তাজনূভা জাবীন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন তাজনূভা জাবীন। তিনি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
আজ রোববার দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তাজনূভা তাঁর পদত্যাগের কথা জানান। পোস্টে তিনি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আসন সমঝোতার প্রসঙ্গ টেনে লিখেছেন, ‘এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি।’
ঢাকা-১৭ আসনে তাজনূভাকে প্রার্থী করেছিল এনসিপি। তাজনূভা তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, আজ তিনি এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। অত্যন্ত ভাঙা মন নিয়ে জানাচ্ছেন, তিনি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। নির্বাচন করতে মানুষ তাঁকে যে অর্থ অনুদান হিসেবে পাঠিয়েছেন, তা তিনি এক এক করে ফেরত দেবেন। কীভাবে টাকা ধীরে ধীরে ফেরত দেবেন, তা তিনি বিস্তারিত লিখে জানাবেন। সে জন্য তিনি একটু সময় চেয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতা করতে গিয়ে সংকটে পড়েছে এনসিপি। এ ব্যাপারে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সমঝোতার বিষয়টি অনেকটাই চূড়ান্ত হওয়ার পর গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তাসনিম জারা। তিনি দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ছিলেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দলটি থেকে পদত্যাগ করেন এনসিপিতে জামায়াতবিরোধী অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত মীর আরশাদুল হক।
তাজনূভার ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো–
‘আপনারা অনেকে ভাবছেন, হয়তো জামায়াতের সাথে জোটে ঐতিহাসিক কারণ বা নারী বিষয়ের কারণে আমার আপত্তি। এর চেয়েও ভয়ংকর যে কারণ, সেটা হলো যে প্রক্রিয়ায় এটা হয়েছে। এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে।
‘এটা আদর্শের চেয়েও অনেক বড়, সেটা হলো বিশ্বাস। মাত্র কিছুদিন আগে সমারোহে সারা দেশ থেকে মনোনয়ন সংগ্রহের ডাক দিয়ে ১২৫ জনকে মনোনয়ন দিয়ে ৩০ জনের জন্য সিট সমঝোতা করে বাকিদের নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। এই সিদ্ধান্তে সিলমোহর বসানো হয়েছে। বিষয়টা ঠেলতে ঠেলতে একদম শেষ অবধি এনেছে যাতে কেউ স্বতন্ত্র নির্বাচনও করতে না পারে। আগামীকাল মনোনয়ন জমা দেয়ার শেষ তারিখ। আমার অবশ্য এই মুহূর্তে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ইচ্ছা নাই। পুরো আগোছালো করে চোখের পলকে ডিসওউন করে দিয়েছে।
‘বিভিন্ন পত্রিকায় নানান খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আমি মনোনয়ন হারানোর ভয়ে জোটের বিরোধিতা করছি। আমি কিছুদিন আগে লিখেও ছিলাম আমার আসনে নেগোনিয়েশন হলে আমি নির্বাচন করব না, যত কঠিন প্রতিপক্ষ হোক আমি ফাইট দেব। দিলো না। তাদের গোষ্ঠীর ভাইরা তাদের পক্ষে দিস্তায় দিস্তায় লিখে ভরায় ফেলছে কেন আর কীভাবে এই জোট। কিন্তু কোনো জেনারেল, ইসি মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত এ রকম ছিল না জোট হলে বাকি আসনে প্রার্থীকে বসে যেতে হবে। আবার বাকি আসনগুলোতে জামায়াতের হয়ে নির্বাচনী প্রচার–প্রচারণা করতে হবে। জামায়াতের সাথে চরমোনাই পীরের ৭০টা আসনে সমঝোতা হচ্ছে। আর গণ–অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেয়া দলের ৩০টা আসনে।
‘এনসিপি শুরু থেকে যে গণ পরিষদ, সেকেন্ড রিপাবলিক মধ্যপন্থার, নারী, বিভিন্ন জাতিসত্তাকে নিয়ে রাজনীতি করার কথা বলছে সেটা ধারন করে যে কয়জন পার্টিতে ছিল তাদের মধ্যে আমি একজন। এই পার্টির একজন ফাউন্ডার মেম্বার আমি। স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ মন খারাপ। কিন্তু এই দল ছেড়ে দেয়া ছাড়া আমার সামনে আর কোনো সম্মানজনক অপশন নাই। দলের খারাপ সময়ে দল ছেড়ে দিয়ে অরাজনৈতিক, অপরিপক্বতার পরিচয় ইত্যাদি বয়ান দিবে অনেকে। জাস্ট বুলশিট। শুধু এটুকু বলি, আমি বহিরাগত ওখানে, আমাকে প্রতারিত করলে মেইক সেন্স। কিন্তু এক শীর্ষ নেতা আরেক শীর্ষ নেতার সাথে যে মাইনাসের রাজনীতি করে ওখানে সেটা ভয়ংকর। এরা নিজেদের মধ্যে রাজনীতি করতে এত ব্যস্ত এরা কখনো দেশের জন্য নতুন একটা মধ্যপন্থার বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি করতে পারবে না।
‘সবাই খুব বলছেন কালকে থেকে, রাজনীতি লম্বা, অনেক দূর যেতে হয়। একদম ঠিক। কিন্তু সেই নীতি এনসিপির নিজেরই নাই। নেতারা বিতর্কের পর বিতর্ক জন্ম দিয়ে সেটাকে বিপ্লব নাম দিয়েছে আর আমাদের মতো যারা আসলেই এনসিপির নীতি ধারণ করেছি তাদের আবেগপ্রবণ লেবেল দেয়া হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণাপত্র থেকে শুরু করে সবশেষ ডেইলি স্টারের ডিবেটে বলা কথা শীর্ষ নেতারা কতটুকু ধারণ করে সময় মতো মিলিয়ে নিয়েন।
‘ওই পুরোনো ফাঁকা বুলির রাজনীতি করতে হলে পুরোনো দলই করতাম, নতুন কেন? এবার আবারও আসি জামায়াতের সাথে জোট প্রসঙ্গে, এনসিপি স্বতন্ত্র স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে যে কারও সাথে রাজনৈতিক জোটে অসুবিধা ছিল না। সেটা ৫ বছর পরে হতো, ঠিক প্রথম নির্বাচনেই কেন? কিন্তু আর সব অপশনকে ধীরে ধীরে রাজনীতি করে বাদ দেয়া হয়েছে যাতে জামায়াতের সাথে জোট ছাড়া কোনো উপায় না থাকে। সুনিপুণভাবে এখানে এনে অনেককে জিম্মি করা হয়েছে। যা–ই হোক। এটা কোনো রাজনৈতিক কৌশল না। এটাই পরিকল্পনা।
‘এই লেখার পরে আমার ওপর অনেক আক্রমণ আসবে। আমার অনেক ব্যর্থতার ঢালি সাজানো হবে। চরিত্রহননের চেষ্টা হবে। কিন্তু নিজের কাছে নিশ্চিত। আমি এদের সাথে রাজনীতি করতে এসেছিলাম, এদের বিরুদ্ধে না। আমার আজকে মনোনয়ন জমা দেয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করার কথা, আর আমি এখানে বসে এসব লিখছি। জোট নাকি হবে দেড় মাসের, তারপর তারা মধ্যপন্থায় ব্যাক বাউন্স করবে। ট্রু। ব্যাক করে আবার দ্বিচারিতা, ভন্ডামি শুরু করবে। যে জবাবদিহির কথা বলে এরা মুখে ফেনা তোলে, সেটা নিজেদের কেউ করলে তাকেই মাইনাস করে।
‘আমি আগে রাজনীতি করি নাই, ঠিক। কিন্তু এরা কে আগে জাতীয় রাজনীতি করেছে? আমি নিজে বের হয়ে দলের বদনাম করছি, বলতে পারেন। বিষয়টা আমারও ভালো লাগছে না। কিন্তু সেটার থেকে আমার কাছে বেশি জরুরি মানুষ যে এনসিপির দিকে তাকিয়ে আছে, এনসিপিকে এটা–সেটা ভেবে, এনসিপি ওটা না। এনসিপিকে আমরা যারা ওটা করতে চেয়েছি তাদেরকে ট্যাগিং করা হয়েছে নানাভাবে। আমরা যারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, তারা একে একে ছাড়ছি। যাতে এই এনার্জিটা গঠনে ব্যয় হয়, এই চেষ্টাটা প্রোডাকটিভ ভাবে করতে পারি। এখন কলুর বলদ খাটছি।
‘নিজেরও ভালো লাগছে না, এভাবে ছেড়ে যেতে। কিন্ত যারা এই দেশ, এই সংসদই চায় নাই তাদের সমঝোতায় একদম শুরুতেই এমপি হতে চাওয়া, বা যারা এদের কল্যাণে এমপি হওয়ার জন্য হাভাইত্তার মতো করছে তাদের নেতৃত্ব মানা আমার পক্ষে ঠিক গণ–অভ্যুত্থানের পরের বছর অসম্ভব। এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি। আমার নেতা হবে মাজাওয়ালা, জুলাই রাজনীতির ধারক। কিন্তু পুরো জুলাইকে নিয়ে রাজনৈতিক কৌশলের নাম করে তুলে দিচ্ছে জামায়াতের হাতে। আবার নাকি বাউন্স ব্যাক করবে। হাস্যকর। বিএনপি, এই জামায়াতের সাথে জোট করে ১৭ বছর ক্ষমতা থেকে দূরে ছিল। আর বিএনপির অধীনে জামায়াতের সাথে জোট হয়েছিল। জামায়াতের অধীনে না। যেখানে এনসিপিকে বলাই হয় জামায়াতের আরেকটা দোকান, তাহলে কেন এনসিপি আগে নিজের স্বকীয়তা, নিজের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জামায়াতকে বেছে নিতে মরিয়া হয়ে যাচ্ছে? তিনজন মন্ত্রী ছিল না ক্ষমতায়? পারে নাই তো।
‘ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা যায় কৌশল করে, কিন্তু সংগঠন দাঁড় করাতে যোগ্যতা লাগে। আপনারা মিলায় নেবেন, যারা এনসিপি ছাড়ছি তারাই এনসিপির বলা নয়া বন্দোবস্তের রাজনীতি করেছি। কিন্তু ছাড়তে হচ্ছে আমাদের। পার্টিতে থাকা অবস্থায় কোন শোকজ না পেয়ে, সম্পূর্ণ পার্টির ইন্টিগ্রিটি মেনে যখন ছেড়ে আসতে চাই, তখন “অরাজনৈতিক” তকমা পড়ে। আপনারা এটাও মিলায় দেখেন কত কয়েক মাসে কোনো কোনো নেতা কত অসংখ্যবার পাটির ইন্টিগ্রিটি ভেঙ্গে বক্তব্য দিয়েছে, বিভিন্ন কাজ করেছে; কিন্তু তারা মিলিয়ন ফলোয়ারওয়ালা গণ–অভ্যুত্থানের নেতা তাই তারা নির্বাচনী জোটের নামে বাকিদের নির্বাচন করার অধিকার কেড়ে নিয়ে এমপি হতে পারেন আর আমরা পদত্যাগও করতে পারব না। সেটাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হবে।
নির্বাচন কেন্দ্র করে প্রচুর পজিটিভ পিআর হবে এ সকল নেতাদের ঘিরে। কিন্তু আমি নিশ্চিত এরা নয়া বন্দোবস্ত না, এরা মধ্যপন্থার রাজনীতি না। আপনারা বলতে পারেন, এসব আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু এই দলে অনেকে আছে/ছিল যারা আদতেই এনসিপির রাজনীতি করেছে। তাদেরকে এম্পাওআরড করা হয় নাই ইচ্ছাকৃতভাবে। আপনারা তাদেরই চেনেন যাদের এনসিপি চেনাতে চেয়েছে। জুলাই–এর যে স্পিরিট সেটা এনসিপিতে চর্চা করা হয় না, ব্যবহার করা হয়।
‘যারা চর্চা করত, তাদের “নীতি কথা বলা যায় অনেক, বিপ্লব দিয়ে রাজনীতি হয় না, আবেগ দিয়ে রাজনীতি হয় না” ইত্যাদি বলে থামানো হয়, যাতে তারা নিজেদের ভন্ডামি চালিয়ে যেতে পারে।
‘আরেকটা বিষয় দেখলাম, বিএনপি গণভোটে “না” ভোটকে জেতায় আনবে তাই সেটা ঠেকানোর জন্য এই কৌশল। আমার প্রশ্ন, “হ্যাঁ” ভোট জেতানোর জন্য এনসিপিকে ৩০টা আসনে সীমিত হতে হল???? যে লিস্ট ঘুরছে তাদের ৬০-৭০% –এর রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড দেখেন। আমার চেয়ে ভালো জানবেন। এরপরও এনসিপির জোর করে চেপে বসে থাকা নেতাদের মধ্যে যদি এনসিপির রাজনীতি নিয়ে পরিকল্পনা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখতাম, জবাবদিহি পেতাম, তাহলে আমি আরও চেষ্টা করতাম টিকে থাকার। এখন সময় নষ্ট না করি আর।
‘ভেবেছিলাম, জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পর আমি পদত্যাগ দেব। শেষ আশাই ছিলাম। কিন্তু গতকাল সবাই নিশ্চিত করেছে এই জোটে সিল পড়েছে। আর আবারও বলি, আমার পদত্যাগের কারণ যতটা না জোট, তার চেয়ে বেশি যে প্রক্রিয়ায় জোট হয়েছে। অবিশ্বাস, অনাস্থা মূল কারণ। দল অনেক বড় হয়ে স্টাবলিশ করতে পারলে অনেক কিছু বিবেচনা করে ছাড় দেয়া যেত; কিন্তু গঠনের শুরুটাই নাকি আগে সংসদে যেতে হবে, তারপর ওই যে কজন এমপি বের হবে তাদেরকে কেন্দ্র করে নাকি সংগঠন বড় হবে। কিয়েক্টাবস্থা।
‘জামাতের সাথে জোট না চাওয়া মানে বিএনপির সাথে চাওয়া না। আমার রাজনীতিই সংস্কারের পক্ষে। নতুন সংবিধানের পক্ষে। আমি চেয়েছিলাম স্বতন্ত্র একটা নির্বাচন হোক, তৃতীয় জোট করে, বিএনপি/জামায়াতের বাইরে গিয়ে।
‘যা–ই হোক, আমি আজকে পদত্যাগ করেছি এনসিপি থেকে। অত্যন্ত ভাঙ্গা মন নিয়ে জানাচ্ছি আমি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছি না। সবচেয়ে কষ্ট লাগছে আজকেই আম্মু চট্টগ্রাম থেকে আসছে আমার নির্বাচন করা উপলক্ষে, আর আজকেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম। আমি জানি অনেকে ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন আমার এই সিদ্ধান্তে। কিন্তু এটাই আমার জন্য সঠিক। এখানে ন্যূনতম আশা থাকলে, আমি আমার আত্মসম্মানবোধকেও বোধ হয় ডাউট অফ বেনিফিট দিতাম।
‘আমি আপনাদের পাঠানো ডোনেশন ফেরত দেব এক এক করে। আমাকে একটু সময় দেবেন। সেটার জন্য বিস্তারিত লিখে আপডেট দেব কীভাবে ধীরে ধীরে ফেরত দেব। প্রত্যেকটা পয়সা ফেরত দেব। আপনাদের সমর্থন, আপনাদের ভালোবাসার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
‘শেষ কথা বলি, আমি আগে কখনো রাজনীতি করি নাই। জুলাই এ আমার রাজপথে নামা, পরিবর্তনের লক্ষ্যে নতুন কিছুর জন্য।
‘আমি মারা যাওয়ার আগপর্যন্ত সেই চেষ্টা করতে থাকব। আমার আওয়াজ, দেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য কাজ আরও জোরালোভাবে জারি থাকবে। মধ্যপন্থার বাংলাদেশপন্থী নয়া বন্দোবস্তের রাজনীতির জায়গাটা খালিই পড়ে থাকল। আমি ওই জায়গা পূরণ করার চেষ্টায় থাকব। সময় বলে দিবে বাকিটা।’
‘এনসিপি ছেড়েছি, রাজনীতি না’
বেলা ১টা ২৮ মিনিটে তাজনূভা তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আরেকটি পোস্ট দেন। এই পোস্টে তিনি লিখেন, ‘আরেকটা কথা, আমি এনসিপি ছেড়েছি, রাজনীতি না। সংসদ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য যে লড়াইটা চালাতে হয় এরা একটাও সে লড়াই করে নাই। লড়াই, সংগ্রাম, মজলুম ছাড়া সংসদে যাওয়া টেকসই না, জনপ্রতিনিধি হওয়া টেকসই না। আমি টেকসই কিছু চাই। এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আমার আসল লড়াই শুরু। আমার রাজনীতির শেষ না, এটা শুরু।’
বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, বিএনপি হচ্ছে মুনাফিকের দল। তারা জন্মগতভাবেই জাতির সাথে, রাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা করে আসছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের যে ৩১ দফার কথা বিএনপি বারবার বলে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে বিএনপি সেই ৩১ দফা ছুড়ে ফেলে দিয়ে রাষ্ট্রের প্রত্যকটি জায়গায় অন্ধ দলীয়করণে মেতে উঠেছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাত ১০টায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রধান ফটকে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মূল দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করা। এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে তারা ৫ বছর শাসন করলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল উত্থাপন করেনি।
শিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম আরও বলেন, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমের রক্তের উপর দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তারা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে নিজেদের মতো ম্যানিপুলেশন করতে চায়। PSC সংস্কার করতে চায় না। ভাইভার নম্বর ৪-৫ গুণ বাড়িয়ে আবার তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের চাকরিতে পুনর্বহাল করা এবং শুধুমাত্র লিস্ট নিয়ে নিজেদের নেতাকর্মীদের চাকরি দেওয়ার জন্য জনগণের সাথে, তরুণ প্রজন্মের রক্তের সাথে বেইমানি করার ছক আর কৌশল তারা করছে।
তিনি আরও বলেন, চা খাওয়ার দাওয়াতের নাম করে PSC-এর সদস্যদেরকে পদত্যাগ করানো হচ্ছে। আমরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলতে চাই—যদি জনগণের সাথে, তরুণ প্রজন্মের চাকরি নিয়ে আবারও এই বেইমানি এবং প্রতারণার আশ্রয় আপনারা নেন, শেখ হাসিনাকে তখন সামলাতে পারেন নাই, সে তখন আপনাদের সামলানোর ক্ষমতা নাই।
সাদ্দাম হুশিয়ারী করে বলেন, জুলাই সনদই আপনাদের অস্তিত্ব। জুলাই সনদই আপনাদের ক্ষমতার ভিত্তি, জনগণের ম্যান্ডেটই আপনাদের ক্ষমতার ভিত্তি। সুতরাং সেটাকে যদি ডিনাই করেন, আপনাদের ওই ক্ষমতার মসনদ দুমড়ে-মুচড়ে শেষ হয়ে যাবে।
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান
৭ দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ শুরু হয়েছে। সকাল ৭টায় লংমার্চ শুরুর আগে উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যুব সমাজকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমরা কারও ছলনায় কান দিও না। আরেকটি বিপ্লব আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের সাত দফা দাবির মধ্যে মূল দাবি হলো গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করা। যদি এ দাবি আদায় হতো তাহলে বাকি ৬টি দাবি মাথাচাড়া দিতো না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি সরকার জনগণের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে, আশাহত করেছে। বিএনপি যদি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে তাহলে চড়া মূল্য দিতে হবে। বিএনপি অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি। বরং, তারা নতুন নতুন জঞ্জাল সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, অতীতে যারা দাসত্ব স্বীকার করেছে, তারা তাদের পরিণতি ভোগ করছে। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, আপনারা আমাদের দাবি মেনে নেন। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করুন। আমাদের দাবি আদায় করে আমরা ছাড়বো।
তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো ব্যক্তিগত ও দলীয় দাবি নিয়ে রাস্তায় নামিনি। এসব জনগণের দাবি। আমাদের আগের দুটি লংমার্চ জনগণের সহযোগিতায় সফল হয়েছে।
এর আগে দাবি আদায়ে ১১ দল গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রথম লংমার্চ করে চট্টগ্রাম অভিমুখে, দ্বিতীয়টি ১৯ সেপ্টেম্বর করে রংপুর অভিমুখে।
ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারসহ তিন দফা দাবিতে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে লক্ষ্মীপুরে পথসভা ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। গতকল শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকালে শহরের উত্তর তেমুহনী এলাকার শহীদ আফনান চত্বরে এ পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে জুমার নামাজের পর শহরের চকবাজার এলাকা থেকে তিন দফা দাবিতে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। মিছিলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের জুলাইযোদ্ধাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
পথসভায় বক্তব্য দেন- ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল জাবের, সদস্য সচিব ফাতিমা তাসনিম জুমা ও জুলাইযোদ্ধা সানজিদা আনোয়ার চৌধুরীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
বক্তারা বলেন- বিগত ১৭ বছরেও যে সংবিধান স্বৈরাচারী শাসন ও শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা ঠেকাতে পারেনি, সেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে এখন সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। সংবিধান ও সংস্কারের অজুহাতে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। সরকার জুলাই শহীদদের বিচার এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হলে দেশে আরেকটি জুলাইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
আগামী ১৮ ডিসেম্বরের আলটিমেটাম দিয়ে বক্তারা বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত না হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এ বিষয়ে তারা সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, পথসভা শেষে ইনকিলাব মঞ্চের ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি লক্ষ্মীপুরের জকসিন ও চন্দ্রগঞ্জ হয়ে নোয়াখালীর উদ্দেশে যাত্রা করে।
একসময় দেশের প্রগতিশীল আন্দোলন, মুক্তচিন্তা ও অসংখ্য গুণী মানুষের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখন ‘স্বাধীনতাবিরোধী ও অমানুষদের কারখানায়’ পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, যে প্রতিষ্ঠান একসময় বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেখানে এখন স্বাধীনতাবিরোধীদের ছবি টাঙিয়ে তাদের জাতির নেতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কীসের লেখাপড়া? কেউ ভর্তি হওয়া উচিত না। একটা সিনিয়র মাদ্রাসা, অমানুষদের একটা জায়গা হয়েছে এটা। কী দরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করে? এটা কী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান?’বিশ্ববিদ্যালয়টির অতীত গৌরবের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে পাকিস্তান আন্দোলনের, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় মুক্তির। সেই ২৭ সাল, ২৮ সাল, ২৯ সাল, ৩০ সাল, আবদুল ওহাব, আবুল হোসেনসহ সমস্ত কবি-সাহিত্যিক যারা ছিলেন, তাদের জন্ম দিয়েছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকদের জন্ম দিয়েছে, মোজাফফর আহমদ চৌধুরীদের মতো লোক, নীলিমা ইব্রাহিমদের মতো লোক, ড. নাজমা চৌধুরীর মতো লোক, আহমদ শরীফদের মতো লোক, হুমায়ুন আজাদদের মতো লোক, হুমায়ূন আহমেদদের মতো লোকের জন্ম দিয়েছে।’
এরপর ক্ষোভ প্রকাশ করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এটা এখন স্বাধীনতাবিরোধী, অমানুষদের একটা কারখানা। কী দরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হয়ে? যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাম আযম, নিজামীর ছবি টাঙানো হয়, এরাই নাকি জাতির নেতা! সেই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তো চিন্তাই করি না আমি।’দেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘চিন্তা করতে পারতাম, যদি সেই বাঙালি জাতি একদিন মনে করত, আমাদের নেতার নাম ছিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আমাদের নেতার নাম ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। আমাদের নেতার নাম ছিল নেতাজি সুভাষ বোস। আমাদের শহীদের নাম ছিল ক্ষুদিরাম, আমাদের শহীদের নাম ছিল সূর্য সেন।’
ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘যদি একবার মনে করতে পারতাম, আমাদের ভাষা আন্দোলনের শহীদ, মা বলার স্বীকৃতি যারা দিয়ে গেলেন, তাদের নাম ছিল বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার। যদি আজও মনে করতে পারেন, এই যে বাঙালির ছেলেরা, যাদের ভীরু বাঙালি বলা হয়, ৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধের ডাক এলো, সেদিন যারা বাবাকে-মাকে কাঁদিয়ে, বাবার বাহুবন্ধন উপেক্ষা করে কেউ গিয়েছিলাম ত্রিপুরার পাহাড়ে, কেউ গিয়েছিলাম মেঘালয়ের পাহাড়ে, কেউ গিয়েছিলাম কলকাতা, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারে।’
মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমরা যারা দেরাদুনে ট্রেনিং নিয়েছিলাম, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিতে যারা যুদ্ধ করেছিলাম, সেই সন্তান যদি আবার বাংলায় আসে, তাহলে এটার নাম হবে বাংলাদেশ। না হলে এখানে অমানুষরা জিতে যাবে। আমরা সব ইতিহাসের জঞ্জাল এবং কঙ্কালে পরিণত হব।’
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের আশীর্বাদে আর পাঁচটা বছর বাঁচতে চাই। আমি বাংলাদেশটাকে দেখে যেতে চাই, এটা কি বাঙালির বাংলাদেশ থাকবে, নাকি রাজাকারদের পাকিস্তান? এটা আমি দেখে যেতে চাই এবং এটার জন্য শেষ যুদ্ধটা করে যেতে চাই।’
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মানের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধীরা যারা এখন সাহসী হয়ে উঠছে বা তাদের সংখ্যা বেড়ে গেছে, তারা এখন আমাদের হয়তো গুলি করে মেরে ফেলবে। প্রথম ফার্স্ট টার্গেট ফজলুর রহমান টু কিল হিম উইথ অ্যা শট অব অ্যা বুলেট। কিন্তু অসহায় মুক্তিযোদ্ধা মরলে এ দেশে কবরও পাবে না, যেটা প্রমাণ হচ্ছে এ দেশে। আমার নিমদা তো অন্তত তার দাহটা পেয়েছেন শ্মশানে গিয়ে। আমি নাও পেতে পারি কবর। দেশটা এই জায়গায় চলে গেছে।’
এনসিপির সমাবেশের মঞ্চে দলটির নেতারা
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেছেন, ‘এই দুজন মন্ত্রীই তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে দেশের সর্বত্র আমরা মিছিল করব। সেই মিছিল নিয়ে আমরা জনাব তারেক রহমানকে (প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান) ঘেরাও করে আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ।’
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ সমাবেশে সমাপনী বক্তব্যে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন। ‘দেশব্যাপী সরকার প্রযোজিত খুন, লুটতরাজ, অরাজকতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে’ এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার যৌথ উদ্যোগে এ সমাবেশ হয়।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে এনসিপির দুই প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর উপস্থিতিতে এ সমাবেশে কয়েক হাজার নেতা–কর্মী অংশ নেন। জাতীয় জাদুঘরের সামনের চত্বর ও আশপাশের সড়কে অবস্থান নেন নেতা–কর্মীরা।
সমাবেশে সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাহাজানিতে সবার জীবন আজ নাজেহাল। দেশে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। দেশের সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা দিতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার দায় সবচেয়ে বেশি বর্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ওপর। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত হয়েছেন। গণভোটের গণরায় বাদ দিয়ে তিনি সংবিধান কাটাছেঁড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। চলমান নৈরাজ্য ও গুম–খুনের দায় নিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। সঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকেও পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, দুজনই তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন।’
‘নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি’
বিএনপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দেশ পরিচালনা করার কোনো ধরনের পরিকল্পনাই নেই বলে মন্তব্য করেছেন নাহিদ ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে সমাবেশে তিনি বলেন, ‘কীভাবে দেশে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব কায়েম করা হবে, সেই পরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন। আমরা এক স্বৈরাচারকে বিদায় করে এখন নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি। কিন্তু জনগণের সামনে আমাদের প্রতিশ্রুতি, পতিত স্বৈরাচার এবং এই নব্য স্বৈরাচার–এই দুই স্বৈরাচারকেই আমরা পরাজিত করব, ইনশা আল্লাহ।’
আগামী ডিসেম্বরে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে শুনছি পতিত স্বৈরাচার নাকি আসবে দেশে! আমরা জানি, সেই স্বৈরাচারকে এই নতুন স্বৈরাচার কোনোভাবেই মোকাবিলা করতে পারবে না।...তাই বাংলাদেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
করিডর, গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গ
সীমান্তে হত্যা, পাহাড়ে অশান্তি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নির্যাতন, দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ভারতের চক্রান্ত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারবে না। জাপানে গিয়ে আবারও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে অবৈধ করিডর ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তারেক রহমান। এ ধরনের কোনো অবৈধ করিডর বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আগামী ডিসেম্বরে যদি গঙ্গা চুক্তি ন্যায্যভাবে নতুন করে তৈরি করা না হয়, বাংলাদেশের জনগণ আবারও মাঠে নামবে। ‘এবার আমরা গঙ্গা চুক্তিতে কোনোভাবেই বিন্দু পরিমাণ আমাদের ন্যায্য হিস্যায় ছাড় দেব না’ বলে উল্লেখ করেন নাহিদ।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা–৮ আসনে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছিল। ইনশা আল্লাহ, এবার আমরা তাঁকে হারতে দেব না। আসিফ মাহমুদকে পরিকল্পনা করে নির্বাচনের বাইরে রেখে যারা ভেবেছিল, গণ–অভ্যুত্থানের শক্তিকে নিঃশেষ করে দেবে, তারাও ইনশা আল্লাহ এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরাজিত হবে।’
কলকাতায় ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ে না?
গণবিক্ষোভ সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, কলকাতায় এলপিজির দাম হাজার টাকা, বাংলাদেশে সেই গ্যাস কিনতে হচ্ছে ২৫০০ টাকায়। কলকাতায় কি ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ে না? এর উত্তর জ্বালানিমন্ত্রীকে দিতে হবে।
সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান আখতার। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।
এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আকরাম হুসাইন, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার ছাড়াও দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সমাবেশে বক্তব্য দেন।
সমাবেশে বিপুল জমায়েত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আজকের গণবিক্ষোভ সমাবেশটি ছিল এনসিপির মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক হাজার নেতা–কর্মী সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। কর্মসূচির আগে সপ্তাহজুড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রচারপত্র বিতরণ করেছিলেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।
শাহবাগে গণবিক্ষোভ শুরু হওয়ার কথা ছিল বেলা তিনটায়। তিনটার আগে থেকেই বাংলামোটরে এনসিপি কার্যালয়ের নিচে ও শাহবাগে দলটির নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। নেতা-কর্মীদের অনেকেই বাসে করে এসেছিলেন।
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা শাহবাগের সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক আবদু্ল্লাহ আল আমিন, সারোয়ার তুষার ও মনিরা শারমিন প্রথমে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন। পরে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা আসতে থাকেন। বিকেল পৌনে চারটার পর বাংলামোটর থেকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির এবং বিকেল সোয়া চারটার দিকে আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির দুটি বড় মিছিল সমাবেশস্থলে প্রবেশ করে।
বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর বাজানো হয় জাতীয় সংগীত। পরে এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিক মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেননি।
নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিক স্খলনের অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক বিতর্কিত ঘটনাগুলোর পর তার দলীয় পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি নাটোর জেলা বিএনপি। গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে বিষয়টি দলের হাইকমান্ডের ওপর ছেড়ে দিয়েছে জেলা কমিটি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ।
আব্দুল আজিজ নাটোর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। জেলা বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা আহ্বায়ক কমিটির কোনো যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে বহিষ্কার বা এ ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার নেই। ফলে তার দলীয় পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর ন্যস্ত করেছে জেলা কমিটি।সম্প্রতি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় আব্দুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর পরদিন, ২৮ অক্টোবর, সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরপর এ দুই ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। নৈতিক স্খলনের অভিযোগ তুলে তার সংসদ সদস্য পদ ও দলীয় পদ থেকে পদত্যাগের দাবিও ওঠে।এ পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে শুক্রবার সকাল ১০টায় নাটোর জেলা পরিষদ হলরুমে জরুরি বিশেষ সভা ডাকে জেলা বিএনপি। জেলা আহ্বায়ক কমিটির অধিকাংশ সদস্যের উপস্থিতিতে শুরু হওয়া সভা চলে টানা আট ঘণ্টা।সভায় শাকিল হত্যা মামলায় রিমান্ডে থাকা এমপিপুত্র মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং আব্দুল আজিজের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের পর সদস্যরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। পরে দলের গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার জেলা কমিটির নেই বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছান তারা।জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘আমরা সবগুলো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের কাছে আব্দুল আজিজের পরিচয় তিনি জেলার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। এ ছাড়া তিনি একজন জাতীয় সংসদ সদস্যও। তাই গঠনতন্ত্র মোতাবেক জেলা কমিটির ক্ষমতা নেই কোনো যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। সর্বসম্মতিক্রমে এ বিষয়ে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত দলের হাইকমান্ডের ওপর ন্যস্ত করেছে কমিটি।’
এদিকে, শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার নূরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড শেষে আরও সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। শুক্রবার গুরুদাসপুর আমলি আদালতের বিচারক মেহেদী হাসানের আদালতে এ আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, তদন্তে আরও অগ্রগতির জন্য গ্রেপ্তার নূরুজ্জামান মিন্টুকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এ কারণে বিধি অনুযায়ী আদালতের কাছে আরও সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।