কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন কোনো আকস্মিক উত্তেজনার ফল নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যকে সহিংসভাবে পাল্টে দিতে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশে এই যুদ্ধ। আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল–থানি।
আল–জাজিরাকে দেওয়া এক বিস্তৃত ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক ওই অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
শেখ হামাদ সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা এ যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তথাকথিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ গঠনের আকাঙ্ক্ষার বিষয়েও সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বানও জানান।
শেখ হামাদ বলেন, ‘আমরা এই অঞ্চলের বড় ধরনের এক পুনর্গঠনের সাক্ষী হচ্ছি।’ আগামী কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রূপরেখা কেমন হবে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সেটা নির্ধারণ করে দেবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নেতানিয়াহুর ‘ভ্রান্ত ধারণা’ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভুল পদক্ষেপ
মধ্যপ্রাচ্যে আসন্ন সংঘাতের বিষয়ে শেখ হামাদ গত বছরই সতর্ক করেছিলেন। তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন, যাতে সামরিক হামলা প্রতিরোধ করা যায়।
শেখ হামাদ ইরানের সঙ্গে সংঘাত উসকে দেওয়ার একটি চেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। এ জন্য তিনি ইসরায়েলের ভেতরের একটি কট্টরপন্থী গোষ্ঠীকে দায়ী করেন, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন নেতানিয়াহু।
শেখ হামাদের মতে, এই গোষ্ঠীটি সেই ১৯৯০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি যুদ্ধে টেনে আনার চেষ্টা করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদসহ আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করতে দ্বিধা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের কাছে একটি ‘ভ্রান্ত ধারণা’ সফলভাবে বিক্রি করতে সক্ষম হন বলে মনে করেন শেখ হামাদ।
শেখ হামাদ বলেন, ‘তিনি (নেতানিয়াহু) মার্কিন প্রশাসনকে বোঝাতে সক্ষম হন, এই যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে।’
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীলতার সমালোচনা করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি সব সময়ই বলপ্রয়োগ এড়িয়ে চলার সক্ষমতায় নিহিত ছিল, তা প্রয়োগ করার মধ্যে নয়।’
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সব পক্ষকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। শেখ হামাদ মনে করেন, এ বছরের শুরুতে জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান যুদ্ধ এড়াতে যে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই আলোচনাকে যদি আরও দুই সপ্তাহ বেশি সময় দেওয়া হতো, তবে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো।
শেখ হামাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, এই যুদ্ধের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে নেতানিয়াহু সামনে চলে এসেছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক আঞ্চলিক জোট গঠনে তাঁর ধারণা এবং ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ পরিকল্পনাকে সামনে আনছেন—যা ইসরায়েলের ডানপন্থীদের একটি ধারণা। তাদের মূল লক্ষ্য প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর আরও গভীরে ইসরায়েলের সীমানার সম্প্রসারণ।
হরমুজ প্রণালি: নতুন বৈশ্বিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু
তেহরানের কৌশল মূল্যায়ন করে শেখ হামাদ বলেন, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে প্রতিপক্ষের প্রাথমিক সামরিক হামলার সামনে ইরান সফলভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। পরে নতুন একটি কৌশলগত সুবিধা বুঝতে পেরে দেশটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সময়ক্ষেপণ করে। এই কৌশলগত সুবিধার মূল ভিত্তি ছিল, হরমুজ প্রণালিকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।
এই জলপথকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাকে যুদ্ধের ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন শেখ হামাদ। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান এখন এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংকীর্ণ জলপথকে নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করছে। তাঁর মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির তুলনায় বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এটি আরও তাৎক্ষণিক ও গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
শেখ হামাদ বলেন, ওয়াশিংটন নয়, এই (হরমুজ প্রণালি) সংকটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ভোগ করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হওয়ার পর ইরান পাল্টা জবাব দিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জ্বালানি, শিল্প ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
শেখ হামাদ ইরানের ওইসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করার অজুহাতে ওইসব হামলা চালিয়েছিল। অথচ উপসাগরীয় দেশগুলো স্পষ্টভাবেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল।
এর ফলে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের অনেক রাজনৈতিক পুঁজি হারিয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিঘ্ন নিয়ে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়েছে। তবে শেখ হামাদ জোর দিয়ে বলেন, ভৌগোলিক কারণ দেশগুলোর সহাবস্থানকে অনিবার্য করে তুলেছে। তাই তিনি তেহরানের সঙ্গে একটি খোলামেলা ও যৌথ উপসাগরীয় সংলাপের আহ্বান জানান—যেখানে বিচ্ছিন্ন ও এককভাবে যোগাযোগের পরিবর্তে বাস্তবসম্মত ভবিষ্যৎ কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
‘গালফ ন্যাটো’ গড়ার আহ্বান
শেখ হামাদ জোর দিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ইসরায়েল বা বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নয়; বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
এর মোকাবিলায় শেখ হামাদ একটি সামরিক জোট ‘গালফ ন্যাটো’ গঠনের প্রস্তাব দেন। এটি হবে একটি যৌথ রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা প্রকল্প, যা শুরু হবে কৌশলগতভাবে ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে। সৌদি আরব হবে এর নিরপেক্ষ মেরুদণ্ড।
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি, ইউরোপীয় ইউনিয়নও শুরুতে অল্প কয়েকটি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত হয়েছিল এবং পরে তা সম্প্রসারিত হয়েছে। একই ধরনের একটি মডেলের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক আইনের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে এবং সদস্যরাষ্ট্রের জন্য আইন সমান, মেনে চলা বাধ্যতামূলক ও সম্মানযোগ্য হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি প্রসঙ্গে শেখ হামাদ স্বীকার করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো কয়েক দশক ধরে প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, চীনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এশিয়ার দিকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত ঝোঁক বিবেচনায় উপসাগরীয় অঞ্চল আর দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করতে পারবে না। তাই তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোকে তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিসরের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশ
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে শেখ হামাদ সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসনব্যবস্থার পতনে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিপ্লবের শুরুর দিকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাবেক প্রেসিডেন্টকে তাঁর জনগণের কথা শোনার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নতুন সিরীয় নেতৃত্বের বাস্তববাদী অবস্থানের প্রশংসা করেন, বিশেষ করে ইসরায়েলি উসকানি এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে তাদের কৌশলের কথা উল্লেখ করে। পাশাপাশি তিনি প্রায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ ও আসাদ সরকারের অব্যবস্থাপনার পর দেশকে পুনর্গঠন করতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্মাণের ওপর মনোযোগ দেওয়ায় আহ্বান জানান।
আল–জাজিরার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে শেখ হামাদ একটি গোপন কূটনৈতিক ইতিহাসও প্রকাশ করেন। শেখ হামাদ বলেন, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে বিল ক্লিনটন প্রশাসনের একটি বার্তা পৌঁছে দিতে কাতারি নেতৃত্ব তাঁকে তেহরানে পাঠিয়েছিল। ওই বার্তায় যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরান তার নবজাত পারমাণবিক কর্মসূচি রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করবে অথবা আন্তর্জাতিক কোনো ব্যবস্থার অধীনে তা গ্রহণ করবে।
সেখানে কাতার কেবল একজন বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছিল। তারপরও তেহরান সে সময় দোহাকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সমন্বিত বা সংগতিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে হওয়া এই আন্দোলনে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমা চাইতে বলেছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ফেসবুকে মোদি জানান, যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে দেওয়া ওই বার্তায় মোদি আরও লেখেন, ‘যারা আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায়, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
৬ সপ্তাহে সর্বোচ্চ তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখন ১০০ ডলারের কাছাকাছি চলে গেছে।
আজ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৮৮ ডলার অতিক্রম করেছে।
আজ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৯৩ ডলার বা ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৪১ ডলার বা ১ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়েছে। খবর রয়টার্স ও টাইমস অব ইন্ডিয়া।
গতকাল তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। ফলে ব্রেন্টের দাম ৮ জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। এর মধ্যে লোহিত সাগরে তেলবাহী ট্যাংকারে নতুন হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের দিকে বাজার সব সময় নজর রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র টানা ১২তম রাতে ইরানে হামলা চালানোর পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান যখনই কোনো জাহাজে হামলা করবে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনো সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে। তাঁর এ মন্তব্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়বে, এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে মাইন পাতা আছে- এমন পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বিস্ফোরণে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। তাদের ভাষ্য, ওই ঘটনার পর আরও দুটি ট্যাংকার যাত্রাপথ থেকে ফিরে যায়।
আইআরজিসি আরও বলেছে, এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান চলাকালে হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এই প্রণালি এখন পুরোপুরি বন্ধ। ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো ট্যাংকার প্রণালিতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হতে দেওয়া হবে না বলেও তারা সতর্ক করেছে। এদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে অভিযান আরও জোরদার করায় সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কা বেড়েছে।
হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল বহনকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে। তাদের দাবি, সামরিক অভিযানে তারা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা করেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি পতাকাবাহী ট্যাংকার এনসেলিয়া লোহিত সাগরে হামলার শিকার হয়েছে।
এ ছাড়া হুতিদের দাবি, সৌদি বন্দরের দিকে যেতে নিষেধ করে সতর্কবার্তা দেওয়ার পর প্রায় ১০টি জাহাজ ফিরে গেছে। তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এসব ঘটনায় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথ-হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালি-দিয়ে তেল পরিবহন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আইআরজিসির এক মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) শিপিং কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলে মাইন পাতা আছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অকার্যকর ঘোষণার পর এবার তেলের দাম এখনো ১০০ ডলারের নিচেই আছে। যদিও প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত আছে।
এর আগে তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল, এখন দাম তার চেয়ে ৩০ ডলার কম।
শাহবাজ শরিফ, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আসিম মুনির
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা সুবিধা চেয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। দেশটির অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের মেয়াদে এই সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার (২২ জুলাই) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের এই অনুরোধ এমন সময় এসেছে, যখন দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান সহায়তা কর্মসূচির অধীনে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করায় ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অবস্থানও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে দেশটি।
অনুমোদন মিললে এই তহবিল পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে, রুপির ওপর চাপ কমাতে এবং বহুপাক্ষিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসে সহায়ক হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র বা পাকিস্তান। তবে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব জানান, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতির ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বৈঠকে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে সহজ প্রবেশাধিকার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং দেশের সার্বভৌম ঋণমান উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহযোগিতা চেয়েছেন আওরঙ্গজেব। পাশাপাশি দুই দেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৌশলগত প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বর্তমানে পাকিস্তান ৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এই কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী কর বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করছে দেশটি। ২০২৩ সালে সার্বভৌম ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে পাকিস্তান প্রথমে ৩ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ স্ট্যান্ডবাই ঋণ পায়।
পরে আরও ৭ বিলিয়ন ডলারের ‘এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি’ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অতিরিক্ত ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদিত হয়।
তবুও পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো মূলত আইএমএফের অর্থছাড়, দ্বিপক্ষীয় সহায়তা এবং চীন ও সৌদি আরবের মতো অংশীদারদের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারিতে জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
উল্লেখ্য, মুদ্রা স্থিতিশীলতা সহায়তা সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’-এর মাধ্যমে দেওয়া বিশেষ আর্থিক ব্যবস্থা। এর আওতায় ডলার সহায়তা, মুদ্রা বিনিময় চুক্তি বা গ্যারান্টির মাধ্যমে কোনো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করা হয়।
রয়টার্স জানিয়েছে, এ ধরনের সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থায়ী ডলার সোয়াপ লাইনের বাইরে একটি পৃথক ব্যবস্থা। ২০২৫ সালে আর্জেন্টিনাকে দেওয়া সহায়তার আগে সর্বশেষ বড় ধরনের এমন প্যাকেজ ২০০২ সালে উরুগুয়েকে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া মেক্সিকোর সঙ্গে ১৯৪০-এর দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা রয়েছে।
জাপান প্রথমবারের মতো 'কোকুশোবি' বা 'প্রচণ্ড গরম দিন' ঘোষণা করেছে
জাপানের মধ্যাঞ্চলের তিনটি শহরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। ফলে দেশটি প্রথমবারের মতো 'কোকুশোবি' বা 'প্রচণ্ড গরম দিন' ঘোষণা করেছে। ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরোনো বিপজ্জনক তাপপ্রবাহ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে চলতি বছরের এপ্রিলে নতুন এই সতর্কতা চালু করেছে জাপানের আবহাওয়া সংস্থা।
গতকাল মঙ্গলবার জাপানের মধ্যাঞ্চলের তিন শহর তাজিমি, গুজো এবং তয়োদায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। এই তীব্র তাপমাত্রা আগামী সপ্তাহেও অব্যাহত থাকবে- এমন ধারণা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাপানের আওহাওয়া সংস্থা।
তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে সেই দিনগুলোকে জাপানে ‘কোকুশোবি’ বলা হয়। তীব্র গরমের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে এই পরিভাষাটি চালু করা হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহওয়া ঘন ঘন দেখা দিতে থাকার মধ্যে জাপানে প্রথমবারের মতো ‘অসহনীয় গরমের দিন’ ঘোষণা করা হল। গত বছর জাপানের ইসেসাকি নগরীতে এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস দেখা গিয়েছিল।
জাপানে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের জন্য বিশেষ পরিভাষা আছে। যেমন: যেসব দিনে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায় তাকে বলে মোসোবি বা ‘চরম গরম দিন’।
কিন্তু ‘কোকু’ শব্দটি আরও প্রচণ্ড বা প্রখর তাপ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। কিয়োদো নিউজের খবরে বলা হয়েছে, দেশের ৯১৪ টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রর প্রায় ৩০০ টিতেই মঙ্গলবার মোসোবি রেকর্ড করা হয়েছে।
তাছাড়া, কর্তৃপক্ষ দেশের ৪০ টিরও বেশি প্রশাসনিক এলাকায় হিটস্ট্রোক অ্যালার্ট জারি করেছে। লোকজনকে এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার করা, যথেষ্ট পানি পান, লবণ খাওয়া এবং বাইরে কম যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বয়স্ক মানুষদেরকে শীতল পরিবেশে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জাপানের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে জানায়, টোকিও দমকল বিভাগ জানিয়েছে, মঙ্গলবার সিটি হাসপাতালে ৩ থেকে ১০৩ বছর বয়সের মোট ২৮৭ জনকে হিটস্ট্রোকের কারণে ভর্তি করা হয়েছে। এবছর এটিই হিটস্ট্রোকে হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ রেকর্ড।
দমকল বিভাগও অ্যালার্ট জারি করে লোকজনকে তাপ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তীব্র তাপপ্রবাহের ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং বেশি মাত্রায় ঘটছে। গত বছর জাপান ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম পার করেছে।
আন্দোলনের চাপের মুখে মোদি
পরীক্ষাসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির পর জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ভারতের পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় এমপিদের সমর্থন পাওয়ার পর আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাজধানী নয়াদিল্লির প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে আজ বুধবার (২২ জুলাই) অনলাইনভিত্তিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনে হাজার হাজার সমর্থকের বিশাল জমায়েত দেখা গেছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার আর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। খবর এএফপির।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-ভিত্তিক আন্দোলন সিজেপির নেতৃত্বে ভারতজুড়ে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তার সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যন্তর মন্তরে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীরা রাজধানী ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
উপস্থিত সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের মাঝে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, "ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা যন্তর মন্তর ছাড়ব না। যে দেশে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল, সরকারের সমালোচনা করাকে দেশদ্রোহিতা বলা হতো, আমরা এখন সেই দেশকে জাগিয়ে তুলেছি।"
বেশিরভাগ তরুণ ও শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন মঙ্গলবার দেশটির বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার পর মোদি সরকারের জন্য বড় সংকট তৈরি করে। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গত সোমবার (২০ জুলাই) আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো পুলিশি দমনপীড়নের জন্য সরকারের ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন। গতকাল মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাহুল গান্ধীকে প্রতিবাদস্থল থেকে তুলে নিয়ে দুই ঘণ্টা আটকে রাখে পুলিশ। আজ বুধবার কালো পোশাক পরে পার্লামেন্টে উপস্থিত হয়ে সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেন, তরুণেরা যখন রাজপথে, তখন প্রধানমন্ত্রী নীরব ভূমিকা পালন করছেন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত মে মাসে, যখন দেশটির প্রধান বিচারপতি সুর্য কান্ত আদালতে শুনানির সময় তরুণদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা এবং ‘পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ককরোচ জনতা পার্টির, যা এখন বেকারত্ব ও সরকারি অনিয়মের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। গত সোমবার বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা করার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিপেটা ও টিয়ারগ্যাস প্রয়োগ করে। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট-ইউজির প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অনলাইন মূল্যায়নে অনিয়মের কারণে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হলে এই অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। পরিস্থিতির উত্তাপ বুঝে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় সংস্কার এবং আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে দিল্লি ছাড়িয়ে এখন মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াতেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে চাপের মুখে থাকা সরকার কীভাবে এই অচলাবস্থা নিরসন করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আইন পাস করেছে ফ্রান্স।
বিবিসি জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির পার্লামেন্টে আইনটি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশের জন্য বাধ্যতামূলক বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর পথ তৈরি হয়েছে।
শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই ধরনের নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ক্ষমতায় এক দশক পূর্তির আগে এই আইন কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তবে আইনটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তাদের আশঙ্কা, বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে, ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে এবং কিশোরেরা এই বিধিনিষেধ এড়িয়ে যেতে পারবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে ফ্রান্স সরকার বলছে, বয়স যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনলাইন প্রযুক্তি ইতোমধ্যে রয়েছে এবং তা নিরাপদ ও কার্যকর। কিছু বামপন্থি সদস্যের আপত্তি সত্ত্বেও মঙ্গলবার ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ ও নেনেট—পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই বিলটি পাস হয়।
ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ফ্রান্স শিশুদের সোশাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর এই কড়াকড়ি আরোপ করল।
আইনটি কার্যকর করা হবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী কেউ নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। নতুন সব অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক হবে।
দ্বিতীয় ধাপে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে এই নিয়ম বিদ্যমান সব অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, ফ্রান্সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে হলে সবাইকে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের বয়স ১৫ বছরের বেশি।
রয়টার্স জানিয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত বয়স যাচাই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
পার্লামেন্টে ভোটাভুটির আগে ফ্রান্সের ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী অ্যান লে হেনাফ বলেন, বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি আগে থেকেই বিদ্যমান থাকায় দ্রুত আইন কার্যকর করা সম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ার পর বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এ ধরনের আইন চালু করল ফ্রান্স।
অস্ট্রেলিয়া গত বছরের ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করলেও বাস্তবে অনেক কিশোর-কিশোরী এখনো বিভিন্নভাবে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
চলতি বছরের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশন জানায়, নিষেধাজ্ঞার আগে যেসব ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ছিল, তাদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে সাতজনেরই এখনো কোনো না কোনোভাবে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট স্টাডিজের অধ্যাপক তামা লিভার বিবিসিকে বলেন, প্রযুক্তিগত দিক থেকে অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
তবে তার মতে, এই উদ্যোগ অন্তত দেখিয়েছে যে এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তিনি একে ‘একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ’ হিসেবে দেখছেন।
তার ভাষায়, অন্য দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনায় তরুণদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে সিদ্ধান্ত তাদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেওয়া হয়।
লিভারের মতে, ফ্রান্সের আইন সফল হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি, কারণ সেখানে সব ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এতে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কিশোররা কম নিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চলে যেতে পারে, সংবাদ পড়ার প্রবণতা কমতে পারে এবং রাজনৈতিক বিষয়ে তাদের অংশগ্রহণও হ্রাস পেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ জোরালো হয়েছে।
জুনে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দেশটিতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা হবে।
পাশাপাশি ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের জন্য মধ্যরাতের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ‘কারফিউ’ চালুর পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।
এর আগে মে মাসে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ইউরোপের শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের প্রস্তাব দেন এবং এ বিষয়ে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন নিয়ম চালুর সম্ভাবনার কথা বলেন।