ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ মরক্কোর উপকূলীয় শহর ইমসোয়ানের একটি সার্ফশপে (সার্ফিংয়ের সরঞ্জাম বিক্রির দোকান) কাজ করেন ২৬ বছর বয়সী হামজা (ছদ্মনাম)। দোকানে বসে মুঠোফোনে ইনস্টাগ্রাম দেখছিলেন তিনি। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল শৈশবের বন্ধুদের ছবি।
গত সেপ্টেম্বরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাছের ইউরোপের দেশ স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। দোকানের বাইরে তখন সার্ফিং শেষে ফিরছিলেন ক্লান্ত পর্যটকেরা। পাশেই বিলাসবহুল একটি বুটিক হোটেল, যার বেশির ভাগ অতিথিই তরুণ ইউরোপীয় সার্ফার।
হামজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘স্পেনে যেতে গিয়ে আমার শৈশবের বন্ধুরা মারা যেতে পারত। তারপরও তাঁদের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়াটা সার্থক মনে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যেসব ছেলের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি, তাঁদের অনেকেই দারিদ্র্যের এক অন্তহীন চক্রে আটকে পড়েছেন। যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।’
সেপ্টেম্বরে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশের আশায় মরক্কোর প্রায় চার হাজার তরুণ এবং সাবসাহারা আফ্রিকার কয়েকজন অভিবাসী সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওই ঘটনার কথাই বলছিলেন হামজা। ইউরোপে ভালো জীবনের স্বপ্নে যাত্রা করা ওই মানুষের ভিড়ে ছিলেন তাঁর শৈশবের ছয় বন্ধুও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেউতায় প্রবেশের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ার পর এই তরুণেরা ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে স্পেনের ওই স্বায়ত্তশাসিত শহরের সীমান্তসংলগ্ন জনপদ বেলিউনেশে পৌঁছান।
উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতা ও মেলিইয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র আফ্রিকান স্থলসীমান্ত। উন্নত জীবনের আশায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা সেখানে প্রায়ই দেখা যায়।
মরক্কো কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশটির বিভিন্ন শহর থেকে আসা তিন হাজার মানুষ সীমান্তের বেড়া টপকে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করার সময় আটক হন। এ উদ্যোগের আয়োজনে জড়িত থাকার সন্দেহে প্রায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকজন আলজেরীয় কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে মরক্কো। তবে আলজেরিয়ার সংবাদমাধ্যম সে অভিযোগ অস্বীকার করে।
ঘটনার সময় মরক্কোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যদিও কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে মরক্কোর ঐতিহাসিক শহর তেতোয়ানের সরকারি কৌঁসুলি ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।
‘মরক্কোতে জীবন যেন বৃথা’
সীমান্ত থেকে যাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই শত শত মানুষের বিপরীতে হামজার বন্ধুরা ছিলেন সেউতায় পৌঁছাতে সক্ষম হওয়া হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে।
হামজা বলেন, ‘আমার বন্ধুরা এখন কেমন আছে, আমি জানি না। তারা খুব একটা কিছু বলে না। সম্ভবত কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার ভয়ে।’
এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন হামজার শৈশবের বন্ধুরা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হামজার নিজ শহর এল জাদিদা থেকে ১৭ তরুণ স্পেনে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হন। আটলান্টিক উপকূলের এ বন্দরনগরী কাসাব্লাঙ্কার কাছাকাছি। ওই সময় তাঁরা নৌকায় করে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছান।
মুঠোফোনে সেই বন্ধুদের একজনের পাঠানো একটি বার্তা দেখান হামজা। বর্তমানে তিনি আইবেরীয় উপদ্বীপে বসবাস করছেন। হামজা বলেন, ‘ইনস্টাগ্রামে এটিই তার সর্বশেষ পোস্ট। দেখে মনে হচ্ছে সে যেন ছুটি কাটাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, স্পেনে তার জীবন মোটেও সহজ নয়।’
ভিডিওতে দেখা যায়, হামজার সেই বন্ধু-যিনি একজন ফুটবলার-সমুদ্রসৈকতের কাছের একটি রৌদ্রোজ্জ্বল উন্মুক্ত চত্বরে বসে পানীয় পান করছেন। পেছনে বাজছে প্রাণবন্ত সংগীত।
হামজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ওর প্রতিভা আছে। স্পেনে সুযোগ পাওয়ার আশায় আছে। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এখন পর্যন্ত সব ক্লাবই তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।’
হোটেলের সার্ফিং পরিবেশের সঙ্গে মানানসই পোশাক পরা হামজা সেউতায় আটকে পড়া তাঁর ছয় বন্ধুর ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশ্র অনুভূতির কথা জানান।
