রাজশাহীতে কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
কারাগার কেবল অপরাধীদের বন্দি করে রাখার স্থান নয় বরং একজন বিপথগামীর জন্য এটি হবে প্রকৃত সংশোধনাগার— এমন মন্তব্য করেছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন। তিনি বলেন, কারা বিভাগ একটি সুপ্রাচীন ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। এ বিভাগের মূল লক্ষ্য হলো বন্দিদের সংশোধনের মাধ্যমে আলোর পথে ফিরিয়ে আনা।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘৬৩তম ব্যাচ কারারক্ষী বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স’ -এর সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে জেলের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের ধারাবাহিকতায় এ প্রতিষ্ঠানকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও জনসেবামুখী হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
‘কারারক্ষীর জীবন শুধু একটি চাকরি নয়, এটি একটি সুবিন্যস্ত জীবনব্যবস্থা’— এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে মোতাহের হোসেন নবীন কারারক্ষীদের বলেন, তোমরা এ পর্যন্ত যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছ, তা ছিল কারারক্ষী জীবনে পদার্পণ করার জন্য মৌলিক প্রশিক্ষণমাত্র। এ প্রশিক্ষণের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তোমরা যেভাবে নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে আত্মনিয়োগ করেছ, তা সত্যিই প্রশংসনীয় ও উৎসাহব্যঞ্জক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সমাপনী কুচকাওয়াজে মোট ৬৮৭ জন নবীন কারারক্ষী অংশ নেন। সার্বিক বিষয়ে শ্রেষ্ঠ নবীন কারারক্ষী নির্বাচিত হন মো. তানভীন আহমেদ। এ ছাড়াও ড্রিলে মো. রাকিব মিয়া, পিটিতে মো. বাপ্পি হোসেন, ফায়ারিংয়ে দ্বিপংকর দাস, অস্ত্রবিহীন যুদ্ধে মো. রনি হোসেন এবং অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে মো. রিয়ন ইসলাম রোকন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার ড. মো. জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. তানভীর হোসেন এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাজশাহী সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল সৈয়দ কামাল হোসেন।
এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, নবীন কারারক্ষীদের অভিভাবক, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা।
পরীক্ষা ছাড়াই গোপনে দুটি পদে কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার গোপালঝাড় বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। চাকরির কথা বলে অর্থ লেনদেনের কথা স্বীকার করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি। তবে নিয়োগের বিষয়টিকে বানোয়াট দাবি করে প্রধান শিক্ষকের পাল্টা অভিযোগ, স্কুলের ওয়েবসাইট হ্যাক করে জালিয়াতির মাধ্যমে এসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। যদিও শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, খোদ প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব আইডি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করেই নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতার বিলের ফাইল সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী গোপালঝাড় বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫০০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ১৬ জন শিক্ষক ও ৫ জন কর্মচারী রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে বিদ্যালয়টির খালি থাকা অফিস সহায়ক ও নৈশ প্রহরী পদে নিয়োগের জন্য পরপর তিনবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। তবে অভিযোগ রয়েছে, কোনোবারই নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন করা হয়নি। সম্প্রতি পরীক্ষা ছাড়াই চুপিসারে অফিস সহায়ক পদে জাহিদুল ইসলাম এবং নৈশ প্রহরী পদে পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতির ভাতিজা সবুজ ইসলামকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন নতুন নিয়োগ পাওয়া অফিস সহায়ক জাহিদুল ইসলাম। তবে নৈশ প্রহরী পদে নিয়োগ পাওয়া সবুজ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো সারা দেননি। এদিকে, গোপনে সম্পন্ন করা এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির অন্য সদস্যদের।
ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বজলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে কমিটির সদস্য হিসেবে আছি। আগের নিয়োগগুলোর কথা জানতাম। কিন্তু এই দুটি পদে নিয়োগের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না, আমার কোনো স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি। আমাকে বলা হয়েছিল আপাতত কোনো নিয়োগ হবে না, পরবর্তী নতুন কমিটি আসলে তাদের মাধ্যমে হবে। পরে শুনলাম ব্যাকডেটে নাকি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সদস্যের স্বাক্ষর ছাড়া কীভাবে এই ব্যাকডেটে নিয়োগ দেওয়া হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
ভুক্তিভোগী ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রের প্রথম শিকার হন গোপালঝাড় গ্রামের বাসিন্দা মো. আলমগীর। অফিস সহায়ক পদে চাকরির আশায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির হাতে কয়েক দফায় ৮ লাখ টাকা তুলে দেন তিনি। পরবর্তীতে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই গোপনে অন্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে।
ভুক্তভোগী মো. আলমগীর বলেন, আমি অফিস সহায়ক পদে চাকরির জন্য জমি জমা বিক্রি করে এবং ধার-দেনা করে প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলাম। আমাকে নিশ্চিত করা হয়েছিল চাকরি আমারই হবে। এমনকি আবেদনের সুবিধার জন্য প্রধান শিক্ষক জালিয়াতি করে আমার ভোটার আইডি কার্ডে বয়সও কমিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারি, আমার চেয়েও বেশি টাকার বিনিময়ে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই গোপনে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চাকরির নামে আমার সাথে চরম প্রতারণা করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এ বিষয়ে শিক্ষা অফিস সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার মেলেনি।
চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান। তার দাবি, আট লাখ নয়, চাকরির কথা বলে আলমগীরের কাছ থেকে প্রধান শিক্ষক ও আমি আড়াই লাখ টাকা নিয়েছিলাম। তবে পরবর্তীতে যাদেরকে নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আলমগীরকে পাওনা টাকা লাভসহ ফেরত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এই টাকার ভাগ শিক্ষা অফিসসহ নিয়োগ সংশ্লিষ্টদেরও দিতে হয়েছে।
তবে নিয়োগ ও লেনদেনের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হামিদুর রহমান। তাঁর দাবি, নিয়োগ দেওয়া হয়নি। স্কুলের ওয়েবসাইট হ্যাক করে একটি চক্র জালিয়াতির মাধ্যমে এসব তথ্য ছড়াচ্ছে।
প্রধান শিক্ষকের এই দাবিকে পুরোপুরি অসত্য বলে নাকচ করে দিয়েছেন শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা। জলঢাকা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা(অতিরিক্ত দায়িত্ব) আশরাফ-উজ-জামান সরকার জানান, প্রধান শিক্ষকের দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট। তিনি নিজেই অফিসে এসে ওই দুই পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের বিল পাঠানোর সুপারিশ করেছিলেন।
এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমানও বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব অনলাইন আইডি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করেই বেতন-ভাতার বিলের আবেদন পাঠানো হয়েছে। তাই এই নিয়োগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগের নামে এমন জালিয়াতি ও অর্থ লেনদেনের ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
এ এবি এম আব্দুল কাদের
নওগাঁয় শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ দিয়ে ২৯ বছর ধরে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে এ এবি এম আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে। এলাকাবাসীর পক্ষে এক ব্যক্তি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুল কাদের নওগাঁ সদর উপজেলার চকপ্রসাদ ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। জাল সনদে চাকরি করার পাশাপাশি তিনি এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন করে মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, এ বি এম আব্দুল কাদের ১৯৯৭ সালে চকপ্রসাদ ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ইবতেদায়ি শাখায় সহকারী মৌলভী পদে যোগদান করেন। কিছু দিন পর ওই মাদ্রাসায় আলিম শাখা খুলে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই বছর ৩ জুলাই মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটি রেজল্যুশন করে তাঁকে বিধি বহির্ভূতভাবে আলিম শাখায় আরবি প্রভাষক হিসেবে পদায়ন করে।
সদর উপজেলার মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতির সভাপতি কাজী রফিকুল ইসলাম ২০২৪ সালে আব্দুল কাদেরের দাখিল ও আলিম মাদ্রাসার সনদ যাচাইয়ের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাঠান। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ওই বছর ২৮ অক্টোবর চিঠি দিয়ে জানায় আব্দুল কাদেরের দাখিল ও আলিম সনদ দুটি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে ইস্যু করা নয়। তাঁর সনদে উল্লিখিত রোল ও নিবন্ধন নম্বরের সনদ ইমান ফকর উদ্দীন নামের এক ব্যক্তির নামে ইস্যু করা।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, শিক্ষকতার পাশাপাশি এক দশকের বেশি সময় ধরে আব্দুল কাদের নওগাঁ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে এ বি এম আব্দুল কাদেরের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘জাল সনদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। মাদ্রাসা বোর্ডের নামে ভুয়া চিঠি দেখিয়ে আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে। সনদের বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান। এসব বিষয়ে আমি তদন্ত কমিটি ও আদালতের কাছেই জবাব দেব।’
নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকতা করলে কাজী হওয়া যাবে না এ ধরনের কোনো সুস্পষ্ট বিধি নাই।’
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা মিললে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ছবি : সংগৃহীত
আরবের মরুভূমির খেজুর গাছ এখন দোল খাচ্ছে পাবনার মাটিতে। যেসব উন্নত জাতের খেজুর একসময় শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বাগানেই দেখা যেত, সেগুলোই এখন ফলছে আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম হিরোর বাগানে। শুরু করেছিলেন মাত্র চারটি চারা দিয়ে। তিন বছরের ব্যবধানে সেই ছোট উদ্যোগই পরিণত হয়েছে সম্ভাবনাময় বিদেশি খেজুর বাগানে। প্রতিদিনই বাগানটি দেখতে ভিড় করছেন কৃষক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
২০২২ সালে সদর উপজেলার গয়েশপুর এলাকার একজন উদ্যোক্তার কাছ থেকে চারটি খেজুরের চারা সংগ্রহ করে নিজের জমিতে রোপণ করেন সাইফুল ইসলাম হিরো। মাত্র ১৬ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। সে সময় অনেকেই দেশের আবহাওয়ায় বিদেশি খেজুর চাষ সম্ভব নয় বলে তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু নিয়মিত পরিচর্যা এবং ধৈর্যের মাধ্যমে তিনি সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন।
বর্তমানে সাইফুল ইসলামের ৩৩ শতাংশ বাগানে প্রায় ৬০টি খেজুরগাছ রয়েছে। সেখানে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ১০ থেকে ১২টি উন্নত জাতের খেজুর চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে আজওয়া, মরিয়ম, মেডজুল, সুক্কারি, ওয়ারহিছ ও বড়ই জাত উল্লেখযোগ্য। অনেক গাছে ইতোমধ্যে ফল এসেছে। আবার বেশ কয়েকটি গাছে উন্নতমানের সাকার হয়েছে, যা থেকে নতুন চারা তৈরি করা সম্ভব।
বাগানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজ পাতার ফাঁকে খেজুরের থোকা। দৃশ্যটি যেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো খেজুর বাগানের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ বাগানটি দেখতে আসছেন। অনেকে চাষের খুঁটিনাটি জেনে নিজেরাও বাগান করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি খেজুরের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে উন্নতমানের সাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিরোর বাগানের অনেক গাছে এখন সাকার উৎপন্ন হচ্ছে। এসব সাকার থেকে নতুন গাছ তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় ভবিষ্যতে দেশে বিদেশি খেজুর চাষ আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। বর্তমানে মরিয়ম জাতের একটি চারার বাজারমূল্য প্রায় এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। ফলে বিদেশি খেজুর চাষকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
কৃষক সাইফুল ইসলাম হিরো জানান, চলতি বছর আবাদে খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। অতিবৃষ্টি না হলে প্রতিটি গাছে তিন কেজি খেজুর হবে। বিক্রি করলে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পাবেন বলে আশা করছেন। তিনি বলেন, ‘শুরুতে অনেকেই বলেছিলেন, এই দেশে বিদেশি খেজুর হবে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস হারাইনি। নিয়মিত পরিচর্যা করেছি, বিভিন্ন উৎস থেকে খেজুর চাষের প্রযুক্তি শিখেছি। এখন আমার বাগানে ফল এসেছে। প্রতিদিনই মানুষ বাগান দেখতে আসছেন। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বিদেশি খেজুর চাষ করতে চাই। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদেরও সহযোগিতা করতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশি খেজুর চাষে ধৈর্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিচর্যা করলে সফল হওয়া সম্ভব।’
উপজেলার একদন্ত ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিলি খাতুন বলেন, বিদেশি খেজুর চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, মাঠ পর্যায়ে তদারকি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা মোতমাইন্না বলেন, আটঘরিয়ার মাটি ও জলবায়ু উন্নত জাতের বিদেশি খেজুর চাষের জন্য সম্ভাবনাময়। সাইফুল ইসলাম হিরোর মতো উদ্যোক্তারা অন্য কৃষকদের অনুপ্রাণিত করছেন। লাভজনক কৃষি সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা ইমরান শেখের ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম। গতকাল রোববার দুপুরে ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভিডিওটি কবে ধারণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, ভিডিওটি প্রায় এক বছর আগে ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে।
৫৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, গাঢ় নীল রঙের ফুলহাতা শার্ট পরা ইমরান শেখ অফিস কক্ষের চেয়ারে বসে আছেন। সেবাগ্রহীতার উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘মূল দলিল বিকেলে দেবেন। ফটোকপি আমার কাছে দেওয়া আছে।’
এরপর ওই সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে ইমরান শেখ গুনে গুনে ১০টি ৫০০ টাকার নোট নেন। টাকা নেওয়ার সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি মূল দলিল আজকে দেন। আজকে রাত্রে আবেদন করে দেব। এই সপ্তাহ তো শেষ হয়ে গেল। সামনে রোববার এসি ল্যান্ড আসবে। ইনশা আল্লাহ, দুই সপ্তাহ ক্রস (অতিক্রম) করবে না। কারণ, স্যার দ্রুত কাজ করে।’
একপর্যায়ে ইমরান শেখ সেবাগ্রহীতাকে প্রশ্ন করেন, ‘স্যারের (এসি ল্যান্ড) কথাবার্তা ভালো না? উনিও ৪০তম বিসিএসের। আমিও ৪০তম বিসিএসের। উনার কপাল ভালো, আল্লাহ উনারে ক্যাডার বানাইছে আর আমারে নন–ক্যাডার বানাইছে।’ এরপর টাকা পকেটে রেখে তিনি অন্য এক সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন।
এ বিষয়ে ইমরান শেখ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি ঘুষের টাকা নয়, এটি ধারের টাকা। অনেক মানুষ আমার কাছ থেকে টাকা ধার নেয়, আবার ফেরত দিয়ে যায়। এটি ধারের টাকা ফেরত দেওয়ার সময়কার ভিডিও।’ তবে যিনি টাকা ফেরত দিয়েছেন, তাঁর নাম-পরিচয় জানাতে তিনি রাজি হননি।
বোয়ালমারী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শিব্বির আহমেদের বক্তব্য জানতে তাঁর সরকারি মুঠোফোনে গতকাল রাতে দুই দফা কল করা হলেও তিনি ধরেননি।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের অফিস আদেশে ইমরান শেখকে সাময়িক বরখাস্তের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেন বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান। তিনি জানান, এ ব্যাপারে আরও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। খোঁজখবর নিয়ে বিধিমোতাবেক তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শূন্য কোষাধ্যক্ষ পদে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন যোগ্য অভ্যন্তরীণ শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞ একজন অভ্যন্তরীণ শিক্ষকই এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সবচেয়ে উপযুক্ত।
আজ রোববার (২৬ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’-এর ব্যানারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ বলেন, “অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আবেদন করতে পারেন। তবে নোবিপ্রবির শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা চাই, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন যোগ্য শিক্ষক কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান।”
অংশ নেওয়া আরেক শিক্ষার্থী রিমন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ একজন শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানের সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। ফলে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁরাই অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।’
শিক্ষার্থীরা বলেন, কোষাধ্যক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বাইরের কোনো শিক্ষককে নিয়োগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থেই ইতিবাচক হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ জুন নোবিপ্রবির সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. হানিফ মুরাদ লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে কোষাধ্যক্ষ পদটি শূন্য রয়েছে। সম্প্রতি এ পদে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে- এমন আলোচনা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁরা আজকের মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
শহীদ তুরাবের কবর জিয়ারত ও তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করেন- জামায়াতের নেতৃবৃন্দ
সিলেটের ইতিহাসে প্রথম পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ সাংবাদিক তুরাব হত্যার বিচার নিয়ে চলছে নানা সংশয়ও নানা আশংকা। এ দিকে দফায় দফায় তদন্তের নামে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বিচার নিয়ে হতাশা বেড়েছে শহীদ পরিবারে। বিচারের দীর্ধ সুত্রিতা নিয়ে ক্ষুব্ধ সিলেটের সাংবাদিক সমাজও। ২ বছরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে দেশে। ক্ষমতার মসনদে বসেছে নির্বাচিত সরকার। সেই সরকারের মেয়াদও ৬ মাস হতে চলেছে। কেবল শেষ হয়নি তুরাব হত্যার বিচার। এ মামলায় ২ বছরে অর্জন কেবল ২ জন আসামী গ্রেফতার। প্রকাশ্য পুলিশের গুলির প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এখনো তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে আছে সাংবাদিক তুরাব হত্যার বিচার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর ব্যস্ততম এলাকা কোর্টপয়েন্টের উত্তর পাশে ডায়বেটিক হাসপালের প্রধান গেইটের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলীতে নিহত হন দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার আবু তাহের মো. তুরাব (এটিএম তুরাব)। এরপর কেটে গেছে ২ বছর। এই সময়ে এসএমপির কোতোয়ালী থানা, পি বি আই হয়ে মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল- আইসিটিতে। অপেক্ষা বাড়ছে বিচারের। মৃত্যুর আগে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চান শহীদ তুরাবের মা, স্বামী হত্যার বিচার দেখতে চান বিয়ের ৩ মাসের মাথায় প্রিয়জনকে হারানো স্ত্রী ও তুরাবের ভাই-বোনেরা।
সেদিন কি ঘটেছিলঃ ১৯ জুলাই বাদ জুমআ সিলেট নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় ছাত্র-জনতার উপর নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে মিছিল বের করে বিএনপি। তখন ন্যুনতম কোনো উত্তেজনা ছিলনা। নিত্যদিনের মতো সেদিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিকগণ। পাশেই ছিল পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান। হঠাৎই অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তাদের মারমুখী আচরণে বদলে যায় পরিস্থিতি। উত্তপ্ত হয়ে উঠে কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। ঐ পুলিশের কিলিং মিশনের টার্গেটে পড়ে যান সাংবাদিক এটিএম তুরাব। পুলিশের ছুঁড়া ৯৮টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয় তুরাবের শরীরে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে জরুরী ভিত্তিতে সোবহানী ঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানেই আইসিইউ-তে থাকা অবস্থায় সাংবাদিক তুরাব সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন।
তুরাবের ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম তখন জানিয়েছিলেন, তুরাবের শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায়ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ কারণেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
মাত্র তিন মাস আগে লন্ডনি কন্যা বিয়ে করেছিলেন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। লন্ডন যাওয়ার সব প্রক্রিয়া এগিয়েও রেখেছিলেন। হয়তো কয়েক মাসের মধ্যে তার লন্ডন পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয় তাকে।
এমন ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়ে তার পরিবার। লন্ডনে থাকা সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী তানিয়া ইসলাম বিয়ের তিন মাসের মধ্যে হয়ে যান বিধবা। এখনো কাঁদেন তিনি। কারণ তখন দেশে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় স্বামীর মরদেহ ও শেষ বিদায়ের দৃশ্য দেখতে পারেননি তিনি। সাংবাদিক তুরাব হত্যার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে তুরাব হত্যা মামলায় এসএমপির তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও পুলিশ কনস্টেবল উজ্জল সিংহ কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামী এখনো বাইরে থাকায় ন্যায়বিচার নিয়ে পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সংশয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যার ঘটনায় মৃত্যুর ৫ দিনের মাথায় একই বছরের ২৪ জুলাই সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মো. আজরফ (জাবুর) এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানায় আট থেকে ১০ জন পুলিশকে অভিযুক্ত করে এজাহার দাখিল করেন। কিন্তু কোতোয়ালি থানা পুলিশ সেটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে জিডি হিসেবে নথিভুক্ত করে। এরপর সেই বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মোমেনের আদালতে এটিএম তুরাব হত্যার ঘটনায় পুনরায় মামলা দায়ের করেন তার ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ (জাবুর)। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
আদালত শুনানি শেষে মামলার এফআইআর করার নির্দেশ দেন। মামলায় ২নং আসামি এসএমপির তৎকালীন উপকমিশনার (ক্রাইম উত্তর) মো. সাদেক দস্তগীর কাউসার, ৩নং আসামি তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখ ও ৪নং আসামি হন কোতোয়ালী থানার তৎকালীন সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমান। এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন- এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানার বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ কল্লোল গোস্বামী, থানার তৎকালীন ওসি মঈন উদ্দিন, ওসি (তদন্ত) ফজলুর রহমান, থানার এসআই কাজি রিপন সরকার, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আফতাব উদ্দিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি পিযূষ কান্তি দে, যুবলীগ নেতা ও সিসিকের তৎকালীন গণসংযোগ কর্মকর্তা সাজলু লস্কর, সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সিসিকের ৩২নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রুহেল আহমদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাস অনিক, নগরের চালিবন্দর নেহার মঞ্জিলের বাসিন্দা শিবলু আহমদ (মো. রুহুল আমিন), এসএমপির কনস্টেবল সেলিম মিয়া, কনস্টেবল আজহার, কনস্টেবল ফিরোজ ও কনস্টেবল উজ্জ্বল। এছাড়া মামলায় ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়।
এদিকে, দীর্ঘ দুই বছরে এই মামলায় দু’জন আসামি গ্রেফতার হলেও বাকিরা এখনো পলাতক। গেল বছর মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কোর্টে স্থানান্তর করা হয়। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের পর আইসিটি কোর্টের তদন্ত টীম দফায় দফায় সিলেট সফর করেন। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেন। গেল বছরের ২০ জুলাই প্রথমবারের মতো তুরাব হত্যা মামলার দুই আসামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। চাওয়া হয় রিমান্ড।
গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে চার্জশীট দাখিল করার কথাও জানিয়েছিলেন আইসিটি কোর্টের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তাগণ। কিন্তু এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে আরও দুই বছর। সামনে চলে আসছে আরেক আগস্ট। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কোর্টের একটি তদন্ত টীম গত সপ্তাহে সিলেট সফর করে গেছেন। তারা তুরাব হত্যা মামলার সাক্ষীদের সাথে কথাও বলছেন। এব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, আমরা তদন্তের কাজে সিলেটে এসেছি। তুরাব হত্যা মামলার বাদি ও সাক্ষীদের সাথে কথা বলেছি। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে মন্তব্য করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন তিনি।
মামলার বাদী সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মোহাম্মদ আজরফ (জাবুর) হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলিতে আমার ভাইকে হত্যা করা হলো। শত শত ফুটেজ, নিউজ ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকার পরও একের পর এক তদন্তের নামে কালক্ষেপনে আমরা বিচার নিয়ে হতাশ। প্রশাসন এখন পর্যন্ত মাত্র ২ জন আসামীকে গ্রেফতার করতে পেরেছে। অন্য আসামীদের গ্রেফতারে কোন তৎপরতা না থাকার বিষয়টি দুঃখনজক। আমরা তুরাব হত্যার বিচার চাই।
এদিকে, চব্বিশের জুলাই গণ আন্দোলনে সিলেটের রাজপথে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের কবর জিয়ারত করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি। আজ রোববার (২৬ জুলাই) সকালে বিয়ানীবাজার পৌর শহরের ফতেহপুর কবরস্থানে গিয়ে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তের তৎকালিন সিলেট ব্যুরো প্রধান ও দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার শহীদ তুরাবের কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করেন। জিয়ারত শেষে শহীদ সাংবাদিক তুরাবের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ডা. শফিকুর রহমান। এসময় তিনি তুরাবের বড় ভাই আবু আজরফ মো. জাবুরসহ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাদের খোঁজখবর নেন।
এসময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, শহীদ সাংবাদিক তুরাবদের রক্তের বিনিময়েই আজ দেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, শহীদ হওয়ার দুই বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত তাঁর হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। শহীদ সাংবাদিক তুরাব হত্যার বিচার না হলে ভবিষ্যতে তুরাবের মতো সাহসী ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক তৈরি হবে না। সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা জরুরি। তিনি বলেন, আমরা সাংবাদিক তুরাবের হত্যার বিচারের দাবী জোরদার করবো। এর বিচারের হতেই হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সার্থে তুরাব হত্যার বিচার হওয়া উচিত। আমরা জানিনা এই সরকার তুরাব হত্যার বিচার করবে কিনা। তবে শেষ বিচারের দিনে অবশ্যই তুরাব ন্যায়বিচার পাবেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতের নেতৃবৃন্দ।
এ সময় তিনি তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন, পরিবারের খোঁজ খবর নেন ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।