ছবি - এআই দিয়ে বানানো।
জ্বালানি তেল, এলপিজি ও নিত্যপণ্যের চড়া দামে এমনিতেই দিশেহারা সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই সাধারণ গ্রাহকদের ঘাড়ে চেপে বসেছে বিদ্যুতের বাড়তি বিলের বোঝা। গত জুনে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৬.৬৮ শতাংশ। আবাসিক গ্রাহকদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ছয় ধাপে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করায় সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক। স্লাব পরিবর্তন হওয়ায় একটি পরিবারের জন্য নিতান্ত প্রয়োজনীয় বাতি, ফ্যান ও আনুসঙ্গিক প্রয়োজন মেটাতে যেটুকু বিদ্যুৎ লাগে সেটুকু ব্যবহারেও এখন গ্রাহককে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত চার্জ। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা প্ল্যাটফর্মে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিরক্ত হয়ে ফুঁসে উঠেছে মানুষ।
ইস্যুটি নিয়ে নওরোজের পক্ষ থেকে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। সাধারণ নাগরিকদের মনোভাব জানার চেষ্টা করেছেন। মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা নওরোজকে জানিয়েছেন তাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা।
তারা জানিয়েছেন- বর্ধিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। সাধারণ পরিবারগুলো বলছে- ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন সেই ৫০ থেকে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার করে একই রেট নির্ধারণ করতে হবে। শতকরা ৯৫ শতাংশ মানুষ নওরোজের কাছে এমন প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে অন্যান্য অতিরিক্ত যেসব খরচ যুক্ত হয় যেমন ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সেগুলোও বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গ্রাহকদের বক্তব্য- ‘নিজের টাকায় বসানো মিটারে কেন ভাড়া গুণতে হবে আমাদের।’ তাদের ভাষ্য, দেশের বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত সংস্কার বিশেষ করে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো সংস্কার না করে উল্টো গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গ্রাহকরা বলেন, সাধারণ মানুষ ২০০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ করে থাকে। এটিও যখন বাড়ানো হচ্ছে তখন আমাদের বিলাসিতার ওপর নয়, নিত্য প্রয়োজনীয় যে চাহিদা সেটার ক্ষেত্রে এই খরচ বাড়ানো হচ্ছে।
মূল্যবৃদ্ধিতে ধাপ (স্ল্যাব) পরিবর্তন
ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মাথায় জুনে এসে বাড়িয়েছে বিদ্যুতের দাম। প্রথম ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করেছে বিইআরসি। এটি সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ধাপ যারা মূলত বাতি ও একটি ফ্যান চালান। এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ।
এরপর ৭৫ ইউনিট (০ থেকে ৭৫) পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের গ্রাহক। এই ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সা। এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা;
তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর জন্য দাম ৭ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ১০ পয়সা করা হয়েছে।
চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ২ পয়সা থেকে ১৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬২ পয়সা, পঞ্চম ধাপে ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহারকারী বিদ্যুতের দাম ১২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ টাকা ০১ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ১৪ টাকা ৬১ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা করা হয়েছে।
এভাবে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকের ব্যবহৃত ইউনিটের পরিমাণ অনুযায়ী মাসিক বিলও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
চাপে প্রথম ৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকরা
ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মাসে ২০০ থেকে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর। কারণ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা আগে যে হারে বিদ্যুৎ বিল দিতেন নতুন মূল্যবৃদ্ধির পর ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য অতিরিক্ত হার আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে কেউ যদি ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাহলে পুরো ইউনিটের বিলই উচ্চ হারে গণনা করা হচ্ছে। এ কারণে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।
বিল বৃদ্ধির তুলনামূলক চিত্র
একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। আগে ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের জন্য (ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ ছাড়া) বিল আসতো ১ হাজার ২৯৫ টাকা। এর মধ্যে প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা এবং বাকি ১২৫ ইউনিটের জন্য ৭ টাকা ২০ পয়সা করে হিসাব করা হয়। এখন শুধু স্ল্যাব পরিবর্তন হওয়ায় একই পরিমাণ বিদ্যুতের বিল বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৪৪০ টাকায়। কারণ তখন পুরো ২০০ ইউনিটই উচ্চ হারে গণনা হবে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করায় ২০০ ইউনিট ব্যবহারের বিল দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৬৪০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। এতে গ্রাহকের মাসিক বিল বাড়বে ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এর বাইরে বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট যুক্ত হবে।
প্রভাব ফেলেছে ১ কোটি ৫৩ লাখ গ্রাহককে
পিডিবির হিসাব বলছে- শুধু স্ল্যাব পুনর্গঠনের কারণেই প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক বাড়তি বিলের চাপে পড়বেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪ কোটি ৩১ লাখের বেশি আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ লাইফলাইন গ্রাহক, যারা মাসে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। আরও ২২ শতাংশ গ্রাহক ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। অন্যদিকে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ গ্রাহক মাসে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। বাকি চারটি ধাপ যথাক্রমে ২০০ থেকে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ শতাংশ।
স্ল্যাব পরিবর্তনে সে কারণে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এই শ্রেণির ওপর; যারা বিলাসিতা নয় নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও কিন্তু অতিরিক্ত চার্জে বিল দিচ্ছেন। এমন গ্রাহকদের বেশিরভাগই সাধারণত বাসায় নিয়মিত একাধিক বাতি, ফ্যান, ফ্রিজ ও টিভি চালাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।
কী বলছেন গ্রাহকরা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মোখলেসুর রহমান নওরোজকে বলেন, আমার পরিবারের চারজন সদস্য। শুধু ফ্যান, লাইট ও ফ্রিজ ব্যবহার করি। এতেই আগে যে বিল আসতো সেই তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি টাকা এখন মাসিক বিলে গুণতে হচ্ছে আমাকে। অথচ আয় বাড়েনি। তাহলে কীভাবে এই অতিরিক্ত খরচ বহন করবো?
