প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগেই মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের ব্যয় ধরা হয়নি।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া হাজার হাজার মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইতিমধ্যে কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, সামরিক ব্যয়ও তত বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামনে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। অনেকের ধারণা, এই নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ সীমিত করতে চাইতে পারেন, কারণ যুদ্ধটি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
যুদ্ধ কত দিন চলবে সে বিষয়ে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও ভিন্নতা দেখা গেছে। শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন যুদ্ধ প্রায় এক মাস চলতে পারে। পরে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের সরকার পতন এবং পারমাণবিক হুমকি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলতে পারে।
এই যুদ্ধের খরচ শুধু অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জামে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই সাধারণ মার্কিন নাগরিকের জীবনে পড়তে শুরু করেছে। পেট্রলের দাম বেড়েছে, সামনে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে।
কারণ, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটছে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় মর্টগেজ ঋণের সুদ বাড়ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় শেয়ারবাজারেও পতন দেখা যাচ্ছে।
প্যাসিফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ ওয়েইন ওয়াইনগার্ডেন বলেন, যুদ্ধের কারণে পেট্রল, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের দামে চাপ তৈরি হচ্ছে। পরিবহন, প্যাকেজিং ও সার উৎপাদনের খরচ বাড়ার ফলে এই দাম আরও বাড়তে পারে। এতে এমনিতেই উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে বিপাকে থাকা পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এই যুদ্ধ কীভাবে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন খরচে প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার জন্য কয়েকটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবহন ও জ্বালানি
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন হয়। ইরান এই প্রণালির উত্তর দিক নিয়ন্ত্রণ করে। যুদ্ধ শুরুর পর যেকোনো জাহাজ সেখানে প্রবেশ করলে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। একই পথ দিয়ে সার, সার তৈরির কাঁচামাল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও যায়। ফ্রান্সের এসেক বিজনেস স্কুলের অর্থনীতির প্রভাষক হেরন লিম জানান, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, প্লাস্টিক ও রাবার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক কাঁচামালও এই পথ দিয়ে যায়। অন্যদিকে এশিয়া থেকে ওষুধ, পোশাক ও ব্যাটারির মতো পণ্য উল্টো পথে পরিবহন করা হয়।
ইরান নাকি এই পথজুড়ে নৌ মাইন পেতে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এমন কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো মাইন স্থাপন করছিল। যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি কার্যকর সমাধান নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
বিকল্প পথ ব্যবহার করাও সহজ নয়। কারণ, সুয়েজ খালের পথেও নতুন করে হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর কারণে লোহিত সাগর হয়ে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যে জ্বালানির বাজারে দেখা যাচ্ছে। মার্কিন মোটর ক্লাব এএএর তথ্য অনুযায়ী, ১২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের গড় দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ৩ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র এক সপ্তাহেই দাম বেড়েছে প্রায় ৩৫ সেন্ট।
এ ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে শিগগিরই অনেক পরিবারকে বেশি বিদ্যুৎ ও গরমের বিল দিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের কয়েকটি দেশ গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য জ্বালানি সংরক্ষণের পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ৮ মার্চ সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানবে। তাদের ভাষায়, যদি প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলারের বেশি সহ্য করতে পারেন, তবে এই যুদ্ধ চালিয়ে যান।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্যদেশগুলো ইতিমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈশ্বিক বাজারে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, দাম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র তার জরুরি তেল মজুত থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল বাজারে ছাড়বে।
তবে অর্থনীতিবিদ ওয়েইন ওয়াইনগার্ডেনের মতে, এটি অনেকটা সংগীতের খেলায় চেয়ারের অভাবের মতো অবস্থা। খেলোয়াড় বেশি, চেয়ার কম। কৌশলগত তেল মজুত বাজারে ছাড়লে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তাতে বড় পরিবর্তন আসবে না।
কৃষি ও খাদ্য
যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে কৃষি ও খাদ্য খাতেও। মার্কিন ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশনের সভাপতি জিপি ডুভাল এক চিঠিতে ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, সার সরবরাহে বিঘ্ন এবং দাম বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা বড় সমস্যায় পড়তে পারেন। এর ফল হিসেবে বাজারে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাস সার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। আর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বে ইউরিয়া সারের অন্যতম বড় উৎস।
বিশ্বের প্রায় ৪৯ শতাংশ ইউরিয়া রপ্তানি এবং প্রায় ৩০ শতাংশ অ্যামোনিয়া রপ্তানি আসে এই অঞ্চল থেকে। বিশ্বের প্রায় এক–তৃতীয়াংশ ইউরিয়াও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকেই ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। তেল ও গ্যাস পরিশোধনের একটি উপজাত সালফারের প্রায় অর্ধেক সরবরাহও আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। এই সালফার সার উৎপাদন ছাড়াও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
হেরন লিম বলেন, যদি জাহাজে করে বাজারে সার পৌঁছানো না যায়, তাহলে কৃষকেরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন। এতে ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।
বিমান ও পর্যটন
বিমান ভাড়াও বাড়তে শুরু করেছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী স্কট কিরবি সতর্ক করেছেন, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার কারণে বিমান ভাড়া বাড়তে পারে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে।
ক্যাথে প্যাসিফিক ও তাদের বাজেট এয়ারলাইন এইচকে এক্সপ্রেস ইতিমধ্যে জ্বালানি সারচার্জ প্রায় দ্বিগুণ করেছে। হংকং এয়ারলাইনসও একই পদক্ষেপ নিয়েছে।
মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোক জানিয়েছেন, জ্বালানি খরচ কমাতে কিছু ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে এবং খাদ্যসহ জরুরি পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
যুদ্ধের কারণে ভ্রমণপথও বদলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে গিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক রুটে বিমান ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের কিছু রুটে এই মাসে ভাড়া প্রায় ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
প্রযুক্তি
উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতেও প্রভাব পড়ছে। বিশ্বের প্রায় ৮ শতাংশ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন হয় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতার ও বাহরাইনের কয়েকটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। ফলে অ্যালুমিনিয়ামের দাম প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে গাড়ি, নির্মাণ ও বিমানশিল্পের খরচও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের হিলিয়াম উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে হিলিয়াম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চিকিৎসা যন্ত্র, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতেও এর ব্যবহার রয়েছে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আইফোন, ল্যাপটপসহ নানা ইলেকট্রনিক পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উইলিয়াম ফিগুয়েরোয়ার মতে, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই সাধারণ মানুষের পকেটে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পেট্রলের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় মর্টগেজের সুদ বাড়ছে। তেল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকির মুখেও পড়তে পারে।
ভারতের জেন-জি। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই দেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তবয়স্ক প্রজন্মে রূপ নিতে চলেছে জেন জি বা জেনারেশন জেডের তরুণ-তরুণীরা। ফলে আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব উপেক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনাটি এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে যে দেশের তরুণ সমাজকে সরকার এখন আর এড়িয়ে চলতে পারে না। নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলনটি দ্রুত শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে এক বৃহত্তর জাতীয় আলোচনায় রূপ নেয়, যা প্রমাণ করে যে ডিজিটালভাবে সংযুক্ত ভারতীয় যুবসমাজ কত দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
