জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নিচ্ছেন নতুন মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা।
গাড়ি-বাড়ি, বেতন ও সম্পূর্ণ চিকিৎসা খরচসহ অন্তত ১৩ ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন নতুন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, চিফ হুইপ, হুইপ, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার এসব সুবিধাভোগী হবেন। বিগত সরকারগুলোর মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টারাও এসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এসেছেন।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীরা কী সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তা নির্ধারণ করা আছে সংবিধানের দ্য মিনিস্টার্স এবং মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলাইজ) অ্যাক্টে। এর বাইরে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা সরকারের পক্ষ থেকে এমপিদের দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া রাজধানীতে যাদের থাকার স্থায়ী জায়গা নেই, তাদের অনেককে প্লটও বরাদ্দ দিয়েছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এবার এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান।গতকাল মঙ্গলবার এমপিদের শপথ গ্রহণ শেষে সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠক শেষে বিএনপির পক্ষ থেকেও একই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অতীতের রেওয়াজ থেকে এটা বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন বলে মনে করছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা খুবই ভালো একটা উদ্যোগ। পাশাপাশি এটাও বলব, জুলাই সনদে ৩২টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে।
সেখানে ৭৪ নম্বর ধারায় বলা আছে, যে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব দেবেন। সেটা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া থাকবে। এভাবে প্রতি বছর তারা সম্পদের হিসাব দেবেন। এখন আমাদের কাজ হবে তারা এগুলো করছে কিনা ফলোআপ করা।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদাক্রম অনুযায়ী চিফ হুইপ এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করেন। হুইপরা ভোগ করেন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা। স্পিকারের পদমর্যাদা প্রধানমন্ত্রীর পরই। এ ছাড়া ডেপুটি স্পিকার মন্ত্রীর মর্যাদা পেয়ে থাকেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করেন।
বেতন-বাড়ি
একজন মন্ত্রী পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি প্রতিমাসে বেতন-ভাতা বাবদ এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রী ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রী ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা পাবেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তারা সরকারি ব্যয়ে সুসজ্জিত বাসভবন পাবেন বিনা ভাড়ায়। এ ছাড়া যখন প্রয়োজন বাসার সব মেরামতও সরকারের পক্ষ থেকে করা হবে। প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। তবে তারা কেউ সরকারি বাড়িতে থাকতে না চাইলে একজন মন্ত্রী বাসা ভাড়া বাবদ মাসে ৮০ হাজার টাকা পাবেন। প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী পাবেন ৭০ হাজার টাকা। নিজ বাড়ি বা ভাড়া বাড়িতে থাকলে ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিন মাসের বাড়ি ভাড়ার সমপরিমাণ টাকা তারা প্রতিবছর পাবেন। বাসভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিফোনের যাবতীয় খরচ সরকার বহন করবে। সরকারি বাড়ির সাজসজ্জার জন্য একজন মন্ত্রী পাঁচ লাখ এবং প্রতিমন্ত্রী চার লাখ টাকা পাবেন প্রতিবছর।
গাড়ি সুবিধা
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা সরকারি খরচে গাড়ি পাবেন। সরকারের পরিবহন পুল থেকে এই গাড়ি সরবরাহ করা হবে। প্রতিদিন ১৮ লিটার জ্বালানি তেল বা সমপরিমাণ অর্থ পাবেন গাড়ির জ্বালানি বাবদ। সরকারি প্রয়োজনে বা নির্বাচনী এলাকায় ভ্রমণের সময় মন্ত্রণালয়ের অধীন যে কোনো সংস্থা বা দপ্তর থেকে একটি জিপ পাবেন তারা। দেশের ভেতরে কোথাও ভ্রমণে গেলে দৈনিক ভাতা পাবেন দুই হাজার টাকা করে। উপমন্ত্রী পাবেন দেড় হাজার টাকা। বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে বছরে ১০ লাখ টাকা বীমা সুবিধা পাবেন তারা।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সহায়ক ব্যক্তি সুবিধা
একজন মন্ত্রী তাঁর পছন্দ অনুযায়ী উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে পাবেন। এ ছাড়া তারা একজন সহকারী একান্ত সচিব পাবেন। পাবেন দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। এগুলো তাদের পছন্দমতো ব্যক্তিকে তারা নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ছাড়া একজন জমাদার, একজন আরদালি, দুজন অফিস সহায়ক ও একজন বাবুর্চি পাবেন। প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর ক্ষেত্রে এসব সুবিধা কিছুটা কম পাবেন। দুজনের পরিবর্তে একজন অফিস সহকারী, একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পাবেন তারা।
চিকিৎসা
মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার পুরো ব্যয়ভার সরকার বহন করবে। সেই খরচের কোনো সীমা আইনে বেঁধে দেওয়া নেই। তবে চিকিৎসা খরচের ভাউচার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে হবে।
আপ্যায়ন
দেশি-বিদেশি অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য একজন মন্ত্রী মাসে ১০ হাজার টাকা করে আপ্যায়ন ভাতা পাবেন। আর প্রতিমন্ত্রী পাবেন সাড়ে সাত হাজার টাকা। উপমন্ত্রী পাবেন পাঁচ হাজার টাকা।
এলাকার উন্নয়নে বরাদ্দ
নিজের নির্বাচনী এলাকার মসজিদ, মন্দির উন্নয়নসহ এলাকার মানুষের দাতব্য কাজে একজন মন্ত্রী বছরে ১০ লাখ টাকা, প্রতিমন্ত্রী পাবেন সাড়ে সাত লাখ এবং উপমন্ত্রী পাবেন পাঁচ লাখ। এ টাকার মধ্যে একজন মন্ত্রী চাইলে একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা দিতে পারেন। প্রতিমন্ত্রী দিতে পারবেন ৩৫ হাজার ও উপমন্ত্রী দিতে পারবেন ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বেতন ও সুবিধাদি নির্ধারণ করা রয়েছে দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্টের মাধ্যমে।
সেখানে বলা আছে, একজন প্রধানমন্ত্রী মাসে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাবেন। এর সঙ্গে বাড়ি ভাড়া হিসেবে পাবেন এক লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিনোদনের জন্য ব্যয় করা সম্পূর্ণ অর্থই তিনি পাবেন ভাতা হিসেবে। তাঁর অফিস থেকে বাসা এবং বাসা থেকে অফিসে যাতায়াতের সব খরচও বহন করবে রাষ্ট্র। এ ছাড়া তিনি আরও অনেক সুবিধা রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে পেয়ে থাকেন।
এমপিদের সুযোগ-সুবিধা
এমপিরা মাসে বেতন হিসেবে ৫৫ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। তবে অতীতে দেখা গেছে, বেতনের বাইরেও এলাকার উন্নয়নে তাদের পৃথকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা খাত দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের নজির রয়েছে। এ ছাড়া তারা শুল্কমুক্ত গাড়ি নিয়েছেন। প্লটও পেয়েছেন অনেকে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির ঘটনায় বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা ও মুক্তচিন্তার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এ ধরনের চাকরিচ্যুতির ঘটনা শুধু পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনকেই বিপর্যস্ত করে না, বরং সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার স্বাধীনতা, মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত করে বলে মনে করে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সভাপতি প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মাহবুবর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. পূর্বা ইসলাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক মো. মশিউর রহমানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, কুয়েটে চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন—কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীল, আইইএম বিভাগের অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্র, ইএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মণ্ডল, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফা এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমান। এ ছাড়া চাকরিচ্যুত হয়েছেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি এবং অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত।
বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ জানিয়েছে, আমরা মনে করি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়েই এ ধরনের চাকরিচ্যুতি ও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটানো হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে অদ্যাবধি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ সর্বস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতি, সাময়িক বরখাস্ত, একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বয়কট, হুমকি-হয়রানি এবং মব সন্ত্রাসের এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে শত শত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার এবং সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এসব ঘটনার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাক্স্বাধীনতা, শিক্ষকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও মুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশের পরিবর্তে ভীতি, অসহিষ্ণুতা, প্রতিহিংসা ও জবরদস্তিমূলক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় কখনো ভিন্নমত দমনের ক্ষেত্র কিংবা ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের কথা বলা, চর্চা করা কিংবা এসবের পক্ষে অবস্থান নেওয়া কোনো অপরাধ নয়। অথচ এসব আদর্শের পক্ষে কথা বলার কারণে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসংখ্য শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীকে নানাভাবে হয়রানি, বঞ্চনা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ বলছে, আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা ভিন্নমতের কারণে কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে হয়রানি, বঞ্চিত কিংবা চাকরিচ্যুত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ধরনের মব সন্ত্রাস, সামাজিক বয়কট কিংবা অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কারও পেশাগত ও শিক্ষাগত অধিকার হরণ করা চলতে পারে না।
বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ অবিলম্বে কুয়েটে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বপদে পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে অদ্যাবধি দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরিচ্যুতি, বয়কট, সাময়িক বহিষ্কার ও হয়রানির শিকার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যথাযথ মর্যাদায় স্ব স্ব পদে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুনর্বহাল করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য শিক্ষার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তিনি সিআইডির দিনাজপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন। এর আগে ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক জোনে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপন থেকে তাকে অবসরে পাঠানোর বিষয়টি জানা যায়।
বিভাগীয় মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে তার পরিচয় হয়। পরে ওই নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় করা মামলার আদালতের পর্যবেক্ষণেও তাদের স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে বলে বিভাগীয় নথির সারসংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ডে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে বিভাগীয় তদন্তে উল্লেখ করা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়।
বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির ২৫ অক্টোবরের অনুমোদনের পর এ আদেশ জারি করা হয়।
ছবি : সংগৃহীত
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুর ও সাভারের আশুলিয়ায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। শনিবার সকাল থেকে দুই এলাকার বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে কয়েক ঘণ্টা ধরে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
শ্রমিক অসন্তোষের মুখে আশুলিয়ার কাঠগড়া ও আশপাশের অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
সকাল থেকে আশপাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানার কয়েকশ শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, আশুলিয়ায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণে কাঠগড়া ও আশপাশের অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জালাল উদ্দিন জানান, দুপুর আড়াইটার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শ্রমিকেরা সরে যান। এরপর প্রায় চার ঘণ্টা পর ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে বিকেল ৩টার দিকেও মিরপুর সাড়ে ১১ ও কালশী সড়কে শ্রমিকদের অবরোধ চলছিল।
মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আশুলিয়া থেকে তিনটি ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে শ্রমিকদের উসকে দিতে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন তেমন ভালো নয়। শ্রমিকেরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন। তাঁরা অন্য কারখানার শ্রমিকদের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন। আমরা শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে।’
সাবেক ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর রশীদ
অবশেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার ও বিতর্কিত সাবেক ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর রশীদকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে পুলিশের সাবেক ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে এ গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ই-মেইল ঠিকানায় একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কর্মস্থলে যোগদান করেননি।
এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয় পুলিশ সদর দপ্তর। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল বিভাগীয় মামলা দায়ের করে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি কোনো লিখিত জবাব দেননি কিংবা সময় বৃদ্ধির আবেদনও করেননি।
পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের ২২ জুন অভিযোগ তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত শেষে ৬ আগস্ট দাখিল করা প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে মতামত দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না কেন, সে বিষয়ে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় ২০ আগস্ট। ওই নোটিশেরও কোনো জবাব দেননি তিনি।
পরে প্রস্তাবিত গুরুদণ্ডের বিষয়ে ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ চাওয়া হয়। ১ অক্টোবর কমিশন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের পক্ষে মতামত দেয়।সবশেষে গত ২৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের বিষয়ে অনুমোদন দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী পলায়নের তারিখ অর্থাৎ ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শরীরে নয়টি গুলি লাগার বানোয়াট দাবি এবং ভুয়া চিকিৎসাপত্র দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা করার তথ্য প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। বিস্তারিত তদন্তে মামলার বাদী নূর হোসেনের গুলিবিদ্ধ হওয়া তো দূরের কথা, ঘটনার দিন তিনি কোনোভাবেই আহত হননি বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত সংস্থা।
এ প্রেক্ষিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মামলার মোট ৮৪ জন আসামিকে অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে এ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উক্যমং রাখাইন। সম্প্রতি বিষয়টি আদালতের নজরে এলে ম্যাজিস্ট্রেট নথি পর্যালোচনা করে বাদীর প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির আদেশ দেন এবং আগামী ১ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।
