ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১২:০২ পিএম

জুমার দিন ইসলামি সংস্কৃতিতে ‘সাপ্তাহিক ঈদের দিন’। জুমার দিন শুধু সাধারণ সাপ্তাহিক ছুটির দিন নয়, বরং এটি আত্মিক জাগরণ, পাপমুক্তি এবং মহান আল্লাহর খাস রহমত অর্জনের এক মহিমান্বিত সুযোগ।


এক ব্যক্তি জানতে চান, কেউ যদি ইমামের খুতবা চলাকালীন সময় সুন্নতের নিয়ত করেন, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?


উত্তরে ঢাকার মারকাযুশ শরীয়াহ আলইসলামিয়ার হাদীস ও ফিকহ বিভাগের শিক্ষক মুফতী নাঈম সিদ্দীকী বিন আব্দুস সাত্তার বলেন, ইমামের খুতবা চলাকালীন সময় নামাজের নিয়ত করা নিষেধ।


عن ابن عمر قال : سمعت النبي صلى الله عليه و سلم يقول إذا دخل أحدكم المسجد والإمام يخطب على المنبر فلا صلاة ولا كلام حتى يفرغ الإمام


অনুবাদ-আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ বলেন-আমি রাসূল (স.) -কে বলতে শুনেছি যে, যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করে আর ইমাম খুতবা দিচ্ছে মিম্বরের উপর, তাহলে ইমাম ফারিগ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো নামায নেই, কোনো কথাও নেই। (মাযমাউজ জাওয়ায়েদ, ২/১৮৪, হাদীস নং-২০১৪) ইবনে হিব্বান (রহ.) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।


عن ثعلبة بن أبى مالك القرظي : أن جلوس الإمام على المنبر يقطع الصلاة وكلامه يقطع الكلام (شرح معانى الآثار، كتاب الصلاة، باب الرجل يدخل المسجد يوم الجمعة والإمام يخطب هل ينبغي له أن يركع أم لا، رقم الحديث-2014)


অনুবাদ-হযরত সা’লাবা বিন আবি মালিক আল কুরাজী (রা.) বলেন- ‘নিশ্চয় ইমামের মিম্বরে বসা নামায বন্ধ করে দেয়, আর তার কথা বলা কথাকে বন্ধ করে দেয়’। (তাহাবী শরীফ, ১/৩৭০, হাদীস নং-২০১৪) এই হাদীসটি সহীহ।


أن أبا هريرة أخبره أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال إذا قلت لصاحبك يوم الجمعة أنصت والإمام يخطب فقد لغوت (صحيح البخارى-كتاب الجمعة، باب الإنصات يوم الجمعة والإمام يخطب، رقم الحديث-892


অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন- রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- ‘যখন তুমি তোমার পাশের জনকে জুমআর দিন বল-চুপ থাক, এমতাবস্থায় যে, ইমাম সাহেব খুতবা দিচ্ছে, তাহলে তুমি অযথা কাজ করলে।’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৮৯২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০০৫)




  • প্রকাশ : শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৯:৩৭ এএম

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তরুণ সাহাবিরাই পালন করেছেন। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো তরুণেরা নবীজির হাতে গড়ে উঠেছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন আলেম, কেউ প্রচারক, কেউ প্রশাসক, কেউ সেনাপতি। তাঁদের যোগ্যতা এক ছিল না। দায়িত্বও এক ছিল না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে রাসুল (সা.) এমন কিছু দেখেছিলেন, যা অন্যরা হয়তো তখনো দেখতে পায়নি।


তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাই মহানবীর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তিনি উপদেশ দিয়েছেন, আবার দায়িত্বও দিয়েছেন। ভুল শুধরে দিয়েছেন, আবার আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছেন। ইমান তৈরি করেছেন, আবার সেই ইমানের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগও দিয়েছেন।


১. ভালোবাসার মাধ্যমে তরুণের হৃদয় জয় করা


কোনো মানুষকে সংশোধন করতে হলে আগে তার হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়। রাসুল (সা.)  তরুণদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, যাতে তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে নিজেদের কথা বলতে পারত। এর একটি অসাধারণ উদাহরণ সেই যুবক, যে নবীজির কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল।


সাহাবিরা তার কথায় ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে ধমক দিলেন না। বললেন, ‘তাকে আমার কাছে আসতে দাও।’ এরপর তাকে কাছে বসিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এমনটা পছন্দ করবে?’


যুবক বলল, ‘না, আল্লাহর কসম।’ তিনি বললেন, ‘মানুষও তাদের মায়ের জন্য তা পছন্দ করে না।’ এরপর কন্যা, বোন, ফুফু ও খালার কথা উল্লেখ করলেন। প্রতিবার যুবক একই উত্তর দিল। শেষে রাসুল (সা.)  তার জন্য দোয়া করলেন।


বর্ণনাকারী আবু উমামাহ (রা.) বলেন, এরপর ওই যুবকের কাছে ব্যভিচারের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কিছু ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)


২. প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে বিকশিত করা


প্রত্যেক মানুষ একই ধরনের যোগ্যতা নিয়ে জন্মায় না। কেউ জ্ঞান অর্জনে এগিয়ে, কেউ নেতৃত্বে, কেউ ভাষা ও লেখায়, কেউ দাওয়াতের কাজে। রাসুল (সা.) তরুণদের সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তোলেননি। তিনি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র যোগ্যতা চিনেছেন এবং সেই অনুযায়ী তাদের তৈরি করেছেন।


জায়েদ ইবনে সাবিত ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী তরুণ। রাসুল (সা.) তাঁর শেখার ক্ষমতা লক্ষ করেছিলেন। তাই তাঁকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। জায়েদ (রা.) বলেন, তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাষা শিখে ফেলেন। এরপর ইহুদিদের চিঠি নবীজির কাছে পড়ে শোনাতেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে তাদের চিঠি লিখতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১৫)


পরবর্তী সময়ে তিনি ওহি লেখকদের অন্যতম হন। কোরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ফরায়েজ শাস্ত্রেও তিনি বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মধ্যেও তিনি জ্ঞানের বিশেষ যোগ্যতা দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তাঁকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাঁকে কোরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৩)


পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।


৩. আত্মবিশ্বাস তৈরি করা


তরুণ বয়সে আত্মবিশ্বাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ যদি মনে করে, ‘আমি পারি না’, তাহলে তার অনেক যোগ্যতাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। রাসুল (সা.)  তাই প্রয়োজনমতো তরুণদের ভালো গুণের প্রশংসা করতেন।


আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘এর পর থেকে তিনি খুব কমই রাতের নামাজ ছেড়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১২২)


এখানে নবীজি (সা.) সরাসরি ‘তুমি তাহাজ্জুদ পোড়ো না’ বলে ভর্ৎসনা করেননি। আগে তার ভালো দিকটি উল্লেখ করেছেন। তারপর উন্নতির একটি পথ দেখিয়েছেন। এ ধরনের প্রশংসা মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।


৪. তরুণদের হাতে বাস্তব দায়িত্ব তুলে দেওয়া


রাসুল (সা.) তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে প্রস্তুত করেননি; যোগ্যতা দেখলে তাদের বর্তমানেই দায়িত্ব দিয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।


নবীজি তাঁকে একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই বাহিনীতে বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক বড় সাহাবিও ছিলেন। ওসামা তখন তরুণ। কিছু মানুষ তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করলে নবীজি বললেন, ‘তোমরা যদি ওসামার নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করো, এর আগে তাঁর পিতার নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি করেছিলে। আল্লাহর শপথ, সে নেতৃত্বের উপযুক্ত ছিল। আর তার পরে ওসামাও আমার কাছে প্রিয় এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৩০)


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাসুল (সা.) নেতৃত্ব শেখানোর জন্য ওসামাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করাননি। তাঁর যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে বাস্তব দায়িত্ব দিয়েছেন। কেননা দায়িত্ব পালন করতে করতেই দায়িত্বশীলতা তৈরি হয়।


৫. পাঠশালা থেকে পাঠিয়ে দিতেন জীবনের মাঠে


শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ না পায়, তাহলে তার প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। রাসুল (সা.) তরুণদের জ্ঞান দিয়েছেন এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগও দিয়েছেন।


মুসআব ইবনে ওমাইর (রা.) ছিলেন তরুণ। হিজরতের আগে নবীজি তাঁকে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।


মদিনায় গিয়ে তিনি মানুষের কাছে ইসলাম তুলে ধরেন। তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে সাদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মাধ্যমে আরও বহু মানুষ ইসলামের দিকে আসে।


৬. ইমান ও চিন্তার ভিত শক্ত করা


তরুণকে দায়িত্ব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে তার চিন্তার ভিত শক্ত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) তাই তরুণদের সঙ্গে এমন কথাও বলতেন, যা তাদের পুরো জীবনদর্শন গড়ে দিত।


আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন তখন কিশোর। এক সফরে তিনি নবীজির বাহনের পেছনে বসে ছিলেন। সেই সময় নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, ‘হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাব।’


এরপর বললেন, ‘আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাইবে। সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখবে, সমগ্র মানুষ তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কিছু করতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)


পরে ইবনে আব্বাস (রা.) উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে পরিণত হন।


৭. শুধু শিষ্য নয় শিক্ষক বানাতেন


নবীজির কাছে কয়েকজন তরুণ প্রায় ২০ দিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের পরিবারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। এটা বুঝতে পেরে তিনি তাঁদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। কিন্তু তাঁদের যাওয়ার সময় বললেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও, তাদের শিক্ষা দাও এবং তাদের সৎকাজের নির্দেশ দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭২৪৬)


লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁরা নবীজির কাছে এসেছিলেন শিখতে। আর ফিরে গেলেন শিক্ষক হয়ে। এটাই নবীজির দীক্ষার বড় বৈশিষ্ট্য যে মানুষকে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা নয়; তাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সে নিজেই অন্যদের পথ দেখাতে পারে।


জুমার দুই খুতবার মাঝে খতিব বসেন কেন? ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ২:০৩ পিএম

খুতবা জুমার নামাজের অপরিহার্য অংশ। খুতবা ছাড়া জুমার নামাজ হয় না। যেসব কাজ নামাজের মধ্যে হারাম, তা জুমার খুতবা চলাকালীন সময়ও হারাম। খুতবার সময় মুসল্লিদের চুপ থাকা ওয়াজিব। এ সময় সকল প্রকার কথাবার্তা এমনকি জিকির থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে।


নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর কুবার মসজিদে প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেন। এ নামাজে তিনি নিজেই ইমামতি করেন। এ দিন জুমার নামাজের আগে তিনি দুটি খুতবা প্রদান করেন। তখন থেকেই শুক্রবারে জুমার নামাজের জামাতের আগে দুটি খুতবা প্রদানের নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। ওফাতের আগ পর্যন্ত নবীজি (সা.) এবং তার পর খলিফা ও অন্যান্য সাহাবিরাও জুমার আগে দুটি খুতবা দিতেন।


জুমার আগে দুই খুতবা দেওয়াকে ইসলামি আইনজ্ঞরা সুন্নতে মুয়াক্কাদা বলেছেন। এক খুতবা দিয়ে জুমার নামাজ পড়ালে জুমার নামাজ শুদ্ধ হয়ে গেলেও তা মাকরুহ হবে।


জুমার দুই খুতবার মাঝে খতিবগণ সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বসেন, এটাও নবীজির (সা.) সুন্নত। জাবের ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার আগে দুটি খুতবা দিতেন, উভয় খুতবার মাঝখানে বসতেন। খুতবায় তিনি কোরআন পড়তেন এবং জনগণকে উপদেশ দিতেন। (সহিহ মুসলিম: ১৮৮০)


ইসলামি আইনজ্ঞ ও গবেষকগণ জুমার দুই খুতবার মাঝখানে খতিবদের এই সংক্ষিপ্ত সময় বসার কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন:


১. সুন্নত পালন

মহানবী (সা.) যেহেতু জুমার জুমার দুই খুতবার মাঝে বসতেন, তার পর সাহাবায়ে কেরামসহ পরবর্তী যুগের মুসলমান ও আমাদের সময়ের খতিবগণেরও দুই খুতবার মাঝে বসার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর মহানবীর (সা.) সুন্নত পালন করা। তাঁর হুবহু অনুকরণ করা।


২. শারীরিক স্বস্তি ও দুই খুতবাকে আলাদা করা

টানা বক্তব্য প্রদানের পর মাঝখানের এই সংক্ষিপ্ত বিরতি খতিব বা বক্তার শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, শ্রোতারাও দীর্ঘ সময় একনাগাড়ে শোনার পর কিছুটা স্বস্তি পান। এটি খুতবার মূল বিষয়ের আলোচনাকে দুটি সুনির্দিষ্ট ও গোছানো অংশে পূর্ণতা দিতে ভূমিকা রাখে।


৩. দুই রাকাত নামাজের স্থলাভিষিক্ত হওয়া

অনেক আলেমের মতে, সাধারণ দিনগুলোতে জোহরের ফরজ নামাজ চার রাকাত হলেও জুমার দিন তা সংক্ষেপ করে দুই রাকাত করা হয়েছে, বাকি দুই রাকাতের শূন্যতা বা ঘাটতি পূরণ করে এই দুটি খুতবা, যা জুমার নামাজেরই অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়। তাই জুমার আগে দুটি খুতবাই দিতে হয় এবং দুই খুতবার মাঝখানে বসার মাধ্যমে দুই খুতবাকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা হয়।



ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : সোমবার ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:৩৮ এএম

মানবজীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা ও পরম পাওয়া হলো বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন করা। প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ের সুপ্ত আকুলতা থাকে—কীভাবে তিনি তাঁর রবের প্রিয়পাত্র হবেন, কীভাবে লাভ করবেন তাঁর অসীম রহমত ও সান্নিধ্য। পবিত্র কোরআন কেবল নির্দেশনার কিতাব নয়; বরং এটি এমন এক জীবন্ত আলোকবর্তিকা, যেখানে আল্লাহ নিজেই সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন বান্দার কোন কোন গুণ ও আচরণ তাঁর কাছে সর্বাধিক প্রিয়।


পবিত্র কোরআনের আলোকে আল্লাহর খাঁটি ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের ছয়টি মৌলিক গুণ ও আমল আলোচনা করা হলো।


১. সার্বক্ষণিক খোদাভীতি অর্জন


আল্লাহর ভালোবাসা লাভের প্রধানতম সোপান হলো অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত রাখা। তাকওয়া কেবল নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়; বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও নজরদারির অনুভূতি নিয়ে চলাই হলো প্রকৃত তাকওয়া।


আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, ‘হ্যাঁ, যে ব্যক্তি তার অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭৬)


তাকওয়ার প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে তখন, যখন মানুষ লোকচক্ষুর অন্তরালে সম্পূর্ণ নির্জনতায় থাকে। যেখানে পাপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধু আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংযত রাখা এবং প্রবৃত্তির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়াই হলো খাঁটি মুত্তাকির বৈশিষ্ট্য।


২. তাওবার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন


মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; প্ররোচনা ও দুর্বলতার বশবর্তী হয়ে মানুষের পদস্খলন ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু পাপের পর যে হৃদয় উদ্ধত না হয়ে অপরাধ স্বীকার করে, অনুতপ্ত হয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয় এবং বিনীতভাবে রবের কাছে ফিরে আসে—সেই অন্তর আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।


পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২)


পাপ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত তার চেয়ে বহুগুণ প্রশস্ত। বান্দা যখন অনুতপ্ত হয়ে এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলে তাওবা করে, তখন আল্লাহ–তাআলা মরুভূমিতে পথহারা উট ফিরে পাওয়ার চেয়েও অধিক আনন্দিত হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৯)


৩. পরোপকারে নিবেদিত হওয়া


আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার অন্যতম প্রধান গুণ হলো ‘ইহসান’ বা আন্তরিক সৎকর্মশীলতা। এর অর্থ হলো প্রতিটি ভালো কাজকে সুন্দর, ত্রুটিহীন ও সর্বোত্তম রূপে সম্পন্ন করা এবং সৃষ্টির প্রতি নিঃস্বার্থ সদাচরণ করা।


আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দেন, ‘আর তোমরা সৎকর্ম করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)


ইহসান কেবল নামাজের একাগ্রতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া এবং মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলাও ইহসানের অন্তর্ভুক্ত।


লোকচক্ষুর অন্তরালে নিঃস্বার্থভাবে করা একটি ছোট সৎকাজও আল্লাহর দরবারে নাজাতের অসিলা হয়ে যেতে পারে।


৪. আল্লাহর ওপর অটল নির্ভরতা


পার্থিব জীবনে মানুষের পরিকল্পনা অনেক সময় ভেস্তে যায়, প্রিয়জনেরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং চারদিকের সমস্ত পথ রুদ্ধ বলে মনে হয়। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও হতাশ না হয়ে আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই হলো ‘তাওয়াক্কুল’।


আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)


তাওয়াক্কুল অর্থ চেষ্টা ও কর্ম পরিত্যাগ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং সাধ্যমতো সঠিক উপকরণ ও সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করার পর চূড়ান্ত ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর সঁপে দেওয়া।


রাসুল (সা.) এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আগে তোমার উটটি রশি দিয়ে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)


৫. প্রতিকূলতায় ধৈর্যধারণ


মানবজীবন পরীক্ষা ও সংকটের এক নিরবচ্ছিন্ন ক্ষেত্র। রোগব্যাধি, আর্থিক ক্ষতি, প্রিয়জন বিয়োগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মানুষের সামনে বারবার এসে দাঁড়ায়। এই কঠিন মুহূর্তগুলোতে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল থাকার নামই হলো ‘সবর’।


কোরআনে আল্লাহ–তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪৬)


ধৈর্যশীল বান্দা জানে—দুঃখের পরই আসে স্বস্তি এবং সাময়িক এই পরীক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনন্ত কল্যাণের প্রতিশ্রুতি। এই বিশ্বাসের ওপর অটল থাকাই মুমিনকে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল করে।


৬. আপসহীন ন্যায়পরায়ণতা


আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত হলো ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে সুবিচার এবং ইনসাফ কায়েম রাখা।


আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘...এবং তোমরা তাদের সঙ্গে সুবিচার করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত: ৮)।


ইনসাফ কেবল বিচারালয়ের কাঠগড়ায় সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। নিজ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সমতা বজায় রাখা, কর্মক্ষেত্রে অধীনদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া, নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও সত্যের পক্ষে সাক্ষী দেওয়া এবং কারও দুর্বলতার সুযোগ না নেওয়া—এসবই হলো প্রাত্যহিক জীবনের ইনসাফ।


  • প্রকাশ : বুধবার ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১১:০৫ এএম

দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যস্ততা, অলসতা কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে অনেকেরই নিয়মিত নামাজ ছুটে যায়। ইসলামে নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা ফরজ। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর সেই নামাজ আদায়ের সুযোগ আছে কি না, ইসলামি শরিয়তে কাজা নামাজ বলতে আদৌ কিছু আছে কি না, কিংবা ইচ্ছাকৃত নামাজ ছাড়লে তা কাজা করতে হয় কি না—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি রয়েছে।


কাজা নামাজ কী


ইসলামি আইনশাস্ত্রে (ফিকহ) ফরজ আমল আদায়ের দুটি রূপ রয়েছে:


আদা: শরিয়ত নির্ধারিত সময়ের ভেতরে নামাজ আদায় করা।


কাজা: নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ছুটে যাওয়া নামাজ পরবর্তীতে পড়ে দায়িত্বমুক্ত হওয়া।


আল্লাহ–তাআলা নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩)


তবে মানুষের ভুলত্রুটি বা বাধার কারণে ওয়াক্ত পার হয়ে গেলে সেই নামাজ আল্লাহর ‘ঋণ’ হিসেবে বান্দার ওপর থেকে যায় কি না, তা-ই কাজা নামাজের মূল প্রতিপাদ্য।


কাজা নামাজের প্রামাণিক ভিত্তি


ইসলামে কাজা নামাজের অস্তিত্ব হাদিসের স্পষ্ট বিবরণ ও মুসলিম মনীষীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) দ্বারা প্রমাণিত।


১. অনিচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছুটে গেলে: ঘুম বা ভুলে যাওয়ার কারণে নামাজ কাজা হলে তা স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করা ফরজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নামাজের কথা ভুলে যায় কিংবা ঘুমের কারণে তা ছুটে যায়, তার কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হলো—যখনই তার মনে পড়বে, তখনই সে তা আদায় করে নেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭)


খন্দকের যুদ্ধের সময় কাফেরদের তীব্র আক্রমণের কারণে রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের আসরের নামাজ ওয়াক্তমতো আদায় করা সম্ভব হয়নি। সূর্যাস্তের পর তিনি প্রথমে আসরের কাজা এবং পরে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৬)


অনিচ্ছাকৃত কাজা আদায়ের ব্যাপারে সব যুগের আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে। (আন-নববি, আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ৩/৬৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, তাবি; ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ১/৪৩৫, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ১৯৯৭)


২. ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দিলে: কোনো যুক্তিসংগত অপারগতা ছাড়া ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগ করা মহাপাপ (কবিরা গুনাহ)। এটা চার মাজহাবের সর্বসম্মত মত। তবে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও খাঁটি তওবার পাশাপাশি পূর্বের সব ছুটে যাওয়া নামাজের কাজা আদায় করা আবশ্যক:


হানাফি মাজহাব: ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগকারীর নামাজ জিম্মায় দায় হিসেবে থেকে যায় এবং তা কাজা করা ছাড়া দায়মুক্ত হওয়া যায় না। (আস-সারাখসি, আল-মাবসুত, ১/১২৪, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৯৩)


মালিকি মাজহাব: ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগের পরও অনুতপ্ত হয়ে পূর্বের নামাজ কাজা আদায় করা ফরজ। (ইবনে আবদিল বার, আল-ইস্তিজকার, ২/৭৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)


শাফিয়ি মাজহাব: ইমাম শাফিয়ি যুক্তি দেন, ঘুমন্ত ব্যক্তির যদি কাজা লাগে, তবে অবহেলাকারীর ক্ষেত্রে কাজা আদায় আরও বেশি প্রযোজ্য। (আশ-শাফিয়ি, কিতাবুল উম্ম, ১/১৪৭, দারুল ওয়াফা, আল-মানসুরা, ২০০১)


হাম্বলি মাজহাব: অনুতপ্ত নামাজ ত্যাগকারী ইসলামের ওপর অটল থাকলে তার অতীত জীবনের নামাজ ধারাবাহিকভাবে কাজা করতে হবে। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ১/৪৩৮, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ১৯৯৭)


কাজা নামাজ নিয়ে সন্দেহ কেন


ইতিহাসের কিছু ফকিহ ও আলেম—যেমন ইমাম ইবনে হাজম, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম প্রমুখ মত দেন যে ইচ্ছাকৃত নামাজ ছাড়লে পরবর্তী সময়ে আর কাজা হয় না। (আল-মুহাল্লা বিল আসার, ২/২৩৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৮; মাজমুউল ফাতাওয়া, ২২/৩৭, মাজমাউল মালিক ফাহাদ, মদিনা, ১৯৯৫; কিতাবুস সালাত ওয়া হুকমু তারিকিহা, পৃ. ৬৪, দারুল ইমাম আল-বুখারি, দামেস্ক, ২০০৬)


তাঁদের মূল যুক্তিগুলো হলো:


সময়ের বাধ্যবাধকতা: ওয়াক্ত আসার আগে যেমন নামাজ হয় না, তেমনি ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পরও তা পড়ার সুযোগ নেই।


ভুল তুলনা: হাদিসে শুধু ঘুমন্ত ও ভুলোমনা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। কোনো ক্ষমার যোগ্য অপারগ ব্যক্তির বিধানকে ইচ্ছাকৃত অপরাধীর ওপর চাপানো ঠিক নয়।


নতুন নির্দেশের অভাব: শরিয়তে সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ইচ্ছাকৃত ত্যাগকারীর জন্য নতুন কোনো কাজা করার সরাসরি আদেশ আসেনি।


নফল দিয়ে পূরণ: রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন ফরজের ঘাটতি থাকলে আল্লাহ নফল দিয়ে তা পূরণ করবেন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪১৩)। তাই তাঁদের মতে, কাজা না পড়ে বেশি বেশি নফল পড়া উচিত।


সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহদের জবাব


চার মাজহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ (জমহুর ওলামা) এই সন্দেহের জবাব দিয়েছেন:


অগ্রাধিকারমূলক যুক্তি: কোনো অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও যদি ঘুম বা বিস্মৃতির কারণে আল্লাহর হক বাতিল না হয়ে কাজা করা লাগে, তবে অবহেলাকারী অপরাধীর ক্ষেত্রে নামাজ মাফ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তার দায় আরও কঠোর।


আল্লাহর ঋণ পরিশোধের মূলনীতি: রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর প্রাপ্য ঋণ পরিশোধ করাই সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৫৩)। নামাজ হলো একটি ঋণ; সময় পার হলেও বান্দার কাঁধ থেকে এই ঋণ দূর হয় না।


রোজার বিধানের সাদৃশ্য: রমজানের রোজা ইচ্ছাকৃত ভাঙলে সবার মতেই কাজা করতে হয়। রোজা যদি সময়ভিত্তিক হয়েও কাজা প্রযোজ্য হয়, তবে নামাজের ক্ষেত্রেও তা অবশ্য পালনীয়।


মুসলিম হিসেবে দায় বহাল: অলসতাবশত নামাজ ত্যাগকারী ব্যক্তি পাপী হলেও কাফের নয়। তাই তার অতীত জীবনের ফরজগুলোর দায় শরিয়ত অনুযায়ী বহাল থাকে।


নামাজ কাজা হলে কী করব


সংশয়ে পড়ে নামাজ কাজা না করে বসে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। চার মাজহাবের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী বিগত জীবনের কাজা নামাজ আদায় করে দায়মুক্ত হওয়াই নিরাপদ। তাই আমাদের করণীয় হলো:


আন্তরিক তাওবা: অতীতে নামাজ ছেড়ে দেওয়ার ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে কখনো নামাজ না ছাড়ার প্রতিজ্ঞা করা।


সম্ভাব্য হিসাব নির্ধারণ: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কত দিন বা বছর নামাজ পড়া হয়নি, তার একটি সতর্কতামূলক আনুমানিক সংখ্যা ঠিক করে নেওয়া।


দৈনন্দিন রুটিন করে বিগত কাজা পড়া: বর্তমান পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সঙ্গে পেছনের ছুটে যাওয়া এক বা একাধিক ওয়াক্তের কাজা ধারাবাহিকভাবে আদায় করা (যেমন: আজকের ফজরের সঙ্গে পেছনের একটি কাজা ফজর পড়ে নেওয়া)।


সহজ নিয়ত: মনে মনে নিয়ত করা, ‘আমার দায়িত্বে থাকা পেছনের ছুটে যাওয়া কাজা নামাজের মধ্য থেকে প্রথম বা শেষ অমুক ওয়াক্তের (যেমন: ফজর/জোহর) ফরজ নামাজ আদায় করছি।’


শুধু ফরজ নামাজের কাজা পড়া: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তের ১৭ রাকাত ফরজ এবং এশার সঙ্গের ৩ রাকাত বিতর—মোট ২০ রাকাত। সাধারণ সুন্নত বা নফল নামাজের কাজা পড়তে হয় না।


অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি তাওবার পাশাপাশি নিয়মিত কাজা নামাজ আদায় করে নেওয়াই একজন সচেতন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাঠগড়ায় দায়মুক্তির নিশ্চয়তা লাভ করতে পারে।


  • প্রকাশ : শনিবার ২৯ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৩:২০ পিএম

দুনিয়ার জীবনে মানুষের দুঃখ-কষ্টের সীমা নেই। তা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক যেকোনো ধরনের বিষয়ে মানুষের ওপর বিপদ-আপদ নেমে আসতে পারে। কারণ এই জগতে সবাইকে পরীক্ষা করাই আল্লাহর উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে আখিরাতে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিদান পাওয়া যায়। তাই পার্থিব জীবনে কোনো বিপদ-আপদে মুমিনের করণীয় হলো, ধৈর্য ধারণ করা ও কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণে অবিচল থাকা।


আল্লাহ বলেন, আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তার কাছেই ফিরে যাবো।' তাদের ওপরই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত, আর তারাই সঠিক পথে পরিচালিত।' (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৫-১৫৭)


আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ মুমিনদের নানাভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। আর বিপদগ্রস্তদের মধ্যে যারা আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তাদের জন্য বিশেষ সুসংবাদ রয়েছে।


সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেছেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন কারা? তখন তিনি বললেন, নবীগণ, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী মর্যাদার অধিকারী অর্থাত্ নেককার বান্দারা। তারপর যারা তাদের পরবর্তী মর্যাদার অধিকারী। মানুষকে তার দ্বিনের দৃঢ়তা অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। তার দ্বিনের মধ্যে যদি দৃঢ়তা থাকে, তাহলে তার পরীক্ষাও কঠিন করা হয়। আর তার দ্বিনের মধ্যে যদি দুর্বলতা থাকে, তাহলে তার পরীক্ষা হালকা করা হয়। আর বান্দার ওপর একের পর এক বিপদ-আপদ আসতেই থাকে, অবশেষে সে পৃথিবীর বুকে এমন অবস্থায় চলাফেরা করে যে, তার ওপর কোনো গুনাহ অবশষ্টি থাকে না।' (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৯৮)


তাই কোনো বিবাদ ও ঝামেলায় ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর কাছে আকুতি-মিনতি জানানো একমাত্র সম্বল। ইরশাদ হয়েছে, যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধারণ করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিজিক প্রদান করেছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভালো কাজের মাধ্যমে মন্দকে দূর করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের শুভ পরিণাম।' (সুরা রাআদ, আয়াত : ২২-২৪)


বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে অগণিত পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, আর আল্লাহর জমিন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরই তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।' (সুরা ঝুমার, আয়াত : ১০)


উম্মে সালামা (রা.) বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কোনো মুসলিমের ওপর যখন কোনো বিপদ-আপদ আসে এবং সে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তার কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদের জন্য আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। তখন আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।'


উম্মে সালামা (রা.) বলেন, যখন আবু সালামা (রা.) মারা যান, তখন আমি মনে মনে বললাম, আবু সালামার চেয়ে উত্তম কোনো মুসলিম আর কে হতে পারে?' তিনি তো ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সর্বপ্রথম তার পরিবারসহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে হিজরত করেছিলেন। এরপরও আমি রাসুলুাল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সেই দোয়া পাঠ করলাম, হে আল্লাহ! আমার এই বিপদের জন্য আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।' তখন আল্লাহ আমাকে আবু সালামার পরিবর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দান করলেন।


এরপর উম্মে সালামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য সাহাবি হাতিব ইবনু আবি বালতাআ (রা.)-কে আমার কাছে পাঠালেন।' আমি বললাম, আমার একটি ছোট শিশু-কন্যা রয়েছে এবং আমি খুবই আত্মমর্যাদাশীল ও ঈর্ষাপ্রবণ।'


তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মেয়ের ব্যাপারে আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করব, যেন তিনি তাকে তোমার মুখাপেক্ষী না রাখেন। আর তোমার ঈর্ষা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব, যেন তিনি তোমার সেই ঈর্ষা দূর করে দেন।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১৮)


মহান আাল্লাহ সবাইকে সব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন।


  • প্রকাশ : শুক্রবার ২৮ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৩:২৭ পিএম

ইসলাম মানুষের জীবনকে কৃচ্ছ্রসাধনের অন্ধকারে আবদ্ধ না করে বৈধ স্বাচ্ছন্দ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। তবে সেই অনুমতির সঙ্গে শিখিয়েছে সংযম ও ভারসাম্য। মানুষ খাবে, পরবে, ব্যয় করবে এবং আল্লাহর নেয়ামত উপভোগ করবে, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই সীমা অতিক্রম কিংবা অপচয় করবে না। মানবজীবনে অপচয়ের সাতটি প্রভাব হলো-


১. আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়া


একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মহান আল্লাহর ভালোবাসা। সম্পদ, সম্মান, নেতৃত্ব কিংবা ক্ষমতা যত মূল্যবানই হোক, রবের সন্তুষ্টি ও ভালোবাসার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।


আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)


এ সংক্ষিপ্ত নির্দেশনার মধ্যেই অপচয়বিরোধী ইসলামি দর্শনের মূল কথা নিহিত রয়েছে।


২. অপচয়কারী শয়তানের ভাই


শয়তান মানুষের মধ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতার প্রবণতা সৃষ্টি করতে চায়। অপচয়ও মানুষকে এমন এক মানসিকতার দিকে নিয়ে যায়, যেখানে সে প্রাপ্ত নেয়ামতের যথাযথ মূল্য না দিয়ে অবহেলায় তা নষ্ট করে।


এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)


আয়াতে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। এটি অপচয়ের চরিত্রগত বিপজ্জনক দিকটি তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষা।


৩. নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা


অপচয়ের একটি গুরুতর প্রভাব হলো অন্তর থেকে নেয়ামতের প্রকৃত মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া। একটি খাদ্য কণার পেছনে অগণিত মানুষের পরিশ্রম আর আল্লাহর অপরিসীম করুণা জড়িয়ে থাকে। এ বোধ যার অন্তরে জাগ্রত থাকবে, তার বিবেক কোনো কিছু নষ্ট করতে সায় দেবে না। আল্লাহর এসব নেয়ামত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার দাবি রাখে।


মহান আল্লাহ সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব আর তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)


কেবল মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার নাম কৃতজ্ঞতা নয়, প্রকৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহারে। অর্থসম্পদের অপচয় অকৃতজ্ঞতারই বাহ্যিক রূপ।


৪. নেয়ামত পরিবর্তনের আশঙ্কা


মানুষ যখন কোনো অনুগ্রহের যথাযথ মূল্য না দেয়, তখন তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ইতিহাসে বহু জাতি প্রাচুর্য ও ক্ষমতা পেয়েও তা সংরক্ষণ করতে পারেনি, অকৃতজ্ঞতার ফলে তাদের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল।


কোরআনে এসেছে, ‘এটি এ কারণে যে আল্লাহ কোনো জাতিকে যে নেয়ামত দান করেছেন, তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না করা পর্যন্ত তিনি তা পরিবর্তন করেন না।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৫৩)


অপচয় কোনো সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করলে তার ক্ষতি কেবল দু-একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য নষ্ট হলে খাদ্যের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়, পানির অপব্যবহার করলে পানিসংকট তৈরি হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অসংযত ব্যবহারে জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয় এবং এর প্রভাব একসময় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ব্যক্তিপর্যায়ের অসচেতনতা তখন সামষ্টিক বোঝায় পরিণত হয়।


৫. প্রাচুর্যের মোহে আখিরাতবিমুখ হয়ে পড়া


অপচয়ের অভ্যাস কখনো কখনো এমন এক জীবনদর্শনে পরিণত হয়, যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে আকাঙ্ক্ষাই মানুষের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। ফলে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চাহিদা জন্ম নিতে থাকে। একটি প্রাপ্তি আরেকটি প্রাপ্তির ক্ষুধা বাড়ায়। মৃত্যু ছাড়া এ প্রতিযোগিতার কোনো শেষ গন্তব্য নেই।


আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফিল করে রেখেছে, এমনকি তোমরা কবরস্থানে পৌঁছে গেছ।’ (সুরা তাকাসুর, আয়াত: ১-২)


জীবনের সব অর্জন যদি ভোগবিলাস ও প্রতিযোগিতার পেছনে ব্যয় হয়, তাহলে আখিরাতের প্রস্তুতি ক্রমেই গুরুত্ব হারাতে থাকে। অপচয় কখনো কখনো মানুষের অন্তর থেকেও জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যকে বিস্মৃত করে দেয়।


৬. পরকালীন জবাবদিহি


মানুষের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে সে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। উপার্জনের উৎস যেমন প্রশ্নের বিষয়, তেমনি ব্যয়ের খাতও জবাবদিহির অন্তর্ভুক্ত।


নবীজি (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, (তার মধ্যে একটি হলো) তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)


এ হাদিস মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে পরকালীন দায়বদ্ধতাকেও যুক্ত করে দিয়েছে। অপচয়ের ক্ষেত্রে এ জবাবদিহির অনুভূতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাতে ব্যয় করা বৈধ হলেই তা সব সময় প্রশংসনীয় হয় না। তাই ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় সীমা লঙ্ঘন করার বিষয়েও মুমিনকে ভাবতে হবে।


৭. অর্থনৈতিক সংকট


অসংযত ব্যয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিণতি হলো অর্থনৈতিক সংকট। অপ্রয়োজনীয় খরচ যদি কারও নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে সে একসময় অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।


কোরআনে এসেছে, ‘তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং একেবারে পুরোপুরি প্রসারিতও করো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৯)


এখানে দুটি চরম অবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। একদিকে কৃপণতা, অন্যদিকে লাগামহীন ব্যয়। ইসলামের শিক্ষা মাঝামাঝি পথ। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উদারতা আর অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংযম।


অপচয় এমন একটি ব্যাধি, যার ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা, অসুস্থ সময়ের প্রস্তুতি কিংবা হঠাৎ নেমে আসা সংকট-এসব বিবেচনায় রেখে ব্যয় করা দূরদর্শী মানুষের গুণ। সুতরাং মিতব্যয়িতা দারিদ্র্যের প্রতীক নয়, এটি ভবিষ্যৎ-সচেতনতার পরিচয়।