জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, ব্যাংক লেনদেনের ওপর কর আরোপ এবং অতিরিক্ত সম্পদশালীদের ওপর কর বাড়ানোর বিষয়ে ভাবছে সরকার। ব্যাংক লেনদেনের ওপর কর আদায় করা যায় কিনা সে বিষয়ে কাজ করছে এনবিআর।’
আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে প্রাক-বাজেট উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘উচ্চ আয়ের ব্যক্তি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর কর বৃদ্ধি ও ব্যাংক লেনদেনে কর প্রবর্তনের চিন্তা চলছে। কর আদায়ের প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করা হবে এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এনবিআরের পক্ষে একা সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সকল সরকারি কার্যালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর আদায়ে আরও বেশি আধুনিক ও মনোযোগী হতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্টির জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবারের বাজাটের অন্যতম উদ্দেশ্য। ছোট-বড় সরকারি প্রকল্পগুলোকে ট্যাক্সের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে সিস্টেম ইন্ট্রিগেশনের পাশাপাশি কাস্টমস বন্ডের অপব্যবহার দূর করতে অটোমেশন সিস্টেম চালু করা হচ্ছে।’
আবদুর রহমান খান বলেন, ‘ভবিষ্যতে কর আদায় প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সবকিছুই ডিজিটালাইজেশন করছে। এটা হলে কমপ্লেনগুলো অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি মানুষের কাস্টমস অফিসে, ভ্যাট অফিসে, বন্ড অফিসে যেতে হবে না। ট্যাক্স প্রদানকারীরা যখন রিটার্ন সাবমিট করবে তখন উনার রিফান্ড যেটা হবে সেটা যদি সঠিক হয় তাহলে অটোমেটিক্যালি তা উনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হয়ে যাবে।’
কর ফাঁকি ও ভুয়া অডিট রিপোর্ট করা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অটোমেটিক রিটার্ন ও ভ্যাট প্রদানে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়া উদ্দিন, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞাসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সমিতির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিকেলে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট শীর্ষক আরেক আলোচনা সভায় যোগ দেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
মেট্রোরেল
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মেট্রোরেলের তিন প্রকল্প একসঙ্গে অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্প তিনটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। তিন প্রকল্পের মধ্যে দুটি হলো- জাপানের অর্থায়নে মেট্রোরেল লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর) ও লাইন-৫ নর্দার্ন (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব। অন্য প্রকল্পটি হলো- এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নের এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্প।
তিন মেট্রোরেলসহ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প সাতটি ও সংশোধিত প্রকল্প পাঁচটি।
একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি মেট্রোরেল প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে ব্রিফ করেন।
জানা গেছে, বুধবার একনেকের মূল এজেন্ডায় শুধু এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা ছিল। পরে এই প্রকল্পের সঙ্গে জাপানের অর্থায়নের সংশোধিত দুটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জাপানের অর্থায়নে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। জাপানের অর্থায়নের ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ১৩.১০ কিলোমিটার আন্ডরগ্রাউন্ডসহ ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ছে ১১৭.৬৪ শতাংশ। ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এমআরটি করিডোর নির্মাণ ও চালু করা।
শিগগির আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ রুট)। প্রকল্পের সবকিছু মোটামুটি প্রস্তুত। রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে এ মেট্রো লাইন। হাতিরঝিল অংশের লাইন যাবে টানেল দিয়ে। আফতাবনগর থেকে বাকিটা হবে উড়াল।
এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা যৌথভাবে দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের উন্নয়ন সহায়তা তহবিল (ইডিসিএফ)। প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার।
সোনার দাম কমলো
দেশের বাজারে সোনার গহনার দাম কমানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার গহনার দাম কমানো হয়েছে ২ হাজার ১৫৮ টাকা। এতে ভ্যাটসহ ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৮০ টাকা। স্থানীয় বাজারে তেজাবী সোনার দাম কমায় এই দাম কমানো হয়েছে।
আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
এদিন বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটি বৈঠকে করে এই দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীনের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম কমানো হয় ১ হাজার ১০৮ টাকা। তার আগে ৬ সেপ্টেম্বর ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম কমানো হয় ২ হাজার ২১৬ টাকা। এতে তিন দফায় ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম কমানো হলো ৫ হাজার ৪৮২ টাকা।
এখন ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৮০ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ২ হাজার ১০০ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৪৪১ টাকা।
এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৮০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ১২৩ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৫১৬ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩০৬ টাকা।
৯ সেপ্টেম্বর ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৪৯ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৪১ টাকা।
এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ৯৩৩ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৩১ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ৭০০ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২২ টাকা।
আজ সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত এই দামেই সোনার গহনা বিক্রি হয়। সোনার গহনার দাম কমানোর পাশাপাশি এখন রুপার গহনার দামও কমানো হয়েছে। ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম ১১৬ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ১৬ টাকা।
এছাড়া ২১ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম ১৭৫ টাকা কমিয়ে ৪ হাজার ৭৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম ১৭৫ টাকা কমিয়ে ৪ হাজার ৮২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির এক ভরি রুপার গহনার দাম ১১৭ টাকা কমিয়ে ৩ হাজার ৯১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে ৫০ শতাংশ কোটা কমালো সরকার
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজারে সম্ভাব্য মূল্যচাপ নিয়ন্ত্রণে সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখা থেকে আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জারি করা প্রজ্ঞাপনে আগে অনুমোদিত ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ করা সুগন্ধি চাল রপ্তানির পরিমাণ অর্ধেকে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশোধিত বরাদ্দ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং অনুমোদনের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে বৃহৎ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মাঝারি ও ক্ষুদ্র পর্যায়ের রপ্তানিকারকরাও আগের অনুমোদিত পরিমাণের অর্ধেকের বেশি সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে পারবেন না।
রপ্তানিতে যুক্ত হচ্ছে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্ত
কোটা কমানোর পাশাপাশি রপ্তানি কার্যক্রমে নজরদারি, জবাবদিহি ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে ১০টি শর্ত আরোপ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭-এর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
২. সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
৩. প্রতিটি চালান রপ্তানির আগে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের মান ও সত্যতা যাচাই করবে।
৪. প্রতিটি কনসাইনমেন্ট জাহাজীকরণের পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখায় জমা দিতে হবে।
৫. ভবিষ্যতে নতুন রপ্তানি অনুমোদনের আবেদন করলে আগের অনুমোদিত কোটার বিপরীতে প্রকৃত রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও প্রমাণ দিতে হবে।
৬. কোনো অবস্থাতেই সংশোধিত অনুমোদিত পরিমাণের বেশি চাল রপ্তানি করা যাবে না।
৭. আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য সুরক্ষায় প্রতি কেজি সর্বনিম্ন FOB রপ্তানিমূল্য ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
৮. অনুমোদন সম্পূর্ণ অহস্তান্তরযোগ্য; সাব-কন্ট্রাক্ট বা অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রপ্তানি করা যাবে না।
৯. জনস্বার্থে সরকার যে কোনো সময় কারণ দর্শানো ছাড়াই অনুমোদন বাতিল করতে পারবে।
১০. রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসনের প্রমাণ হিসেবে PRC (Proceeds Realization Certificate) দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এর আগে, দুই দফায় ২৭৮ টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১২৯টি প্রতিষ্ঠান মোট ২৪১৯ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়।
সরকারের নীতিগত অবস্থান হলো, রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হলেও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বাজারের সরবরাহ ও মূল্যস্থিতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমানো এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে মূল্য, পরিমাণ, নথিপত্র ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় রপ্তানিকারকদের অনুমোদিত সীমার মধ্যে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আগের রপ্তানি-কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে হবে।
এর ফলে সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে একদিকে যেমন নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, অন্যদিকে রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও বাড়বে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
সরকারের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করা নয়; বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রেখে নিয়ন্ত্রিত ও টেকসইভাবে সুগন্ধি চাল রপ্তানি পরিচালনা করা।
দেশের প্রথম আর্থিক সাক্ষরতা উদ্যোগ চালু করেছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি।
শিশুদের কাছে অর্থ ব্যবস্থাপনার মৌলিক ধারণাগুলো সহজ ও আনন্দদায়কভাবে পৌঁছে দিতে পুতুলনাচ বা পাপেট শো ব্যবহার করে দেশের প্রথম আর্থিক সাক্ষরতা উদ্যোগ চালু করেছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি। গল্প বলার ঢঙে, বিনোদনের মোড়কে এবং বয়স উপযোগী উপস্থাপনায় শিশুদের কাছে অর্থ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আজ রাজধানীর খিলক্ষেতে প্রাইম টাওয়ারের মেরিনা ইয়াসমিন চৌধুরী হল অব অ্যাসপিরেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগের উদ্বোধন করা হয়। এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের ৬০তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে ইউনেসকো নির্ধারিত “মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা” প্রতিপাদ্যের আওতায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের পরিচালক মো. ইকবাল মহসীন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে মো. ইকবাল মহসীন বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কোনো চ্যারিটি নয়, বরং অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার একটি দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে পাপেট-শো এর মাধ্যমে আর্থিক সাক্ষরতার প্রচলন ঘটিয়ে প্রাইম ব্যাংক একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করার সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি প্রাইম ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং এমপাওয়ারিং ইয়ুথ উদ্যোগের প্রশংসা করেন, বিশেষ করে দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক শিক্ষা ও সম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন।
চরিত্রনির্ভর ও সহজবোধ্য গল্পের মাধ্যমে এই পাপেট শোতে সঞ্চয়, দায়িত্বশীল ব্যয়, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিংয়ের মতো মৌলিক বিষয়ে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য হলো, আর্থিক সাক্ষরতাকে অতিরিক্ত কোনো পাঠ হিসেবে না দেখিয়ে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে তুলে ধরা।
এই উদ্যোগের আওতায় প্রতি মাসের দ্বিতীয় ও চতুর্থ শনিবার বিকেল ৫টায় প্রাইম ব্যাংকের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে পাপেট শোগুলো সম্প্রচারিত হবে। প্রতিটি পর্বে বয়স উপযোগী আর্থিক ধারণা সহজ, আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক উপায়ে উপস্থাপন করা হবে, যাতে শিশু ও অভিভাবক একসঙ্গে শিখতে পারেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. নাজিম এ. চৌধুরী। বক্তব্যে তিনি বলেন, অর্থবহ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য আর্থিক সাক্ষরতা একটি অপরিহার্য ভিত্তি। শুধু ব্যাংকিং সেবার প্রবেশাধিকার যথেষ্ট নয়; সচেতনভাবে ও দায়িত্বশীলভাবে সেসব সেবা ব্যবহারের জন্য মানুষের প্রয়োজন জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা।
তিনি আরও বলেন, শিশু ও তরুণদের কাছে আর্থিক সাক্ষরতাকে আরও সহজলভ্য করতে প্রাইম ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্টুডেন্ট ব্যাংকিং, ক্যাম্পাসভিত্তিক আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং এই পাপেট শোর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সহজ ও বাস্তবসম্মতভাবে আর্থিক ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়, দায়িত্বশীল ব্যয় ও অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিশুদের বোঝাতে পারলে একটি আর্থিকভাবে সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, আর্থিক শিক্ষা হওয়া উচিত সহজবোধ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন অ্যান্ড স্কুল ব্যাংকিং এম এম মাহবুব হাসান। এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন এসইভিপি ও লায়াবিলিটি অ্যান্ড উইমেন ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান শায়লা আবেদীন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান নাবিলা খালিদ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির এসইভিপি ও ডিস্ট্রিবিউশন বিভাগের প্রধান মামুর আহমেদ; বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক দেবাশীষ রায়, লাইট অব হোপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সিইও ওয়ালিউল্লাহ ভূঁইয়া এবং টোগুমোগু প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল আরেফিন মোমেল। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রাইম ব্যাংক এবং অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রতিশ্রুতির অংশ এই উদ্যোগ। প্রাইম ব্যাংক মনে করে, শুধু আর্থিক সেবার প্রবেশাধিকারই যথেষ্ট নয়; সেই সেবা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা থাকলেই তা প্রকৃত অর্থে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
প্রাইম ব্যাংক বিশ্বাস করে, আর্থিক সাক্ষরতার সূচনা হওয়া উচিত শৈশব থেকেই। বিনোদনমূলক মাধ্যমে শিশুদের সঞ্চয়ের সুস্থ অভ্যাস, দায়িত্বশীল অর্থ ব্যয় এবং সচেতন আর্থিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দিয়ে ব্যাংকটি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়, যারা কেবল আর্থিকভাবে সচেতনই নয়, বরং ক্রমবর্ধমান জটিল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের জন্যও প্রস্তুত।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। এটা করা সম্ভব হলে বিশাল জনগোষ্ঠী এ খাতের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্যোগে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নারীদের এ খাতে যুক্ত হওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে। সৃজনশীলতার পাশাপাশি দেশের খাবার, সংগীত, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কাজকে বৈশ্বিক বাজারে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ বলেন, বিশ্বের কোনো কোনো দেশের অর্থনীতিতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ১০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ ১০ শতাংশে যেতে না পারলেও ২-৩ শতাংশে নিতে পারলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ এখানে বেশি।
দেশের গ্রাম-গঞ্জের গান, খাবার ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে পণ্য হিসেবে গড়ে তুলে বিশ্ববাজারে বিক্রির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের অনেক গান ও সৃজনশীল কাজ এতদিন মনিটাইজ করা সম্ভব হয়নি। এগুলোকে সঠিক সহায়তার মাধ্যমে বাজারযোগ্য পণ্যে পরিণত করতে হবে।
তিনি বলেন, একটা ছোটখাটো গান যখন হিট হয়, একজন সাধারণ মানুষের একটা গান যখন হিট হয়ে যায়, এটা কি শত শত কোটি টাকার প্রোডাক্ট হয়ে গেল না? আমাদের মধ্যে সেটা আছে, সৃজনশীলতা আমাদের দেশের মধ্যে আছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সারদের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইসিটি খাতে কাজ করা এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সৃজনশীলতাকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে হবে।
থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ কর্মসূচির উদাহরণ দিয়ে আমির খসরু বলেন, তিনি থাইল্যান্ডে দেখেছেন গ্রামের মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে পণ্য তৈরি করছেন। কিন্তু পণ্যের মান ছিল বিশ্ববাজারে বিক্রির উপযোগী। এর পেছনে ছিল সরকারের সহায়তা, কাঁচামাল থেকে শুরু করে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং পর্যন্ত।
তিনি বলেন, গ্রামের তৈরি পণ্যগুলো প্যাকেটজাত করে বিকেলে একটি ভ্যান এসে সংগ্রহ করে সরাসরি বিমানবন্দরে নিয়ে যেত। সেখান থেকে সেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যেত। বাংলাদেশেও এমন সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হলে গ্রামের সৃজনশীল মানুষকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব মানুষের জীবনযাত্রার মান শুধু পরিবর্তন হবে না, অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অবদান রাখবে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে, রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্দেশে বলেন, শুধু ঋণ দিলেই হবে না, ঋণগ্রহীতাদের পণ্যকে আপগ্রেড করার জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করতে হবে।
অনুষ্ঠানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে অনেক সৃজনশীলতা থাকলেও আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে তারা তা কাজে লাগাতে পারেন না। আবার অনেকেই ব্যাংকে যেতে ভয় পান কিংবা ব্যাংকিং সেবায় তাদের প্রবেশাধিকার নেই। এ কারণে ‘অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্স’ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ঋণের সঙ্গে খরচ বা সুদ যুক্ত থাকলে উদ্যোক্তার মধ্যে তা আয় করে পরিশোধ করার একটি দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। অন্যদিকে অনুদানের অর্থ অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। তাই ঋণ নিয়ে লাভজনক ব্যবসা করার সক্ষমতা তৈরি করা এবং উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে তাদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, কর্মসংস্থান ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আরও ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে মোট ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং কুটিরশিল্পই বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। বড় শিল্প ও বড় প্রকল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বহু পরিবার তিন-চার প্রজন্ম ধরে একই ধরনের কাজ করে আসছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে তারা সেই পর্যায় থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না।
সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য সরকারের নেওয়া সহায়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের শুধু ঋণ নয়, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ১০০ টাকার একটি পণ্যকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার পণ্যে উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে। এসব পণ্য আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্যযোগ্য হয়ে উঠলে অ্যামাজন, আলিবাবাসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের বাজারে পৌঁছানো সম্ভব।
সংগীত, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও ওটিটি খাতের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব সৃজনশীল পণ্যের কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই। বিশ্বের মানুষ এখন বিভিন্ন দেশের গান, সংস্কৃতি ও বিনোদন উপভোগ করছে। তাই বাংলাদেশের প্রতিভাবান শিল্পী ও সৃজনশীল মানুষদেরও সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, এটা তো একটা জিডিপি, এটা অর্থনীতি। এটা কোনো চ্যারিটি না। চ্যারিটির মাধ্যমে কারও জীবনের উন্নয়ন হয় না। এটার একটা ইকোনমিক রিটার্ন পেতে হবে।
অর্থমন্ত্রী কর্মসংস্থান ব্যাংককে শুধু প্রচলিত খাতের উদ্যোক্তাদের নয়, সংগীত, সংস্কৃতি ও অন্যান্য সৃজনশীল খাতের সম্ভাবনাময় মানুষদেরও ঋণের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ফাইন্যান্সিং ইজ নট এনাফ। আপনি যে ফাইন্যান্সিংটা করছেন, যে মানুষটাকে করছেন, তার সঙ্গে আপনার একটা বন্ধন থাকতে হবে। তাকে সাপোর্ট দিতে হবে। হি ইজ আ পার্টনার, হি ইজ নট আ বোরোয়ার।
অনুষ্ঠানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা এনপিএল কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকটির এনপিএল প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি এটি আরও কমিয়ে ১-২ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এতে ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিলের পাইলট প্রকল্পের জন্য ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি কেবল একটি পাইলট প্রকল্প। প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকের মুনাফা ও প্রফিট প্লাওব্যাকের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আরও উৎসাহিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কর্মসংস্থান ব্যাংকের রয়েছে। জামানত ছাড়াই এসব জনগোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার সুযোগও রয়েছে বলে জানান তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণে সাধারণত ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নেওয়া হয়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে এ উদ্যোগটি সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। এ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হবে, যাতে তারা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে তিনটি জেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কর্মসংস্থান ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. এ এফ এম মতিউর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ২ শতাংশ সুদে তহবিল সরবরাহ করে, তাহলে কর্মসংস্থান ব্যাংক আরও কম সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে।
তিনি জানান, বর্তমানে কর্মসংস্থান ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। ব্যাংকটি কম স্প্রেডে কার্যক্রম পরিচালনা করায় ঋণের সুদের হারও তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখা হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
দুর্দশাগ্রস্থ পাঁচ ব্যাংক মিলে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আজ সোমবার থেকে অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করেছে। ঘোষিত স্কিমের বাইরে আমানতকারীদের থেকে আবেদন নিয়ে টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। অর্থ ফেরত পেতে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ঝামেলার খবর পাওয়া যায়নি। ঘোষিত স্কিমের বাইরে ১ সেপ্টেম্বর থেকে রোববার পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেন। অর্থ ফেরত দেওয়ার সুবিধার জন্য টাকা ছাপিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে রোববার পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
দীর্ঘ দিন ধরে আমানতকারীদের জমানো টাকা ফেরত দিতে না পারায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। ব্যাংকগুলো হলো— এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চার ব্যাংকের কতৃর্ত্ব ছিল চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদ ওরফে এস আলমের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী- ব্যাংকগুলোকে এর আগে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকার বিশেষ ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুদসহ যা এখন প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে নতুন করে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতিতে এর যে প্রভাব পড়বে তা মেনেই ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা আনতে এটা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়া বা তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পুরো অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্কিম ঘোষণা করেছে। ওই স্কিমের বাইরে ব্যক্তি আমানতকারীদের থেকে আবেদন নিয়ে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
২৫ আগস্ট সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরতে কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ থাকছে না এমন ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী আমানতের মূল অর্থ তুলতে পারবেন বলেও জানানো হয়। এরপর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক অর্থ ফেরতের বিশেষ উদ্যোগ নেয়। গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট শাখা বা উপশাখায় গিয়ে আবেদন করতে হয়েছে। আবেদন যাচাই করে পাওনা অর্থ পরিশোধ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ও মেয়াদি আমানতের মূল টাকা উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। তবে এই সুবিধার আওতায় আমানতের বিপরীতে অর্জিত বা প্রাপ্য মুনাফা পাওয়া যাবে না। কোনো গ্রাহক মেয়াদি আমানতের মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতের ক্ষেত্রে সেটিকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। হিসাব চালু রাখলে চুক্তি অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে মুনাফা দেওয়া হবে।