প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগেই মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের ব্যয় ধরা হয়নি।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া হাজার হাজার মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইতিমধ্যে কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, সামরিক ব্যয়ও তত বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামনে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। অনেকের ধারণা, এই নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ সীমিত করতে চাইতে পারেন, কারণ যুদ্ধটি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
যুদ্ধ কত দিন চলবে সে বিষয়ে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও ভিন্নতা দেখা গেছে। শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন যুদ্ধ প্রায় এক মাস চলতে পারে। পরে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের সরকার পতন এবং পারমাণবিক হুমকি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলতে পারে।
এই যুদ্ধের খরচ শুধু অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জামে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই সাধারণ মার্কিন নাগরিকের জীবনে পড়তে শুরু করেছে। পেট্রলের দাম বেড়েছে, সামনে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে।
কারণ, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটছে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় মর্টগেজ ঋণের সুদ বাড়ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় শেয়ারবাজারেও পতন দেখা যাচ্ছে।
প্যাসিফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ ওয়েইন ওয়াইনগার্ডেন বলেন, যুদ্ধের কারণে পেট্রল, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের দামে চাপ তৈরি হচ্ছে। পরিবহন, প্যাকেজিং ও সার উৎপাদনের খরচ বাড়ার ফলে এই দাম আরও বাড়তে পারে। এতে এমনিতেই উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে বিপাকে থাকা পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এই যুদ্ধ কীভাবে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন খরচে প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার জন্য কয়েকটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবহন ও জ্বালানি
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন হয়। ইরান এই প্রণালির উত্তর দিক নিয়ন্ত্রণ করে। যুদ্ধ শুরুর পর যেকোনো জাহাজ সেখানে প্রবেশ করলে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। একই পথ দিয়ে সার, সার তৈরির কাঁচামাল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও যায়। ফ্রান্সের এসেক বিজনেস স্কুলের অর্থনীতির প্রভাষক হেরন লিম জানান, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, প্লাস্টিক ও রাবার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক কাঁচামালও এই পথ দিয়ে যায়। অন্যদিকে এশিয়া থেকে ওষুধ, পোশাক ও ব্যাটারির মতো পণ্য উল্টো পথে পরিবহন করা হয়।
ইরান নাকি এই পথজুড়ে নৌ মাইন পেতে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এমন কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো মাইন স্থাপন করছিল। যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি কার্যকর সমাধান নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
বিকল্প পথ ব্যবহার করাও সহজ নয়। কারণ, সুয়েজ খালের পথেও নতুন করে হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর কারণে লোহিত সাগর হয়ে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যে জ্বালানির বাজারে দেখা যাচ্ছে। মার্কিন মোটর ক্লাব এএএর তথ্য অনুযায়ী, ১২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের গড় দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ৩ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র এক সপ্তাহেই দাম বেড়েছে প্রায় ৩৫ সেন্ট।
এ ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে শিগগিরই অনেক পরিবারকে বেশি বিদ্যুৎ ও গরমের বিল দিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের কয়েকটি দেশ গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য জ্বালানি সংরক্ষণের পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ৮ মার্চ সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানবে। তাদের ভাষায়, যদি প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলারের বেশি সহ্য করতে পারেন, তবে এই যুদ্ধ চালিয়ে যান।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্যদেশগুলো ইতিমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈশ্বিক বাজারে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, দাম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র তার জরুরি তেল মজুত থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল বাজারে ছাড়বে।
তবে অর্থনীতিবিদ ওয়েইন ওয়াইনগার্ডেনের মতে, এটি অনেকটা সংগীতের খেলায় চেয়ারের অভাবের মতো অবস্থা। খেলোয়াড় বেশি, চেয়ার কম। কৌশলগত তেল মজুত বাজারে ছাড়লে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তাতে বড় পরিবর্তন আসবে না।
কৃষি ও খাদ্য
যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে কৃষি ও খাদ্য খাতেও। মার্কিন ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশনের সভাপতি জিপি ডুভাল এক চিঠিতে ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, সার সরবরাহে বিঘ্ন এবং দাম বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা বড় সমস্যায় পড়তে পারেন। এর ফল হিসেবে বাজারে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাস সার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। আর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বে ইউরিয়া সারের অন্যতম বড় উৎস।
বিশ্বের প্রায় ৪৯ শতাংশ ইউরিয়া রপ্তানি এবং প্রায় ৩০ শতাংশ অ্যামোনিয়া রপ্তানি আসে এই অঞ্চল থেকে। বিশ্বের প্রায় এক–তৃতীয়াংশ ইউরিয়াও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকেই ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। তেল ও গ্যাস পরিশোধনের একটি উপজাত সালফারের প্রায় অর্ধেক সরবরাহও আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। এই সালফার সার উৎপাদন ছাড়াও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
হেরন লিম বলেন, যদি জাহাজে করে বাজারে সার পৌঁছানো না যায়, তাহলে কৃষকেরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন। এতে ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।
বিমান ও পর্যটন
বিমান ভাড়াও বাড়তে শুরু করেছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী স্কট কিরবি সতর্ক করেছেন, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার কারণে বিমান ভাড়া বাড়তে পারে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে।
ক্যাথে প্যাসিফিক ও তাদের বাজেট এয়ারলাইন এইচকে এক্সপ্রেস ইতিমধ্যে জ্বালানি সারচার্জ প্রায় দ্বিগুণ করেছে। হংকং এয়ারলাইনসও একই পদক্ষেপ নিয়েছে।
মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোক জানিয়েছেন, জ্বালানি খরচ কমাতে কিছু ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে এবং খাদ্যসহ জরুরি পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
যুদ্ধের কারণে ভ্রমণপথও বদলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে গিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক রুটে বিমান ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের কিছু রুটে এই মাসে ভাড়া প্রায় ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
প্রযুক্তি
উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতেও প্রভাব পড়ছে। বিশ্বের প্রায় ৮ শতাংশ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন হয় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতার ও বাহরাইনের কয়েকটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। ফলে অ্যালুমিনিয়ামের দাম প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে গাড়ি, নির্মাণ ও বিমানশিল্পের খরচও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের হিলিয়াম উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে হিলিয়াম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চিকিৎসা যন্ত্র, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতেও এর ব্যবহার রয়েছে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আইফোন, ল্যাপটপসহ নানা ইলেকট্রনিক পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উইলিয়াম ফিগুয়েরোয়ার মতে, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই সাধারণ মানুষের পকেটে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পেট্রলের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় মর্টগেজের সুদ বাড়ছে। তেল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকির মুখেও পড়তে পারে।
চীনে বিদেশি কার্গো জাহাজে ভয়াবহ আগুন
চীনের পূর্বাঞ্চলের শিংদাও বন্দরে মেরামতকাজ চলার সময় বিদেশি পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। জাহাজটিতে মোট ৪২ জন ছিলেন।
চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে শিংদাওয়ের একটি শিপইয়ার্ডে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘ওশান মেলোডি’ জাহাজটিতে আগুন লাগে।
আগুন লাগার পর জাহাজটি থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তবে ততক্ষণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০ মিটার বা ৬২৩ ফুট দীর্ঘ জাহাজটি গত ৩১ আগস্ট শিংদাও বন্দরে পৌঁছেছিল। শিংদাও চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরগুলোর একটি।
অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুযায়ী, জাহাজ থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা গেলেও কোনো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়নি।
মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দ্বিতীয় দফা ঝুঁকি বা ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং দুর্ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি জানতে তদন্ত চলছে।
১৩২ বছরের রেকর্ড খরা যুক্তরাষ্ট্রে
