মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলীয় আফিয়নকারাহিসার প্রদেশের তিনটি গ্রামে বন্দুকধারীর গুলিতে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও একজন। হামলাকারীকে ধরতে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে দেশটির পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যার দিকে প্রদেশটির গ্রামীণ এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এলাকাটি রাজধানী আঙ্কারা ও উপকূলীয় শহর ইজমিরের মাঝামাঝি অবস্থিত।
প্রাদেশিক গভর্নরের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সশস্ত্র হামলায় আটজন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বরাতে জানা যায়, ইউকারিতানদির গ্রামে সড়কের ওপর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুই নারীকে উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়।
এ ছাড়া ওই গ্রামের প্রায় আধা ঘণ্টার পথ দূরে কিয়ির গ্রামে আরও তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়। একইভাবে আরও আধা ঘণ্টা দূরের আয়াজিনি গ্রামে উদ্ধার করা হয় আরও তিনজনের মরদেহ।
হামলায় আহত গুরুতর অবস্থায় থাকা ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে তিনি কোন গ্রামে হামলার শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি জানিয়েছে, হামলার পর লাল রঙের একটি গাড়িতে করে এক সন্দেহভাজনকে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। পুলিশ ওই গাড়ি ও সন্দেহভাজন ব্যক্তির সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে।
তবে হামলার কারণ, নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা সন্দেহভাজন হামলাকারীর পরিচয় সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ।
মদিনা
পবিত্র মদিনার দিকে নিক্ষেপ করা ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দাবি করেছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করা হয় বলে জানিয়েছেন সৌদির নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকি।
জোটের মুখপাত্র বলেন, ‘মদিনা অঞ্চলের দিকে হুথি বিদ্রোহীদের নিক্ষেপ করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।’
এর আগে সৌদি আরবের মদিনা প্রদেশের লোহিত সাগর উপকূলবর্তী ইয়ানবু গভর্নরেট এলাকায় দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ অল্প সময়ের জন্য সতর্কতা জারি করেছিল।
সূত্র: মিডল-ইস্ট আই
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
নির্বাচনে ব্যর্থতার পর এবার আরও বড় এক ধাক্কা এসে লেগেছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মসনদে। দীর্ঘদিনের মিত্র অতি-গোঁড়া ইহুদিদের একটি রাজনৈতিক দল তার পাশে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দলটি জানিয়ে দিয়েছে, নতুন সরকার গঠনের জন্য তারা নেতানিয়াহুর নাম সুপারিশ করবে না। এতে সরকার গঠনের পথে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের সামনে বড় সুযোগ এসে হাজির হয়েছে। খবর টাইমস অব ইসরায়েলের
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের মতো আলোচনা করছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। নির্বাচনে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। তিন বছর ধরে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইসরায়েলকে নেতৃত্ব দেওয়া ডানপন্থি নেতা নেতানিয়াহু দেশটিতে বেশ বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম নামের অতি-গোঁড়া ইহুদিদের দলটি আগের পাঁচটি নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে তারা নতুন সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহুর নাম সুপারিশ করেনি। তবে বিরোধী নেতা আইজেনকটকেও সমর্থন দেয়নি দলটি।প্রেসিডেন্টের দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সাত আসন পাওয়া দলটি কোনো সংসদ সদস্যের নামই সরকার গঠনের জন্য সুপারিশ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম মূলত ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত আশকেনাজি অতি-গোঁড়া ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে একই ধরনের আরেকটি দল শাস প্রতিনিধিত্ব করে সেফারদি ইহুদিদের, যাদের অধিকাংশের শিকড় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়।
ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি বহাল রাখার দাবিতে দুই দলই দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর সমর্থন পেয়ে আসছে। নেতানিয়াহু এই অব্যাহতি বহাল রাখলেও আইন করে স্থায়ী রূপ দেননি। গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের সংরক্ষিত সেনাদের বারবার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের আইনপ্রণেতা আইজ্যাক পিনড্রাস বলেন, পরবর্তী যে সরকারই গঠিত হোক না কেন, আমাদের প্রথম কাজ হবে তোরাহর শিক্ষার্থীদের অবস্থান নির্ধারণের বিষয়টি সমাধান করা।
অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকট মধ্যপন্থি ও মধ্য-ডানপন্থি দলগুলোকে একত্র করে সরকার গঠনের চেষ্টা করছেন। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি বন্ধ করার বিষয়ে তিনি অনড়।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের এই অবস্থানের উদ্দেশ্য নেতানিয়াহুকে চাপে রাখা এবং বোঝানো যে তাদের সমর্থন নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নেতানিয়াহু সরকার গঠনে সফল হলে দলটি সেই সরকারে যোগ দিতেও পারে।
বৃহস্পতিবার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। এরপর তিনি একজন আইনপ্রণেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। সাধারণত কোন নেতা সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেয়েছেন, তা বিবেচনা করেই প্রেসিডেন্ট এই সিদ্ধান্ত নেন। সে হিসাবে আইজেনকটের দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আইনপ্রণেতা ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কাউকে দায়িত্ব দেবেন।
নতুন পার্লামেন্টে নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৫৩। এর মধ্যে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের আসনও রয়েছে। অন্যদিকে আইজেনকটের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।
এদিকে ইসরায়েলের আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা বেড়ে ১৯-এ দাঁড়িয়েছে। আইজেনকট চাইলে এসব দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারেন। তবে তাতে বিরোধী জোটের কিছু সমর্থককে হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
ভারতের দিল্লিতে চাবড়ি বাজার এলাকায় একটি তিন তলা চিকিৎসাধীন ভবন ধসে পড়েছে ২ জন নিহত হয়েছে, এছাড়াও একাধিক মানুষের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চাবড়ি বাজার মেট্রো স্টেশনের কাছে গলি সিতারা এলাকায় সকাল ৯টা ৫০ মিনিট নাগাদ এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
দুর্ঘটনাস্থলে পানির গাড়ি এবং উদ্ধারকারী যানবাহনসহ ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ছয়টি ইউনিটকে দ্রুত পাঠানো হয়েছে। ধসে পড়া কাঠামোর ভেতরে কেউ আটকে আছেন কি না তা খুঁজে বের করতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
আম আদমি পার্টির নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ এই ঘটনার পর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার সরকারের সমালোচনা করে দাবি করেছেন, গত কয়েক মাসের মধ্যে এটি তৃতীয় ভবন ধসের ঘটনা।সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে সৌরভ ভরদ্বাজ লিখেছেন, ‘চাবড়ি বাজার বা চাঁদনি চক এলাকায় আরেকটি তিন তলা ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। রেখা গুপ্তার সরকার এবং এমসিডি দিল্লির সব ভবনে একাধিক নিরাপত্তা নিরীক্ষা চালিয়েছে, তবুও ভবন ধসে পড়ছে। কেন?’
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সৌরভ ভরদ্বাজ এক্সে আরও লেখেন, ‘বারবার নিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রকৃত পদক্ষেপের পরিবর্তে একাধিক বিভাগ বহুবার ঘুষ আদায় করেছে, যে কারণে প্রতি মাসে ভবন ধসে পড়ে।’
হতাহতের সংখ্যা এবং ভবন ধসের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যের জন্য এখনো অপেক্ষা করা হচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের প্রভাব দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও পড়তে পারে। প্রায় দুই বছর ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন ট্রাম্প। এতে মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয় পক্ষের মধ্যেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখন নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর বিদেশের মাটিতে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকে নজর রাখছে বিভিন্ন দেশ।
বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও ইউক্রেনের জন্য এই নির্বাচনের ফল গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা নাকি নতুন করে যুদ্ধ, ট্রাম্প কোন পথে হাঁটবেন, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সমর্থন কতটা কমবে এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনকে কতটা চাপ দেবেন, এসব প্রশ্নের উত্তর নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্পের দল রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা এখন তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নতুন সুযোগ পাবে। তবে আন্তর্জাতিক বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাতে এখনো যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনে পরাজয় তাকে সমঝোতায় আগ্রহী করবে, নাকি নিজের অবস্থানে আরও অনড় করে তুলবে?
ইরানের উল্লাস, তবে যুদ্ধের আশঙ্কা কাটেনি
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়কে স্বাগত জানিয়েছে ইরান। তবে দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার আশঙ্কায় রয়েছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে আংশিক ভূমিকা রেখেছে। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুদ্ধই তাদের পরাজয়ের কারণ।
যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের ক্ষুব্ধ করতে গত আট মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে আসছে ইরান। রিপাবলিকানদের পরাজয়কে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমতের রায় হিসেবে দেখছে তেহরান। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মার্কিন সরকার যদি আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট শক্তি ও ব্ল্যাকমেইলারদের স্বার্থে জনগণের রায় উপেক্ষা করে, তাহলে তাদের কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
তবে ওয়াশিংটনের নীতিতে পরিবর্তন আসবে, এমনটা ধরে নিচ্ছে না তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলে দেশটির নীতির পরিবর্তন হবে বলে যারা মনে করছেন, তারা ‘গুরুতর ভুল করছেন’।
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল নয়। নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাচ্ছে তেহরান।
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ইরান সতর্ক করেছে, এবার পাল্টা হামলার পরিধি আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত হবে। এ সপ্তাহে কয়েকজন সাংবাদিককে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে বড় ধরনের হামলার কথা বিবেচনা করছেন। আবার অন্যদের বলেছেন, আপাতত যুদ্ধ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই তার।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ সিএনএনকে বলেন, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তার সামনে দুটি পথ—মুখরক্ষার মতো একটি সমঝোতা করে বিজয় ঘোষণা করা অথবা সামরিকভাবে আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করা। তার আশঙ্কা, নির্বাচনে দুর্বল হয়ে পড়া প্রেসিডেন্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য দিয়ে সেই পরাজয়ের ক্ষত মুছে ফেলার চেষ্টা করতে পারেন।
তবে কূটনীতির পথও খোলা রয়েছে। গ্রীষ্মে স্থবির হয়ে পড়া আলোচনা গত এক সপ্তাহে আবার গতি পেয়েছে। ইরান কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের কাছে কর্মকর্তা পাঠিয়েছে। কাতার ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প ইরানের সাতটি শর্ত মেনে নিলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তেহরান।
চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল বলেন, নির্বাচনের ফল ইরানের নেতৃত্বের কাছে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে সমর্থন হিসেবে মনে হতে পারে। তবে এতে তাদের সমস্যার সমাধান হবে না। ট্রাম্প কূটনৈতিক বিজয় চান, কিন্তু নিজেকে দুর্বল দেখাতে চান না। অন্যদিকে তেহরান তার নির্বাচনী পরাজয়কে আরও বেশি ছাড় আদায়ের সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। তার ধারণা, সামরিক হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়বে। পূর্ণাঙ্গ চুক্তির চেয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে ‘একটি যুগের অবসান’
ইসরায়েলের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিনই প্রথম ধাক্কাটি আসে। সেদিন ট্রাম্প আকস্মিকভাবে দেশটিকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দেন। এরপর কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়কে ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি দুই দলের দীর্ঘদিনের সমর্থন আগেই কমতে শুরু করেছিল। গাজা যুদ্ধে প্রাণহানির ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের মধ্যেও একটি অংশ মনে করছে, ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত সমর্থন দিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন সিএনএনকে বলেন, বর্তমানে ইসরায়েলের সমালোচনাই যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলের মধ্যে একমাত্র অভিন্ন বিষয় হয়ে উঠেছে। এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে এবং রিপাবলিকান পার্টির বড় একটি অংশেও একই প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
ওরেনের মতে, মার্কিন সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত কেবল শুরু। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আয়রন ডোমের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তির যৌথ উন্নয়নও বন্ধ করে দিতে পারে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দিয়ে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি যুগের অবসানে পৌঁছেছি।’
জেরুজালেম পোস্টের সাবেক সম্পাদক ইয়াকভ কাৎজও মনে করেন, সামনে আরও পরিবর্তন আসতে পারে। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা আসলে পরিবর্তনের হিমশৈলের চূড়ামাত্র। অস্ত্র বিক্রি বন্ধ, নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব এবং যৌথ অর্থনৈতিক কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধের মতো পদক্ষেপও আসতে পারে।
ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের একাংশের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব আরও জোরালো হয়েছে। তাদের ধারণা, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। এখনো নেতানিয়াহু ইরানে নতুন করে হামলা শুরুর জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা চলছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে দেশটির পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইসেনকটেরও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। সরকার গঠন করতে হলে তাকে রেকর্ডসংখ্যক ভোট পাওয়া আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে।
বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলকে নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে আনতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।
ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বের অপেক্ষায় ইউক্রেন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নিয়ে ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া নির্বাচনের আগেই অনেকটা স্পষ্ট হয়েছিল। তবে বুধবার কিয়েভের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তেমন কোনো মন্তব্য আসেনি।
গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে। ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি জানিয়েছেন, রাশিয়ার স্বার্থসংশ্লিষ্ট জ্বালানি চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউক্রেনের প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা নির্ভরতা বাধাগ্রস্ত করেছেন।
এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের কৌশল অনেকটা আগেভাগেই নির্ধারিত হয়েছে, ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বের জন্য অপেক্ষা করা।
বুধবার নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হতে শুরু করলেও কিয়েভের পক্ষ থেকে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের উপপ্রধান সের্গেই কিসলিৎসিয়া ইউক্রেনের টেলিভিশনে বলেন, ক্ষমতায় যিনিই থাকুন না কেন, তাদের সঙ্গে প্রকৃত, স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার চেষ্টা এবং নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কথাও জানান তিনি।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সময় ফুরিয়ে আসার বিষয়টি ইউক্রেনের জন্য ইতিবাচক। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানো সহজ। কিন্তু রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় তিনি ইউক্রেনের ওপরই চাপ সৃষ্টি করেছেন। জেলেনস্কিকে কখনো অপমান করেছেন, কখনো তিরস্কার করেছেন, আবার কখনো সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছেন। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের মিত্ররাও উদ্বিগ্ন।
অস্ত্র, অর্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের নিশ্চয়তা—এখনো ইউক্রেনের এসব সহায়তা প্রয়োজন। তবে কয়েক মাসের বৈরী আচরণের পর ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যাবে না বলে মনে করছে কিয়েভ।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কমে আসার একটি ঝুঁকিও রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মনে করতে পারেন, ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে তার হাতে প্রায় এক বছর সময় রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যুদ্ধের মাধ্যমে যতটা সম্ভব সুবিধা আদায় করে নিতে চাইতে পারেন তিনি। কারণ, ২০২৮ সালের নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির নীতিতে আবার ইউক্রেনপন্থি অবস্থান ফিরে আসতে পারে।
এতদিন ট্রাম্পকে নিজের বড় মিত্র হিসেবে পেয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেননি পুতিন। তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় হতে থাকার এই সময়ে সেই পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধই ছিল তাদের দলের পরাজয়ের প্রধান কারণ, রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারের পর দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ কথা লিখেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স এক দীর্ঘ পোস্টে এই প্রতিক্রিয়া দেন তিনি। ভ্যান্স বলেন, ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ হলো যুদ্ধ।’
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেন, ‘সবাই জানে, কেন আমরা হেরেছি। আর এখান থেকে আমরা কীভাবে সামনে এগোব, সেটা যে কোনো সৎ আলোচনা থেকেই শুরু হতে হবে।’
বুধবার (৪ নভেম্বর) গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভ্যান্সের এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একসময় ইরানের সঙ্গে সমঝোতার প্রচেষ্টায় ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। এখন ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থিতা সামনে রেখে অজনপ্রিয় এই যুদ্ধ থেকে ভ্যান্স নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা কেন হেরেছি, তার প্রকৃত কারণ প্রায় সবার কাছেই স্পষ্ট। আমাদের পরাজয়ের কারণ এই যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নিজেও গত রাতে এমনটা বলেছেন। কেউ যদি যুক্তি দিতে চান যে যুদ্ধটি সার্থক ছিল, অর্থাৎ আগামী ৬ বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোটা খুব বড় কোনো ক্ষতি নয়। পরবর্তী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোও এর বিনিময়ে মেনে নেওয়ার মতো ছিল, তাহলে তা বলতে পারেন। যুক্তি দিন, এই মূল্য দেওয়া সার্থক হয়েছে। আপনি একমত হন বা দ্বিমত পোষণ করেন, অন্তত সেটি হবে সৎ অবস্থান।’
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার যৌক্তিকতা নিয়ে ভ্যান্স শুরু থেকেই সন্দিহান ছিলেন বলে জানা যায়।