দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
ইরানে ইসরায়েল ও এর ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার জেরে দুবাইয়ে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে তেহরানের হামলা এবং বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে বসবাসরত ধনীরা বিপাকে পড়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ এ বাণিজ্যনগরী ছাড়তে এখন প্রাইভেট জেটই এই ধনীদের একমাত্র ভরসা। ফলে বিকল্প পথে দেশ ছাড়ার হুড়োহুড়িতে ব্যক্তিগত বিমানের ভাড়া আকাশ ছুঁয়েছে।
ধনকুবের, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও লাখো পর্যটকের প্রমোদকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঝলমলে দুবাই এখন চরম উৎকণ্ঠার শহর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে শুধু দুবাই-ই নয়, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি নিশানা করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান।
ইরানের হামলায় দুবাই বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরটির বেশ কিছু বিলাসবহুল হোটেল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত।
আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, গতকাল সোমবারও তারা বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার জেরে তেহরানে নিজেদের দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে আমিরাত।
এ পরিস্থিতিতে দুবাই থেকে অনেকে পার্শ্ববর্তী ওমানের দিকে ছুটছেন। গাড়ি চালিয়ে ওমান যেতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। সেখানে এ পর্যন্ত যুদ্ধের প্রভাব তেমনটা পড়েনি। ওমানের মাসকাট বিমানবন্দর এখনো চালু রয়েছে। তবে সেখানে ফ্লাইট ছাড়তে কিছুটা দেরি হচ্ছে।
বিভিন্ন অনলাইন টিকিট বুকিং সাইটের তথ্য অনুযায়ী, ওমানের মাসকাট থেকে ইউরোপগামী অধিকাংশ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের টিকিট চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত ফুরিয়ে গেছে।
দুবাইয়ে ছুটিতে এসেছিলেন রুশ পর্যটক আলেকজান্দ্রা ভাভিলোভা। তিনি জানান, অনেক চেষ্টার পর গতকাল রাতে তিনি একটি টিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তবে সেটি ইউরোপের নয়, মাসকাট থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বোগামী একটি ফ্লাইটের। এদিকে মাসকাট থেকে প্রাইভেট জেটের ভাড়া বেড়েছে অনেক। ব্যাপক চাহিদা ও অস্থিতিশীল এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজের অভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি।
মাসকাটভিত্তিক প্রাইভেট জেট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ‘জেটভিপ’ যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে জানায়, নেক্সট্যান্ট নামের খুব ছোট একটি জেটে করে ইস্তাম্বুল যাওয়ার খরচ এখন ৮৫ হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকা), যা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় তিন গুণ। আবার মস্কোগামী প্রাইভেট চার্টার বিমানে একেকজন যাত্রীর সিটভাড়া পড়ছে ২০ হাজার ইউরো (প্রায় ২৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা)।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রাইভেট জেট কোম্পানি উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে।
অস্ট্রিয়াভিত্তিক চার্টার প্রতিষ্ঠান অ্যালবাজেট জানিয়েছে, তাদের কাছে এখন খুব কম উড়োজাহাজ ফাঁকা আছে। ইউরোপে যাওয়ার জন্য প্রায় ৯০ হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা) ভাড়া চাইছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিনিধি জানান, বিমা–সংক্রান্ত জটিলতা ও মালিকপক্ষের আপত্তিতে অনেক অপারেটর এখন ফ্লাইট পরিচালনা করতে চাইছে না। ফলে চাহিদা থাকলেও জোগানের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
আমিরাত ছাড়তে ইচ্ছুক অনেক যাত্রী ১০ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদে যাচ্ছেন। কারণ, রিয়াদ বিমানবন্দর এখনো সচল রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সেমাফোর তথ্য অনুযায়ী, অনেক বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা ‘এসইউভি’ গাড়ির বহর ভাড়া করছে। এসব গাড়িতে করে গ্রাহকদের রিয়াদে পৌঁছে দেওয়ার পর সেখান থেকে প্রাইভেট ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে তারা।
প্রাইভেট জেট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ভিমানা প্রাইভেট জেটসের প্রধান নির্বাহী আমির ন্যারান বলেন, রিয়াদ থেকে ইউরোপের ফ্লাইটের ভাড়া সাড়ে ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকায়) গিয়ে ঠেকেছে।
এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ইতালিতে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেতো গতকাল সরকারি উড়োজাহাজে করে দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন। ইতালির শত শত নাগরিক যখন দুবাইয়ে আটকা পড়ে আছেন, সে সময় মন্ত্রীর এভাবে ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর সময় ক্রোসেতো সপরিবার দুবাইয়ে অবকাশ যাপন করছিলেন।
এ ঘটনায় রোমের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সংঘাতের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সরকার কেন আগে থেকে সতর্ক ছিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। এমনকি তারা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সপরিবার ফেরার পরিকল্পনা পরিবর্তন করে মন্ত্রী একাই ইতালিতে ফিরেছেন। তাঁর পরিবার এখনো দুবাই অবস্থান করছে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, বিমানের খরচ তিনি নিজেই বহন করেছেন।
দ্য গার্ডিয়ানকে ক্রোসেতো বলেন, ‘আমি এখন আমার অফিসে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। হাজার হাজার মানুষের মতো আমিও সেখানে আটকে পড়েছিলাম। কিন্তু সেটা এখন বড় কোনো বিষয় নয়।’
তবে বেশির ভাগ পর্যটকের জন্য এখন দুবাইয়ে অবস্থান করা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।
দুবাই পর্যটন বোর্ড স্থানীয় হোটেলগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। ফ্লাইট জটিলতার কারণে যেসব পর্যটক আরব আমিরাত ছাড়তে পারছেন না, তাঁদের হোটেল থেকে বের না করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আগের ভাড়াতেই তাঁদের থাকার মেয়াদ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু অনেক রুশ পর্যটক অনলাইনে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের হয় বাড়তি টাকা দিতে বলা হচ্ছে অথবা রিসোর্ট ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম টেলিগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একজন রুশ নারী বলেন, ‘আমাদের হোটেলের রিসেপশনিস্ট বুকিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। তাঁর মতে, এটা তাঁদের সমস্যা নয়। ভিনদেশে আটকে পড়া মানুষের প্রতি এমন আচরণ সত্যি অমানবিক।’
ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বন্দরগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার পশ্চিমা পর্যটক এখন মাঝসমুদ্রে প্রমোদতরিতে আটকা পড়েছেন।
এ অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দরের কাছে অন্তত ছয়টি বড় প্রমোদতরি নোঙর করেছে। এসব জাহাজের প্রতিটিতে হাজার হাজার যাত্রী আছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের জাহাজ থেকে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যালকনিতে না গিয়ে নিজ নিজ কেবিনে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত রোববার দুবাই ও শারজার শিল্পাঞ্চলে বিমান হামলার আগে ও পরের কিছু ছবি প্রকাশ পেয়েছে। আবুধাবির জায়েদ বন্দরে ইরানের ড্রোনের আঘাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর সেখান থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। মেইন শিফ-৪ নামের একটি জাহাজের পর্যটকেরা সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেছেন।
জার্মান সংবাদমাধ্যম বিল্ডকে তাঁরা জানান, তাঁদের ছুটির স্বর্গ নিমেষে রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় চরম আতঙ্কিত তাঁরা।
দুবাইয়ে আটকা পড়া এমএসসি ইউরিবিয়া জাহাজের যাত্রীরা জানিয়েছেন, তাঁদের রুমের চাবির মেয়াদ ৬ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর আগে পর্যটকদের পক্ষে জাহাজ ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম নিয়ে গতকাল ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফ্লাইট ছাড়া, বাতিল হওয়া বা আবার কবে চালু হবে—এসব নিয়ে একেক রকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকার ফ্লাইটরাডার২৪ জানায়, গতকাল বিকেলে অন্তত একটি যাত্রীবাহী বিমান আবুধাবি থেকে লন্ডনের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।
দুবাইভিত্তিক আইনজীবী ইরিনা হিভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, দুবাইয়ে তাঁর পরিচিতজনেরা এখন তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
প্রথম দল দ্রুত ওমান সীমান্তের দিকে ছুটছে। তাদের আশা, সেখান থেকে প্রাইভেট জেটে করে তারা ইস্তাম্বুলে যাবে। দ্বিতীয় দলটি জেদ ধরে আছে। তারা মনে করে, জীবন স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে। তারা সমুদ্রসৈকতে সাঁতার কাটা, পাম জুমেইরাহতে সূর্যাস্ত দেখা আর রোদে শরীর এলিয়ে দিয়ে সময় কাটানোতেই বিশ্বাসী।
তৃতীয় দলটি সম্পর্কে হিভার লিখেছেন, তারা ‘আশ্রয়স্থলে অবস্থান-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা’ পালন করবে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পক্ষে প্রচারে নেমে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধ এবং চড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন।