ভালো বেতন, শিক্ষিত মা–বাবা এবং ভূতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকার কারণে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার কথা হামজা কখনো ভাবেননি। তবে তাঁর বন্ধুরা কেন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা তিনি বুঝতে পারেন।
হামজা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দেখে ইউরোপের মানুষের জীবন কেমন। তাদের কারও কারও মনে হয়, মরক্কোতে থেকে তারা শুধু জীবনটাই নষ্ট করছে। হয়তো এটাই তাদের জন্য নতুন একটি সুযোগ।’
টিকটক–ইনস্টাগ্রামে ইউরোপ–যাত্রার স্বপ্ন ভাগাভাগি
সেউতার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভাইরাল প্রবণতার কথাও উঠে আসে হামজার সঙ্গে আলাপে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বহু তরুণ নিজেদের ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন ও যাত্রার গল্প ভাগাভাগি করছিলেন।
এসব পোস্টে প্রায়ই ব্যবহার করা হতো ‘হাররাগা’ শব্দটি। উত্তর আফ্রিকার কথ্য আরবি থেকে আসা এ শব্দের অর্থ হলো পরিচয় গোপন রাখতে অবৈধভাবে অভিবাসনের আগে নিজের পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলা মানুষ।
মরক্কোর অভিবাসনবিষয়ক পরামর্শক ও গবেষক আলী জুবেইদি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘অভিবাসীদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা ছড়াতে শুরু করল, তখন আমি ভেবেছিলাম, এটি মজা। পরে বুঝলাম, বিষয়টি সত্যি।’
আলী জুবেইদির মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছিল, তা ২০২১ সালের গণ–অভিবাসনের চেষ্টার তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। ২০২১ সালে আট হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ সীমান্তের দেয়াল টপকে, কেউ আবার মরক্কোর সৈকত থেকে সাঁতরে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
ওই সময় পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মাদ্রিদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে মরক্কো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে সীমান্তে যেতে দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিল স্পেন।
কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের চিত্র ছিল ভিন্ন। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিজেরাই সংগঠিত হয়েছিলেন মরক্কোর তরুণেরা। এ ক্ষেত্রে মানব পাচারকারী বা দালালদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
এর আগে সীমান্ত পার হওয়ার বেশির ভাগ চেষ্টাই করতেন সাবসাহারা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টাকারীদের বড় অংশই ছিলেন মরক্কোর নাগরিক। জুবেইদির ভাষ্য, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিচিতিও ছিল ভিন্ন।
জুবেইদি বলেন, ‘সাধারণত যাঁরা অবৈধভাবে অভিবাসনের চেষ্টা করেন, তাঁরা মরক্কোর তরুণ, দীর্ঘদিন রাস্তায় থাকছেন, কাজ নেই, পরিবারের সহায়তা পান না—এমন সব ব্যক্তি। কিন্তু সেপ্টেম্বরে আমরা এমন অনেককে দেখেছি, যাঁদের চাকরিবাকরি আছে ও মাসে ৪–৫ হাজার দিরহাম (প্রায় ৪৫০ মার্কিন ডলার) আয়ও করেন।’
জুবেইদির মতে, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ ছিল হতাশা ও অসন্তোষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি ও বাস্তবতায় বিপুল ফারাক
হামজার জন্মশহরের বাসিন্দাদের কাছে নিজ দেশ মরক্কো ছেড়ে বিদেশে যাওয়া এক বড় স্বপ্ন। এর পেছনেও রয়েছে একই কারণ। হামজা বলেন, এখানকার তরুণদের আলোচনার মূল বিষয়ই বিদেশে যাওয়া।
ফোনে আরও কিছু পোস্ট দেখান হামজা। সেখানে সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পারা মানুষদের অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্পেনে ঢোকার জন্য মানব পাচারকারীদের অর্থ দিতে বছরের পর বছর কাজ করেছেন।
এ সময় কথোপকথনে যোগ দেন হামজার এক বন্ধু। তিনি বলেন, ‘আমি এমন মানুষকে চিনি, যাঁরা মরক্কো থেকে সেউতার সাত কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অনুশীলন করেছেন।’
ইউরোপে যেতে সফল হওয়া ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয়। সেখানে ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে তোলা সেলফির পাশাপাশি দেখা যায় পার্টির নানা ভিডিও।
তবে হামজা জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সেই জীবনের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। তিনি বলেন, দেখলে মনে হয়, সবাই জীবনের সেরা সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা তো তাঁদের রাস্তায় ঘুমানোর ছবিগুলো পোস্ট করেন না।
সেউতা সীমান্তের কোল ঘেঁষে থাকা এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশের তরুণদের কাছে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নটা একেবারে হাতের নাগালের বিষয় ছিল। মরক্কোর তাঞ্জার-তেতোয়ান অঞ্চলে বসবাসকারী বাসিন্দাদের এক বড় অংশই এভাবে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির পর সীমান্ত–বাণিজ্য ও সীমান্ত পেরিয়ে কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে স্পেনের সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন।
অস্থায়ী হিসেবে শুরু হওয়া এসব বিধিনিষেধ পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও মরক্কোর মধ্যে হওয়া বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়। ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে অভিবাসন ঠেকানো এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বিনিময়ে মরক্কোকে ৫০ কোটি ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রাসেলস।
মরক্কোর সঙ্গে এ সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরূপ চুক্তিগুলো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরণার্থীদের ইউরোপে পৌঁছানো ঠেকাতে ইইউ জেনেশুনেই মরক্কোসহ তৃতীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
২০২২ সালের জুনে স্পেনের মেলিইয়া শহরের সীমান্তে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাকে এসব নীতির ক্ষতিকর প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে উত্তেজনার জেরে ওই ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন নিহত হন।
এসব নীতির মানবিক মূল্য সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে ফেনিদেকে। আগে প্রতিদিন হাজারো মরক্কোর বাসিন্দা কাজের জন্য সেউতায় যাতায়াত করতেন। সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাটিতে বেকারত্ব বেড়ে যায়। গত পাঁচ বছরে ফেনিদেকের মানুষের আয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
‘সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম’
এমদিক–ফেনিদেক প্রদেশেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ১৭ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী বুশরা আবজাইউর মতে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর তৈরি হওয়া হতাশা মানুষকে ইউরোপে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে।
মিডল ইস্ট আইকে এই স্কুলছাত্রী বলেন, ‘মরক্কোতে তরুণদের পরিস্থিতি খুব কঠিন। আমার আশপাশে যাদের দেখি, প্রায় সবাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।’
বুশরার ভাই ২০২১ সালের গণ–অভিবাসনের সময় মরক্কো ছেড়েছিলেন। চার বছর পরও স্পেনে টিকে থাকার সংগ্রাম করছিলেন তিনি। বহুবার তাঁকে রাস্তায় রাত কাটাতে হয়েছে। তারপরও তাঁর তথাকথিত ‘সফলতার গল্প’ অনুপ্রাণিত করেছে বুশরার এক চাচাতো ভাইকে, যিনি গত সেপ্টেম্বরে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেন।
এখন সেউতার একটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ১৭ বছর বয়সী ইব্রাহিম (ছদ্মনাম) জানায়, সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আহ্বান দেখে বা কোনো পরিকল্পনা করে সীমান্ত পার হয়নি। সে বলেন, ‘আমি ফেনিদেকের বাসিন্দা। সীমান্তে প্রতিদিন কী হয়, আমি নিজের চোখেই দেখি। আলাদা করে আর কিছু জানার দরকার হয় না।’
ইব্রাহিমের ভাষায়, ‘মরক্কো ভেঙে পড়েছে। দারিদ্র্যই আমাকে সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করেছে।’
ইব্রাহিম যেদিন সেউতার উদ্দেশে সাঁতরে রওনা দেয়, সেদিন স্পেন–মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন আকাশ ছিল মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন। সাত কিলোমিটারের সেই যাত্রার কথা স্মরণ করে সে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, জীবনে এমন সুযোগ আর না–ও আসতে পারে।’ সে আরও বলে, ‘আমার কাছে সাঁতারের কোনো সরঞ্জাম ছিল না। পথও চিনতাম না। তবু সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম।’
ইব্রাহিম ভাগ্যবান ছিল। কিন্তু গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহরের উপকূলের কাছে তাঁদের মরদেহ ভাসতে দেখা যায়।
ওই সময় অনেকে আবার মরক্কো পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পরে বাসে করে তাঁদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেউতাভিত্তিক স্প্যানিশ বেসরকারি সংস্থা ‘নো নেম কিচেন’– এর মুখপাত্র ফ্রানচেসকা ফুসারো মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানান।
ফুসারো বলেন, তরুণেরা যাতে আবার সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা না করেন, সে জন্য মরক্কো কর্তৃপক্ষ নিয়মিতই এ পদ্ধতি অনুসরণ করে।
ইব্রাহিমের ভাষায়, সমুদ্রে কাটানো সেই কয়েক ঘণ্টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। বলে, ‘আমার মনে হচ্ছিল, জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো মারা যাব। তখন ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম, প্রিয়জনদের কথা ভাবছিলাম। বিশেষ করে বারবার মনে পড়ছিল মায়ের কথা।’
এদিকে সেউতায় গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ২৪ ঘণ্টায় অর্ধলাখের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেন। স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পার হতে গিয়ে এ সময় অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সীমান্তের স্পেন অংশে উদ্ধার করা হয় ৫৭ জনের মরদেহ। মরক্কোর দিকেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
সর্বব্যাপী ‘দমন-পীড়ন’
মরক্কোর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক খালিদ মুনার মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছে, তা শুধু উন্নত জীবনের খোঁজে তরুণদের দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ নয়। বলেন, ‘এটি একধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তরুণেরা অভিবাসনকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মরক্কোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।’
খালিদ মুনা বলেন, দমন-পীড়নের মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তরুণদের জন্য শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। তাঁর ভাষায়, জনপরিসরে দমন-পীড়ন সব সময়ই রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণদের একত্র হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরেই মরক্কোতে মানবাধিকার দমনের অভিযোগ তুলে আসছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার অধিকারের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে হাইপ্রোফাইলের মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের কারাবন্দী করা এবং হয়রানির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের ঘটনাও রয়েছে।
মুনা ও জুবেইদির মতে, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের দুর্বল অবস্থাও তরুণ মরক্কোবাসীদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মরক্কোর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ (প্রায় ২৫ লাখ) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। অর্থাৎ শুধু আয়ের অভাব নয়, শিক্ষা, মৌলিক অবকাঠামো, সেবাসহ নানা ক্ষেত্রেই তাঁরা বঞ্চিত।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আরও ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েন। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে।
বুশরার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপ সম্পর্কে যে অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। তিনি বলেন, স্পেনে পৌঁছাতে পেরেছে-এমন মানুষের গল্প আর অভিবাসনে উৎসাহ জোগানো অসংখ্য গান তরুণদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
বুশরা বলেন, ‘মরক্কোর তরুণদের মধ্যে বারবার এমন চিন্তা ফিরে আসছে-এ নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন।’
এদিকে দক্ষিণ মরক্কোর সমুদ্রসৈকতে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন হামজা। চলতি বছর তিনি ইউরোপে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করবেন। তবে তিনি জানেন, পরিবারের সমর্থন না থাকায় তাঁর বন্ধুদের সে সুযোগ নেই।
আরও একবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের খোঁজ করেন হামজা। ইউরোপে কষ্টে দিন কাটালেও লজ্জায় তাঁরা পরিবারের সদস্য ও পরিচিত ব্যক্তিদের সামনে সুখী জীবনের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। হামজা জানেন, তাঁদের কেউ কেউ রাতে রাস্তায় ঘুমান। কিন্তু স্বজনদের চোখে তাঁরা যেন পূরণ করে ফেলেছেন ‘ইউরোপ-যাত্রার স্বপ্ন’।
ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আট মাস ধরে চলা সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া এবং এ অঞ্চলে তেল সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের আশঙ্কায় মঙ্গলবার এশিয়ার লেনদেনের শুরুতে তেলের দাম বাড়ে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা ৪ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪৮ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০৫ দশমিক ২৫ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৪৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৯৩ ডলারে ওঠে।
এর আগে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ দশমিক ৬৬ ডলার বা ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ৭৭ ডলারে স্থির হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকজন কর্মকর্তা হামলাকে প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করেছেন। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা যাতে ইরান না পায়, সে উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, হামলার খবর তেলের দামে ঝুঁকির প্রিমিয়াম আবার যুক্ত করেছে। বাজার যখন কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে শুরু করেছিল, তখন নতুন করে সামরিক তৎপরতার খবর পরিস্থিতির চিত্র বদলে দিয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে সোমবার জানিয়েছে তেহরান। কাতারের মধ্যস্থতায় কয়েক দিন ধরে দুই পক্ষের আলোচনা হলেও প্রস্তাব পরিবর্তন হয়েছে, তবে কোনো সমঝোতা হয়নি।
সোমবার ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর হুমকি বাস্তবায়ন করবেন কিনা, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংঘাতের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যা ভোটারদের ওপর চাপ তৈরি করছে। সংঘাতের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের ওপরও চাপ বাড়ছে। আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবার বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় অক্টোবরের শেষ দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
সূত্র: রয়টার্স
ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাত ১টার দিকে রাজ্যটির প্রকাশম জেলার ওঙ্গোলের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে ঝড়টির স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টির স্থলভাগ অতিক্রমের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর প্রভাবে দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ঝোড়ো বাতাসের তীব্রতাও বাড়ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাত ১টা ৩০ মিনিটে দেওয়া আবহাওয়া বুলেটিন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের কাছে অবস্থান করছিল। তখন এটি ওঙ্গোল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, কাভালি থেকে ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং বাপাতলা থেকে ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল।
আইএমডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেলোর ও নরসাপুরের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে ওঙ্গোলের কাছাকাছি এলাকায় ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগ অতিক্রম করতে পারে। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত উপকূল ও আশপাশের এলাকায় ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়া বিভাগ আরও জানিয়েছে, আগামী ১২ ঘণ্টায় দক্ষিণ উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
এ ছাড়া বুধবার সকাল পর্যন্ত স্বাভাবিক জোয়ারের তুলনায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ মিটার বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে। এতে দক্ষিণ উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হতে পারে। বিশেষ করে বাপাতলা, কৃষ্ণা ও প্রকাশম জেলায় জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বেশি বলে সতর্ক করেছে আইএমডি।
ছবি : সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে কেশম দ্বীপের দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোন দুটি অকার্যকর করা হয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি ইরান।
বার্তাসংস্থা আনাদোলু বলছে, সোমবার (২ নভেম্বর) আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দুটি এমকিউএম-১৭০ ড্রোনের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এর ফলে ইরানি বাহিনীর হাতে এ ধরনের ড্রোন আটক হওয়ার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারটিতে।
তাসনিম জানিয়েছে, এ অভিযানের ফলে ড্রোন দুটি তাদের নির্ধারিত মিশন সম্পন্ন করতে পারেনি। তবে অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
এর আগে গত সপ্তাহে ইরানের পক্ষ থেকে একই ধরনের দুটি ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। গত শুক্রবার রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা ইরনা জানায়, কেশম দ্বীপের আকাশে ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ব্যবহার করে একটি এমকিউএম-১৭০ ড্রোন ভূপাতিত করেছে আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স।
এর আগের দিন আইআরজিসির নৌবাহিনী জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির পশ্চিমাঞ্চলে একই ধরনের আরেকটি ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। ড্রোনটি অক্ষত অবস্থায় অবতরণ করানো হয়।
তবে বৃহস্পতিবারের ঘটনা নিয়ে ইরানের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ চলার মধ্যেই সর্বশেষ এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো।
এদিকে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশ বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন, কাতারের মধ্যস্থতায় এ যোগাযোগ সহজ করতে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি দোহা সফর করেছেন।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জবাবে ইসরায়েল এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায় ইরান। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।
এরপর হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। তবে প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধের কারণে এর বাস্তবায়ন থমকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে অঙ্গরাজ্যটিতে হামের সংক্রমণ-সংশ্লিষ্ট প্রথম মৃত্যুর ঘটনা এটি।বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা সোমবার (৩ নভেম্বর) শিশুটির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ ও লুইস কাউন্টি পাবলিক হেলথ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারণে লুইস কাউন্টিতে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারণে লুইস কাউন্টিতে এক শিশুর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। শিশুটির পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। এই কঠিন সময়ে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানোর অনুরোধ করছি।’শিশুটির বয়স, লিঙ্গ বা মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।
নিউইয়র্ক ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে গভর্নর ক্যাথি হোকুল জরুরি অবস্থা ঘোষণার এক মাস পর এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটল।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত নিউইয়র্কে হামে আক্রান্ত হওয়ার ১৭৮টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক সিটিতে আক্রান্ত হয়েছেন আটজন।
জরুরি অবস্থার আদেশ অনুযায়ী, নিবন্ধিত নার্সরা হামে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার নির্দেশ দিতে পারবেন।
গত বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করার পর কোনো অঙ্গরাজ্যে প্রথমবারের মতো এ ধরনের জরুরি আদেশ জারি করা হয়েছে।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে হামে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অন্তত ৯৬ শতাংশ টিকা নেননি অথবা তাঁদের টিকা নেওয়ার তথ্য জানা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে কাশি, নাক দিয়ে পানি ঝরা, ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর এবং চোখ লাল হয়ে পানি পড়া।
লক্ষণ দেখা দেওয়ার দুই থেকে তিন দিন পর রোগীর মুখের ভেতরে, গালের অভ্যন্তরীণ অংশে ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা দিতে পারে। এগুলোকে কপলিক স্পট বলা হয়।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৪ হাজার ৮০০টির বেশি হামের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশটির প্রায় সব অঙ্গরাজ্যেই সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। ১৯৯১ সালের পর এ বছরই যুক্তরাষ্ট্রে হামে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ।
সিডিসি সবাইকে এমএমআর (হাম, মাম্পস ও রুবেলা) টিকার দুই ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। প্রথম ডোজ ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ৪ থেকে ৬ বছর বয়সের মধ্যে নেওয়া উচিত।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, এমএমআর টিকার এক ডোজ হাম প্রতিরোধে ৯৩ শতাংশ এবং দুই ডোজ ৯৭ শতাংশ কার্যকর।
এ ছাড়া উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রাদুর্ভাবের এলাকায় বসবাসকারী বা সেখানে ভ্রমণকারী ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুরা আগাম তৃতীয় ডোজ এমএমআর টিকা নিতে পারবে।
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। প্রভাবশালী এই সংবাদমাধ্যমটির এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোরে দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপ ও বন্দর লেঙ্গেহতে দফায় দফায় বিস্ফোরণের খবর জানিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো।
বার্তাসংস্থা আনাদোলু বলছে, মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ খবর প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তবে বিস্ফোরণের কারণ, হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মূলত এমন এক সময়ে এই হামলার খবর এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনাকে অনেকটা খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় সময় সোমবার (২ নভেম্বর) সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা জিতেছি’। তিনি আরও বলেন, ‘এটাকে আদৌ যুদ্ধ বলা যায় কি না, তা আমি জানি না। কারণ, কয়েক মাস ধরে আমরা কোনো লড়াই করছি না।’
তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ছোট পরিসরে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন বাহিনী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা এসব অভিযানকে প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করেছেন। তাদের ভাষ্য, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি বা জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন থেকে ইরানকে বিরত রাখতেই এসব অভিযান চালানো হচ্ছে।
এদিকে পৃথক প্রতিবেদনে আনাদোলু জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কেশম দ্বীপ ও হরমোজগান প্রদেশের উপকূলীয় শহর বন্দর লেঙ্গেহতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, কেশম দ্বীপে পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। অন্যদিকে আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, হরমোজগান প্রদেশের বন্দর লেঙ্গেহতে সমুদ্রের দিক থেকে বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে।
বিস্ফোরণের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি সংবাদমাধ্যম দুটি। মূলত হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই বিস্ফোরণের খবর এলো।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশ বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে। তিনি নিশ্চিত করেন, কাতারের মধ্যস্থতায় এ যোগাযোগ সহজ করতে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি দোহা সফর করেছেন।
এর আগে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জবাবে ইসরায়েল এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। পরে এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।
হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। তবে প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধের কারণে এর বাস্তবায়ন থমকে যায়।
বাড়িতে কয়েক দিনের খাবার, পানি, ওষুধ, টর্চলাইট ও রেডিও রাখার পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার। ছবি: পেক্সেলস
বাড়িতে কয়েক দিনের খাবার, পানি, ওষুধ, টর্চলাইট ও রেডিও রাখার পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স নাগরিকদের তিন দিনের প্রস্তুতি নিতে বলছে। সুইডেন ও নরওয়েতে এক সপ্তাহ এবং জার্মানিতে ১০ দিনের প্রস্তুতির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
যুক্তরাজ্যে সরকারের আহ্বানের পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে টিনজাত খাবার, রেডিও, টর্চলাইট ও পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রিও বেড়েছে। কেন এত দেশ নাগরিকদের জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলছে? এর পেছনে কি আসন্ন কোনো যুদ্ধ বা বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা আছে?
বিভিন্ন দেশের সরকারি নির্দেশনা এবং বিবিসি, নিউজউইক, স্কাই নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তুতির পেছনে আছে একাধিক ঝুঁকি।
এর মধ্যে আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা এবং বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। ইউরোপের কিছু দেশের প্রস্তুতিতে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও বিবেচনায় আছে।
তবে এসব নির্দেশনা থেকে নির্দিষ্ট কোনো যুদ্ধ বা বিপর্যয় আসন্ন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তি নেই।
যুক্তরাজ্যে কী হচ্ছে
গত ২২ অক্টোবর যুক্তরাজ্য সরকার ‘বি রেডি’ নামের একটি প্রচারাভিযান শুরু করে। এর উদ্দেশ্য, জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকেরা যেন অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারে।
ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশনায় একজনের জন্য প্রতিদিন তিন লিটার খাবার পানি, সহজে নষ্ট হয় না এমন খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক ও ব্যাটারিচালিত বা হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকার বলছে, ঝড়, বন্যা, বিদ্যুৎবিভ্রাট কিংবা সাইবার হামলার কারণে জরুরি পরিষেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারগুলো কিছুদিন নিজেরা চলতে পারলে উদ্ধার ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলো বেশি বিপদে থাকা মানুষদের আগে সাহায্য করতে পারবে।
টিনজাত খাবার ও রেডিওর বিক্রি বেড়েছে
সরকারের এই আহ্বানের পর যুক্তরাজ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জরুরি সামগ্রীর বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বিবিসির ‘নিউজ নাইট’ অনুষ্ঠানের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে এক সপ্তাহান্তে টিনজাত খাবারের বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বোতলজাত পানির বিক্রিও বেড়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
যুক্তরাজ্যের গৃহস্থালির ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রবার্ট ডায়াস জানিয়েছে, আগের সপ্তাহের তুলনায় তাদের রেডিও বিক্রি বেড়েছে ১৬০ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ম্যাপলিনের হিসাবে, সরকারি ঘোষণার পর রেডিওর বিক্রি ৯২ শতাংশ, টর্চলাইটের বিক্রি ২৮৪ শতাংশ এবং পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি ১০৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগের মাসের একই সময়ের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের তুলনা করেছে।
জরুরি পরিস্থিতির সরঞ্জাম বিক্রি করে এমন কয়েকটি ছোট প্রতিষ্ঠানও চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট কয়েকটি বিক্রেতার। এ থেকে গোটা যুক্তরাজ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বা খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ড জানিয়েছে, তাদের টিনজাত খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে।
অন্য দেশগুলো কী বলছে
২৮ অক্টোবর প্রকাশিত নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের জরুরি প্রস্তুতিবিষয়ক নির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসেও তিন দিনের জরুরি সামগ্রী রাখার পরামর্শ আছে। সুইডেন ও নরওয়ে প্রায় এক সপ্তাহ এবং জার্মানি দিয়েছে ১০ দিনের প্রস্তুতির পরামর্শ।
ভারতে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখতে বললেও সবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ওয়েবসাইট ‘রেডি ডট গভ’-এও কয়েক দিন চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার নির্দেশনা আছে।
তবে সব দেশের নির্দেশনার কারণ এক নয়। জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে স্থানীয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য আলাদা নির্দেশনা আছে।
এ ছাড়া এসব নির্দেশনার সবই নতুন নয়। অনেক দেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্যোগ প্রস্তুতির কর্মসূচি চালু আছে।
ইউরোপে কেন বাড়তি গুরুত্ব
ইউরোপীয় কমিশন ২০২৫ সালের মার্চে ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করে। এতে সদস্যদেশগুলোর নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা মোকাবিলায় সামগ্রিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।
সুইডেনের সরকারি নির্দেশিকায় সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধের পরিস্থিতির কথাও আছে। দেশটির নাগরিকদের এক সপ্তাহ চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
তবে সুইডেনে যুদ্ধকালীন নাগরিক প্রস্তুতির নির্দেশনা নতুন নয়। দেশটির এমন নির্দেশিকা প্রকাশের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সাম্প্রতিক সংস্করণে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ৯০ দিনের প্রস্তুতি
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক স্থাপনাগুলোর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে আলাদা উদ্যোগ নিয়েছে।
২ নভেম্বর দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বাইরে থেকে সহায়তা না পেলেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলো যেন অন্তত ৯০ দিন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
এ জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির স্বনির্ভরতা, সরবরাহব্যবস্থা, জরুরি মজুত এবং সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা আছে।
তবে এই ৯০ দিনের প্রস্তুতি সাধারণ নাগরিকদের জন্য দেওয়া কোনো নির্দেশনা নয়। এটি সামরিক স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম সচল রাখার পরিকল্পনা।
তাহলে কি বড় কোনো বিপর্যয় আসছে
বিভিন্ন দেশের প্রস্তুতির উদ্যোগকে একই ধরনের আসন্ন হুমকির সতর্কবার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আধুনিক জীবনে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট, ব্যাংকিং ও যোগাযোগব্যবস্থা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বড় ধরনের দুর্যোগ বা সাইবার হামলায় একটি পরিষেবা বন্ধ হলে অন্য পরিষেবাও ব্যাহত হতে পারে। সরকারি নির্দেশনাগুলোর মূল উদ্দেশ্য এমন পরিস্থিতিতে মানুষের দুর্ভোগ কমানো।
ব্রিটিশ সরকারও স্পষ্ট করেছে, জরুরি প্রস্তুতি মানে একবারে বিপুল পরিমাণ খাবার বা পানি কিনে রাখা নয়। ঘরে আগে থেকেই থাকা সামগ্রী দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে কিছু জিনিস যোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের নির্দেশনায় প্রতিবেশীদের খোঁজ রাখা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর লিখে রাখা এবং যাঁদের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন, তাঁদের কথা বিবেচনা করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের এই উদ্যোগের মূল বার্তা হলো সম্ভাব্য সংকটের জন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকা। এসব আসন্ন যুদ্ধ বা খাদ্যসংকটের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।
সূত্র: বিবিসি, নিউজউইক, স্কাই নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান, ইউরোপীয় কমিশন, সুইডিশ সিভিল ডিফেন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স এজেন্সি ও যুক্তরাষ্ট্রের রেডি ডট গভ।