিক’ বলে দাবি করে, হামলার দায় নেয় তারা।
২ জুলাই অভিযানের ঘটনাক্রম
সকাল ৭টা ৩০ মিনিট : রাতভর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর যৌথ সেনা, নৌ, পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল গুলশানে অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়।
৭টা ৪৫ মিনিট : কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যেরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।
সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী, শিশুসহ ছয় জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশি নাগরিক তাঁর মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা।
৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।
থান্ডারবোল্ট নামের সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা যে অভিযান চালায়, সেখানে জঙ্গি হামলায় সরাসরি অংশ নেয়া পাঁচ তরুণের সবাই মারা পড়েন। তাঁরা হলেন—মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাজ ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। সকাল ১০টায় চার জন বিদেশিসহ ১৩ জন জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মরদেহ পাওয়ার কথা পুলিশ জানায়।
অভিযানে জঙ্গিদের ছয় জন নিহত এবং এক জন ধরা পড়ে। জিম্মি সংকটের ঘটনায় ১ জুলাই সন্ধ্যা থেকে দিবাগত সারা রাত অর্থাৎ ২ জুলাই সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের নজর ছিল ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারির দিকে।
সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপ ফুটবল মানে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের উন্মাদনা। গ্যালারি থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের টেলিভিশন পর্দা–সবখানেই তখন টানটান উত্তেজনা। প্রিয় দলের প্রতিটি আক্রমণ, গোল আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু খেলা দেখার এই অতিউত্তেজনা বা প্রিয় দলের হারে তৈরি হওয়া তীব্র মানসিক চাপ আমাদের শরীরের জন্য গুরুতর–এমনকি জীবনঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে যখন কোনো হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ চলে, তখন স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেড়ে যায়। এর মূল কারণ হলো, অতিরিক্ত উত্তেজনা। আমরা যখন ব্যাপক উৎকণ্ঠা বা উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাই, তখন শরীরে ‘অ্যাড্রেনালিন’ ও ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ দ্রুত বেড়ে যায়।
এই হরমোনগুলোর আধিক্যের কারণে রক্তচাপ (Blood Pressure) হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়, হৃদস্পন্দন দ্রুত হয় এবং রক্তনালি সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর ফলে হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা হৃদরোগের মতো সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই আকস্মিক চাপ হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। এমনকি অনেক সময় সুস্থ মানুষেরও ‘স্ট্রেস-ইনডিউসড কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ বা বুক ধড়ফড়ানির সমস্যা হতে পারে।
সতর্কতায় করণীয়:
খেলাধুলা বিনোদনের অংশ। এটিকে জীবনের চেয়ে বড় করে দেখা যাবে না। খেলা দেখার সময় শরীর ও মন সুস্থ রাখতে কিছু বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি:
মানসিক প্রস্তুতি: খেলা শুরুর আগেই মনকে বোঝান, এটি কেবলই একটি খেলা এবং এখানে যেকোনো একদল হারবে ও অন্যদল জিতবে। হার-জিতকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা রাখুন।
বিরতি নিন: ম্যাচ যদি অতিরিক্ত উত্তেজনাপূর্ণ বা স্নায়ুচাপের হয়, তবে মাঝে মাঝে টিভি স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিন। প্রয়োজনে কিছুক্ষণ হেঁটে আসুন বা একটু পানি পান করুন।
ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা: যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যা আছে, তারা খেলার উত্তেজনায় কোনোভাবেই নিয়মিত ওষুধ খাওয়া মিস করবেন না। বুক ধড়ফড় বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে খেলা দেখা বন্ধ করে বিশ্রাম নিন।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম: গভীর রাত জেগে খেলা দেখার কারণে শরীরে ক্লান্তি বাড়ে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই খেলার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দিন।
খেলা উপভোগ করার জন্য, জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলার জন্য নয়। প্রিয় দলকে সমর্থন করুন সুস্থ থেকে, সুন্দরভাবে।
[লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]
ময়মনসিংহের মতিউর রহমান সুমন
নিজ গ্রামের স্কুলে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে পথশিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা, মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পরিচর্যা কিংবা বৃক্ষরোপণ ও রক্তদান কার্যক্রম, সমাজসেবার নানা ক্ষেত্রে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন মতিউর রহমান সুমন। কৃষিবিদ, ব্যাংকার ও লেখক পরিচয়ের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যও তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন মানুষের কাছে।
গ্রামের স্কুলে বই পড়ার আগ্রহ বাড়াতে শৈশবের সেই বিদ্যালয়েই নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘মাহতাব উদ্দিন স্মৃতি পাঠাগার’। বিদ্যালয়ের প্রয়াত শিক্ষক মাহতাব উদ্দিনের স্মৃতিকে ধরে রাখতেই পাঠাগারটির নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে।
এ বিষয়ে সুমন বলেন, “সামান্য সহযোগিতার অভাবে অনেক শিশু পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। পরে তারা টোকাই বা পথশিশু হিসেবে পরিচিত হয়। এদের অনেকেই একসময় বিপথগামী হয়ে নেশা, চুরি বা ছিনতাইয়ের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। সময়মতো সহযোগিতা পেলে তাদের জীবন বদলে যেতে পারে।”
ময়মনসিংহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের প্রতিও রয়েছে তার বিশেষ নজর। শহরের পরিচিত এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি মিরাজকে চুল-দাড়ি কেটে, গোসল করিয়ে ও নতুন পোশাক পরিয়ে নতুন জীবনযাপনের সুযোগ করে দেন তিনি। একইভাবে সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় অবস্থান করা আরেক ব্যক্তিকেও পরিচ্ছন্ন করে নতুন পোশাক পরিয়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
