ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সড়কে দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: রয়টার্স
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের জোরালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ ঘিরে দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। এই সমঝোতা স্মারকে সইয়ের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি চালু হবে। এরপর একটি চুক্তির জন্য আলোচনার টেবিলে বসবেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান। এই মধ্যস্থতার বিষয়ে জানাশোনা আছে—এমন একটি সূত্র গতকাল বুধবার প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক-সংক্রান্ত তথ্য রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে। এর আগে সূত্রের বরাতে একই তথ্য দেয় মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। এক পাতার ওই সমঝোতা স্মারকে থাকা ১৪ দফার কিছু অংশও প্রকাশ করেছে তারা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় যে অগ্রগতি হচ্ছে, তার ইঙ্গিত আগেই পাওয়া যাচ্ছিল। অ্যাক্সিওসে খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছিলেন, আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযান স্থগিত করছেন তিনি। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিরুদ্ধে এ অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত যদি সত্যিই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা হয়, তা হবে মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো বিশ্বের জন্য স্বস্তির খবর। যেমন সমঝোতার সম্ভাবনার খবরেই গতকাল জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল কমে ১০০ ডলারের নিচে নামে। যুদ্ধের জেরে এই তেলের দাম দ্বিগুণ বেড়ে ১২০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। এ ছাড়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি প্রাণহানিসহ মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি তো হয়েছেই।
সমঝোতা স্মারক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তাঁরা ওয়াশিংটনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখছেন। দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান–প্রদান চলছে। তবে প্রস্তাবের জবাব এখনো দেওয়া হয়নি। আর সূত্রের বরাতে ইরানের তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবে অগ্রহণযোগ্য কিছু বিষয় রয়েছে।
সব মিলিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদী গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আবাস আসলানি। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, তিনি আশা করছেন গতকালের ঘটনাগুলো ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তির দিকে অগ্রগতির পথ তৈরি করেছে। আশা করা হচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইরান একটি জবাব দেবে।
৩০ দিনের আলোচনায় চূড়ান্ত চুক্তি
ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে পাকিস্তান। গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে তেহরান ও ওয়াশিংটনকে এক টেবিলে বসাতে সফলও হয়েছিল তারা। সেখান থেকে ইতিবাচক কোনো ফল আসেনি। এরপর চেষ্টা করেও দুই পক্ষকে আর একসঙ্গে বসানো যায়নি। যদিও পাকিস্তানের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বার্তা আদান-প্রদানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল।
আড়ালের ওই বার্তা আদান-প্রদানের ফলেই এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল পাকিস্তানি একটি সূত্র রয়টার্সকে বলে, ‘আমরা এটি খুব তাড়াতাড়ি শেষ করব। আমরা কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছি।’ আর অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্বাস করে, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ সম্ভব। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে তারা।
সংবাদমাধ্যমটির খবর অনুযায়ী, ওই সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হলে চূড়ান্ত একটি চুক্তি করতে দুই পক্ষ ৩০ দিনের আলোচনায় বসবে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ বা সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে এ আলোচনা হতে পারে।
খসড়া স্মারকের দফা অনুযায়ী, আলোচনার ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ তুলে নেবে ইরান। আর ইরানের বন্দরে অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। এর ব্যত্যয় হলে আবার হামলা শুরু করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পও গতকাল ট্রুথ সোশ্যালে বলেছেন, হরমুজ চালু করার চুক্তিতে ইরান রাজি না হলে, ‘আরও বড় পরিসরে ও তীব্রতার’ সঙ্গে দেশটিতে হামলা চালানো হবে।
আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দেশটির পরমাণু কর্মসূচিকে মূল কারণ হিসেবে দেখিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইরানের কাছে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এটি পরমাণু অস্ত্র তৈরির মাত্রার খুব কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের দাবি, ইরান এই ইউরেনিয়াম দিয়ে পরমাণু অস্ত্র বানাতে চায়। যদিও তেহরান বরাবরই বলে এসেছে, তারা কখনোই এমন অস্ত্র বানাবে না।
যুদ্ধ শুরুর পরও দুই দেশের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে অগ্রগতির খবর সামনে আসেনি। এখন অ্যাক্সিওস বলছে, খসড়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত ও পরমাণু অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতি দেবে ইরান। বিনিময়ে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। জব্দ থাকা ইরানের দুই হাজার কোটি ডলারও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
ইরান কত সময়ের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখবে, তারও একটি ধারণা দিয়েছে অ্যাক্সিওস। সূত্রের বরাতে তারা বলেছে, এই সময়টা ১২ বা ১৫ বছর হতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক। আর তেহরানের দাবি, সময়সীমাটা পাঁচ বছরে সীমিত রাখা হোক। সময়সীমা শেষে ইরান ৩ দশমিক ৬৭ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৫ সালে একটি পরমাণু চুক্তি হয়েছিল। ২০১৯ সালে সেই চুক্তি থেকে ট্রাম্প সরে যান। তাই আবার দুই দেশের মধ্যে পরমাণু চুক্তি অতটা সহজ হবে না বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬-এর সাবেক প্রধান জন সয়ার্স। বিবিসিকে তিনি বলেন, কিন্তু পরমাণু কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধান এক বা দুই দিনের আলোচনায় হবে না। ২০১৫ সালের চুক্তির সময় প্রায় দুই বছর ধরে আলোচনা চলেছিল।
লেবাননে নৃশংসতা থামছে না
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। প্রায় ছয় সপ্তাহ ওই অভিযানের পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে যায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ২২ এপ্রিল ওই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বৃদ্ধি করেন ট্রাম্প। এরপর গতকাল এপিক ফিউরি অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ পর্ব শেষ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইছে—রুবিওর বক্তব্য তারও একটি ইঙ্গিত। তবে থামছে না ইসরায়েল। ৮ এপ্রিল থেকে তারা ইরানে হামলা বন্ধ রাখলেও লেবাননে নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। লেবানন সরকারের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতিকে পাশ কাটিয়ে গতকালও টায়ার, খিরবেত সেলমসহ দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন।
লেবাননে এ নিয়ে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ফলে ইসরায়েল দেশটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নির্মূলের কথা বললেও দেখা যাচ্ছে বেসামরিক মানুষই বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। গতকালও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ১২টি শহর থেকে বেসামরিক লোকজনকে সরে যেতে বলেছে ইসরায়েল।
আসলে ইসরায়েলের জনগণই চায় না যুদ্ধ শেষ হোক। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট নামের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ ইসরায়েলি চায়, ইরানের বিরুদ্ধে আবার পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধে ফিরে আসুক ইসরায়েল। গতকাল ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও বলেছেন, ‘ইরানে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর আরও একটি তালিকা আমরা প্রস্তুত করেছি। আমরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছি, যেন ইরানে আবার একটি শক্তিশালী ও বিস্তৃত অভিযান শুরু করা যায়।’
হরমুজ চালু কতটা সহজ হবে
যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি দর-কষাকষিতে ইরানের মূল হাতিয়ার হলো হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর পরই বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহের এই পথ বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটি। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এটি। যুক্তরাষ্ট্রেরও তেলের দাম বেড়ে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ইরানের এই পদক্ষেপ ট্রাম্পের জন্য মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানকে পাল্টা চাপে ফেলতে ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরে অবরোধ শুরু করে মার্কিন বাহিনী। এর লক্ষ্য ছিল ইরানে পণ্য ও তেলবাহী জাহাজ যাওয়া-আসা বন্ধ করা। এরপর আবার গত সোমবার হরমুজে প্রজেক্ট ফ্রিডম অভিযানের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তাঁর এ ঘোষণার পর প্রণালিটিতে সামরিক-বেসামরিক জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আবার উত্তেজনা দেখা দেয়।
এ নিয়ে যুদ্ধের পর থেকে হরমুজ ও এর আশপাশের জলসীমায় ২৬টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে গতকাল জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। তবে ট্রাম্প প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত করার পর ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর বলেছে, হরমুজ দিয়ে নিরাপদে জাহাজ পারাপার নিশ্চিত করা হবে। আর সমঝোতা স্মারকে ঐকমত্য হলে, দুই দেশই অবরোধ তুলে নিতে পারে।
হরমুজ পুরোপুরি চালু হলে হামলার শঙ্কা কমবে। এরপরও যুদ্ধের আগে যেমন দিনে প্রায় ১৪০টি জাহাজ প্রণালিটি পাড়ি দিত, সে পর্যায়ে পৌঁছানো অতটাও সহজ হবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে। যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল সাইমন মেয়ল আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান এখন কারা নিয়ন্ত্রণ করছেন, তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রেরও পথ বদলের ইতিহাস রয়েছে। ফলে সমঝোতা স্মারকে দুই পক্ষ যদি সই করে, তারপরও হরমুজ পাড়ি দিতে বেসামরিক জাহাজগুলো খুবই সতর্ক থাকবে। অনেকে প্রণালিতে জাহাজ পাঠাতে চাইবে না। এমন অবস্থায় তাদের মধ্যে ধাপে ধাপে আস্থা ও বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে।
ছবি: সংগৃহীত
হরমুজে ৭ জাহাজে মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি ইরানের। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই জলপথে জাহাজ চলাচলে সহায়তা অব্যাহত রাখলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার রাতভর হামলার শিকার হওয়া সাতটি জাহাজের মধ্যে চারটি থেকে তেল স্থানান্তরের কাজ চলছিল। হামলার পর জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। অন্য তিনটি জাহাজ মাইনে আঘাত হানার পর চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে বলে দাবি করেছে ইরান। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হামলায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর কোন দেশের পতাকা ছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। তাদের বক্তব্য, ওয়াশিংটন যদি প্রণালির অন্যান্য অংশ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংঘাত এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।’ এটিকে তারা গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কিম জং উন। ছবি: সংগৃহীত
সীমান্তের নতুন সেতু অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন চীনের দানদং শহরে অত্যন্ত গোপনে এক ঝটিকা সফর সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘ ১২ বছর আগে নির্মিত ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এই প্রতীকী সফর অনুষ্ঠিত হলো। শনিবারের (২৪ অক্টোবর) এই একদিনের ঝটিকা সফর শেষে তিনি ইতোমধ্যেই স্বদেশে ফিরে গেছেন।
সফরকালে কিম জং উনের সঙ্গী ছিলেন চীনের চতুর্থ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ওয়াং হুনিং। তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের পক্ষ থেকে উত্তর কোরীয় নেতার কাছে আন্তরিক শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। দুই নেতা একসঙ্গে স্থানীয় একটি অটোমোবাইল কারখানা পরিদর্শন করেন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। এসময় কিম জানান, চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব রক্ষা এবং ব্যবহারিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত রয়েছে পিয়ংইয়ং।
বিশেষ এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যা ১৯৫০-১৯৫৩ সালের কোরিয় যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণের বর্ষপূর্তির ঠিক আগের দিন। সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দানদং-এর কোরিয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে যান কিম ও ওয়াং। সেখানে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করে প্রাণ উৎসর্গকারী চীনা সৈন্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কিম জং উন। সফর শেষে নতুন সেতুর গোড়ায় এসে কিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান ওয়াং হুনিং।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন চার লেনের সেতু চালুর মাধ্যমে চীন ও উত্তর কোরিয়ার বাণিজ্যের বড় বাধা দূর হলো। তবে কেবল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থেকে নিজের অবস্থান শক্ত করার কৌশল হিসেবেই কিম জং উনের এই হঠাৎ ও রহস্যময় চীন সফরকে দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র:আল-জাজিরা
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের হামলা বা কড়া অবরোধের চিন্তাভাবনা করছেন। তবে এতে একটুও দমে না গিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পারস্য উপসাগরে তারা কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ঘেঁষতে দেবে না।
ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদুল্লাহি কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে আবার মার্কিন সৈন্য পাঠানোর স্বপ্ন ট্রাম্পকে কবরে নিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে তারা নাকি ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করেছে, অথচ নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের সীমানার কাছে পাঠাতে তারা ভয় পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’ সফর
এই সংঘাতের আতঙ্কে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ১১৭ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’-তে একের পর এক তেলবাহী জাহাজে হামলা চলছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌদি আরবের লড়াইও নতুন করে বেড়ে চলেছে।
সংঘাত থামাতে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় দেশগুলো বৈঠক করলেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান উপস্থিত ছিল না। তুরস্ক সতর্ক করেছে, ইরানে নতুন হামলা পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তবে ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন হামলা ও অত্যাচার না থামলে তারা কোনো আলোচনায় বসবে না এবং হরমুজ প্রণালিও মুক্ত করবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
মেগান মার্কেল ও তার বাবা থমাস মার্কেল। ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূ ও প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেলের বাবা থমাস মার্কেলের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের আপত্তিকর ছবি জমানোর এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম ক্ষোভ ও গভীর মানসিক কষ্ট প্রকাশ করেছেন ডাচ অব সাসেক্স মেগান। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এমন বিভৎস খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিপর্যস্ত। ঘটনার শিকার হওয়া নিরীহ শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ‘দ্য সান’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেগানের সৎ ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপাইনে তাদের বাবার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এই আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করেন। তার দাবি, বাবার ড্রয়ার ও কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে শত শত শিশু নির্যাতনের ছবি ছিল। এরপরই তিনি ফিলিপাইন পুলিশ, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থায় গিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন। ফিলিপাইন প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই বর্তমানে যৌথভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে। তবে মেগানের বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়র তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বর্তমানে ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন ৮২ বছর বয়সি থমাস জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। মেগানের বোন সামান্থা মার্কলও বাবার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, এই কম্পিউটারগুলো দুই বছর ধরে অন্য মানুষদের হাতে ছিল এবং তার ভাই বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এই ঘটনার পর মেগান মার্কেল তার বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্বের আসল কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, আজ থেকে আট বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালেই পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাবার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তিকর অভিযোগের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল।
মেগান বলেন, এতদিন সংবাদমাধ্যমে নানা কথা ছড়ানো হলেও, মূলত সন্তানদের সুরক্ষার কথা ভেবেই তিনি বাবাকে নিজের পরিবার থেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার অন্তত মানুষ বুঝতে পারবে যে কেন তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তিনি আশা করেন ভুক্তভোগী শিশুরা যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য সামনে এক বড় ধরণের ‘চমক’ অপেক্ষা করছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার ঘটনার পর সেখানে বড় ধরণের সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এই মন্তব্য করেন।
ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানান, ফিলিস্তিনকে কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে না দেওয়া তাদের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, হঠাৎ এবং আচমকা পদক্ষেপ নেওয়াই তার বেশি পছন্দ। নেতানিয়াহু আরও জানান, ফিলিস্তিন থেকে আসা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় কিছু গোপন কৌশল ব্যবহার করা হবে, যা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের জন্য খুব শীঘ্রই এক বড় ধাক্কা আসতে চলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি তুলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াই তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় আরও কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি বাড়াবেন। অন্তত দুটিরও বেশি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো শর্ত দেবে না, কারণ তারা ভালো করেই জানে যে ইসরাইল তা কখনোই মেনে নেবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা