কাজী আসমা আজমেরী ও অপ্রিতম
একজন বিদেশি বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন—সন্তানকে ভালোবাসা আর দামি কিছু দেওয়া, ভালোবাসা প্রকাশের একমাত্র উপায় নয়। আজ একটি মর্মান্তিক ঘটনা দেখে হঠাৎ ২০১২ সালের নিউজিল্যান্ডের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। ঘটনাটি এত বছর পরও আমার মনে স্পষ্ট। ২০১২ সালে আমি নিউজিল্যান্ডে কাজ করতাম। সেই সময় নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে আমার বন্ধু পিটারের সঙ্গে দেখা হয়। পিটারের ছোট্ট একটি মেয়ে ছিল এলিনা। বয়স তখন মাত্র সাড়ে ছয় কিংবা সাত বছর।
পিটারের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল। তার সাবেক স্ত্রী কানাডায় থাকতেন। আর পিটার তার মেয়েকে নিয়ে একটি বোটে থাকতেন- যাকে বলা হয় ‘বোট হাউস’। জায়গাটি ছিল পিকটন এলাকায়। পিটার একদিন আমাকে বলল, “তুমি পিকটনে এসো। আমাদের সঙ্গে থেকো। তোমার খুব ভালো লাগবে।”
আমি তখন কায়াকুরা যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। পৃথিবীর বিখ্যাত তিমি দেখার জায়গাগুলোর একটি কায়াকুরা—আর তিমি দেখা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। তাই ভাবলাম, ওয়েলিংটন থেকে ফেরিতে পিকটন হয়ে তারপর কায়াকুরা যাব। পরের মাসে ছুটি পেয়ে আমি সত্যিই পিকটনে চলে গেলাম।
পিটার তখন শুধু ট্যুর গাইডই ছিল না; সে একজন বিশ্বমানের প্যারাগ্লাইডিং চ্যাম্পিয়নও ছিল। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের সময়কালে সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছিল। পাশাপাশি প্যারাগ্লাইডিং প্রশিক্ষণ দিত এবং নিজের বোটে পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখাত।
প্রথম রাতে আমি পিকটনের একটি হোস্টেলে থাকলাম। সেখানে সুইডেন থেকে আসা কয়েকজন নতুন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হলো। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে পরদিন পিটারের বোটে যাওয়ার কথা হলো। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। পিটারের বোটটি ঘাটের একেবারে পাশে ছিল না। সেখানে পৌঁছাতে কায়াক করতে হতো। আমি কায়াক করতে পারতাম না।
আর তখনই ঘটল এমন একটি ঘটনা, যা আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। সাড়ে ছয়-সাত বছরের ছোট্ট এলিনা ঘুম থেকে উঠে, আধো ঘুম চোখে, আমাকে কায়াক করে বোটে নিয়ে গেল! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল—আল্লাহ! এত ছোট একটা বাচ্চা, আর সে আমার জন্য এত রাতে কায়াক করছে!
পিটার নিজের একটি বোটে যাচ্ছিল, আর এলিনা আমাকে নিয়ে অন্যদিকে যাচ্ছিল।
বোটে পৌঁছে আমি আরও অবাক হলাম। এটি ছিল সুন্দর, আধুনিক এবং বেশ বিলাসবহুল একটি বোট—তিনটি বেডরুম, রান্নাঘর, বসার জায়গা, ডাইনিং স্পেস, এমনকি ছাদেও বসার ব্যবস্থা ছিল। পিটারের স্বপ্ন ছিল একদিন এই বোট নিয়ে পৃথিবী ভ্রমণ করবে। আমি সেখানে কয়েকদিন ছিলাম। একদিন সকালে পিটার বাজারে চলে গেল। এলিনা তখন একা।
তার সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে আমার হঠাৎ একটা বিষয় মনে হলো—পিটার বাইরে গেলে এই ছোট্ট মেয়েটি যদি কোনো বিপদে পড়ে? যদি ভয় পায়? যদি তার বাবার সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ করার প্রয়োজন হয়? কিন্তু তার কাছে কোনো মোবাইল ফোন নেই, ওয়াকি-টকি নেই—যোগাযোগের তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেই।
আমি তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই ভাবলাম, একটা ফোন কিনে দিলে কেমন হয়?
আমি এলিনাকে নিয়ে শপিং সেন্টারে গেলাম এবং ২০১৩ সালের সেই সময়ে প্রায় ১৮০ ডলার দিয়ে একটি সুন্দর গোলাপি রঙের ফোন কিনে দিলাম। ফোনটিতে ছবি তোলা যেত, হাতে লিখে ব্যবহার করা যেত—একজন ছোট শিশুর জন্য বেশ চমৎকার একটি ডিভাইস ছিল। আমার ধারণা ছিল, পিটার নিশ্চয়ই খুশি হবে।
কিন্তু আমি সম্পূর্ণ ভুল ভেবেছিলাম।
পিটার ফোনটি দেখেই আমার ওপর প্রচণ্ড রেগে গেল। সে বলল, “তোমার এত বড় সাহস কীভাবে হলো আমার মেয়েকে এত দামি একটা উপহার দেওয়ার?”
আমি তো হতবাক! আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, “আমি তো ওকে নষ্ট করার জন্য দিইনি। তুমি যখন বাইরে থাকবে, তখন যেন ও তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। ওর মায়ের সঙ্গেও যদি কখনো কথা বলার দরকার হয়, যেন যোগাযোগ করতে পারে—সেই জন্যই দিয়েছি।” কিন্তু পিটার রাজি হলো না।
সে বলল, “আজ ওর জন্মদিন নয়। কোনো বিশেষ দিনও নয়। তাহলে ওকে এত দামি উপহার কেন দেওয়া হবে?” তারপর সে আমাকে এমন একটি কথা বলল, যা তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল। সে বলল, “একটা ছোট বাচ্চা যদি খুব সহজে দামি জিনিস পেয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সে কোনো কিছুর মূল্য বুঝবে না। কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করা, পরিশ্রম করা কিংবা মায়া তৈরি করা—এসব শেখা দরকার।”
সে আমাকে ফোনটি ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে আসতে বলল। আমি সত্যিই লজ্জায় পড়ে গেলাম। আমাদের দেশে কাউকে একটি মোবাইল ফোন উপহার দিলে আমরা সাধারণত খুশি হই। বরং ১৫-২০ হাজার টাকার একটি ফোন উপহার পেলে অনেকে সেটাকে অনেক বড় ভালোবাসার প্রকাশ মনে করেন। কিন্তু পিটারের কাছে বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শেষ পর্যন্ত আমি দোকানে গিয়ে ফোনটি ফেরত দিলাম এবং ক্রেডিট নোট নিয়ে বের হলাম। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সেদিন আমি এলিনাকে নিয়ে একটি ভালো রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার কথা ভাবলাম। আইসক্রিম খাওয়াব বলে তাকে নিয়ে ঢুকছিলাম। ঠিক তখন পিটার ফোন করল। “তুমি কোথায়?” আমি বললাম, “ওকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে এসেছি। আইসক্রিম খাওয়াব।”
পিটার আবার বলল, “আজ কি ওর জন্মদিন?” আমি বললাম, “না।” সে বলল, “তাহলে এত দামি জায়গায় কেন? বার্গার খাওয়াতে চাইলে Burger King-এ নিয়ে যাও, McDonald's-এ নিয়ে যাও। কিন্তু প্রতিদিন যদি তুমি ওকে দামি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাও, তাহলে কোনো বিশেষ দিনে দামি জায়গায় গেলেও সেটা তার কাছে আর বিশেষ মনে হবে না।”
সেদিন আমার সত্যিই মন খারাপ হয়েছিল। মনে হয়েছিল—কী অদ্ভুত মানুষ! আমি ভালোবেসে একটা ফোন কিনে দিলাম, সে নিল না। বাচ্চাকে একটু ভালো জায়গায় খাওয়াতে চাইলাম, সেটাও পছন্দ হলো না। কিন্তু আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে আমি বুঝি—সেদিন পিটার আমাকে আসলে একটা বড় শিক্ষা দিয়েছিল।
শিশুকে ভালোবাসা আর শিশুর প্রতিটি চাওয়া পূরণ করা—এক জিনিস নয়।
শিশুকে সবকিছু সহজে দিয়ে দেওয়া হয়তো সাময়িক আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু কোনো কিছু পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা, প্রয়োজন আর বিলাসিতার পার্থক্য বোঝা এবং জিনিসের মূল্য উপলব্ধি করা—এসবও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আজকের একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাকে আবার সেই ছোট্ট এলিনার কথা মনে করিয়ে দিলো।
একটি ছোট ছেলে আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গিয়েছিল। পরে সেই ফোনকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনায় শিশুটির জীবন হারানোর খবর আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। একটি শিশুর এভাবে চলে যাওয়া সত্যিই অত্যন্ত কষ্টের। তার পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। একই সঙ্গে এই ঘটনা আমাদের সবার জন্য একটি সতর্কবার্তাও হতে পারে।
আমি কোনো শিশুর মৃত্যুর জন্য তার বাবা-মাকে সরাসরি দায়ী করতে চাই না। আমরা পুরো ঘটনা, পরিস্থিতি এবং পরিবারের বাস্তবতা জানি না। কিন্তু একজন মা-বাবা হিসেবে আমাদের নিজেদের কাছে কিছু প্রশ্ন করা দরকার। আমরা কি সন্তানকে শুধু দামি জিনিস দিচ্ছি, নাকি তাকে সেই জিনিস ব্যবহারের সঠিক শিক্ষা ও দায়িত্ববোধও শেখাচ্ছি?
আমরা কি সন্তানের হাতে মোবাইল দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করছি, নাকি তার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি? আমরা কি তাকে শুধু ভালো স্কুলে পড়াচ্ছি, নাকি ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাটাও দিচ্ছি? মোবাইল ফোন খারাপ নয়। প্রযুক্তিও খারাপ নয়। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু একটি ছোট শিশুর হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার আগে তাকে শেখানো জরুরি—কোথায় ফোন ব্যবহার করতে হয়, কোথায় করা উচিত নয়, অপরিচিত কারও সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হয়, নিজের অবস্থান কীভাবে নিরাপদ রাখতে হয় এবং কোনো বিপদে পড়লে কীভাবে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ফোন দেওয়ার বিষয়টি বয়স, প্রয়োজন, নিরাপত্তা এবং অভিভাবকের তত্ত্বাবধান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
পশ্চিমা বিশ্বের অনেক পরিবারে আমি দেখেছি, সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শুধু প্রযুক্তির সঙ্গে নয়—প্রকৃতি, খেলাধুলা, বই, সংগীত, ভ্রমণ এবং বিভিন্ন বাস্তব জীবনের দক্ষতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। রাশিয়ায় গিয়ে আমি এমনও দেখেছি—৬-৭ বছরের শিশুদের বাবা-মা পার্কে নিয়ে যাচ্ছেন, দৌড়াতে শেখাচ্ছেন, বিভিন্ন শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দিচ্ছেন, নতুন কিছু শেখাচ্ছেন।
আর আমাদের অনেক পরিবারে কী হচ্ছে? বাচ্চা বিরক্ত করছে? “এই নাও মোবাইল। ইউটিউব দেখো।” মা-বাবা ব্যস্ত? “এই নাও ফোন। আমাকে বিরক্ত করো না।” এভাবে ধীরে ধীরে মোবাইল হয়ে যায় শিশুর খেলনা, সঙ্গী এবং বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। অথচ একটা শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মায়ের সময়, ভালোবাসা, শাসন, খেলাধুলা, গল্প, বই, প্রকৃতি এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা।
আমি আমার বিভিন্ন বক্তব্যে প্রায়ই বলি— সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য বিশেষ কোনো ডিগ্রি লাগে না। কিন্তু একজন ভালো বাবা-মা হওয়ার জন্য শিক্ষা, সচেতনতা, ধৈর্য এবং দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেই কেউ ভালো বাবা বা মা হয়ে যায় না। সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানোই শিক্ষা নয়।
সন্তানকে দামি ফোন কিনে দেওয়াও ভালোবাসার শেষ প্রমাণ নয়।
তাকে শেখাতে হবে—কোনটা তার প্রয়োজন। কোনটা বিলাসিতা। কোনটা নিরাপদ। কোনটা বিপজ্জনক। কোন জিনিস অনুমতি নিয়ে নিতে হয়। কোন পরিস্থিতিতে “না” বলতে হয়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— নিজের জীবন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কীভাবে নিতে হয়। স্কুলে সব শিশুকে একই রঙের ইউনিফর্ম পরানোর একটি সুন্দর সামাজিক উদ্দেশ্য আছে—ধনী-গরিবের পার্থক্য যেন পোশাক দিয়ে স্পষ্ট না হয়, সবাই যেন একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে অনুভব করে।
কিন্তু স্কুলের বাইরে আমরা যেন আবার সন্তানদের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতা তৈরি না করি— “কার ফোন বেশি দামি?” “কার পোশাক বেশি দামি?” “কার গাড়ি বড়?” “কার জীবনযাপন বেশি বিলাসী?” একটি শিশুর আত্মসম্মান যেন তার হাতে থাকা ফোনের দামের ওপর নির্ভর না করে। আমি নিজের জীবনেও সবসময় বুঝেছি—কোনো কিছু পাওয়ার আনন্দ তখনই বেশি হয়, যখন তার মূল্য বোঝা যায়।
২০১৩ সালে এলিনার সেই গোলাপি ফোনটি আমি শেষ পর্যন্ত তাকে দিতে পারিনি। তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল। কিন্তু আজ মনে হয়, পিটার আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছিল, সেই শিক্ষাটাই হয়তো সেই ১৮০ ডলারের ফোনের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। কিছু ভালোবাসা হাতে তুলে দিতে হয়। আবার কিছু ভালোবাসা শিক্ষা হিসেবে দিতে হয়।
আজ যে ছোট্ট শিশুটি আমাদের ছেড়ে চলে গেল, তার পরিবারের জন্য সত্যিই আমার হৃদয় থেকে কষ্ট হচ্ছে। একটি শিশুর জীবন কোনোভাবেই একটি ফোন, একটি খেলনা, একটি স্ট্যাটাস কিংবা কোনো বস্তুগত জিনিসের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে না। তাই বাংলাদেশের প্রতিটি মা-বাবার কাছে আমার অনুরোধ— সন্তানকে শুধু সফল বানানোর চেষ্টা করবেন না, তাকে সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন।
তাকে শুধু ইংরেজি শেখাবেন না—জীবন শেখান। শুধু ভালো স্কুলে পাঠাবেন না—ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিন। শুধু ফোন কিনে দেবেন না—জরুরি অবস্থা ছাড়া, সেটাও শেখান। শুধু টাকা খরচ করবেন না—সময় দিন। কারণ সন্তানকে বড় করা সহজ। কিন্তু একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা—সেটাই আসল দায়িত্ব।
সন্তানের হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ফোন তুলে দেওয়ার চেয়ে, তার মাথার ভেতর সঠিক শিক্ষা আর হৃদয়ের ভেতর মানবিকতা তৈরি করা অনেক বেশি জরুরি। তাহলে তাদের সন্তানটি হয়তোবা আজকে বেঁচে থাকত। হাজার মন্ত্রী মিনিস্টারকে ফোন করলেও বাচ্চাটার ফিরে আসবে না, হয়তো বাচ্চাটার মৃত্যুর বিচার হবে ? কিন্তু মৃত্যুর আগে যদি আমরা একটু কেয়ারফুল হতাম তাহলে তিনি বাচ্চাটা মরতো?
হায় আল্লাহ, আমাদের সবাইকে ভালো বাবা-মা হওয়ার শিক্ষা দিন। চিন্তা চেতনার পরিবর্তনার। নাহলে আপনাদের সুন্দর ছেলেমেয়েরা নষ্ট হয়ে যাবে, এটা কোন শিক্ষা নয় এটা অশিক্ষা কে বলে। আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখুন, সচেতন রাখুন এবং ভালো শিশুর জীবন অপ্রয়োজনীয় কোনো জিনিসের কারণে অঝোরে হারিয়ে না যায়।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)
২০২৭ সালের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যবইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নতুন অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে- এটা নতুন খবর নয়। এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় সব সংবাদমাধ্যমে খবরটা প্রকাশিত হয়েছে।
সেই খবর অনুযায়ী, ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্মোহ থেকে এবং ক্ষমতার প্রভাব মুক্ত হয়ে ইতিহাস রচনা করে নিরপেক্ষ ও সত্য ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরতে পারা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সেটা যে পারা যায় না, তা এতকাল পরে আবারও নিরপেক্ষ ও সত্য ইতিহাস জানাবার প্রয়াস থেকেই বোঝা যায়।
কোনো জাতি কতটা পথহারা হলে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও তার জন্মের সত্য ইতিহাস খুঁজতে মাঠে নামতে বাধ্য হয় এবং পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনতে হয়। এই সত্য খোঁজাখুঁজির ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ একেক রকম করে উপস্থাপিত হচ্ছে।
ইতিহাস যেন বাস করে ক্ষমতার ঘরে। ‘বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে’-এমন একটা কথা নাকি উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন। ঠিক এই বাক্যটি তিনি বলেছিলেন কিনা তা খুঁজে পাওয়া না গেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে চার্চিল পরাজিত হলেন, তখন তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, “ইতিহাস আমার প্রতি সদয় হবে, কারণ এটি লেখার ইচ্ছা আমার নিজেরই আছে।”
এই প্রচ্ছন্ন অহংকার আর দূরদর্শিতা থেকেই পরবর্তীকালে তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত বহুখণ্ডের গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার'। মিত্রপক্ষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে চার্চিল ভালো করেই জানতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র দিয়ে সাম্রাজ্য জয় করা সম্ভব হলেও, মানবমন জয় করতে হলে ইতিহাসকে নিজের বয়ানে সাজাতে হয়। তাই সেই বিশাল ঐতিহাসিক স্মারকে তিনি নিজের ও মিত্রশক্তির সামরিক সিদ্ধান্ত, কৌশল ও বীরত্বকে উজ্জ্বলতম আলোয় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, আর কৌশলগতভাবে আড়াল করেছিলেন তাদের নানাবিধ ভুলত্রুটি ও কূটনৈতিক অন্ধকার দিকগুলো। চার্চিল প্রমাণ করেছিলেন যে বিজয়ী রাষ্ট্রনায়করা শুধু যুদ্ধই জেতেন না, যুদ্ধের পর নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করে নিজেদের অপরাধ ঢেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেদের চিরন্তন নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেল, নতুন পাঠ্যপুস্তকে থাকছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। বলা হচ্ছে, যার যতটা অবদান ততটাই থাকবে পাঠ্যপুস্তকে। কিন্তু এই অবদান পরিমাপ হবে কিসের ভিত্তিতে?
আশা করি কর্তৃপক্ষ সেক্ষেত্রে সময়, পরিধি, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি, পরিবেশ, প্রতিকূলতা, অনুকূলতা, দূরদর্শিতা, নেতৃত্বের গভীরতা, স্বাধীনতা সংগ্রামে দৃঢ়চিত্ততা, মুক্তির লক্ষ্যে একনিষ্ঠতা, সঠিক ও সময়মাফিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সত্যিকারের দেশপ্রেমকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের অবদান তুলে ধরবেন। নতুন অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হলেও জাতির অন্যান্য বীর সন্তানদের অবদান কিভাবে তুলে ধরা হবে তা সুস্পষ্ট নয়। আশা করি শিগগিরই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এ সংশয় দূর করবে।
একটি দেশের ইতিহাস শুধু আর্কাইভ, গবেষণাগার এবং ইতিহাসবিদের বইয়ে সংরক্ষিত থাকে না। ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নেয় নতুন প্রজন্ম। আর নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের প্রথম ও প্রভাবশালী পরিচয় হয় পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে। যদিও বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বদলেছে বারবার। কখনো পুরো শিক্ষাক্রম, কখনো নির্দিষ্ট বই, কখনো একই বইয়ের একটি অধ্যায় বা কয়েকটি অনুচ্ছেদ। কখনো বা পরিবর্তিত হয়েছে একটি ঘটনার কয়েকটি বাক্যও।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রথম থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক সংশোধন, পরিমার্জন ও পুনর্লিখন করা হয় খুব দ্রুত। নবজাত রাষ্ট্রের প্রয়োজন, নতুন রাষ্ট্রচেতনা ও আধুনিক ধারণা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পরে ১৯৭৮-৭৯ সালে নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে বই প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৯১ সালের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। ১৯৭১-সংক্রান্ত বিষয় হিসেবে বীরশ্রেষ্ঠদের সংক্ষিপ্ত জীবনীই ছিল প্রধান উপাদানগুলোর একটি। ১৯৯৩ সালে পরিবেশ পরিচিতি (সমাজ) বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ যুক্ত হয়। সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে এম এ হান্নান ও মেজর জিয়াউর রহমানের নাম ছিল। এই বর্ণনা বহাল ছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৬ সালে মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন বইয়ে ১৯৭১-এর ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক লেখা, কবিতা ও জীবনী নতুনভাবে যুক্ত করা হয়।
২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর সেই বর্ণনায় আবার বড় পরিবর্তন আসে। ৭ই মার্চের ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর নামের কিছু উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়। পরিবেশ পরিচিতি (সমাজ) বইয়ে আগের এম এ হান্নান ও মেজর জিয়া সংক্রান্ত বর্ণনা পরিবর্তন করে এম এ হান্নানের নাম এবং ‘বঙ্গবন্ধুর পক্ষে’ কথাটি বাদ দেওয়া হয়; ঘোষণার তারিখও ২৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ করা হয়। ফলে একই ঐতিহাসিক ঘটনা পাঠ্যবইয়ের ভাষায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে বদলেছে, এটা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
২০১০ সালের পরের বইগুলোতে আবার বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয়। ২০২৫ সালের বইয়ে সেই বর্ণনা পুনরায় পরিবর্তিত হয়ে বলা হয়, ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবার ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জাতির পিতা’ পরিচয়ও নতুন বই থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিছু বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সঙ্গে ব্যবহৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ব্যবহার কমানো এবং ৭ই মার্চের ভাষণ-সংবলিত কিছু পাঠ বাদ দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
একই ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাখ্যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায়। তাই পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের বর্ণনা কেবল শিক্ষাব্যবস্থার বিষয় নয়; রাষ্ট্র, রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের ওপরও নির্ভরশীল! একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা নয়, নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাসকে কীভাবে জানবে তার ওপর নির্ভর করে জাতীয় স্মৃতি ও সেই রাষ্ট্রের পরিচয়। একই ঘটনা কোন সময়ে কীভাবে লেখা হয়েছে, কী বাদ গেছে, কী যুক্ত হয়েছে এবং কেন পরিবর্তন করা হয়েছে? প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেয় জাতির ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে কতবার পরিবর্তন হয়েছে এবং কতটা সময়ের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বয়ানের প্রভাবে নির্মিত হয়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা বিষয়টি এ বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১০ সালের পর পাঠ্যবইয়ে বলা হতো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ গ্রেপ্তারের আগে ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে আবার বর্ণনা পরিবর্তন করে বলা হয়, ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পুনরায় ঘোষণা করেন।
একই ঘটনা একেক সরকারের সময়ে একেকভাবে লেখা হলে শিক্ষার্থীর সামনে ইতিহাসের ব্যাখ্যা বদলে যায়। তাই ভবিষ্যতের পাঠ্যবই প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ নীতি কোনো রাজনৈতিক সরকারের তাৎক্ষণিক বয়ানের ওপর নির্ভর করে নয়- কে ঘোষণা করেছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে করেছিলেন, কেন করেছিলেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরা উচিত। এক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের মূল ঐতিহাসিক দলিল, বেতার বার্তা, সমকালীন সংবাদপত্র, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, সরকারি নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং পরবর্তী সাংবিধানিক দলিল পাশাপাশি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তবেই প্রতিষ্ঠিত সত্য উঠে আসা সম্ভব। প্রতিনিয়ত পরিবর্তন মূলত দেখায়- রাষ্ট্র কোন সময়ে ইতিহাসকে কীভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করেছে। কারণ সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক বয়ানও বদলাতে পারে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধানের পদ্ধতি যেন না বদলায়।
একটি সরকারের সময়ে ইতিহাসের যে ভাষা সত্য হিসেবে শিক্ষার্থীর সামনে আসে, পরবর্তী সরকারের সময়ে সেটিই যদি পাল্টে যায় তাহলে প্রশ্ন ওঠে- ইতিহাস কি তবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত? তাই কোনো রাজনৈতিক বয়ানে সীমিত রাখা নয়; বহুমাত্রিক প্রাথমিক দলিল, স্বাধীন গবেষণা, সমকালীন নথি ও যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত পাঠ্যবইয়ে জাতির ইতিহাস।
একটি জাতির ইতিহাস কতবার বদলায়, কেন বদলায়, কী প্রমাণের ভিত্তিতে বদলায় এবং কে সেই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়? ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি পাঠ্যপুস্তকে জাতির ইতিহাস পরিবর্তিত হয় তাহলে ইতিহাস বদলায় নাকি তার বয়ান? এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জাতির সত্য ইতিহাস না জানাতে পারার লজ্জা! ক্ষমতার প্রভাব ও মসনদ ধরে রাখার জন্য স্রোতের অনুকূলে গুণকীর্তন করা হয়, যার প্রভাব পড়ে কোমলমতি শিশুদের চিন্তায়। যে শিশু সময়ের সঙ্গে তার জন্মভূমির ইতিহাসের পরিবর্তন হতে দেখে, তার মনে আপনি দেশপ্রেমের বীজ বুনবেন কী করে?
যে শিশুটি নবম-দশম শ্রেণিতে ইতিহাস সম্পর্কে নিরপেক্ষ, নির্মোহ এবং নতুন করে আরেকটি অধ্যায় জানবে, সে কিন্তু বছর আড়াই আগে তার পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের আরেক রূপ দেখেছে; তার স্কুলে জাতীয় দিবসগুলো অন্যরকমভাবে পালন করেছে। এই যে সময়ে ইতিহাসের অতিরঞ্জন, নিরপেক্ষ আর সত্যের নামে স্বার্থান্বেষিত- এগুলোই শিক্ষার্থীদের মনে সংশয়ের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় সাংঘর্ষিকতায়।
ইতিহাস কি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন করে লেখা হবে, নাকি প্রাথমিক দলিল ও যাচাইযোগ্য গবেষণার ভিত্তিতে স্থিতিশীল একটি ইতিহাসচর্চা গড়ে উঠবে- যা হবে চিরস্থায়ী? স্বাধীনতাযুদ্ধ কোনো দলের একার নয়, নির্দিষ্ট কোনো নেতার নয়; এ যুদ্ধ ছিল সাড়ে সাত কোটি জনতার মুক্তির লড়াই। যে লড়াইয়ে কেউ হারিয়েছে সহায়-সম্বল, কেউ প্রিয়জন।
লাখো শহীদের রক্তে পাওয়া স্বাধীনতা কারো ক্ষমতা ধরে রাখার তাসের টেক্কা হতে পারে না। পাঠ্যবই কোনো সরকারের রাজনৈতিক স্মারক নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অতীতকে জানার ও বোঝার জানালা। সেই জানালায় রাজনৈতিক পালাবদলের ছায়া নয়, সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে স্থায়ী এবং সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং একসঙ্গে
বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নয়াদিল্লিতে হয়ে গেল ব্রিকসের ২০২৬ সালের সম্মেলন। সম্প্রসারিত এই জোটে সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বও। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো নেতাদের অংশগ্রহণ এবারের সম্মেলনকে অ–পশ্চিমা বিশ্বের বড় কূটনৈতিক সমাবেশে পরিণত করেছে। এ কারণেই ব্রিকস বড় ধরনের আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিকসের চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের চতুর্থ মেয়াদ অবশ্য বেশ নিরুত্তাপ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনের মতো এবার জাঁকজমক দেখা যাচ্ছে না। সে সময় কয়েক মাস ধরে রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে রঙিন দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছিল। বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশাল বিলবোর্ডও ছিল। এবার প্রস্তুতি অনেকটাই নীরব ও সংযত।
ব্রিকস এখন যুক্তরাষ্ট্রের নজরেও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ব্রিকসের ১১টি সদস্যদেশ ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথে এগোলে তাদের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করা হবে।
অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিরোধও সামনে এনেছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সংঘাতে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ফলে জোটটি যত বড় হয়েছে, তাকে একমত করানো তত কঠিন হয়েছে। অথচ ১১ বছর আগে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর উল্লেখযোগ্য বাস্তব সাফল্যের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়।
তারপরও ভারতের জন্য এবারের সম্মেলন একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ। নয়াদিল্লির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, তার দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে একই জায়গায় এনে একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করানো। ভারত যদি তা করতে পারে, তাহলে পশ্চিম এশিয়ার পরস্পরবিরোধী দুই দেশের মধ্যে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার ভূমিকা আরও জোরালো হবে।
এমন সাফল্য পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হবে। পাকিস্তান কিছুদিন আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতায় সাফল্যের দাবি করেছিল। কিন্তু ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। ভারত সফল হলে সেটি ২০২৩ সালে জি-২০ সম্মেলনে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অভিন্ন ভাষা তৈরির সাফল্যের ধারাবাহিকতা হবে।
ভারতের জন্য এবারের সম্মেলনে কোনো বড় বিরোধ ছাড়াই বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে পারা একটি কূটনৈতিক সাফল্য হবে। কিন্তু তাতেও ১১টি দেশের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর মিলবে না। ব্রিকস শেষ পর্যন্ত কী হতে চায়; একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ, নাকি পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।
একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে আনায় ভারতের প্রচেষ্টাও শক্তিশালী হবে। গত মাসে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে মোদি পুতিনকে ‘অন্তহীন যুদ্ধ থেকে অবসানের’ পথে যাওয়ার আহ্বান জানান। কয়েক দিন পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফর করে বলেন, যুদ্ধ বন্ধে সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই। ইউক্রেন যুদ্ধ প্রায় পাঁচ বছরে পা দিতে চলেছে।
এসব কারণে ভারতের এবারের ব্রিকস সভাপতিত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। শুক্রবার বিকেলে মোদি পুতিনের সঙ্গে এবং পরে সন্ধ্যায় ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় বৈঠকেই বৈশ্বিক সংঘাত এবং তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে খাদ্য, সার ও জ্বালানির ওপর সংঘাতের প্রভাব ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ব্রিকসের শুরু অবশ্য ভূরাজনীতি দিয়ে হয়নি। ২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের একটি গবেষণাপত্রে ‘ব্রিক’ শব্দটির জন্ম। সেখানে বলা হয়েছিল, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্ব আগামী দিনে আরও বাড়বে। পরে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও উৎপাদনশিল্পের বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া ও ভারতও গত ২৫ বছরে বিভিন্ন মাত্রায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
২০০৬ সালে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রথমবার বৈঠক করেন। ২০০৯ সালে হয় প্রথম নেতাদের সম্মেলন। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে ব্রিকস পাঁচ সদস্যের জোটে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তখন অগ্রগতি হচ্ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার চার বছরের মধ্যেই নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। উন্নয়ন সহায়তার জন্য এটি ছিল একটি নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রচলিত ভূমিকার বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটিই ছিল ব্রিকসের প্রথম বড় পদক্ষেপ।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ভূরাজনীতি দ্রুত ব্রিকসের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ানে ভারত ও চীনের সংঘর্ষ হয়। ২০২২ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালে ব্রিকস সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রাজিল ও ভারত সম্প্রসারণের জন্য কিছু নিয়ম তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল, নতুন সদস্যদের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করতে হবে।
সৌদি আরবকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দেশটি মূল ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠায়নি। শুধু আউটরিচ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল। আরও একটি নতুন দিক হলো, ভারত এখন ব্রিকসের আর সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছে। কিন্তু তাতে মূল প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে, ১১টি সদস্যদেশ আসলে ব্রিকসের মাধ্যমে কী অর্জন করতে চায়?
ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকা সংঘাত ব্রিকসকে আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। বিশ্বের বড় উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে কী ভাবছে, ব্রিকস তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে।
ভারতের জন্য এবারের সম্মেলনে কোনো বড় বিরোধ ছাড়াই বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে পারা একটি কূটনৈতিক সাফল্য হবে। কিন্তু তাতেও ১১টি দেশের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর মিলবে না। ব্রিকস শেষ পর্যন্ত কী হতে চায়; একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ, নাকি পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।
লেখক- দ্য প্রিন্ট-এর প্রধান প্রতিবেদক
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার মানচিত্র কখনো স্থির থাকে না। যে রাষ্ট্রগুলো একসময় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রান্তে অবস্থান করত, অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তারাই একসময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসে। ব্রিকসের উত্থানকে এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্যেই বুঝতে হবে।
এটি কেবল কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সহযোগিতা কাঠামো নয়, বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসম বণ্টন সম্পর্কে একধরনের রাজনৈতিক প্রশ্ন।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর থেকে ‘ব্রিকস’ নামটির উৎপত্তি। পরবর্তী সময়ে এর পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া-এই ১১টি দেশ এর সদস্য। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রকে অংশীদার দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
ফলে ব্রিকস এখন আর পাঁচ দেশের একটি সীমিত মঞ্চ নয়, এটি ক্রমে বৃহত্তর দক্ষিণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশভূমিতে পরিণত হচ্ছে।
ব্রিকস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক সময়ে নির্মিত হয়েছিল, যখন বর্তমানের বহু উদীয়মান শক্তির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত।
কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। চীন ও ভারত বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে; ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজ নিজ অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে-বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তব ক্ষমতাবিন্যাস যদি বদলে যায়, তবে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে কেন? ব্রিকস মূলত এই অসামঞ্জস্যের জায়গাটিতেই প্রবেশ করেছে।
এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অধিকতর বহুকেন্দ্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি সংবেদনশীল করা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও উন্নয়ন কাঠামোতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠ শক্তিশালী করা, অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নে অর্থায়ন বৃদ্ধি, সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সংকটে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা-এসবই ব্রিকসের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অংশ।
ব্রিকসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হলো নতুন উন্নয়ন ব্যাংক। এই ব্যাংক অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি, নগরায়ণ, পরিবহন, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করে। এর লক্ষ্য প্রচলিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত করা নয় বরং উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য অর্থায়নের আরও একটি পথ তৈরি করা।
ব্রিকস কি অন্য আঞ্চলিক সংস্থার জন্য হুমকি? এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন, ব্রিকস প্রকৃত অর্থে কোনো আঞ্চলিক সংস্থা নয়।
কারণ, এর সদস্যরা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত নয়। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্র এতে রয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্রগুলোর জোট কিংবা আফ্রিকার আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এর সরাসরি প্রতিযোগিতা নেই।
বরং ব্রিকসের উত্থান সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলছে সেই আন্তর্জাতিক কাঠামোগুলোর প্রাধান্য নিয়ে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা শক্তির প্রভাব প্রবল। তবে ব্রিকসকে ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ হিসেবে দেখা অতিসরলীকরণ হবে।
ভারত যেমন ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও তার গভীর কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অতএব, ব্রিকসের প্রকৃত তাৎপর্য সম্ভবত পশ্চিমকে প্রতিস্থাপনে নয়; বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিকল্প দর-কষাকষির ক্ষেত্র সৃষ্টি করার মধ্যে।
বাংলাদেশ কী অর্জন করতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। প্রথমত, বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে বিপুল অবকাঠামোগত অর্থায়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০২১ সাল থেকে নতুন উন্নয়ন ব্যাংকের সদস্য। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের জন্য ব্যাংকটির অনুমোদিত অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক আগ্রহের পর্যায়ে নেই; এর একটি কার্যকর আর্থিক ভিত্তিও ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ব্রিকস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির পরিসর বাড়াতে পারে। চীন ও ভারত বাংলাদেশের দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ব্রিকস সদস্যরাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের জ্বালানিনিরাপত্তা, শ্রমবাজার ও বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
তৃতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বৈদেশিক অর্থায়ন, বাজার সুবিধা এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বের নতুন উৎস খুঁজতে হবে।
ব্রিকস সেই পরিবর্তনপর্বে একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবলম্বন হতে পারে।
চতুর্থত, ব্রিকসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিকে আরও কার্যকর বহুমুখিতা দিতে পারে।
একটি ক্ষুদ্র বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রের কৌশলগত সাফল্য সব সময় কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ করার মধ্যে থাকে না; বরং একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের দর-কষাকষির পরিসর বাড়ানোর মধ্যেই থাকে।
তাহলে বাধা কোথায়?
সম্ভাবনা যত বড়, কূটনৈতিক হিসাবও তত জটিল। বাংলাদেশের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা। দেশটির রপ্তানি, উন্নয়ন সহযোগিতা ও আর্থিক ব্যবস্থায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্ব বিপুল। অন্যদিকে চীন, ভারত, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য এশীয় রাষ্ট্রও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ব্রিকসে যোগদানকে যদি কোনো পক্ষের দিকে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকে পড়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ব্রিকসের অভ্যন্তরেই। এর সদস্যদের স্বার্থ সর্বক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে; রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের গভীর বিরোধ বিদ্যমান; ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-অগ্রাধিকারও এক নয়। এত বৈচিত্র্যের মধ্যে ব্রিকস কতটা সুসংহত রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়।
তৃতীয়ত, সদস্যপদ নিজেই কোনো অর্থনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। একটি রাষ্ট্র কোনো জোটে প্রবেশ করলেই বিনিয়োগ, বাণিজ্য কিংবা উন্নয়ন অর্থায়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায় না।
তার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল, প্রকল্প প্রস্তুতির সক্ষমতা, বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং দক্ষ অর্থনৈতিক কূটনীতি।
বাংলাদেশের সামনে ‘ব্রিকসে যোগ দেওয়া উচিত কি না’ এত সরল নয়। অধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্রিকসকে বাংলাদেশ তার জাতীয়
স্বার্থে কীভাবে ব্যবহার করবে?
পররাষ্ট্রনীতিতে সদস্যপদ কোনো অলংকার নয়, এটি একটি উপকরণ। ব্রিকসে প্রবেশের লক্ষ্য যদি কেবল একটি নতুন পরিচয় অর্জন হয়, তার মূল্য সীমিত। কিন্তু যদি এর মাধ্যমে বাংলাদেশ অবকাঠামো অর্থায়ন, নতুন বাজার, জ্বালানিনিরাপত্তা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বৃহত্তর দক্ষিণের রাজনৈতিক মঞ্চে অধিক কণ্ঠস্বর অর্জন করতে পারে, তবে এর কৌশলগত মূল্য অনেক বেশি।
আজকের বিশ্ব আর একক কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে না। ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ছে, নতুন মেরু তৈরি হচ্ছে, পুরোনো জোটের পাশাপাশি নতুন সমীকরণ গড়ে উঠছে।
এই পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো একটি শিবির নির্বাচন করা নয়; প্রয়োজন নিজের অবস্থানের মূল্য বৃদ্ধি করা। ব্রিকস সেই সুযোগগুলোর একটি।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য তখনই হবে, যখন ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেও ওয়াশিংটনকে হারাবে না, দিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা রেখেও নিজস্ব কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখবে, মস্কোর সঙ্গে কাজ করেও ব্রাসেলসের বাজারকে বিপন্ন করবে না এবং ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েও অন্য অংশীদারদের কাছে নিজেকে কোনো ভূরাজনৈতিক শিবিরের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরবে না।
কারণ, ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময় তার সামরিক সামর্থ্য নয়-অনেক সময় তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কারও স্যাটেলাইট স্টেট বা অনুগ্রহ নির্ভর রাষ্ট্র না হয়ে সবার কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার কূটনৈতিক সক্ষমতা।
ব্রিকস বাংলাদেশের জন্য সেই সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পথ হতে পারে-যদি সদস্যপদকে গন্তব্য নয়, জাতীয় স্বার্থ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।
ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই। ই–মেইল: akmahsanullah@gmail.com
মরুভূমিতে মুসলিম উটচালকদের রেখে যাওয়া ইতিহাস
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ মরুভূমি। চারদিকে লাল মাটি, তীব্র রোদ আর শুষ্ক প্রান্তর। এই দুর্গম পরিবেশের মাঝেই উনিশ শতকে গড়ে উঠেছিল মুসলিম উটচালকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি। তাদের হাত ধরে নির্মিত হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার প্রথম দিকের পরিচিত মসজিদ, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ অঞ্চল অনুসন্ধান, যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
সিডনি থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার উত্তরে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মারে এলাকায় এই ঐতিহাসিক স্থানের অবস্থান। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৬০-এর দশকে সেখানে মুসলিম উটচালকদের বসতি গড়ে ওঠে এবং তাদের উদ্যোগেই মসজিদ নির্মিত হয়।
তবে মসজিদটির সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো সূত্রে ১৮৬০-এর দশক, আবার কিছু সূত্রে ১৮৮০-এর দশকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনও মসজিদটিকে ১৮৬০-এর দশকের স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
১৮৬০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে আনুমানিক ৩ হাজার মানুষ আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। তাদের অনেককে সম্মিলিতভাবে ‘আফগান ক্যামেলিয়ার’ বলা হলেও সবাই আফগানিস্তানের নাগরিক ছিলেন না। ভারত ও বর্তমান পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু এলাকা থেকেও মুসলিম উটচালক ও ব্যবসায়ীরা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।
তখন অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম ছিল উট। মরুভূমির কঠিন পরিবেশে দক্ষ মুসলিম উটচালকেরা উটের কাফেলার মাধ্যমে দূরবর্তী খনি অঞ্চল, বসতি, রেললাইন নির্মাণ এলাকা ও টেলিগ্রাফ স্টেশনে খাদ্য, পানি, পণ্য ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দিতেন। ফলে দেশটির বিস্তীর্ণ অভ্যন্তরীণ অঞ্চলকে যোগাযোগের আওতায় আনতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এই সময়কে ‘ক্যামেল এরা’ বা ‘উটের যুগ’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। বর্তমান মারে এলাকার পুরোনো নাম ছিল হারগট স্প্রিংস। প্রাকৃতিক পানির উৎসের কারণে এটি উটের কাফেলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিশ্রাম ও যোগাযোগকেন্দ্রে পরিণত হয়। মুসলিম উটচালকেরা সেখানে নিজেদের বসতি গড়ে তোলেন, যা পরে ‘ঘান টাউন’ নামে পরিচিতি পায়।
সে সময় বসতির পরিচায়ক হিসেবে সেখানে খেজুরগাছও লাগানো হয়েছিল। মারে শহরে জাতিগত বিভাজনও ছিল। মুসলিম ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল শহরের উত্তর দিকে, আর ইউরোপীয়দের বসতি ছিল দক্ষিণ দিকে।
মারে মসজিদটি ছিল খুবই সাধারণ। বর্তমানের বড় গম্বুজ, মিনার কিংবা অলংকৃত স্থাপত্যের সঙ্গে এর কোনো মিল ছিল না। মাটির দেয়াল, কাঠ ও স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি ছোট এই মসজিদের ছাদ ছিল সাধারণ গেবল ধরনের। ভেতরে নামাজের স্থান, ছোট মিম্বর ও অজুর ব্যবস্থা ছিল। কাছাকাছি পানির উৎস ও আর্টেসিয়ান বোরের পানি অজুর কাজে ব্যবহার করা হতো। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় সেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন মুসল্লি নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন।
মসজিদটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বেশ কয়েকজন মুসলিম উটচালক, ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় ব্যক্তি। ইতিহাসে বেজাহ দারভিশ, দাদলেহ বালুচ, ফাইজ ও তাগ মহমেতের মতো ব্যক্তিদের নাম পাওয়া যায়। বিশ শতকের শুরুর দিকে আসিম খানও মারে এলাকার একটি মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করেন।
মারে এলাকায় একাধিক মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের মাটির তৈরি মসজিদগুলোর অন্তত একটি ১৯১০ সালের দিকে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নির্মিত গ্যালভানাইজড লোহার মসজিদটিও ধীরে ধীরে ব্যবহারের বাইরে চলে যায় এবং একসময় জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।
মুসলিম উটচালকদের প্রথম প্রজন্মের অনেকের মৃত্যুর পর এবং তাদের বংশধরদের একটি বড় অংশ ইসলামি অনুশীলন থেকে দূরে সরে যাওয়ায় মসজিদগুলোর নিয়মিত ব্যবহার কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মূল মসজিদটি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে মারে এলাকায় যে মসজিদটি দেখা যায়, সেটি মূল ভবনের একটি পুনর্নির্মিত প্রতিরূপ। ঐতিহাসিক স্থানটির স্মৃতি ধরে রাখতে ২০০৩ সালে এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। মূল স্থাপনাটি টিকে না থাকলেও মসজিদটির ইতিহাস অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিমদের প্রাথমিক উপস্থিতি এবং দেশটির দুর্গম অভ্যন্তরীণ অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের অবদানের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে আছে।
ছবি : সংগৃহীত
ইরান ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাত এখনো শেষ হয়নি; কিন্তু বিশ্লেষকেরা এর মধ্যেই এ থেকে কী শিক্ষা নেওয়া উচিত, তা ঘোষণা করতে তাড়াহুড়া শুরু করে দিয়েছেন। নিরাপত্তা নীতি-সংক্রান্ত একটি নতুন ধারার নিবন্ধে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত সামরিক অভিযানের বিভিন্ন রসদ-সংক্রান্ত ও কৌশলগত ঘাটতিগুলো তুলে ধরা হচ্ছে।
যেমন জ্বালানি তেল ও সার পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার প্রস্তুতি না থাকা, নিখুঁত অস্ত্র ও প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া, সস্তা একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন মোকাবিলার কার্যকর প্রস্তুতির অভাব, পর্যাপ্ত মাইন অপসারণকারী জাহাজের ঘাটতি ইত্যাদি।
ভবিষ্যতের সংঘাতগুলোর প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এগুলো হয়তো দরকারি শিক্ষা হতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে দেশের চরম ব্যর্থতার মূল কারণ এগুলো নয়। সংঘাতের অনেক আগেই যদি এই বিষয়গুলো সমাধান করা যেত, তাহলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য-অর্থাৎ শাসনব্যবস্থার পতন, ইরানের দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতা ধ্বংস করা বা পারমাণবিক অস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোর বিষয়ে তাদের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা-অর্জন করতে পারত কি না, তা বলা কঠিন।
অস্ত্রের মজুত বাড়ানো কিংবা তেলসংকটের প্রস্তুতি হয়তো দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণ অভিযান বা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির সুযোগ দিত। কিন্তু গত ছয় মাসে যা অর্জিত হয়নি, তা যে আরও সাত মাসের বোমাবর্ষণ বা অবরোধে অর্জিত হতো-এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
কৌশলগত ব্যর্থতার ফলে ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে আরও উন্মুক্ত সুযোগ পাওয়া, হরমুজ প্রণালিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখনো অত্যন্ত সক্ষম। এমনকি এই ভুলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধেও তারা এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা বিশ্বের অন্য কোনো সামরিক বাহিনীর নেই। তারা নিজস্ব উপকূল থেকে সাত হাজার মাইলের বেশি দূরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে এবং ইরানের আকাশসীমার ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
এর ফলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটি অত্যন্ত একপেশে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যেখানে ইরানের পক্ষে মৃতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই হাজার ছাড়িয়ে গেছে (যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই)।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, পরিকল্পনা ও সরবরাহের ব্যর্থতা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী দেখিয়েছে যে তারা এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তবে কোনো প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই সেই কৌশলগত অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ করতে পারে না, যা সামরিক বাহিনীর কাছে অসম্ভব কিছু দাবি করে বসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক বাহিনীর কাছে একটা নয়, তিন-তিনটি অসম্ভব কাজ চেয়েছেন এবং সেগুলো করতে ব্যর্থ হলে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
প্রথম অসম্ভব কাজ ছিল-কোনো ধরনের পদাতিক বা স্থল অভিযান ছাড়াই বোমাবর্ষণ করে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো। কেবল বিমানশক্তি দিয়ে কৌশলগত বিজয় অর্জনের স্বপ্ন স্বাধীন বিমানবাহিনীগুলো ১৯২১ সাল থেকেই দেখে আসছে, যখন ইতালীয় তাত্ত্বিক জিউলিও দুহেত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে কেবল বোমারু বিমান দিয়েই ভবিষ্যৎ যুদ্ধে জয় পাওয়া সম্ভব। তিনি ১৯২৮ সালে এমনকি এটাও দাবি করেছিলেন যে একটি মাঝারি আকারের দেশে মাত্র ৩০০ টন বোমা ফেললেই এক মাসের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।
কেবল আকাশপথেই যুদ্ধ জেতা যায়-এই তত্ত্ব আধুনিক শিল্পযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লন্ডনের ওপর জার্মানির ফেলা ৪০ হাজার টন বোমা কেবল ব্রিটিশদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার মানসিকতাকে আরও শক্ত করেছিল। জবাবে অক্ষশক্তির ওপর মিত্রবাহিনীর ফেলা ২৫ লাখ টন বোমা অ্যাডলফ হিটলারের রাজত্বকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তা কিন্তু তাদের পতন ঘটাতে পারেনি; বরং যুদ্ধের প্রতি সাধারণ জনগণের সমর্থনকে আরও চাঙা করেছিল।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেলা ৮০ লাখ টন বোমায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি; বরং তা সেখানে কমিউনিস্টদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়াতে সাহায্য করেছিল।
পারমাণবিক হামলা ছাড়া কেবল বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে কোনো শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা হয়তো অসম্ভব। এর কাছাকাছি যা গিয়েছিল, তা হলো স্লোবোদান মিলোসেভিচের অধীনে সার্বিয়ার ওপর ন্যাটোর বিমান হামলা। কিন্তু ১৯৯৯ সালের জুনেই সেখানে বোমাবর্ষণ বন্ধ হয়েছিল, আর মিলোসেভিচ সরকারের পতন ঘটেছিল ২০০০ সালের অক্টোবরে গণবিক্ষোভের মুখে।
কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানি সরকারের পতন ঘটানোর সম্ভাবনা ছিল শূন্যের কোঠায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে পরবর্তী অসম্ভব দাবি ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অকার্যকর করা-সেটিও কেবল আকাশপথ থেকে। কিন্তু সামান্য পদাতিক বাহিনী ব্যবহার করে মোবাইল লঞ্চার অকার্যকর করার এই চেষ্টাও অতীতে বারবার করা হয়েছে এবং প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও আমেরিকান ও ব্রিটিশ বিমানবাহিনী একটি বিস্তৃত বোমাবর্ষণ অভিযান চালিয়ে জার্মানির ভি-১ ও ভি-২ রকেটের উৎপাদন ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা উৎক্ষেপণ বন্ধ করতে পারেনি। এগুলো লুকিয়ে রাখা বা শক্ত আবরণে ঢেকে রাখা খুবই সহজ ছিল।
নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের বিকাশ এই হিসাবকে পাল্টে দিতে পারেনি। কারণ, এর বিপরীতে চলে এসেছে মোবাইল লঞ্চব্যবস্থা। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আকাশ থেকে ইরাকি স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চার ধ্বংস করার চেষ্টা একটিও নিশ্চিত ধ্বংসের প্রমাণ দিতে পারেনি।
একইভাবে ইসরায়েলও গাজা ও দক্ষিণ লেবানন থেকে হামাস ও হিজবুল্লাহর রকেট হামলা ঠেকাতে দুই দশক ধরে ব্যাপক বিমান অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু কেবল স্থল অভিযান চালিয়েই সেই রকেটগুলোকে নীরব করা সম্ভব হয়েছিল।
ইয়েমেন থেকে হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বন্ধ করতে একাধিক দেশের জোট চেষ্টা করেছে, অথচ এখনো সেই আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। সুতরাং নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কেবল আকাশ থেকে মোবাইল উৎক্ষেপণব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়, যা সহজে আড়াল থেকে নিক্ষেপ করে দ্রুত নতুন জায়গায় সরে যেতে পারে। শাসনব্যবস্থার পতনের মতোই, রকেট হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতেও স্থলবাহিনীর প্রয়োজন হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ ভরসা ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চালু রাখা, যাতে জিসিসিভুক্ত (গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলোর অবকাঠামো ইরান ধ্বংস করতে না পারে। কারণ, এই দেশগুলোর আতিথেয়তার ওপরই মার্কিন সামরিক অভিযান নির্ভর করছিল। আক্রমণ রোখার সস্তা উপায়ে বেশি বিনিয়োগ এবং স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করলে হয়তো মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি আক্রমণের বড় একটি অংশ প্রতিহত করতে পারত।
কিন্তু যেখানে ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সেগুলোকে ঠেকানোর ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি সস্তা এবং দ্রুতগতির, সেখানে ইরান শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে ভাসিয়ে দেবে-এটাই ছিল স্বাভাবিক। দুটি ব্যর্থতার পর তৃতীয় আরেকটি অসম্ভব কাজ মার্কিনদের রক্ষা করতে পারল না।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর যদি ড্রোন এবং রণতরি, মাইন অপসারণকারী জাহাজ ও সুরক্ষিত বিমানঘাঁটি-সম্পর্কিত কেনাকাটার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে চোখ খোলার প্রয়োজন থেকে থাকে, তবে সেই শিক্ষা তারা পেয়ে গেছে। কিন্তু এই যুদ্ধ পেন্টাগনের ভেতরে হারেনি; এটি হেরেছে হোয়াইট হাউসের অলিন্দে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে অসম্ভব কিছু দাবি করার ঝুঁকি যদি ট্রাম্পের মাথায় না ঢোকে, তবে তা মনে করিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব। অবশ্য ট্রাম্প কোনো অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বেছে নেননি; বরং পিট হেগসেথের মতো একজন অনুগত তোষামোদকারীকে বসিয়েছেন, যাঁর চরম অক্ষমতা তাঁকে কেবল আরও বেশি অনুগত করে তুলেছে।
হেগসেথ পেন্টাগনের শীর্ষ পদে থাকা এমন যেকোনো অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ছেঁটে ফেলার জন্য বহুদূর হেঁটেছেন, যিনি অন্য কোনো মতামত দিতে পারেন। মার্কিন অফিসার কোর কখনোই রাজনীতিবিদের কাছে অপ্রিয় খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজে খুব একটা পারদর্শী ছিল না, কিন্তু হেগসেথের এই কৌশলের কারণে প্রেসিডেন্টকে থামানোর মতো কেউ পেন্টাগনে অবশিষ্ট ছিল না।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন কাঠখড় পুড়িয়ে কোনোমতে সমস্যার সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করলেও হেগসেথের অন্ধ সমর্থনের মুখে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
এর সবই পূর্বানুমানযোগ্য ছিল এবং বস্তুত এর অনেকটাই আগেভাগে বলা হয়েছিল। ফলে ইরানে এই বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক দায় ট্রাম্প এবং তাঁর অপদার্থ উপদেষ্টাদের ওপর বর্তালেও, চূড়ান্ত দায় এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকে, যা কোনো রাজনীতিবিদ স্বীকার করবেন না-আর তা হলো দেশটির ভোটাররা।
ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ছিল মার্কিন সাধারণ ভোটারদের। একজন ব্যক্তি, যিনি স্পষ্টতই অক্ষম, যিনি অপ্রিয় বা ভিন্ন কোনো তথ্য গ্রহণে চরমভাবে অক্ষম এবং যিনি নিজেকে তোষামোদকারীদের দিয়ে ঘিরে রাখতে পছন্দ করেন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নেতা নির্বাচন করা আর কোনো রিয়্যালিটি শোর বিনোদনমূলক উপস্থাপক নির্বাচন করা যে এক কথা নয়, সেটাই এখন প্রমাণিত। পেন্টাগনের ভেতরে হয়তো ভুলগুলো নিয়ে প্রতিবেদন লেখা শুরু হয়ে গেছে।
কিন্তু তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে মার্কিন সম্পদের ক্ষয়-এই ব্যর্থতার কৌশলগত পরিণতিগুলো যখন আরও ঘনীভূত হতে থাকবে, তখন দেখার বিষয় একটাই: আমেরিকান ভোটাররা আদৌ বুঝতে পেরেছেন কি না যে ব্যালট বাক্সে করা ভুল পছন্দ থেকে কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কখনোই তাদের সুরক্ষা দিতে পারে না।
ব্র্যাট ডেভরোক্স একজন সামরিক ইতিহাসবিদ, রোমান অর্থনীতি ও সামরিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
সাকিব জাহান (মিশু)
ক্যাম্পাস মানেই এক টুকরো ভালোবাসার নাম। প্রথম যেদিন এই চত্বরে পা রেখেছিলাম, বুকের ভেতর কাজ করছিল এক অজানা ভয় আর জড়তা। কিন্তু সময়ের আবর্তে এই ক্যাম্পাসকে কখন যে প্রচণ্ড ভালোবেসে ফেলেছি, বুঝতেই পারিনি। আজ ভীষণ মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা—সিনিয়রদের স্নেহের পরশ, বন্ধুদের সাথে ক্লাস করা, আর ক্যাফেটেরিয়ার টেবিলে চায়ের কাপে ঝড় তোলা আড্ডা। বিশেষ করে ক্যাফেটেরিয়ার সেই চেনা সিঙ্গারার স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। ক্লাসের ফাঁকে অসময়ের আড্ডা কিংবা দল বেঁধে ভার্সিটির বাসে বাড়ি ফেরা—সবই এক অনন্য অনুভূতি। কখনো কোনো বন্ধুর মন খারাপ হলে সবাই মিলে তাকে হাসিয়ে তোলার সেই চেষ্টা, আমাদের এক নিবিড় ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবলে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। চেনা ছন্দ ফিরে আসুক, আমাদের স্বপ্নের ক্যাম্পাস আবার প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠুক—এটাই মনে-প্রাণে প্রত্যাশা।
সোশ্যাল মিডিয়া আর পত্রিকার পাতায় দেখেছিলাম ক্যাম্পাসটি অনেক সুন্দর। কিন্তু বাস্তবে এর মায়াবী রূপ যে কতটা ছোঁয়াচে, তা এখানে না এলে অনুধাবন করা অসম্ভব। ক্যাম্পাসের সুউচ্চ বিল্ডিং, সবুজ মাঠ, শান্ত পরিবেশ, এমনকি সিঁড়ির প্রতিটি কোণে কোণে কত শত খুনসুটি আর আড্ডার গল্প লুকিয়ে আছে!
ক্যাম্পাসের প্রথম দিনেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা একঝাঁক প্রাণোচ্ছল বন্ধু পেয়েছিলাম। খুব দ্রুতই জমে উঠেছিল আমাদের বন্ধুত্ব। মাঠজুড়ে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো আর দিনের ক্লান্তি শেষে টংয়ের দোকানের এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা—আমাদের দিনের সমাপ্তিটাকে করে তুলত অসাধারণ। এক পরম আনন্দের সময় পার করছি আমরা। আমাদের প্রিয় এই শহরের সুস্থতা কামনা করি, চারপাশের এই চেনা আনন্দগুলো যেন কখনো মলিন না হয়, কখনো মরিচা না ধরে স্মৃতির পাতায়।
লেখা:
সাকিব জাহান (মিশু)
শিক্ষার্থী, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, পঞ্চম পর্ব
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।