ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ মরক্কোর উপকূলীয় শহর ইমসোয়ানের একটি সার্ফশপে (সার্ফিংয়ের সরঞ্জাম বিক্রির দোকান) কাজ করেন ২৬ বছর বয়সী হামজা (ছদ্মনাম)। দোকানে বসে মুঠোফোনে ইনস্টাগ্রাম দেখছিলেন তিনি। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল শৈশবের বন্ধুদের ছবি।
গত সেপ্টেম্বরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাছের ইউরোপের দেশ স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। দোকানের বাইরে তখন সার্ফিং শেষে ফিরছিলেন ক্লান্ত পর্যটকেরা। পাশেই বিলাসবহুল একটি বুটিক হোটেল, যার বেশির ভাগ অতিথিই তরুণ ইউরোপীয় সার্ফার।
হামজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘স্পেনে যেতে গিয়ে আমার শৈশবের বন্ধুরা মারা যেতে পারত। তারপরও তাঁদের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়াটা সার্থক মনে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যেসব ছেলের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি, তাঁদের অনেকেই দারিদ্র্যের এক অন্তহীন চক্রে আটকে পড়েছেন। যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।’
সেপ্টেম্বরে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশের আশায় মরক্কোর প্রায় চার হাজার তরুণ এবং সাবসাহারা আফ্রিকার কয়েকজন অভিবাসী সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওই ঘটনার কথাই বলছিলেন হামজা। ইউরোপে ভালো জীবনের স্বপ্নে যাত্রা করা ওই মানুষের ভিড়ে ছিলেন তাঁর শৈশবের ছয় বন্ধুও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেউতায় প্রবেশের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ার পর এই তরুণেরা ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে স্পেনের ওই স্বায়ত্তশাসিত শহরের সীমান্তসংলগ্ন জনপদ বেলিউনেশে পৌঁছান।
উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতা ও মেলিইয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র আফ্রিকান স্থলসীমান্ত। উন্নত জীবনের আশায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা সেখানে প্রায়ই দেখা যায়।
মরক্কো কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশটির বিভিন্ন শহর থেকে আসা তিন হাজার মানুষ সীমান্তের বেড়া টপকে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করার সময় আটক হন। এ উদ্যোগের আয়োজনে জড়িত থাকার সন্দেহে প্রায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকজন আলজেরীয় কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে মরক্কো। তবে আলজেরিয়ার সংবাদমাধ্যম সে অভিযোগ অস্বীকার করে।
ঘটনার সময় মরক্কোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যদিও কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে মরক্কোর ঐতিহাসিক শহর তেতোয়ানের সরকারি কৌঁসুলি ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।
‘মরক্কোতে জীবন যেন বৃথা’
সীমান্ত থেকে যাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই শত শত মানুষের বিপরীতে হামজার বন্ধুরা ছিলেন সেউতায় পৌঁছাতে সক্ষম হওয়া হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে।
হামজা বলেন, ‘আমার বন্ধুরা এখন কেমন আছে, আমি জানি না। তারা খুব একটা কিছু বলে না। সম্ভবত কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার ভয়ে।’
এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন হামজার শৈশবের বন্ধুরা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হামজার নিজ শহর এল জাদিদা থেকে ১৭ তরুণ স্পেনে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হন। আটলান্টিক উপকূলের এ বন্দরনগরী কাসাব্লাঙ্কার কাছাকাছি। ওই সময় তাঁরা নৌকায় করে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছান।
মুঠোফোনে সেই বন্ধুদের একজনের পাঠানো একটি বার্তা দেখান হামজা। বর্তমানে তিনি আইবেরীয় উপদ্বীপে বসবাস করছেন। হামজা বলেন, ‘ইনস্টাগ্রামে এটিই তার সর্বশেষ পোস্ট। দেখে মনে হচ্ছে সে যেন ছুটি কাটাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, স্পেনে তার জীবন মোটেও সহজ নয়।’
ভিডিওতে দেখা যায়, হামজার সেই বন্ধু-যিনি একজন ফুটবলার-সমুদ্রসৈকতের কাছের একটি রৌদ্রোজ্জ্বল উন্মুক্ত চত্বরে বসে পানীয় পান করছেন। পেছনে বাজছে প্রাণবন্ত সংগীত।
হামজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ওর প্রতিভা আছে। স্পেনে সুযোগ পাওয়ার আশায় আছে। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এখন পর্যন্ত সব ক্লাবই তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।’
হোটেলের সার্ফিং পরিবেশের সঙ্গে মানানসই পোশাক পরা হামজা সেউতায় আটকে পড়া তাঁর ছয় বন্ধুর ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশ্র অনুভূতির কথা জানান।
ভালো বেতন, শিক্ষিত মা–বাবা এবং ভূতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকার কারণে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার কথা হামজা কখনো ভাবেননি। তবে তাঁর বন্ধুরা কেন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা তিনি বুঝতে পারেন।
হামজা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দেখে ইউরোপের মানুষের জীবন কেমন। তাদের কারও কারও মনে হয়, মরক্কোতে থেকে তারা শুধু জীবনটাই নষ্ট করছে। হয়তো এটাই তাদের জন্য নতুন একটি সুযোগ।’
টিকটক–ইনস্টাগ্রামে ইউরোপ–যাত্রার স্বপ্ন ভাগাভাগি
সেউতার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভাইরাল প্রবণতার কথাও উঠে আসে হামজার সঙ্গে আলাপে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বহু তরুণ নিজেদের ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন ও যাত্রার গল্প ভাগাভাগি করছিলেন।
এসব পোস্টে প্রায়ই ব্যবহার করা হতো ‘হাররাগা’ শব্দটি। উত্তর আফ্রিকার কথ্য আরবি থেকে আসা এ শব্দের অর্থ হলো পরিচয় গোপন রাখতে অবৈধভাবে অভিবাসনের আগে নিজের পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলা মানুষ।