মামলার নথিপত্র ও পুলিশ সূত্র জানায়, এজাহারে নূর হোসেন দাবি করেছিলেন যে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় গণআন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় তিনি নির্বিচার হামলার শিকার হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পিঠে ছয়টি, বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপরে দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটিসহ মোট নয়টি গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে আসামিরা তাকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে আসামিদের ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এসব অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন তিনি।
জাল চিকিৎসাপত্রে সাজানো নাটক ফাঁস
পুলিশের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাদী নূর হোসেন এজাহারের সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসার যে ব্যবস্থাপত্র ও কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি জাল। হাসপাতালের মূল রেজিস্টার ও রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখা যায়, উল্লিখিত তারিখে নূর হোসেন নামের কোনো ব্যক্তি সেখানে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি।
প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা দুটি গুরুতর অসংগতি তুলে ধরেন। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা সব সময় হাতে লিখে ব্যবস্থাপত্র দেন, কিন্তু নূর হোসেনের দাখিলকৃত নথিটি ছিল কম্পিউটারে টাইপ করা। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাপত্রে ব্যবহৃত ক্যাশ মেমো নম্বরটি যাচাই করে দেখা যায় সেটি আব্দুস সাত্তার নামের ৫৪ বছর বয়সী এক ভিন্ন রোগীর নামে বরাদ্দ। এছাড়া যে পেশেন্ট আইডি নম্বর উল্লেখ করা হয়েছিল, তা ছিল জুয়েল নামের ৩২ বছর বয়সী অন্য এক ব্যক্তির।
এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের তালিকা নিয়ে সরকারের প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক গেজেটেও নূর হোসেনের নামের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। সামগ্রিক পারিপার্শ্বিকতা ও তথ্যপ্রমাণ বিবেচনায় তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, বাদী বাস্তবে আহত না হয়েও অসৎ উদ্দেশ্যে আহত হওয়ার মিথ্যা নাটক সাজিয়ে এ মামলা করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন সময়ে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা আট আসামিকে এ মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট বা গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। নতুন করে কাউকে এ মামলার এজাহারের ভিত্তিতে সরাসরি আটক করা হয়নি।
তদন্তে অভিযোগের কোনো প্রাথমিক সত্যতা না পাওয়ায় শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের ছাড়াও অব্যাহতি পাওয়া উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, মিলন হোসেন, মহিলা লীগ নেত্রী ইশরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।
মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার দায়ে বাদীর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই উক্যমং রাখাইন জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তবে বাদীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার আদালতের রয়েছে।
পাসের হার ২২ বছরে সর্বনিম্ন
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। দ্বাদশ শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পর্যায়ে পা রাখতে যাওয়া এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে, যা উত্তীর্ণের মোট সংখ্যার ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
এর আগে ২০২৫ সালে এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ; তাদের মধ্যে ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল। এই হিসাবে ২০২৬ সালের পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন।
এর আগে ২০০৪ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর আর কখনও এবারের মতো বাজে ফল আর হয়নি।
আজ শনিবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। বরাবরের মতই শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটের পাশাপাশি মোবাইলে এসএমএস করেও উচ্চমাধ্যমিকের ফল জানা যাচ্ছে।
চব্বিশের অভ্যুত্থান ঘিরে সার্বিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের অধীনে খাতা দেখার ধরন বদলে যাওয়ায় গতবার মাধ্যমিকের পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিকেও পাসের হারে ধস নামে।
এবার এসএসসিতে পাসের হার আরও কমে হয় ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। আর এইচএসসিতে ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বাজে ফল এল।
ফলাফলে এমন ধসের পেছনে নির্মোহভাবে খাতা দেখা এবং শিক্ষার্থীদের শিখনের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখার কথা বলছে সরকার।
ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেছেন, “আমাদের নির্বাচিত সরকারের আয়োজিত প্রথম এই এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষায় আমরা নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করেছি।
“প্রত্যেকের খাতায় যে পরীক্ষা যেভাবে দিয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে চাইছি এবং এই প্রথমবারের মতন থাকছে পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষা।”
অকৃতকার্যদের মধ্যে এক বা দুই বিষয়ে যারা ফেল করেছে, সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের কথা বলেছেন তিনি।
আর শিখনের ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ফলাফলে এভাবে নিচের দিকে নেমে আসা কখনও কাম্য নয়।
“ঘাটতি আমাদের শিখন পদ্ধতিতে রয়েছে, অভিভাবকদের রয়েছে, পরিবেশ রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে যে ঘাটতি রয়েছে, সেটাকে আমাদেরকে পুনঃনির্ধারণ করতে হবে এবং এটাকে আমাদের অ্যাড্রেস করতে হবে-এটাই আমাদের দায়িত্ব।”
এ ঘাটতি পূরণের জন্য অভিভাবক এবং শিক্ষকদেরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
খাতা পুরোপুরি পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “খাতা দেখায় স্বচ্ছতার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি এবং অসঙ্গতি পাওয়া গেলেই সেগুলি নিয়ে আপনাদের ছাত্র-ছাত্রীরা তারা রি-এক্সামিন করতে পারে। তখন আগামী দিনে কী হয়েছে, সেটা আমরা বলতে পারব।”
এসএসসি পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষায় ফলাফলে অনেক পরিবর্তন আসার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ১৩ লাখ খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য এসেছিল। এর মধ্যে ৪৫ হাজারের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এবং ৫ হাজার জন ফেল থেকে পাস করেছে। আর ৩ হাজার ৭৯ জন বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
এই পরিবর্তনের কারণ খতিয়ে দেখার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অনেক রেজাল্ট চেঞ্জ হয়েছে, এবার কী অবস্থা হয়। আমাদের শিক্ষকদের, এক্সামিনারদের কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না সেটা আমরা দেখি।
“তো আপাতত আমরা বলতে পারি যে- এই রেজাল্টটি যতটা হয়েছে, যদিও আমরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু রেজাল্টে ত্রুটি আছে কি-না, সেই বিষয়ে আমরা এখনো নির্ধারণ করতে পারিনি। রি-এক্সামিন করার পর বোঝা যাবে।”
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্ধারিত দিন সকালে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা সারতেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার হাতে ফলের প্রতিবেদন তুলে দিতেন বোর্ডের চেয়ারম্যানরা। শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা থাকতেন ওই অনুষ্ঠানে।
সরকারপ্রধান আনুষ্ঠানিকতা সারার পর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ওয়েবসাইট ও মোবাইলে ফল জানার সুযোগ মিলত। এছাড়া শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে সারাদেশের বিস্তারিত ফলাফলের সারসংক্ষেপ তুলে ধরতেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ফল প্রকাশের সেসব আনুষ্ঠানিকতা রাখা হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে।
এবারের ফল
এগারোটি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় অংশ নেয়।
তাদের মধ্যে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন পাস করেছে। সার্বিক পাসের হার ৫২.১২%
নয় সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫১.৬২%, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন।
মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৬১.০৭%, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২৫০ জন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৯.৪৩%, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৮৬ জন।
সার্বিকভাবে ছাত্রদের মধ্যে পাসের হার ৪৭.৭৫%, ছাত্রীদের মধ্যে পাস করেছে ৫৬.৩১%
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০ হাজার ৩৬৩ জন ছাত্র এবং ১৯ হাজার ৭২১ জন ছাত্রী।
ফল মিলবে যেভাবে
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি জানিয়েছে, বোর্ডগুলোর প্রকাশিত ফল সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষার্থীরা https://eduboardresults.gov.bd ও https://educationboardresults.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে ফল সংগ্রহ করতে পারবেন।
প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়েবসাইটের রেজাল্ট কর্নারে ক্লিক করে বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানের ইআইএন দিয়ে ফল ডাউনলোড করতে পারবে। আর পরীক্ষার্থীরা ওয়েবসাইটে গিয়ে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে ফল সংগ্রহ করতে পারবেন।
এছাড়া এসএমএসের মাধ্যমেও ফল জানতে পারবেন পরীক্ষার্থী। এর জন্য HSC লিখে স্পেস দিয়ে নিজ বোর্ডের তিন অক্ষরের নাম, স্পেস দিয়ে রোল নম্বর এবং আবার স্পেস দিয়ে পরীক্ষার বছর লিখতে হবে। এরপর 16140 নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে। যেমন- HSC DHA 123456 2026 লিখে 16140 নম্বরে পাঠাতে হবে।
উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন
পুনর্নিরীক্ষণসহ উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করা যাবে অনলাইনে ১ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত।
এর জন্য ওয়েবসাইটে (https://rescrutiny.eduboardresults.gov.bd) গিয়ে রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর পূরণ ও বোর্ড নির্বাচন করতে হবে। তারপর সাবমিট বাটনে ক্লিক করলে মোবাইল নম্বর চাইবে, যে নম্বরে পুনঃনিরীক্ষণের ফল এসএমএস করা হবে।
পরবর্তী ধাপে শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক ফল দেখা যাবে। এক বা একাধিক বিষয়ে ফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য বিষয় নির্বাচন করে ‘ফি প্রদান করুন’ বাটনে ক্লিক করতে হবে।
প্রতিটি পত্রের জন্য দেড়শ টাকা হারে ফি গুনতে হবে। দ্বিপত্রের বিষয়ের ক্ষেত্রে উভয়পত্রের জন্য আবেদন করতে হবে। বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় ও সোনালী সেবার মাধ্যমে ফি পরিশোধ করা যাবে। ফি পরিশোধ করে আবেদনের পোর্টালে এসে ‘জমা দিন’ বাটনে ক্লিক করতে হবে।
প্রয়োজনে ফি পরিশোধের বিস্তারিত ধাপ পোর্টালের ‘হেল্প’ বাটনে ক্লিক করে দেখে নেওয়া যাবে।