ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৩ মে, ২০২৬, সময় : ১০:১০ এএম

হেলেন ইয়াফে ৩০ বছর ধরে নিয়মিত কিউবায় আসা-যাওয়া করছেন। একবার এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় (ক্যাটাগরি ফোর হারিকেন) যখন দ্বীপরাষ্ট্রটির দিকে ধেয়ে আসছিল, সেই সময়ের স্মৃতি আজও গেঁথে আছে তাঁর মনে। এই শিক্ষাবিদ ও পডকাস্টার তখন একটি বাড়িতে আরও ১৩ জনের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। 


প্রবল ঝড় আঘাত হানলেও সেখানে থাকা মানুষের মধ্যে কোনো আতঙ্ক ছিল না। কারণ, দুর্যোগের সময় কার কী ভূমিকা হবে, তা প্রত্যেকে আগে থেকেই জানতেন। ওই বাড়িতে থাকা কেউ কেউ বয়স্ক ও অসহায় প্রতিবেশীদের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। অন্যরা ঝড়ের বেগ কমার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।


প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কিউবার জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রশংসা পেয়েছে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কাছ থেকে। চরম আবহাওয়ার কবলে ঘনঘন পড়লেও কিউবায় প্রাণহানির সংখ্যা খুব কম। দেশটির এই সক্ষমতা সমাদৃত বিশ্বজুড়ে।


দুর্যোগ মোকাবিলার সেই একই মডেলকে এখন অন্য একটি হুমকির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাইছে হাভানা। তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত।


কিউবার প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য সম্প্রতি আরও তীব্রতর হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কৌঁসুলিরা ৩০ বছর আগের এক ঘটনায় কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোকে অভিযুক্ত করেছেন। এতে দুই দেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে।


১৯৯৬ সালে কিউবার কয়েকটি বিমান দেশটির নির্বাসিতদের দ্বারা পরিচালিত দুটি উড়োজাহাজ ভূপাতিত করেছিল। এতে তিনজন মার্কিন নাগরিকসহ চারজন নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনায় রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্র, হত্যাকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট চারটি ও বিমান ধ্বংস-সংক্রান্ত দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।


উত্তেজনার এই আবহে ১৬ মে কিউবার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ ‘সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষায় পারিবারিক নির্দেশিকা’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলায় পরিবারের দায়িত্ব ও সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা নিয়মাবলি কী হবে, তা বলা হয়েছে।


যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাতিন আমেরিকান রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক ও ‘কিউবা অ্যানালাইসিস’ পডকাস্টের উপস্থাপক ইয়াফে আল-জাজিরাকে বলেন, এই নির্দেশিকা কিউবার প্রতিরক্ষা তত্ত্ব ‘ওয়ার অব অল পিপল’ বা জনযুদ্ধের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।


সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর কিউবা এ নীতি গ্রহণ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো গেরিলা যুদ্ধ, স্থানীয় মিলিশিয়া এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে বিদেশি হামলা প্রতিহত করা।


ইয়াফে বলেন, ‘কিউবার প্রত্যেক নাগরিক সামরিকভাবে প্রশিক্ষিত। তাঁরা এই জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আওতাভুক্ত।’


রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের একটি অংশ। অন্যান্য চাপের মধ্যে রয়েছে গত কয়েক মাস ধরে কিউবার উপকূলে মার্কিন নজরদারি বিমানের টহল বৃদ্ধি, মার্কিন সিনেটে কিউবার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা সীমিত করার ব্যর্থ চেষ্টা এবং কিউবাকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘উল্লেখযোগ্য হুমকি’ ঘোষণা করে নির্বাহী আদেশ জারি।


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিউবার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে সেটি তাঁর আমলেই হবে।


একই দিন রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে অনেক বছর ধরে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাঁর দাবি, কিউবার বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থা রেখে সেটি আর ঠিক করা সম্ভব নয়।


কিউবাকে অন্যায়ভাবে ‘হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করায় রুবিওর তীব্র সমালোচনা করেছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ। 


তিনি বলেন, ‘মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন, যাতে একটি সামরিক আগ্রাসন উসকে দেওয়া যায়। এমন পদক্ষেপ কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র-উভয় দেশের নাগরিকদের রক্তপাতের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’


এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত শিগগিরই কিউবায় সামরিক অভিযান চালাতে যাচ্ছে। কিউবা বর্তমানে কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘ বিদ্যুৎ-বিভ্রাট, মার্কিন অবরোধের কারণে জ্বালানিসংকট এবং ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও কিউবা মোটেও অরক্ষিত নয়।


ভেনেজুয়েলা মডেল ‘কাজ করবে না’ কিউবায়


যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী গত ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে তাঁর দেশ থেকে তুলে নিয়ে যায়। সেই অভিযানের ক্ষিপ্রতা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল।ইয়াফে জানান, সেই লড়াইয়ে নিহতদের মধ্যে ৩২ জন ছিলেন কিউবার নাগরিক, যাঁরা ‘সত্যিই প্রচণ্ড প্রতিরোধ’ গড়ে তুলেছিলেন। খোদ ট্রাম্প এই প্রতিরোধের কথা স্বীকার করেন।


এদিকে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-ক্যানেল ১৮ মে বলেন, কিউবার বিরুদ্ধে যেকোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ একটি ‘রক্তবন্যা’ ডেকে আনবে। অথচ এই দ্বীপরাষ্ট্র কারও জন্য হুমকি নয়।


ইয়াফে বলেন, ‘তাঁরা (যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা) ভেনেজুয়েলা মডেলের কথা বলছেন। প্রশ্ন হলো, তাঁরা কি কিউবাতেও একই মডেল প্রয়োগ করবেন? কিন্তু এটি কিউবায় কাজ করবে না।’


বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘কিউবার নেতা ও জনগণের কথা হলো তাঁরা (মার্কিন কর্মকর্তারা) কী মনে করেন, ওটাই প্রচণ্ড প্রতিরোধ ছিল? সেখানে তো কিউবার নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন মাত্র ৩২ জন। ভাবুন- তাঁরা যদি এখানে আসে, তাহলে এক কোটি মানুষ তাঁদের প্রতিরোধ করবে।’


স্পেনের মাদ্রিদে অবস্থিত এলকানো রয়্যাল ইনস্টিটিউটের আর্জেন্টাইন লাতিন আমেরিকা বিশ্লেষক কার্লোস মালামুদও একমত পোষণ করেন ইয়াফের সঙ্গে। কিউবার চ্যালেঞ্জ ভেনেজুয়েলার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে করেন তিনি।


মালামুদ বলেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবার সেনাবাহিনী অনেক বেশি প্রশিক্ষিত। তাঁদের সরঞ্জামও তুলনামূলকভাবে উন্নত।


তবে ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর কিউবান স্টাডিজের কিউবান-আমেরিকান পরিচালক সেবাস্তিয়ান আরকোস সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। 


তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘কিউবার সামরিক বাহিনী সেকেলে। তাদের মার্কিন বাহিনীকে প্রতিরোধ করার তেমন একটা সামর্থ্য নেই।’


তবে তিনি এটাও মানেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবা বেশি চ্যালেঞ্জিং। এটা যতটা না সামরিক শক্তির কারণে, তার চেয়ে বেশি হলো তারা এই ধরনের অভিযান মোকাবিলায় প্রস্তুতির জন্য দীর্ঘ সময় পেয়েছে।


কিউবার সামরিক সক্ষমতা যা-ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির দূরত্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। মালামুদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছে হওয়ার কারণে কিউবার পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা অনেক বেশি। ভেনেজুয়েলা বা ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।


কিউবায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যে পাল্টা হামলা হবে, তা কোনো কল্পনা নয়, বরং তা বাস্তব হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষক কার্লোস মালামুদ। 


তাঁর ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক জনগণ, মিয়ামিসহ বিভিন্ন শহরে ক্ষয়ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদের অনেক বেশি।’


অন্যদিকে সেবাস্তিয়ান আরকোস বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন জনমতকে খেপিয়ে তুলতে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাতে পারে।


১৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কিউবা ৩০০টি সামরিক ড্রোন সংগ্রহ করেছে। তারা গুয়ান্তানামো বে-র মার্কিন নৌঘাঁটি, নৌযান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপ শহর কী ওয়েস্টে হামলার পরিকল্পনা করছে।


তবে ইয়াফে ও মালামুদ এই গোয়েন্দা তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান। তাঁদের মতে, কিউবা কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতের পক্ষে নয়। অন্যদিকে আরকোস মনে করেন, অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনটি ‘যৌক্তিক’। কারণ, কিউবা সব সময় রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সম্পদের অভাব থাকা সত্ত্বেও দেশটি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।


তবে কিউবা এরই মধ্যে প্রতিবেদনটিকে মার্কিন হামলার অজুহাত তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, যেকোনো ধরনের মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে।


ভিন্নধর্মী অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা


সামরিক হিসাব-নিকাশের বাইরে এমন কিছু রাজনৈতিক বিষয় আছে, যা কিউবায় মার্কিন হামলাকে অনেক বেশি জটিল করে তুলতে পারে।


ইয়াফে বলেন, দ্বীপটিতে হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে অভিবাসনের জোয়ার সৃষ্টি হতে পারে। আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটা ট্রাম্প ও তাঁর দলকে বড় ধরনের চাপে ফেলতে পারে। কারণ, অভিবাসনবিরোধিতা করেই ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন।


মালামুদ বলেন, কিউবা বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভেনেজুয়েলার প্রবাসীদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। মূলত এই দুই পক্ষের মধ্যে কোনো তুলনা চলে না। মার্কিন কংগ্রেসে কিউবা বংশোদ্ভূত রাজনীতিবিদের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবা বংশোদ্ভূত। এসব কারণে কিউবার প্রবাসী জনগণ ভেনেজুয়েলা ধরনের সমাধান মেনে নেবে না।


মালামুদ এ জটিলতা ব্যাখ্যা করে বলেন, ভেনেজুয়েলায় নেতার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু পুরোনো ক্ষমতা কাঠামো রয়ে গেছে। কিউবার নির্বাসিতরা কাস্ত্রো পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া কোনো কিছু মেনে নেবে না।


অন্যদিকে ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু, আমাদের জয় হবেই’-এটা হলো কিউবার বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী চেতনার মূল কথা। তাই যুক্তরাষ্ট্রে অভিযুক্ত রাউল কাস্ত্রোকে অপহরণ করে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, এতে একদিকে কিউবান-আমেরিকান সমর্থকেরা সন্তুষ্ট হবেন না। অন্যদিকে রাউল কাস্ত্রোর অপহরণ কিউবার সরকারকে নমনীয় করার বদলে জেদ বাড়িয়ে দেবে।


চরম অর্থনৈতিক সংকটে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি


উরুগুয়ের ওআরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক মাতিয়াস ব্রাম সতর্ক করে বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার পর কিউবায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটিতে হামলার মতো কোনো ঘটনা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।


ব্রাম আল-জাজিরাকে বলেন, তাঁর ধারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্র কখনো ভেনেজুয়েলায় সরাসরি হামলা চালাবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা হামলা চালিয়েছে এবং মাদুরোকে অপহরণ করেছে। তাই তিনি আগে ট্রাম্পকে গুরুত্ব না দিলেও এখন তাঁকে ভয় পাচ্ছেন।


তাঁর মতে, কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, লাতিন আমেরিকার বামপন্থী সরকারগুলো সেদিকে নিবিড় নজর রাখবে। বিশেষ করে কলম্বিয়া ও মেক্সিকো। কারণ, ট্রাম্প এসব দেশকেও হুমকি দিয়ে রেখেছেন।


এদিকে কিউবার গভীর সংকটের মধ্যেই বুধবার দেশটির সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন রুবিও। তিনি হাভানাকে ১০ কোটি ডলারের খাদ্য ও ওষুধ সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছেন। এটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের আগের প্রস্তাবেরই অংশ। কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।


তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধই যে কিউবার বর্তমান সংকটের মূল কারণ, তা রুবিও স্বীকার করেননি। বরং বিদ্যুৎ, খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতির জন্য তিনি কিউবার নেতৃত্বকেই দায়ী করেছেন।


বিশ্লেষক মালামুদ মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবা এখনো কিছু কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা দেশটির রয়েছে। কিন্তু গভীর মানবিক সংকট শেষ পর্যন্ত সেই সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।


মালামুদ বলেন, কিউবার পরিস্থিতির জটিলতা এখানেই। সংকট এখন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।


এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে কিউবার ওয়ার অব অল পিপল বা জনগণের যুদ্ধ নীতি কি শুধু তাত্ত্বিক ধারণা হয়েই থাকবে, নাকি বাস্তবে রূপ নেবে।


হেলেন ইয়াফে মনে করেন, কিউবা লড়বে। তাঁর ভাষায়, হাভানাজুড়ে এখনো একটি স্লোগানই বেশি শোনা যাচ্ছে-‘নো সে রিন্দে নাদিয়ে’, অর্থাৎ এখানে কেউ আত্মসমর্পণ করে না।




ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১১:১৬ এএম

চীনের তিব্বত অঞ্চলে ৭.০ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ভূগর্ভের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে সৃষ্ট এই ভূমিকম্পটি তিব্বতের নাখু শহরের ১৯০ কিলোমিটার পূর্বে আঘাত হানে বলে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এনডিটিভি নিউজের এক প্রতিবেদনে এক খবর জানানো হয়েছে।


চীন সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) স্থানীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, এই ঘটনায় ৪৬ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ভূমিকম্পের ফলে অন্তত ৩৩৯টি বাড়িঘর ধসে পড়েছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকাজ চালাতে অবিলম্বে তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।


ভূমিকম্পের আঘাত হানার সময় সুপারমার্কেটের শেলফ থেকে জিনিসপত্র পড়ে যাওয়া এবং আতঙ্কিত মানুষকে রেস্তোরাঁ ছেড়ে বাইরে বের হতে দেখা গেছে। এর আগে তিব্বতের এই অঞ্চলে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক ভূমিকম্পে ১২৬ জন নিহত হয়েছিলেন এবং আগস্টে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় এক হাজার চারশরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।


মূল ভূমিকম্পের পর ওই দিনই ভারতের অরুণাচল প্রদেশের পঙ্গিন থেকে উত্তর-উত্তরপশ্চিমে চীন সীমান্তে ৫.২ মাত্রার আরও একটি ভূকম্পন রেকর্ড করেছে ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস)।


সূত্র: এনডিটিভি


চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১০:৪৪ পিএম

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।


চায়না আর্থকোয়েক নেটওয়ার্কস সেন্টার (সিইএনসি) বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে এ ভূমিকম্প হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।


সিইএনসির তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল তিব্বতের উত্তরাঞ্চলের নাগচু এলাকার একটি উচ্চ পার্বত্য কাউন্টিতে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থলের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ভূমির গড় উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ৮৬৪ মিটার।


চীনে ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে জানিয়েছে সিইএনসি। স্থানীয় এলাকায় কম্পনটি স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে। এর আগে ২০১০ সালে প্রতিবেশী ছিংহাই প্রদেশের ইউশু এলাকায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। ওই ঘটনায় অন্তত ২ হাজার ৬৯৮ জন নিহত হন এবং প্রায় ৩০০ জন নিখোঁজ ছিলেন।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৮:৫৫ পিএম

ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তরে তাজরিশ স্কয়ারে মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ব্যতিক্রমী এক শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। ব্যস্ত সড়কের পাশে স্থাপন করা ওই শিল্পকর্মে ট্রাম্পের আদলে এক অভিনেতাকে কারাগারের পেছনে দেখা যায়। বিলবোর্ডের মতো দেখতে শিল্পকর্মটিতে একটি কৃত্রিম কারাগার তৈরি করা হয়েছে। ট্রাম্পের ভূমিকায় অভিনয় করা ওই ব্যক্তি কারাগারের চারপাশে হাঁটেন এবং মাঝেমধ্যে ভেতরে বসেন।


শিল্পকর্মটিতে লেখা রয়েছে, ‘এই দৃশ্য না দেখা একটি অপরাধ।’ এর পাশে থাকা অন্যান্য বার্তায় দক্ষিণ ইরানের সিরকি এলাকায় সেপ্টেম্বরের শুরুতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।


ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, ওই হামলায় দুই নারী ও দুই শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ৬০ জনেরও বেশি মানুষ।


ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কারাগারে বন্দি অবস্থায় দেখিয়ে প্রতীকীভাবে তার প্রতি প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।


আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৮:৪৫ পিএম

আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’-এ ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম। 


উন্নতি সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে দেশটি। সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০ দশমিক ৩৯, যেখানে বৈশ্বিক গড় ০ দশমিক ৫৫। তবে এ বছর আইনের শাসন সূচকে বিশ্বের ১৫তম শীর্ষ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অগ্রগতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে দেশটি।


দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে নেপাল। 


দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে শুধু পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।


আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশও সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ঘানা ৬২তম, কেনিয়া ১০০তম, লাইবেরিয়া ১০৩তম, সিয়েরা লিওন ১১০তম, নাইজেরিয়া ১২০তম এবং জিম্বাবুয়ে ১২২তম স্থানে রয়েছে।


বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। সূচকের শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ।


সূচকে আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে দেশগুলোর আইনের শাসন মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো- সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-বিধানের প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার।


আটটি মানদণ্ডের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-বিধানের প্রয়োগ। বাকি পাঁচটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে।


মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ খাতে ০ দশমিক ৩১ স্কোর নিয়ে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে ১৩৩তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর সবচেয়ে ভালো অবস্থান মুক্ত সরকার মানদণ্ডে। এ খাতে ০ দশমিক ৪২ স্কোর নিয়ে ১২৮তম স্থানে রয়েছে দেশটি।


মোহাম্মদ সাদিক

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৮:০৮ পিএম

আফগানিস্তানে বড় পরিবার এবং সন্তানের সংখ্যা অনেক এমন দম্পতির দেখা পাওয়া সাধারণ ঘটনা। তবে উরুজগান প্রদেশের মোহাম্মদ সাদিকের পরিবার সম্ভবত দেশটির অন্যতম বড় একটি পরিবার। মোহাম্মদ সাদিকের চার স্ত্রীর ঘরে ৫৮টি সন্তান রয়েছে এবং তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের জন্ম হয়েছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। এত বড় পরিবার চালানো তার জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।


তিনি বলেন, তার সমস্ত প্রচেষ্টা প্রতিদিন সন্তানদের খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবারের ছোট সন্তানরাও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। 


এই পরিবারের চার নারীও বছরের পর বছর গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব বহন করে আসছেন। মোহাম্মদ সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের সময় তার চার স্ত্রীর বয়সই খুব অল্প ছিল, ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ছিলেন তারা।


মোহাম্মদ সাদিক হাসতে হাসতে বলেন, কখনও কখনও তিনি তার সব সন্তানের নামও মনে রাখতে পারেন না। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি সন্তানদের গুনে দেখেন, সবাই বাড়িতে আছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য।


উৎসবের' আবহ


মোহাম্মদ সাদিকের মতে, ছোট সন্তানরা যখন তাকে ঘিরে জড়ো হয়, তখন তাদের বাড়ি কোলাহল, হাসি আর ব্যস্ততায় ভরে ওঠে, যেন সেখানে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। তবে এই পরিবারের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে গুরুতর আর্থিক সংকট। দারিদ্র্য কখনও কখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে কিছু সন্তানকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়।


পরিবারটিতে দিনে মাত্র দুইবার রান্না হয়, সকালে এবং সন্ধ্যায়। পরিবারের দুই জন নারী রান্নার দায়িত্ব পালন করেন।


৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি বলেন, আরও সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল "নবীর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো"।


তার এক মেয়ের বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মজার ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, "যে মৌলভি সাহেব বিয়ে পড়িয়েছিলেন, তিনি আমাকে আমার মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুলবশত আমার অন্য এক মেয়ের নাম বলে ফেলি। তখন মৌলভি সাহেব হেসে বললেন, আপনি বাড়ি গিয়ে আবার দেখে আসুন, ভুল নাম বলেছেন কি না।"


'নামটাও মনে থাকে না'


তিনি ব্যাখ্যা করেন, এত বেশি সন্তান থাকার কারণে সবার নাম মনে রাখা তার জন্য প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি অধিকাংশকেই "বাবা" বা "আমার সন্তান" বলে ডাকেন।


মোহাম্মদ সাদিক একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, "এক রাতে আমরা সবাই খাবারের টেবিলের চারপাশে বসেছিলাম। আমি সন্তানদের গোনা শুরু করি এবং দেখি একজন নেই। আমি এটাও জানতাম না যে অনুপস্থিত সন্তানটি ছেলে না মেয়ে। পরে আমি তাদের মায়েদের জিজ্ঞেস করি। তখন একজন জানান, তিনি তার সন্তানকে তার নানির বাড়িতে পাঠিয়েছেন এবং সে রাতটা সেখানে কাটাবে।"


মোহাম্মদ সাদিকের প্রথম বিয়ে হয়েছিল যখন তার বয়স ছিল ২০ বছর। তরুণীদের বিয়ে করার কারণ সম্পর্কে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি বিয়ের জন্য তাকে কয়েক বছর ধরে কনের পরিবারকে দেওয়া অর্থ জমাতে হয়েছে।


এত বড় পরিবার ও সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার স্ত্রীরা খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন। শৈশব ও কৈশোরেই তারা বিয়ে, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান পালনের বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তাদের জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে। মোহাম্মদ সাদিক এবং তার স্ত্রীরা জীবনে আরেকটি বড় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে তারা ১৪ সন্তান হারিয়েছেন, যা যেকোনো বাবা-মায়ের জন্য গভীর বেদনার বিষয়।


স্বাস্থ্য সংকট ও আর্থিক অনটন


বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে বিয়ে এবং গর্ভধারণ মা ও অনাগত শিশু উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। বারবার গর্ভধারণ নারীদের জন্য আরও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ হতে পারে।


আফগানিস্তান এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে, যেখানে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় নারীদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে এখনো বেশি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে, যেখানে মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে, দারিদ্র্যও এই পরিবারের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।


শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে খাবার খান এবং গ্রীষ্মকালে উঠানে খান, কিন্তু মৌলিক সুবিধাগুলোরও তাদের সীমিত প্রাপ্যতা রয়েছে।


যে জায়গায় তারা গোসল করেন, সেটিই কাপড় এবং বাসন ধোয়ার জন্যও ব্যবহৃত হয়। একই স্থান শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।


পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে শুধু মোহাম্মদ সাদিক নন, তার অনেক সন্তানও কাজ করে। কেউ কেউ কাগজ, প্লাস্টিক এবং অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ করে, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় অথবা বিক্রি করে পরিবারের খরচে অবদান রাখা হয়।


সব কষ্ট সত্ত্বেও এই পরিবার প্রতিদিনের চাহিদা মেটানোর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি দিনই নতুন একটি চ্যালেঞ্জ, খাবার, আশ্রয় এবং সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর চ্যালেঞ্জ।


শীতের রাতে কখনও কখনও ছয় বা সাতজন মানুষ একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমান। সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে। জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়।


মোহাম্মদ সাদিকের দুই ইচ্ছে


শীতের রাতে কখনও কখনও ছয় বা সাতজন মানুষ একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমান। সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে।


জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়।


এসব কষ্টের মধ্যেও নিজে পড়াশোনা করতে না পারা মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তিনি তার সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তবে সীমিত আয়ের কারণে তাদের শিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।


মোহাম্মদ সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি বলেন, প্রতি একটি গাড়ি বিক্রির জন্য তিনি মাত্র এক হাজার আফগানি কমিশন পান।


কিন্তু এত বড় পরিবারের চাহিদা তাদের সম্মিলিত আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। তাই মোহাম্মদ সাদিক সরকার, সহায়তা সংস্থা এবং আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান, যাতে তিনি তার সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন।


নিজের ইচ্ছের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তার জীবনে মাত্র দুটি বড় ইচ্ছে রয়েছে।


"আমার প্রথম ইচ্ছা, আমার সন্তানরা শিক্ষা লাভ করুক, ধর্ম এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক। দ্বিতীয়ত, তাদের যেন কখনও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং তাদের পেট যেন ভরা থাকে।"


  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৮:০১ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোতে হুতিদের আক্রমণে অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার।


এর জেরে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।


বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চলমান উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় নিকট ভবিষ্যতেও তেলের দাম চড়া থাকতে পারে।ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৩৫ ডলার বা ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ১১২ দশমিক ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ১৮ মের পর এটিই ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ দাম।


একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৮৩ ডলারে পৌঁছেছে।


পিভিএম অয়েলের বিশ্লেষক তামাস ভার্গা বলেন, ‘ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টাগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে... হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরব ও তার তেল অবকাঠামোতে হুতিদের হামলা নতুন করে চিন্তার কারণ হয়েছে। এসবের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সংঘাতের পূর্ববর্তী মাত্রার চেয়েও বেশি তেল রপ্তানির খবর পুরোপুরি ম্লান হয়ে গেছে।’তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এসব সংঘাত হ্রাসের কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে নিকট ভবিষ্যতে তেলের দাম চড়া থাকবে।’


এদিকে, মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা এক নোটে অনুমান করেছেন, গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে।


মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সৌদি আরবে নিজেদের কূটনৈতিক উপস্থিতি নিয়েও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।


মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন মিশনগুলোর কিছু কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মার্কিন মিশন থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।


এরই মধ্যে বুধবার সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী। হামলার মধ্যে দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে আঘাতের ঘটনায় অন্তত দুজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন।


অন্যদিকে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিকেও বুধবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। তবে এসব বিস্ফোরণের প্রকৃতি ও উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।


এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। নতুন এক বার্তায় সংস্থাটি বলেছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আবারও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।


মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং তেল অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে তেলের দামে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।


সূত্র: রয়টার্স, দ্য স্টার