মরক্কোর অভিবাসনবিষয়ক পরামর্শক ও গবেষক আলী জুবেইদি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘অভিবাসীদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা ছড়াতে শুরু করল, তখন আমি ভেবেছিলাম, এটি মজা। পরে বুঝলাম, বিষয়টি সত্যি।’
আলী জুবেইদির মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছিল, তা ২০২১ সালের গণ–অভিবাসনের চেষ্টার তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। ২০২১ সালে আট হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ সীমান্তের দেয়াল টপকে, কেউ আবার মরক্কোর সৈকত থেকে সাঁতরে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
ওই সময় পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মাদ্রিদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে মরক্কো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে সীমান্তে যেতে দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিল স্পেন।
কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের চিত্র ছিল ভিন্ন। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিজেরাই সংগঠিত হয়েছিলেন মরক্কোর তরুণেরা। এ ক্ষেত্রে মানব পাচারকারী বা দালালদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
এর আগে সীমান্ত পার হওয়ার বেশির ভাগ চেষ্টাই করতেন সাবসাহারা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টাকারীদের বড় অংশই ছিলেন মরক্কোর নাগরিক। জুবেইদির ভাষ্য, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিচিতিও ছিল ভিন্ন।
জুবেইদি বলেন, ‘সাধারণত যাঁরা অবৈধভাবে অভিবাসনের চেষ্টা করেন, তাঁরা মরক্কোর তরুণ, দীর্ঘদিন রাস্তায় থাকছেন, কাজ নেই, পরিবারের সহায়তা পান না—এমন সব ব্যক্তি। কিন্তু সেপ্টেম্বরে আমরা এমন অনেককে দেখেছি, যাঁদের চাকরিবাকরি আছে ও মাসে ৪–৫ হাজার দিরহাম (প্রায় ৪৫০ মার্কিন ডলার) আয়ও করেন।’
জুবেইদির মতে, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ ছিল হতাশা ও অসন্তোষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি ও বাস্তবতায় বিপুল ফারাক
হামজার জন্মশহরের বাসিন্দাদের কাছে নিজ দেশ মরক্কো ছেড়ে বিদেশে যাওয়া এক বড় স্বপ্ন। এর পেছনেও রয়েছে একই কারণ। হামজা বলেন, এখানকার তরুণদের আলোচনার মূল বিষয়ই বিদেশে যাওয়া।
ফোনে আরও কিছু পোস্ট দেখান হামজা। সেখানে সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পারা মানুষদের অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্পেনে ঢোকার জন্য মানব পাচারকারীদের অর্থ দিতে বছরের পর বছর কাজ করেছেন।
এ সময় কথোপকথনে যোগ দেন হামজার এক বন্ধু। তিনি বলেন, ‘আমি এমন মানুষকে চিনি, যাঁরা মরক্কো থেকে সেউতার সাত কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অনুশীলন করেছেন।’
ইউরোপে যেতে সফল হওয়া ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয়। সেখানে ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে তোলা সেলফির পাশাপাশি দেখা যায় পার্টির নানা ভিডিও।
তবে হামজা জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সেই জীবনের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। তিনি বলেন, দেখলে মনে হয়, সবাই জীবনের সেরা সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা তো তাঁদের রাস্তায় ঘুমানোর ছবিগুলো পোস্ট করেন না।
সেউতা সীমান্তের কোল ঘেঁষে থাকা এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশের তরুণদের কাছে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নটা একেবারে হাতের নাগালের বিষয় ছিল। মরক্কোর তাঞ্জার-তেতোয়ান অঞ্চলে বসবাসকারী বাসিন্দাদের এক বড় অংশই এভাবে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির পর সীমান্ত–বাণিজ্য ও সীমান্ত পেরিয়ে কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে স্পেনের সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন।
অস্থায়ী হিসেবে শুরু হওয়া এসব বিধিনিষেধ পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও মরক্কোর মধ্যে হওয়া বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়। ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে অভিবাসন ঠেকানো এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বিনিময়ে মরক্কোকে ৫০ কোটি ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রাসেলস।
মরক্কোর সঙ্গে এ সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরূপ চুক্তিগুলো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরণার্থীদের ইউরোপে পৌঁছানো ঠেকাতে ইইউ জেনেশুনেই মরক্কোসহ তৃতীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
২০২২ সালের জুনে স্পেনের মেলিইয়া শহরের সীমান্তে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাকে এসব নীতির ক্ষতিকর প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে উত্তেজনার জেরে ওই ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন নিহত হন।
এসব নীতির মানবিক মূল্য সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে ফেনিদেকে। আগে প্রতিদিন হাজারো মরক্কোর বাসিন্দা কাজের জন্য সেউতায় যাতায়াত করতেন। সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাটিতে বেকারত্ব বেড়ে যায়। গত পাঁচ বছরে ফেনিদেকের মানুষের আয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
‘সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম’
এমদিক–ফেনিদেক প্রদেশেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ১৭ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী বুশরা আবজাইউর মতে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর তৈরি হওয়া হতাশা মানুষকে ইউরোপে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে।
মিডল ইস্ট আইকে এই স্কুলছাত্রী বলেন, ‘মরক্কোতে তরুণদের পরিস্থিতি খুব কঠিন। আমার আশপাশে যাদের দেখি, প্রায় সবাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।’
বুশরার ভাই ২০২১ সালের গণ–অভিবাসনের সময় মরক্কো ছেড়েছিলেন। চার বছর পরও স্পেনে টিকে থাকার সংগ্রাম করছিলেন তিনি। বহুবার তাঁকে রাস্তায় রাত কাটাতে হয়েছে। তারপরও তাঁর তথাকথিত ‘সফলতার গল্প’ অনুপ্রাণিত করেছে বুশরার এক চাচাতো ভাইকে, যিনি গত সেপ্টেম্বরে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেন।
এখন সেউতার একটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ১৭ বছর বয়সী ইব্রাহিম (ছদ্মনাম) জানায়, সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আহ্বান দেখে বা কোনো পরিকল্পনা করে সীমান্ত পার হয়নি। সে বলেন, ‘আমি ফেনিদেকের বাসিন্দা। সীমান্তে প্রতিদিন কী হয়, আমি নিজের চোখেই দেখি। আলাদা করে আর কিছু জানার দরকার হয় না।’
ইব্রাহিমের ভাষায়, ‘মরক্কো ভেঙে পড়েছে। দারিদ্র্যই আমাকে সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করেছে।’
ইব্রাহিম যেদিন সেউতার উদ্দেশে সাঁতরে রওনা দেয়, সেদিন স্পেন–মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন আকাশ ছিল মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন। সাত কিলোমিটারের সেই যাত্রার কথা স্মরণ করে সে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, জীবনে এমন সুযোগ আর না–ও আসতে পারে।’ সে আরও বলে, ‘আমার কাছে সাঁতারের কোনো সরঞ্জাম ছিল না। পথও চিনতাম না। তবু সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম।’
ইব্রাহিম ভাগ্যবান ছিল। কিন্তু গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহরের উপকূলের কাছে তাঁদের মরদেহ ভাসতে দেখা যায়।
ওই সময় অনেকে আবার মরক্কো পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পরে বাসে করে তাঁদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেউতাভিত্তিক স্প্যানিশ বেসরকারি সংস্থা ‘নো নেম কিচেন’– এর মুখপাত্র ফ্রানচেসকা ফুসারো মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানান।
ফুসারো বলেন, তরুণেরা যাতে আবার সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা না করেন, সে জন্য মরক্কো কর্তৃপক্ষ নিয়মিতই এ পদ্ধতি অনুসরণ করে।
ইব্রাহিমের ভাষায়, সমুদ্রে কাটানো সেই কয়েক ঘণ্টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। বলে, ‘আমার মনে হচ্ছিল, জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো মারা যাব। তখন ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম, প্রিয়জনদের কথা ভাবছিলাম। বিশেষ করে বারবার মনে পড়ছিল মায়ের কথা।’
এদিকে সেউতায় গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ২৪ ঘণ্টায় অর্ধলাখের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেন। স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পার হতে গিয়ে এ সময় অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সীমান্তের স্পেন অংশে উদ্ধার করা হয় ৫৭ জনের মরদেহ। মরক্কোর দিকেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
সর্বব্যাপী ‘দমন-পীড়ন’
মরক্কোর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক খালিদ মুনার মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছে, তা শুধু উন্নত জীবনের খোঁজে তরুণদের দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ নয়। বলেন, ‘এটি একধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তরুণেরা অভিবাসনকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মরক্কোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।’
খালিদ মুনা বলেন, দমন-পীড়নের মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তরুণদের জন্য শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। তাঁর ভাষায়, জনপরিসরে দমন-পীড়ন সব সময়ই রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণদের একত্র হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরেই মরক্কোতে মানবাধিকার দমনের অভিযোগ তুলে আসছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার অধিকারের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে হাইপ্রোফাইলের মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের কারাবন্দী করা এবং হয়রানির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের ঘটনাও রয়েছে।
মুনা ও জুবেইদির মতে, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের দুর্বল অবস্থাও তরুণ মরক্কোবাসীদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মরক্কোর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ (প্রায় ২৫ লাখ) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। অর্থাৎ শুধু আয়ের অভাব নয়, শিক্ষা, মৌলিক অবকাঠামো, সেবাসহ নানা ক্ষেত্রেই তাঁরা বঞ্চিত।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আরও ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েন। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে।
বুশরার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপ সম্পর্কে যে অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। তিনি বলেন, স্পেনে পৌঁছাতে পেরেছে-এমন মানুষের গল্প আর অভিবাসনে উৎসাহ জোগানো অসংখ্য গান তরুণদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
বুশরা বলেন, ‘মরক্কোর তরুণদের মধ্যে বারবার এমন চিন্তা ফিরে আসছে-এ নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন।’
এদিকে দক্ষিণ মরক্কোর সমুদ্রসৈকতে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন হামজা। চলতি বছর তিনি ইউরোপে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করবেন। তবে তিনি জানেন, পরিবারের সমর্থন না থাকায় তাঁর বন্ধুদের সে সুযোগ নেই।
আরও একবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের খোঁজ করেন হামজা। ইউরোপে কষ্টে দিন কাটালেও লজ্জায় তাঁরা পরিবারের সদস্য ও পরিচিত ব্যক্তিদের সামনে সুখী জীবনের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। হামজা জানেন, তাঁদের কেউ কেউ রাতে রাস্তায় ঘুমান। কিন্তু স্বজনদের চোখে তাঁরা যেন পূরণ করে ফেলেছেন ‘ইউরোপ-যাত্রার স্বপ্ন’।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
একই দিনে একের পর এক ধাক্কা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে এরকম শুক্রবার আগে এসেছে কিনা সন্দেহ। আগেই ভেঙে খান খান হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। এবার পশ্চিমবঙ্গের দুই বিধানসভা উপ-নির্বাচনের আগে খোয়ালেন দলীয় নাম ও প্রতীক।
অন্যদিকে, নমিনেশন জমা দেওয়ার সময় সীমা শেষ হওয়ার পর নন্দীগ্রামের মত হেভিওয়েট আসন থেকে নমিনেশন তুলে নিলেন মমতার প্রার্থী। আবার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তড়িঘড়ি করে কংগ্রেসকে সমর্থন জানালেন মমতা। এক ঘণ্টার মধ্যে খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হলো নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থীকে।
দলের নতুন নাম
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের নতুন নাম হলো ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’। তাদের প্রতীক ‘ফুটবলার’। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের নাম হলো ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’। প্রতীক হলো ‘খাম’। পশ্চিমবঙ্গের দুই বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনের আগে প্রতীক যুদ্ধে ইতি টেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের এমনই অন্তর্বর্তী নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের উপনির্বাচনে মমতা ও ঋতব্রত শিবিরের প্রার্থীদের এই প্রতীক এবং এই দলের নামেই নির্বাচনে লড়াই করতে হবে। আজ শুক্রবার দুপুরে বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
বিধানসভা উপনির্বাচনের লড়াই করার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের বিবাদমান দুই গোষ্ঠীই নতুন দলের নাম ও প্রতীকের জন্য নিজেদের পছন্দের তালিকা নির্ধারিত সময় আজ শুক্রবার সকাল ১১টার মধ্যে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। সূত্রের খবর, এর আগে গতকাল দিবাগত রাত ১২টার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী দলের নাম ও প্রতীকের জন্য তিনটি করে বিকল্প জমা দেয়। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী আজ শুক্রবার সকালে তাদের পছন্দের তালিকা পাঠায়।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া তৃণমূল কংগ্রেসে দলের নাম ও নাম প্রতীকের দখল নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ভারতের নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে গড়া দল ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং দলের ‘জোড়াফুল’ প্রতীক আপাতত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে দুই গোষ্ঠীই ওই নাম বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।
এদিকে, আগামী ৬ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের দুই বিধানসভার উপনির্বাচন। যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক চেয়ে আবেদন করেছে দুই পক্ষের চারজন প্রার্থী। এমন অবস্থায় নির্বাচন কমিশনে দুই পক্ষের শুনানি চলমান অবস্থায় থাকায় সাক্ষ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারছিল না কমিশন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক স্থগিত করে। আজ শুক্রবার সকাল ১১টা ছিল নতুন নাম ও প্রতীক কমিশনে জমা করার জন্য শেষ সময়।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনে কালীঘাটের পক্ষ থেকে যে তিনটি নাম পাঠানো হয়েছিল সেগুলো হলো- ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’, ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস মমতা’ ও ‘তৃণমূল মমতা কংগ্রেস’।
প্রতীক চাওয়া হয়েছিল খেলারত ফুটবল খেলোয়াড় (কমিশনের তালিকায় ৬৫ নম্বর), আর একটি ক্রিকেট ব্যাট (তালিকায় ৮ নম্বর)।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিকল্প হিসেবে দলের তিনটি নাম ও প্রতীক পাঠিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির। তারা দলের নাম চেয়েছে ‘ন্যাশনালিস্ট তৃণমূল কংগ্রেস’, ‘ওয়েস্টবেঙ্গল তৃণমূল কংগ্রেস’ও ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’—এই তিন নামের কোনো একটি। পাশাপাশি আবেদন জানানো হয়েছিল খাম, টর্চ ও ব্ল্যাকবোর্ড প্রতীকের জন্য। দুই তরফেই নতুন নাম ও প্রতীকের আবেদনে সাড়া পাওয়ার পরও আজ শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কমিশন।
২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর দলীয় বিবাদের জেরে প্রথমবার দলীয় নাম ও প্রতীক ছাড়াই নির্বাচনী ময়দানে নামতে চলেছে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠী।
দলীয় প্রতীক খাম নিয়ে অভিযোগ
এদিকে ঋতব্রতপন্থি ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’কে নির্বাচন কমিশন প্রতীক চিহ্ন হিসেবে খাম অনুমোদন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে আইএসএফ (ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট)। আইএসএফ’র প্রতীকও খাম, নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়েছেন আইএসএফ প্রার্থী। কী হবে আইএসএফ প্রার্থীর প্রতীক ভবিষ্যৎ?— এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হাতছাড়া হতে পারে পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী ও বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) অত্যন্ত পরিচিত প্রতীক ‘খাম’।
মনোনয়নপর্ব শেষ হওয়ার পর প্রার্থী প্রত্যাহার মমতার
দলের নাম প্রতীক খাওয়ানোর পর আবারও চূড়ান্ত ধাক্কা খেলেন মমতা। যে বিধানসভা উপনির্বাচনে লড়াই করার জন্য নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী নাম ও প্রতীক নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; সেই নির্বাচন থেকেই সরে দাঁড়ালেন মমতার প্রার্থী।
পশ্চিমবঙ্গের হাইভোল্টেজ কেন্দ্র শুভেন্দুর ছেড়ে আসা নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের উপনির্বাচনের লড়াই থেকেই সরে দাঁড়ালেন মমতা সর্বভারতীয় তৃণুমল কংগ্রেসের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে। এমন সময় সঞ্চিতা প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছেন; যখন মনোনয়নপর্ব শেষ হয়ে গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করে ‘আশীর্বাদ’ চেয়েছিলেন তিনি। ময়দানের পূর্ত দপ্তরের ছাউনিতে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির ভোট পরিচালক শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন সঞ্চিতা। সঙ্গে ছিলেন তার স্বামী সত্যজিৎ প্রধানও। এরপরেই তীব্র কল্পনা-জল্পনা শুরু হয়।
যদিও সঞ্চিতা সে সময় বলেছিলেন, ‘শুভেন্দু নন্দীগ্রামের পুরোনো বিধায়ক এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তাই তার কাছে এসে দেখা করেছেন। কিন্তু আজ শুক্রবার বিকেলে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। ফলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসে’র আর কোনো প্রার্থী থাকলো না।
নন্দীগ্রাম আসনে কালীঘাট শিবিরের প্রার্থী হিসেবে গত ১৩ সেপ্টেম্বর সঞ্চিতার নাম ঘোষণা হয়েছিল। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরও এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে মহম্মদ এতেশামুল হককে। ফলে একই দলের দুই গোষ্ঠীর দুই প্রার্থীকে ঘিরে নন্দীগ্রামের লড়াই এমনিতেই আলাদা মাত্রা পেয়েছিল। তবে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ শুক্রবার বিকেলে যেভাবে ভোটের লড়াই থেকে মমতার প্রার্থী নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ালেন; তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে ৷
প্রসঙ্গত, নন্দীগ্রামে বিজেপি ইতিমধ্যেই প্রার্থী করেছে হাসিরানি রথকে। তিনি প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা। চন্দ্রনাথ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ফলে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রচারে আবেগের একটি মাত্রাও যুক্ত হয়েছে। আপাতত ৬ অক্টোবরের ভোটকে সামনে রেখে প্রচার শুরু করেছে সব দল।
কংগ্রেসকে সমর্থনের বার্তা মমতার
মমতার নিজের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর কালীঘাটের বাড়িতে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘নন্দীগ্রামে আমরা লড়ব না, সিস্টার পার্টি কংগ্রেসকে সমর্থন করছি। তাতে ইন্ডিয়া জোটকে শক্তিশালী করা হবে।’ অর্থাৎ, আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করছে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। রেজিনগর কেন্দ্রের উপনির্বাচনে কি লড়বেন মমতা? নাকি সেখানেও অন্য কাউকে সমর্থন দেবেন? তা নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানালেন পশ্চিমবঙ্গের এই নেত্রী।
কংগ্রেস প্রার্থীকে গ্রেপ্তার
এদিকে মমতা কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন জানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে। নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনে বিধানসভার কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন মিলন প্রধান। দাবি করেছিলেন, সম্প্রতি প্রচার কাজ শুরু করবেন। সূত্রের খবর, আজ দুপুর থেকে অনেকক্ষণ ধরেই তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীকালে জেলা পুলিশ জানিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগামীকাল শনিবার হলদিয়া মহকুমা আদালতে তোলা হবে। পুরোনো একটি খুনের মামলায় তার নামে ওয়ারেন্ট ছিল—এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে কলকাতা পুলিশ।
দিনভর ঘটনাপ্রবাহ প্রসঙ্গে যা বললেন মমতা, ঋতব্রত, শুভেন্দু ও অধীর
এদিকে দলের নাম এবং প্রতীক হারানোর পর সংবাদ সম্মেলন করে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙুল তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার স্পষ্ট অভিযোগ, উপনির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়ে দিয়েছিল, প্রত্যাহারের সময়সীমার একদিন আগে এইভাবে দলীয় নাম আর প্রতীক স্থগিত করে দেওয়া বেআইনি। মমতার সাফ কথা, ‘'আজ গণতন্ত্রের কালো অধ্যায়। অগণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যদিও এটা অন্তর্বর্তী নির্দেশ, তবুও আমরা মাথা নত করব না।’
মমতার প্রশ্ন— ‘২৮ বছরের দলের প্রতীক এভাবে কীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া যেতে পারে? দলের অ্যাকাউন্টও ফ্রিজ করে দিয়েছে। এখানে অনেক বেনামি রাজনৈতিক দল আছে, তাদের প্রতীক তো নিচ্ছে না। তৃণমূল নেত্রী পরিষ্কার জানিয়েছেন, ‘প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আমরা একদম তৃণমূল থেকেই দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন করি। আমাদের সব সাংগঠনিক নির্বাচন আমরা করেছি। তার রেকর্ড আছে, কমিশনকেও সব রেকর্ড দেওয়া আছে। তাও এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এটা ঠিক নয়।’ কমিশনকে নিশানা করে তার বক্তব্য, মধ্যরাতে গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিধানসভায় সংবাদ সম্মেলন করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন আমাদের তৃতীয় বিকল্প নামটি দিয়েছে। প্রতীকে প্রথম চয়েস খাম চেয়েছিলাম। সেটা পেয়েছি। নির্বাচন কমিশনের যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। অন্যপক্ষ যে নাম পেয়েছে সেখানে ব্যক্তি গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছি। রাজনীতিতে মালিকানা হয় না। জোড়াফুল থেকে ফুটবল; এটা ওনারাই বলতে পারবে। যুবভারতীর সামনে থেকে গলাকাটা ফুটবলটা সরে গেছে বলে হয়তো ওনারা ফুটবল দিয়েছে।’
পুরো ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমার আর এই নিয়ে বলার কিছু নেই। এটা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত। নির্বাচন কমিশন নিয়ম মেনে সব পক্ষের কথা শুনে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উনি নিজের দলকে এক রাখতে পারেননি, দুই, তিন, চার ভাগ হয়েছে দল। এর দায়-দায়িত্ব ওনার। এর সঙ্গে আমাদের বিজেপির সরাসরি রোল নেই। তবে আমি একটা কথা বলি, নির্বাচনের গণনার দিন হলদিয়ায় বলেছিলাম। আর যেই থাকুক, এনারা থাকবেন না। তার কারণ, অতি দর্পে হত লঙ্কা। দম্ভ যার হবে সেই দম্ভে সে চূর্ণ হবে। কারণ, হিন্দু ধর্মকে গন্ধা ধর্ম বলা। মহা কুম্ভকে মৃত্যু কুম্ভ বলা হয়। রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার দিনে রাম মন্দির মানি না বলে মিছিল করা। ভগবান পুরুষোত্তম মহারাজ রামচন্দ্রের অভিশাপে সব ধ্বংস হয়ে গেছে।’
মিলন প্রধানের গ্রেপ্তার নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার করার অর্থ, কংগ্রেস প্রার্থীকে ভয় পাচ্ছে বিজেপি। গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে বিজেপি প্রমাণ করে দিল, তারা নৈতিকভাবে পরাজিত।’
ছবি : সংগৃহীত
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের কোহাটে মসজিদের কাছে বোমা হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের সময় পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে এ হামলা হয়। খবর আলজাজিরার।
কোহাটের জেলা সদর হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার পর হাসপাতালে ১৬টি মরদেহ এবং ৫০ জনের বেশি আহত ব্যক্তিকে নেওয়া হয়েছে। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশপ্রধান জুলফিকার হামিদ জানান, বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি পুরোনো পুলিশ লাইনসের ফটকে ধাক্কা দেওয়ার পর বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে গোলাগুলিও শুরু হয়।
পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের বন্দুকযুদ্ধের সময় স্পেশাল ব্রাঞ্চ ভবনের কাছেও আরেকটি আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানান তিনি।
আইজি হামিদ বলেন, পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এখন পর্যন্ত তিন হামলাকারী নিহত হয়েছেন। তবে হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বীকার করেনি।
পুলিশপ্রধান বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশ ‘লোহার দেয়ালের মতো’ দাঁড়িয়ে আছে। এ ধরনের হামলা পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভেঙে দিতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, নিহতদের রক্ত বৃথা যাবে না। হামলাকারী ও তাদের সহযোগীদের এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।
এদিকে বিস্ফোরণে মসজিদের বাইরের অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি দেয়ালও ধসে পড়েছে। ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চলছে। হামলার পর কোহাট-হাঙ্গু সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আহতদের চিকিৎসায় কোহাটের জেলা সদর হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে অন্তত ২৫ জন আহতকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় পুলিশ কার্যালয় জানিয়েছে, কোহাটের আঞ্চলিক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে ঘটনার প্রতিবেদন চেয়েছেন আইজি হামিদ। বিস্ফোরণের ধরন ও হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
জুমার নামাজের সময় পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে এ হামলার ঘটনায় কোহাটজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সূত্র : আলজাজিরা ও জিউ নিউজ
ছবি : সংগৃহীত
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লাগাম টানতে তেহরানের কাছে সহায়তা চেয়েছে চীন। সৌদি আরব গত এক সপ্তাহে ইরান–সমর্থিত এই গোষ্ঠীর সামরিক অগ্রযাত্রার পর বেইজিংয়ের কাছে সাহায্য চেয়েছিল। এরপরই চীন একান্তে তেহরানের কাছে এ অনুরোধ জানায়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি ইরানি সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, লোহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সহায়তার জন্য চীনের দ্বারস্থ হয় রিয়াদ।
চীন প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ ও নৌপথে নিরাপদ চলাচল ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে তেহরানকে একান্তে দেওয়া বার্তায় এর চেয়ে আরও বেশি কিছু বলা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বেইজিং চায় না জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ুক। এ কারণে হুতিদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে তেহরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চীন।
আলোচনার বিষয়ে অবহিত সূত্রগুলো পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছে। তবে বার্তাটি ঠিক কীভাবে তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য দেয়নি। গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির চীন সফরের সময় বার্তাটি দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনের এই বার্তার জবাবে তেহরান বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ না হলে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরবে না।
তিনটি ইরানি সূত্র জানায়, চীনা কর্মকর্তারা তেহরানকে সরাসরি কোনো হুমকি দেননি। হুতিদের ওপর প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ হলে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দেওয়া হবে, এমন কোনো ইঙ্গিতও বেইজিং দেয়নি।
এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চীন চায় না আঞ্চলিক উত্তেজনা ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে আরও ছড়িয়ে পড়ুক। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বেড়ে গেলে তাতে কোনো পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা হবে না।
মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান জানাতে হবে। মানুষের জীবন–জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, এমন পদক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে আলোচনা–সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিয়েছে দেশটি।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পায়নি রয়টার্স।
বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি
এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতাও চীন।
পণ্যবাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। এর পরিমাণ ছিল দিনে গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
এ বিষয়ে অঞ্চলটিতে দায়িত্বরত এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, হুতিদের লাগাম টানতে ইরানের ওপর চাপ দিতে পারে, বিশ্বে এমন দেশের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে এই হাতে গোনা দেশগুলোর মধ্যে চীন অন্যতম।
সৌদি আরবের সুন্নি প্রভাবের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনে হুতি গোষ্ঠীটির উত্থান ঘটে। ইরানি সূত্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর মতে, হুতিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ দিয়ে থাকে ইরান। হুতিরা বর্তমানে তেহরানের পশ্চিমা ও ইসরায়েলবিরোধী ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে হুতিদের যেকোনো হুমকি সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে তা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়বে।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরের জাহাজ বা বন্দরে হুতিদের অব্যাহত হামলা মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান তেল রপ্তানি পথকে একই সময়ে ব্যাহত করতে পারে। এতে জ্বালানিসংকট আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিস্তৃত সংঘাতে নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
একটি সূত্র বলেছে, ইরান ও তার মিত্ররা এখন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের দুই প্রান্তেই চাপ সৃষ্টি করছে। আর চীন দুটি নৌপথের ওপরই নির্ভরশীল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, বেইজিং হয়তো ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের চাপের বিরোধিতা করবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের স্বার্থ ইরানের বাইরেও বিস্তৃত। চীনের তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে এ অঞ্চল থেকে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার।
ভাতানকা বলেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু একপর্যায়ে এ সক্ষমতা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা ইরান যে শক্তির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করছে, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
চীনের দোটানা
তিনটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, বেইজিংয়ের উদ্বেগের বিষয়ে তেহরান কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্রগুলো বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে থাকা ইরানের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। দেশটির তেলশিল্প টিকিয়ে রাখতে, অর্থনৈতিক চাপ কমাতে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা থাকা হাতে গোনা কয়েকটি দেশের একটি চীন।
বেইজিং তার কূটনৈতিক প্রভাবও দেখিয়েছে। বহু বছরের বৈরিতার পর ২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতা করেছিল চীন।
তবে সে প্রভাবেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২১ সালে চীন ও ইরান ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি সই করে। এরপর তেলবহির্ভূত খাতে চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ইরানের ভেতরে সমালোচনা হয়েছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির তুলনায় ইরানে এ বাণিজ্য–বিনিয়োগের পরিমাণ কম।
চীন এমন একটি পক্ষ, যাকে তেহরান উপেক্ষা করতে পারে না। তবে দুটি ইরানি সূত্র বলেছে, তেহরানের কাছে বেইজিংয়ের স্বার্থ অনেকগুলো বিবেচনার মধ্যে একটি মাত্র। ইরানের সিদ্ধান্ত কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।
পশ্চিমা সেই কূটনীতিক বলেন, তেহরান ও বেইজিংয়ের একে অপরকে প্রয়োজন। চীন এমন একটি পক্ষ, যাকে তেহরান উপেক্ষা করতে পারে না। আর বেইজিং চায়, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হোক, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিরাপদ থাকুক।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন তার দাবির সঙ্গে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের ওপর নিজের প্রভাব খাটাতে চীন সত্যিই প্রস্তুত, এর প্রমাণ পাওয়া গেলে বেইজিংয়ের দৃঢ় অবস্থানের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলবে।
ছবি : সংগৃহীত
দিল্লিতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মরদেহ খোলা মাঠে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চারজনের বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের মধ্যে তিনজনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। কয়েক দিন পর পচে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারের সময় তার শরীরের কিছু অংশ কুকুরে খেয়ে ফেলেছিল। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও রাতভর অভিযানের পর চার সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, দিল্লিতে ১৭ বছর বয়সী ওই চারজনে ধর্ষণ করে। পরে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। পরে মরদেহ একটি খোলা মাঠে ফেলে দেওয়া হয়। সেখানে মরদেহের কিছু অংশ কুকুরে খেয়েও ফেলে। পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণ ও হত্যার কয়েক দিন পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর পচে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারের পর ভয়াবহ এই ঘটনা সামনে আসে।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ এতটাই পচে গিয়েছিল যে, প্রথমে সেটি নারী নাকি পুরুষের, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই কিশোরী ও অভিযুক্তরা পরস্পরের পরিচিত ছিল। ঘটনার সময় সে তাদের সঙ্গে একটি টেম্পোতে করে যাচ্ছিল। অভিযোগ, টেম্পোর ভেতর তারা একসঙ্গে মদ পান করে। এরপর কিশোরীকে যৌন নির্যাতন করা হয় এবং ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, ১৩ সেপ্টেম্বর মধ্য দিল্লির কুশাক রোডে জয়পাল রানার মাঠের কাছে কিশোরীর পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহের কিছু অংশও কুকুরে খেয়ে ফেলেছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার একটি হাত মরদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়।
কিশোরীর পরিবার তার নিখোঁজ হওয়ার কোনো অভিযোগ করেনি। পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের সদস্যরা তাদের বলেন, ওই কিশোরী প্রায়ই বাড়ি থেকে বের হয়ে কয়েক দিন পর আবার ফিরে আসত।
এ ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং শিশু নির্যাতন আইন পকসোর প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি এবং শুরুতে অভিযুক্তদের পরিচয়ও জানা ছিল না। এ কারণে পুলিশ দল ওই এলাকা ও আশপাশের রুটের ৫০ টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে।
ফুটেজ বিশ্লেষণের সময় ঘটনার সম্ভাব্য সময়ের কাছাকাছি একটি টেম্পোকে ঘটনাস্থলের আশপাশ দিয়ে যেতে দেখা যায়। অন্ধকারের কারণে টেম্পোটির নম্বর স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। এরপর তদন্তকারীরা একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ অনুসরণ করে টেম্পোটির চলাচলের গতিপথ শনাক্ত করার চেষ্টা করেন।
গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে রাতভর অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন টেম্পোটির সন্ধান পাওয়া যায়। এর চালককে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর তদন্তে ওই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে চারজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্তের নাম শিবম ওরফে সুদামা ওরফে চুচু। সে খাড্ডা কলোনির বাসিন্দা। তিন অপ্রাপ্তবয়স্কের বয়স ১৬ ও ১৭ বছর। অভিযোগ অনুযায়ী, অপরাধে ব্যবহৃত দুটি ছুরি, অভিযুক্তদের পরা পোশাক এবং টেম্পোটি উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পুরো ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে, আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ করতে এবং ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ যাচাই করতে তদন্ত চলছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি এবং কয়েক জন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাকে ভিসা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্ক সিটিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু হতে চলেছে। অনুষ্ঠিতব্য সেই অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও প্রতিনিধি দলের যোগদান নিশ্চিত করতেই এই ভিসা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে এএফপিকে ওই মুখপাত্র বলেছেন, “আয়োজক দেশ হিসেবে আমাদের বাধ্যবাধকতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে, ইরানি সরকারের মূল প্রতিনিধিদল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে পারবে।”
তবে সাধারণ পরিষদের সম্মেলন উপলক্ষে আগত অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিদের তুলনায় ইরানি প্রতিনিধি দলকে কিছু অতিরিক্ত বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই মুখপাত্র বলেছেন, “কেবল একটি সীমিত আকারের প্রতিনিধিদলকেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে এবং আমাদের নীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর কঠোর ভ্রমণ বিধিনিষেধ ও বিলাসবহুল পণ্য ক্রয় বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা তাদের মেনে চলতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের অচলাবস্থার মধ্যেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এ অধিবেশনে যোগ দিতে ভিসার আবেদন করেছিলেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসও; কিন্তু তাকে ভিসা দেয়নি মার্কিন প্রশাসন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট যদি তার বক্তব্যের ভিডিও পাঠান, তাহলে তা প্রচার করা হবে অধিবেশনে।
সূত্র : এএফপি
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধে সেনা পাঠাবে না দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বা কোনো সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়া সেনা পাঠিয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যাতে দেশটি সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট লি আরও বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো নিরাপদ রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পদক্ষেপ নেবে।
তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে দেশটির ভেতরে জনমত ও প্রতিবাদ বাড়ছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক মোতায়েনের বিরোধিতা করে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভও হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে নিজেদের জাহাজ ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে।