• প্রকাশ : বুধবার ০৪ মার্চ, ২০২৬, সময় : ৬:১৯ এএম

ইরানে লক্ষ্য অর্জনে যা যা প্রয়োজন, সবই করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে হামলায় যোগ দিয়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটির প্রেসিডেন্ট কী লক্ষ্য অর্জন করতে চান?


প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনও ‘শাসন পরিবর্তন’কে যুদ্ধের লক্ষ্য বলে বর্ণনা করছেন। কখনও বলছেন, ইরান যেন পারমাণনিবক অস্ত্র বানাতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে চান তিনি।


তিনি কখনো বলেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে, আবার কখনো বলছেন, তা অনেক দীর্ঘ হতে পারে। ইরানে হামলার পর এ কয়েক দিনে গোটা মধ্যপ্রাচ্যই যুদ্ধের মঞ্চে পরিণত হয়েছে, এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে? এই আলোচনা এখন সামনে এসেছে।


প্রায় দুই দশক আগে ইরাকে যে অজুহাতে হামলা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, এবারও প্রায় একই অজুহাত সামনে আনা হয়েছে, যার কোনো গোয়েন্দাভিত্তি নেই। বরং এরকম এক যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।


আরেকটি ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন, আর তা হল- একটি সন্দেহজনক যুক্তির উপর ভিত্তি করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিতে পারে। যা শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু ঘটাতে পারে। এছাড়া এই যুদ্ধ আগামী বছরগুলোতে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে নতুন ‘সন্ত্রাসী হামলার ভিত্তিও’ তৈরি করতে পারে।


আরেকটি বিকল্প পরিস্থিতির কথাও বলেছে সিএনএন। সেটি হল-এই হামলার মাধ্যমে ট্রাম্প যদি এ অঞ্চলে ৫০ বছরের জন্য ইরানের হুমকি কমিয়ে আনতে পারেন এবং সে দেশে স্বাধীনতার সূচনাকে ত্বরান্বিত করতে পারেন।


গত শনিবার সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু করে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক ও সামরিক শীর্ষ পর্যায়েরও কয়েকজন নিহত হয়েছেন হামলায়।


গত সোমবার হোয়াইট হাউজে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানে হামলা চালানোর এটিই ছিল ‘শেষ সেরা সুযোগ’। এ পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, “একটি অসুস্থ ও পাপিষ্ঠ শাসনব্যবস্থা থেকে আসা অসহনীয় হুমকি দূর করতেই আমরা বর্তমানে এই পদক্ষেপ নিচ্ছি।”


গত গ্রীষ্মে পরিচালিত ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, “সেই অভিযানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার পর আমরা তাদের সতর্ক করেছিলাম অন্য কোথাও নতুন করে পারমাণবিক কেন্দ্র না গড়তে। কিন্তু তারা সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে ছোটা অব্যাহত রেখেছে।”


ইরানে এবারের মার্কিন অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে, ‘এপিক ফিউরি বা মহাতাণ্ডব’। ইসরায়েল নাম দিয়েছে ‘রোরিং লায়ন বা গর্জনরত সিংহ’।


‘হামলা বাড়াবে যুক্তরাষ্ট্র’


খামেনির বিদায়ের পর যা আশা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, তা এখনও দেখা যায়নি ইরানে, অর্থাৎ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরানিরা এখনো রাস্তায় নামেনি। চারদিকে যখন শোকের মাতম আর বিশৃঙ্খলা ঘনিয়ে উঠছে, ঠিক তখনই তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দ থেকে নাটকীয়ভাবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছেন প্রবীণ এক ঝানু রাজনীতিবিদ আলি লারিজানি।


গত রোববার তিনি জানিয়েছেন, দেশে একটি ‘অস্থায়ী পরিচালনা পরিষদ’ গঠন করা হবে। এই ঘোষণা দিয়ে তিনি যেন বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি না থাকলেও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো স্থিতিশীল আছে।


খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অত্যন্ত বিশ্বস্ত কৌশলবিদ হিসেবে বিবেচিত লারিজানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ আনেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।


এ অবস্থায় মঙ্গলবার চতুর্থ দিনে প্রবেশে করেছে যুদ্ধ। সিএনএন লিখেছে, ইরানে হামলা বাড়াবে যুক্তরাষ্ট্র। সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সবথেকে বড় হামলা এখনো চালানো হয়নি।


সিএনএন সঞ্চালক জেক ট্যাপারকে তিনি বলেন, “আমরা তাদের ওপর চরম আঘাত হানছি। মনে হয় খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে। অত্যন্ত শক্তিশালী একটি অভিযান। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সামরিক বাহিনী আছে আমাদের। আমরা সেটি ব্যবহার করছি।”


ট্রাম্প বলেন, “আমরা এখনো তাদের ওপর খুব কঠোরভাবে আঘাত শুরুই করিনি। বড় ঢেউটি এখনো আসেনি। সেটি আসছে খুব শিগগিরই।” মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে ইরানের আক্রমণকে ‘বড় বিস্ময়’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প।


তিনি বলেন, “আমরা অবাক হয়েছি। আমরা তাদের (আরব দেশগুলোকে) বলেছিলাম, ‘আমরা এটি সামলে নেব’। কিন্তু এখন তারা লড়াই করতে চাইছে। তারা বেশ আগ্রাসীভাবেই লড়াই করছে। তাদের ভূমিকা খুব সামান্যই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন তারা এতে যুক্ত হওয়ার জন্য জোরাজুরি করছে।”


সিএনএন বলছে, ইরানের নেতৃত্বের যারা এখনো টিকে আছেন, তারাও ‘আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা উসকে দিতে সংকল্পবদ্ধ।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরিণতি কী হতে পারে?


• বিমান অভিযান চালিয়ে রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের লক্ষ্যস্থলগুলোতে ধ্বংসাত্মক হামলা করলে এটি জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও প্রতিবাদের জোয়ার সৃষ্টি করতে পারে, যা দীর্ঘ সময় ধরে চলা ক্ষমতা কেন্দ্রের ওপর চাপ তৈরি করবে এবং একটি নতুন ইরান মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দিতে সক্ষম হতে পারে।


• ইরানের বাকি নেতৃত্ব নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে যে যেন দেশটি আর আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে না পারে।


• খারাপ যা ঘটতে পারে, তা হল- ইরানের পরিস্থিতি লিবিয়ার মতো হতে পারে। বছরের পর বছর ধরে চলা কতৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হতে পারে। গোষ্ঠীগত লড়াই বা গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে, যা ছড়িয়ে পড়তে পারে অঞ্চলজুড়ে, উদ্বাস্তু সংকট তৈরি হতে পারে এবং ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ উগ্রপন্থিদের হাতে চলে যেতে পারে।


গত সোমবার রয়টার্সের এক সাংবাদিক জানিয়েছেন সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে ঢুকছে শত শত ইরানি।


সে দিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসবিদ ও বৈশ্বিক নীতি বিশারদ ম্যাক্স বুট কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস সম্মেলনে বলেছেন, “ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা অযৌক্তিক এবং অবৈধ। তবে এর মানে এই নয় যে এটি ব্যর্থ হবে।” তিনি একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সমালোচনা করেন।


তবে ইরানের সামরিক বাহিনী এখনো সক্রিয় থাকায় দেশটির শাসক গোষ্ঠীকে উৎখাত করাটা ‘কঠিন’ মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ডেভিড পেট্রাউস।


কারণ হিসেবে সংস্থার সাবেক এ পরিচালক বলেন, “সমস্যা হলো, কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বেশ কঠিন, যদি সেখানে লাখ লাখ সদস্যের সশস্ত্র ও সংগঠিত বাহিনী মাঠে উপস্থিত থাকে।” ট্রাম্প বলেছিলেন ইরানে তিনি স্থলবাহিনী মোতায়েন করবেন না।


এ অবস্থায় ইরানে সরকার পরিবর্তন না হলেও এই অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হয় বেশ কিছু লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে বলে মনে করেন ডেভিড পেট্রাউস।


তবে সোমবার নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, “ইরানে মার্কিন স্থলসেনা পাঠানো নিয়ে আমার কোনো জড়তা নেই। অন্য প্রেসিডেন্টরা যেমন বলেন, স্থলভাগে কোনও সেনা মোতায়েন করা হবে না। আমি তা বলি না। আমি বলি, সম্ভবত তাদের (স্থলসেনা) প্রয়োজন নেই অথবা যদি প্রয়োজন হয় (তবে পাঠানো হবে)।”


কী চলছে ইরানে


বিবিসি লিখেছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শনিবার ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে যে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, তাতে ১৯৮৯ সাল থেকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়া আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।


ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী-আইডিএফ দাবি করেছে, খামেনির সঙ্গে নিহত হয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান, সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ এবং ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর প্রধানের মতো শীর্ষস্থানীয় কয়েক ডজন কর্মকর্তা।


মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট।


সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৫৩টি শহর আক্রান্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ৫০৪টি স্থান লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। আর নথিভুক্ত হামলার সংখ্যা ১০৩৯-এ পৌঁছেছে।


খামেনির মৃত্যুতে সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং ৪০ দিনের শোক পালনের জন্য দেশের সব সরকারি এবং সাধারণ কার্যক্রম স্থগিত রাখা হবে। সরকার শোককাঠিন্যকে “জাতির একত্রিত ক্ষতি” হিসেবে উল্লেখ করেছে।


বিবিসি লিখেছে, সোমবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে যে তারা ওমান উপসাগরে ইরানের ১১টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে, ওই এলাকায় ইরানের আর কোনো জাহাজ নেই।


ইরানের পাল্টা হামলা


ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েল, কুয়েত, আরব আমিরাতেও মৃত্যুর খবর এসেছে। নিহতদের মধ্যে মার্কিন সেনাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি দেশে মার্কিন স্থাপনা ইরানের হামলার লক্ষ্যস্থল।


মঙ্গলবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ড্রোন হামলা হয়েছে। এর পর সৌদি আরবের বিভিন্ন মিশনে তাদের সব ধরনের সেবা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।


কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দূতাবাস এক্স পোস্টে বলেছে, “আমরা সব ধরনের নিয়মিত এবং জরুরি কনস্যুলার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করেছি।”


এর আগে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ‘গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির’ কারণ দেখিয়ে কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের বাণিজ্যিক মাধ্যমে দেশত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছিল।


বাহরাইনে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটির প্রধান কমান্ড সদর দপ্তর ইরানের হামলায় ধ্বংস হওয়ার খবর এসেছে।


গত সোমবার অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন হামলায় তাদের দুটি ডেটা সেন্টার অঞ্চলে ‘সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত’ হয়েছে।


গতকাল মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় নতুন করে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান আশপাশের যেসব শহরকে পাল্টা হামলার নিশানা বানিয়েছে, দোহা সে তালিকার একটি।


আল জাজিরা লিখেছে, এর আগে সোমবার কাতারের বিমান বাহিনী তাদের আকাশসীমায় দুটি ইরানি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে এবং কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করে।


সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির মুসাফাহ এলাকায় একটি জ্বালানি ট্যাংক টার্মিনালে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ওমান, জর্ডান ও ইরাকেও মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইরান। ইরানের সমর্থনে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা করছে। ইসরায়েল পাল্টা লেবাননের বৈরুতে হামলা করেছে।


জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আলি বাহরাইনি জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, “যদি কোনো প্রতিবেশী দেশের কোনো ঘাঁটি অন্য কোনো দেশে হামলা বা আক্রমণ চালানোর জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে সেই ঘাঁটি ইরানের জন্য একটি বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে।”


বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব?


উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চলার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।


ইরানের হামলার কারণে কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে, যে কারণে সোমবার ইউরোপে গ্যাসের দাম হঠাৎ করেই ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।


আল জাজিরা জানিয়েছে, দিনের শুরুতেই দাম ২৫ শতাংশ বেশি ছিল। কাতার এনার্জির উৎপাদন বন্ধের খবরের পর সেই ঊর্ধ্বগতি আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।


ইরানের ড্রোন হামলা জেরে সৌদি আরবের রাস তানুরা শোধনাগার আংশিক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী এ তথ্য দিয়েছেন। সেদিন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে আরামকোর একটি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়।


বিবিসি লিখেছে, ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিশ্বের তেল-গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয় এই প্রণালী হয়ে।


সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালীতে তিনটি জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার খবরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সোমবার প্রতি ব্যারেল ৮২ ডলারে উঠেছে।


আসলে কী চায় যুক্তরাষ্ট্র?


ইরানে কেন যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেছে? ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কী এ বিষয়ে স্পষ্ট কারণ রয়েছে?


হামলার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা একেক সময় একেক যুক্তি দিচ্ছেন। ফলে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী, এ বিষয়ে যদি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভ্রান্তি থাকে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।


সিএনএন লিখেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বদলানো। ইরানিদের ‘স্বাধীনতা’ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেছেন তিনি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংসের অঙ্গীকার করেছেন তিনি, যদিও এর আগে ১২ দিনের হামলায় তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করেছিলেন।


প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সোমবার জোর দিয়েই বলেছেন, ইরানি সন্ত্রাসী বা ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্বের সময় ইরান সমর্থিত মিলিয়াশিয়াদের হাতে আমেরিকানদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়া প্রয়োজন।


পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলার যুক্তি হাজির করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগাম হামলা চালিয়েছে কারণ তারা জানতেন ইসরায়েলে হামলার পরিকল্পনা করছে এবং তাতে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হতে পারে।


ট্রাম্প প্রশাসনের এ ধরনের বক্তব্যে বোঝা যায়, কী কারণে যুদ্ধে জড়িয়েছেন সেটি তারা জানে না। ফলে ইতোমধ্যে তাদের এই সামরিক অভিযান সমস্যায় পড়ে থাকতে পারে।


ডেমোক্রেটিক সেনেটর জিন সাহিন সোমবার সিএনএনকে বলেন, “সত্যি কোনো স্পষ্ট কৌশল নেই এবং প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আমাদের শোনা দরকার তিনি কী চান।”


“সফল হলে এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রকৃত মোড় ঘোরানোর সুযোগ হতে পারে। তবে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কীভাবে ঘটবে, তা মোটেও স্পষ্ট নয়,” বলেন তিনি।


ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই অস্পষ্টতা যেন অসঙ্গতিপূর্ণ নয়, বরং তার কৌশলেরই একটি অংশ। যুদ্ধে লক্ষ্য অনিশ্চিত রেখে তিনি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করতে চান, যাতে যখন চাইবেন তখনই বিজয় ঘোষণা করতে পারেন।


তিনি যেন ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন- বৃহৎ পরিসরের স্থলযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা ও অচলাবস্থার ঝুঁকি তৈরি করে।


কিন্তু আকাশ হামলার মাধ্যমে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন ও অনুগত শাসক বসানোর একমাত্র নজির চিন্তা করা কী সম্ভব? যদিও ট্রাম্প বলেছেন, কিছু সমালোচকের কথায় তিনি বিরক্ত নন, যারা বলছেন-ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে গেলে তার নিজের ক্ষমতায় থাকা নিয়ে তারা সন্দিহান।


সিএনএন লিখেছে, ট্রাম্প ইতোমধ্যেই যুদ্ধে লক্ষ্য সীমিত করে এনেছেন বলে মনে করা হয়েছে।


গত সোমবার তিনি বলেছেন, তাদের পরিকল্পনা হল ইরানে নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূর্চি ও ভবিষ্যৎ পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্খা ধ্বংস করা। মনে হচ্ছে তিনি এবং হেগসেথ দুজনই আগে থেকেই ব্যর্থতার অজুহাত তৈরি করে রাখছেন, যাতে ইরানের বর্তমান পুনর্গঠিত হলে সে দেশের জনগণের ঘাড়েই দোষ চাপানো যায়, ‘তোমরাই তো সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছ’।


হেগসেথ বলেছেন, “আমি মনে করি ইরানিদের প্রতি প্রেসিডেন্টের বার্তা স্পষ্ট। ইরানের জনগণ: এটা তোমাদের সময়।”


কিছু বিশ্লেষক ভেনিজুয়েলায় মাদুরাকে উৎখাত প্রসঙ্গ টেনেছেন। মাদুরাকে ধরে আনার পর ভেনিজুয়েলায় অন্তর্বর্তী নেতা ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু বহু দশক ধরে চেষ্টা করেও ইরানে মধ্যপন্থি কোনো নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে।


এমনকি খামেনিকে হত্যা করার পর এখনও এমন কোনো নেতা খুঁজে পায়নি তারা। যে অজুহাতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, সেই অভিযোগকে নাকচ করে দিল আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।


সংস্থাটির প্রধান, মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি এনবিসি নিউজকে বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইরানের কোনো সমন্বিত কর্মসূচির প্রমাণ তারা পাননি। ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য কোনো সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত কর্মসূচির আলামত শনাক্ত হয়নি।


‘শিগগিরই আগ্রহ হারাবে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র’


আল জাজিরা লিখেছে, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও কৌশলগত পর্বে এগিয়ে থাকতে পারেন—যদিও এই ‘জয়’ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে মূলত তাদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থের ঐক্যের কারণে।


তবে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু পরস্পরের প্রতি পুরোপুরি আস্থাশীল নন। উভয় পক্ষের সহযোগিতার ক্ষেত্রটি মূলত তাৎক্ষণিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ—দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ঐক্যের ভিত্তি স্পষ্ট নয়।


মনোযোগ সরে গেলে, দুজনই এক অনিশ্চিত যুদ্ধের মুখোমুখি হবেন। ট্রাম্প দ্রুত অভিযান গুটিয়ে নেওয়ার চাপ অনুভব করতে পারেন, যেখানে নেতানিয়াহু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিতে পারেন।


দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় জনসমর্থন ও রাজনৈতিক ধৈর্য ট্রাম্পের নেই—এমন অভিযোগ উঠছে। তিনি স্থলবাহিনী মোতায়েন করতে পারবেন না বলেই বারবার ইরানিদের ‘সহায়তা করা’ বা তারা নিজেদের দেশ নিয়ন্ত্রণে নিলে ‘পাশে থাকার’ বার্তা দিচ্ছেন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ শুরুর অভিযোগ, সম্ভাব্য মার্কিন হতাহতের ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ছেন।


বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু-ট্রাম্পের এই ‘অস্বস্তিকর’ জোটটি ধীরে ধীরে গড়ে উঠলেও স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত তাদের অর্জন ‘বড় মূল্য দিয়ে সীমিত সাফল্য লাভ’ হয়ে থাকতে পারে।


কতদিন চলবে এ যুদ্ধ?


ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত করবে যে বিশেষজ্ঞ পরিষদ, তার এক সদস্য বলেছেন, নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ‘দীর্ঘায়িত’ হবে না।


আলি মোআলেমি বলেছেন, নতুন নেতা নির্বাচনের সময় ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ বা রাজনৈতিক ও দলীয় গোষ্ঠীর প্রাধান্য যে বিবেচ্য হবে না, সেই বিষয়ে শপথ নিয়েছেন বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা। তিনি বলেন, “বিপ্লবের শহীদ নেতার মতোই একজনকে নির্বাচিত করবে বিশেষজ্ঞ পরিষদ।”


মিডল ইস্ট মনিটর লিখেছে, ইসলামি ঐতিহ্যে, বিশেষ করে শিয়া ইতিহাসচেতনায়, শহীদ হওয়া পরাজয়ের প্রতীক নয়। বরং এটি ‘স্রষ্টার সঙ্গে অঙ্গীকারের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্যের’ প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়।


খামেনির মৃত্যু ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তিনি ‘সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদের’ বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে সংগ্রাম করে গেছেন।


খামেনির মৃত্যু ইরানে গভীর জাতীয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর পরপরই ইরানি কর্তৃপক্ষ প্রতিশোধ নেওয়া এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা করেছে। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ হত্যাকাণ্ড আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। খামেনির এই ‘কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড’ একটি মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।


যে ঘটনাকে তার বিরোধীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হিসেবে ভেবেছিল, সেটিই উল্টো ব্যাপক জনসমাবেশ ও সংগঠনের শক্তিশালী প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে কি না, সে আলোচনাও সামনে এসেছে।


গত শনিবার ট্রাম্পের এক বক্তব্যের বরাতে বিবিসি লিখেছে, ইরানের ওপর হামলা ‘সপ্তাহজুড়ে বা যতদিন প্রয়োজন অব্যাহত থাকবে’। তবে পরে তিনি আরও দীর্ঘ সময়সীমার ইঙ্গিত দেন।


গত রোববার নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ একই গতিতে অভিযান চালিয়ে যেতে পারে।


গত সোমবার হোয়াইট হাউসে তিনি বলেন, “শুরু থেকেই আমরা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের কথা বলেছি, তবে আমাদের সক্ষমতা এর চেয়েও অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চালানোর।”


এই যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে, এমন প্রশ্নে তিনি সিএনএনকে বলেছেন, “প্রায় এক মাস। আমি চাই না এটি খুব দীর্ঘ হোক। আমি সবসময় ভেবেছি এটা চার সপ্তাহ চলবে।”


ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ শেষ হতে ‘কিছুটা সময় লাগলেও তা বছরের পর বছর চলবে না’।


নেতানিয়াহু অবশ্য এই সংঘাতকে আগের দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোর মতো দেখতে নারাজ, জানিয়েছে রয়টার্স।


ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে সোমবার তিনি বলেন, “আমি বলেছিলাম এটি দ্রুত ও চূড়ান্ত হতে পারে। এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে, কিন্তু এটি বছরের পর বছর ধরে চলবে না। এটি কোনো অন্তহীন যুদ্ধ নয়।”




ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৩:১৭ পিএম

ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সীমান্তের একাধিক স্থানে ভারত ও চীনা সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর।


গত জুলাইয়ের পর থেকে সীমান্তে উত্তেজনা কতটা বিস্তৃত হয়েছে, এ বিষয়ে এটিই ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। এছাড়া প্রদেশটির কয়েক কিলোমিটার ভেতরে চীনা সেনারা অবস্থান করছে বলেও জানা গেছে।


গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপির সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে বাহিনীর বার্ষিক সম্মাননা অনুষ্ঠান ‘হিমবীর সম্মান সমারোহে’ বক্তব্য দেয়ার সময় উভয় দেশের সেনাদের মধ্যে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলেন কাপুর। 


দ্য হিন্দু তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘গত কয়েক দিনে অরুণাচলের একাধিক স্থানে মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তা এখনো চলছে।’


বাহিনীর নবগঠিত ‘শৌর্য কমান্ডো’ ইউনিটের ভূমিকার প্রশংসা করে কাপুর জানান, এ পরিস্থিতিতে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ২০০৪ সালে চীনের সঙ্গে সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব পাওয়ার আগে আইটিবিপি একটি পার্বত্য গেরিলা বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


কাপুর বলেন, ‘বাহিনীকে তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে আসার প্রয়োজন নেই, বরং সেনাবাহিনী থেকে পৃথক একটি বিশেষায়িত উচ্চ পার্বত্য যুদ্ধবাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে। শিগগিরই শৌর্য কমান্ডোদের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনই আমাদের শক্তি।’


মাজা এলাকায় তাঁবু স্থাপন চীনা সেনাদের


সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের টাকসিংয়ের কাছে আসাফিলা এলাকায় জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা চলছে। আপার সুবানসিরি জেলার টাকসিং সার্কেলের মাজা কোম্পানি অপারেটিং বেসের কাছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সদস্যরা উঁচু এলাকায় তাঁবু স্থাপন করেছেন। ভারত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) যেখানে রয়েছে বলে মনে করে, সেখান থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবুগুলো স্থাপন করা হয়েছে।


একটি সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে জানায়, জুলাইয়ে নিয়মিত টহলের সময় মাজা এলাকায় ভারতীয় ও চীনা সেনারা মুখোমুখি হন। সংক্ষিপ্ত উত্তেজনার পর দুই পক্ষ ফিরে গেলেও কয়েক দিন পর আরও বেশি সদস্য নিয়ে ফিরে আসে চীনা সেনারা। 


এরপর ভারতের ধারণা অনুযায়ী, এলএসি থেকে ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করে তারা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর থেকে ওই এলাকায় নিজেদের সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে ভারতও।


আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ


কাপুর জানান, আইটিবিপির অস্ত্রশস্ত্র প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। এখন সেগুলো আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। অস্ত্র ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বড় বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে চীনের মোকাবিলা করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। এ জন্য ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।


কাপুর উল্লেখ করেন, ড্রোনের মাধ্যমে ছোট একটি দেশও বড় দেশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। রাশিয়ার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধ এবং ড্রোনের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ইরানের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি।


তিনি বলেন, ‘আমাদের ড্রোন ও ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। ৪০০ কোটি রুপির আধুনিকায়ন তহবিলের ৭০ শতাংশ আমরা ড্রোনের পেছনে ব্যয় করেছি। সীমান্ত পাহারার প্রতিটি ব্যাটালিয়নে একটি করে ড্রোন প্লাটুন রয়েছে। ড্রোন চালক তৈরির প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে এবং নিজস্ব উদ্যোগে ড্রোন তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৪ হাজার কোটি রুপির আরেকটি আধুনিকায়ন প্রকল্প থেকে ড্রোনের জন্য ১ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’


আলোচনার পরও কমেনি উত্তেজনা


কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হলেও সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। জুলাইয়ের পর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে তিনটি আলোচনাও হয়েছে। গত ৬ আগস্ট ভারত-চীন সীমান্তবিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয়ের জন্য গঠিত ওয়ার্কিং মেকানিজমের ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।


২৬ আগস্ট বেইজিংয়ে সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠককেন্দ্রে পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরে প্রথমবারের মতো ‘কর্পস কমান্ডার’ পর্যায়ের বৈঠক করেন ভারত ও চীনের সেনাবাহিনী।


মোদি সরকারের সমালোচনায় কংগ্রেস


আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ। সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের ‘গভীর ও অস্বস্তিকর নীরবতা’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রমেশ লেখেন, ‘তথাকথিত ‘বিশ্বগুরু’ যখন চীনের কাছে একের পর এক ছাড় দিয়ে চলেছেন, তখন আইটিবিপির মহাপরিচালক অরুণাচল প্রদেশে পিএলএ’র সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের ঘটনায় বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন- যা যথার্থই প্রশংসনীয়। অথচ, এই পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক গভীর নীরবতা পালন করা হচ্ছে।’


তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত মাসে ‘তাকসিং’ এলাকায় মুখোমুখি সংঘাতের পর অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা ও দামাইতে কর্পস কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, লাদাখের মতোই এখানেও ভারতীয় বাহিনীর টহল দেয়ার জায়গাগুলো হাতছাড়া হয়ে গেছে। চীন ক্রমাগত অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তন করে চলেছে এবং সেখানে ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বাঁধ নির্মাণ করছে, যা আমাদের পরিবেশগত ও পানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।’


নিজেই পা কেটে ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন ইউক্রেনে

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ২:৪৪ পিএম

বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের ধ্বংসস্তূপের নিচে ছোট্ট এক গর্তে আটকে ছিলেন ইউক্রেনীয় সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। বেঁচে থাকার তাগিদে একপর্যায়ে তাকে নিতে হয় ভয়াবহ এক সিদ্ধান্ত-নিজের অবশিষ্ট পা-টিও কেটে ফেলতে হবে।


৪৯ বছর বয়সী এই পদাতিক সেনা গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় বাঁ পা হারান। একই হামলায় তার ডান পা-ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে হামাগুড়ি দিয়ে চলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন তিনি। 


প্রায় তিন মাস পর, পচে যাওয়া ও হাড় বেরিয়ে আসা ডান পা-টি নিজের ছুরি দিয়ে কেটে ফেলতে বাধ্য হন ভ্লাসেনকো। এরপর রক্তপাত বন্ধ করতে ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধেন।


সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার পরও শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফেরেন তিনি। গত ৪ অক্টোবর এক নজিরবিহীন অভিযানে বিশাল একটি ড্রোনের সঙ্গে ঝুলিয়ে তাকে উদ্ধার করে ইউক্রেনীয় বাহিনী। আট মাসের মতো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরেন তিনি। এর আগে ইউক্রেনের ড্রোন-অধ্যুষিত যুদ্ধক্ষেত্রে টানা ৪৯১ দিন কাটাতে হয়েছিল তাকে।


ছয় পাখার একটি ভারী ড্রোনের সঙ্গে নিরাপত্তা বেল্টে ঝুলিয়ে তাকে প্রায় ৭০ মিটার উঁচুতে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায় ড্রোনটি। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আকাশপথে ড্রোন ব্যবহার করে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা।


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের ধরন পাল্টে দিয়েছে। বিশেষ করে সম্মুখসারির কিছু এলাকা এখন ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী হিসেবে পরিচিত। সেখানে সারাক্ষণ নজরদারি ও হামলায় নিয়োজিত থাকে ড্রোন। ফলে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।


খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম।’ ব্যান্ডেজে মোড়ানো দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।’


ভ্লাসেনকোর দুর্দশা ও উদ্ধার অভিযানের বিষয়টি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে। উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজেও অভিযানের দৃশ্য দেখা গেছে। 


তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তার বর্ণনার প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার দিনগুলো


ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের হয়ে খারকিভ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত বছরের মে মাসে তাকে সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে বাস্কি নামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে অবস্থান করতেন তিনি।


দুজন একটি ছোট মাটির গর্তে গাদাগাদি করে থাকতেন। ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত তাদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে ওপর থেকে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গত বছরের শরৎকালে তাদের বদলি করতে নতুন দুই সেনাকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নিহত হন। তাদের মরদেহ উদ্ধারে পাঠানো আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান।


বিবাহিত ভ্লাসেনকো বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে। তার ভাষায়, ‘বুঝতে পেরেছিলাম, এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’


একটানা প্রায় ১০ মাস একই জায়গায় থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভ্লাসেনকো ও বাস্কিকে অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। তাদের গর্তে পানি ঢুকে পড়ায় তারা একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।


কিন্তু সেখানেও বিপদ এড়ানো যায়নি। সহযোদ্ধাদের ফেলে যাওয়া শুকনা কাপড় ও খাবারের প্যাকেট আনতে বাইরে বের হলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাদের শনাক্ত করে। এরপর আরেকটি ড্রোন তাদের ওপর বোমা ফেলে।


সেই হামলায় বাস্কি নিহত হন। দিনটি ছিল তার ৫০তম জন্মদিন। বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ডান পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি। নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে কোনোমতে একটি ছোট গর্তে আশ্রয় নেন। গর্তটি ছিল স্কুল ভবন গরম রাখার কাজে ব্যবহৃত একটি পুরোনো ধাতব বয়লারের নিচে।


‘আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না’


গর্তের মধ্যে আটকে থাকা অবস্থায় ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের ক্ষত ধীরে ধীরে পচে যেতে থাকে। ডান পায়ের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। নিচের অংশে এতটাই আঘাত লেগেছিল যে হাড় বেরিয়ে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে থাকা ছুরি দিয়ে ডান পা-টিও কেটে ফেলেন তিনি। এরপর ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।


ঘটনাটি স্মরণ করতে গিয়ে ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমাকে পা-টা কাটতেই হতো। কারণ, এটা আমার পেছন পেছন ঝুলছিল।’


তিনি আরও বলেন, ‘পা-টা এতটাই ঝুলছিল যে হাড় আরও বেশি করে বাইরে বেরিয়ে আসছিল।’ এরপর আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘ফলে আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না।’


উদ্ধার অভিযানে নতুন ধরনের ভারী ড্রোন


ভ্লাসেনকো যখন বেঁচে ফেরার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখন তার কমান্ডাররা তাকে উদ্ধারের উপায় খুঁজছিলেন। এ কাজে ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেডসহ ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিভিন্ন দল যুক্ত হয়।


উদ্ধার পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ ছদ্মনামের এক কর্মকর্তা জানান, ড্রোনের হুমকির কারণে পিকআপ ট্রাক বা সাঁজোয়া যান দিয়ে আহত সেনাদের উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। 


বিকল্প হিসেবে চালকবিহীন স্থলযান পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর পথে এমন দুটি যানই রুশ ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে তাঁকে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।


এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা গুরজুফ ডিফেন্স নামের একটি স্থানীয় কোম্পানির তৈরি ভারী ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। ছয়টি খাড়া পাখা ও কালো কাঠামোর এই ড্রোনটি দেখতে বিশাল পোকার মতো। এটি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে।


কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকার পর ভ্লাসেনকোর ওজন প্রায় ৭০ কেজি। ফলে তাঁকে ড্রোনে ঝুলিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।


তবে ঝুঁকি ছিল বড়। ইউক্রেনের ভারী ড্রোনগুলো প্রায়ই রাশিয়ার ছোট ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এসব ড্রোনে থাকা ক্যামেরার মাধ্যমে চালকেরা দূর থেকে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।


অবশেষে মৃত্যুপুরী থেকে উদ্ধার


অক্টোবরের শুরুতে ভ্লাসেনকো নিয়মিত সরবরাহের একটি প্যাকেটে অপ্রত্যাশিত কিছু জিনিস পান। সেখানে ছিল একটি নিরাপত্তা বেল্ট এবং উদ্ধার অভিযানের নির্দেশনাসংবলিত ভিডিও রাখা একটি ফোন। 


ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতে পারলেও ভ্লাসেনকো জানতেন, বেঁচে ফেরার জন্য এটাই তার সবচেয়ে বড় সুযোগ।


৪ অক্টোবর ছয় পাখার ভারী ড্রোনটি তার কাছে পৌঁছায়। ড্রোনের সঙ্গে ঝুলে থাকা একটি ধাতব সংযোগের হুকে নিজেকে আটকে নেন তিনি। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে তুলে নেয়। অভিযানের সময় তিনটি ছোট ড্রোন ভারী ড্রোনটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়, যাতে রুশ ড্রোনগুলো সহজে হামলা চালাতে না পারে। শত্রুপক্ষের ড্রোনের অবস্থানে হামলা চালাতে ইউক্রেনের চারটি ছোট ড্রোন, গোলন্দাজ বাহিনী এবং বড় ডানাযুক্ত ড্রোনও অংশ নেয়। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অভিযান চালানো হয়।


টানটান উত্তেজনার মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিটের উড্ডয়ন শেষে উদ্ধারকারী ড্রোনটি গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী উদ্ধারস্থলের সঠিক অবস্থান প্রকাশ করেনি।


দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরলেও যাত্রাপথে ভয় একেবারে কাটেনি ভ্লাসেনকোর। তবে তার ভয় ছিল ড্রোন থেকে পড়ে যাওয়া নিয়ে নয়, বরং পানিতে পড়ে যাওয়া নিয়ে।


তিনি বলেন, ‘আমি নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম না। ধরুন, বনের মধ্যে কোথাও পড়ে গেলে আমার ভয় লাগত না।’ এরপর নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে আমি পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, আমি সাঁতার জানি না।’


যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা, সহযোদ্ধাকে হারানো, নিজের দুই পা হারিয়েও বেঁচে থাকার লড়াই-সবকিছুর পর শেষ পর্যন্ত ড্রোনের সাহায্যে মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে আসেন ভ্লাসেনকো। 


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ২:১২ পিএম

ভালোবাসার সাধারণ এক আলিঙ্গন যে শেষ পর্যন্ত হাড় ভাঙার কারণ হতে পারে, তা হয়তো কল্পনাও করেননি চীনের এক দম্পতি। স্বামীর মৃদু জড়িয়ে ধরাতেই ভেঙে গেছে স্ত্রীর পাঁচটি পাঁজর, ফাটল ধরেছে আরও একটিতে। 


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তোলা এ ঘটনার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় জানা গেছে, ওই নারী তীব্র ‘অস্টিওপোরোসিস’ বা হাড়ক্ষয় রোগে ভুগছিলেন।


চীনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘জিংসি লাইভ’-এর বরাতে জানা যায়, শীত লাগছে জানানোয় স্ত্রীকে উষ্ণতা দিতে জড়িয়ে ধরেছিলেন ওয়াং পদবির ওই ব্যক্তি। 


তবে আলিঙ্গনের মুহূর্তেই হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান তিনি। ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে মাটিতে বসে পড়েন।


স্বামীর দাবি, তিনি কোনো অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেননি; স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বিষয়টি যে এতটাই গুরুতর রূপ নিতে পারে, তা আঁচ করতে পারেননি ওই দম্পতি। ফলে সারা রাত অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে পরদিন সকালে তারা হাসপাতালে যান। সেখানে বুকের সিটি স্ক্যান করার পর চিকিৎসকেরা দেখতে পান, তার পাঁচটি পাঁজর ভেঙে গেছে এবং ষষ্ঠ পাঁজরে চিড় (হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার) ধরেছে।


চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াং জানান, তার স্ত্রীর হাড় অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার মূল কারণ অস্টিওপোরোসিস। 


তিনি জানান, ৪৫ থেকে ৫০ কেজি ওজনের তার স্ত্রী মাত্রাতিরিক্ত ডায়েট করতেন এবং প্রায়ই রাতের খাবার বাদ দিতেন। এ ছাড়া তিনি সূর্যালোকের সংস্পর্শেও আসতেন না বললেই চলে। বাসা থেকে মাত্র দুই-তিন মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত পারিবারিক দোকানেই তার বেশির ভাগ সময় কাটত।


উহান এশিয়া হার্ট জেনারেল হাসপাতালের অস্থিশল্য বিশেষজ্ঞ (অর্থোপেডিক ফিজিশিয়ান) ইয়ান ইয়ানসিয়াং বলেন, সাধারণত তরুণ বয়সে শুধু আলিঙ্গনের চাপে পাঁজর ভেঙে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ব্যক্তির অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে হাড়ের এই অস্বাভাবিক দুর্বলতার গভীর যোগসূত্র রয়েছে।


তিনি আরও জানান, পাঁজরের এই ধরনের ভাঙনে ফুসফুস বা ফুসফুসের পর্দায় কোনো জটিলতা তৈরি না হলে সচরাচর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে না। সে কারণে চিকিৎসকেরা ওই নারীকে কোনো অস্ত্রোপচার না দিয়ে ওষুধ, বিশেষ প্যাচ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের মাধ্যমে নিরাময়ের পরামর্শ দিয়েছেন।


বিক্ষোভ ফের দানা বাঁধছে ফ্রান্সে

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১:১৭ পিএম

গত সপ্তাহে কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম দাঙ্গার পর শনিবার আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভের আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স। 


পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এরপরও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


শিক্ষার্থী, শ্রমিক ইউনিয়ন ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দ্বিতীয় দফায় এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।


গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গার ব্যাপকতা আগে থেকে আঁচ করতে না পারায় সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা উঠেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, ‘আমরা কোনো কিছুই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেব না।’


তিনি আরও বলেন, ভাঙচুরকারী, লুটপাটকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিকল্পিত বিক্ষোভের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র বামপন্থীদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সহিংসতার আহ্বানও দেখা গেছে বলে জানান তিনি।


গত কয়েক দিনে দ্রুত বিচার কার্যক্রমের মাধ্যমে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় কয়েক শ মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ শনিবারের বিক্ষোভের আগে শুক্রবার শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। 


শিক্ষার্থী নেতারা জানান, তাদের সঙ্গে আলোচনায় মাখোঁ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।


চলতি সপ্তাহের শুরুতে মাখোঁ ঘোষণা দেন, শনিবার কেবল স্বীকৃত শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভই অনুমোদন পাবে। লিওঁ, নিস ও মনপেলিয়েরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে সব ধরনের সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ বিক্ষোভের আয়োজকদের নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। দেশজুড়ে ছোট-বড় শত শত বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে।


গত সপ্তাহের সহিংসতার পর ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছিল। রাজধানী প্যারিসের কিছু এলাকাও এর আওতায় ছিল। এখনো শহরভেদে বিক্ষোভের অনুমতি ও নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে।


কিছু শহরের মেয়র ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও অন্যরা কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছেন। যেমন মার্সেইয়ে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার আগের নির্দেশ দ্রুত প্রত্যাহার করে শ্রমিক ইউনিয়নের আয়োজিত মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।


প্যারিসে শিক্ষার্থী ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমর্থনে আয়োজিত একটি মিছিলকে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে নির্ধারিত পথে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নতুন করে সহিংসতা ও লুটপাটের আশঙ্কায় প্রস্তুতি চলছে।


আজ শনিবার ল্যুভর, ওরসে ও পিকাসো জাদুঘর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফুটবল ক্লাব প্যারিস সাঁ জারমাঁর (পিএসজি) নির্ধারিত ঘরের মাঠের ম্যাচও সোমবারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য লুটপাট ঠেকাতে বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের দোকানের জানালায় কাঠের পাটাতন লাগিয়েছে।


শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। আজ শনিবার দেশজুড়ে পুনরুজ্জীবিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকদেরও ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যেতে পারে।


মাখোঁর প্রথম মেয়াদে এই আন্দোলন ফ্রান্সজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও জনজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল। আন্দোলনটিতে বাম ও ডান-উভয় ধারার সমর্থকেরাই যুক্ত হয়েছিলেন।


গোষ্ঠীটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটে শনিবারের জন্য ৫০০টির বেশি বিক্ষোভ এবং আরও প্রায় ২০০টি কর্মসূচির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে মাখোঁর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।


অনলাইনে দেওয়া আহ্বানে আন্দোলনকারীরা ১৭ অক্টোবরের সহিংসতা নিয়ে চলা নিন্দার স্রোতে নিজেদের যুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছে তারা।


গত সপ্তাহের অস্থিরতার রেশ এখনো কাটেনি ফ্রান্সে। সে সময় বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গাকারীদের তুলনায় পুলিশ সদস্যের সংখ্যা অনেক জায়গায় কম ছিল। বিভিন্ন দোকানে লুটপাট এবং ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি ঐতিহাসিক টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ছিল এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।


শুক্রবার বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানান, ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৩২ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ২৬০ জনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।


লুটপাট কিংবা পুলিশকে আক্রমণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি চেয়ে আবেদন করতে কৌঁসুলিদের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারমন্ত্রী। এসব শাস্তির মধ্যে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ভোটাধিকার প্রত্যাহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বাধা দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও থাকতে পারে।


বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বেড়েছে

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১২:১৯ পিএম

তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ লুইজিয়ানার একটি শোধনাগারে সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের অনুমোদন দিয়েছে। জার্মানিও কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অপরিশোধিত তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।


এ ছাড়া লিবিয়ার দুটি তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল নেওয়ার পাইপলাইনের একটি ভালভ বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমেছে। 


অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডিজেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়া থেকে ডিজেলবাহী একটি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের দিকে যাচ্ছে।


মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলারের বেশি বেড়ে ১১৬ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গতকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) লেনদেন শেষে অপরিশোধিত তেলের দামের এই বৃদ্ধি দেখা যায়। সৌদি আরবে হুতিদের হামলা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর এ মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।


বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলার ৫৫ সেন্ট বা ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ১১৬ ডলার ৭২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। ২৯ এপ্রিলের পর এটি সর্বোচ্চ দাম। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৩ ডলার ৮০ সেন্ট বা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১০৩ ডলার ২৭ সেন্ট। সপ্তাহজুড়ে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ, আর ডব্লিউটিআইয়ের ২ দশমিক ৩ শতাংশ।


এলপিএল ফাইন্যান্সিয়ালের প্রধান কৌশলবিদ অ্যাডাম টার্নকুইস্ট বলেন, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থানে ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার পর সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। এতে তেলের বাজারে দাম বাড়ছে।


এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুয়াইন উপকূলে একটি জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর জানিয়েছে দেশটির পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে কী কারণে তেল ছড়িয়েছে এবং কোন জাহাজ থেকে তা ঘটেছে, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। 


গত ৯ অক্টোবর আমিরাতের আল জাজিরা এলাকার পশ্চিমে একটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানার পর ‘জেম নম্বর ২’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলেও জানিয়েছে জাহাজ চলাচল-সংশ্লিষ্ট সূত্র।


তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ লুইজিয়ানার একটি শোধনাগারে সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের অনুমোদন দিয়েছে। জার্মানিও কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অপরিশোধিত তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।


এ ছাড়া লিবিয়ার দুটি তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল নেওয়ার পাইপলাইনের একটি ভালভ বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডিজেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়া থেকে ডিজেলবাহী একটি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের দিকে যাচ্ছে।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১১:০৬ এএম

করোনাভাইরাসের আতঙ্কের দাগ মানুষের মন থেকে পুরোপুরি কেটে যাওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে নতুন এক ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবাদি পশুর শরীরে সংক্রমণ ঘটানো ‘শামোন্ডা ভাইরাস’ এবার মানুষের শরীরেও শনাক্ত হয়েছে।


ফ্রান্সে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়ার ঘটনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য মহলে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। 


প্রশ্ন উঠেছে- গবাদি পশুর এই ভাইরাসটি কি মানুষের জন্য ভয়াবহ কোনো মহামারির রূপ নিতে পারে? 


কী এই শামোন্ডা ভাইরাস?


শামোন্ডা ভাইরাস মূলত ‘অর্থোবুনিয়াভাইরাস’ গোত্রের একটি কীটপতঙ্গবাহিত ভাইরাস, যা সিম্বু সেরোগ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৬০-এর দশকে নাইজেরিয়ার একটি খামারে গবাদি পশুর শরীরে প্রথমবারের মতো এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছিল। 


দীর্ঘ সময় ধরে এটি প্রধানত আফ্রিকা, এশিয়া এবং সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গরু, ছাগল, ভেড়া ও ঘোড়ার মতো পশুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।


সাধারণত মশা বা রক্তচোষা ক্ষুদ্র পতঙ্গের কামড়ের মাধ্যমে পশুর শরীরে এই ভাইরাস ছড়ায়। পশুর শরীরে এর সংক্রমণে উচ্চ জ্বর, তীব্র ডায়রিয়া, ক্ষুধামন্দা, দুধ উৎপাদন হঠাৎ কমে যাওয়া এবং গর্ভপাত বা জন্মগত ত্রুটির মতো প্রজননজনিত মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়।


মানুষের শরীরে সংক্রমণ ও ফ্রান্সের ঘটনা


ইতিহাসে এই প্রথম ফ্রান্সে কোনো মানুষের শরীরে শামোন্ডা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ষাটোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি আগে থেকেই গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতায় বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হীনতায় ভুগছিলেন।


মৃত্যুর আগে তার মস্তিষ্কে যে জটিলতা দেখা দিয়েছিল, তার পেছনে এই ভাইরাসের সংযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওই ব্যক্তির শরীরে কিভাবে ভাইরাসটি প্রবেশ করল, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না গবেষকরা। প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, আক্রান্ত কোনো পোকা বা মশার কামড়েই তার শরীরে এই সংক্রমণ ঘটে থাকতে পারে।


করোনার চেয়েও কি ভয়ংকর?


শামোন্ডা ভাইরাস মানুষের শরীরে শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়লেও, এটিকে করোনাভাইরাসের মতো অতিমারি বা মহামারির সঙ্গে তুলনা করার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।


বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাস যেভাবে খুব দ্রুত এক মানুষের দেহ থেকে অন্য মানুষের দেহে বায়ুবাহিত উপায়ে বা সংস্পর্শে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম ছিল, শামোন্ডা ভাইরাসের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।


এটি মূলত পশুবাহিত রোগ এবং পতঙ্গের কামড়ে ছড়ায়। এখন পর্যন্ত মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস সংক্রমণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আতঙ্কিত না হয়ে এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ও বিরল ঘটনা হিসেবেই দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।


বিশ্বজুড়ে কেন সতর্কতা?


ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সম্প্রতি গবাদি পশুর মধ্যে শামোন্ডা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের শরীরে এর প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ও ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ইসিডিসি) পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।


বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ঠিক কীভাবে প্রভাবিত করে এবং এর প্রকৃত ঝুঁকি কতখানি তা নির্ধারণে আরও ব্যাপক গবেষণা ও ডেটা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবে এখনই একে নিয়ে প্যানিক বা অতিরিক্ত ভয়ের কোনো কারণ নেই বলে মনে করছেন তারা।