ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুটা নাটকীয়ভাবে এর মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। ট্রাম্প তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরান সরকার বর্তমানে অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অনুরোধে আমরা হামলা স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নেতৃত্ব, বিশেষ করে আসিম মুনিরের প্রতি এটা ট্রাম্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক স্বীকৃতি। ৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পেছনে আসিম মুনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসনের পথ তৈরি করেন।
ইসলামাবাদে ১১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রায় ২১ ঘণ্টার বৈঠক করেন। কিন্তু কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। এরপর দ্বিতীয় দফার বৈঠকের জন্য জোর তৎপরতা শুরু করে পাকিস্তান। তারই অংশ হিসেবে সরাসরি তেহরান সফরে যান আসিম মুনির। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর কোনো আঞ্চলিক সামরিক নেতার এটাই ছিল প্রথম ইরান সফর।
এক বছরে বদলে যাওয়া দৃশ্যপট
আসিম মুনিরকে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক শান্তির দূত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে বিশ্বমঞ্চে তাঁর অভাবনীয় উত্থান জানতে হলে যেতে হবে এক বছর পেছনে। তখনকার কিছু ঘটনা তাঁর আজকের ভাবমূর্তির ভিত্তি তৈরি করে।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর এক সশস্ত্র হামলা হয়। এর জেরে দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়ায়। তা আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
চার দিনের সেই সংঘর্ষে আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার ও পাকিস্তানের সামগ্রিক সামরিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তিনি চার তারকা জেনারেল থেকে ফিল্ড মার্শাল এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের প্রথম চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সবকিছু পাল্টে দেওয়া এক যুদ্ধ
পেহেলগাম হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারত ২০২৫ সালের ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নাম দিয়ে পাকিস্তানে হামলা করে বসে। সীমান্ত এলাকার পাশাপাশি পাকিস্তানের গভীরে হামলা চালানো হয়। পাকিস্তানও পাল্টা জবাব দেয় এবং একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। ১০ মে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগপর্যন্ত দুই দেশ পাল্টাপাল্টি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করে। ট্রাম্প বারবার এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দাবি করে আসছেন। পাকিস্তান তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খান, ইউএসআইপির সাবেক প্রধান
পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা ২০ মে সর্বসম্মতিক্রমে আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করে। আইয়ুব খানের পর তিনি পাকিস্তানের ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি এই পদমর্যাদা পেলেন। ফিল্ড মার্শাল হওয়ার পর আইয়ুব খান সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আসিম মুনির সেনাপ্রধানের পদটিও নিজের হাতে রাখেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিসের (ইউএসআইপি) সাবেক প্রধান ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খানের মতে, ভারতের সঙ্গে এই সীমিত সংঘাত আসিম মুনিরকে বিশ্বদরবারে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রাম্পের মতো নেতারা ‘শক্তির ভাষা’ পছন্দ করেন। মুনির সেই শক্তিরই প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন সমীকরণ
ট্রাম্প ২০২৫ সালের ১৮ জুন হোয়াইট হাউসে আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেন। কোনো বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া কোনো পাকিস্তানি সামরিক প্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটিই ছিল প্রথম একান্ত বৈঠক। বৈঠক শেষে মুনিরকে ‘একজন মহান যোদ্ধা’ এবং ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
আসলে আরও আগে ট্রাম্প ও মুনিরের এই সুসম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে সমন্বয় করে ‘অ্যাবে গেট’ বোমা হামলায় জড়িত একজন সন্দেহভাজনকে ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দেয় ইসলামাবাদ। এটা ট্রাম্পকে মুগ্ধ করেছে।
প্রসঙ্গত প্রায় ২০ বছর অবস্থান শেষে ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট আফগানিস্তান ত্যাগের সময় কাবুলে মার্কিন সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা হয়েছিল। এটা অ্যাবে গেট বোমা হামলা নামে পরিচিত।
এ ছাড়া বিরল খনিজ পদার্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি সহযোগিতার প্রস্তাবের মাধ্যমে ইসলামাবাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, তারা এমন একটি ‘সুইং স্টেট’, যারা ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসার ক্ষমতা রাখে।
ক্ষমতার সাংবিধানিক ভিত্তি
পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী পাস হয়। এটা আসিম মুনিরের ক্ষমতাকে আইনগতভাবে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস বা সিডিএফ পদটি তৈরি করা হয়।
সিডিএফের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও কৌশলগত পরিকল্পনা বিভাগকে একটি একক ও একীভূত কমান্ডের অধীনে আনা হয়। আসিম মুনির বর্তমানে পাঁচ বছরের জন্য সিডিএফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাঁর ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে।
সংশোধনী অনুযায়ী, ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদা যে কর্মকর্তা পাবেন, তা তিনি আজীবন ব্যবহার করতে পারবেন। তা ছাড়া পাঁচ তারকা পদধারী কোনো কর্মকর্তাকে বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে আজীবনের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বিরোধীদের প্রবল প্রতিবাদ সত্ত্বেও মাত্র ১৬ মিনিটে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে বিলটি পাস হয়।
ইসলামাবাদভিত্তিক সনোবর ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমা বলেন, এটি কেবল ক্ষমতা কুক্ষিগত করা নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামরিক শক্তিকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসার প্রয়াস।
তবে অনেক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মনে করেন, এই অতি-কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা দীর্ঘ মেয়াদে পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ইরান মধ্যস্থতা
কাতারের রাজধানী দোহার একটি ভবনে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর হামলা চালায় ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। এর আট দিন পর পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এখানেও মুখ্য ভূমিকা রাখেন আসিম মুনির। এই চুক্তির আওতায় এক দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দেশ তা নিজের ওপর হামলা বলে ধরে নিয়ে ব্যবস্থা নেবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরু করলে পাকিস্তান এক কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়ে। কারণ, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান।
কামার চিমা, নির্বাহী পরিচালক, সনোবর ইনস্টিটিউট, ইসলামাবাদ
একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে নবজাতক প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা পাকিস্তানের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু এই যুদ্ধ একই সঙ্গে আসিম মুনিরের কপাল খুলে দেয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে আসিম মুনির সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তেহরানের কাছে ওয়াশিংটনের প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।
মূলত আসিম মুনিরের মধ্যস্থতার কারণে ৮ এপ্রিলের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, একটি দুর্বল বা অস্থিতিশীল ইরান পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ভারতের প্রভাব বাড়িয়ে দেবে। এই আশঙ্কা থেকে মুনির ইরানকে রক্ষার কূটনৈতিক লড়াইয়ে নামেন।
অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আসিম মুনিরের ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’ ভাবমূর্তি থাকলেও পাকিস্তানের ভেতরে তা ঠিক উল্টো। ২০২৫ সালে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সশস্ত্র সহিংসতা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখনো কারাবন্দী। তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। দেশটির নাগরিক অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসিম মুনিরের এই বাহ্যিক বৈধতা ও আন্তর্জাতিক স্তরে ট্রাম্পের মতো নেতাদের সমর্থন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতাকে আরও জোরদার করেছে। বর্তমানে পাকিস্তানে আসিম মুনিরের মেয়াদ বা ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো আইনি বা রাজনৈতিক শক্তি অবশিষ্ট নেই বললেই চলে।
আসিম মুনিরের উত্থান কেবল এক সামরিক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। বরং এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় পাকিস্তানের নতুন অবস্থানের প্রতিফলন।
একদিকে ভারতের সঙ্গে সীমিত যুদ্ধ। অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা, এই দুই মেরুর রাজনীতি আসিম মুনিরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে তিনি ট্রাম্পের কাছে ‘পছন্দের ফিল্ড মার্শালে’ পরিণত হয়েছেন।
তবে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা আর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে আসিম মুনিরের এই ক্ষমতা কত দিন টেকসই হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আপাতত আসিম মুনির এমন একজন নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যাঁর সিদ্ধান্ত কেবল ইসলামাবাদ নয়, বরং ওয়াশিংটন থেকে তেহরান পর্যন্ত ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ
ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
গতকাল শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) লেনদেন শেষে ডিসেম্বরের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলার ৬৪ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের দিনের তুলনায় দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। দিনের লেনদেনে একপর্যায়ে ব্রেন্টের দাম ১১৮ ডলারে উঠেছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ। দিন শেষে প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়ায় ১০৪ ডলার ১২ সেন্টে।
অক্টোবর মাসে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার ঘিরে একাধিক ঘটনার খবর সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দিনের মধ্যে সুপারট্যাংকার সংশ্লিষ্ট চারটি ঘটনা ঘটেছে। তাদের দাবি, ইরানি কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ ঘোষিত পথে চলাচলের সময় দুটি ট্যাংকার মাইনে আঘাত করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে এ ধরনের ঘটনা তেলের সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
সূত্র : আল জাজিরা
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত
দিনিপ্রো শহরের ব্যস্ত রেলস্টেশনে রাশিয়ার ড্রোন হামলার পরের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
দিনিপ্রো শহরের প্রধান রেলস্টেশনে একটি জেটচালিত ড্রোন আঘাত হানে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে সংস্থা উক্রজালিজনিতসিয়া। হামলার সময় স্টেশনটির একটি প্ল্যাটফর্মে যাত্রীবাহী ট্রেন ছাড়ার প্রস্তুতি চলছিল।
হামলার পর প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল মরদেহ। বিস্ফোরণের আঘাতে মেঝেতে রক্ত জমে যায়। বিমান হামলার সতর্কসংকেতের মধ্যে পুলিশকে কালো ব্যাগে মরদেহ ভরতে দেখা গেছে।
স্টেশনের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া ৬৭ বছর বয়সী স্বিতলানা শেরবাক বলেন, ‘আবার হামলা কেন? রাশিয়ানরা কী লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
দিনিপ্রোতে আরেকটি হামলায় একটি শিক্ষার্থীদের আবাসিক ভবনে আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর ওলেকসান্দর হানজা। তিনি জানান, দিনভর হামলায় শহরটির প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
দিনিপ্রোর বাইরে উত্তর ইউক্রেনের চেরনিহিভ শহরের কেন্দ্রীয় সড়কে ড্রোন হামলায় দুই কিশোরী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় চার শিশুসহ অন্তত ২৩ জন আহত হয়েছেন।
শহরটির সামরিক প্রশাসনের প্রধান দিমিত্রো ব্রিজিনস্কি বলেন, সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষ হামলার শিকার হয়েছেন।
মধ্যাঞ্চলীয় ক্রেমেনচুক শহরে আবাসিক ভবন ও ব্যক্তিগত বাড়িতে হামলায় নিহত হয়েছেন তিনজন। আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়ায় তিনটি পৃথক হামলায় শহরের বাস লক্ষ্য করে রুশ ড্রোন আঘাত হানে। এতে ছয়জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে কাতার ও তুরস্কের মতো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার এই দাবিকে পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার চেষ্টা আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিরোধী শিবিরের গাদি আইজেনকট। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে আরব দলগুলোর প্রাপ্ত তহবিলের উৎস খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেইতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে হাস্যকর ও বিপজ্জনক বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দোহার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রাজনীতিকেরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছে দেশটি।নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে এটা স্পষ্ট-নেতানিয়াহুর জোট কিংবা বিরোধী জোট, কোনো পক্ষ পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। আরব ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে সব সমীকরণ পাল্টে গেছে। ১২০ আসনের নেসেটে দুটি আরব দলের জোট জয়েন্ট লিস্ট এবং রাআম রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে।
নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের জোট ৪৮টি আসন পেয়েছে। এমন ফলাফলে আরব দল দুটি এখন সরকার গঠনের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে।নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে গুরুতর সন্দেহের তদন্ত করতে শিন বেইতকে অনুরোধ জানান কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির (সিইসি) প্রধান। এরপর বৃহস্পতিবার লিকুদ পার্টি অভিযোগ তোলে যে আরব দলগুলোকে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের ঘুষ দেওয়া হয়েছে।
দুটি আরব দলই এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবদের জোট জয়েন্ট লিস্ট এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছে।
নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা এই পুরো বিতর্ককে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর বৈধতা নষ্ট করতে চাইছেন। যাতে আইজেনকট তাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা করতে না পারেন। কারণ, বর্তমানে আরবদের সমর্থনই বিরোধী জোটের ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির কাছে একটি অভিযোগ আসে যে আরব এলাকায় ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে কাতার তহবিল জুগিয়েছে। তবে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবি সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেছে।
নেতানিয়াহু এবং তার দল লিকুদ এই অভিযোগকে রাজনৈতিক ভূমিকম্প এবং গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হিসেবে আখ্যা দেয়। তাদের দাবি-কট্টর ডানপন্থী সরকারকে হটাতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে শিন বেইত পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের এই তদন্ত বৈধভাবে ভোট দেওয়া পুরো আরব সম্প্রদায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে না। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে জানান, নির্বাচনের স্বচ্ছতা পদ্ধতিগতভাবে লঙ্ঘনের কোনো প্রমাণ মেলেনি।
তদন্তের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর আইজেনকট জানান, ঠিক কী ঘটেছে বা আদৌ কিছু ঘটেছে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণ করতে নেতানিয়াহু সুপরিকল্পিত প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন।
জয়েন্ট লিস্টের শরিক দল বালাদের চেয়ারম্যান সামি আবু শেহাদেহ এই অভিযোগ উড়িয়ে দেন। পরাজিত পক্ষ বর্ণবাদী মিথ্যা অপবাদ তৈরি করছে এবং নির্বাচনের ফল উল্টে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে বলপ্রয়োগের আহ্বান জানাচ্ছে বলে দাবি তার।
নেতানিয়াহু কয়েক দিন ধরে আরব ভোটার ও দলগুলোর ওপর ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ করে আসছেন। নির্বাচনের দিন তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, আরব ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ডানপন্থীদের জন্য চরম জরুরি অবস্থা এবং এটি তাদের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। ডানপন্থী সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টানতে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি আরব ভোটারদের ছবিও প্রকাশ করেন।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাদের অনেকে নিজেদের ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন।
বহুবছর ধরে অনেক আরব ভোটাররা ইসরায়েলের নির্বাচন বর্জন করে আসছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল-ভোট দিলে এমন একটি ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া হয়, যেখানে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হয়; কিন্তু এবার নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থী জোট সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যেই তারা বিপুলসংখ্যক ভোট দিয়েছেন।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, বিশ্বাস ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোজতবা খামেনি। একই সঙ্গে দেশের শক্তি ও সক্ষমতা বাড়াতে আরও বেশি প্রচেষ্টা চালানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠানো চিঠির জবাবে এসব কথা বলেন মোজতবা খামেনি। ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণদের দৃঢ় সংকল্প, দায়িত্ববোধ ও অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া জবাবে মোজতবা খামেনি বলেন, জ্ঞান ও বিশ্বাসের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি, স্রষ্টার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং পবিত্র কোরআন ও আহলে বাইতের শিক্ষার গভীর উপলব্ধি অর্জনে তরুণদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত।
তিনি বলেন, আরও বেশি পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে প্রিয় ইরানের শক্তি ও সক্ষমতা বাড়াতে তরুণদের ভূমিকা রাখতে হবে।চিঠিতে মোজতবা খামেনি বলেন, তরুণ ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া চিঠিগুলো ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাদের দৃঢ় সংকল্প ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। এই অঙ্গীকার পবিত্র ইসলামের শিক্ষা এবং ইমাম খোমেনি ও শহীদ খামেনির উত্তরাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি নেতৃত্ব ও তরুণদের একই লক্ষ্যে যুক্ত করেছে।
তিনি আরও বলেন, ইমাম মাহদির দোয়া ও অনুগ্রহে উন্নতি এবং ইসলামি-ইরানি সভ্যতা গড়ে তোলার পথে এই অঙ্গীকারবদ্ধ শক্তির অগ্রযাত্রা আরও কার্যকর ও দ্রুত হবে বলে তিনি আশা করেন।