গতকাল শনিবার ওহাইওতে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ওবামা বলেন, “এই প্রশাসনের কিছু বোকামি অন্তত কিছুটা হলেও লাগাম টেনে ধরার জন্য এই নির্বাচনই আমাদের শেষ সেরা সুযোগ।"
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ক্ষমতা দখলের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে বারাক ওবামা নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। এই প্রচারে তিনি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দুর্নীতির নিন্দা করেছেন, ইরান নিয়ে তার কৌশলের সমালোচনা করেছেন এবং হোয়াইট হাউজ সংস্কারে ট্রাম্পের জাঁকজমক নিয়ে খোঁচা দিয়েছেন।
ওবামা ক্লিভল্যান্ড ও ডেট্রয়েটের সমাবেশে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছেন।
মিশিগানে মার্কিন সেনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের পক্ষে প্রচার চালানোর সময় ওবামা আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনকে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির কিছু বোকামিকে অন্তত কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার একটি 'সার্কিট ব্রেকার' বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “আমাদের এই অচলাবস্থা বা চলমান ধারা ভাঙতে হবে এবং এই সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
ওদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে জর্জিয়ার এক সমাবেশে তার প্রশাসনের অভিবাসন এবং শুল্ক নীতির প্রশংসা করে সমর্থকদের বলেছেন, “আমরা আমেরিকার সুবর্ণ যুগে আছি।”
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির মেয়াদের বাকি সময়ের জন্য কংগ্রেস কোন দল নিয়ন্ত্রণ করবে তা ঠিক করবে, আর তাই প্রেসিডেন্টের জন্য তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা কতটা সহজ হবে সেটিও এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারণ হয়ে যাবে।
আগাম ভোটগ্রহণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং ট্রাম্প শনিবার ফ্লোরিডায় তার স্ত্রী ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে একসঙ্গে নিজের ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যেই ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে প্রচারে নেমে শনিবার ওহাইও এবং মিশিগানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওবামা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিশানা করে সমালোচনা করেছেন। এক পর্যায়ে তিনি হোয়াইট হাউজ পুনর্সজ্জা করার জন্য ট্রাম্পের চেষ্টা নিয়ে উপহাসও করেন।
ক্লিভল্যান্ডের প্রচার সমাবেশে ওবামা বলেন, “আধুনিক যুগে আমরা দেখিনি এমন বিশৃঙ্খলা, নিষ্ঠুরতা, দুর্নীতি এবং অযোগ্যতার দীর্ঘ দুই বছর পার করার পর, আপনার কাছে 'যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়' বলার সুযোগ এসেছে।”
ওবামা বলেছেন, তিনি সেইসব ভোটারদের প্রতি সহানুভূতিশীল যারা কোভিড মহামারীর পর অর্থনৈতিক এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২০২৪ সালে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে তিনি বলেন, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার জন্য ট্রাম্পের কেবল নিজেকেই দোষ দেওয়া উচিত।
“আপনি যদি ভেবে থাকেন যে 'আপনি কার কথা বলছেন' (নাম উল্লেখ না করে ট্রাম্পকে নির্দেশ করে) তার আসার আগে সবকিছু খুব ব্যয়বহুল ছিল, তবে এখন সবকিছু আরও বেশি ব্যয়বহুল।”
ওবামা মিশিগানের প্রচারসমাবেশে জনতার মনের মতো কথা বলে তাদের খুশি করেন। তিনি ডেমোক্র্যাটদের সেইসব সমালোচনার পুনরাবৃত্তি করেন, যা ট্রাম্প এবং তার সব কথায় রিপাবলিকানদের অন্ধ সমর্থন দেওয়াকে নিয়ে করা হয়।
ওবামা বলেন, “জনগণের করের অর্থ ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক ফায়দা লোটার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রেসিডেন্টের মতো এমন চতুর ও পারদর্শী কাউকে আগে কখনও দেখা যায়নি। এই প্রেসিডেন্টের মতো ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যকে বেশি বেশি সুবিধা দিতে কাউকে কখনও দেখিনি। এখন মনে হচ্ছে, দলটি হয় দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার, না হয় অযোগ্য সরকার, অথবা কোনও সরকার না থাকার পক্ষে অবস্থান করছে।”
এই সমালোচনার বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়ার অনুরোধে হোয়াইট হাউজ তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