রাজশাহীর গৃহিণী লাবণী আক্তার বলছেন, বিদ্যুৎ খরচ দিন দিন লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মাসিক চার্জ যেভাবে বাড়ছে তাতে আমাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। এই অবস্থা থেকে আমরা নিষ্কৃতি চাই। আমাদের সামর্থের কথা ভেবে প্রথম ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিলে অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার করা উচিত সরকারের।
দিনাজপুরের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিলের হিসাব দেখে আমরা দিশেহারা। একদিকে বাড়ির বিদ্যুৎ খরচ, অন্যদিকে জমিতে সেচের জন্য বিদ্যুতের খরচ সব মিলিয়ে যে টাকা আসে তা জোগাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে আমাদের। এটি আমাদের ওপর এক ধরনের জুলুম। সরকারের উচিত বিদ্যুৎ বিলের লাগাম টেনে ধরা।
নীলফামারীর ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, আমার একটি তেলের মিল আছে। সরিষাসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের যে দাম সে তুলনায় তেলের যে দাম তাতে কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না আগে থেকেই। এখন বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি বাসার বিলও বেড়ে যাচ্ছে প্রতি মাসে। জানি না- ভবিষ্যতে এই মিল চালিয়ে যেতে পারবো কিনা। বিদ্যুৎ খরচ আমাদের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এই বিল কমানো উচিত সরকারের।
প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ‘অযৌক্তিক’
এদিকে প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না বলে জোরালো দাবি জানিয়েছেন রাজনৈতিক ও বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনের বক্তারা। এ ব্যাপারে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) এর নেতা, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক মেঘমল্লার বসু বলেন, প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না। দেশের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা ভেবে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সাধারণ মানুষ ২০০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ করে থাকে। এটিও যখন বাড়ানো হচ্ছে তখন তাদের বিলাসিতার উপর খরচ বাড়ানো হচ্ছে না, নিত্য প্রয়োজনীয় যে চাহিদা সেটার ক্ষেত্রে এই খরচ বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে প্রথম ২০০ ইউনিটে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে প্রথম ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের দাম এক টাকাও না বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জীবনযাত্রার খরচ কমানোর জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার মূল্য সহনশীল রাখতে হবে।
বিদ্যুতের বিলাসী ব্যবহারের ওপর এক ধরনের কর আরোপ করা যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এই ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেবে না এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে দুই থেকে তিনশ’ ইউনিটের পর প্রতি ইউনিটের জন্য বিদ্যুতের ব্যয়ের হার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। ৪০০ ইউনিট ক্রস করলে আরও বেড়ে যাবে তাতে সমস্যা নাই। কিন্তু নিত্যান্ত সামান্য যে প্রয়োজন সে বিদ্যুৎটুকুতেও যদি বাড়তি মূল্য বসানো হয় সেটি জনগণের জন্য একটি জুলুম।
নাগরিক সমাজের তীব্র বিরোধিতা
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসির গণশুনানিতে লিখিত বক্তব্যে সংস্থাটি বলেছে, দাম বাড়ানো হলে মাসের খরচ বাড়বে, একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে। এ কারণে মানুষের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে। তবে তাদের আপত্তির দিকে কর্ণপাত করেনি সরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, কী কী করলে বিদ্যুতের দাম কমানো যেতে পারে, এ পরিকল্পনা কেন নেই। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়। ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর কথা বলে না।
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার যেন মুনাফাখোর না হয়, সেটাই জনগণের প্রত্যাশা। কল্যাণের অর্থনীতি থেকে বিবেচনা করলেও বিদ্যুতের দাম কমানো যায়।
সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী মানুষকে স্বস্তি দিতে চান, আর এখানে হচ্ছে উল্টোটা। সরকার মুনাফাভোগী হতে পারে না, ব্যবসা করতে পারে না। বিইআরসির আইন সংশোধন করতে হবে। লুটপাটের বাংলাদেশ থেকে বের হতে হবে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, খরচ না কমিয়ে লুণ্ঠনের সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে সরকার। আর ঘাটতির সংকট দেখিয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। তিনি বলেন, পিডিবি দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দিতে পারে, ঘাটতি পূরণের কৌশল বলে দিতে পারে না। বিদ্যুৎ বিলের ধাপ পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। এর মানে হলো- নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা।
অধ্যাপক শামসুল আলম বিতরণ সংস্থাগুলোর এই ‘অযৌক্তিক ব্যয়’ গ্রাহকদের ওপর চাপানোর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, গত ১০-১৫ বছর ধরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দাম নিয়ে সংস্থাগুলো যে মুনাফা করেছে, তার হিসাব কোথায়? তাদের জবাবদিহিতার আওতায় না এনে খরচের দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য প্রফেসর ম. তামিম বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কেবল বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর। বিশেষ করে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিস্টেম লস, ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলো বন্ধ করার দাবি ছিল ভোক্তাদের। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর খড়্গ নামানো হলো, যা খুবই দুঃখজনক। যেখানে বিভিন্ন দেশ ক্ষুদ্র প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য বিল মওকুফের কথা বলছে, সেখানে ভর্তুকি কমানোর কথা বলে ক্ষুদ্র গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হলে স্বাভাবিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে।’
৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব
গণশুনানিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স)।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সাংবিধানিক অধিকার। এটি সেবা খাত, লাভজনক বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মানুষের পকেট কেটে টাকা নেওয়ার নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে পিডিবি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বোবা কান্না দেখার কেউ নেই, ধাপ বদল করে আরও টাকা নিতে চায়। এমন প্রস্তাব যারা দেয়, তাদের মধ্যে জনস্বার্থ নেই। তাই দাম বাড়ানো অনৈতিক।
জানা গেছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন এই কৌশল নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ধাপ (স্ল্যাব) বদল করে আয় বাড়াতে চায় সংস্থাটি। এতে কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা হারাচ্ছেন গ্রাহকদের একটি বড় অংশ। এ ছাড়া বছরে দুবার দাম সমন্বয় চায় পিডিবি।
দাম বাড়ানোর আগমুহূর্তে পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেছিলেন, আর্থিক ঘাটতির কারণে জ্বালানি (তেল, কয়লা) কেনা যাচ্ছে না, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল দেওয়া যাচ্ছে না। খরচ কমিয়েও ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। কয়েক বছরে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। জ্বালানির দাম বাড়তি। তাই বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘাটতি কমাতেই আবাসিকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধাপ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিইআরসি বলছে, উৎপাদন, সঞ্চালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ বৃদ্ধি ও অনিয়ম-দুর্নীতি দেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। যার দায়ভার বছরের পর বছর বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাকে।
এসব বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দাম বাড়ানোর ফলে মানুষের ব্যয় বাড়বে, তবে অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এটা করার সুযোগ আছে।
পাঠকের প্রতি নওরোজের ঘোষণা:
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ নানা প্ল্যাটফর্মে প্রতিবাদে সরব হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে এ নিয়ে নানা পোস্ট করছেন, কমেন্টস করছেন। জনমত বলছে- মানুষ এ থেকে নিষ্কৃতি চাচ্ছে।
আপনাদের দুর্ভোগের বিষয়টি উপলব্ধি করে নওরোজ এ ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
আপনারা নওরোজের পেজটি লাইক দিন, শেয়ার করুন এবং আপনাদের মতামত কমেন্টে আমাদের জানান। পরবর্তীতে আমরা এ ব্যাপারে ধারাবাহিক প্রতিবেদন আপনাদের সামনে তুলে ধরবো এবং আপনাদের দাবির প্রতি সোচ্চার থাকবো।
ছবি : সংগৃহীত
পবিত্র হজের ২০২৭ সালের নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। সৌদি সরকারের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হজযাত্রীদের নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের পর নিবন্ধনের সময় আর বাড়ানো হবে না। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ-২ শাখা থেকে গত ৯ সেপ্টেম্বর জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৭ সালের হজে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত কোটা ৭৮ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ হাজার ৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ২ হাজার ৬৭৬ জনের নিবন্ধনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৭ জুলাই থেকে হজের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর বাংলাদেশের চূড়ান্ত হজযাত্রীর সংখ্যা সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
এরপর চূড়ান্ত হজযাত্রীর সংখ্যার ভিত্তিতে সৌদি পর্বের অর্থ প্রেরণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসার আবেদন, টিকাদান, হজ প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
হজে গমনেচ্ছু ব্যক্তি, হজ এজেন্সি, হজ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