জনসংখ্যার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সি জেন জি প্রজন্মের জনসংখ্যা প্রায় ৩৮ কোটিতে পৌঁছাবে (প্রায় ১৯ কোটি ৯০ লাখ পুরুষ এবং ১৮ কোটি ২০ লাখ নারী)। এর মাধ্যমে তারা মিলেনিয়াল প্রজন্মকে পেছনে ফেলে ভারতের বৃহত্তম প্রাপ্তবয়স্ক প্রজন্মে পরিণত হবে। এই জনমিতিক পরিবর্তনের প্রভাব কেবল সংখ্যার পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; জেন জি প্রজন্ম দেশের বৃহত্তম ছাত্র সমাজ, প্রথমবার ভোটদাতা ভোটার এবং কর্মজীবনের শুরুতে থাকা পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ব করবে। ফলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন ও সুশাসনের মতো ইস্যুগুলো রাজনৈতিক ময়দানে আরও বেশি গুরুত্ব পাবে।
ভারতের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বয়োবৃদ্ধ হওয়ার কারণে সামগ্রিক ভোটারদের মধ্যে তরুণদের অনুপাত কিছুটা কমলেও, জেন জি তাদের বিশাল সংখ্যা, অভূতপূর্ব ডিজিটাল সংযোগ এবং দ্রুত সংঘবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতার কারণে অত্যন্ত প্রভাবশালী এক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। সামগ্রিক জনসংখ্যার রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শিশুদের অনুপাত হ্রাসের পাশাপাশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারত বয়সসীমার দিক থেকে প্রবীণ হওয়ার সাথে সাথে ঐতিহ্যগত জনমিতিক লভ্যাংশ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসায় বর্তমান সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জেন জি এমন একসময়ে প্রাপ্তবয়স্ক শ্রেণীতে পা রাখছে যখন তারা দেশের বৃহত্তম ও রাজনৈতিকভাবে অন্যতম সচেতন প্রজন্মে পরিণত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে একটি সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনবে।
সূত্র: এনডিটিভি।
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ছবি: সংগৃহীত
সরকারের সঙ্গে হওয়া চুক্তি লঙ্ঘন করে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে—এমন গুরুতর অভিযোগ এনে কেন্দ্র সরকারকে ফের কঠোর আন্দোলনের আলটিমেটাম দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
সোমবার (২৭ জুলাই) আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রঙ্কা ও সৌরভ দাস এবং স্বতন্ত্র রাজ্যসভা সাংসদ ও সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিবল উপস্থিত থেকে এই উদ্বেগের কথা জানান।
একই সঙ্গে আন্দোলনের সময়কার ডিজিটাল প্রমাণ সুরক্ষিত রাখতে এবং আইনি সহায়তা দিতে ‘সাক্ষী’ নামের একটি নতুন ওয়েবসাইট ও অ্যাপ উন্মোচন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সৌরভ দাস জানান, ৩৬ দিনব্যাপী আন্দোলন প্রত্যাহারের পরও ভবিষ্যতে সরকার আন্দোলনকারীদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তারা শুরু থেকেই আইনজীবী কপিল সিবলের আইনি পরামর্শ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, অতীতে বড় ধরনের অন্যান্য আন্দোলনেও দেখা গেছে যে আন্দোলনের গতি স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর এককভাবে ব্যক্তিদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়।
সিজেপির নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘সাক্ষী’র মাধ্যমে বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিও ক্রিপ্টোগ্রাফিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তির সাহায্যে টেম্পার-প্রুফ বা পরিবর্তন-রহিত প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করা যাবে, যাতে ফোন বাজেয়াপ্ত বা চ্যাট ডিলিট হওয়ার কারণে কোনো প্রমাণ হারিয়ে না যায়।
এদিকে আশুতোষ রঙ্কা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উদ্দেশে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো দণ্ডমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার যে সরকারি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা পুরোপুরি লঙ্ঘিত হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, দিল্লি ও অন্যান্য রাজ্যে স্বেচ্ছাসেবকদের হয়রানি করা হচ্ছে এবং কেবল বিহার ও পশ্চিমবঙ্গেই শত শত শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রঙ্কা হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এফআইআরগুলো প্রত্যাহার করা না হলে এবং আটককৃতদের মুক্তি না দিলে সিজেপি পুনরায় আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। একই সাথে তিনি আগামীকালের মধ্যে আইনি মামলা সংক্রান্ত লিখিত চুক্তি এবং সরকারের সাথে নির্ধারিত টাইমলাইনগুলো প্রকাশ করার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, এর আগে নিট-ইউজি পরীক্ষার অনিয়ম ও সামগ্রিক সংস্কারের দাবিতে যন্তর মন্তরে ৩৬ দিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল সিজেপি। কেন্দ্রের সাথে আলোচনার পর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর প্রত্যাহার এবং পরীক্ষা সংস্কারের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসে গত ২৫ জুলাই আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
