প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
নতুন এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবছরের মতো এবারও জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধিবেশনের উদ্বোধন হয়। এতে যোগ দিতে আগামীকাল সোমবার নিউইয়র্কে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। এর মধ্য দিয়ে মা-বাবার পারিবারিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আসছেন তারেক রহমান।
দীর্ঘদিন পর তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর স্মরণীয় করে রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। দফায় দফায় বৈঠক করছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানাতে নিউইয়র্কের জনএফ কেনেডি বিমানবন্দরে যাবেন হাজারো নেতাকর্মী। গতকালও কয়েকটি প্রস্তুতি সভা করেছেন তারা।
কর্মব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রধানমন্ত্রী
স্থানীয় সময় সোমবার নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর কর্মব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অবস্থান করবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফরের শুরুতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। বৈঠকে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্যকর অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পাবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন মিত্র দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এসব আলোচনায় দেশের জাতীয় স্বার্থ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। এসডিজি অগ্রগতি পর্যালোচনা, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক একাধিক উচ্চপর্যায়ের সাইড-ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখবেন।
নতুন বাংলাদেশের পরিকল্পনা তুলে ধরবেন
জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ভাষণে বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকার, সংস্কার কার্যক্রম এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নিয়ে সরকারের লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা জানাবেন তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ২০০০ সালে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
পারিবারিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতায় এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিতে আসছেন তারেক রহমান। একই পরিবারের তিন বিশিষ্ট রাজনীতিকের বিশ্বমঞ্চে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার এই ঘটনা দেশের রাজনীতিতে এক বিরল ও ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের ১১তম সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এরপর ২০০৫ সালে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন। নতুন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর, অর্থনৈতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অগ্রাধিকারগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বাংলায় বক্তব্য রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভূ-রাজনীতি ও অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরেছিলেন। প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাধিকবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সর্বজনীন অধিকার নিয়ে বিশ্বের দরবারে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।’
৮১তম অধিবেশন শুরু
স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এ বছরের প্রতিপাদ্য–‘একসঙ্গে, আমরা পারব’। এই প্রতিপাদ্য বর্তমান পরিস্থিতির তাগিদ এবং আশাবাদ উভয়কেই তুলে ধরে।
সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, যেসব ১৩৯টি লক্ষ্যমাত্রার তথ্য পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ৩৬ শতাংশ সঠিক পথে রয়েছে অথবা মধ্যম অগ্রগতি অর্জন করেছে– যা আগের বছরের তুলনায় ইতিবাচক। তবে এই অগ্রগতি এখনও অত্যন্ত ধীর এবং অসম। অর্থায়নের ঘাটতি, জলবায়ুর আঘাত, ঋণের বোঝা, সংঘাত ও বৈষম্য অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। তা সত্ত্বেও রূপান্তর এখনও সম্ভব; কিন্তু লক্ষ্যগুলোর অগ্রগতি বাড়াতে প্রয়োজন বড় পরিসরে সমন্বিত উদ্যোগ, ধারাবাহিক বিনিয়োগ, মজবুত অংশীদারিত্ব এবং নতুন করে আন্তর্জাতিক সংহতি। উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বক্তব্য রাখেন। এতে চারটি সেশন ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতাদের ব্যাপক প্রস্তুতি
এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর স্মরণীয় করে রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস আহমেদ বলেন, আমরা সব নেতাকর্মী প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। জনএফ কেনেডি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে নেতাকর্মীর ঢল নামবে। বোস্টন বিএনপির সভাপতি বদরা সাইদ বলেন, দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে প্রবাসীদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আবু সাঈদ আহমেদ বলেন, দলীয় প্রধানের সফর ঘিরে নিউইয়র্কে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয়েছে। নিউইয়র্ক দক্ষিণ মহানগর বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্র আসছেন, এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিশ্বনেতাদের পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও যৌথ দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘ আয়োজিত ‘এসডিজি মোমেন্ট’ অনুষ্ঠানে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক এ তথ্য জানান।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে যোগদানের জন্য আগামীকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন।
ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তায় এসডিজি বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নতুন পে-স্কেল
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন-ভাতা কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ নামে প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়। নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া অর্থ একবারে নয়, কার্যকর হবে তিন ধাপে। প্রথম ধাপ ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যকর হবে। এই ধাপে ১ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বেতনবৃদ্ধির পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ অর্থ দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় ধাপ ২০২৭ সালে ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুনের মধ্যে কার্যকর হবে। এই ধাপে ১ম গ্রেড ও তদূর্ধ্বের কর্মকর্তাদের জন্য ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৭৫ শতাংশ অর্থ দেওয়া হবে।
তৃতীয় ধাপ বা শেষ ধাপ ২০২৭ সালে ১ জুলাইয়ে কার্যকর করা হবে। বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিসহ (ইনক্রিমেন্ট) শতভাগ মূল বেতন ও সুবিধা কার্যকর হবে।
২০টি গ্রেডের নতুন বেতন স্কেল
১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত নতুন স্কেলের মূল বেতনের বিষয় প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা যায়। যেমন-
১ম গ্রেড : ১,৫৬,০০০ টাকা (নির্ধারিত)
২য় গ্রেড : ১,৩২,০০০ – ১,৫৩,০০০ টাকা
৩য় গ্রেড : ১,১৩,০০০ – ১,৪৮,৮০০ টাকা
৪র্থ গ্রেড : ১,০০,০০০ – ১,৪২,৪০০ টাকা
৫ম গ্রেড : ৮৬,০০০ – ১,৩৯,৭০০ টাকা
৬ষ্ঠ গ্রেড : ৭১,০০০ – ১,৩৪,০০০ টাকা
৭ম গ্রেড : ৫৮,০০০ – ১,২৬,৮০০ টাকা
৮ম গ্রেড : ৪৬,০০০ – ১,১০,৮০০ টাকা
৯ম গ্রেড : ৪৪,০০০ – ১,০৫,৯০০ টাকা
১০ম গ্রেড : ৩২,০০০ – ৭৭,৩০০ টাকা
১১তম গ্রেড : ২৫,০০০ – ৬০,৫০০ টাকা
১২তম গ্রেড : ২৪,৩০০ – ৫৪,৭০০ টাকা
১৩তম গ্রেড : ২৪,০০০ – ৫৬,০০০ টাকা
১৪তম গ্রেড : ২৫,৫০০ – ৫৬,৮০০ টাকা
১৫তম গ্রেড : ২২,৮০০ – ৫১,২০০ টাকা
১৬তম গ্রেড : ২১,৯০০ – ৫২,৯০০ টাকা
১৭তম গ্রেড : ২১,৪০০ – ৫১,১০০ টাকা
১৮তম গ্রেড : ২১,০০০ – ৫০,৯০০ টাকা
১৯তম গ্রেড : ২০,৫০০ – ৪৯,৬০০ টাকা
২০তম গ্রেড : ২০,০০০ – ৪৮,৪০০ টাকা
প্রজ্ঞাপনে বিশেষ পদ মর্যাদায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মূল বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং সিনিয়র সচিব ও সমমর্যাদার পদের মূল বেতন ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় কর্মস্থল ও গ্রেড অনুযায়ী বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ, ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৪র্থ গ্রেডে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া পাবেন।
অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও নির্দিষ্ট এলাকায় এ হার কিছুটা কম। জেলা সদর, উপজেলা ও অন্যান্য এলাকাতেও গ্রেডভেদে বাড়িভাড়ার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি বাসায় বসবাসকারীরা বাড়িভাড়া ভাতা পাবেন না।
চিকিৎসা ও শিক্ষা সহায়ক ভাতা
চিকিৎসা ভাতা হিসেবে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মাসে ৩ হাজার টাকা, ৫০ বছর ১ দিন থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার, ৬০ বছর ১ দিন থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৬ হাজার টাকা দেওয়া হবে।
শিক্ষা সহায়ক ভাতা সন্তানপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য ১ হাজার টাকা দেওয়া হবে। সন্তানের বয়স ২৩ বছর পর্যন্ত নির্ধারিত শর্তে এ ভাতা পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা মাসে ৬০০ টাকা যাতায়াত ভাতা এবং ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা পাবেন। ৫ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা পাবেন।
পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের জন্য মূল বেতনের ২০ শতাংশ বা নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমায় পাহাড়ি ভাতা এবং হাওর, দ্বীপ ও চরসহ দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের জন্য বিশেষ ভাতা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মাসে ২ হাজার টাকা, সিনিয়র সচিব ও সচিব ১ হাজার, অতিরিক্ত সচিব ৯০০ এবং যুগ্মসচিব ও অন্যান্য প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তারা ৬০০ টাকা আপ্যায়ন ভাতা পাবেন।
সব কর্মকর্তা-কর্মচারী মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে নববর্ষ ভাতা পাবেন। নির্ধারিত শর্তে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা কার্যভার ভাতাও দেওয়া হবে।
পেনশন ও উচ্চতর গ্রেড
নতুন প্রজ্ঞাপনে অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্যও নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বিদ্যমান নিট পেনশনের ভিত্তিতে নতুন নিট পেনশন নির্ধারণ হবে। এতে সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনের স্ল্যাব রাখা হয়েছে।
পেনশনের বর্ধিত অংশও তিন ধাপে কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে শতভাগ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে পেনশন ও গ্র্যাচুইটির বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত থাকবে।
এ ছাড়া কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্ণ করলে নবম বছরে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাবেন। পরবর্তী ছয় বছর চাকরি পূর্ণ হলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে পুরো চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস, প্রতিরক্ষা সার্ভিসের সামরিক পদ, পুলিশ বাহিনী, বিজিবি, দৈনিক বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত কর্মীরা এই বেতন কাঠামোর আওতায় থাকবেন না।
পে স্কেল
সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে সরকারি চাকুরেদের নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অর্থ বিভাগের জারি করা এ প্রজ্ঞাপন আজ শনিবার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
এতে বলা হয়েছে, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। এর মধ্যে ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামোর বাড়তি বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন এবং ১০-২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে পাবেন।
এ ছাড়া ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামোতে বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০-২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন।
২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে। আর মূল বেতনের সঙ্গে যেসব ভাতা পেয়ে থাকেন সরকারি চাকুরেরা, সেসব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
গত ৩০ জুন তারা যে বেতন পেয়েছিলেন, সেটিকে ভিত্তি ধরে বাড়তি প্রাপ্য হিসাব করা হবে।
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তার বেতন হবে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং জ্যেষ্ঠ সচিব ও সমমর্যাদার বেতন হবে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
৩১ অগাস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করে সরকার। তাতে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে।
আর নবম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার টাকা। বিসিএস দিয়ে যারা প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা পদে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তারা এ গ্রেডে বেতন পান। অন্যদিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থ্যাৎ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার (নির্ধারিত) থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ গ্রেডে বেতন পান।
সেই সঙ্গে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা ও আর্থিক সুবিধা বাড়ানোরও অনুমোদন দেওয়া হয়।
বছর কয়েক ধরে আলোচনার পর সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি চাকুরেদের কাঙ্ক্ষিত এ জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন করার পর এবার কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তারও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা মিলল নতুন এ আদেশে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ২০ দিন আগে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন।
বেতন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ বরাদ্দ করে যাওয়ার কথা তখন বলেছিলেন তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। পে কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছে, তা পরীক্ষা করার জন্য কমিটি করে দেওয়ার কথা তিনি সেসময় বলেছিলেন।
বিএনপি সরকার গঠন করার পর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়। একই সঙ্গে আগের সরকারের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের অর্থের সংস্থান না থাকায় এটি বাস্তবায়নে কিছুটা সময় নেয়।
এছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাড়তি দামে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও সরকারের খরচ বাড়ছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে সরকারের নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরুর আগ্রহের আলোচনার সময় তাদের তরফে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের অর্থ সংকুলান নিয়ে প্রশ্ন এসেছিল।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও এসব বিবেচনায় সেই সুযোগ থাকছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় সরকারি চাকুরেদের জন্য নবম এ বেতন কাঠামো আলোর মুখ দেখল।
রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসান
সরকার, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী নিয়ে বক্তব্যের অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনায় আসা মো. রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তবে রাকিবুল হাসান এখন কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ডিএমপির দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাকিবুল হাসানকে রাজধানীর মিন্টো রোডের গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রাত ১২টার সময়েও ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন তিনি। এরপর তাঁর অবস্থান কোথায়, সেটি জানা যায়নি।
রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার হওয়ার পর রাকিবুল হাসান এখন কোথায় আছেন, তা জানতে আজ পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের আট পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তবে তাঁদের কেউ রাকিবুলের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। রাকিবুলকে ডিবিতে নেওয়াই হয়নি বলে উল্লেখ করেছেন একজন। রাকিবুল হাসানের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এ বিষয়ে রাকিবুলের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল রাতে বলেছিলেন, ছড়িয়ে পড়া অডিওর বিষয়ে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে রাকিবুল হাসানকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি এখনো সেখানে আছেন, নাকি অন্য কোথাও গেছেন বা তাঁকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে কি না, এ বিষয়ে আজ কোনো কর্মকর্তা নিশ্চিত তথ্য দেননি।
রাকিবুল হাসানকে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর তিনি এখন কোথায় আছেন, এ বিষয়ে জানতে আজ শুক্রবার ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। রাকিবুলকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শফিকুল ইসলাম বলেন, রাকিবুল কোথায় আছেন তিনি জানেন না। গতকাল তিনি রাকিবুলকে ডিএমপি সদর দপ্তরে দেখেছেন। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা বিষয়টি জানতে পারেন।
পরে কমিটির এক সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও রাকিবুলের অবস্থান সম্পর্কে জানেন না বলে জানিয়েছেন।
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, রাকিবুল কোথায় আছেন, তাঁরও জানা নেই।
কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি
রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি থাকা অবস্থায় গত বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাকিবুল হাসানের কথোপকথনের একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে তাঁকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায়।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অডিওটি রাকিবুল হাসানের বলে প্রাথমিকভাবে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।
অডিওতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ও পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে রাকিবুল হাসানকে মন্তব্য করতে শোনা যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি পুলিশে বিভিন্ন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ করেন।
অডিওটি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে গতকাল রাকিবুল হাসানকে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তাঁকে ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এরপর রাকিবুলের বিরুদ্ধে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী নিয়ে রাকিবুল হাসানের বক্তব্যের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির তিন সদস্যই ডিএমপির উপকমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত কমিটির একজন সদস্য আজ বলেন, কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে ডিএমপি কমিশনারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
কী বলেছিলেন রাকিবুল হাসান
অডিওতে পুলিশ পরিদর্শক রাকিবুল হাসানকে বলতে শোনা যায়, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল। ভয়ানক দুর্বল। আসা উচিত। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলি এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’
ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করতেছি না। সব সিনিয়ররা বিএনপি করতেছে, আমরা বিএনপি করতেছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই। তোমরা খাবাদাবা, নিয়ে থাকবা আর আমরা এখানে বসে বসে কাজ করব, তা তো হবে না।’
অডিওতে রাকিবুল হাসান পুলিশের ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের পদায়ন দেওয়ার অভিযোগ করেন।
মনির নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও বলা হয় ওই অডিওতে। অডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো সহ্য করা যায়? আর কী বলব? যারা পোস্টিং পাইতেছে, তার (মনির) কাছে টাকা দিচ্ছে, সকালবেলা পোস্টিং হইতেছে।’
ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর ইস্কাটনের বিয়াম ফাউন্ডেশন ভবনে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে দুজনের মৃত্যুর ঘটনার নেপথ্যে ছিল প্রায় ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য ধামাচাপার চেষ্টা। এর মূল পরিকল্পনাকারী বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম জাহিদুল ইসলাম। তিনি নিজের অপকর্ম আড়াল করতে হিসাব-সংক্রান্ত নথি পুড়িয়ে ফেলার জন্য পুরো ঘটনা সাজান। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
পিবিআই বলছে, জাহিদুল চেয়েছিলেন, টাকা আত্মসাতের বিষয়টি যেন হিসাবরক্ষকের নজরে না আসে এবং উল্টো তাঁকেই ফাঁসানো যায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য আশরাফুল ইসলাম, অফিস সহায়ক আব্দুল মালেক ও গাড়িচালক ফারুক মীরকে এ কাজে ব্যবহার করেন। এ ঘটনায় সম্প্রতি জাহিদুল ও আশরাফুলের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পিবিআই।
বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে হাতিরঝিল থানায় করা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন এসআই খন্দকার সালেহ আবু নাঈম। পরে এটি পিবিআই ঢাকা মহানগরের বিশেষায়িত তদন্ত ও অভিযান (সংঘবদ্ধ অপরাধ-উত্তর) ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।
সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর এসআই মোহাম্মদ গোলাম মওলা বলেন, বিয়ামের সমবায় সমিতির ৯টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সেখানে চাকরির সুবাদে জাহিদুল ইসলাম সব হিসাব নম্বরে লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সমিতির কমিটি বছর বছর পরিবর্তন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগের হিসাবের বিষয়ে তেমন খোঁজ রাখতেন না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রায় ৯ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলেন ওই কর্মকর্তা। তিনি ব্যাংক হিসাবের ‘সিগনেটরি অথরিটি’র স্বাক্ষর জাল করে টাকা তুলে নেন। সেই টাকায় তিনি ঢাকায় পাঁচ কাঠার প্লট এবং অন্যত্র ২১ বিঘা জমি কেনেন।
তিনি আরও বলেন, সমিতির হিসাবরক্ষক মমিনুর রহমান এর আগে চার লাখ টাকার গরমিল ধরে ফেলায় তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন জাহিদুল। তাই তিনি হিসাবের কারসাজির নথি পুড়িয়ে মমিনুরকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন।
গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৩টা ২০ মিনিটের দিকে বিয়াম ফাউন্ডেশনের ৫০৪ নম্বর কক্ষে সমবায় সমিতির অফিসে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সমিতির দলিল, নামজারির কাগজ, জমি কেনার চুক্তিপত্র, ব্যাংক হিসাবের চেকবই, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আসবাব এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র পুড়ে যায়।
এ ঘটনায় সেখানেই পুড়ে মারা যান অফিস সহায়ক আব্দুল মালেক। দগ্ধ গাড়িচালক ফারুক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। প্রাথমিকভাবে এ ঘটনাকে এসি বিস্ফোরণ বলে ধারণা করেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
পিবিআইর তদন্ত সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন একই পদে থাকায় সমিতির বিভিন্ন কার্যনির্বাহী কমিটির অভ্যন্তরীণ বিষয়, সদস্যদের আর্থিক লেনদেন এবং হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে জাহিদুলের বিস্তারিত ধারণা ছিল। বিভিন্ন কাজে সমিতির সদস্য ও কর্মকর্তারা তাঁর কাছে টাকা দিতেন।
এসব অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে জমা না দিয়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাক্ষর জাল করে টাকা তুলে তিনি আত্মসাৎ করেন। পিবিআই তদন্তের একপর্যায়ে জাহিদুল ইসলাম ও আশরাফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি নেওয়া হয়। বর্তমানে জাহিদুল জামিনে এসে পলাতক এবং আশরাফুল জামিনে রয়েছেন।
আশরাফুলকে ১২ লাখ টাকার প্রস্তাব
তদন্তে বলা হয়েছে, জাহিদুল প্রথমে তাঁর পরিচিত আশরাফুল ইসলামকে পরিকল্পনার কথা জানান। এ কাজে সহযোগিতার বিনিময়ে তাঁকে ১২ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে আশরাফুল কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন এবং কয়েক মাস মগবাজারের একটি হোটেলে জাহিদুলের খরচে থাকেন। তিনি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আব্দুল মালেককে যুক্ত করেন। মালেককে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে রাজি করানো হয়।
সে সময় মালেক জানান, ফারুকের সহায়তা প্রয়োজন। পরে ফারুককে তিন লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হলে তিনিও রাজি হন। মালেক ও ফারুক দুজনেই রাতে অফিসে থাকতেন।
সিসিটিভি বন্ধের পরিকল্পনা
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ৫০৪ নম্বর কক্ষের সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা পুরো তলা পর্যবেক্ষণ করত। এ কারণে আগেই সিসিটিভি বন্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়। মালেক সিসিটিভি কীভাবে বন্ধ করতে হয় তা আশরাফুলকে শেখান। আগুন দেওয়ার জন্য পেট্রোল ও লাইটার আগেই কিনে রাখা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে আশরাফুলকে কাপড়, টুপি, মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস কেনার জন্য জাহিদুল চার-পাঁচ হাজার টাকা দেন। রাত আড়াইটার দিকে ফারুক তাঁকে বিয়াম ভবনে নিয়ে যান।
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার বরাত দিয়ে তদন্তে বলা হয়েছে, রাত ২টা ৩৪ মিনিটের দিকে লিফট বন্ধ থাকায় আশরাফুল সিঁড়ি দিয়ে চতুর্থ তলায় যান। ২টা ৩৬ মিনিটের দিকে তিনি সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করেন।
এরপর মালেক ও ফারুকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। পরে তিনজন মিলে ৫০৪ নম্বর কক্ষে ঢুকে বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল ছিটিয়ে দেন। তখন আশরাফুলকে দরজার সামনে পাহারায় দাঁড়াতে বলা হয়। মালেক ও ফারুক লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।
আগুন, বিস্ফোরণ ও মৃত্যু
আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে কক্ষের কাগজপত্র ও আসবাব আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কক্ষে থাকা এসিতে আগুন ধরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মালেক ও ফারুক দগ্ধ হন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আশরাফুল সেখান থেকে পালিয়ে দোতলার একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। পরে নিজের পরনের পোশাক, টুপি ও হ্যান্ডগ্লাভস সেখানে রেখে রাত ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে ভবন থেকে বের হয়ে যান।
অন্যদিকে ফারুক অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় কক্ষ থেকে বের হয়ে ৫০৭ নম্বর কক্ষে যান। পরে ভবনের নিচে নেমে আসেন। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ ঘটনাস্থলের উত্তর পাশের রান্নাঘরের কাছ থেকে মালেকের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে। ফারুককে পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৫ মার্চ জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
যোগাযোগ ও টাকা লেনদেন
তদন্তে মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জাহিদুল ঘটনার আগে মালেক ও ফারুকের নম্বরে একাধিক দফায় টাকা পাঠান। ঘটনার দিনও তাদের নম্বরে টাকা পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার পর আশরাফুলের সঙ্গে জাহিদুল নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। আশরাফুলের জবানবন্দি অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে জাহিদুল তাকে ছয়-আট লাখ টাকা দিয়েছেন।
চীনা নৌবাহিনী জাহাজ
পাঁচ দিনের শুভেচ্ছা সফরে চীনের নৌবাহিনী জাহাজ বাংলাদেশে আগমন করেছে। ‘থাং শান’(TANG SHAN), ‘দা ছিং’ (DA QING), এবং ‘থাই হু’ (TAI HU) নামের জাহাজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়। চীনা জাহাজের কর্মকর্তা ও নাবিকদের চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চল-এর পক্ষ থেকে চিফ স্টাফ অফিসার স্বাগত জানান।
এ সময় নৌবাহিনীর সুসজ্জিত বাদকদল ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুযায়ী ব্যান্ড পরিবেশন করে।
এছাড়াও জাহাজসমূহকে স্বাগত জানাতে বাংলাদেশস্থ চীন দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ চীনের নাগরিক এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর স্থানীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সফরকারী জাহাজসমূহ বাংলাদেশের জলসীমায় এসে পৌঁছালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ ‘বানৌজা ওমর ফারুক’ তাদের অভ্যর্থনা জানায়।
বাংলাদেশে অবস্থানকালে সফরকারী জাহাজসমূহের অধিনায়ক ও বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের মিলিটারি অ্যাটাশেসহ একটি প্রতিনিধি দল কমান্ডার চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চল, কমান্ডার বিএন ফ্লিট এবং চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ-এর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
সফরকারী জাহাজসমূহের কর্মকর্তা ও নাবিকগণ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ, ঘাঁটি, চট্টগ্রামের বিভিন্ন দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহ পরিদর্শন করবে।
এছাড়াও, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যগণ চীনের নৌবাহিনী জাহাজ পরিদর্শন করবে। এ সফরের মাধ্যমে উভয় দেশের নৌসদস্যগণ পারস্পরিক কার্যক্রম ও পেশাগত উৎকর্ষ প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ এবং মতবিনিময়ের সুযোগ লাভ করবে।
শুভেচ্ছা সফরের মাধ্যমে দুই দেশের নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ও নাবিকদের পেশাগত বিষয়ে মতবিনিময়, ভবিষ্যৎ প্রশিক্ষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশা করা যায়।
উল্লেখ্য, শুভেচ্ছা সফর শেষে জাহাজসমূহ আগামী ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ বাংলাদেশের জলসীমা ত্যাগ করবে।