নিবন্ধন ও হজসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজবিষয়ক ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
বিভিন্ন দেশের কারাগারে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার ৬৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং কারাদণ্ড শেষে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থাও করছে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনগুলো। গতকাল বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে যশোর-৫ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য কাজী এনামুল হকের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের কারাগারে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার ৬৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি বা কারাগারে রয়েছেন। কোনো দেশে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করা বাংলাদেশি নাগরিকরা ওই দেশের আইনি প্রক্রিয়ার অধীন থাকেন। তাই ওই দেশের আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই সরকারকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো বন্দির আইনজীবী নিয়োগের সক্ষমতা না থাকলে আদালতের মাধ্যমে একজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশন প্রচেষ্টা চালায়। বন্দির পরিবার আলাদাভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে চাইলে মিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, কোনো ক্ষেত্রে জরিমানা পরিশোধের প্রয়োজন হলে বন্দির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জরিমানা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিটের ব্যবস্থাও করা হয়। পরিবার প্রত্যাবাসন ব্যয় বহনে অসমর্থ হলে সরকারি অর্থে ওই ব্যয় বহন করা হয়।
তিনি আরও জানান, দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় প্রটোকলসহ অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য দ্রুত ট্রাভেল পাস ইস্যুর ব্যবস্থাও করা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদেশস্থ বাংলাদেশের মিশনগুলো এসব সেবা দিয়ে থাকে।
তিনি জানান, ক্ষেত্রবিশেষে স্বাগতিক দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার জন্যও জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিক এবং মিয়ানমারে আটক তিন বাংলাদেশি জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, বিদেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শিগগির একটি পোর্টাল চালু করবে।
সূত্র: বাসস
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত-হোসেন
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রক্তসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনার অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এসব অনিয়মের প্রমাণ পান।
এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসার কাগজপত্র ও বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেন।
পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যে অভিযোগ শুনে এখানে এসেছি সেটা শতভাগ সত্যি। ডেঙ্গু শনাক্তে সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার (জমজম, সততা ও সান) থেকে লোক এসে রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে সুবিধা আছে। বাইরে থেকে লোক এসে এখান থেকে ব্লাড নিয়ে যায়, এরা কি অন্ধ? ডাক্তার আছে, চোখে দেখবে না?’
সাংবাদিকদের সামনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাগজ দেখিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি অর্থে রোগীদের পরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাইরের লোক এসে নমুনা নিয়ে যাচ্ছে। রোগীরা কেন বাইরে পরীক্ষা করাবেন সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে রোগীদের বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে। এরপরও যদি বাইরের লোক এসে রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যায় তাহলে এর সঙ্গে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের রোগী ও স্বজনরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে লিফট নিয়মিত চালু না থাকা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগী ও স্বজনদের একাধিক তলায় ছোটাছুটি করতে হওয়ার অভিযোগ করেন তারা।
এক রোগীর স্বজন বলেন, লিফট নিয়মিত চালু থাকলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য অনেক সুবিধা হতো। বর্তমানে পরীক্ষার জন্য রোগী ও স্বজনদের এক তলা থেকে আরেক তলায় যেতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন এবং রোগীদের চিকিৎসা কীভাবে চলছে, কোন কোন পরীক্ষা করানো হয়েছে এবং কোথা থেকে রিপোর্ট এসেছে এসব বিষয়ে খোঁজ নেন। এ সময় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুতি রয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে চিকিৎসা সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রতিরোধমূলক অভিযান জোরদার করার কথাও জানান তিনি। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে এ ধরনের সরেজমিন পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে নতুন ছক
‘নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬’ বাস্তবায়নে নতুন ছক তৈরি করছে সরকার। প্রজ্ঞাপন জারির পর সাতটি পৃথক এসআরওর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে আইবাস প্লাস প্লাসে চাকরিজীবীদের তথ্য হালনাগাদ করে অনলাইনে নতুন বেতন নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে পদ, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতির তথ্য অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বেতন নির্ধারণ হবে।
প্রজ্ঞাপনের খসড়া ইতোমধ্যে আইনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং শেষ হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি হবে।
এতে বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক সাত এসআরও বা বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ থাকবে। এসব আদেশে বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগ-এ সাত ক্ষেত্রের বেতন-ভাতা এবং সংশ্লিষ্ট বিধান আলাদাভাবে কার্যকরের বিষয় থাকবে।
এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণ হবে আইবাসে। এ ব্যবস্থায় প্রত্যেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অনলাইনে আইবাস প্লাস প্লাসে প্রবেশ করে চাকরি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রজ্ঞাপন জারির পরই বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন কাঠামোর প্রয়োগে যেসব কারিগরি ও প্রশাসনিক পার্থক্য রয়েছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে পৃথক এসআরও প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বাস্তবায়নের কাজ আরও স্পষ্ট হবে।
সাতটি পৃথক এসআরও-এর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো প্রয়োগের বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি আইবাস প্লাস প্লাস-এ তথ্য হালনাগাদ এবং বেতন নির্ধারণের কারিগরি প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, নবম পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর বলে সরকার জানিয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে সাতটি পৃথক এসআরও জারি করা হবে। এগুলো হলো : সিভিল বা বেসামরিক প্রশাসনের সাধারণ বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। পুলিশ বিভাগ-পুলিশ সদস্যদের বেতন, ভাতা ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এই বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক বিধান। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ-সরকারি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কাঠামো।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান-সরকারের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ-সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জন্য সংশ্লিষ্ট যৌথ বাহিনী নির্দেশনা ও বেতন কাঠামো। জুডিশিয়াল বা বিচার বিভাগ-বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা ও বিচারকদের জন্য প্রযোজ্য কাঠামো।
অর্থাৎ একটি সাধারণ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মূল কাঠামো কার্যকর হলেও বিভিন্ন শ্রেণির চাকরিজীবীর জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তারিত প্রয়োগবিধি পৃথক আদেশের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হবে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বেতন নির্ধারণের ডিজিটাল ব্যবস্থায়। অর্থ বিভাগ চাইছে সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যক্তিগত তথ্য আইবাস প্লাস প্লাস-এর আওতায় আরও পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়ে আসতে। বর্তমানে আইবাস প্লাস প্লাস সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বেতন, পেনশন, বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের অনলাইন বেতন নির্ধারণী ব্যবস্থায় জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের সুযোগও রয়েছে। এর মধ্যে পদ, গ্রেড, মূল বেতন, চাকরিতে যোগদানের তথ্য, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেডসহ প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তথ্য পূরণ ও যাচাই হয়ে গেলে নতুন পে-স্কেলের কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন ও প্রযোজ্য ভাতা কত হবে, তা সফটওয়্যারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ হয়ে যাবে।
এর ফলে প্রত্যেক কর্মচারী নিজের তথ্যের ভিত্তিতে নতুন বেতন কাঠামোয় তার আর্থিক অবস্থান জানতে পারবেন। আইবাস প্লাস প্লাস-এর বর্তমান ব্যবস্থায়ও অনলাইন বেতন বিল, জিপিএফ, ঋণ ও আয়কর-সংক্রান্ত হিসাব তৈরি এবং বেতন-পেনশন ইএফটির মাধ্যমে দেওয়ার সুবিধা রয়েছে।
নবম পে-স্কেলে গ্রেড, মূল বেতন, ভাতা, পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট ও বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীর জন্য আলাদা বিধান থাকায় বিদ্যমান সফটওয়্যারকে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের লক্ষ্য হচ্ছে-কাগজে-কলমে বেতন নির্ধারণের বদলে তথ্যভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বেতন পুনর্নির্ধারণ করা। এতে একজন কর্মচারীর বেতন নির্ধারণে হিসাবরক্ষণ অফিসে বারবার যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে ভুল হিসাব, দ্বৈত সুবিধা বা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ‘বেতন বাড়ানোর সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা থাকলে একবারেই নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করা যেত। তবে একাধিক ধাপে বাস্তবায়ন করাও বাস্তবসম্মত। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।’
ট্রেন
দেশে বর্তমানে ১৪০ কিমি.র গতিসম্পন্ন ট্রেন চলাচল করছে ৬৫ কিলোমিটার গতিতে। অথচ শুধু রেলপথ বা ইঞ্জিন-কোচ সংস্কার হলেই ট্রেনে ফেরানো সম্ভব অন্তত একশ কিলোমিটার গতি। আর গতির অভাবে সিডিউল ঠিক রাখতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলো। গতি ফিরিয়ে আনতে পারলে একই সময়ে দ্বিগুণ সংখ্যক ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হবে।
বর্তমানে রেলের যাত্রীবাহী ট্রেন রয়েছে ২৮৫টি। তার মধ্যে ১২০টি আন্তঃনগর ট্রেন। আর মাত্র ৩টি বিরতিহীন ট্রেন। সঠিক সময়ে ট্রেন পৌঁছানোই ট্রেনের যাত্রী পরিষেবার মূল বিষয়। তাছাড়া যাত্রীসেবা ও সুরক্ষার অন্যান্য কার্যক্রমও রয়েছে। কিন্তু গত দুই যুগ ধরেই রেল থেকে উধাও হয়ে গেছে ওই মূল তিনটি বিষয়ই। ফলে নিয়মে পরিণত হয়েছে ট্রেনের ঘণ্টার পর ঘণ্টার ট্রেন দেরি করে চলা। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সূত্র মতে জানা গেছে, দেশের রেলপথে কোনো ট্রেনই যথাযথ গতিতে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এদেশে ১২০ কিংবা ১৪০ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চালানো স্বপ্নের বিষয় এখনো। মূলত জরাজীর্ণ ইঞ্জিন, রুট এবং জনবল সংকট এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে রেলের ইঞ্জিন সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বেশি গতির ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ার শঙ্কা থাকে। বর্তমানে জরাজীর্ণ বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ রুট। যদিও প্রতি অর্থবছরই বরাদ্দ থাকে রেলপথের চলমান সংস্কার কার্যকর রাখতে। কিন্তু ওই বরাদ্দের বেশির ভাগই লুটপাট হয়ে যায়।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বাংলাদেমের রেলপথে মাইলের পর মাইল যথাযথ পাথর নেই। আর পুরো রেলপথের অধিকাংশ স্থানে স্লিপার, ডগস্পাইক (হুক), ফিশপ্লেট খোলা রয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে রেলওয়ে সেতুর মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিশেষ করেআখাউড়া থেকে সিলেট রেলপথ খুবই জরাজীর্ণ। ফলে ওই পথে কখনো কখনো ট্রেন চলে ৫ থেকে ১০ শতাংশ গতিতে। তাছাড়া জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রেলপথও প্রায় তিন যুগ ধরে জরাজীর্ণ। ফলে প্রায়শই ওসব লাইনে দুর্ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি রেলপথে বৈধ কিংবা অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে রেলের ২৭০টি ইঞ্জিন রয়েছে। তবে ওসব ইঞ্জিনের ৭৭ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিগত আওয়ামী সরকার প্রায় ১৬ বছরে রেলে সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও বাস্তবে তার বেশিরভাগই লোপাট হয়ে গেছে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ট্রেনের গতি বাড়ানোসহ যাত্রীদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। জরাজীর্ণ লাইন থাকায় ট্রেনে গতি উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ গতির ট্রেন হলে যাত্রীদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস বাড়তো। তাতে আয়ের পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও সুরক্ষাও বাড়তো। রেলের জন্য নতুন করে উচ্চগতির ইঞ্জিন ও কোচ কেনা হচ্ছে।
একটি সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে কক্সবাজারের ৪৮০ কিলোমিটার দূরত্বের পথপৌঁছাতে ট্রেনের ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় লাগার কথা। আর ঢাকা-পঞ্চগড়ের ৬৩৯ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমে ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় লাগার কথা। কিন্তু ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ট্রেন পৌঁছাতেই প্রায় ৯ ঘণ্টা সময় লাগছে আর পঞ্চগড়ে যেতে সময় লাগছে ১২ ঘণ্টা। ফলে ট্রেনগুলো গড়পড়তা (আন্তঃনগর, মেইল ও কমিউটার) ৫০ শতাংশ সময়ানুবর্তিতাও ধরে রাখতে পারছে না। সেক্ষেত্রে ট্রেনের গতি বাড়ানোর কার্যক্রম বাস্তবায়নে রেল সংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্তকর্তা গড়িমসি করে। অভিযোগ রয়েছে, বিলম্বে ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস মালিকদের সঙ্গে রেলওয়ে বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। তাছাড়া মালবাহী ট্রেন পরিচালনায় চলছে চরম নৈরাজ্য। যদিও বিগত অর্থবছরেও বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনেছে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল হোসেন জানান, যাত্রীবাহী ট্রেনের গতি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। গতি বাড়ানোর সঙ্গে আয় বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। গতি বাড়লে ঢাকা-যশোর ও ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে বেশি সংখ্যক ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু ইঞ্জিন ও কোচ পাওয়া যাচ্ছে না।
সংসদে মাহবুব উদ্দিন খোকন। ফাইল ছবি
আপিল বিভাগে একটি মামলায় জরিমানার আদেশ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে কথোপকথনের এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের এজলাস ত্যাগের বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।
এ ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ আখ্যা দিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগে এমন ঘটনা কী বার্তা দিচ্ছে।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, ঘটনাটি রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে কোনো অঙ্গের সঙ্গে ঘটেনি। এটি একজন আইনজীবীর আচরণের বিষয়। তবে ওই আচরণকে তিনি সমর্থন করছেন না।
বুধবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি তোলেন নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, “আমাদের সম্মানিত সংসদ সদস্য বার-এর প্রেসিডেন্ট জনাব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। উনার সাথে প্রধান বিচারপতির একটি বদানুবাদের ঘটনা ঘটে, যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি এবং সকল আপিল বিভাগের বিচারপতি তাদের এজলাস ত্যাগ করেন এবং গতকালকে তারা আর কোর্টে ফিরে আসেননি।”
মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে আপিল বিভাগ একটি মামলায় আদেশ দেয়। একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন এবং আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা (কস্ট) করা হয়।
জরিমানার টাকা ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদেশ দেওয়ার সময় আইনজীবী সুফিয়া আহামেদ আদালতে ছিলেন। তবে তার সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে এসব মামলায় যুক্ত ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন তখন আদালতে ছিলেন না।
দুপুরের পর এজলাসে গিয়ে ব্যারিস্টার খোকন প্রধান বিচারপতির কাছে ওই নারী আইনজীবীর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করেন।
তার ভাষ্য ছিল, একজন জুনিয়র ল’ইয়ার হিসেবে ৫ লাখ টাকা ‘কস্ট’ অনেক বেশি হয়ে গেছে, এটা মাফ করে দেওয়া দরকার।
ওই কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আপিল বিভাগে মামলা কমে যাওয়া এবং এর ফলে আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন।
সেই ঘটনা বর্ণনা করে ব্যারিস্টার খোকন পরে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে বললাম, যে আপনি মাননীয় প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আসলে মামলা-টামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে। আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।"
খোকনের দাবি, তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে মামলার শুনানি কমে যাওয়ার বিষয়টি বোঝানো।
তবে প্রধান বিচারপতি তখন খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই আইনজীবীদের আয় কমে গেছে–এমন কিছু খোকন বোঝাতে চাইছে কি না।
খোকন একই বক্তব্য আবার বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, তার ওই বক্তব্য ‘অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল’।
এরপর প্রধান বিচারপতি জানান, তিনি আর আদালতে দিনের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। এরপর তিনি এবং বেঞ্চের অন্য বিচারকরা এজলাস ছেড়ে উঠে যান।
সকালের ঘটনার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন জানিয়ে সংসদ সদস্য নাজিবুর বলেন, “একজন আইনজীবী বারংবার সত্যকে গোপন করে রিট করার কারণে পেনাল্টি হিসেবে জরিমানা করা হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়।”
তিনি বলেন, “মাহবুব উদ্দিন খোকন শুধু একজন আইনজীবী নন, তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সংসদের একজন সদস্য।
“এ ধরনের যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলি। জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার যে সর্বশেষ আশ্রয়স্থল, সেটা হলো বিচার বিভাগ। এ ধরনের ঘটনা জনগণকে কী মেসেজ দিচ্ছে, এটা আমাদেরকে চিন্তা করা উচিত।”
অতীতের একটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদী আমলে প্রধান বিচারপতিকে অস্ত্রের মুখে কিন্তু তার পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।”
এরপর ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’ প্রবাদটি মনে করিয়ে দিয়ে নাজিবুর বলেন, “এ ধরনের ঘটনা সে ধরনের বার্তা দিচ্ছে কিনা, এটা কিন্তু আমাদেরকে খতিয়ে দেখতে হবে।”
‘এক অঙ্গ আরেক অঙ্গের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে না’
রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টিও তোলেন নাজিবুর রহমান।
তিনি বলেন, “বিশেষ করে আমাদের রাষ্ট্রের যে তিনটি প্রধান অঙ্গ রয়েছে, বিচার বিভাগ—তার স্বাধীনতা আমরা চাই, সকলে এটার ব্যাপারে কথা বলেছে। এটা যেমন সার্বভৌম নয়, একই সাথে সংসদও সার্বভৌম নয় এবং এক্সিকিউটিভ, সেটাও সার্বভৌম নয়।”
এই সংসদ সদস্য লেন, “এই তিনটা মিলে জনগণ যে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, যেভাবে ক্ষমতা দিয়েছে, সেই ক্ষমতাকে আমাদেরকে সেইভাবে ব্যবহার করতে হবে, একটা অঙ্গ আরেক অঙ্গের উপরে কোনো প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করবে না, এটাই আমাদের জন্য প্রযোজ্য, এটাই যথার্থ।”
এ বিষয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করতে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য চান তিনি। তখন স্পিকার বলেন, সংসদ সদস্য ক্ষমতার পৃথকীকরণের প্রেক্ষাপটে আইনমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। আইনমন্ত্রী চাইলে তখনই অথবা পরে কার্যপ্রণালী বিধির ৩৫০ বিধিতে বক্তব্য দিতে পারেন।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিষয়টি ‘আলোচনার দাবি রাখে’।
তবে তিনি বলেন, “সেপারেশন অফ পাওয়ারের যে থিওরি, তা এখানে অ্যাপ্লাই করে না মাননীয় স্পিকার।”
তার ব্যাখ্যা, ঘটনাটি একজন আইনজীবীর আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সেই আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।
আইনমন্ত্রী বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের তিনটা অর্গানের কোনো অর্গানের পার্ট নয়। ইট ইজ অ্যান ইনফরমাল বডি, ইট ইজ অ্যান অ্যাসোসিয়েশন অফ দ্য মেম্বারস হু আর প্র্যাকটিসিং ইন দ্য সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ।”
তিনি বলেন, ওই আইনজীবী বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ বা শাসন বিভাগের কোনো অঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করেননি।
তবে আইনমন্ত্রী এও বলেন, “দ্যাট ডাজ নট মিন আই অ্যাম জাস্টিফাইং দ্যাট অ্যাকশন।”
আইনমন্ত্রী বলেন, আদালতে আইনজীবী ও বেঞ্চের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের ঘটনা নতুন নয়।
তিনি বলেন, “এটা অনেক সময় দেখা যায় এটা বার অ্যান্ড বেঞ্চের রিলেশনশিপের ব্যাপার। অনেক সময় মনে হচ্ছে যে আমরা ফাইট করছি বারে। কোনো সময় আদার সাইডের লইয়ারের সাথে, কোনো সময় আমরা বেঞ্চের সাথে। কিন্তু বের হওয়ার পরে আমরা কিন্তু এক হয়ে যাই।”
এ প্রসঙ্গে তিনি নিজের পেশাজীবনের একটি ঘটনার উদাহরণ দেন।
আসাদুজ্জামান বলেন, একটি মামলায় ড. কামাল হোসেন, রফিকুল হক ও ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ এক পক্ষে এবং ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ অন্য পক্ষে ছিলেন।
বিচারকের একটি প্রশ্নের পর রফিকুল হক বলেছিলেন, “আমার ৫০ বছরের প্র্যাকটিসের জীবনে আমি এরকম কোনো সাবমিশন শুনি নাই।”
এর জবাবে রোকনউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, “আমার মত মানুষের বাচ্চা ৫০ দিনে এটা শিখতে পারে, কিন্তু যাদের ব্রেন নাই তারা ৫০ বছরেও শিখবে না।”
আইনমন্ত্রী বলেন, পরে ইশতিয়াক আহমেদ তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করতে বললে রোকনউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “আপনি দালালি করবেন না।”
আদালতে এমন তর্কের পরও পরে ওই আইনজীবীদের একসঙ্গে চা খেতে দেখেছিলেন বলে সংসদে জানান আসাদুজ্জামান।
মঙ্গলবারের ঘটনার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি যেভাবে আদালত থেকে উঠে গিয়েছিলেন, তাতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর আচরণ ‘যথাযথ ছিল না’ বলে তাদের মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, “কালকে মাননীয় প্রধান বিচারপতি যেভাবে কোর্ট থেকে উঠে গেলেন, এই উঠে যাওয়াটা আমাদের কাছে নিশ্চিতভাবেই মনে হয়েছে দ্য লইয়ার হু ডেমোনস্ট্রেটেড দ্যাট কন্ডাক্ট ওয়াজ নট প্রপার।”
আইনমন্ত্রী বলেন, বুধবার প্রধান বিচারপতি আদালতে বসে আদালত অবমাননার রুল দিতে পারেন বলে তাদের ধারণা হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি।
তিনি বলেন, “সকাল ৯টায় উঠেই উনি আবার কিন্তু যথারীতি কাজ শুরু করেছেন এবং ওই লয়ারও সেই মাননীয় প্রধান বিচারপতির কোর্টে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে মামলা করেছেন বলে খবর পেয়েছি।”
ঘটনাটি সংসদে তোলার জন্য নাজিবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানান আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে কেউ ঘটাবেন না বলে আমরা প্রত্যাশা রাখি এবং এটা আমাদের সংবিধানের আর্টিকেল ২১-এ আমাদের নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব রয়ে গেছে।”
পরে সংসদে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেন মাহবুব উদ্দিন খোকন।
তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আগের দিনের ঘটনা বর্ণনা করতে চাইলে স্পিকার তাকে শুধু বিশেষ ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বলেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, “আপনার যদি বিশেষ ব্যাখ্যা থাকে তা দিন। আইনমন্ত্রী সুন্দরভাবে বলেছেন। আমি ওই বারের ক্ষুদ্র সদস্য। আপনি ওই বারের সভাপতি। আমার মনে হয়, আইনমন্ত্রী যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, মহান সংসদে তা গ্রহণযোগ্য হয়েছে। আর নতুন করে যদি যুক্ত করার না থাকে তাহলে বসুন।”
এরপরও মাহবুব উদ্দিন খোকন ঘটনার বিস্তারিত বলতে চাইলে ডেপুটি স্পিকার তাকে থামান।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, “জুডিশিয়াল বিষয়ে অভ্যন্তরীণ কথা বলা শোভা পাচ্ছে না। আইনমন্ত্রী সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আপনি বসুন।”
একপর্যায়ে সংসদ কক্ষে হইচই শুরু হলে স্পিকার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মাইক বন্ধ করে দেন।