ছবি : সংগৃহীত
আগ্রাসী অভিবাসনবিরোধী নীতি এবং ইরানে যুদ্ধসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরও কয়েকটি নীতির প্রতিবাদে গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নগরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ট্রাম্পবিরোধী এ বিক্ষোভ ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গতকাল শনিবার তৃতীয়বারের মতো ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
এদিন যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ২০০টির বেশি জায়গায় বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আগের দুটো বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
তবে এবার সবচেয়ে বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় মিছিল হয়েছে নিউইয়র্ক, টেক্সাসের ডালাস, পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া ও ওয়াশিংটনে, যদিও দুই-তৃতীয়াংশ মিছিলের আয়োজন হয়েছে বড় বড় শহরের বাইরে।
আয়োজকেরা বলেছেন, গত বছরের জুনে প্রথমবার ‘নো কিংস’ বিক্ষোভের তুলনায় ছোট ছোট শহরগুলোতে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সেন্ট পলের বাইরে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্পের আগ্রাসী অবৈধ অভিবাসননীতির কারণে এ অঙ্গরাজ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সেখানে বিক্ষোভ মিছিলে অনেকেই নানা ধরনের পোস্টার উঁচিয়ে ধরেছিলেন। কারও কারও পোস্টারে রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটির ছবি দেখা গেছে। এ বছর মিনিয়াপলিসে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা এই দুজনকে গুলি করে হত্যা করেন।
জনসভায় মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালৎস বলেন, ট্রাম্প ও তাঁর নীতির বিরুদ্ধে তাঁরা যে প্রতিবাদ করছেন, সেটাই প্রমাণ করে- তাঁরাই যুক্তরাষ্ট্রের ভালো দিকগুলোর আসল শক্তি।
ওয়ালৎস আরও বলেন, ‘তাঁরা আমাদের কট্টরপন্থী বলেন। আপনারা একদম ঠিক বলেন, আমরা কট্টরপন্থী, আমরা সত্যই প্রভাবিত হয়েছি- মানবিকতা দ্বারা প্রভাবিত, শালীনতা দ্বারা প্রভাবিত, ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত, গণতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যা কিছু করা সম্ভব, তা করতে আমরা প্রভাবিত হয়েছি।’
ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও মিনেসোটায় বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই দেশকে স্বৈরাচার বা অলিগার্কদের দিকে পতিত হতে দেব না। এ দেশে জনগণের শাসন থাকবে।’
নিউইয়র্কে ম্যানহাটানে এদিন প্রায় লাখো মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এখানে বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজকদের একজন ছিলেন বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো।
রবার্ট ডি নিরো বলেন, ‘ট্রাম্পের আগে আর কোনো প্রেসিডেন্ট আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে এতটা অস্তিত্বের সংকটে ফেলেননি।’
৫৪ বছর বয়সী হলি বেমিস বলেন, তিনি এবং নিউইয়র্কে প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণকারী অন্যরা সেই একই চেতনায় কাজ করছেন, যেভাবে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা আমেরিকান বিপ্লবে লড়াই করেছিলেন।
এই নারী বলেন, ‘আমরা রাজাদের শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছি এবং আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়েছি। এখন আমরা আবারও ঠিক সেই কাজই করছি।’
ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে প্রতিবাদে জড়ো হওয়া লোকজন গণতন্ত্রের সমর্থনে স্লোগান দেন। এ সময় তাঁরা ট্রাম্পবিরোধী প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন।
মেরিল্যান্ডে একদল বয়স্ক মানুষ হুইলচেয়ারে বসে হাতে প্ল্যাকার্ড ধরে প্রতিবাদ জানান। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’, ‘গণতন্ত্র চাইলে আওয়াজ তুলুন’ এবং ‘ট্রাম্পকে বিদায় দিন’।
ডালাসে অনুষ্ঠিত সমাবেশে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাঁদের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রতিবাদে অংশ নেন অবসর জীবনে যাওয়া টেরেসা গানের।
তিনি বলেন, তিনি এতে অংশ নিয়েছেন কারণ- সবারই স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও লোভের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
টেরেসা বলেন, ‘ট্রাম্প যা কিছু করছেন, তার সবই নিজেকে আরও ধনী করতে এবং সাধারণ মার্কিনদের কাছ থেকে সম্পদ কেড়ে নিতে।’
গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার ‘দাঙ্গাকারী’ একটি ফেডারেল ভবন ঘিরে রাখার সময় দুজনকে ফেডারেল আইন প্রয়োগকারীদের ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, ফেডারেল কারাগারের আশপাশের এলাকা থেকে সরে না যাওয়ার কারণে একাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সেখানে বিক্ষোভকারীরা একটি বেড়ার ওপার থেকে ইট-পাটকেল ছুড়লে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আজ বুধবার ভাষণ দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান
‘ইরান কূটনীতির দরজা খোলা রাখতে প্রস্তুত। তবে কোনো চাপের মুখে মাথা নত করবে। ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়।’ বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের সামনে দেওয়া ভাষণে দৃঢ়কণ্ঠে এ ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়।
বক্তব্যের শেষ দিকে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে পেজেশকিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা, বাড়তি চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মুখে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ আরও বাড়বে। নিষেধাজ্ঞা, চাপ ও হুমকি বাড়ানো হলেও ইরানের জনগণ কখনো মাথা নত করবে না। আমরা কখনো মাথা নত করব না, হাঁটু গেড়ে বসব না।
ইরান সংলাপ ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান বলেন, তবে কোনো ধরনের ‘শক্তির ভাষা’ মেনে নেবে না তার দেশ। তিনি বলেন, ‘তারা বুঝেছে যে ইরানকে আত্মসমর্পণ করানো যায় না।’ তিনি মন্তব্য করেন—ইরান কখনো আগ্রাসী দেশ ছিল না, কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি এবং সবসময় আলোচনার টেবিলে বসার ব্যাপারে নিজেদের প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে।
ব্ক্তব্যের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতিসংঘের আগের দিনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ট্রাম্প ইরানকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরাই সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছি।’
ভাষণে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকিও দেন তিনি।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি ছবি তুলে ধরে পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর প্রথম দিন তেহরানে তাঁর কম্পাউন্ডে বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন। এরপর তিনি হামলায় নিহত শিশুদের ছবিও দেখান।
ইরান নিয়ে জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী মিশন চলতি মাসের শুরুতে জানিয়েছিল, একটি স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় সামরিক হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার ‘যুক্তিসংগত ভিত্তি’ রয়েছে এবং এসব হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের প্রয়োজন পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, পারমাণবিক বোমা নয়। তাঁর দাবি, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ইরানের অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর সন্দেহ করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা বা সিক্রেট সার্ভিস। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
ইরানের প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি দেশটির প্রতিনিধি দলের অন্য কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনৈতিক নিরাপত্তা শাখার গোয়েন্দারা। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফেডারেল নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
পেজেশকিয়ান ও ইরানের প্রতিনিধি দলের নিরাপত্তায় নিউইয়র্ক পুলিশের গোয়েন্দা সদস্যদের পাশাপাশি গোয়েন্দা বিভাগের অন্যান্য সদস্য এবং মহাসড়ক পুলিশের গাড়িবহরও থাকবে।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ইরান কয়েক দশক ধরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও তার পূর্বসূরি ইব্রাহিম রাইসি।
তবে এবারের অধিবেশনে ইরানের উপস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কারণ ইরানের প্রতিনিধি দল এমন একটি দেশের মাটিতে অবস্থান করছে, যার সঙ্গে দেশটির যুদ্ধ এখনো চলছে।
এ অবস্থায় ইরানের প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবেই করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা অংশ নিচ্ছেন। অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর। সংস্থাটির সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বসেছে। প্রথম দিন গতকাল মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩৭ মিনিটের ভাষণে ইরান যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড, জলবায়ু পরিবর্তন, ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশ্বশান্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতিসংঘে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষণটি গত বছরের চেয়ে কিছুটা কম বিস্ফোরক ছিল। তবে এবারও তিনি নানা বিষয়ে ‘মিথ্যা’ বলেছেন। আসুন, সেসব বিষয়ে জেনে নিই—
যুদ্ধ বন্ধের দাবি
ট্রাম্প অনেক আগে থেকেই আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি করে আসছেন। দাবিটি পুনর্ব্যক্ত করে ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আটটি যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছি। এটা আমার জন্য বড় সম্মানের।’
এ আটটি যুদ্ধ ও সংঘাত হলো কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড, কসোভো ও সার্বিয়া, রুয়ান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, ভারত ও পাকিস্তান, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান, ফিলিস্তিনের গাজা, ইসরায়েল ও ইরান এবং মিসর ও ইথিওপিয়া।
তবে ট্রাম্পের বলা এ ‘আটটি যুদ্ধের’ সংখ্যা স্পষ্টতই অতিরঞ্জিত। কেননা, ট্রাম্পের তালিকায় এমন দুটি ঘটনা আছে, যেগুলো তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার সময় আদৌ ‘যুদ্ধ’ ছিল না। মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে বিরোধটি ছিল একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে কূটনৈতিক বিরোধ।
সার্বিয়া ও কসোভোর পরিস্থিতিও যুদ্ধ ছিল না। সেখানে কী ধরনের যুদ্ধ ট্রাম্প বন্ধ করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ ছাড়া রুয়ান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সেখানে একটি শান্তি চুক্তি হয়েছে। সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
গাজার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের দাবি নিয়ে প্রশ্ন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সেখানে যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েল এখনো উপত্যকাটিতে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে।
গত বছর ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানের সঙ্গে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এক সময় মানুষকে আক্রমণ করতে পারে বা হত্যা করতে পারে—এ সতর্কবার্তা নিয়ে ভাষণে ঠাট্টা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, এসব সতর্কতা দিচ্ছেন ‘সেই একই লোকেরা’, যাঁরা বলেছিলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে।
ট্রাম্প দাবি করেন, পরে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শব্দটি বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা জলবায়ু পরিবর্তন করা হয়েছে। কারণ, পৃথিবী নাকি উষ্ণ হওয়ার বদলে ঠান্ডা হচ্ছিল। আর এ কারণে কেউ মারাও যায়নি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে অন্তত চারটি ‘ভুল’ আছে। প্রথমত, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ শব্দটি এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটিও প্রচলিত। দুটি শব্দের অর্থ এক নয়। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা দুটি শব্দই ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা বোঝাতে তাঁরা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বলেন। আর এর ফলে পৃথিবীতে যে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, সেগুলো বোঝাতে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প কোন সময়ের কথা বলেছেন, সেটা স্পষ্ট নয়। তবে পৃথিবী ঠান্ডা হচ্ছে, এমন দাবির কোনো ভিত্তি নেই; বরং পৃথিবী আরও উষ্ণ হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) গত জানুয়ারিতে জানায়, রেকর্ড রাখা শুরুর পর সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর হলো সর্বশেষ ১১ বছর। এর মধ্যে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল সবচেয়ে উষ্ণ তিনটি বছর।
তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ‘কেউ মারা যায়নি’—এমন দাবির সঙ্গেও বিশেষজ্ঞরা একমত নন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঠিক কত মানুষ মারা গেছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন হিসাবে এ সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন হতে পারে। ভবিষ্যতে আরও মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
চতুর্থত, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে আমরা সবাই মারা যাব’-জলবায়ু বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিবেদনে এমন কথা বলা হয়নি। ২০১৮ সালে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পৃথিবীর উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে হলে পরবর্তী ১২ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। এ সীমা অতিক্রম করলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন।
বিনিয়োগ নিয়ে বিভ্রান্তি
ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, ‘পুরো বিশ্ব থেকে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আমরা নিশ্চিত করেছি।’ এ দাবির স্পষ্ট কোনো ভিত্তি নেই। এর পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব দিতে পারেনি হোয়াইট হাউস।
ট্রাম্পের ভাষণের সময় হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে বলা হয়, তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের। ট্রাম্পের বলা ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির তুলনায় এ অঙ্ক বেশ কম।
২০২৫ সালে সিএনএনের এক বিশদ পর্যালোচনায় হোয়াইট হাউসের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, তালিকায় কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের অস্পষ্ট বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ধরা হয়েছে।
মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে ঘাটতি
ইরানের সঙ্গে টানা যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে টান পড়েছে, এমন দাবির কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প। ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে কোনো ঘাটতি নেই।
ট্রাম্প বলেন, ‘কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতকেরা বলতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার কমে গেছে, তা সত্য নয়। আমাদের কাছে এত বেশি অস্ত্র আছে, তা কখনো ব্যবহার করার কথাও ভাবতে পারি না। আমরা এমন মাত্রায় অস্ত্র তৈরি করছি, যা আগে কখনো করিনি।’
মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে ঠিক কত অস্ত্র আছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, হয়ও না। তাই ট্রাম্পের দাবি পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব নয়। ‘কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক’ বলতে ট্রাম্প কাদের বোঝাচ্ছেন, সেটিও স্পষ্ট নয়।
তবে শুধু সিএনএনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম নয়, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের (পেন্টাগন) ওপর নজরদারি করা সরকারি পরিদর্শক সংস্থা এবং নির্দলীয় কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস বলেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্রের মজুত কমে গেছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত পৃথক দুটি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরিস্থিতি সামাল দিতে পেন্টাগন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। তবে অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে প্রতিরক্ষা শিল্প খাতের ‘উল্লেখযোগ্য সময়’ লাগবে।
পেন্টাগন বরাবর বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে কোনো ঘাটতি নেই। গত সপ্তাহেও একই দাবি করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে অপরাধ কমার হার নিয়েও বাড়িয়ে বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, গত বছরের ২০ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাজধানী ওয়াশিংটন অপরাধে জর্জরিত ছিল। এখন সেখানে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে। তাঁরা শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্পের বলা ‘৮৭ শতাংশ’ অপরাধ কমার হার সঠিক নয়।
ওয়াশিংটনের পুলিশ গত সোমবার পর্যন্ত ১৫ হাজারের বেশি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ। ট্রাম্প যে ৮০ শতাংশের বেশি কমার দাবি বারবার করছেন, তার সঙ্গে এ হিসাবের মিল নেই।
ওয়াশিংটন পোস্টে গত আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে অপরাধ ‘৮১, ৮৮ বা ৯২ শতাংশ’ কমেছে, ট্রাম্পের এমন দাবির পক্ষে কোনো তথ্য দিতে পারেনি হোয়াইট হাউস।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
গত জানুয়ারিতে এক অভিযানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী আটক করার পর এটিই ছিল তাদের প্রথম বৈঠক।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ট্রাম্পের আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রদ্রিগেজের সঙ্গে এই সংক্ষিপ্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রথম সফর। আজ বুধবার বিকেলে সাধারণ পরিষদে তার ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধি দলের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দেশটির অর্থনীতি বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট, তেলমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত প্রতিনিধি দলের মূল লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলাকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় বা উপযুক্ত হিসেবে তুলে ধরা। প্রতিনিধি দলটি যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও ঋণ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রদ্রিগেজের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস এবং প্রেসিডেন্টের সহকারী ও নীতি-বিষয়ক ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার।
মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রদ্রিগেজের সঙ্গে ট্রাম্প একটি কর্ম-সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তবে সমালোচকদের মতে, ওয়াশিংটন মারিয়া করিনা মাচাদোর নেতৃত্বাধীন বিরোধী পক্ষকে পাশ কাটিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে তেল ও বিনিয়োগ চুক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং অবাধ নির্বাচনের দাবি থেকে সরে এসেছে। নির্বাচনের দাবিতে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে ভেনেজুয়েলার একদল মানুষ বিক্ষোভ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প মাদুরোকে একজন ‘আইন-বহির্ভূত স্বৈরশাসক’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, মাদুরোর গ্রেপ্তারের পর থেকে শত শত রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি এই অভিযানকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র তার ‘অতুলনীয় সামরিক শক্তি’ প্রয়োগ করবে।
‘বিজয়ীই সব সম্পদের মালিক হয়’- মন্তব্য করে ট্রাম্প গত মাসে কারাকাসের সঙ্গে তার প্রশাসনের স্বাক্ষরিত একটি তেল চুক্তিকে ‘সম্ভবত সর্বকালের সবচেয়ে বড় চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসুক- এমনটাই তিনি চান।
সূত্রমতে, গত সোমবার একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে নিউইয়র্কে পৌঁছান রদ্রিগেজ। প্রতিনিধি দলটি মার্কিন কর্মকর্তা, বহুপাক্ষিক ঋণদাতা সংস্থা এবং বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও ঋণ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রধান ভেনেজুয়েলার জন্য ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদনের চেষ্টা করছেন। তবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কিছু সদস্যের কাছ থেকে তিনি বাধার মুখে পড়েছেন।
রদ্রিগেজের উপস্থিতির প্রতিবাদ জানাতে জাতিসংঘের বাইরে ৫০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী সমবেত হন। তারা ভেনেজুয়েলার পতাকা ওড়ান এবং ‘ভোট নেই তো তেলও নেই’ ও ‘নতুন মুখ, একই শাসনব্যবস্থা’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। অনেকেই জানান, তারা চান ট্রাম্প যেন দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে অবাধ নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
বিক্ষোভকারীরা ভেনেজুয়েলার জাতীয় সংগীত গাওয়ার পাশাপাশি স্লোগান দেন- ‘ডেলসি, আমি শপথ করে বলছি, মাদুরোর সঙ্গে তোমাকেও ব্রুকলিনে যেতে হবে।’ এই স্লোগানের মাধ্যমে নিউইয়র্ক শহরের ব্রুকলিন বরোতে অবস্থিত ফেডারেল কারাগারের কথা বোঝানো হয়েছে, যা জাতিসংঘের ঠিক বিপরীতে ইস্ট নদীর ওপারে অবস্থিত। মাদক পাচারের অভিযোগে বিচার-প্রক্রিয়া চলাকালে তার পূর্বসূরি মাদুরোকে সেখানেই আটক রাখা হয়েছে।
২০১৭ সালে কারাকাস থেকে চলে আসা ৩৪ বছর বয়সী সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার মিগুয়েল এদুয়ার্দো মার্টিনেজ বলেন, ‘একদিকে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সেই শাসনব্যবস্থার কোনো অংশের বৈঠক দেখাটা যেমন ক্ষোভের বিষয়, তেমনি এতে কোনো সন্দেহ নেই যে- এই সরকারের কারণেই আজ আমরা স্বাধীনতার আরও এক ধাপ কাছাকাছি পৌঁছেছি।’
বিক্ষোভকারী সিজার কোয়েলো বলেন, ডেলসি রদ্রিগেজ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চাভিস্টা একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত এবং এর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি কমলা রঙের কারাগারের পোশাক পরা রদ্রিগেজের ছবিযুক্ত একটি প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন।
‘চাভিসমো’ হলো ভেনেজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক আন্দোলন।
কোয়েলো বলেন, আশা করছি ট্রাম্প ও রদ্রিগেজ শিগগিরই নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দিচ্ছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ
গাজায় কোনো মানবিক করিডর এখনো চালু হয়নি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার সমালোচনা করে তিনি এ আক্ষেপ করেন। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন তিনি। আগামী মে মাসে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়ার আগে এটিই জাতিসংঘে তার শেষ ভাষণ।
মাখোঁ বলেন, এক বছর আগে একই মঞ্চে প্রায় এক ডজন দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তখন কেউ কেউ বলেছিলেন, স্বীকৃতি শুধু একটি কাগজ এবং বাস্তব পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, শান্তির দাবি করা হলেও এক মুহূর্তের জন্যও মানবিক সহায়তার পথ খুলে দেওয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সবাইকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা উচিত কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মাখোঁর বক্তব্যের জবাবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ট্রাম্প ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করেছেন এবং জীবিত সব জিম্মিকে মুক্ত করেছেন। নিহত জিম্মিদের মরদেহও তাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়ে। গাজার জন্য ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ চলছে।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরও যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ায় ফ্রান্সে মাখোঁ সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
তবে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটি কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।
জাতিসংঘে ভাষণে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানান মাখোঁ। তিনি বলেন, সেখানে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। অথচ পশ্চিম তীরে হামাস কখনো কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।
মাখোঁ বলেন, পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তা প্রতিদিন ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্বের বৈধ অধিকারকে সম্মান করে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
গত এক বছরে ইসরায়েলের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কেও টানাপোড়েন বেড়েছে। মাখোঁ বলেন, ইসরায়েলের সব প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলেই দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে-এমন ধারণা ভুল।
তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেই দুর্বল করছে।
২০১৭ সালে প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন মাখোঁ। আগামী বছর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এবারের ভাষণটি ছিল জাতিসংঘে তার শেষ উপস্থিতি।
সূত্র: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে তারা।
এরপর এক নজিরবিহীন চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সেই সামরিক অভিযান ও তেলচুক্তির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র টানলেন।
একমুহূর্তের জন্য চোখের পলক না ফেলে ট্রাম্প বললেন, ‘যুদ্ধে যে বিজয়ী, লুটের মালামাল সে-ই পাবে, এটাই নিয়ম। সে কথা তো আপনারা জানেন, তাই না?’
ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলাকে একসঙ্গে ধরলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল এখন তাদের হাতে।
৮০ বছর আগে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধ ঠেকাতে, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে, শান্তি বিঘ্নিত হলে সম্মিলিত ব্যবস্থা নিতে। সেই জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বললেন, প্রয়োজনে তিনি যুদ্ধ করবেন। বিজয়ের পুরস্কার হিসেবে পরাজিত দেশের মূল্যবান সম্পদে ভাগ বসাবেন। যেন এতে প্রশ্নের কিছু নেই, বিস্ময়েরও কিছু নেই।
একই ভাষণে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।’
এই শক্তি কতটা অপ্রতিরোধ্য, তার উদাহরণ হিসেবে তিনি ইরানকে টেনে আনলেন।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে-ইরানের সঙ্গে চুক্তি করব, নাকি ইসলামিক রিপাবলিককে নিশ্চিহ্ন করে দেব।’
এরপর ট্রাম্প প্রশ্ন করলেন, ইরানকে কি এমনভাবে ‘নরকে পাঠাবেন’, যাতে তার টিকে থাকার বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো আশা না থাকে।
জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের এমন হুমকি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০১৭ সালে সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণেও তিনি উত্তর কোরিয়াকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়েছিলেন।
৯ বছর পর ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বুঝিয়ে দিলেন, এটি কোনো তাৎক্ষণিক মুখ ফসকানো কথা নয়, শক্তি প্রয়োগের অধিকার সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বাসেরই পুনরাবৃত্তি।
অথচ ২০১৭ সালের সেই ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কারও ওপর নিজের জীবনধারা চাপিয়ে দিতে চায় না; বরং শক্তিশালী, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পাশাপাশি কাজ করবে।
কিন্তু গতকালের ভাষণে সেই সার্বভৌমত্বের ধারণাই উল্টে গেল। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ। কিন্তু দুর্বল দেশের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থের’ অধীন।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে বিশ্ব সংস্থা গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল একতরফা সামরিক শক্তির বদলে আলোচনা, মধ্যস্থতা ও সম্মিলিত নিরাপত্তার মাধ্যমে বিরোধ মেটানো।
জাতিসংঘ সনদ অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি নিষিদ্ধ করেছে। এর স্বীকৃত ব্যতিক্রম দুটি-নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন অথবা সশস্ত্র হামলার মুখে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক আত্মরক্ষা।
ভেনেজুয়েলা বা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এগুলোকে তাৎক্ষণিক সশস্ত্র হামলার জবাবে সীমিত আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবেও ট্রাম্প উপস্থাপন করেননি। বরং তাঁর প্রকাশ্য যুক্তি ছিল আরও বিস্তৃত: যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, শত্রুর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণ ও বিজয়ের পর অর্থনৈতিক সুবিধা।
এ কারণেই ট্রাম্পের ঘোষণা এত উদ্বেগজনক। কোনো সামরিক সর্বাধিনায়ক তাঁর সেনাদের উদ্দেশে এ কথা বলছিলেন না। কোনো আসন্ন হামলা ঠেকাতে আক্রমণকারী দেশকেও তিনি সতর্ক করছিলেন না। তিনি বলছিলেন এমন একটি মঞ্চে, যেখানে সমবেত রাষ্ট্রনেতাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ মেটানো। শুধু ‘জাতীয় স্বার্থ’ দেখিয়ে অন্য রাষ্ট্রে হামলা কিংবা তার সম্পদ দখলের অধিকার দাবি করা জাতিসংঘের নীতি-আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।
১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিন এবং পরে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেল্টের এক ঘোষণার মাধ্যমে ওয়াশিংটন পশ্চিম গোলার্ধকে নিজের বিশেষ স্বার্থবলয় হিসেবে দেখতে শুরু করে। উভয় সিদ্ধান্ত লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক যুক্তি জুগিয়েছিল।
গতকাল ট্রাম্প সেই পুরোনো মতবাদকে আরও বিস্তৃত করলেন। তিনি বললেন, পশ্চিম গোলার্ধ তো বটেই, ‘আমাদের অঞ্চল এবং সারা বিশ্বে’ প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে। কোথায়, কখন, কীভাবে সেই শক্তি প্রয়োগ হবে, সিদ্ধান্ত নেবে ওয়াশিংটন একাই।
ট্রাম্পের বহুপক্ষীয়তাবিরোধী অবস্থান ভাষণের অন্য অংশেও স্পষ্ট ছিল। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ‘আমেরিকাবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে এই আদালত ত্যাগ করার আহ্বান জানান।
উল্লেখ করা দরকার, আদালতটি জাতিসংঘের কোনো অঙ্গ নয়। রোম সংবিধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান।
ট্রাম্প আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার প্রস্তাবিত বৈশ্বিক কার্বন শুল্কের বিরোধিতা করেন। ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার ভূমিকার সঙ্গে অভিবাসনবিষয়ক অবস্থান জড়িয়ে আক্রমণ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেওয়া ট্রাম্পের এই ভাষণের শ্রোতা শুধু বিশ্বনেতারা ছিলেন না, দেশের ভেতরের ভোটারদের কথাও ট্রাম্পের মাথায় ছিল। ভাষণে কূটনীতি বা বহুপক্ষীয় সমঝোতার বদলে ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর অনুগত সমর্থকেরা তাঁকে এভাবেই দেখতে ভালোবাসেন।
সবশেষ রয়টার্স-ইপসস জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে ৩২ শতাংশে। অনুমান করা যায়, সেই সমর্থন কিছুটা ফেরাতে তিনি নিজেকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, যেন গোটা বিশ্বের ‘কমান্ডার ইন চিফ’ হিসেবে হাজির করতে চেয়েছেন।
ট্রাম্প অনেক আগে থেকেই জাতিসংঘভিত্তিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। গতকাল তিনি আরও এক ধাপ এগোলেন।
জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল এই বিশ্বাস থেকে যে সামরিক বিজয় কোনো দেশকে পরাজিত জনগণের ভূমি ও সম্পদের মালিক বানায় না। অথচ সেই মঞ্চে দাঁড়িয়েই ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, বিজয়ীরই অধিকার লুটের মালে।
দুর্বল হয়ে পড়া বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার কফিনে ট্রাম্প আরেকটি পেরেক ঠুকে গেলেন।