তবে রোববার সকালে ট্রুথ সোশালে এক পোস্টে ট্রাম্প সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে চরম অযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন এবং আল-সায়েদকে মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন জিহাদি আখ্যা দিয়েছেন; যিনি ইহুদি, কৃষ্ণাঙ্গ, আমেরিকান এবং ট্রাম্পকে ঘৃণা করেন।
বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়াচ্ছে নিম্নচাপ। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় ভারতের পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূলীয় রাজ্যগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালের মধ্যে নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। আগামী ২৮ অক্টোবর সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা ও বিশাখাপত্তমের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে ঝড়টি স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে।সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার হতে পারে। দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি শুরু করেছে ওড়িশা সরকার। রাজ্যের পাঁচটি জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই দিনের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, কোরাপুট ও মালকানগিরি জেলায় আগামী ২৮ ও ২৯ অক্টোবর স্কুল, কলেজ এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। অন্যান্য জেলায় আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেবেন সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকেরা।
ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি প্রশাসনকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের প্রস্তুতি জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। উদ্ধারকাজের জন্য প্রায় ৬০টি ওড়িশা দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর দল, ১৭টি জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর দল এবং দমকলের ২২৫টি দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।আবহাওয়া দপ্তর ২৮ অক্টোবর গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, কোরাপুট ও মালকানগিরি জেলায় অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কায় লাল সতর্কতা জারি করেছে। এসব এলাকার কোথাও কোথাও ২০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টি হতে পারে। বজ্রপাতের পাশাপাশি ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির কয়েকটি এলাকায় টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন। পুদুচেরির কোস্ট রোড, কৃষ্ণনগর ও লাসপেট এলাকায় পানি জমে দুর্ভোগ বেড়েছে। চেন্নাই, নাগাপট্টিনম, কুড্ডালোর, কারাইকাল, পাম্বান ও তুতিকোরিনসহ একাধিক বন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলে ঝড়টির নাম হবে ‘অর্ণব’। নামটি প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। তবে ঝড়টির গতিপথ, শক্তি ও স্থলভাগে আঘাত হানার স্থান সম্পর্কে পরবর্তী পূর্বাভাসের ওপর নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যটিতে প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার এই ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভের সময় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কার্যালয়, একটি পুলিশ স্টেশন ও পুলিশের কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ ছাড়া স্থানীয় দুই বিধায়ক ও রাজ্য বিজেপি সভাপতির বাসভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা জোরদার এবং তিনটি শহরে মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট টুডে বলছে, অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্পের (এসইউএমপি) বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং এরপরই পূর্ব সিয়াং জেলার তিন শহরে পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন।
গত শুক্রবার জারি করা আদেশে শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিকেল ৫টা থেকে জেলার পাসিঘাট, মেবো ও রুকসিনে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা কার্যকর করা হয়।
চলমান আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় পূর্ব সিয়াং জেলা প্রশাসন এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর আগে পূর্ব সিয়াংয়ের পুলিশ সুপার পাসিঘাটে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের সম্ভাব্য পরিকল্পনার বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের আদেশে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আরও ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে’। শান্তি ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, সব ধরনের জনসভা, মিছিল, সমাবেশ এবং পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র, দা, ধনুক-তীর, ছোরা, ছুরি, কুঠার ও লাঠিসহ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে- এমন কোনো বস্তু বহন করা যাবে না। তবে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তাকর্মীরা এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন।
