ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, সেজন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার স্থানগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালাবে পুলিশ।
গোয়েন্দা শাখাসহ (ডিবি) ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এ দায়িত্ব পালন করবে বলে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন।
শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকালে মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফিংয়ে এসে তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। ডিএমপির সব থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোথায় কোথায় এ ধরনের আয়োজন রয়েছে, তা শনাক্ত করে আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। থানা-পুলিশ এবং ডিবি— উভয় পক্ষ থেকেই সেখানে সদস্য মোতায়েন থাকবে, যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।
নগরবাসীদের প্রতি তিনি বলেন, আনন্দ যেন আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, বিষাদে পরিণত না হয়। খেলায় হার-জিত থাকবেই। নিজের দলের জয় উদযাপন করবেন, তবে অন্যের মত ও সমর্থনের প্রতিও সহনশীল থাকতে হবে।
গত বুধবার রাজধানীর আদাবরে বিএনপি নেতা মো. আবুল বাশার বাদশা হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি জানাতে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
পুলিশ বলছে, গত সোমবার রাতে ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলা দেখা ও জয় উদযাপনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজন কিশোর ঢোল ও বাঁশি বাজাচ্ছিল। এ সময় হাবিব নামে এক ব্যক্তি নিরব নামে এক যুবককে মারধর করেন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে বুধবার রাতে আদাবরের নবোদয় হাউজিং এলাকায় স্থানীয় বিএনপির ইউনিট সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার বাদশাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহ থেকে নিরব, রিপন, মজনু ও মিজানুর রহমান নামে চারজনকে গ্রেফতার করে ডিবির তেজগাঁও বিভাগ।
শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, রিপনই বাদশাকে ছুরিকাঘাত করেন। গ্রেফতারের পর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ বলেছে, রিপন ও নিরব আপন ভাই। এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া মজনু তাদের বাবা।
হামলায় আহত স্থানীয় বিএনপির ইউনিট সভাপতি এখনও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
রাজধানী ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে আজ ঢাকা ট্রেড সেন্টার ও ফুলবাড়িয়া সুপারমার্কেট সংলগ্ন ফুটপাত থেকে শতাধিক অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। ডিএসসিসি’র চারজন বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, শতাধিক উচ্ছেদ কর্মী এবং পর্যাপ্ত পুলিশ বলের সহায়তায় এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১টা পর্যন্ত এ অভিযান চলে। পে-লোডারসহ বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অবৈধ অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর উচ্ছেদকৃত মালামাল ও সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুস সালাম সরাসরি উপস্থিত থেকে এ উচ্ছেদ অভিযান পরিদর্শন করেন এবং গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন।
পরিদর্শনকালে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, "সিটি কর্পোরেশনের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাস্তা ও ফুটপাত পরিষ্কার এবং দখলমুক্ত রাখা হচ্ছে। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ফুটপাত, নৈশকালীন মার্কেট ও হলিডে মার্কেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, তারা কেবল সেখানেই বসতে পারবেন। বিশেষ করে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তা সম্পূর্ণ পরিষ্কার রাখা হবে এবং মূল রাস্তায় কোনোভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না।"
হকারদের সতর্ক করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "রাস্তা ও ফুটপাত পরিষ্কার রাখার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে সতর্ক করার পাশাপাশি হকার সংগঠনের নেতাদের সাথেও একাধিকবার বৈঠক করা হয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদের পরও পুনরায় বসে পড়ায় এখন কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। নিয়ম অমান্য করে বসলে মালামাল জব্দের পাশাপাশি প্রয়োজনে গ্রেফতার করা হবে।" এই উচ্ছেদ ও দখলমুক্তকরণ অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
অভিযানটি পরিচালনা করেন ডিএসসিসি’র প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ও বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ রেজাউল করিম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট জনাব জোনায়েদ কবীর সোহাগ, সম্পত্তি কর্মকর্তা ও বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হাছিবা খান এবং বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (সিনিয়র সহকারী সচিব) মোঃ আমিনুল ইসলাম।
পথচারীদের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এই অভিযান সামনেও অব্যাহত থাকবে।
রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় আজ উচ্ছেদ অভিযান চালায় ডিএসসিসি
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেছেন, রাজধানীর গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তা দখলমুক্ত রাখা হবে। এই সড়কের কোথাও হকারদের বসতে দেওয়া হবে না। নির্ধারিত স্থানের বাইরে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে কোনো হকার দোকান বসালে মালামাল জব্দের পাশাপাশি প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করা হবে। আজ বুধবার রাজধানীর গুলিস্তানে উচ্ছেদ অভিযান পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
এর আগে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত গুলিস্তানের ঢাকা ট্রেড সেন্টার ও ফুলবাড়িয়া সুপারমার্কেট–সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালায় ডিএসসিসি। এ সময় ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা শতাধিক অবৈধ দোকান ও অবকাঠামো উচ্ছেদ করা হয়। পে-লোডারসহ ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে অবৈধ অবকাঠামো ভেঙে ফেলার পাশাপাশি মালামাল–সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
অভিযান চলাকালে ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ফুটপাত, নৈশকালীন মার্কেট ও হলিডে মার্কেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা কেবল সেখানেই বসতে পারবেন। বিশেষ করে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তা সম্পূর্ণ পরিষ্কার রাখা হবে। মূল রাস্তায় কোনোভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না।
উচ্ছেদের পর আবার রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর বিষয়ে প্রশাসক বলেন, হকারদের বিভিন্ন মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছে। হকার সংগঠনের নেতাদের সঙ্গেও একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। এরপরও উচ্ছেদ করা জায়গায় আবার দোকান বসানো হচ্ছে। এ কারণে এখন কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
আবদুস সালাম বলেন, নিয়ম অমান্য করে বসলে মালামাল জব্দের পাশাপাশি প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করা হবে। রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ডিএসসিসি জানিয়েছে, আজকের অভিযানে সংস্থাটির চারজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, শতাধিক উচ্ছেদকর্মী ও ছয় প্লাটুন পুলিশ অংশ নেন।
অভিযান পরিচালনা করেন ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল করিম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জোনায়েদ কবীর সোহাগ, সম্পত্তি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাছিবা খান এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম।
পথচারীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি।
নজীবুর রহমান
মেট্রোরেলে প্রচণ্ড ভিড়। দাঁড়িয়ে থাকা ৬৪ বছর বয়সী নজীবুর রহমান অসুস্থ বোধ করছিলেন। বসে থাকা যাত্রীদের উদ্দেশে কয়েকবার তাঁকে বসতে দেওয়ার অনুরোধও জানান। কিন্তু কেউ সাড়া দেননি বলে অভিযোগ তাঁর ছেলে নাকিবুর রহমানের। এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে মেট্রোরেলের মেঝেতে পড়ে যান নজীবুর রহমান। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
নজীবুর রহমান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। ২৪ অক্টোবর বিকেলে মেট্রোরেলে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর একটি আক্ষেপই তাড়া করে ফিরছে ছেলে নাকিবুরকে।
তিনি মঙ্গলবার রাতে বলেন, ‘ছেলে হিসেবে আজীবন একটাই আক্ষেপ থাকবে, কেউ যদি আব্বুকে বসতে দিতেন। তাহলে হয়তো বাবা এভাবে নিচে না পড়ে, কারও কোলে মাথা রেখে মারা যেতে পারতেন।’
নাকিবুর রহমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি জানান, ২৪ অক্টোবর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যান তাঁর বাবা। অনুষ্ঠান শেষে বেলা তিনটার দিকে শাহবাগ মেট্রোস্টেশন থেকে উত্তরার উদ্দেশে মেট্রোরেলে ওঠেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তাঁর কাছ থেকেই তিনি এ ঘটনা শুনেছেন।
কয়েক দিনের ছুটি শেষ হওয়ায় সেদিন মেট্রোরেলে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। বসার আসন না পেয়ে দুজনই ভেতরের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলিতে একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
নাকিবুর রহমান জানান, বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মেট্রোরেল শেওড়াপাড়া এলাকায় পৌঁছালে ঠেলাঠেলির মধ্যে তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় সিটে বসে থাকা যাত্রীদের কাছে কয়েকবার বসার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কেউ সাড়া দেননি। এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে তিনি মেঝেতে পড়ে যান।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা তাঁকে ধরে তোলার চেষ্টা করেন। শোরগোল শুনে বাবার সহকর্মীও পরে সেখানে আসেন। অন্য যাত্রীদের সহায়তায় পরীক্ষা শেষে বুঝতে পারেন, নজীবুর রহমান বেঁচে নেই। নাকিবুরের ধারণা, মেট্রোরেলের ভেতরে পড়ে যাওয়ার সময়ই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়েছিল।
শেষবিদায়ে থাকতে পারেননি পরিবারের আর কেউ
নাকিবুর রহমান জানান, তাঁর বাবার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছিল। বাবাকে মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর স্টেশনে নামানোর পর আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। বাবার সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সেখানে যান তিনি। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁর বাবাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন।
বাবার মৃত্যুর সময় পরিবারের কেউ পাশে ছিলেন না। নাকিবুর জানান, তাঁর মা ও ছোট ভাই ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে ছিলেন। সৌদি আরবের বিমানের টিকিটসংক্রান্ত জটিলতায় তাঁরা সময়মতো দেশে ফিরতে পারেননি। তাঁর বোন পরিবার নিয়ে নিউজিল্যান্ডে থাকেন। আরেক ভাইও সেখানে পড়াশোনা করেন। তাঁরাও বাবার মৃত্যুর পর দেশে আসতে পারেননি। পরিবারের এই সদস্যদের ছাড়াই বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে নজীবুর রহমানকে দাফন করা হয়।
বাবার মৃত্যুর ঘটনা বলতে গিয়ে নাকিবুর বলেন, ‘আমি কাউকে দোষারোপ করছি না। যে কেউ এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। বয়স্ক মানুষের প্রতি আমাদের সবার সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। তাঁদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন।’
ঢাকা মহানগরীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে গঠিত পরিবীক্ষণ টিমগুলোকে কঠোর আইনি অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। একইসঙ্গে ঢাকায় সরকারি বাসা নিয়ে যে চাকরিজীবীরা থাকছেন, তাদের উদ্দেশে কড়া এক হুঁশিয়ারি বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেছেন, ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কোনো রকম আপস করা হবে না। এমনকি সরকারি বাসস্থানে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ কিংবা এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল এবং নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হবে।সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত ‘ঢাকা মহানগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ’ বিষয়ক এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
মীর শাহে আলম বলেন, ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন থেকেই অত্যন্ত সচেষ্ট। তিনি স্বচক্ষে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও কোয়ার্টারের অবস্থা দেখে এসেছেন। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বড় বড় সরকারি কোয়ার্টার, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে এডিস মশার লার্ভা ও চরম অবহেলার চিত্র পাওয়া গেছে।পরিবীক্ষণ কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে মাঠে কাজ করছেন। তাই যেখানেই অনিয়ম ও লার্ভা পাবেন, সেখানেই তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা ও কঠোর জরিমানা আদায় করবেন। সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের কোয়ার্টার পরিষ্কার রাখতে না পারলে তাদের সরকারি বাসায় থাকার কোনো যোগ্যতা নেই।নগরীর সৌন্দর্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, ঢাকার হাতিরঝিল, ধানমন্ডি, বনানী ও গুলশান লেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পূর্বের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে রাজউক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কাজ করছে। এছাড়া উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬টি খাল পুনঃখনন, গাইড ওয়াল নির্মাণ ও নেটিং করার কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিক বা লোহার ডাস্টবিন চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে ফাইবার বোর্ড দিয়ে নতুন বিন তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দুই সিটি করপোরেশন পর্যায়ক্রমে স্থাপন করবে।
টিমগুলোর সমন্বিত ও কঠোর ভূমিকা থাকলে আগামী এক-দুই মাসের মধ্যেই ঢাকার দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে এ সময় আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন প্রতিটি আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এলাকাভিত্তিক ২০টি জোনে ২০টি বিশেষ পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১০টি এবং দক্ষিণে ১০টি কমিটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব জোনাল কমিটির প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর। এছাড়া, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিবীক্ষণের দায়িত্বে থাকা ২০ কমিটির সদস্যরাও অংশ নেন এতে।
বহু বছরের পুরনো রাজধানীর শান্তিনগরের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সটি ব্যবসায়িক মন্দায় বন্ধ হয়ে গেছে। শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত এই মার্কেটটি এক সময়ে রাজধানীর অভিজাত শপিং মলগুলোর একটি ছিল। কিন্তু নানা কারণে ক্রমেই মার্কেটটি ব্যবসায়ীকভাবে পিছিয়ে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে লোকসান দিতে দিতে গত অক্টোবর মাসে পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে মার্কেটটি।
মার্কেটটির ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত এক দশকের ধাপে ধাপে পতন হয়েছে এই শপিং মলের। মোটা দাগে এর জন্য ৪টি কারণ দায়ি বলে মনে করছেন তারা। এক. শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মানকালীন সময়ে ক্রেতা কমে আসা। দুই. কোভিডকালীন ব্যবসায়ীক মন্দা। তিন. ভালো ব্যবসায়ীরা চলে যাওয়া ও চতুর্থ. কিছু অসৎ ব্যবসায়ীর প্রতারণা। যে ভবনে কর্ণফুলী গার্ডেন শপিং কমপ্লেক্স অবস্থিত সেটি ২০ তলা। এর নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছিল শপিং মল এবং উপরের তলাগুলো আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই শপিং মলে পোশাক, জুতো, প্রসাধনী, গিফট আইটেম এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুম ছিল। চতুর্থ তলায় ছিল ফুড কোর্ট ও বাগান। চালুর সময় মার্কেটিতে ১৯৮টি দোকান ছিল। কিন্তু গত অক্টোবরে যখন মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন মাত্র ২০ থেকে ২৫টি দোকান চালু ছিল বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ফলে ক্রেতা কমে যাওয়া, সার্ভিস চার্জ না পাওয়া এবং বিদ্যুৎ বিল ৫০ লাখ টাকার বেশি বকেয়া পড়ার পর টানা লোকসানের মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ। অবশেষে দোকান মালিক সমিতি সম্মিলিতভাবে পুরো মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রোববার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটে প্রবেশের প্রধান ফটকের সাটার নামানো। উপরে ঝুলছে বন্ধের ব্যানার; তাতে লেখা, ‘১/১০/২০২৬ ইং তারিখ হতে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ থাকিবে।” তবে মুল গেটের বামপাশে কাচ্ছি ডাইন, হটকেক, ডানপাশে পোষাকের ব্রান্ড রেমন্ড, মেজবান ডাইনসহ কিছু খাবারের দোকান খোলা রয়েছে।
এই মার্কেটে ২০১৭ সাল থেকে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল ঘড়ি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ‘এক্কোচি’। মার্কেটের নিচ তলায় ছিল তাদের দোকান। দীর্ঘদিন সরাসরি ক্রেতার উপস্থিতি না থাকায় তারা মূলত অনলাইন গ্রাহকদের ওপর ভিত্তি করেই ব্যবসা পরিচালনা করত। মার্কেটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেইলি রোডের ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টারে দোকান স্থানান্তর করে প্রতিষ্ঠানটি। এক্কোচি এর দায়িত্বে থাকা মো. শফিউল বলেন, “মার্কেট বিক্রি হয়ে গেছে। এটা একটা পার্টি কিনে নিচ্ছে। হয়ত হাসপাতাল বা অন্য কিছু করবে। মার্কেট তো আর করবে না।”
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম ইকবাল বলেন, “এটা আমরা বিক্রি করে দিচ্ছি। সব মালিকরা মিলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। এটা হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার হতে পারে। হতে পারে টিভি সেন্টার বা অন্য যে কোনো অফিস।”
বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ও অনিয়মিত সার্ভিস চার্জ প্রসঙ্গে মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী (আনন্দ শাহ) বলেন, “সার্ভিস চার্জ আসতেছিল না, কারেন্ট বিল ডিউ হয়ে গেছে প্রায় ৫০ লাখ। যার কারণে সব মালিকরা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিয়ে মার্কেট বন্ধ রেখেছে।” তবে মার্কেটের নিরাপত্তারক্ষী ও কর্মচারীদের বেতন এবং দৈনন্দিন সামান্য খরচ তোলার জন্য গেইটের মুখে কিছু দোকান খোলা রাখা হয়েছে বলে তথ্য দেন বাকীবিল্লাহ। তিনি বলেন, “এই কয়েকটা দোকানের ভাড়া উঠায় সিকিউরিটি, একজন ম্যানেজার এদের বেতনটা যাতে দেওয়া। কিছুটা ঋণ করে হলেও এটার জন্য শুধু এই কয়েকটা দোকান খোলা রাখা হয়েছে।”
এদিকে মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করা হলেও ভবনের ওপরের অংশের আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টগুলো পুরোপুরি আলাদা। এগুলো বন্ধের সিদ্বান্তের আওতামুক্ত বলে জানিয়েছে মার্কেট কর্তৃপক্ষ।
কর্ণফুলী গ্রুপের হাত ধরে তৈরি হওয়া এই মার্কেটটির অধিকাংশ দোকান অনেক আগেই ব্যক্তিগত মালিকানায় রেজিস্ট্রি করে বিক্রি করে দেয় ওই কোম্পানি। বর্তমানে বন্ধ হওয়া মার্কেট ভবনে হাসপাতাল, করপোরেট অফিস বা ব্যাংক করার উদ্দেশ্যে একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা চলছে বলে জানিয়েছেন বাকীবিল্লাহ।
তিনি বলেন, “কয়েকটা পার্টির সাথে আমাদের কথা হচ্ছে। কারো সাথে ফাইনাল কিছু হয় নাই। কোন চুক্তিও হয় নাই। অনেকগুলা কোম্পানি; হসপিটাল আছে, করপোরেট কোম্পানি আছে, ব্যাংক আছে।”
চার কারণে মার্কেটে ‘ধস’
বিগত এক দশক ধরে ধাপে ধাপে মার্কেটটির পতন ঘটেছে বলে দাবি করেছেন কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ীরা। বন্ধ ঘোষণার আগের ব্যবসায়িক অবস্থা তুলে ধরে একোচ্চির মো. শফিউল বলেন, “মার্কেটে কাস্টমার ছিল না, একদম ডাউন ছিল। অনলাইন গ্রাহকদের ওপর ভিত্তি করেই ব্যবসা পরিচালনা করতাম। ধারাবাহিকভাবে মার্কেটটা বন্ধ হইছে। বিগত প্রায় ১০ বছর মিলায়ে আস্তে আস্তে এই মার্কেটটা ফল করেছে।”
মার্কেটটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কিছু ব্যবসায়ী বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণের দীর্ঘ সময় রাস্তাঘাট বন্ধ ও সংস্কার কাজের কারণে ক্রেতারা মার্কেটে আসা বন্ধ করে দেন। এতে ভালো ব্যবসায়ীরা অন্য মার্কেটে চলে যান এবং আর ফিরে আসেননি। এরপর কোভিডের সময় দীর্ঘ লকডাউনে ব্যবসায় ধস নামলে অবশিষ্ট ভালো ব্যবসায়ীরাও চলে যান। সে সময় কিছু অসাধু ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ী জিনজিরা ও চকবাজারের তৈরি নিম্নমানের পণ্য এনে বিদেশি বলে বিক্রি করায় অভিজাত ও বিশ্বস্ত ক্রেতারা মার্কেটের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেন। এর মধ্যই ই-কমার্স ও ফেইসবুক কেন্দ্রিক কেনাকাটা বাড়ার পাশাপাশি বসুন্ধরা সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্কের মত বিশাল শপিং মলের সঙ্গে ছোট এই মার্কেটটি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি।
দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী বলেন, “ফ্লাইওভারটা তৈরির সময় থেকে সংস্কারের কাজের জন্য লোকজন এই মার্কেটে ঢুকত না। তখন ভালো কিছু ব্যবসায়ী এই মার্কেট থেকে চলে যায়। অন্যান্য মার্কেটে গিয়ে তারা টেম্পোরারি চিন্তা করছিল আবার রাস্তাঘাট ঠিক হলে … কিন্তু সেই ব্যবসায়ীরা তারা আর ফেরত আসে নাই। কোভিডের সময় যে মার্কেটটা বন্ধ হল, কিছু দোকানদার ভালো ভালো ব্যবসায়ী চলে গেল, তারাও আর রিটার্ন করে নাই।
তিনি বলেন “এটা ইন্টারনেটের যুগ। আমরা ঘরে বসেই সবকিছু অর্ডার করি। জুতা হতে শুরু করে বাচ্চার টুপিটা পর্যন্ত সেখানে পাওয়া যায়। বড় সুপার মার্কেটগুলোর চেয়ে যেমন বসুন্ধরা, যমুনা আমার এখানে দোকান কম। একটা কাস্টমার আসলে শার্ট পেলে প্যান্ট খুঁজে পায় না। যার কারণে আমার এইখানে আর ঢোকে না।”
অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেন বাকীবিল্লাহ। তিনি বলেন, “কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তারা পণ্য আনত জিঞ্জিরা, চকবাজার থেকে। কিন্তু বলত দুবাই থেকে আনছে। ফলে প্রিমিয়াম ও বিশ্বস্ত কাস্টমারগুলা এখান থেকে ছুটে গেছে।”
বক্তব্য রাখছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। ছবি: সংগৃহীত