এছাড়াও বৃক্ষরোপণ, রক্তদান, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদ উপহার প্রদান এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে তার জীবনে।
মতিউর রহমান সুমনের জন্ম হালুয়াঘাটে হলেও বেড়ে ওঠা গফরগাঁওয়ে। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ শহরে বসবাস করছেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি পথশিশুদের উন্নয়ন, রক্তদান কর্মসূচি ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাঁধন ও রোভার স্কাউটের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন।
বর্তমানে তিনি জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত। কৃষিবিদ হয়েও ব্যাংকিং পেশায় আসার বিষয়ে তিনি বলেন, “জীবন বৈচিত্র্যময়। সুযোগ থাকলে যে কেউ যেকোনো পেশায় যেতে পারে। তবে আমি চাই না একজন কৃষিবিদ ব্যাংকার হোক। কৃষি খাতে যত পদ রয়েছে, তা যদি কৃষিবিদদের দিয়েই পূরণ হয়, তাহলে অন্যরা কোথায় যাবে? আমাদের কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।”
চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের পেশা পরিবর্তনের বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, দেশের চাহিদা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বিবেচনা করে উচ্চশিক্ষার আসনসংখ্যা নির্ধারণ করা উচিত।
সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয় মতিউর রহমান সুমন। তার লেখায় উঠে আসে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সমাজজীবনের নানা অনুষঙ্গ। তিনি গফরগাঁওয়ের প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে ‘এক মলাটে গফরগাঁও’ প্রথম খণ্ড প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
২০২৫ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার গল্পগ্রন্থ ‘অন্তর্দাহ’। বইটিতে মোট আটটি গল্প স্থান পেয়েছে, যেখানে জীবনের উত্থান-পতন, মানবিক অনুভূতি ও সামাজিক বাস্তবতা উঠে এসেছে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সুমন জীবনের নানা সংগ্রাম কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। হতাশাগ্রস্ত বেকার তরুণদের অনুপ্রেরণা দিতে ইউটিউব চ্যানেলে নিয়মিত কর্মসংস্থান ও ব্যাংকিংবিষয়ক শিক্ষামূলক কনটেন্ট প্রকাশ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, মানুষের পাশে থেকে সমাজের জন্য কাজ করে যেতে চান। তার বিশ্বাস, জীবনে উত্থান-পতন থাকবেই, তবে হতাশ হলে চলবে না। মানুষের জন্য কিছু করতে পারাই জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা মতিউর রহমান সুমন তাই অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার নাম।
একটি শিশুর হাসি যেমন একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি, তেমনি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে সেই হাসি ম্লান হয়ে যাওয়া আমাদের সবার জন্যই বেদনাদায়ক। বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে হাম রোগের পুনরুত্থান আমাদের সামনে এমনই এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে; যেখানে সামান্য অসচেতনতা বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। হাম নিয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার।
কতটা ভয়ংকর এই ‘হাম’
হাম পৃথিবীর অন্যতম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে গড়ে ১২-১৮ জন অ-টিকাপ্রাপ্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস খুব দ্রুত পরিবার ও সমাজে বিস্তার লাভ করে।
লক্ষণ: প্রথমেই চিনে নিন-
> উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া
> চোখ লাল হয়ে যাওয়া
> মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)
> মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া লাল ফুসকুড়ি
জটিলতা: অবহেলার সুযোগ নেই
হাম কখনোই ‘হালকা’ রোগ নয়; বিশেষ করে কিছু শিশুদের জন্য এটি জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সম্ভাব্য জটিলতা—
> নিউমোনিয়া
> ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন
> কানের সংক্রমণ l এনসেফালাইটিস
> দীর্ঘ মেয়াদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া
জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু: তারা কি বেশি ঝুঁকিতে?
একজন পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায়, জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুরা হামের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কেন বেশি ঝুঁকিতে থাকে, বিশেষ করে—
> যাদের হার্টের সমস্যা এখনও সম্পূর্ণ সংশোধন (corrected) হয়নি
> যাদের হার্ট ফেইলিউর বা ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রয়েছে
> অপুষ্ট বা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া শিশু
বেশি ঝুঁকি কী কী?
> হামের সময় নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা আগে থেকেই দুর্বল হার্ট ও ফুসফুসের জন্য বিপজ্জনক
> জ্বর ও সংক্রমণের কারণে হার্টের
কিসের ওপর চাপ বাড়ে
> অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে, যা সায়ানোটিক হার্ট ডিজিজে সমস্যা বাড়াতে পারে
> ডিহাইড্রেশন ও ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা হার্টের অবস্থা খারাপ করতে পারে। অর্থাৎ একটি ‘সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ’ এই শিশুদের জন্য দ্রুত জটিল অবস্থায় রূপ নিতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা
> টিকাদানে কোনো বিলম্ব নয়
> নির্ধারিত সময়েই MR টিকা
অবশ্যই দিতে হবে
> প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে আগাম সুরক্ষা পরিকল্পনা করা যেতে পারে
> সংক্রমণ এড়িয়ে চলা
> ভিড় বা অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
> পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে শিশুকে আলাদা রাখুন
দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ
> জ্বর, কাশি বা ফুসকুড়ি দেখা দিলেই দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান
> ‘দেখি নিজে নিজে ভালো হয় কিনা’–এই অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে
পুষ্টি ও ফলোআপ নিশ্চিত করা-
> অপুষ্টি থাকলে ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে
> নিয়মিত কার্ডিওলজি ফলোআপ
বজায় রাখা জরুরি
প্রতিরোধ: টিকাই একমাত্র ঢাল।
ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার
অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল