ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : সোমবার ৩০ মার্চ, ২০২৬, সময় : ১:২১ এএম

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি ইরানি দ্বীপ দখলের জন্য সেনা পাঠাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন মেরিন সেনা ও ছত্রীসেনারা (প্যারাট্রুপার) সেখানে একটি মরণফাঁদে পড়তে পারেন। কারণ, তাঁদের রসদ সরবরাহব্যবস্থা থাকবে অরক্ষিত আর কৌশলগত লক্ষ্যগুলোও অস্পষ্ট। মিডল ইস্ট আইকে এমনটাই বলেছেন সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা।


ওই এলাকায় মার্কিন সামরিক অভিযানটি শুরু হবে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ও রাডার ব্যবস্থা অচল (জ্যাম) করার মধ্য দিয়ে। আর এর পরপরই চালানো হবে ব্যাপক বোমা হামলা।


মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনসের সাবেক চিফ অব স্টাফ সেথ ক্রুমরিক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে প্রস্তুতিমূলক এবং বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বর্তমানে গ্লোবাল গার্ডিয়ান নামের একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ক্রুমরিক। তিনি বলেন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধের পর ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করতে ‘প্রস্তুতিমূলক’ হামলা চালানো হবে।


যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে। তবে তিনটি দ্বীপের ওপর বেশি নজর থাকবে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে খারগ দ্বীপ। কুয়েতের উল্টো দিকে অবস্থিত এই দ্বীপটিতে এমন সব স্থাপনা রয়েছে, যেখান থেকে ইরান তাদের মোট তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ রপ্তানি করে।


আবু মুসা এবং এর কাছাকাছি আরও দুটি ছোট দ্বীপ উপসাগরীয় অঞ্চলের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে ইরানের সাবেক শাহ এগুলো দখল করেছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত এই দ্বীপগুলোর মালিকানা দাবি করে আসছে।


অন্য একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে কেশম দ্বীপ। এটি দখল করা সবচেয়ে কঠিন হবে। কারণ, এটি আয়তনে সবচেয়ে বড় এবং এখানে ইরানের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক রয়েছে। এসব সুড়ঙ্গে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করে রাখা হয়।


প্রায় দেড় লাখ ইরানি এই দ্বীপে বসবাস করেন। দ্বীপটি বন্দর আব্বাস থেকে খুব সামান্য দূরত্বে অবস্থিত। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে কেশম এবং এর পাশের দ্বীপ লারাকের মধ্যবর্তী পথ দিয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।


আকাশপথে আগ্রাসনের আশঙ্কা বেশি


বিশ্লেষকেরা প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপ যুদ্ধের আলোচনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মেরিন সেনাদের সমুদ্র থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওকিনাওয়া এবং আইও জিমা দ্বীপের দিকে উঠে আসার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তবে মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ড্যানিয়েল ডেভিস বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ থাকায় মার্কিন আক্রমণকারী বাহিনীর প্রথম অংশটি সম্ভবত আকাশপথেই আসবে।


ডেভিস বলেন, ‘ইউএসএস বক্সার বা ইউএসএস ত্রিপোলিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার করে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই আমি দেখছি না।’ তিনি মূলত দুটি উভচর যুদ্ধজাহাজের কথা বুঝিয়েছেন, যেগুলোতে করে কয়েক হাজার মার্কিন মেরিন সেনাকে এই অঞ্চলে আনা হচ্ছে। এই জাহাজগুলো ছোট আকারের ল্যান্ডিং ক্রাফট (উপকূলে সেনা ও রসদ পৌঁছানোর নৌযান) ও হোভারক্রাফট (উভচর যান) বহনে সক্ষম।


ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর সিনিয়র ফেলো ডেভিস বলেন, ‘এখানে কেবল একটিই বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে, আর তা হলো আকাশপথ।’

মার্কিন সেনাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ভি-২২ অস্প্রে টিল্ট-রোটর বিমান, চিনুক এবং ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ব্যবহার করবে।


যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শুক্রবার বলেছেন, স্থলসেনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। তবে এর মধ্যেও ওই অঞ্চলে স্থল অভিযানে পারদর্শী একটি বাহিনী পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন।


প্রায় ২ হাজার ৫০০ সেনার সমন্বয়ে গঠিত দুটি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের আরও ৩ হাজার ছত্রীসেনাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ইউএস নেভাল পোস্টগ্রাজুয়েট স্কুলের শিক্ষক কালেভ সেপ বলেন, মার্কিন আক্রমণকারী বাহিনীকে সম্ভবত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর ঘাঁটির ওপর নির্ভর করতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দিলে, তারা (মার্কিন বাহিনী) এটি করতে পারবে না।’


এর আগে মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে সমর্থন দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। আমিরাত প্রকাশ্যে এমন যেকোনো যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে, যা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। সৌদি আরব জনসমক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে তুলনামূলক কম আক্রমণাত্মক হলেও, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।


‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’র সিনিয়র ফেলো ডেভিস বলেন, হেলিকপ্টারে করে আসা মার্কিন সেনারা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ড্রোন এবং এমনকি হালকা অস্ত্র ও আরপিজি (কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ট্যাংকবিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র) হামলার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।


ডেভিস বলেন, ‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেই হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেনা নামানো হবে। তবে ইরানও মানচিত্র পড়তে জানে, তাই তারা এর জন্য প্রস্তুত থাকবে।’


‘ফকল্যান্ড আক্রমণের চেয়েও কঠিন’


মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি থাকা কোনো দ্বীপ দখল করার জন্য পশ্চিমা কোনো আক্রমণকারী বাহিনীর শেষ চেষ্টা ছিল ১৯৮২ সালে। ওই সময় ব্রিটেন আর্জেন্টিনার কাছ থেকে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ পুনরায় দখল করে নেয়। সেই সময় উভচর অবতরণের (দ্বীপের তীরে ওঠার) সময় আর্জেন্টিনার বিমানবাহিনী ব্রিটিশ জাহাজগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছিল।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে মার্কিন আক্রমণকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানের কাছে এখনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন রয়েছে। আর্জেন্টিনা থেকে ফকল্যান্ডের দূরত্বের তুলনায় ইরানের দ্বীপগুলো দেশটির মূল ভূখণ্ডের অনেক বেশি কাছাকাছি। এর ফলে এমনকি প্রথাগত কামানের সাহায্যেও মূল ভূখণ্ড থেকে এই দ্বীপগুলো রক্ষা করা অনেক সহজ।


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক কর্মকর্তা সেপ বলেন, ‘ব্রিটিশদের জন্য ফকল্যান্ড জয় যতটা কঠিন ছিল, পারস্য উপসাগরের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং ড্রোন যুদ্ধের উন্নতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি এখন আরও বেশি কঠিন।’ তিনি বলেন, ‘খুব কম বিশেষজ্ঞই বিশ্বাস করেন যে ইরান মার্কিন আক্রমণকারী বাহিনীর অবতরণ ঠেকাতে পারবে। কিন্তু একবার মার্কিন মেরিন সেনারা বা ছত্রীসেনারা সেখানে পৌঁছে গেলে, তারা প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়বে। খারগ এবং বিশেষ করে কেশম দ্বীপের ভূপ্রকৃতি ইরানি সেনাদের লুকিয়ে থেকে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর সুযোগ করে দেবে।’


‘মোজাইক ডিফেন্স’ প্রয়োগ করবে ইরান


ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) স্থলযুদ্ধবিষয়ক সিনিয়র ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট বলেন, ইরান তাদের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ বা খণ্ড খণ্ড প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর আরও বেশি জোর দেবে।


২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সাদ্দাম হোসেনের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সাজানো (টপ টু ডাউন) সামরিক বাহিনীকে দ্রুত পরাজিত করেছিল, তা দেখার পরই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামো বা ‘ডিসেন্ট্রালাইজড কমান্ড স্ট্রাকচার’ প্রবর্তন করে।


চলমান যুদ্ধজুড়ে এই ‘মোজাইক ডিফেন্স’ ব্যবস্থার প্রতিফলন দেখা গেছে। আইআরজিসির ৩১টি পৃথক কমান্ড রয়েছে—প্রতিটি প্রদেশের জন্য একটি করে। সেখানকার কর্মকর্তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা রয়েছে। এমনকি আইআরজিসিকে আরও ছোট ছোট শাখায় বিভক্ত করা সম্ভব।


স্টুয়ার্ট বলেন, ‘তারা গেরিলাযুদ্ধের ওপরই বেশি নির্ভর করবে। আমেরিকানদের এমন কোনো সুযোগ দেবে না, যাতে তাদের খোলা ময়দানে টেনে এনে উন্মুক্ত লড়াইয়ে জড়াতে পারে।’


তিন সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে বিমান হামলার পাশাপাশি সমুদ্র ও স্থল থেকে ইরানের ওপর অনবরত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন মাটিতে থাকা মেরিন সেনা এবং ছত্রীসেনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু বা কৌশলে নতুন করে পরিবর্তন আনতে হবে।


আইআইএসএসের সিনিয়র ফেলো স্টুয়ার্ট বলেন, ‘আমরা এমন এক বিমান ও নৌবাহিনীর কথা বলছি, যারা কয়েক সপ্তাহ ধরে অত্যন্ত তীব্রগতিতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এখন মাটিতে থাকা সেনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে তাদের শক্তিতে টান পড়বে।’


‘আ ব্রিজ টু ফার’


স্টুয়ার্ট বলেন, একবার মার্কিন সেনারা উপকূলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিলে, তাদের জন্য নিয়মিত খাদ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং গোলাবারুদ সরবরাহের প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সেখানে রকেট লঞ্চার, সাঁজোয়া গাড়ি এবং এমনকি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও মোতায়েন করতে চাইবে। একই সঙ্গে আহত সেনাদের চিকিৎসার জন্য পুনরায় জাহাজে বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে।


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক কর্মকর্তা সেপ বলেন, ‘একবার সেনারা সেখানে অবস্থান নিলে তাদের রসদ সরবরাহের বিষয়টি সামনে আসবে। এটি একটি বড় সমস্যা। এই সেনাদের টিকে থাকার জন্য নিয়মিত খাদ্য, জ্বালানি, গোলাবারুদ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে।’


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহের হিসাব অনুযায়ী, লড়াইয়ে থাকা প্রতি একজন সেনার বিপরীতে নয়জন সহায়ক কর্মীর প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে আবার জলসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশপথের সুরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী অন্তর্ভুক্ত নয়।’ বলে রাখা ভালো, সেনাদের সহায়তার জন্য যুদ্ধজাহাজ ছাড়াও পারস্য উপসাগরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো সামরিক ঘাঁটির একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে।


কিন্তু পারস্য উপসাগর অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানি হামলার মুখে বেশ অরক্ষিতই প্রমাণিত হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কিং ফাহাদ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছে। অন্যদিকে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি অনুযায়ী দেখা গেছে যে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিটি ইতিমধ্যে ইরানি হামলার শিকার হয়েছে।


নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই অঞ্চলে থাকা ১৩টি ঘাঁটির অধিকাংশ ইরানি হামলায় এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো এখন আর বসবাসের উপযোগী নেই।


মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য মেরিন সেনা এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন হলো ‘অগ্রগামী’ বা মূল আক্রমণকারী শক্তি। সাধারণত একটি বড় আক্রমণকারী বাহিনীর অবতরণের জন্য উপকূলে প্রাথমিক অবস্থা তৈরি করতে এদের ব্যবহার করা হয়। তবে এই ধরনের বাহিনীকে যখন তাদের সক্ষমতার অতিরিক্ত বিস্তৃত করা হয়, তখন তার পরিণতি কী হতে পারে—ইতিহাসে এমন অনেক সতর্কতামূলক উদাহরণ রয়েছে।


‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর সিনিয়র ফেলো ডেভিস বলেন, ‘এই বাহিনীগুলো নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে অত্যন্ত দক্ষ, কারণ তারা খুব দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা এক জায়গায় স্থির হয়ে যায়, তখনই তারা শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তখন তাদের সুরক্ষা এবং নিয়মিত রসদ সরবরাহ করার প্রয়োজন পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘এটি হবে অনেকটা শুটিং গ্যালারির (মরণফাঁদ) মতো।’


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘অপারেশন মার্কেট গার্ডেন’-এর ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন আইআইএসএসের সিনিয়র ফেলো স্টুয়ার্ট। ওই অভিযানে ছত্রীসেনারা মূলত নেদারল্যান্ডসে নাৎসি জার্মানির প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।


স্টুয়ার্ট বলেন, ‘“আ ব্রিজ টু ফার” হলো আকাশপথে মোতায়েন করা এমন এক বাহিনীর ধ্রুপদি উদাহরণ, যারা কোথাও অবস্থান নিতে পারলেও তা ধরে রাখতে পারে না। পারস্য উপসাগরেও এমনটি ঘটতে পারে। কারণ, সেখানে তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতার মধ্যে থাকবে।’ তিনি এখানে ১৯৭৭ সালের শন কনারি এবং মাইকেল কেইন অভিনীত সিনেমার কথা উল্লেখ করেছেন, যা ওই সামরিক বিপর্যয়কে সামনে এনেছিল।


আক্রমণাত্মক অবস্থানে ইরান


ইরানও আক্রমণাত্মক অবস্থানে যেতে পারে। চলতি সপ্তাহে একজন ইরানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেছেন, তেহরান বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলীয় অঞ্চল দখলের জন্য প্রস্তুত। বিশ্লেষকেরা এই সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও তাঁরা বলেছেন, অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।


লন্ডনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্টিফেনস বলেন, ‘হুতিরা এখনো এই সংঘাতে প্রবেশ করেনি (অবশ্য শনিবার ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে এই সংঘাতে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা)। আমার ধারণা, ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সংঘাত আরও বাড়লে তাদের কাজে লাগানোর জন্য অপেক্ষা করছে। আর স্থল আক্রমণ হবে তেমনই একটি বড় উসকানি।’


বাবেল মান্দেব প্রণালি বর্তমানে সৌদি আরবের লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব তেল রপ্তানি করা হচ্ছে। হুতিরা যদি লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।


মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনসের সাবেক চিফ অব স্টাফ ক্রুমরিক বলেন, ইরানও পারস্য উপসাগরজুড়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি খারগ দ্বীপ দখল করতে যায়, তবে ইরান নিশ্চিতভাবেই আরও বেশি পানি শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেল উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাবে।


ক্রুমরিক বলেন, ইরানের অধিকাংশ দ্বীপ দখল করে যুক্তরাষ্ট্রের খুব একটা লাভ হবে না, তবে খারগ দ্বীপ দখল করার পেছনে ‘প্রধানত অর্থনৈতিক কারণ’ থাকতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্পেশাল অপারেশনসের সাবেক চিফ অব স্টাফ আরও বলেন, ‘এটি দখল ইরানি শাসনব্যবস্থাকে এক কঠিন সমস্যার মুখে ফেলে দেবে। যেমন আপনি কি আপনার দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের ওপর অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং কামানের গোলা নিক্ষেপ করবেন। যেখানে কিছু মার্কিন সেনা বা ছত্রীসেনা মারা যেতে পারে; কিন্তু একই সঙ্গে আপনার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডও পঙ্গু হয়ে যাবে?’


তেল রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে এই দ্বীপটির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে চায়, তবে তারা স্বেচ্ছায় এমনটি করতে পারে।


মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক কর্মকর্তা সেপ বলেন, একই সময়ে কেশম বা আবু মুসার মতো দ্বীপগুলো দখল করলে হরমুজ প্রণালি আবার উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে খুব একটা কাজে আসবে না। তিনি বলেন, ‘পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো থেকে যে সুবিধা পাওয়া যায়, তার বাইরে এই দ্বীপগুলো তেমন নতুন কোনো বাড়তি সুবিধা দেবে না।’



সর্বশেষ সব খবর

ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১০:৫৭ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের হামলা বা কড়া অবরোধের চিন্তাভাবনা করছেন। তবে এতে একটুও দমে না গিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পারস্য উপসাগরে তারা কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ঘেঁষতে দেবে না।


ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদুল্লাহি কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে আবার মার্কিন সৈন্য পাঠানোর স্বপ্ন ট্রাম্পকে কবরে নিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে তারা নাকি ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করেছে, অথচ নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের সীমানার কাছে পাঠাতে তারা ভয় পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।


এই সংঘাতের আতঙ্কে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ১১৭ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’-তে একের পর এক তেলবাহী জাহাজে হামলা চলছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌদি আরবের লড়াইও নতুন করে বেড়ে চলেছে।


সংঘাত থামাতে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় দেশগুলো বৈঠক করলেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান উপস্থিত ছিল না। তুরস্ক সতর্ক করেছে, ইরানে নতুন হামলা পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তবে ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন হামলা ও অত্যাচার না থামলে তারা কোনো আলোচনায় বসবে না এবং হরমুজ প্রণালিও মুক্ত করবে না।


সূত্র: আল-জাজিরা


সর্বশেষ সব খবর

মেগান মার্কেল ও তার বাবা থমাস মার্কেল। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:৩৬ পিএম

ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূ ও প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেলের বাবা থমাস মার্কেলের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের আপত্তিকর ছবি জমানোর এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম ক্ষোভ ও গভীর মানসিক কষ্ট প্রকাশ করেছেন ডাচ অব সাসেক্স মেগান। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এমন বিভৎস খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিপর্যস্ত। ঘটনার শিকার হওয়া নিরীহ শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।


যুক্তরাজ্যের ‘দ্য সান’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেগানের সৎ ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপাইনে তাদের বাবার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এই আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করেন। তার দাবি, বাবার ড্রয়ার ও কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে শত শত শিশু নির্যাতনের ছবি ছিল। এরপরই তিনি ফিলিপাইন পুলিশ, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থায় গিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন। ফিলিপাইন প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই বর্তমানে যৌথভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে। তবে মেগানের বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়র তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।


বর্তমানে ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন ৮২ বছর বয়সি থমাস জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। মেগানের বোন সামান্থা মার্কলও বাবার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, এই কম্পিউটারগুলো দুই বছর ধরে অন্য মানুষদের হাতে ছিল এবং তার ভাই বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এই ঘটনার পর মেগান মার্কেল তার বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্বের আসল কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, আজ থেকে আট বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালেই পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাবার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তিকর অভিযোগের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল।


মেগান বলেন, এতদিন সংবাদমাধ্যমে নানা কথা ছড়ানো হলেও, মূলত সন্তানদের সুরক্ষার কথা ভেবেই তিনি বাবাকে নিজের পরিবার থেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার অন্তত মানুষ বুঝতে পারবে যে কেন তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তিনি আশা করেন ভুক্তভোগী শিশুরা যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।


সর্বশেষ সব খবর

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:০৩ পিএম

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য সামনে এক বড় ধরণের ‘চমক’ অপেক্ষা করছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার ঘটনার পর সেখানে বড় ধরণের সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এই মন্তব্য করেন।


ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানান, ফিলিস্তিনকে কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে না দেওয়া তাদের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, হঠাৎ এবং আচমকা পদক্ষেপ নেওয়াই তার বেশি পছন্দ। নেতানিয়াহু আরও জানান, ফিলিস্তিন থেকে আসা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় কিছু গোপন কৌশল ব্যবহার করা হবে, যা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের জন্য খুব শীঘ্রই এক বড় ধাক্কা আসতে চলেছে।



মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি তুলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াই তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় আরও কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি বাড়াবেন। অন্তত দুটিরও বেশি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো শর্ত দেবে না, কারণ তারা ভালো করেই জানে যে ইসরাইল তা কখনোই মেনে নেবে না।


সূত্র: আল-জাজিরা

সর্বশেষ সব খবর

সুলতান আল-কাহতানি। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৮:৫৫ পিএম

সৌদি আরবের দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের এক হামলার সময় অন্য যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে সুলতান আল-কাহতানি নামের এক বিমানবন্দর কর্মী বীরের মতো প্রাণ হারিয়েছেন।


গত ২১ অক্টোবর বিমানবন্দরে হামলার পরপরই প্রস্থান গেটের কাছে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুন যাতে রানওয়েতে থাকা অন্য কোনো বিমানে ছড়িয়ে না পড়ে এবং যাত্রীদের কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য সুলতান ও তার সহকর্মীরা দ্রুত আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে তারা আগুন নেভাতে প্রাণপণে চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন নেভাতে গিয়ে তিনি এতটাই অতিরিক্ত ধোঁয়া গ্রহণ করেন যে, তার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা ও তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।


 পরবর্তীতে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে আর বাঁচাতে পারেননি। নিহত সুলতানের ছয়টি সন্তান রয়েছে। তার বাবা ছেলের এই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, দেশ ও মানুষের সেবা করতে গিয়েই তার ছেলে শহীদ হয়েছে। চরম বিপদের মুখে নিজের জীবনের পরোয়া না করে অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে সুলতানের এই অসাধারণ সাহসিকতা এখন পুরো দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।

সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৩:১৭ পিএম

ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সীমান্তের একাধিক স্থানে ভারত ও চীনা সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর।


গত জুলাইয়ের পর থেকে সীমান্তে উত্তেজনা কতটা বিস্তৃত হয়েছে, এ বিষয়ে এটিই ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। এছাড়া প্রদেশটির কয়েক কিলোমিটার ভেতরে চীনা সেনারা অবস্থান করছে বলেও জানা গেছে।


গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপির সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে বাহিনীর বার্ষিক সম্মাননা অনুষ্ঠান ‘হিমবীর সম্মান সমারোহে’ বক্তব্য দেয়ার সময় উভয় দেশের সেনাদের মধ্যে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলেন কাপুর। 


দ্য হিন্দু তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘গত কয়েক দিনে অরুণাচলের একাধিক স্থানে মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তা এখনো চলছে।’


বাহিনীর নবগঠিত ‘শৌর্য কমান্ডো’ ইউনিটের ভূমিকার প্রশংসা করে কাপুর জানান, এ পরিস্থিতিতে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ২০০৪ সালে চীনের সঙ্গে সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব পাওয়ার আগে আইটিবিপি একটি পার্বত্য গেরিলা বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


কাপুর বলেন, ‘বাহিনীকে তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে আসার প্রয়োজন নেই, বরং সেনাবাহিনী থেকে পৃথক একটি বিশেষায়িত উচ্চ পার্বত্য যুদ্ধবাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে। শিগগিরই শৌর্য কমান্ডোদের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনই আমাদের শক্তি।’


মাজা এলাকায় তাঁবু স্থাপন চীনা সেনাদের


সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের টাকসিংয়ের কাছে আসাফিলা এলাকায় জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা চলছে। আপার সুবানসিরি জেলার টাকসিং সার্কেলের মাজা কোম্পানি অপারেটিং বেসের কাছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সদস্যরা উঁচু এলাকায় তাঁবু স্থাপন করেছেন। ভারত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) যেখানে রয়েছে বলে মনে করে, সেখান থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবুগুলো স্থাপন করা হয়েছে।


একটি সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে জানায়, জুলাইয়ে নিয়মিত টহলের সময় মাজা এলাকায় ভারতীয় ও চীনা সেনারা মুখোমুখি হন। সংক্ষিপ্ত উত্তেজনার পর দুই পক্ষ ফিরে গেলেও কয়েক দিন পর আরও বেশি সদস্য নিয়ে ফিরে আসে চীনা সেনারা। 


এরপর ভারতের ধারণা অনুযায়ী, এলএসি থেকে ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করে তারা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর থেকে ওই এলাকায় নিজেদের সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে ভারতও।


আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ


কাপুর জানান, আইটিবিপির অস্ত্রশস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। এখন সেগুলো আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। অস্ত্র ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বড় বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে চীনের মোকাবিলা করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। এ জন্য ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।


কাপুর উল্লেখ করেন, ড্রোনের মাধ্যমে ছোট একটি দেশও বড় দেশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। রাশিয়ার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ এবং ড্রোনের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ইরানের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি।


তিনি বলেন, ‘আমাদের ড্রোন ও ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। ৪০০ কোটি রুপির আধুনিকায়ন তহবিলের ৭০ শতাংশ আমরা ড্রোনের পেছনে ব্যয় করেছি। সীমান্ত পাহারার প্রতিটি ব্যাটালিয়নে একটি করে ড্রোন প্লাটুন রয়েছে। ড্রোন চালক তৈরির প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে এবং নিজস্ব উদ্যোগে ড্রোন তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৪ হাজার কোটি রুপির আরেকটি আধুনিকায়ন প্রকল্প থেকে ড্রোনের জন্য ১ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’


আলোচনার পরও কমেনি উত্তেজনা


কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হলেও সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। জুলাইয়ের পর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে তিনটি আলোচনাও হয়েছে। গত ৬ আগস্ট ভারত-চীন সীমান্তবিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয়ের জন্য গঠিত ওয়ার্কিং মেকানিজমের ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।


২৬ আগস্ট বেইজিংয়ে সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠককেন্দ্রে পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরে প্রথমবারের মতো ‘কর্পস কমান্ডার’ পর্যায়ের বৈঠক করেন ভারত ও চীনের সেনাবাহিনী।


মোদি সরকারের সমালোচনায় কংগ্রেস


আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ। সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের ‘গভীর ও অস্বস্তিকর নীরবতা’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রমেশ লেখেন, ‘তথাকথিত ‘বিশ্বগুরু’ যখন চীনের কাছে একের পর এক ছাড় দিয়ে চলেছেন, তখন আইটিবিপির মহাপরিচালক অরুণাচল প্রদেশে পিএলএ’র সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের ঘটনায় বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন- যা যথার্থই প্রশংসনীয়। অথচ, এই পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক গভীর নীরবতা পালন করা হচ্ছে।’


তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত মাসে ‘তাকসিং’ এলাকায় মুখোমুখি সংঘাতের পর অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা ও দামাইতে কর্পস কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, লাদাখের মতোই এখানেও ভারতীয় বাহিনীর টহল দেয়ার জায়গাগুলো হাতছাড়া হয়ে গেছে। চীন ক্রমাগত অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তন করে চলেছে এবং সেখানে ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বাঁধ নির্মাণ করছে, যা আমাদের পরিবেশগত ও পানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।’

সর্বশেষ সব খবর

নিজেই পা কেটে ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন ইউক্রেনে

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ২:৪৪ পিএম

বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের ধ্বংসস্তূপের নিচে ছোট্ট এক গর্তে আটকে ছিলেন ইউক্রেনীয় সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। বেঁচে থাকার তাগিদে একপর্যায়ে তাকে নিতে হয় ভয়াবহ এক সিদ্ধান্ত-নিজের অবশিষ্ট পা-টিও কেটে ফেলতে হবে।


৪৯ বছর বয়সী এই পদাতিক সেনা গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় বাঁ পা হারান। একই হামলায় তার ডান পা-ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে হামাগুড়ি দিয়ে চলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন তিনি। 


প্রায় তিন মাস পর, পচে যাওয়া ও হাড় বেরিয়ে আসা ডান পা-টি নিজের ছুরি দিয়ে কেটে ফেলতে বাধ্য হন ভ্লাসেনকো। এরপর রক্তপাত বন্ধ করতে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধেন।


সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার পরও শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফেরেন তিনি। গত ৪ অক্টোবর এক নজিরবিহীন অভিযানে বিশাল একটি ড্রোনের সঙ্গে ঝুলিয়ে তাকে উদ্ধার করে ইউক্রেনীয় বাহিনী। আট মাসের মতো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরেন তিনি। এর আগে ইউক্রেনের ড্রোন-অধ্যুষিত যুদ্ধক্ষেত্রে টানা ৪৯১ দিন কাটাতে হয়েছিল তাকে।


ছয় পাখার একটি ভারী ড্রোনের সঙ্গে নিরাপত্তা বেল্টে ঝুলিয়ে তাকে প্রায় ৭০ মিটার উঁচুতে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায় ড্রোনটি। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আকাশপথে ড্রোন ব্যবহার করে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা।


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের ধরন পাল্টে দিয়েছে। বিশেষ করে সম্মুখসারির কিছু এলাকা এখন ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী হিসেবে পরিচিত। সেখানে সারাক্ষণ নজরদারি ও হামলায় নিয়োজিত থাকে ড্রোন। ফলে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।


খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম।’ ব্যান্ডেজে মোড়ানো দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।’


ভ্লাসেনকোর দুর্দশা ও উদ্ধার অভিযানের বিষয়টি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে। উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজেও অভিযানের দৃশ্য দেখা গেছে। 


তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তার বর্ণনার প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার দিনগুলো


ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের হয়ে খারকিভ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত বছরের মে মাসে তাকে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে বাস্কি নামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে অবস্থান করতেন তিনি।


দুজন একটি ছোট মাটির গর্তে গাদাগাদি করে থাকতেন। ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত তাদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে ওপর থেকে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গত বছরের শরৎকালে তাদের বদলি করতে নতুন দুই সেনাকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নিহত হন। তাদের মরদেহ উদ্ধারে পাঠানো আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান।


বিবাহিত ভ্লাসেনকো বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে। তার ভাষায়, ‘বুঝতে পেরেছিলাম, এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’


একটানা প্রায় ১০ মাস একই জায়গায় থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভ্লাসেনকো ও বাস্কিকে অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। তাদের গর্তে পানি ঢুকে পড়ায় তারা একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।


কিন্তু সেখানেও বিপদ এড়ানো যায়নি। সহযোদ্ধাদের ফেলে যাওয়া শুকনা কাপড় ও খাবারের প্যাকেট আনতে বাইরে বের হলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাদের শনাক্ত করে। এরপর আরেকটি ড্রোন তাদের ওপর বোমা ফেলে।


সেই হামলায় বাস্কি নিহত হন। দিনটি ছিল তার ৫০তম জন্মদিন। বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ডান পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি। নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে কোনোমতে একটি ছোট গর্তে আশ্রয় নেন। গর্তটি ছিল স্কুল ভবন গরম রাখার কাজে ব্যবহৃত একটি পুরোনো ধাতব বয়লারের নিচে।


‘আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না’


গর্তের মধ্যে আটকে থাকা অবস্থায় ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের ক্ষত ধীরে ধীরে পচে যেতে থাকে। ডান পায়ের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। নিচের অংশে এতটাই আঘাত লেগেছিল যে হাড় বেরিয়ে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে থাকা ছুরি দিয়ে ডান পা-টিও কেটে ফেলেন তিনি। এরপর ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।


ঘটনাটি স্মরণ করতে গিয়ে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমাকে পা-টা কাটতেই হতো। কারণ, এটা আমার পেছন পেছন ঝুলছিল।’


তিনি আরও বলেন, ‘পা-টা এতটাই ঝুলছিল যে হাড় আরও বেশি করে বাইরে বেরিয়ে আসছিল।’ এরপর আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘ফলে আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না।’


উদ্ধার অভিযানে নতুন ধরনের ভারী ড্রোন


ভ্লাসেনকো যখন বেঁচে ফেরার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখন তার কমান্ডাররা তাকে উদ্ধারের উপায় খুঁজছিলেন। এ কাজে ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেডসহ ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিভিন্ন দল যুক্ত হয়।


উদ্ধার পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ ছদ্মনামের এক কর্মকর্তা জানান, ড্রোনের হুমকির কারণে পিকআপ ট্রাক বা সাঁজোয়া যান দিয়ে আহত সেনাদের উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। 


বিকল্প হিসেবে চালকবিহীন স্থলযান পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর পথে এমন দুটি যানই রুশ ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে তাঁকে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।


এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা গুরজুফ ডিফেন্স নামের একটি স্থানীয় কোম্পানির তৈরি ভারী ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। ছয়টি খাড়া পাখা ও কালো কাঠামোর এই ড্রোনটি দেখতে বিশাল পোকার মতো। এটি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে।


কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকার পর ভ্লাসেনকোর ওজন প্রায় ৭০ কেজি। ফলে তাঁকে ড্রোনে ঝুলিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।


তবে ঝুঁকি ছিল বড়। ইউক্রেনের ভারী ড্রোনগুলো প্রায়ই রাশিয়ার ছোট ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এসব ড্রোনে থাকা ক্যামেরার মাধ্যমে চালকেরা দূর থেকে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।


অবশেষে মৃত্যুপুরী থেকে উদ্ধার


অক্টোবরের শুরুতে ভ্লাসেনকো নিয়মিত সরবরাহের একটি প্যাকেটে অপ্রত্যাশিত কিছু জিনিস পান। সেখানে ছিল একটি নিরাপত্তা বেল্ট এবং উদ্ধার অভিযানের নির্দেশনাসংবলিত ভিডিও রাখা একটি ফোন। 


ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে পারলেও ভ্লাসেনকো জানতেন, বেঁচে ফেরার জন্য এটাই তার সবচেয়ে বড় সুযোগ।


৪ অক্টোবর ছয় পাখার ভারী ড্রোনটি তার কাছে পৌঁছায়। ড্রোনের সঙ্গে ঝুলে থাকা একটি ধাতব সংযোগের হুকে নিজেকে আটকে নেন তিনি। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে তুলে নেয়। অভিযানের সময় তিনটি ছোট ড্রোন ভারী ড্রোনটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়, যাতে রুশ ড্রোনগুলো সহজে হামলা চালাতে না পারে। শত্রুপক্ষের ড্রোনের অবস্থানে হামলা চালাতে ইউক্রেনের চারটি ছোট ড্রোন, গোলন্দাজ বাহিনী এবং বড় ডানাযুক্ত ড্রোনও অংশ নেয়। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানো হয়।


টানটান উত্তেজনার মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিটের উড্ডয়ন শেষে উদ্ধারকারী ড্রোনটি গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী উদ্ধারস্থলের সঠিক অবস্থান প্রকাশ করেনি।


দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরলেও যাত্রাপথে ভয় একেবারে কাটেনি ভ্লাসেনকোর। তবে তার ভয় ছিল ড্রোন থেকে পড়ে যাওয়া নিয়ে নয়, বরং পানিতে পড়ে যাওয়া নিয়ে।


তিনি বলেন, ‘আমি নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম না। ধরুন, বনের মধ্যে কোথাও পড়ে গেলে আমার ভয় লাগত না।’ এরপর নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে আমি পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, আমি সাঁতার জানি না।’


যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা, সহযোদ্ধাকে হারানো, নিজের দুই পা হারিয়েও বেঁচে থাকার লড়াই-সবকিছুর পর শেষ পর্যন্ত ড্রোনের সাহায্যে মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে আসেন ভ্লাসেনকো। 

সর্বশেষ সব খবর