এছাড়া ভাঙচুর, সম্পত্তি ধ্বংস, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেয়ার মতো কাজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো মিছিল বা বিক্ষোভও করা যাবে না বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় নির্ধারিত এলাকার সব বাসিন্দাকে পুলিশ ও প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম অরুণাচল২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্পের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার রাতে পাসিঘাটে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। এ সময় জাতীয় জলবিদ্যুৎ নিগমের (এনএইচপিসি) একটি কার্যালয়, একটি পুলিশ স্টেশন এবং পুলিশের কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ ছাড়া দুই স্থানীয় বিধায়ক ও রাজ্য বিজেপি সভাপতির বাসভবনে ভাঙচুর চালানো হয়।
অবশ্য প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক তদন্ত ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশের উদ্বেগ, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হতে পারে, পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে এবং পূর্বপুরুষের জমি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে রাজ্য সরকার পানি ব্যবস্থাপনা এবং তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উজানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির বৃহত্তর গুরুত্ব তুলে ধরেছে। অরুণাচল প্রদেশে এই নদী সিয়াং নামে পরিচিত।
পূর্ব সিয়াংয়ের ডেপুটি কমিশনার জয়ন্তী পার্টিনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দিনের বেলায় পাসিঘাটে বন্ধ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে বিকেল ৫টায় আনুষ্ঠানিক বন্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েক শ বিক্ষোভকারী আন্দোলন চালিয়ে যান, মহাসড়ক অবরোধ করেন এবং স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট ও নিরাপত্তাকর্মীদের অনুরোধ সত্ত্বেও সরে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেও পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব হয়নি। এরপর জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরে বিক্ষোভকারীরা পুলিশ ও অন্য কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকেন। এতে কয়েকজন আহত হন।
রাত ১১টার দিকে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। শুরু হয় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর। আর শনিবার ভোর পর্যন্ত এই সহিংসতা চলে।
পাসিঘাটের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ টনি তাতাক নিজেও সহিংসতায় আহত হন। তিনি জানান, হাই রিজিয়ন এলাকায় এনএইচপিসির কার্যালয় এবং একই এলাকার একটি পুলিশ স্টেশনে আগুন দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের সাত থেকে আটটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
সহিংসতার সময় পাসিঘাট ওয়েস্টের বিধায়ক নিনং এরিং, মারিয়াং-গেকুর বিধায়ক ওনি পানিয়াং এবং অরুণাচল প্রদেশ বিজেপির সভাপতি কালিং ময়ংয়ের বাসভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়। আদি জনগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ সংগঠন আদি বানে কেবাংয়ের কার্যালয়ও তছনছ করা হয়েছে।
এমন অবস্থায় শনিবার সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বিক্ষোভকারীদের আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সহিংস বিক্ষোভের আমি তীব্র নিন্দা জানাই। এসইউএমপি প্রকল্প নিয়ে যাদের উদ্বেগ রয়েছে, তাদের এমন পথ বেছে না নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানাচ্ছি।’
ছবি : সংগৃহীত
ফ্রান্সজুড়ে গণবিক্ষোভের পর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার দিনের শেষভাগে প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে গত সপ্তাহান্তের মতো ব্যাপক দাঙ্গা ও লুটপাটের পরিস্থিতি এবার এখন পর্যন্ত এড়ানো গেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন।
তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্কুলগুলোর বেহাল দশার প্রতিবাদে এসব বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা ও ভাঙচুর ঠেকাতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
বিভিন্ন শহরে নানা বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেবল স্বীকৃত ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের দায়ে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় শত শত মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শনিবার প্যারিসে ‘পোর্ত দ’ইতালি’ থেকে ‘পোর্ত দ্য ভিনসেন’ পর্যন্ত একটি পদযাত্রা শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। পদযাত্রার শেষভাগে বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গা পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। পুলিশের অভিযানে সাধারণত সংগঠিত অপরাধ দমন ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে নিয়োজিত একটি বিশেষ ইউনিটও অংশ নেয়।
কিছু বিক্ষোভকারীকে অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে দেখা যায়। এ সময় মুখোশধারী তরুণদের একটি দল একটি গাড়ির শোরুমের জানালা ভাঙচুর করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লরাঁ নুনেজ বলেন, পদযাত্রার শেষ অংশে কয়েক হাজার উগ্রবাদী কর্মী জড়ো হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে দাঙ্গাবাজ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মার্সেইতে আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং রাস্তা অবরোধে ধাতব পাত ব্যবহার করা হয়। শহরটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়িকে জ্বলন্ত ব্যারিকেডের মধ্য দিয়ে যেতে দেখা যায়। বোর্দোতে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কয়েকজন বিক্ষোভকারী একটি ভবন থেকে তক্তা খুলে রাস্তা অবরোধে ব্যবহার করেন।
লিওঁ শহরে স্থানীয় প্রশাসনের নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি এলাকায় জড়ো হওয়া জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহরটির এক বিক্ষোভকারী বলেন, আমাদের দলে প্রায় ১৫০ জন ছিলাম, যাদের অধিকাংশই মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। হঠাৎ করেই কাঁদানে গ্যাস ছোড়া শুরু হয়। রাস্তায় তখন কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।
দিনের শেষভাগে নুনেজ জানান, প্রায় ১ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তিনি আরও জানান, দুজন ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের একজন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তুলুজ শহরে এবং অন্যজন মধ্যাঞ্চলীয় ক্লেরমঁ-ফেরাঁ শহরে আহত হন।
প্যারিসে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জেলি নামের এক নারী বিবিসিকে বলেন, মানুষ সত্যিই হতাশ হয়ে রাস্তায় নেমেছে। ম্যাখোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
২৬ বছর বয়সী জেলি বলেন, তারা আমাদের চুপ করিয়ে রাখে। তারা আমাদের টাকা নিয়ে নেয়, আমাদের ওপর প্রচুর কর চাপায়, অথচ আমরা কিছুই বলতে পারি না। আজ আমরা রাস্তায় নেমেছি, কারণ অনেক সময় পেরিয়ে গেছে, আর সহ্য করা যাচ্ছে না।
মুখোশধারী দুই কিশোর বিক্ষোভকারী, যারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চায়নি, জানায়, তাদের প্রজন্ম চরম হতাশায় ভুগছে এবং সরকারের কাছ থেকে পুরোপুরি অবহেলিত বোধ করছে।
শনিবারের বিশৃঙ্খলার বিষয়ে এক বিক্ষোভকারী বলেন, আমার মনে হয় লুটপাট করাটা মোটেও ঠিক নয়। তবে দারিদ্র্য আর পুলিশের সহিংসতার কারণেই এমনটা ঘটছে। আমাদের দাবিগুলোর জবাব না পাওয়া পর্যন্ত এই বিক্ষোভ চলবে। আমরা সত্যিই ফ্রান্সে পরিবর্তন চাই।
এদিকে, উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় অর্লেয়ঁ শহরে কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালির বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি সমাবেশে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ অংশ নেন। সমাবেশটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়।
ফ্রান্সের মতো একই ধরনের ইস্যুতে শনিবার ইউরোপের আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। স্পেনের বার্সেলোনায় শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘অকারণে ঘটানো সহিংসতা’ বলে অভিহিত করেছে। এ ঘটনায় ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী হাজারো বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। উত্তর ইতালির মিলানে পুলিশ ও শত শত সেনাসদস্যের সমন্বয়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়। গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিক্ষোভকারীদের শহরে জড়ো হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে কর্তৃপক্ষ। গত সপ্তাহে সেখানে কয়েকজন বিক্ষোভকারী আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন, জানালার কাচ ভেঙেছিলেন এবং দোকানপাটে লুটপাট চালিয়েছিলেন।