তবে চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ধরপাকড় অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পাটনার এসএসপি কার্তিকেয় কে শর্মা জানিয়েছেন, গত ২৫ জুলাই সহিংসতার ঘটনায় ৮৬ জন বিক্ষোভকারীকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে এবং ৬০ জনকে ব্যক্তিগত মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সিজেপির আইনি দল আটককৃতদের মুক্ত করতে এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে আইনজীবীদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করে যাচ্ছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া।
হামলার পরের চিত্র। ছবি: সংগৃহীত
সৌদির পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোতে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে জানান, সৌদির পূর্বাঞ্চল থেকে ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ও পরিবহনের বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল পয়েন্ট লক্ষ্য করে এই ড্রোনগুলো পরিচালনা করা হয়েছে। ইয়েমেনের আকাশসীমায় সৌদির বারবার লঙ্ঘনের জবাব হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
তবে এই হামলায় কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি। হুথিদের এই দাবির বিষয়ে সৌদির পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে সোমবার ভোরে সৌদি আরব জানায়, দেশটির তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরাকি ভূখণ্ড থেকে ছোড়া বেশ কয়েকটি ড্রোন তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। এর আগে গত সপ্তাহে সৌদি আরবের দিকে সামুদ্রিক যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা দেয় হুথিরা।
সূত্র: আল-জাজিরা।
আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দুই কর্মকর্তার ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ব্রাজিল। আগামী সপ্তাহে সরকারি সফরে ব্রাজিল যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তাদের ভিসা দেওয়া হয়নি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিল সরকারের আশঙ্কা ছিল, ওই দুই মার্কিন কর্মকর্তা আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে সন্দেহ ও বিতর্ক উসকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাইলি এম. বার্নস এবং উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল স্যামসন ২০ জুলাই ভিসার আবেদন করেন। চার দিন পর, ২৪ জুলাই তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। তবে এ সিদ্ধান্তের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভার মুখোমুখি হবেন সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। ফ্লাভিওর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
গত মে মাসের শেষ দিকে ফ্লাভিও বলসোনারো ও তার ভাই এদুয়ার্দো ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্পসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের দুটি বড় মাদক পাচারকারী সংগঠন-ফার্স্ট কমান্ড ক্যাপিটাল ও রেড কমান্ডকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে। সে সময় এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট লুলা।
এরই মধ্যে শুক্রবার থেকে ব্রাজিলের রপ্তানি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওয়াশিংটনের দাবি, ব্রাজিলের কিছু বাণিজ্যনীতি বিদেশি ব্যবসার জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি শ্রম অধিকার লঙ্ঘন ঠেকাতেও দেশটি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে লুলা প্রশাসন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, আসন্ন নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বার্নস ও স্যামসনের ২৭ থেকে ৩০ জুলাই ব্রাসিলিয়া সফরের পরিকল্পনা ছিল। সফরে তারা সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা ও বিভিন্ন মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এটি ছিল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর। কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনকে প্রভাবিত করার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই এবং এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
অন্যদিকে, ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো দীর্ঘদিন ধরে দেশটির ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন, যদিও এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। অভ্যুত্থানচেষ্টার মামলায় বর্তমানে তিনি নিজ বাড়িতে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সম্প্রতি তার ছেলে সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোও একই অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করেছেন। তবে শনিবার সাও পাওলোতে লিবারেল পার্টি তাকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট
ইসরায়েলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ভোটের মাঠে আবির্ভূত হয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচনে ভোট হতে যাচ্ছে। ইসরায়েলের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আইজেনকোটের উত্থান ঘটেছে। তাঁর দলের নাম ইয়াশার। ২০২৫ সালে তিনি এই দল গঠন করেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে হামাস যোদ্ধারা ইসরায়েলে হামলা চলায়। ওই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হওয়া সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছেন, এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগে ভোটাররা তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চ্যানেল ১২-এর সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে আসনসংখ্যার পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে সামান্য ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে আইজেনকোটের নতুন দল ইয়াশার। জরিপ অনুযায়ী, ইয়াশার পেতে পারে ২৩টি আসন, আর লিকুদ পেতে পারে ২২টি।
একই জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৪৩ শতাংশের মতে, ৬৬ বছর বয়সী গাদি আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে উপযুক্ত মনে করেন ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা।
আইজেনকোটও অবশ্য উগ্রবাদী ইসরায়েলি ধ্যানধারণা পোষণ করেন। হামাসের হামলার পর ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে অপ্রাসঙ্গিক বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তিনি লেবাননে ইসরায়েলের অন্যায্য সামরিক কৌশলের অন্যতম প্রবর্তক হিসেবেও পরিচিত। তিনি চান ইসরায়েল শত্রুপক্ষের হামলার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী বা ব্যাপক সামরিক জবাব দেওয়ার নীতি গ্রহণ করুক।
আইজেনকোট ১০ দফা কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা গড়ে তুলেছেন। তাঁর দাবি, এই কর্মসূচি ইসরায়েলের নিরাপত্তা, জাতীয় ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধার করবে।
২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান (চিফ অব স্টাফ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন গাদি আইজেনকোট। তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারের শীর্ষ অঙ্গীকার হলো, ২০২৩ সালে সীমান্ত পার হয়ে হামাসের রক্তক্ষয়ী হামলার বিষয়ে তদন্তের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা। ওই হামলার পরই গাজা যুদ্ধের সূচনা হয়, যা দ্রুত বিস্তৃত হয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়। একই সঙ্গে এই ঘটনার জেরে নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়নে ব্যর্থতার অভিযোগও ওঠে।
এ ধরনের তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে কয়েক দফায় হাজার হাজার ইসরায়েলি বিক্ষোভ করেছেন। তবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার এর পরিবর্তে এমন একটি তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যার সদস্যদের নির্বাচন করবেন রাজনীতিকেরাই।
এ ছাড়া আইজেনকোট ‘নতুন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তানীতি’ প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার লক্ষ্য হবে সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা এবং ইসরায়েলের সীমান্তনিরাপত্তা আরও জোরদার করা। তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
তবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সামগ্রিক প্রশ্নে তাঁর অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট।
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলার পর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যুদ্ধ হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগরের গণ্ডি ছাড়িয়ে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার। এখন পর্যন্ত আলোচনা থেকে কোনো ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তাদের আগের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সংলাপ চলছে। এই হামলা তেহরানের কাছ থেকে আলোচনার টেবিলে সুবিধা পাওয়ার জন্যও চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত শনিবার ইরানের জাহাজে আঘাত হানে ইউক্রেন।
ইরান জানায়, এতে তাদের এক নাবিক নিহত ও আরেকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ইউক্রেনের কূটনীতিকদের তলব করেছে তেহরান।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হামলার তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দূরপাল্লার ওই হামলায় ইরানের সামরিক কার্গো বহনকারী জাহাজ ও রুশ রণতরীতে হামলা চালিয়েছে কিয়েভ। তিনি মস্কোর বিরুদ্ধে ইরানকে সহায়তা অভিযোগও তুলেছেন। এমন একটি সময় এসব ঘটনা ঘটল, যখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা ১৩ দিন হামলার পর ইরানে আঘাত হানা বন্ধ করেছে।
ইরান বর্তমানে দক্ষিণ উপকূল নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে নৌযান চলাচলে বাধা দিচ্ছে। কাস্পিয়ান সাগরে যুদ্ধ গড়ালে ইরানের ওপর চাপ বাড়বে। তারা সেখান দিয়ে নৌযান পার করতে পারবে না। এতে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে ইরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিপ্রধান কাজা কাল্লাসের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, আরাঘচি এই আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছেন এবং তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মহলকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কখনও প্রত্যক্ষভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ায়নি।
