ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজন মারা গেছেন
সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজন মারা গেছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে মোট ১১১ জনের মৃত্যু হলো।
নতুন এক হাজার ২৫২ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৫৪ জন। আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে দুজন পুরুষ ও দুজন নারী। তাদের মধ্যে একজন শিশু এবং বাকিরা প্রাপ্তবয়স্ক। মোট মারা যাওয়া ১১১ জনের মধ্যে নারী ৬১ জন বা ৫৫ শতাংশ এবং পুরুষ ৫০ জন বা ৪৫ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ঢাকা বিভাগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন হাসপাতালে ৩৭, উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন হাসপাতালে ১৬ ও সিটি করপোরেশনের বাইরে তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। খুলনায় ১৯, ময়মনসিংহে ১২, বরিশালে ১০, চট্টগ্রামে আট, রাজশাহীতে চার এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।
এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৯ হাজার ৫৩২ জন। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৪৬৭ জন।
ছবি- এআই দিয়ে বানানো
জ্বালানি তেল, এলপিজি ও নিত্যপণ্যের চড়া দামে এমনিতেই দিশেহারা সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই সাধারণ গ্রাহকদের ঘাড়ে চেপে বসেছে বিদ্যুতের বাড়তি বিলের বোঝা। গত জুনে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৬.৬৮ শতাংশ। আবাসিক গ্রাহকদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ছয় ধাপে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করায় সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক। স্লাব পরিবর্তন হওয়ায় একটি পরিবারের জন্য নিতান্ত প্রয়োজনীয় বাতি, ফ্যান ও আনুসঙ্গিক প্রয়োজন মেটাতে যেটুকু বিদ্যুৎ লাগে সেটুকু ব্যবহারেও এখন গ্রাহককে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত চার্জ। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা প্ল্যাটফর্মে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
ইস্যুটি নিয়ে নওরোজের পক্ষ থেকে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। সাধারণ নাগরিকদের মনোভাব জানার চেষ্টা করেছেন। মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা নওরোজকে জানিয়েছেন তাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা। তারা জানিয়েছেন- বর্ধিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। সাধারণ পরিবারগুলো বলছে- ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন সেই ৫০ থেকে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার করে একই রেট নির্ধারণ করতে হবে। শতকরা ৯৫ শতাংশ মানুষ নওরোজের কাছে এমন প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে অন্যান্য অতিরিক্ত যেসব খরচ যুক্ত হয় যেমন ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সেগুলোও বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গ্রাহকদের বক্তব্য- ‘নিজের টাকায় বসানো মিটারে কেন ভাড়া গুণতে হবে আমাদের।’ তাদের ভাষ্য, দেশের বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত সংস্কার বিশেষ করে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো সংস্কার না করে উল্টো গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গ্রাহকরা বলেন, সাধারণ মানুষ ২০০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ করে থাকে। এটিও যখন বাড়ানো হচ্ছে তখন আমাদের বিলাসিতার ওপর নয়, নিত্য প্রয়োজনীয় যে চাহিদা সেটার ক্ষেত্রে এই খরচ বাড়ানো হচ্ছে।
মূল্যবৃদ্ধিতে ধাপ (স্ল্যাব) পরিবর্তন
ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মাথায় জুনে এসে গ্রাহক ভেদে ছয়টি ধাপে বাড়িয়েছে বিদ্যুতের দাম। প্রথম ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করেছে বিইআরসি। এটি সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ধাপ যারা মূলত বাতি ও একটি ফ্যান চালান। এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। এরপর ৭৫ ইউনিট (০ থেকে ৭৫) পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের গ্রাহক। এই ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সা। এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। দ্বিতীয় ধাপ (৭৬ থেকে ২০০) পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা; তৃতীয় ধাপ (২০১ থেকে ৩০০) ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর জন্য দাম ৭ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ১০ পয়সা করা হয়েছে। চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ২ পয়সা থেকে ১৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬২ পয়সা, পঞ্চম ধাপে (৪০১ থেকে ৬০০) ইউনিট ব্যবহারকারী বিদ্যুতের দাম ১২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ টাকা ০১ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে (৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে) ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ১৪ টাকা ৬১ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা করা হয়েছে। এভাবে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকের ব্যবহৃত ইউনিটের পরিমাণ অনুযায়ী মাসিক বিলও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
চাপে প্রথম ৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকরা
ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মাসে ২০০ থেকে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর। কারণ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা আগে যে হারে বিদ্যুৎ বিল দিতেন নতুন মূল্যবৃদ্ধির পর ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য অতিরিক্ত হার আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে কেউ যদি ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাহলে পুরো ইউনিটের বিলই উচ্চ হারে গণনা করা হচ্ছে। এ কারণে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।
বিল বৃদ্ধির তুলনামূলক চিত্র
একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। আগে ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের জন্য (ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ ছাড়া) বিল আসতো ১ হাজার ২৯৫ টাকা। এর মধ্যে প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা এবং বাকি ১২৫ ইউনিটের জন্য ৭ টাকা ২০ পয়সা করে হিসাব করা হয়। এখন শুধু স্ল্যাব পরিবর্তন হওয়ায় একই পরিমাণ বিদ্যুতের বিল বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৪৪০ টাকায়। কারণ তখন পুরো ২০০ ইউনিটই উচ্চ হারে গণনা হবে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করায় ২০০ ইউনিট ব্যবহারের বিল দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৬৪০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ গ্রাহকের মাসিক বিল বাড়বে ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এর বাইরে বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট যুক্ত হবে।
প্রভাব ফেলেছে ১ কোটি ৫৩ লাখ গ্রাহককে
পিডিবির হিসাব বলছে- শুধু স্ল্যাব পুনর্গঠনের কারণেই প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক বাড়তি বিলের চাপে পড়বেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪ কোটি ৩১ লাখের বেশি আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ লাইফলাইন গ্রাহক, যারা মাসে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। আরও ২২ শতাংশ গ্রাহক ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। অন্যদিকে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ গ্রাহক মাসে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। বাকি চারটি ধাপ যথাক্রমে ২০০ থেকে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী (১২ শতাংশ)। তাই স্ল্যাব পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এই শ্রেণির ওপর; যারা বিলাসিতা নয় নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও কিন্তু অতিরিক্ত চার্জে বিল দিচ্ছেন। এমন গ্রাহকদের বেশিরভাগই সাধারণত বাসায় নিয়মিত একাধিক বাতি, ফ্যান, ফ্রিজ ও টিভি চালাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।
কী বলছেন গ্রাহকরা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মোখলেসুর রহমান নওরোজকে বলেন, ‘আমার পরিবারের চারজন সদস্য। শুধু ফ্যান, লাইট ও ফ্রিজ ব্যবহার করি। এতেই আগে যে বিল আসতো সেই তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি টাকা এখন মাসিক বিলে গুণতে হচ্ছে আমাকে। অথচ আয় বাড়েনি। তাহলে কীভাবে এই অতিরিক্ত খরচ বহন করবো?
রাজশাহীর গৃহিণী লাবণী আক্তার বলছেন, বিদ্যুৎ খরচ দিন দিন লাগাম ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মাসিক চার্জ যেভাবে বাড়ছে তাতে আমাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। এই অবস্থা থেকে আমরা নিষ্কৃতি চাই। আমাদের সামর্থের কথা ভেবে প্রথম ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিলে অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার করা উচিত সরকারের।
দিনাজপুরের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিলের হিসাব দেখে আমরা দিশেহারা। একদিকে বাড়ির বিদ্যুৎ খরচ, অন্যদিকে জমিতে সেচের জন্য বিদ্যুতের খরচ সব মিলয়ে যে টাকা আসে তা জোগাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে আমাদের। এটি আমাদের ওপর এক ধরনের জুলুম। সরকারের উচিত বিদ্যুৎ বিলের লাগাম টেনে ধরা।
নীলফামারীর ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, আমার একটি তেলের মিল আছে। সরিষাসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের যে দাম সে তুলনায় তেলের যে দাম তাতে কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না আগে থেকেই। এখন বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি বাসার বিলও বেড়ে যাচ্ছে প্রতি মাসে। জানি না- ভবিষ্যতে এই মিল চালিয়ে যেতে পারবো কিনা। বিদ্যুৎ খরচ আমাদের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এই বিল কমানো উচিত সরকারের।
প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ‘অযৌক্তিক’
এদিকে প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না বলে জোরালো দাবি জানিয়েছেন রাজনৈতিক ও বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনের বক্তারা। এ ব্যাপারে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) এর নেতা, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক মেঘমল্লার বসু বলেন, প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না। দেশের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা ভেবে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সাধারণ মানুষ ২০০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ করে থাকে। এটিও যখন বাড়ানো হচ্ছে তখন তাদের বিলাসিতার উপর খরচ বাড়ানো হচ্ছে না, নিত্য প্রয়োজনীয় যে চাহিদা সেটার ক্ষেত্রে এই খরচ বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে প্রথম ২০০ ইউনিটে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে প্রথম ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের দাম এক টাকাও না বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জীবনযাত্রার খরচ কমানোর জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার মূল্য সহনশীল রাখতে হবে।
বিদ্যুতের বিলাসী ব্যবহারের ওপর এক ধরনের কর আরোপ করা যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এই ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেবে না এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে দুই থেকে তিনশ’ ইউনিটের পর প্রতি ইউনিটের জন্য বিদ্যুতের ব্যয়ের হার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। ৪০০ ইউনিট ক্রস করলে আরও বেড়ে যাবে তাতে সমস্যা নাই। কিন্তু নিত্যান্ত সামান্য যে প্রয়োজন সে বিদ্যুৎটুকুতেও যদি বাড়তি মূল্য বসানো হয় সেটি জনগণের জন্য একটি জুলুম।
নাগরিক সমাজের বিরোধিতা
দাম বাড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। লিখিত বক্তব্যে দাম না বাড়ানোর দাবি জানিয়ে সংস্থাটি বলেছে, দাম বাড়ানো হলে মাসের খরচ বাড়বে, একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে, তাদের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে। দাম বাড়ানোর আগে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসির গণশুনানিতে তিনি এসব কথা বলেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, কী কী করলে বিদ্যুতের দাম কমানো যেতে পারে, এ পরিকল্পনা কেন নেই। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়। ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর কথা বলে না। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার যেন মুনাফাখোর না হয়, সেটাই জনগণের প্রত্যাশা। কল্যাণের অর্থনীতি থেকে বিবেচনা করলেও বিদ্যুতের দাম কমানো যায়। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বর্জন করেছে ভোক্তা।
সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী মানুষকে স্বস্তি দিতে চান, আর এখানে হচ্ছে উল্টোটা। সরকার মুনাফাভোগী হতে পারে না, ব্যবসা করতে পারে না। বিইআরসির আইন সংশোধন করতে হবে। লুটপাটের বাংলাদেশ থেকে বের হতে হবে। দাম কমানোর গণশুনানি করতে হবে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, খরচ না কমিয়ে লুণ্ঠনের সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে সরকার। আর ঘাটতির সংকট দেখিয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। তিনি বলেন, পিডিবি দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দিতে পারে, ঘাটতি পূরণের কৌশল বলে দিতে পারে না। বিদ্যুৎ বিলের ধাপ পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। এর মানে হলো- নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা।
অধ্যাপক শামসুল আলম বিতরণ সংস্থাগুলোর এই ‘অযৌক্তিক ব্যয়’ গ্রাহকদের ওপর চাপানোর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, গত ১০-১৫ বছর ধরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দাম নিয়ে সংস্থাগুলো যে মুনাফা করেছে, তার হিসাব কোথায়? তাদের জবাবদিহিতার আওতায় না এনে খরচের দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য প্রফেসর ম. তামিম বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কেবল বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর। বিশেষ করে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিস্টেম লস, ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলো বন্ধ করার দাবি ছিল ভোক্তাদের। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর খড়্গ নামানো হলো, যা খুবই দুঃখজনক। যেখানে বিভিন্ন দেশ ক্ষুদ্র প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য বিল মওকুফের কথা বলছে, সেখানে ভর্তুকি কমানোর কথা বলে ক্ষুদ্র গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হলে স্বাভাবিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে।’
৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব
ওই গণশুনানিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স)। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সাংবিধানিক অধিকার। এটি সেবা খাত, লাভজনক বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মানুষের পকেট কেটে টাকা নেওয়ার নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে পিডিবি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বোবা কান্না দেখার কেউ নেই, ধাপ বদল করে আরও টাকা নিতে চায়। এমন প্রস্তাব যারা দেয়, তাদের মধ্যে জনস্বার্থ নেই। তাই দাম বাড়ানোর প্রস্তাবটাই অনৈতিক।
জানা গেছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন এই কৌশল নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ধাপ (স্ল্যাব) বদল করে আয় বাড়াতে চায় সংস্থাটি। এতে কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা হারাচ্ছেন গ্রাহকদের একটি বড় অংশ। এ ছাড়া বছরে দুবার দাম সমন্বয় চায় পিডিবি।
দাম বাড়ানোর আগমুহূর্তে পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেছিলেন, আর্থিক ঘাটতির কারণে জ্বালানি (তেল, কয়লা) কেনা যাচ্ছে না, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল দেওয়া যাচ্ছে না। খরচ কমিয়েও ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। কয়েক বছরে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। জ্বালানির দাম বাড়তি। তাই বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘাটতি কমাতেই আবাসিকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধাপ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিইআরসি বলছে, উৎপাদন, সঞ্চালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ বৃদ্ধি ও অনিয়ম-দুর্নীতি দেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। যার দায়ভার বছরের পর বছর বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাকে।
এসব বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দাম বাড়ানোর ফলে মানুষের ব্যয় বাড়বে, তবে অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এটা করার সুযোগ আছে।
পাঠকের প্রতি নওরোজের ঘোষণা:
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ নানা প্ল্যাটফর্মে প্রতিবাদে সরব হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে এ নিয়ে নানা পোস্ট করছেন, কমেন্টস করছেন। জনমত বলছে- মানুষ এ থেকে নিষ্কৃতি চাচ্ছে। আপনাদের দুর্ভোগের বিষয়টি উপলব্ধি করে নওরোজ এ ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। আপনারা আমাদের পেজটি লাইক দিন, শেয়ার করুন এবং আপনাদের মতামত কমেন্টে আমাদের জানান। পরবর্তীতে আমরা এ ব্যাপারে ধারাবাহিক প্রতিবেদন আপনাদের সামনে তুলে ধরবো এবং আপনাদের দাবির প্রতি সোচ্চার থাকবো।
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়
রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের চুক্তি সই করেছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মিজানুর রহমান এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের পক্ষে সংস্থাটির ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসি আইসামি চুক্তিতে সই করেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব গাজী শাহরিয়ার পামির এ তথ্য জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও চুক্তি সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পটির আওতায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বছরে আরও ৩০ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন আইএসডিবি চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারিত্ব, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা আরো সম্প্রসারণসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। আগামীতে বাংলাদেশ ও আইএসডিবির মধ্যকার সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদারিত্ব আরো জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ফলের চালানের কাঠের পাটাতনের ভেতর বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো শাখার নিরাপত্তা, পণ্য ছাড়করণ প্রক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কীভাবে বিদেশ থেকে আসা ফলের চালানের সঙ্গে কার্গো ভিলেজ পর্যন্ত পৌঁছাল, চালানটি কোন কোন ধাপ অতিক্রম করেছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল-এসব বিষয় এখন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফলের চালানের পাটাতনে ১৬ কেজি স্বর্ণ
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই ২০২৬ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে বিমানবন্দরের বর্তমান আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সের গেট ৮(এ)-এর অভ্যন্তরে বিজিএমইএ শেডের পেছনে সন্দেহজনক একটি ফলের চালান শনাক্ত করা হয়। পরে চালানটি স্ক্যান ও ইনভেন্টরির জন্য কাস্টমস হাউস, ঢাকার অধীন এক্সপ্রেস সার্ভিস ইউনিটের গেট-৯ এলাকায় নেওয়া হয়।
প্রথম দফায় ফলের চালানের মধ্যে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। তবে চালানটি যে কাঠের সমতল পাটাতনের ওপর রাখা ছিল, সেটি নিয়ে কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। পাটাতনটি স্ক্যানিং মেশিনে পরীক্ষা করলে এর ভেতরে স্বর্ণসদৃশ ধাতব বস্তুর অস্তিত্বের প্রাথমিক আলামত পাওয়া যায়।
এরপর বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কাঠের পাটাতন খুলে হলুদ রঙের স্কচটেপে মোড়ানো ১৬টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বারের ওজন এক কেজি করে। অর্থাৎ মোট ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়। জব্দ তালিকায় বারগুলোর গায়ে সিরিয়াল নম্বর এবং কয়েকটির গায়ে ‘KILO’ লেখা থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তীতে স্বর্ণ পরীক্ষক দি নিউ ইসলাম জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী মো. মাহফুজুল ইসলাম বারগুলোর ওজন ও বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে প্রত্যয়ন দেন। ওই প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে স্বর্ণগুলো জব্দ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, স্বর্ণের বারগুলো ফলের চালানের কাঠামোর মধ্যে লুকানো ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাস্টমস চালানটি শনাক্ত করে স্বর্ণ উদ্ধার করে। কার্গো এলাকায় স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালানে কাস্টমসের কোনো কর্মকর্তা জড়িত নন বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।
নিরাপত্তা নিয়ে কী বলছে বেবিচক
কার্গো ভিলেজের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা রয়েছে কি না-এমন প্রশ্নে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ বিভাগের মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
কার্গো ভিলেজের নিরাপত্তা দুর্বল-এমন অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, সেখানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। তবে ১৬ কেজির মতো বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ফলের চালানের কাঠের পাটাতনের ভেতরে লুকিয়ে কার্গো এলাকায় পৌঁছানোর ঘটনা বিদ্যমান নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আমদানিকারকসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা
মামলার নথি অনুযায়ী, স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান Food Link-এর স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম মোস্তফাকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চালানটি খালাসের জন্য ASYCUDA World System-এ A. RAZZAQUE TRADING নামের একটি সিএন্ডএফ এজেন্টকে ট্যাগ করা ছিল। সংশ্লিষ্ট এয়ারওয়ে বিলের নথিতে FASTRACK CARGO SOLUTIONS LTD. নামের একটি ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের তথ্যও পাওয়া যায়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মাস্টার ও হাউস এয়ারওয়ে বিলের মাধ্যমে আমদানি করা পণ্য ১৯ জুলাই ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভের কাছে ডেলিভারি দেওয়া হয়।
মামলার নথিতে আরও বলা হয়েছে, সন্দেহজনক চালানটির প্রাথমিক কার্যক্রমের সময় সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধি হিসেবে একজন কাস্টমস সরকার উপস্থিত ছিলেন। ওই সময়ের কার্যক্রম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিরাপত্তা প্রতিনিধির বডি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়।
অভিযান ও জব্দ প্রক্রিয়ার ভিডিও ফুটেজও বডি ক্যামেরায় ধারণ করা হয় এবং পরে চাহিদার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পেনড্রাইভে সরবরাহ করা হয়েছে বলে কাস্টমসের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ফলে চালানটি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর কারা এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন এবং কার্গো ভিলেজে প্রবেশ থেকে স্বর্ণ শনাক্ত হওয়া পর্যন্ত এটি কী কী নিরাপত্তা ও ছাড়করণ ধাপ অতিক্রম করেছে-এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত উদ্ধার ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ
কাস্টমসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৬০ কেজি ১৮৭ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে।
বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের এই তথ্য চোরাচালানের প্রবণতা এবং বিমানবন্দরের কার্গো নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে একাধিক বড় চালান শনাক্ত হওয়ার পর পণ্য পরীক্ষা, স্ক্যানিং সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
৩৭৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ
১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কার্গো নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ-চাঁদাবাজি, রোস্টার প্রভাবিত করা, পণ্য ছাড়করণে অনিয়ম এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, কার্গো শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মো. মইনউদ্দিন লোটাস, কর্মী নম্বর পি-৩৬৭৩৯-এর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রটিতে ৩৭৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, কার্গো শাখার সিএন্ডএফ এজেন্ট, রপ্তানি পণ্যের ফরওয়ার্ডার, হেলপার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ বা চাঁদা আদায় করা হতো। দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বদলি, চাকরিচ্যুতি কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য ও তদন্তের মাধ্যমে এর সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।
চার শিপমেন্টের কাগজপত্র নিয়েও অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বরের একটি ঘটনায় চারটি শিপমেন্টের কাগজপত্র ও এক্সিট নম্বর নিয়ে অনিয়ম হয়েছিল। বিমান কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে দায় নির্ধারণ করা হলেও পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়।
এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট শিপমেন্টের নথি, এক্সিট রেকর্ড, ডেলিভারি তথ্য এবং তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই প্রয়োজন।
১,৯২১ কেজি পণ্যের হদিস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে চীন থেকে আমদানি করা ইলেকট্রনিক পণ্যের একটি চালান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে এয়ারওয়ে বিল নম্বর ৭৮৪-৬৯২৫৩৩৬৫-এর অধীনে ৫৬ পিস, মোট ১ হাজার ৯২১ কেজি পণ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই ওই পণ্য সিএন্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয় এবং পরে পণ্যগুলোর হদিস পাওয়া যায়নি। এর ফলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও কাস্টমসের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়।
অভিযোগে এয়ারওয়ে বিল নম্বর ৬১৯-১০৭৭১৬৮১-এর অধীনে ১৩২ পিস এবং প্রায় ৩ হাজার ২৩৯ কেজি কার্গো পণ্য ছাড়করণ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, জাল কাগজপত্র ব্যবহার ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে ওই পণ্য ছাড় করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে মইনউদ্দিন লোটাস ডেলিভারি গেটে দায়িত্বে ছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এয়ারওয়ে বিল, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, কাস্টমস ডকুমেন্ট, ডেলিভারি রেকর্ড, এক্সিট নম্বর এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
‘বকশিশ’ নেওয়ার বক্তব্য
অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত বলে দাবি করা হাতে লেখা দুটি বক্তব্যেও কার্গোতে অতিরিক্ত কাজের বিনিময়ে টাকা পাওয়ার প্রসঙ্গ রয়েছে।
মো. আলী-আশরাফুজ্জামান, জি-৫২৭৯৬-এর নামে থাকা একটি বক্তব্যে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে সেটিকে কাজের বিনিময়ে ‘বকশিশ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে মোরশেদ ও আশরাফের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অন্য একটি বক্তব্যে কার্গো হেলপার খোরশেদ আলম, জি-৫২৫০৯-এর নামে অতিরিক্ত কাজ, নাইট চেকিং ও মালামাল লোডিংয়ের সঙ্গে বকশিশ পাওয়ার কথা লেখা রয়েছে।
রোস্টার ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও অভিযোগ
কার্গো বিভাগের রোস্টার প্রণয়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের স্বচ্ছতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একই কর্মকর্তা নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেকশনে বারবার দায়িত্ব পেয়েছেন এবং স্বাভাবিক রোটেশন অনুসরণ করা হয়নি। নিরাপত্তা বিভাগেও একই এলাকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য অন্তত গত এক বছরের ডিউটি রোস্টার, সংশোধিত রোস্টার, উপস্থিতি রেজিস্টার এবং দায়িত্ব পরিবর্তনের অনুমোদনপত্র পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
যা বলছেন মইনউদ্দিন লোটাস ও বিমান কর্তৃপক্ষ
অভিযোগের বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মো. মইনউদ্দিন লোটাসের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব দেননি। অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়গুলো যাচাই করছেন। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে মইনউদ্দিন লোটাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে এবং সেগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ফলের চালানের কাঠের পাটাতনে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা শুধু একটি চোরাচালান মামলা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। চালানটির প্রবেশ, সংরক্ষণ, হ্যান্ডলিং ও ছাড়করণ প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্বে ছিলেন, কোথায় নজরদারির ঘাটতি ছিল এবং কার্গো শাখাকে ঘিরে ওঠা অনিয়মের অভিযোগগুলোর সঙ্গে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার যোগসূত্র রয়েছে কি না-এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতীয় বেতন কমিশন
পদোন্নতির সুযোগ না থাকা সরকারি কর্মচারীদের জন্য দুটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে সময়সীমা কমানোর জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
নতুন বেতন কাঠামোতে আগের মতোই ১০ ও ৬ বছরের সময়সীমা বহাল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ চাকরির ১০ ও ৬ বছরের পরিবর্তে ৫ ও ৫ বছর পূর্তিতে দুটি উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার সুপারিশ করে। পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীদের বঞ্চনা কমাতে এই সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোতে উচ্চতর গ্রেড ২০১৫ সালের পে স্কেলের মতোই ১০ ও ৬ বছরের সময়সীমা বহাল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ, পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীদের পাঁচ বছর পরপর বেতন বাড়ালে সরকারে আর্থিক ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
গত সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন তা বাস্তবায়নের কাজ শুরুর জন্য গেজেট প্রকাশের জন্য কাজ করছে অর্থ বিভাগ।
সাবেক অর্থ সচিব ও জাতীয় বেতন কমিশনের সভাপতি জাকির আহমেদ খান গতকাল বুধবার বলেন, উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা কেন কমানো হয়েছে তার ব্যাখ্যা বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে বিস্তারিত বলা আছে। অর্থ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেটা জানা যাবে।
এ বিষয়ে জানতে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেছিলেন, এ বিষয়ে এসআরও জারি না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। নিয়ম বা পরিবর্তনগুলো প্রজ্ঞাপন জারির পরই স্পষ্ট হবে।
সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, সরকারের যেগুলো ব্লক পদ, সেই দপ্তরের কর্মচারীদের পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই। তাদের যৌক্তিক সময়ে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধি করা উচিত। কারণ, এটা ছাড়া তাদের বেতন বৃদ্ধির কোনো পথ নেই।
জাতীয় বেতন স্কেল, ২০০৯ অনুযায়ী নিম্ন বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারীরা চাকরির ৮, ১০, ১২ ও ১৫ বছর পূর্তিতে চারটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পেতেন। তবে জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫-তে এ ব্যবস্থা পরিবর্তন করে চাকরির ১০ ও ৬ বছর পূর্তিতে দুটি উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিধান করা হয়।
কর্মচারী নেতারা জানান, জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫-এর সভাপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা আগের বেতন স্কেলে কর্মচারীদের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়কাল কমিয়ে আনার অনুরোধ জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় বেতন কমিশন বিদ্যমান ১০ ও ৬ বছরের পরিবর্তে চাকরির ৫ ও ৫ বছর অন্তর দুটি উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন কর্মচারী নেতারা।
আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশন সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম বলেন, একজন কর্মচারী যে পদে চাকরিতে যোগদান করেন, অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁকে সেই একই পদেই কর্মরত থাকতে হয়। ফলে যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কর্মচারীরা পরবর্তী ধাপে উন্নীত হতে পারেন না।
তিনি বলেন, অর্থ বিভাগ থেকে বেতন কমিশনের সুপারিশ বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এতে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের পদোন্নতি না হলেও নির্দিষ্ট সময় পর আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিধান রয়েছে জাতীয় পে স্কেল ২০১৫-তে। একই পদে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকলেও পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীদের জন্য দুই দফা উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ রাখা হয় ওই বেতন কাঠামোয়।
জাতীয় পে স্কেল ২০১৫-এর ৭(১) উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে ১০ বছর পূর্ণ করলে এবং তাঁর চাকরি সন্তোষজনক হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১১তম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাবেন। এ ছাড়া ৭(২) উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর পরবর্তী ছয় বছরের মধ্যে পদোন্নতি না হলে সপ্তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাবেন কর্মচারী। তবে এই সুবিধা নিয়ে কোনো কর্মচারী তৃতীয় বা তার ওপরের গ্রেডে বেতন প্রাপ্য হবেন না।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ও পুলিশের আইজিপি মো. আলী হোসেন
দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে পুলিশকে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘পুলিশকে দুষ্টের দমনে অত্যন্ত কঠোর ও শিষ্টের পালনে ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক আচরণ করতে হবে।’
রাষ্ট্রপতি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জরুরি ভিত্তিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেন। এ ছাড়া অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য ও গুজব প্রচারসহ সাইবার অপরাধ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিস্তার দমন এবং নারী ও শিশুর নিরাপত্তা বিধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ প্রধানকে নির্দেশ দেন। এ ব্যাপারে জনগণকে নিয়মিত অবহিত রাখা ও ব্যাপক প্রচারণার ওপরও রাষ্ট্রপতি গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় বর্তমান সরকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখতে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জনগণকে হয়রানি ও মিথ্যা মামলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ পুলিশকে নির্দেশনা দেন রাষ্ট্রপতি।
সাক্ষাৎকালে আইজিপি রাষ্ট্রপতিকে পুলিশ বাহিনীর মনোবল দৃঢ় এবং বাহিনীর আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে জানান। দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতির সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন আইজিপি। রাষ্ট্রপতিও সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
ছবি : সংগৃহীত
গ্যাসের সংকটের মধ্যে সেপ্টেম্বরের জন্য লিফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম কিছুটা কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রতি কেজিতে দাম কমেছে ১ টাকা ৩ পয়সা। এতে সবচেয়ে ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকায়, যা আগে ছিল ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দর কার্যকর হবে।
জুলাইয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫২৮ টাকা। আগস্টে এক লাফে ৭০ টাকা বাড়ার পর চলতি মাসে সামান্য কমলেও জুলাইয়ের তুলনায় ভোক্তাকে এখনও সিলিন্ডারপ্রতি ৫৭ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। পাইপলাইনের গ্যাস সংকটে রান্নার জন্য এলপিজির ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ায় এই মূল্যের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে মধ্যবিত্তের বাজেটে।
বিইআরসি জানায়, সেপ্টেম্বর মাসের জন্য সৌদি আরামকো ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত (৩৫:৬৫) অনুযায়ী গড় সৌদি সিপি (কার্গো মূল্য) দাঁড়িয়েছে প্রতি মেট্রিক টন ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। এর সঙ্গে জাহাজভাড়া, ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম এবং প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা হিসাব করে এলপিজির দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
নতুন দর অনুযায়ী, অন্যান্য সিলিন্ডারের মধ্যে ৫.৫ কেজি ৭২৭ টাকা, ১২.৫ কেজি ১৬৫২ টাকা, ১৫ কেজি ১৯৮২ টাকা, ১৬ কেজি ২১১৩ টাকা, ১৮ কেজি ২৩৭৮ টাকা, ২০ কেজি ২৬৪২ টাকা, ২২ কেজি ২৯০৭ টাকা, ২৫ কেজি ৩৩০৩ টাকা, ৩০ কেজি ৩৯৬৪ টাকা, ৩৩ কেজি ৪৩৬০ টাকা, ৩৫ কেজি ৪৬২৪ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার ৫৯৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটারে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৩ টাকা ৯ পয়সা। এছাড়া রেটিকুলেটেড এলপিজি প্রতি কেজি ১২৮ টাকা ৩৭ পয়সা করা হয়েছে। তবে সরকারি কোম্পানির ১২.৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম আগের মতোই ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা অপরিবর্তিত রয়েছে।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রোপেন ও বিউটেনের দর (সৌদি সিপি) এবং ডলারের বিনিময় হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে আদেশ পুনর্ব্যক্ত করে কমিশন জানিয়েছে—মজুত, বোতলজাতকরণ, পরিবেশক বা খুচরা—কোনো পর্যায়ই নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া যাবে না।