গত সপ্তাহান্তে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ফ্রান্সে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর এসব বিক্ষোভে জনঅসন্তোষ আরও প্রকাশ পায়। এর পরের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রথম দিকে বিক্ষোভ মিছিলগুলো মূলত শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে সেগুলোর একাংশ সহিংসতা, লুটপাট ও ভাঙচুরে রূপ নেয়। ফ্রান্সজুড়ে দুই হাজারের বেশি দোকানপাট ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিআই) জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো হতে পারে।
এএফপির তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত গ্রেনেডের আঘাতে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে রাতের বেলা কারফিউ জারি করতে বাধ্য হয়েছে।
ফ্রান্সে ছয় মাস পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এমন সময়ে ধারাবাহিক বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান প্রার্থীরা চলমান পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ ও তার মন্ত্রীদের দায়ী করেছেন।
ছবি : সংগৃহীত
ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্কুল বন্ধ রাখার অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ এক পরিকল্পনা ফেঁদেছিল এক কিশোরী শিক্ষার্থী। তবে সেই ফন্দি শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জন্য। দিল্লির লোধি রোডের ‘এয়ার ফোর্স বাল ভারতী স্কুল’-এ বোমাতঙ্কের ভুয়া ইমেইল পাঠানোর অভিযোগে শেষ পর্যন্ত পুলিশের জালে ধরা পড়েছে ওই স্কুলেরই এক নাবালিকা ছাত্রী। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত ২৩ অক্টোবর স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে একটি উড়ো হুমকি সম্বলিত ইমেইল পাঠানো হয়। ইমেইলটির সাবজেক্ট লাইনে লেখা ছিল—‘আপনার ভবনে বোমা রাখা আছে’ (Bombs Placed in Your Building)। সম্প্রতি ভারতের রাজধানী দিল্লির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে বোমাতঙ্কের হুমকি ইমেইল আসার প্রেক্ষাপটে এই বার্তাকে ঘিরে মুহূর্তেই চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রেরককে শনাক্ত করতে বিস্তারিত কারিগরি ও ডিজিটাল তদন্ত শুরু করে দিল্লি পুলিশ। সাইবার ইউনিটের সহায়তায় ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইপি অ্যাড্রেস এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত লিংক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, হুমকি বার্তাটি বাইরের কোনো সন্ত্রাসী চক্রের নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটিরই এক নাবালিকা ছাত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, কোনো ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে নয়, কেবল সেদিন যেন স্কুলটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়—সেই ইচ্ছাতেই ছুটির লোভে এই বোমাতঙ্কের নাটক সাজিয়েছিল ওই কিশোরী।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ভারতের ‘জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট’-এর প্রযোজ্য ধারা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইন মেনে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
ফ্রান্সের পর এবার বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইতালি। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রোম, তুরিন ও বোলোনিয়ায় কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ। এদিকে সহিংসতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি।
তুরিনে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল ও আতশবাজি ছুড়লে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। একইভাবে রোমে মিছিল চলাকালে বোতল ছোড়ার ঘটনা ঘটলে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। বার্তা সংস্থা আনাদোলু ও ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বোলোনিয়ায়ও বিক্ষোভকারীদের বোতল ও পটকা নিক্ষেপের পর পুলিশ তাদের পিছু হটিয়ে দেয়। এ ছাড়া মিলান ও ফ্লোরেন্সে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার কয়েকটি অংশে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেয় পুলিশ।
এদিকে গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের সময় সংঘটিত সহিংসতার তদন্তে ইতালির বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মিলান ও পার্শ্ববর্তী মনজা শহরসহ মোট ২২টি শহরে দেড় শতাধিক স্থানে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
আনসার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশের প্রতি হুমকি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার পরিকল্পনা, যানবাহন ভাঙচুর এবং ভবনে আগুন দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি জানিয়েছেন, যেসব শহরকে নিরাপত্তার দিক থেকে বিশেষভাবে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিক্ষোভের নামে সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।