ইরান এর আগে জানিয়েছে, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগীদের ওপর হামলা করবে তারা। সেই সময় যুক্তরাজ্যকে উদ্দেশ্য করে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তেহরান। যুক্তরাজ্য শুরু থেকে এ সংঘাতে প্রত্যক্ষভাবে না জড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণ চালাতে নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল। সেটি নিয়েই ক্ষুব্ধ হয় ইরান। পরে জবাবে যুক্তরাজ্য জানায়, তাদের বাহিনী প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুত সব সময়।
যেখানে মিল দুই যুদ্ধের
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর ইউক্রেনকে অস্ত্র ও রসদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের যেসব উদ্যোগ অতীতে দেখা গেছে, সেগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে, ইরানের দিকে অতীতে বেশ কয়েক দফায় ইউক্রেন অভিযোগ তুলেছে, তারা শাহেদ ড্রোন দিয়ে রাশিয়াকে সহায়তা করছে। ইরান যুদ্ধের প্রথম দফায় ইউক্রেন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে ইরানের ড্রোন ঠেকানোর প্রযুক্তি দিতে পারবে বলেও জানিয়েছিল।
ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। অন্যতম বড় মিলটি হলো, দুই পরাশক্তি নিজের তুলনায় কম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে আটকে গেছে। ইউক্রেনের ইরানের জাহাজে হামলা চালানোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কিনা, তা এখনও অস্পষ্ট। তবে দুই যুদ্ধ পরিস্থিতিই যে এটির মধ্যে দিয়ে আরও ঘনীভূত হতে পারে, সে আশঙ্কা তীব্র।
ইউক্রেন এখন কী বলছে
জেলেনস্কি সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, কাস্পিয়ান সাগরে দূরপাল্লার হামলা চালিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় ফল পেয়েছে ইউক্রেন। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, ‘জুলাইয়ের শুরু থেকে আমরা উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও সেখানে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনায় রাশিয়ার স্যাটেলাইটের সক্রিয় নজরদারির বিষয়টি লক্ষ্য করেছি। ওই ছবিগুলো পরে ইরানে পৌঁছেছে।’
জেলেনস্কি আরও জানান, রাশিয়ার স্যাটেলাইটগুলো ১৯ ও ২০ জুলাই চারটি বিমানঘাঁটিতে নজরদারি চালায়। এর মধ্যে দুটি বাহরাইনে, একটি জর্ডানে ও একটি কুয়েতে অবস্থিত। তিনি বলেন, ‘রাশিয়াকে অবশ্যই থামাতে হবে। এই যুদ্ধ থামাতে হবে। আগ্রাসীর ওপর চাপ অবশ্যই কাজ করবে।
সংলাপ যে পর্যায়ে রয়েছে
জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত মাইক ওয়াল্টজ গতকাল রোববার জানিয়েছেন, ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে হামলা থামিয়েছেন কূটনীতিকে সুযোগ করে দিতে। তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কী ধরনের আলোচনা চলছে, সে বিষয়ে কিছু জানাননি তিনি। টানা দুই রাত যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা না চালানোর পর ওই মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাঘায়ি গতকাল জানান, সংঘাতের সম্প্রসারণ ঠেকাতে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চলছে। তিনিও এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য দেননি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কাতার, মিসর, পাকিস্তান ও অন্যান্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটন ও তেহরানকে ১০ দিন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। মূলত দেশ দুটি যাতে গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনায় বসার সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেই এটি করা হয়েছে।
এদিকে, ওমানের সঙ্গেও আলোচনা চলছে ইরানের। ইসমায়েল বাঘায়ি গতকাল জানান, ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল-সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে। কীভাবে দুই দেশ নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে নৌযান চলাচলের বিষয়টিকে সামাল দেবে, তা নিয়ে আলাপ হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, সে বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে এসেছে।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র চায় না হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকুক। অন্যদিকে, ইরান হরমুজে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে সার্বভৌমত্বের অংশ বলে মনে করে। দ্বিতীয় দফায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এই নিয়ন্ত্রণকে ঘিরেই শুরু হয়েছিল।
ইরানের অবকাঠামো ঠিক করার নির্দেশ
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ হওয়ার পরপরই দেশের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোগুলো ঠিক করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব অবকাঠামোর মধ্যে রেলপথ, আন্তর্জাতিক পারাপার করিডোর রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান যোগাযোগ পথ ঠিক করা কৌশলগত অগ্রাধিকার বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।