সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আজ মঙ্গলবার এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার আপসহীন ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রপতি তার বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্য ও অনুসারীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি দেশবাসীকে খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি সম্মান এবং তার চিরশান্তির জন্য প্রার্থনা করার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, আজ মঙ্গলবার ভোর ছয়টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
শেখ হাসিনা ও জাহেদ-উর-রহমান
শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট ও অনড় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা নিজে আসুন বা সরকার তাকে ফিরিয়ে আনুক তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো কৌশল নেই।
আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনাকে সরকার ফিরিয়ে আনতে চায় কি না এ নিয়ে কেউ কেউ যে ধরনের অনুমান করছেন, তা সঠিক নয়। ভারতের ওপর চাপ তৈরির জন্য প্রত্যর্পণের দাবি তোলা হচ্ছে এমন কোনো কৌশল সরকারের নেই। ভারত সরকারের সঙ্গে বিষয়টি শর্ত হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
তিনি বলেন, আমরা প্রায়ই বলছি, আপনি (শেখ হাসিনা) আসবেন না, আপনাকে ধরে নিয়ে আসতে চাই। আপনি আসামি, আপনি পলাতক আসামি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার এখন আর আপিল করার সুযোগ নেই। ফলে তিনি দেশে ফিরে বিচার পুনর্বিবেচনার সুযোগও পাবেন না।
জাহেদ উর রহমান বলেন, টেকনিক্যালি এখন ব্যাপারটা এ রকম তিনি আসবেন এবং তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে। আমরা তাকে ধরে আনতে চাই।
ভারতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার নিয়ে অসন্তোষ
সম্প্রতি শেখ হাসিনা ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন উল্লেখ করে এ বিষয়ে ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে সংবাদমাধ্যমে কথা বলছেন এটি সরকারের কাছে অপ্রত্যাশিত। প্রত্যর্পণ না হওয়া পর্যন্ত অন্তত তিনি যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে না পারেন, ভারত সরকারের কাছ থেকে সে বিষয়ে পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছিল বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, আমরা এক্সপেক্ট করবো ভারত সরকার, এ ব্যাপারে তাকে একটা বার (বাধা) দেবেন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ভারতে কী ধরনের মর্যাদা বা অধিকার ভোগ করছেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভারত সরকারের এ অবস্থান ‘সঠিক হচ্ছে না’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার দাবি শক্তিশালী এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের কোনো দ্বিধা নেই।
ভারত চাইলে সম্পর্ক উন্নয়নে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নে ভারত চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে একটি পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, সেটি হলো শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমে কথা বলা থেকে বিরত রাখা।
তিনি বলেন, ইন্ডিয়ান সরকার সম্পর্কটা উন্নতি করার জন্য অন্তত একটা স্টেপ ইমিডিয়েটলি নিতে পারতো, সেটা হচ্ছে তার মুখ বন্ধ রাখা। সেটা কেন নিচ্ছেন না, সেই জবাব আমার মনে হয় আমি আপনাদের কাছে চাইবো।
ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তিনি গণমাধ্যমবান্ধব এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন। একই সঙ্গে পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোকে বাংলাদেশ ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখেছে বলেও জানান তিনি।
তবে শেখ হাসিনার বক্তব্যের কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তা ভারতীয় পক্ষের বোঝা উচিত বলে মন্তব্য করেন জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় বাংলাদেশিরা হামলার শিকার হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে ভারতীয় গণমাধ্যমে কথা বলতে দেখা বাংলাদেশের মানুষের জন্য কতটা ‘ইরিটেটিং’ (বিরক্তিকর) ও ক্ষোভের তা ভারত সরকারের বোঝা উচিত।
আস্থার পরিবেশ তৈরির তাগিদ
শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিবাদলিপির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির জন্য একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে বিশ্বাস করানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে যথেষ্ট সম্পৃক্ত হতে চায়।
তিনি আরও বলেন, একটা এনভায়রনমেন্ট আসলে লাগবে আস্থার এনভায়রনমেন্ট। আমাকে কনভিন্সড হতে হবে আপনি আসলে আমার সঙ্গে যথেষ্ট এনগেজ করতে চাইছেন।
সার্বিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিকে বাংলাদেশের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হিসেবে তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, তাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে সরকারের কোনো কৌশল বা দ্বৈত অবস্থান নেই। তিনি নিজে দেশে ফিরুন কিংবা তাকে ফিরিয়ে আনা হোক- সরকার তাকে দেশে ফেরাতে চায়।
ছবি : সংগৃহীত
আগামী ১৬ ডিসেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে দু-একটি ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হবে এবং পরে ধাপে ধাপে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হলে শাহজালালের যাত্রী হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় চারগুণ বাড়বে এবং সর্বোচ্চ ২৫০টি এয়ারক্রাফট পরিচালনার অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরি হবে।
আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব তথ্য জানান বিমানমন্ত্রী।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই জানিয়ে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, নাম পরিবর্তনের বদলে তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
মন্ত্রী বলেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনার পর এই প্রকল্পের রাজস্বে বাংলাদেশের অংশ ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
যাত্রীসেবার মান নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিমান অবতরণের ১৫ মিনিটের মধ্যে যাত্রীর হাতে লাগেজ পৌঁছানো নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ব্যর্থতায় সিভিল এভিয়েশনের পক্ষ থেকে জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে।
থার্ড টার্মিনালের ৫০ শতাংশ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পরিচালনা করবে জানিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, উন্নত অবকাঠামোর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ফুটে উঠবে। পরিদর্শনের সময় বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ সাকি এবং বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
২০১৭ সালে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এই ব্যয়ের মধ্যে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে এবং বাকি অর্থ জাপানি সংস্থা জাইকার ঋণ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন হয়। তখন বেবিচক জানিয়েছিল ২০২৪ সালের মধ্যে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, যদিও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক-রহমান
ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু হচ্ছে আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিশেষ অভিযানের উদ্বোধন করবেন। ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাস ঝুঁকিপূর্ণ সময় বিবেচনায় নিয়ে এ কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আয়োজিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মোস্তফা জুলফিকার হাসান এ তথ্য জানান।
সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
কর্মসূচির আওতায় মহানগর এলাকায় সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকরা কার্যক্রম সমন্বয় করবেন। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকবেন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক এ অভিযানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি স্কাউট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), গার্ল গাইডস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হবে।
প্রতি শনিবার স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও স্থাপনায় গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেবেন। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে এমন জায়গা চিহ্নিত করা হবে। মানুষকে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতেও সচেতন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে টেলিভিশনে জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা নিয়মিতভাবে তুলে ধরতে সংশ্লিষ্টদের বলেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী তিন মাস ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আশপাশের এলাকা নিয়মিত পরিষ্কার রাখার বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. শাকিরুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ছবি : সংগৃহীত
গুগল ম্যাপে এখন বাংলাদেশের ৩৪টি জেলার বায়ুর মানসংক্রান্ত তথ্য দেখা যাচ্ছে। গুগল ম্যাপের ‘এয়ার কোয়ালিটি’ স্তরটি চালু করে কোনো স্থানের ওপর চাপ দিলে সেখানকার বায়ুমান সূচক বা একিউআই জানা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে এ উদ্যোগে তথ্য ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের বসানো পর্যবেক্ষণযন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য গুগলের ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। বায়ুর মান সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়া এবং বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে ক্যাপস।
গতকাল ৭ সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্ব নির্মল বায়ু দিবস। এ দিবসে বায়ুদূষণের তথ্য জানার সহজ উপায়ের সন্ধান দিল ক্যাপস।
রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীগুলোর একটি। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ঢাকায় বায়ুদূষণ খুব বেশি থাকে। এ সময় বৃষ্টি কম থাকে, তাই দূষণের মাত্রা হয় অত্যধিক। তবে শুধু ঢাকা নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি শহরেই বায়ুদূষণ কমবেশি আছে। আর শুধু শুষ্ক মৌসুমে নয়, দূষণ এখন থাকে প্রায় সারা বছরই। যেমন আজ মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৯টায় বিশ্বের ১২৭টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ষষ্ঠ। বায়ুর মান ছিল ১৫৭, অর্থাৎ অস্বাস্থ্যকর। বর্ষা পরের এই শরতে সাধারণত বায়ুর মান ভালো থাকে, কিন্তু এখন তা–ও থাকছে না।
বায়ুর মান যেভাবে দেখা যাবে
মুঠোফোনে গুগল ম্যাপ খুলে ‘লেয়ারস’ বা স্তরচিহ্নে চাপ দিতে হবে। এরপর ‘এয়ার কোয়ালিটি’ নির্বাচন করলে মানচিত্রের বিভিন্ন স্থান রং ও সংখ্যার মাধ্যমে চিহ্নিত হবে। নির্দিষ্ট কোনো স্থানের ওপর চাপ দিলে সেখানে বায়ুর মান কেমন, তা দেখা যাবে। বায়ুমান সূচক বা একিউআই হচ্ছে বিভিন্ন দূষকের মাত্রাকে একটি সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশের পদ্ধতি। সংখ্যা ও রং দেখে কোনো এলাকার বায়ু ভালো, মাঝারি, অস্বাস্থ্যকর বা ঝুঁকিপূর্ণ কি না, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
যে ৩৪ জেলায় পর্যবেক্ষণযন্ত্র
ক্যাপস জানিয়েছে, বায়ুর মান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানটি দেশজুড়ে পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। বর্তমানে ৩৪ জেলায় তাদের লাইভ মনিটরিং স্টেশন চালু হয়েছে। অর্থাৎ দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ জেলায় ক্যাপসের পর্যবেক্ষণযন্ত্র রয়েছে।
জেলাগুলো হলো নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, ঢাকা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার।
পর্যায়ক্রমে বাকি জেলাগুলোতেও স্টেশন বসিয়ে ৬৪ জেলা এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিটি পর্যবেক্ষণযন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর রয়েছে। এগুলো দিয়ে তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম২.৫, বস্তুকণা পিএম১০, মোট উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা টিভিওসি, বায়ুমান সূচক এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। কয়েকটি জেলার যন্ত্রে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড পরিমাপের ব্যবস্থাও রয়েছে। ক্যাপসের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশনগুলো সপ্তাহের ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে। এসব স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিট পরপর তথ্য পাঠানো হয়। তবে গুগল বিভিন্ন উৎসের তথ্য সমন্বয় করে সাধারণত ঘণ্টাভিত্তিক বায়ুমান সূচক হিসাব ও প্রদর্শন করে।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে স্টেশনগুলো বসানো হয়েছে। ক্যাপস মনে করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এভাবে কাজ করার ফলে বায়ুদূষণ নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়বে।
২৬ কোটির বেশি কর্মদিবস নষ্ট হয়
বাংলাদেশে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা গুরুতর, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (ক্রিয়া) গবেষণায়।
‘বাংলাদেশে সূক্ষ্ম কণাদূষণের জনস্বাস্থ্য প্রভাব’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেন ড্যানিয়েল নেসান, হুবার্ট থিয়েরিও ও জেমি কেলি। প্রতিবেদনটির সম্পাদক ছিলেন জোনাথন সাইডম্যান।
গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান পিএম২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটে। এসব মৃত্যুর বড় অংশ হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ফুসফুসের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেই বছরে প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ জনের মৃত্যু হয়। পিএম২.৫ বলতে বাতাসে ভাসমান ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের অতিক্ষুদ্র কণাকে বোঝায়। এসব কণা শ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। এমনকি রক্তপ্রবাহেও মিশে যেতে পারে।
ক্রিয়ার হিসাবে, পিএম২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে হাঁপানিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮২ বার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হয়। একই কারণে প্রতিবছর প্রায় ২৬ কোটি ৩০ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হয়।
সূক্ষ্ম কণাদূষণের সঙ্গে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৪৮৫টি অপরিণত বা সময়ের আগে জন্ম এবং ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৯টি কম ওজনের শিশুর জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলেছেন, বায়ুদূষণের এই প্রভাব এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ছে।
যন্ত্রের মান নিশ্চিত করার পরামর্শ
ক্যাপসের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক। তিনি বর্তমানে অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) আছেন। তিনি বলেন, গুগল ম্যাপের মাধ্যমে বায়ুদূষণের তথ্য আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। এর ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বাড়তে পারে।
তবে পর্যবেক্ষণযন্ত্রের মান ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জিয়াউল হক। তিনি বলেন, ‘যেসব যন্ত্র বসিয়ে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, সেগুলোর মান কেমন, তা দেখতে হবে। সাধারণত তুলনামূলক কম দামের যন্ত্র দিয়ে এ ধরনের কাজ করা হয়। এসব যন্ত্র তিন থেকে চার বছর পরপর বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। যন্ত্র নিয়মিত বদলানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যালিব্রেশনের ব্যবস্থা আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরও দেশের বিভিন্ন স্থানে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে উল্লেখ করে জিয়াউল হক বলেন, মাঝেমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ক্যাপসের সংগৃহীত তথ্য পাশাপাশি রেখে মিলিয়ে দেখা উচিত। এতে ক্যাপসের যন্ত্রের পাঠ কতটা নির্ভরযোগ্য, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
একই স্থানের তথ্যে পার্থক্য হতে পারে
গুগলের তথ্য অনুযায়ী, মানচিত্রে দেখানো বায়ুর মান শুধু একটি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের সরাসরি পাঠানো তথ্য নয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ স্টেশন ও বাণিজ্যিক সেন্সরের তথ্যের পাশাপাশি স্যাটেলাইটের উপাত্ত, আবহাওয়ার ধরন, যানবাহনের চাপ, অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমির আচ্ছাদনসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে বায়ুর মান নির্ধারণ করা হয়।
ফলে গুগল ম্যাপে কোনো স্থানের জন্য দেখানো বায়ুমান সূচক এবং নিকটবর্তী কোনো পর্যবেক্ষণ স্টেশনের সরাসরি পাঠের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। একটি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের তথ্য দিয়ে পুরো জেলার সব এলাকার বায়ুর মানও একই রকম বলে ধরে নেওয়া যায় না। বায়ুর মান অল্প দূরত্বের মধ্যেও বদলে যেতে পারে।
‘প্রাথমিক তথ্য ছাড়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়’
ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সাতটি ধাপ অনুসরণ করা প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে বায়ুদূষণের বর্তমান ও ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ, সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ, দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, দূষণ বাড়া বা কমার কারণ অনুসন্ধান, নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য পদ্ধতি নির্ধারণ, সময় ও ব্যয়ের ভিত্তিতে পদ্ধতিগুলোর তুলনামূলক ছক তৈরি এবং নির্বাচিত পদ্ধতি প্রয়োগের পাশাপাশি আইনের বাস্তবায়ন।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার আরও বলেন, ‘দূষণের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য না থাকলে এসব কাজের কোনোটিই ঠিকভাবে করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের জেলা শহরগুলোয় বায়ুর মান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে দূষণের উৎস ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।’ ক্যাপসের চেয়ারম্যান বলেন, ভূমিতে থাকা পর্যবেক্ষণ স্টেশন থেকে সংগৃহীত তথ্য স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও অন্যান্য উপাত্তের সঙ্গে সমন্বয় করে মানচিত্রে যুক্ত করছে গুগল। এতে এসব তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে।
গবেষণা ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ
ক্যাপস জানিয়েছে, তারা কয়েকটি সরকারি, বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। পর্যবেক্ষণযন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা এসব তথ্য নিয়ে থিসিস করতে পারবেন। পাশাপাশি তাঁদের জন্য ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরির কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
দেশের সব জেলায় নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ স্টেশন স্থাপন করা গেলে বায়ুদূষণের স্থান ও সময়ভিত্তিক পরিবর্তন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। এসব তথ্য দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা এবং নীতিনির্ধারণে কাজে লাগতে পারে। তবে তার জন্য যন্ত্রের মান, নিয়মিত ক্যালিব্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্য যাচাই এবং সংগৃহীত উপাত্তের উন্মুক্ততা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন
ধর্মীয় বিষয়ে বিভ্রান্তি নিরসনে একটি জাতীয় ওলামা পরামর্শক কমিটি গঠনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে বলে সংসদকে জানিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)। তিনি বলেন, ধর্মকে ব্যবহার করে উগ্রবাদ, চরমপন্থা ও সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রতি বজায় রাখতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সোমবার সংসদের বৈঠকে প্রশ্নোত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। চট্টগ্রাম-১৫ আসনের শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তরে ধর্মমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন মত ও পথের প্রখ্যাত আলেম-ওলামাদের সম্পৃক্ত করে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা, ধর্মীয় বিষয়ে বিভ্রান্তি নিরসন এবং সামাজিক সংঘাত প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ ও মতবিনিময়ের লক্ষ্যে উপজেলাভিত্তিক গবেষণা ও ইফতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় ওলামা পরামর্শক কমিটি গঠনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।
তিনি বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখা এবং ধর্মের অপব্যবহার রোধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। জুমার খুতবা, ধর্মীয় আলোচনা, প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময় সভার মাধ্যমে শান্তি, সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বার্তা প্রচার করা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের প্রশ্নের উত্তরে ধর্মমন্ত্রী বলেন, বর্তমান অর্থবছরে সংগৃহীত জাকাত ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক কোটি ৫৯ টাকা সরকারি জাকাত ফান্ডে আছে।
সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধান) বিলকে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ করেছে জামায়াতে ইসলামী। সোমবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশের পর মিছিল করে তারা। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জামায়াত আয়োজিত সমাবেশে দলটির সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে তা মানছে না।
মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে গিয়ে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাস করেছে। এর প্রতিবাদে বিরোধী দলের এমপিরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছেন।
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাস করে সরকার কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর করুণ পরিণতি সরকারকে ভোগ করতে হবে। মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইনকে দুর্বল করে যে বিল পাস হয়েছে, তা বিএনপির ফ্যাসিবাদী হওয়ার লক্ষণ।
জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, বিএনপি একই সঙ্গে ইসলামবিরোধী ও গণবিরোধী সরকার। মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইনকে দুর্বল করে ‘কালো আইন’ করেছে। সরকারের ফ্যাসিবাদী হওয়ার কোনো খায়েশ না থাকলে দ্রুত এসব আইন বাতিল করতে হবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপির সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন উত্তরের মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি প্রমুখ।
পর্যালোচনা দাবি হেফাজতের
‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলে’ মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার যাতে ব্যত্যয় না ঘটে, সে বিষয়ে নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। একই দাবি জানিয়েছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন।
হেফাজত আমির শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজিদুর রহমান সোমবার বিবৃতিতে বলেছেন, বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার নিরাপত্তা, সুচিকিৎসা ও সম্মানজনক জীবিকা নিশ্চিত করা প্রতিটি সন্তানের জন্য ইমানি ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলাম মা-বাবার হক আদায়কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছে। তাই জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সুরক্ষায় যে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। তবে আইনের প্রয়োগ ও শরিয়াহর সামঞ্জস্য নিয়ে আলোকপাত করে হেফাজত নেতারা বলেন, মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন, হেবা এবং মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক ফারায়েজ আইনের অধীন। সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন কোনো পদ্ধতি বা ধারা যেন মূল ইসলামী মিরাস ও হেবার বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সমালোচনা ইসলামী আন্দোলনের
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি ইসলামী শরিয়াহতে বিস্তারিত বলা হয়েছে। নতুন পদ্ধতি সংযোজনের দরকার ও সুযোগ নেই। হেবার পরে সম্পত্তি থেকে মা-বাবাকে উচ্ছেদের ঘটনা রোধ করতে সমাজে, সংস্কৃতিতে ও শিক্ষায় মা-বাবার প্রতি সম্মানের ধারণাকে গ্রোথিত করতে হবে। একই সঙ্গে মা-বাবার প্রতি কর্তব্য অবহেলাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে সমাধান সম্ভব। কিন্তু শরিয়াহকে অমান্য করা যায় না। আইনটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়।
উলামায়ে কেরাম ও আইনবিদদের সঙ্গে সংশোধনী আনতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে চরমোনাই পীরের দল। সতর্ক করে বলা হয়, সমস্যা সমাধানের নামে কোনো অবস্থাতেই শরিয়াহ অমান্য করা যাবে না।