এবার তীব্র গরমের মধ্যে পুরো গ্রীষ্মকাল কাটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রবাসী। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল তাপপ্রবাহ। এতে দেখা দিয়েছে খরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) গতকাল বুধবার জানিয়েছে, গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৭৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এ তাপমাত্রা পুরো ২০ শতকের গড়ের চেয়ে ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি।
এর আগে ১৯৩৬ ও ২০২১ সালের গ্রীষ্মকালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। এবারের গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রা সেই রেকর্ডের চেয়েও শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি।
আগস্ট ছিল পশ্চিম ইউরোপেরও সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মের একটি মাস। এবারের গরম সেখানে ২০০৩ সালের প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এনওএএ গত ১৩২ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আবহাওয়ার তথ্য সংরক্ষণ করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এ সময়ের মধ্যে কোনো গ্রীষ্মকালে এবারের মতো এত বেশি তাপমাত্রা দেখা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে গত আগস্ট ছিল সবচেয়ে উষ্ণ মাস। ওই মাসজুড়ে দেশটিতে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৭৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড তাপমাত্রা ক্রমেই বেশি দেখা যাচ্ছে। এনওএএর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পাঁচটি উষ্ণতম গ্রীষ্মের চারটিই ছিল গত পাঁচ বছরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে তাপমাত্রা বৃদ্ধিও সেই বৃহত্তর প্রবণতার অংশ।
১৯৩৬ সালের রেকর্ড তাপমাত্রার সময়ে গ্রেট প্লেইনস অঞ্চলে তীব্র গরম ও খরার সঙ্গে ক্ষতিকর কৃষিপদ্ধতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল।
অন্যদিকে, এবারের গ্রীষ্মকালজুড়ে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি শুষ্ক আবহাওয়া ক্রমেই তীব্রতর হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের প্রায় ৫৯ শতাংশ এলাকা খরার কবলে ছিল। এক মাসের ব্যবধানে দেশটিতে খরাকবলিত এলাকার পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গ্রেট প্লেইনস, মধ্য-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
টেক্সাস ও ওকলাহোমায় গত আগস্টে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩০ শতাংশেরও কম বৃষ্টি হয়েছে। তবে সব জায়গায় পরিস্থিতি একই রকমের শুষ্ক ছিল না। ইন্ডিয়ানা ও ওহাইওর মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গত আগস্টে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। এসব এলাকায় বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের প্রায় দ্বিগুণ।
যুক্তরাষ্ট্রে তাপপ্রবাহের তীব্রতা এখনই কমছে না। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এল নিনো পরিস্থিতি আরও সক্রিয় আর শক্তিশালী হচ্ছে। এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর প্রভাব ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত থাকতে পারে।
ডব্লিউএমওর প্রধান সেলেস্তে সাওলো গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনকার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, এটি আমাদের পর্যবেক্ষণ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে। অর্থাৎ চার দশক ধরে আমরা যে মাত্রা দিয়ে এটি পরিমাপ করে আসছি, এবার আক্ষরিক অর্থেই সেই মাত্রার বাইরে চলে যেতে পারে।’
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বেশি বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। এর মধ্যে এল নিনো পরিস্থিতি বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ডব্লিউএমও সতর্ক করে বলেছে, এখনকার এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যা দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে চলতি সেপ্টেম্বরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে এনওএএ। সংস্থাটি আরও জানায়, দেশটির কয়েকটি অঞ্চলে খরা অব্যাহত থাকতে পারে কিংবা আরও তীব্র হতে পারে।
এনওএএ আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশকিছু অঙ্গরাজ্যে বড় ধরনের দাবানলের ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
আগামী নভেম্বরের শুরুতে অনুষ্ঠাতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ‘অবিলম্বে’ ইরান যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপকালে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে আগ্রহী না হলেও আলোচনা ‘হতে পারে’।
সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তারা কেবল একটি পারমাণবিক অস্ত্র চায়, আর যদি তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকে, তবে পুরো বিশ্ব বিপদে পড়বে। আমরা পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে যাচ্ছি... আরও অনেক বিষয় এখন আলোচনার টেবিলে চলে আসবে, যা তিন মাস আগেও টেবিলে থাকত না।
তেহরানের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, সত্যি বলতে, আমরা এমন কিছু চাইছি না।
তিনি আরও বলেন, আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি; তাদের দেশ বলে এখন খুব সামান্যই বাকি আছে।
হ্যাঁ, একটি আলোচনা হয়ত হতে পারে। আমাদের নির্বাচনের ঠিক পরপরই এই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে।
ইসরায়েলের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতিগুলোর ওপর সম্প্রতি যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন।
সূত্র: আল জাজিরা
ভারতের মাটিতে রাশিয়ার সামরিক বিমান
ভারতের নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রথমবারের মতো তিনটি রুশ সামরিক যুদ্ধবিমান অবতরণ করেছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) টাইমস নাউ-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বিমানগুলো বিমানবন্দরে পৌঁছায়, যার মধ্যে একটি আইএল-৭৬ সামরিক পরিবহন বিমান ছিল।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে রুশ সামরিক কর্মকর্তা ও একটি অগ্রবর্তী দলকে নিয়ে বিমানগুলো ভারতে পৌঁছায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার পর্যন্ত বিমান তিনটি নয়ডা বিমানবন্দরেই অবস্থান করছিল এবং বিমানবন্দর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সার্বিক ব্যবস্থার ওপর কড়া নজর রাখছে।
নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটিই প্রথম কোনো বিদেশি সামরিক বিমানের অবতরণ। এর আগে ভারতে আগত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও সামরিক বিমানের ক্ষেত্রে মূলত দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহৃত হতো। ফলে প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিমানও নয়ডায় নামতে পারে বলে গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে নয়ডা বিমানবন্দরে ভিভিআইপিদের যাতায়াত ঘিরে প্রস্তুতি ও তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
সূত্র: টাইমস নাউ
ছবি : সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পর্ষদ বুধবার ভোট দিয়ে ইরানের পারমাণবিক ‘অমান্যতা’র কারণে বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানে, ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের একটি সংঘাত শুরু করার পর থেকে আইএইএ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশাধিকার পায়নি। ওই সংঘাতে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলাও চালানো হয়েছিল। সবশেষ যুদ্ধেও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়েছে। এই যুদ্ধ ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় এবং আইএইএ বারবার সেখানে প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
প্রস্তাবটির পক্ষে পড়ে ২৩ ভোট আর বিপক্ষে ৩ ভোট। ভোটদানে বিরত থাকে ৮টি দেশ। রাশিয়া, চীন ও নাইজার এর বিপক্ষে ভোট দেয়।
এতে আইএইএ’র মহাপরিচালককে ইরানের বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদ এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘প্রতিবেদন করার’ অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত এই প্রস্তাবটি ইরানের পারমাণবিক প্রতিবেদন সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থতার কারণে ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশটিকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর ঘটনা।
এই পদক্ষেপকে মূলত প্রতীকী হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ ইরানের মিত্র চীন ও রাশিয়ার তেহরানের বিরুদ্ধে যেকোনো নিষেধাজ্ঞায় ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ইরান এই প্রস্তাবের নিন্দা করেছে এবং বলেছে, এটি কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় ইরানের প্রতিনিধি রেজা নাজাফি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ‘এই প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক চাপের অধীনে পাস হয়েছে এবং আমাদের দৃষ্টিতে এর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি এএফপিকেও বলেন যে প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ বিপরীত ফল বয়ে আনবে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারলে দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে ‘ট্রাম্প লভ্যাংশ’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান পার্টির প্রথম মধ্যবর্তী সম্মেলনে তিনি এই প্রস্তাব দেন। তবে এই অর্থ দেওয়ার প্রক্রিয়া বা এর আইনি ভিত্তি কী হবে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৭ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক থাকায় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় ১ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট স্থায়ী প্রাইমটাইম ভাষণে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের মেয়াদের ‘ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ দুই বছর’ শেষ করার দাবি করেন। তিনি নিজের কমতে থাকা জনপ্রিয়তার মধ্যেও নিজেকে নির্বাচনের কেন্দ্রে স্থাপন করেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের কারণে অসন্তুষ্ট ভোটারদের আকর্ষণে তার এই প্রচারণামূলক বক্তব্য কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্র্যাটদের হাতে আমেরিকার ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া হলে দেশকে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পরবর্তী এক দশক সময় লেগে যাবে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই