ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ১৯ মে, ২০২৬, সময় : ৬:০৪ এএম

ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতে ইসরায়েলের আরও একটি গোপন সামরিক ঘাঁটি থাকার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ৩ মার্চ এক মেষপালক আওয়াদ আল-শাম্মারি দুর্ঘটনাক্রমে একটি ঘাঁটির কাছে গেলে ইসরায়েলি হেলিকপ্টার থেকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। 


গোপন ঘাঁটিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হতো। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে জানলেও ইরাককে জানায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। আরও গোপন ঘাঁটি থাকতে পারে বলে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।


দিনটি ছিল ৩ মার্চ, স্থানীয় সময় বেলা প্রায় ২টা। একটি পিকআপ ট্রাক ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমি দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যাচ্ছে। মরুভূমিতে বসবাস করা স্থানীয় বেদুইন বসতির কাছে সেটি পরিচিত এক দৃশ্য। পিকআপটি স্থানীয় এক মেষপালকের। তিনি বাজার করতে কাছের শহর আল-নুখাইবে যাচ্ছিলেন।


তবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই পিকআপটি ফিরে আসে, যা একেবারেই অস্বাভাবিক ছিল। ফিরে আসার সময় সেটিতে আগুন জ্বলছিল এবং গুলিতে সেটি ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।


তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একটি হেলিকপ্টার ট্রাকটিকে (পিকআপ) ধাওয়া করছিল এবং বারবার গুলি চালাচ্ছিল, একপর্যায়ে সেটি মরুভূমিতে বালুর মধ্যে থেমে যায়। সেটিতে তখনো আগুন জ্বলছিল।


ইরাকের মরুভূমিতে প্রাণঘাতী এই হামলা নিয়ে আগে কখনো কোথাও খবর প্রকাশ পায়নি। ট্রাকটি ২৯ বছর বয়সী আওয়াদ আল-শাম্মারির। শাম্মারির চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, তাঁর ভাই আওয়াদ ট্রাকটি নিয়ে বাজার করতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু পথ চলতে গিয়ে তিনি অজান্তে ইরাকের মরুভূমিতে গোপনে স্থাপন করা একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির মুখোমুখি পড়ে যান। 


অত্যন্ত গোপনীয় এবং দারুণভাবে সুরক্ষিত ওই সামরিক আস্তানার কাছাকাছি চলে যাওয়ার কারণেই আওয়াদকে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে বিশ্বাস তাঁর পরিবারের।


আওয়াদ আল-শাম্মির কারণেই শেষ পর্যন্ত থলের বিড়াল বের হয়ে আসে। জানা যায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল তাদের শত্রুদেশ ইরাকের ভেতরে দুটি গোপন সামরিক স্থাপনা থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। দুর্ভাগ্যজনক সেই যাত্রা শুরুর পর থেকে ভয়াবহ পরিণতির আগে কোনো একসময় আওয়াদ ইরাকের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি যা দেখেছিলেন, তা জানাতে সক্ষম হয়েছিলেন।


ওই মেষপালক বলেছিলেন, সেখানে একটি উড়োজাহাজ ওঠা-নামার পথ এবং সেটি ঘিরে সেনা, হেলিকপ্টার ও তাঁবুর সমাবেশ রয়েছে।


জ্যেষ্ঠ ইরাকি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, বাগদাদের আঞ্চলিক মিত্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তার জন্য ইসরায়েল সেখানে একটি ঘাঁটি পরিচালনা করছিল।


এর আগে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ইরাকের ভেতরে ইসরায়েলের একটি সামরিক ফাঁড়ি থাকার খবর প্রকাশ করে। ইরাকি কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমিতে আওয়াদের আবিষ্কার করা সামরিক স্থাপনাটি ইসরায়েলের দ্বিতীয় আরেকটি ঘাঁটি।


আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, আওয়াদ আল-শাম্মারি যে ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, সেটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধেরও আগে তৈরি। ২০২৫ সালের জুনে তেহরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে ঘাঁটিটি ব্যবহার করা হয়েছিল।


আঞ্চলিক কর্মকর্তারা আরও বলেন, দেশের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চল বেছে নিয়ে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই ইসরায়েল অস্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু করে, যাতে ভবিষ্যৎ সংঘাতের সময় অভিযান চালানোর জন্য সেগুলো ব্যবহার করা যায়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের এই ফাঁড়ি ও ঘাঁটি এবং আওয়াদ আল-শাম্মারির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য করা একাধিক অনুরোধে সাড়া দেয়নি।


তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়াদ হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন।


ইসরায়েলি ঘাঁটিগুলো নিয়ে যেসব কর্মকর্তা কথা বলেছেন, তাঁদের অধিকাংশই এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল নিরাপত্তা বিষয় হওয়ায় নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে তাঁরা যে তথ্য দিয়েছেন, তা ইঙ্গিত করে যে অন্তত একটি ঘাঁটি, যেটিতে আওয়াদ হঠাৎ করে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেটির বিষয়ে ২০২৫ সালের জুন মাস থেকেই অথবা তারও আগে থেকে ওয়াশিংটনের কাছে তথ্য ছিল।


এর অর্থ দাঁড়ায়, বাগদাদের অন্য প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এ বিষয়ে ইরাককে কোনো তথ্য দেয়নি। তাদের শত্রু বাহিনী যে গোপনে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করেছে, এটা ওয়াশিংটন বাগদাদকে জানতে দেয়নি।


ইরাকের পার্লামেন্ট সদস্য ওয়াদ আল-কাদু বলেন, ‘এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব, দেশটির সরকার ও তার বাহিনীগুলোর পাশাপাশি ইরাকি জনগণের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা প্রদর্শন করার শামিল।’


আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরাকের নিরাপত্তাব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ইসরায়েলের সেই হিসাব-নিকাশের অংশ ছিল, যার ভিত্তিতে ইসরায়েল ধরে নিয়েছিল, ইরাকে গোপনে সামরিক আস্তানা গড়ে সেখান থেকে সামরিক অভিযান চালানো তাদের জন্য নিরাপদ হবে।


দুজন ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গত বছর জুনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ এবং চলমান সংঘাত-উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের উড়োজাহাজগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে ইরাককে তাদের রাডার বন্ধ করতে বাধ্য করেছিল। এর ফলে বাগদাদ শত্রুর তৎপরতা শনাক্তের জন্য আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।


ইসরায়েলের এসব ঘাঁটির উপস্থিতির তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া ইরাকের জন্যও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মরুভূমির এক মেষপালকের নজরে পড়ার আগপর্যন্ত সত্যিই কি ইরাকি বাহিনী নিজেদের ভূখণ্ডে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি জানত না? নাকি তারা জানত, কিন্তু উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?


যেকোনো সম্ভাবনাই এই ইঙ্গিত করে, দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের টানাপোড়েনে আটকে থাকা ইরাক এখনো নিজের ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি।


আল-কাদু বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমাদের নিরাপত্তা নেতৃত্বের অবস্থান অত্যন্ত লজ্জাজনক।’


এ নিয়ে ইরাকি সেনাবাহিনীর ওয়েস্টার্ন ইউফ্রেতিস ফোর্সেসের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের এই আবিষ্কারের এক মাসের বেশি সময় আগে থেকে তাঁর বাহিনী মরুভূমিতে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে সন্দেহ করে আসছিল।


আল-হামদানি বলেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত ইরাক সরকার এ নিয়ে নীরব।


ইরাকের সরকার এখন পর্যন্ত তাদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি ঘাঁটির অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। এটি স্বীকার করা তাদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।


কারণ, ইসরায়েলের সঙ্গে ইরাকের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। দেশটির জনগণ ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে দেখে।


ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরাকের কাছে ‘কোনো ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।’


মরুভূমিতে ইসরায়েলের ঘাঁটির উপস্থিতির তথ্য প্রকাশের পর ইরাকে ক্ষোভ বাড়ছে। ফলে দেশটিতে ইরানের প্রভাব সীমিত করার যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা হুমকির মুখে পড়তে পারে।


আঞ্চলিক দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, আওয়াদ যে ঘাঁটির তথ্য প্রকাশ করেছিলেন, সেটি ইসরায়েলের বিমানবাহিনীকে অভিযানে সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হতো।


এসব ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল, যাতে ইসরায়েলি উড়োজাহাজগুলোকে ইরান পর্যন্ত পৌঁছাতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে হতো, তা কমানো যায়। এটি মূলত সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য একটি অস্থায়ী উপস্থিতির কথা মাথা রেখে তৈরি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুনে যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল বলে জানান দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা।


গত বছরের যুদ্ধের পর দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেছিলেন, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ‘বিমানবাহিনী এবং স্থল কমান্ডো বাহিনীর সমন্বয় ও প্রতারণামূলক কৌশলের কারণে’ ইসরায়েলি অভিযানে সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছিল।


মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান তদারকির দায়িত্বে থাকা পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকে ইসরায়েলি অভিযানের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রশ্নগুলো ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে পাঠাতে বলেছে।


তবে সাবেক শীর্ষ মার্কিন সামরিক কমান্ডার, পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এবং ওই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন কূটনীতিকেরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিজেদের ভেতর যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তাতে সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে কিছুই জানে না—এটা কল্পনাতেও বিশ্বাস করা অসম্ভব।


বিপজ্জনক গোপন তথ্য যেভাবে ফাঁস হলো


ইরাকের আঞ্চলিক কমান্ডার জেনারেল আল-হামদানি দাবি করেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমির বেদুইন সম্প্রদায়গুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে আঞ্চলিক কমান্ডকে সেখানে অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতার বিষয়ে নানা খবর দিচ্ছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী কাছাকাছি না গিয়ে বরং দূর থেকে ‘সম্ভাব্য ইসরায়েলি বাহিনীর সন্দেহজনক তৎপরতার ওপর নজরদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল’।


তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে এ বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।


আওয়াদ আল-শাম্মারি যেদিন বিদেশি বাহিনীর মুখোমুখি হন, সেদিন তিনিও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর চাচাতো ভাই এবং কারবালা আঞ্চলিক অপারেশন কমান্ডের মুখপাত্র মেজর জেনারেল ফাহিম আল-গুরাইতি।


তার কিছু সময় পর জেনারেল আল-গুরাইতি ও আওয়াদ আল-শাম্মারির পরিবারের সদস্যরা জানান, সেনাবাহিনী ও তাঁর স্বজনেরা তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। তাঁর পরিবার দুই দিন ধরে খোঁজাখুঁজি করে, এরপর হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করা বেদুইন বাসিন্দাদের সন্ধান পায়। তাদের কাছ থেকে তাঁরা আওয়াদের শেষ পরিণতির কথা জানতে পারে, জানতে পারে তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল।


আওয়াদের চাচাতো ভাই আমির বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, আওয়াদের পিকআপের মতোই দেখতে একটি পুড়ে যাওয়া পিকআপ ট্রাক সেখানে পড়ে আছে, কিন্তু কেউ সেখানে যাওয়ার সাহস করেনি। আমরা সেখানে গিয়ে পোড়া ট্রাক ও পুড়ে যাওয়া মরদেহ দেখতে পাই।’


আওয়াদের পরিবার তাঁর রক্তাক্ত ও পোড়া মরদেহের ছবি দেখিয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, তাঁর মাথা ও আঙুল পুড়ে কালো হয়ে গেছে। ছবিতে পোড়া পিকআপও দেখা যাচ্ছে। জেনারেল আল-গুরাইতি ও জেনারেল আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের কাছ থেকে খবর পাওয়ার এক দিন পর ইরাকের আঞ্চলিক কমান্ড একটি পুনর্বীক্ষণ দল সেখানে পাঠায়।


তারও এক দিন পর ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ডের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ইউনিটগুলো এলাকাটির কাছে পৌঁছালে তারা গোলাগুলির মুখে পড়ে। এতে এক সেনা নিহত এবং দুজন আহত হন, দুটি যানবাহনে বোমা হামলা চালানো হয়। এরপর ইউনিটগুলো সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।


বাগদাদে ইরাকের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তখনো বোঝার চেষ্টা করছিলেন, সেখানে আসলে কী ঘটেছিল।


দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের কারণে তাঁদের প্রচেষ্টা বারবার ব্যাহত হয়। শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা ঘটনাটিকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি বা এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছিলেন।


সেনাদের ওপর হামলা ও সেনা হতাহতের ঘটনার পর জনসমক্ষে ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ড জানিয়েছিল, ‘বিদেশি’ বাহিনী তাদের সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে অভিযোগ করেছে।


আর ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল-আমির ইয়ারাল্লাহ গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলে জানান জেনারেল আল-হামদানি এবং দুজন জ্যেষ্ঠ ইরাকি কর্মকর্তা। তাঁরা বলেন, ‘মার্কিন বাহিনী নিশ্চিত করেছিল, ওই কাজ তাদের বাহিনীর নয়, ওটা মার্কিন বাহিনী নয়। তখন আমরা বুঝতে পারি, এটি ইসরায়েলি বাহিনী ছিল।’


ইরাকি সেনাদের ওপর হামলার চার দিন পর, ৮ মার্চ ইরাকি পার্লামেন্ট সামরিক নেতৃত্বকে একটি গোপন ব্রিফিং আয়োজনে বাধ্য করে। ওই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত পার্লামেন্ট সদস্যরা জানান, তাঁরা এর বিস্তারিত প্রকাশ করতে পারেননি। তবে তাঁদের একজন হাসান ফাদাম নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইসরায়েল ইরাকের ভেতরে অন্তত আরও একটি ফাঁড়ি স্থাপন করেছিল।


হাসান ফাদাম বলেন, আল-নুখাইবেরটি সেই ঘাঁটিগুলোর একটি, শুধু এটির অবস্থান ফাঁস হয়েছে।


আরেক ইরাকি কর্মকর্তা দ্বিতীয় ঘাঁটির অস্তিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, তবে সেটির অবস্থান সম্পর্কে আলাদা কিছু জানাননি। শুধু বলেছেন, সেটিও দেশটির পশ্চিমের মরুভূমি অঞ্চলে অবস্থিত।


সাবেক ও বর্তমান দুজন জ্যেষ্ঠ ইরাকি কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রটোকল অনুযায়ী ইরাকি ভূখণ্ডে কোনো কার্যক্রম চালালে তা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বাগদাদকে জানানো বাধ্যতামূলক।


ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, এর অর্থ দাঁড়ায়, ওয়াশিংটন হয় ইসরায়েলি কার্যক্রম গোপন রেখেছিল অথবা ইরাকের শীর্ষ কমান্ডকে জানানো হয়েছিল, তারা তা গোপন রেখেছিল।


তবে কর্মকর্তারা এ–ও বিশ্বাস করেন, মরুভূমির ওই মেষপালক ঘটনাটি প্রকাশ করার আগপর্যন্ত ইরাকি নেতৃত্ব বিদেশি সামরিক বাহিনীর ওই উপস্থিতি যে ইসরায়েলি বাহিনী ছিল, তা তারা জানত-এমনটা প্রায় অসম্ভব। বরং খুব সম্ভবত তারা সেটিকে মার্কিন ঘাঁটি বলে ধরে নিয়েছিল।




ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : রবিবার ০২ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১:৫৪ পিএম

এক সময় আশঙ্কা করা হতো ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলা সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। বাস্তাবে রূপ নেয় আশঙ্কা। শুরু হয় হামলা পাল্টা হামলা। এক্ষেত্রে এখন কোনো অংশে পিছিয়ে নেই ইরানও।


প্রথম দিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলার ক্ষেত্রে ইরান কিছুটা সংযত থাকলেও পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। তেহরানের দাবি, তারা মূলত অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। 


তবে এরই মধ্যে ইরানের হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনাতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আর চুপ থাকতে চাইছে না। কোনো কোনো দেশ সামরিক পদক্ষেপের কথাও বিবেচনা করছে। এরই মধ্যে সৌদি আরব ইরাক ও ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।


একই সঙ্গে ইরানকে মোকাবিলা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান ও ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতায় সৌদি আরবের জন্য হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এখন ইরান ও সৌদি আরব এক ধরনের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধেও বাড়ছে উত্তেজনা


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখনও চলছে। দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় নিয়মিত পাল্টাপাল্টি হামলা হচ্ছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানও জবাব দিচ্ছে।


এই সংঘাত এখন আরও বড় আকারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো যেকোনো মূল্যে নিরাপদ বাণিজ্যপথ ফিরিয়ে আনতে চায়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


কিন্তু ইরান এ বিষয়ে কোনোভাবেই রাজি হচ্ছে না। তেহরানের দাবি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা ও সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় ইরানে হামলার জন্য যেসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হবে, সেসব দেশকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।


এত দিন সৌদি আরব সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইলেও পরিস্থিতির কারণে এখন দেশটিকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। তাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সৌদি আরব সামরিকভাবে কতটা শক্তিশালী? ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে গেলে দেশটি কি টিকে থাকতে পারবে? কিংবা ইরান-সমর্থিত হুথিদের মোকাবিলাই বা কতটা সম্ভব?


সামরিক শক্তিতে ইরান এগিয়ে


২০২৬ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের (জিএফপি) তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শক্তিতে সৌদি আরবের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ইরান। বিশ্বের ১৪৫টি দেশের সামরিক শক্তির তালিকায় ইরানের অবস্থান ১৬তম। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের পরেই ইরানের অবস্থান। 


অন্যদিকে সৌদি আরবের অবস্থান ২৫তম। অর্থাৎ জিএফপি-এর হিসাবে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতায় সৌদি আরবের চেয়ে ইরান এগিয়ে। তবে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চলার কারণে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সংঘাতে ইরানের সামরিক শক্তি ঠিক কতটা ক্ষয় হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।


জিএফপি-এর পাওয়ারইনডেক্স অনুযায়ী, ইরানের স্কোর ০ দশমিক ৩১৯৯। সৌদি আরবের স্কোর ০ দশমিক ৪৪৭৩। এই সূচকে স্কোর যত শূন্যের কাছাকাছি, সামরিক শক্তির অবস্থান তত শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


সামরিক জনবলে বড় ব্যবধান


ইরানের মোট জনসংখ্যা ৮ কোটি ৮৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৭। দেশটিতে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার মতো জনশক্তি রয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ সামরিক দায়িত্ব পালনের উপযোগী।


অন্যদিকে সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৪৪ হাজার ৪৩১ জন। দেশটিতে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার মতো জনশক্তি প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ৩ হাজার ১০৪ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ।


সামরিক বয়সে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যাতেও ইরান এগিয়ে। দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ১৪ লাখ ১৪ হাজার মানুষ সামরিক বয়সে পৌঁছান। সৌদি আরবে এই সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ২১ হাজার।


সক্রিয় সেনাসদস্যেও ইরান অনেক এগিয়ে


ইরানের মোট সামরিক সদস্য প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে সক্রিয় সামরিক সদস্য ৬ লাখ ১০ হাজার এবং রিজার্ভ সদস্য প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার।


অন্যদিকে সৌদি আরবের মোট সামরিক সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার। এর মধ্যে সক্রিয় সদস্য ২ লাখ ৪৭ হাজার। GFP-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের কোনো রিজার্ভ সদস্য নেই। অর্থাৎ সক্রিয় সামরিক সদস্যের সংখ্যাতেও ইরান সৌদি আরবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে।


স্থলবাহিনীতেও বড় ব্যবধান


ইরানের সেনাবাহিনীতে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সদস্য রয়েছে। দেশটির বিমানবাহিনীতে প্রায় ৩৭ হাজার এবং নৌবাহিনীতে প্রায় ২০ হাজার সদস্য রয়েছেন।


অন্যদিকে সৌদি আরবের সেনাবাহিনীতে প্রায় ৭৫ হাজার সদস্য রয়েছে। বিমানবাহিনীতে প্রায় ৩০ হাজার এবং নৌবাহিনীতে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ সদস্য রয়েছেন। অর্থাৎ স্থলবাহিনীর জনবলে ইরান সৌদি আরবের তুলনায় অনেক এগিয়ে।


আধাসামরিক বাহিনীতেও ইরান এগিয়ে


আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যাতেও ইরানের অবস্থান শক্তিশালী। ইরানে এই বাহিনীর সদস্য প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার। সৌদি আরবে আধাসামরিক সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার। ফলে সামরিক ও আধাসামরিক জনবলের ক্ষেত্রেও ইরানের পরিমাণ সৌদি আরবের চেয়ে বেশি।


তিন দিক থেকে নিরাপত্তা হুমকি সৌদি আরবের


বর্তমানে সৌদি আরবকে একসঙ্গে তিনটি দিক থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে ইরান, অন্যদিকে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এবং ইরাকের সশস্ত্র মিলিশিয়ারা।


সম্প্রতি হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাক থেকে ড্রোন হামলা এবং ইরানের নতুন হুমকির পর সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে বিমান হামলা চালায়।


এ ছাড়া একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্চ মাসের শেষ দিকে সৌদি বিমানবাহিনী ইরানের ভেতরেও গোপন প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছিল। তবে এই হামলার বিষয়ে সৌদি আরব বা ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি।


বাণিজ্যপথ রক্ষায় সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট


বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব।


সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে এই জোট গঠন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।


জোটভুক্ত দেশগুলো জানিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে তারা একসঙ্গে কাজ করবে।


এই তিনটি জলপথ ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর হিসেবে বিবেচিত।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ার সময় এই জোট গঠনের ঘোষণা আসে। বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ একসময় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হতো। সেখানে নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।


ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি


এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট বা সহযোগিতা করা এবং দেশটিকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া আঞ্চলিক দেশগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান।


দেশটির খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি বলেছেন, কোনো দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয় কিংবা ওয়াশিংটনের জন্য ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তাকেও যুদ্ধের পরিণতি ভোগ করতে হবে।


এক বক্তব্যে আবদোল্লাহি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আঞ্চলিক যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘ব্যাপক যুদ্ধংদেহী পথে’ আরও দ্রুত এগোচ্ছে।


ইরানি এই কমান্ডারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির পেছনে রয়েছে পুরো অঞ্চলজুড়ে আধিপত্য বিস্তার এবং নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার একটি ‘বিপজ্জনক কৌশল’।


মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র


আবদোল্লাহি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছে যে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থ ও সম্পদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ নিতে তারা পিছপা হবে না।


তার দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর অর্থ, সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কৌশলগত সম্পদকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সামরিক বাহিনীর জন্য ‘প্রতিরক্ষামূলক ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে।


একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।


সহযোগিতা পুনর্বিবেচনার আহ্বান


ইরানের এই সামরিক কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর এখন বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড এবং চলমান যুদ্ধের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়নের সময় এসেছে বলে মনে করেন তিনি।


তিনি মুসলিম দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বা ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।


আবদোল্লাহির ভাষায়, আঞ্চলিক দেশগুলোর উচিত ‘দূরদর্শিতার সঙ্গে’ কাজ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা।


ইরানের দাবি, বদলে গেছে শক্তির ভারসাম্য


আবদোল্লাহি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সংঘাত প্রমাণ করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য আর আগের মতো নেই।


তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে তারা মুসলিম দেশগুলোর ভূখণ্ডের ‘আড়াল’ থেকে যুদ্ধ ও আগ্রাসন চালানোর চেষ্টা করছে এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য আঞ্চলিক সরকারগুলোর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।


তিনি বলেন, ইরান এখন স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছে আঞ্চলিক দেশগুলোকে বুঝতে হবে, তারা কার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে এবং সেই অবস্থানের সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে।


‘যুদ্ধের আগুনে পুড়তে হবে’


বক্তব্যের শেষ দিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন ইরানের এই সামরিক কর্মকর্তা।


তিনি বলেন, কোনো দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘প্রতিরক্ষামূলক ঢাল’ হিসেবে নিজেকে ব্যবহার করতে দেয়, তাহলে সেই দেশও যুদ্ধের আগুন থেকে রেহাই পাবে না।


তার সতর্কবার্তা হলো-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমনভাবে অবস্থান নেওয়া যাবে না, যার ফলে কোনো দেশ নিজেই আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হয়ে পড়ে।


ইরানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ফলে তেহরানের এই কঠোর বার্তা আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।


শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে?


সামগ্রিক সামরিক শক্তিতে ইরান সৌদি আরবের চেয়ে এগিয়ে। ১৪৫টি দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান ১৬তম, যেখানে সৌদি আরবের অবস্থান ২৫তম। সামরিক জনবল, সক্রিয় সেনাসদস্য, রিজার্ভ বাহিনী, স্থলবাহিনী ও আধাসামরিক সদস্যের সংখ্যাতেও ইরানের বড় ব্যবধান রয়েছে।


তবে সামরিক শক্তি শুধু সেনাসদস্যের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, অস্ত্রের মান, আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি, সামরিক জোট এবং সরবরাহব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।


তাই ইরান ও সৌদি আরব সরাসরি সংঘাতে জড়ালে শুধু র‌্যাংকিং দিয়ে ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বরং দুই দেশের শক্তির ধরন ও তাদের মিত্রদের ভূমিকা যুদ্ধের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব একদিকে ইরান ও তার মিত্রদের মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সচল রাখতে সামরিক জোট গড়ে তুলছে। বিপরীতে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোকে সরাসরি সতর্ক করছে।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : রবিবার ০২ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১২:৩৫ পিএম

ইরান সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনো ‘বেপরোয়া পদক্ষেপ’ নেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী যদি মার্কিন বাহিনী ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আবার হামলা চালায়, তবে কঠোরভাবে তার জবাব দেওয়া হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল শনিবার তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলাপে এ হুঁশিয়ারি দেন।


আব্বাস আরাগচির এ হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টা আগে কুয়েতের সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা ইরানের ছোড়া ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কুয়েতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলেও জানায় তারা।


পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে কথা বলার সময় আরাগচি বলেন, যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে ইরান দৃঢ় ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।


নিজের টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের’ সম্ভাব্য পরিণতি এবং এর ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা নিয়েও আলোচনা করেছেন তিনি। পরে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে আলাপকালে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যেকোনো হামলা বা এ ধরনের পদক্ষেপে আঞ্চলিক কোনো দেশের অংশগ্রহণের জবাবে ইরান ‘সমান প্রতিক্রিয়া’ জানাবে।


এদিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গতকাল ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। যুবরাজ ইরান-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিয়ে ‘উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান’ বলে একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।


ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নূরনিউজ গতকাল জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালায়, তবে ইরান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলক্ষেত্র, পাশাপাশি কাতার ও ইসরায়েলের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালাবে।


নূরনিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হবে।’


আগের দিন শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, তাঁর বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা এখনো ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই আলোচক দলে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রয়েছেন।


তবে ট্রাম্প এ–ও বলেছেন, ইরানের প্রতি তাঁর আস্থা ক্রমশ কমছে। তাঁর অভিযোগ, ইরান বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। প্রয়োজন হলে তিনি তাদের ওপর আবার আঘাত হানবেন।


ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একই অভিযোগ করে আসছে।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : রবিবার ০২ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১২:২৬ পিএম

দক্ষিণ মরক্কোর উপকূলীয় শহর ইমসোয়ানের একটি সার্ফশপে (সার্ফিংয়ের সরঞ্জাম বিক্রির দোকান) কাজ করেন ২৬ বছর বয়সী হামজা (ছদ্মনাম)। দোকানে বসে মুঠোফোনে ইনস্টাগ্রাম দেখছিলেন তিনি। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল শৈশবের বন্ধুদের ছবি। 


গত সেপ্টেম্বরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাছের ইউরোপের দেশ স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। দোকানের বাইরে তখন সার্ফিং শেষে ফিরছিলেন ক্লান্ত পর্যটকেরা। পাশেই বিলাসবহুল একটি বুটিক হোটেল, যার বেশির ভাগ অতিথিই তরুণ ইউরোপীয় সার্ফার।


হামজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘স্পেনে যেতে গিয়ে আমার শৈশবের বন্ধুরা মারা যেতে পারত। তারপরও তাঁদের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়াটা সার্থক মনে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যেসব ছেলের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি, তাঁদের অনেকেই দারিদ্র্যের এক অন্তহীন চক্রে আটকে পড়েছেন। যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।’


সেপ্টেম্বরে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশের আশায় মরক্কোর প্রায় চার হাজার তরুণ এবং সাবসাহারা আফ্রিকার কয়েকজন অভিবাসী সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওই ঘটনার কথাই বলছিলেন হামজা। ইউরোপে ভালো জীবনের স্বপ্নে যাত্রা করা ওই মানুষের ভিড়ে ছিলেন তাঁর শৈশবের ছয় বন্ধুও।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেউতায় প্রবেশের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ার পর এই তরুণেরা ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে স্পেনের ওই স্বায়ত্তশাসিত শহরের সীমান্তসংলগ্ন জনপদ বেলিউনেশে পৌঁছান।


উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতা ও মেলিইয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র আফ্রিকান স্থলসীমান্ত। উন্নত জীবনের আশায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা সেখানে প্রায়ই দেখা যায়।


মরক্কো কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশটির বিভিন্ন শহর থেকে আসা তিন হাজার মানুষ সীমান্তের বেড়া টপকে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করার সময় আটক হন। এ উদ্যোগের আয়োজনে জড়িত থাকার সন্দেহে প্রায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকজন আলজেরীয় কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে মরক্কো। তবে আলজেরিয়ার সংবাদমাধ্যম সে অভিযোগ অস্বীকার করে।


ঘটনার সময় মরক্কোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যদিও কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে মরক্কোর ঐতিহাসিক শহর তেতোয়ানের সরকারি কৌঁসুলি ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।


‘মরক্কোতে জীবন যেন বৃথা’


সীমান্ত থেকে যাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই শত শত মানুষের বিপরীতে হামজার বন্ধুরা ছিলেন সেউতায় পৌঁছাতে সক্ষম হওয়া হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে।


হামজা বলেন, ‘আমার বন্ধুরা এখন কেমন আছে, আমি জানি না। তারা খুব একটা কিছু বলে না। সম্ভবত কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার ভয়ে।’


এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন হামজার শৈশবের বন্ধুরা।


২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হামজার নিজ শহর এল জাদিদা থেকে ১৭ তরুণ স্পেনে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হন। আটলান্টিক উপকূলের এ বন্দরনগরী কাসাব্লাঙ্কার কাছাকাছি। ওই সময় তাঁরা নৌকায় করে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছান।


মুঠোফোনে সেই বন্ধুদের একজনের পাঠানো একটি বার্তা দেখান হামজা। বর্তমানে তিনি আইবেরীয় উপদ্বীপে বসবাস করছেন। হামজা বলেন, ‘ইনস্টাগ্রামে এটিই তার সর্বশেষ পোস্ট। দেখে মনে হচ্ছে সে যেন ছুটি কাটাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, স্পেনে তার জীবন মোটেও সহজ নয়।’


ভিডিওতে দেখা যায়, হামজার সেই বন্ধু-যিনি একজন ফুটবলার-সমুদ্রসৈকতের কাছের একটি রৌদ্রোজ্জ্বল উন্মুক্ত চত্বরে বসে পানীয় পান করছেন। পেছনে বাজছে প্রাণবন্ত সংগীত।


হামজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ওর প্রতিভা আছে। স্পেনে সুযোগ পাওয়ার আশায় আছে। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এখন পর্যন্ত সব ক্লাবই তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।’


হোটেলের সার্ফিং পরিবেশের সঙ্গে মানানসই পোশাক পরা হামজা সেউতায় আটকে পড়া তাঁর ছয় বন্ধুর ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশ্র অনুভূতির কথা জানান।


ভালো বেতন, শিক্ষিত মা–বাবা এবং ভূতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকার কারণে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার কথা হামজা কখনো ভাবেননি। তবে তাঁর বন্ধুরা কেন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা তিনি বুঝতে পারেন।


হামজা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দেখে ইউরোপের মানুষের জীবন কেমন। তাদের কারও কারও মনে হয়, মরক্কোতে থেকে তারা শুধু জীবনটাই নষ্ট করছে। হয়তো এটাই তাদের জন্য নতুন একটি সুযোগ।’


টিকটক–ইনস্টাগ্রামে ইউরোপ–যাত্রার স্বপ্ন ভাগাভাগি


সেউতার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভাইরাল প্রবণতার কথাও উঠে আসে হামজার সঙ্গে আলাপে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বহু তরুণ নিজেদের ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন ও যাত্রার গল্প ভাগাভাগি করছিলেন।


এসব পোস্টে প্রায়ই ব্যবহার করা হতো ‘হাররাগা’ শব্দটি। উত্তর আফ্রিকার কথ্য আরবি থেকে আসা এ শব্দের অর্থ হলো পরিচয় গোপন রাখতে অবৈধভাবে অভিবাসনের আগে নিজের পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলা মানুষ।


মরক্কোর অভিবাসনবিষয়ক পরামর্শক ও গবেষক আলী জুবেইদি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘অভিবাসীদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা ছড়াতে শুরু করল, তখন আমি ভেবেছিলাম, এটি মজা। পরে বুঝলাম, বিষয়টি সত্যি।’


আলী জুবেইদির মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছিল, তা ২০২১ সালের গণ–অভিবাসনের চেষ্টার তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। ২০২১ সালে আট হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। কেউ সীমান্তের দেয়াল টপকে, কেউ আবার মরক্কোর সৈকত থেকে সাঁতরে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।


ওই সময় পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মাদ্রিদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে মরক্কো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে সীমান্তে যেতে দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিল স্পেন।


কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের চিত্র ছিল ভিন্ন। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিজেরাই সংগঠিত হয়েছিলেন মরক্কোর তরুণেরা। এ ক্ষেত্রে মানব পাচারকারী বা দালালদের কোনো ভূমিকা ছিল না।


এর আগে সীমান্ত পার হওয়ার বেশির ভাগ চেষ্টাই করতেন সাবসাহারা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টাকারীদের বড় অংশই ছিলেন মরক্কোর নাগরিক। জুবেইদির ভাষ্য, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিচিতিও ছিল ভিন্ন।


জুবেইদি বলেন, ‘সাধারণত যাঁরা অবৈধভাবে অভিবাসনের চেষ্টা করেন, তাঁরা মরক্কোর তরুণ, দীর্ঘদিন রাস্তায় থাকছেন, কাজ নেই, পরিবারের সহায়তা পান না—এমন সব ব্যক্তি। কিন্তু সেপ্টেম্বরে আমরা এমন অনেককে দেখেছি, যাঁদের চাকরিবাকরি আছে ও মাসে ৪–৫ হাজার দিরহাম (প্রায় ৪৫০ মার্কিন ডলার) আয়ও করেন।’


জুবেইদির মতে, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ ছিল হতাশা ও অসন্তোষ।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি ও বাস্তবতায় বিপুল ফারাক


হামজার জন্মশহরের বাসিন্দাদের কাছে নিজ দেশ মরক্কো ছেড়ে বিদেশে যাওয়া এক বড় স্বপ্ন। এর পেছনেও রয়েছে একই কারণ। হামজা বলেন, এখানকার তরুণদের আলোচনার মূল বিষয়ই বিদেশে যাওয়া।


ফোনে আরও কিছু পোস্ট দেখান হামজা। সেখানে সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পারা মানুষদের অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্পেনে ঢোকার জন্য মানব পাচারকারীদের অর্থ দিতে বছরের পর বছর কাজ করেছেন।


এ সময় কথোপকথনে যোগ দেন হামজার এক বন্ধু। তিনি বলেন, ‘আমি এমন মানুষকে চিনি, যাঁরা মরক্কো থেকে সেউতার সাত কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অনুশীলন করেছেন।’


ইউরোপে যেতে সফল হওয়া ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয়। সেখানে ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে তোলা সেলফির পাশাপাশি দেখা যায় পার্টির নানা ভিডিও।


তবে হামজা জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সেই জীবনের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। তিনি বলেন, দেখলে মনে হয়, সবাই জীবনের সেরা সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা তো তাঁদের রাস্তায় ঘুমানোর ছবিগুলো পোস্ট করেন না।


সেউতা সীমান্তের কোল ঘেঁষে থাকা এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশের তরুণদের কাছে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নটা একেবারে হাতের নাগালের বিষয় ছিল। মরক্কোর তাঞ্জার-তেতোয়ান অঞ্চলে বসবাসকারী বাসিন্দাদের এক বড় অংশই এভাবে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছে।


কোভিড-১৯ মহামারির পর সীমান্ত–বাণিজ্য ও সীমান্ত পেরিয়ে কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে স্পেনের সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন।


অস্থায়ী হিসেবে শুরু হওয়া এসব বিধিনিষেধ পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও মরক্কোর মধ্যে হওয়া বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়। ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে অভিবাসন ঠেকানো এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বিনিময়ে মরক্কোকে ৫০ কোটি ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রাসেলস।


মরক্কোর সঙ্গে এ সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরূপ চুক্তিগুলো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরণার্থীদের ইউরোপে পৌঁছানো ঠেকাতে ইইউ জেনেশুনেই মরক্কোসহ তৃতীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।


২০২২ সালের জুনে স্পেনের মেলিইয়া শহরের সীমান্তে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাকে এসব নীতির ক্ষতিকর প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে উত্তেজনার জেরে ওই ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন নিহত হন।


এসব নীতির মানবিক মূল্য সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে ফেনিদেকে। আগে প্রতিদিন হাজারো মরক্কোর বাসিন্দা কাজের জন্য সেউতায় যাতায়াত করতেন। সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাটিতে বেকারত্ব বেড়ে যায়। গত পাঁচ বছরে ফেনিদেকের মানুষের আয় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।


‘সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম’


এমদিক–ফেনিদেক প্রদেশেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ১৭ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী বুশরা আবজাইউর মতে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর তৈরি হওয়া হতাশা মানুষকে ইউরোপে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে।


মিডল ইস্ট আইকে এই স্কুলছাত্রী বলেন, ‘মরক্কোতে তরুণদের পরিস্থিতি খুব কঠিন। আমার আশপাশে যাদের দেখি, প্রায় সবাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।’


বুশরার ভাই ২০২১ সালের গণ–অভিবাসনের সময় মরক্কো ছেড়েছিলেন। চার বছর পরও স্পেনে টিকে থাকার সংগ্রাম করছিলেন তিনি। বহুবার তাঁকে রাস্তায় রাত কাটাতে হয়েছে। তারপরও তাঁর তথাকথিত ‘সফলতার গল্প’ অনুপ্রাণিত করেছে বুশরার এক চাচাতো ভাইকে, যিনি গত সেপ্টেম্বরে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেন।


এখন সেউতার একটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ১৭ বছর বয়সী ইব্রাহিম (ছদ্মনাম) জানায়, সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আহ্বান দেখে বা কোনো পরিকল্পনা করে সীমান্ত পার হয়নি। সে বলেন, ‘আমি ফেনিদেকের বাসিন্দা। সীমান্তে প্রতিদিন কী হয়, আমি নিজের চোখেই দেখি। আলাদা করে আর কিছু জানার দরকার হয় না।’


ইব্রাহিমের ভাষায়, ‘মরক্কো ভেঙে পড়েছে। দারিদ্র্যই আমাকে সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করেছে।’


ইব্রাহিম যেদিন সেউতার উদ্দেশে সাঁতরে রওনা দেয়, সেদিন স্পেন–মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন আকাশ ছিল মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন। সাত কিলোমিটারের সেই যাত্রার কথা স্মরণ করে সে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, জীবনে এমন সুযোগ আর না–ও আসতে পারে।’ সে আরও বলে, ‘আমার কাছে সাঁতারের কোনো সরঞ্জাম ছিল না। পথও চিনতাম না। তবু সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম।’


ইব্রাহিম ভাগ্যবান ছিল। কিন্তু গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহরের উপকূলের কাছে তাঁদের মরদেহ ভাসতে দেখা যায়।


ওই সময় অনেকে আবার মরক্কো পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পরে বাসে করে তাঁদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেউতাভিত্তিক স্প্যানিশ বেসরকারি সংস্থা ‘নো নেম কিচেন’– এর মুখপাত্র ফ্রানচেসকা ফুসারো মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানান।


ফুসারো বলেন, তরুণেরা যাতে আবার সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা না করেন, সে জন্য মরক্কো কর্তৃপক্ষ নিয়মিতই এ পদ্ধতি অনুসরণ করে।


ইব্রাহিমের ভাষায়, সমুদ্রে কাটানো সেই কয়েক ঘণ্টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। বলে, ‘আমার মনে হচ্ছিল, জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো মারা যাব। তখন ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম, প্রিয়জনদের কথা ভাবছিলাম। বিশেষ করে বারবার মনে পড়ছিল মায়ের কথা।’


এদিকে সেউতায় গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ২৪ ঘণ্টায় অর্ধলাখের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেন। স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পার হতে গিয়ে এ সময় অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সীমান্তের স্পেন অংশে উদ্ধার করা হয় ৫৭ জনের মরদেহ। মরক্কোর দিকেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।


সর্বব্যাপী ‘দমন-পীড়ন’


মরক্কোর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক খালিদ মুনার মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছে, তা শুধু উন্নত জীবনের খোঁজে তরুণদের দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ নয়। বলেন, ‘এটি একধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তরুণেরা অভিবাসনকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মরক্কোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।’


খালিদ মুনা বলেন, দমন-পীড়নের মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তরুণদের জন্য শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। তাঁর ভাষায়, জনপরিসরে দমন-পীড়ন সব সময়ই রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণদের একত্র হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।


বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরেই মরক্কোতে মানবাধিকার দমনের অভিযোগ তুলে আসছে।


হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠন করার অধিকারের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে হাইপ্রোফাইলের মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের কারাবন্দী করা এবং হয়রানির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের ঘটনাও রয়েছে।


মুনা ও জুবেইদির মতে, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের দুর্বল অবস্থাও তরুণ মরক্কোবাসীদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে।


২০২৩ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মরক্কোর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ (প্রায় ২৫ লাখ) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। অর্থাৎ শুধু আয়ের অভাব নয়, শিক্ষা, মৌলিক অবকাঠামো, সেবাসহ নানা ক্ষেত্রেই তাঁরা বঞ্চিত।


বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আরও ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েন। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে।


বুশরার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপ সম্পর্কে যে অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। তিনি বলেন, স্পেনে পৌঁছাতে পেরেছে-এমন মানুষের গল্প আর অভিবাসনে উৎসাহ জোগানো অসংখ্য গান তরুণদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।


বুশরা বলেন, ‘মরক্কোর তরুণদের মধ্যে বারবার এমন চিন্তা ফিরে আসছে-এ নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন।’


এদিকে দক্ষিণ মরক্কোর সমুদ্রসৈকতে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন হামজা। চলতি বছর তিনি ইউরোপে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করবেন। তবে তিনি জানেন, পরিবারের সমর্থন না থাকায় তাঁর বন্ধুদের সে সুযোগ নেই।


আরও একবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের খোঁজ করেন হামজা। ইউরোপে কষ্টে দিন কাটালেও লজ্জায় তাঁরা পরিবারের সদস্য ও পরিচিত ব্যক্তিদের সামনে সুখী জীবনের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। হামজা জানেন, তাঁদের কেউ কেউ রাতে রাস্তায় ঘুমান। কিন্তু স্বজনদের চোখে তাঁরা যেন পূরণ করে ফেলেছেন ‘ইউরোপ-যাত্রার স্বপ্ন’।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : রবিবার ০২ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১০:০৩ এএম

যুক্তরাষ্ট্র আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইসরায়েলে প্রায় ১০টি অতিরিক্ত আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী (এরিয়াল রিফুয়েলিং) বিমান মোতায়েন করতে যাচ্ছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট। এ বরাতে রোববার খবর প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নতুন বিমানগুলোর বেশিরভাগই তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে অবস্থান করবে।


এর ফলে সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা ৩০টিরও বেশি মার্কিন রিফুয়েলিং বিমানের সঙ্গে নতুন বিমানগুলো যুক্ত হবে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে তথ্যটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্যে ইরানে হামলা জোরদারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।


মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি হয়েছে, যিনি প্রয়োজন হলে পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেন না। শনিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।


রুবিও বলেন, আমার মনে হয় না ইরানের শাসকগোষ্ঠী আগে কখনো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি হয়েছে। তিনি এমন একজন নেতা, যিনি বাস্তবে পদক্ষেপ নেন।


তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত দুই থেকে তিন দশক ধরে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকেই ইরানকে বিভিন্ন বিষয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান চুক্তি ভঙ্গ, বিভ্রান্তিকর কৌশল এবং প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের মতো কর্মকাণ্ড করে এসেছে।



ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ০১ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ১০:২১ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। দীর্ঘ প্রস্তুতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন, আই-২০ সংগ্রহ, আর্থিক নথি, সবকিছু সম্পন্ন করার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে ওঠে এফ-ওয়ান স্টুডেন্ট ভিসা।


সাম্প্রতিক সময়ে এই ভিসা প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন অনেক আবেদনকারীকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কেউ উদ্বিগ্ন নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট নিয়ে, কেউ আবার দূতাবাসে অতিরিক্ত তথ্য পাঠানোর সঠিক উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। আবার অনেকেই কল সেন্টারে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ছেন। এসব সমস্যার সহজ কিছু সমাধান আছে, যা আগে থেকে জানা থাকলে পুরো ভিসা প্রক্রিয়াই সহজ হতে পারে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল: অ্যানোনিমাস হলেও দিতে হবে তথ্য


নতুন নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আবেদনকারীর ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্টের তথ্য। একজন আবেদনকারীকে তার বিগত পাঁচ বছরের ব্যবহৃত সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ার লিংক ডিএস-১৬০ ফর্মে দিতে হবে। এমনকি আপনার কোনো অ্যানোনিমাস জিমেইল থাকলেও।


অনেকেই মনে করেন, যদি কোনো অ্যাকাউন্টে নিজের নাম প্রকাশ না থাকে বা সেটি অ্যানোনিমাস হয়, তাহলে সেটি উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। যে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো আবেদনকারী ব্যবহার করেন, সেগুলোর পরিচিতি বা হ্যান্ডেল সঠিকভাবে জানানো উচিত। কোনো অ্যাকাউন্ট অ্যানোনিমাস হলেও সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে। কেননা এখানে একজন ভিসা অফিসার দেখতে চান, আবেদনকারী হিসেবে আপনি কোনো তথ্য গোপন করছেন কি না। সাধারণত ইউআরএল লিংক ফর্মে উল্লেখ করতে হয়।


এছাড়াও ভালো মতো জেনে নিন কোন মাধ্যমগুলো এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তালিকায় পড়ছে। সাধারণত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, এক্স, পিনটারেস্ট এর আওতায় পড়ে। তারপরেও নিরাপদ থাকার জন্য, আপনার হোয়াটসঅ্যাপ, ৫ বছরের মধ্যে ডিলেটকৃত যদি কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে থাকে, এসব কিছুই আপনাকে সময় নিয়ে ডিএস-১৬০ ফর্মে উল্লেখ করতে হবে।


যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়ায় তথ্যের স্বচ্ছতা ও সত্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আবেদনপত্রে বা দূতাবাস থেকে তথ্য চাওয়া হলে ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের তথ্য যথাযথভাবে দেওয়াই নিরাপদ।


দূতাবাসে তথ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে কোন ই-মেইল ব্যবহার করবেন


অনেক সময় ভিসা সাক্ষাৎকারের আগে বা পরে দূতাবাস আবেদনকারীর কাছে অতিরিক্ত তথ্য বা নথি চেয়ে ই-মেইল পাঠায়। এ অবস্থায় অনেকেই বিভ্রান্ত হন, উত্তর কি যেকোনো ই-মেইল থেকে পাঠানো যাবে, নাকি নির্দিষ্ট কোনো মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে?


এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয় আবেদনকারী যে ব্যক্তিগত ই-মেইল ঠিকানা দিয়ে ভিসার আবেদন করেছেন, সেই একই ই-মেইল ব্যবহার করা। এতে পরিচয় যাচাই সহজ হয় এবং যোগাযোগে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা কমে।


অন্যদিকে, অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সেবা পরিচালনাকারী সিজিআই পোর্টালে একটি ফিডব্যাক বা রিকোয়েস্ট অপশন থাকে। যদি দূতাবাসের নির্দেশনা বা স্থানীয় ভিসা সেবার নিয়মে এই পোর্টাল ব্যবহার করার সুযোগ থাকে, তাহলে প্রয়োজনীয় তথ্য বা সমস্যার বর্ণনা সেখানে জমা দেওয়া অধিক কার্যকর একটি উপায় হতে পারে। কেননা অনেক সময় পাঠানো ই-মেইল যান্ত্রিক কারণে না পৌঁছালেও ফিডব্যাক অপশনটিতে এই সুযোগ নেই।


কল সেন্টারে যোগাযোগ না হলে বিকল্প কী


ভিসা আবেদনকারীদের একটি সাধারণ অভিযোগ হলো, কল সেন্টারে বারবার ফোন করেও অনেক সময় প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলা যায় না। বিশেষ করে ব্যস্ত মৌসুমে দীর্ঘ অপেক্ষা বা কল সংযোগ না পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করা যেতে পারে। 


যেমন: ইউএস ট্রাভেল ডকসের ওয়েবসাইটে লাইভ চ্যাট সুবিধা রয়েছে। ওয়েবসাইটে আপনার পুরো নাম এবং ই-মেইল দেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে লাইভ চ্যাটের মাধ্যমে একজন প্রতিনিধির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব।


লাইভ চ্যাটের মাধ্যমে আবেদনকারীরা সাক্ষাৎকার, নথিপত্র, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কিংবা প্রযুক্তিগত সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রেই ফোনের তুলনায় এটি দ্রুত ও সুবিধাজনক সমাধান দেয়। পাশাপাশি কথোপকথনের লিখিত রেকর্ডও থেকে যায়, যা ভবিষ্যতে প্রয়োজনে কাজে লাগতে পারে।


মোটরসাইকেল নিয়ে পালাতে গিয়ে ডিগবাজি খেয়ে ছিটকে পড়ে চোর

  • প্রকাশ : শনিবার ০১ আগস্ট, ২০২৬, সময় : ৯:৩০ পিএম

কপাল মন্দ! মোটরসাইকেল চুরি করে দ্রুত সটকে পড়ার চেষ্টার সময় অতিরিক্ত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশেই একটি দেওয়ালে ধাক্কা লাগে মোটরসাইকেলটির। দুর্ঘটনায় সড়কে ছিটকে পড়েন অভিযুক্ত চোর। সেই সুযোগে ছুটে আসা স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে ধরে পুলিশে তুলে দেয়। সম্প্রতি ঘটনাটি ঘটে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের কটক জেলার মধুপাটনা থানাসংলগ্ন এলাকায়।


পুলিশ জানিয়েছে, মধুপাটনা থানার আওতাধীন তিনিঘারিয়া নুয়াসাহি এলাকা থেকে একটি মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ রয়েছে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। মোটরসাইকেলটি নিয়ে দ্রুত পালানোর সময় তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের একটি দেওয়ালে ধাক্কা দেন।


প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনার ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে সড়কে পড়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তি। ঘটনা দেখে আশপাশের লোকজন দ্রুত সেখানে ছুটে আসেন। এরপর পালানোর সুযোগ না দিয়ে তাকে আটক করেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে মধুপাটনা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।


প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন দাবি করেন, আটক ব্যক্তিকে দেখে তাদের মনে হয়েছে তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। তবে তিনি সত্যিই অ্যালকোহলের প্রভাবে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি পুলিশ।


পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তি আগে এ ধরনের কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে


মোটরসাইকেল নিয়ে পালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা, ডিগবাজি খেয়ে ছিটকে পড়লো চোর ডিগবাজি খেয়ে ছিটকে পড়ল চোর/ ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া