মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, আমরা না থাকলে, এখন তোমরা সবাই জার্মান ভাষায় কথা বলতে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মান ভাষাই সুইজারল্যান্ডের চারটি সরকারি ভাষার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে ব্রাসেলস থেকে বার্লিন ও প্যারিসসহ ইউরোপের বহু রাজধানীতে তার এই বক্তব্যকে অপমানজনক, আধিপত্যবাদী ও তথ্যগতভাবে ভুল বলে মনে করা হচ্ছে।
ভাষণে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, ইউরোপ ভুল পথে এগোচ্ছে। এই বক্তব্য তিনি আগেও বহুবার দিয়েছেন। তবে ইউরোপের মাটিতে দাঁড়িয়ে মিত্র ও বন্ধুদেশগুলোর সামনে এমন মন্তব্যের ফলে ভিন্ন ও আরও তীব্র প্রভাব পড়তে পারে।
ফোরাম শেষে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি ইউরোপের আটটি দেশের ওপর আরোপের হুমকি দেওয়া নতুন শুল্ক প্রত্যাহার করছেন। তিনি বলেন, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর গ্রিনল্যান্ড ও পুরো আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে একটি ‘চুক্তির কাঠামো’ তৈরি হয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কীভাবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর সরাসরি মালিকানার ট্রাম্পের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে, তা স্পষ্ট নয়। তার প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ শুল্ক আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লক্কে রাসমুসেন কোপেনহেগেনে সাংবাদিকদের বলেন, এই ভাষণের পর পরিষ্কার যে প্রেসিডেন্টের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখনও অটুট। তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার না করার বক্তব্যকে আলাদাভাবে ‘ইতিবাচক’ বললেও সামগ্রিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ন্যাটোর এক মুখপাত্র জানান, ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলবে। এর লক্ষ্য হবে গ্রিনল্যান্ডে রাশিয়া ও চীনের কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা সামরিক উপস্থিতি ঠেকানো। তবে আলোচনার সময়সূচি বা স্থান এখনও নির্ধারিত হয়নি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই আলোচনায় অংশ নিতে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দূত স্টিভ উইটকফকে দায়িত্ব দিয়েছেন।
এর আগে দাভোসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে না। অনেকে মনে করেছিল আমি শক্তি প্রয়োগ করব, কিন্তু আমি তা করব না। আমি বলপ্রয়োগ চাই না।
ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দুই মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় একদিনের উত্থান ঘটেছে। তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বলছেন, ট্রাম্পের সুর নরম হওয়ায় উত্তেজনা কিছুটা কমলেও গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল বিরোধ এখনো মীমাংসিত হয়নি। গ্রিনল্যান্ডের সরকার এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
গতকাল বুধবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
বক্তব্যে গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাস বিকৃত করে কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোকে আক্রমণ করেছেন এবং অর্থনীতি ও নিজের রেকর্ড নিয়ে পুরোনো কিছু মিথ্যা তথ্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন।
এখানে ট্রাম্পের বক্তব্যের তথ্য-যাচাই তুলে ধরা হলো।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘যুদ্ধের পর আমরা ডেনমার্কের কাছে গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। এটি অত্যন্ত বোকামি ছিল; কিন্তু আমরা তা করেছি। আমরা এটি ফিরিয়ে দিয়েছি।’
ট্রাম্পের এ বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। এখানে তিনি সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বোঝাচ্ছিলেন; কিন্তু সেই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব বা নিয়ন্ত্রণ দেয়নি।
১৯৪১ সালে নাৎসিরা ডেনমার্ক আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনিশ রাষ্ট্রদূত এ চুক্তি করেন। চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অধিকার দেওয়া হয়।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক স্টিভেন প্রেস বলেন, ‘চুক্তিটি আইনিভাবে নড়বড়ে ছিল। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনিশ রাষ্ট্রদূত ছাড়া ডেনমার্ক রাষ্ট্রের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। ওই রাষ্ট্রদূত মূলত একটি নির্বাসিত সরকার হিসেবে কাজ করছিলেন।’
কোপেনহেগেনের ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মিকেল রুঞ্জ ওলেসেন বলেছেন, ওই রাষ্ট্রদূত একতরফাভাবে চুক্তিটি করলেও তিনি নিশ্চিতভাবেই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেননি। তিনি শুধু সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অধিকার দিয়েছিলেন।
চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের কথা একাধিকবার উল্লেখ আছে। সেখানে ডেনমার্ককে দ্বীপটির মাতৃভূমি বলা হয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি স্বীকৃতি ও সম্মানের কথা পুনর্ব্যক্ত করছে।
ওলেসেন আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখল করার সিদ্ধান্ত নিলে ডেনমার্কের কিছুই করার থাকত না; কিন্তু এর কোনো আইনি ভিত্তি থাকত না।
অধ্যাপক স্টিভেন প্রেস বলেন, ‘ট্রাম্পের বক্তব্য তখনই সঠিক বলে গণ্য হতো, ‘যদি আমরা আন্তর্জাতিক চুক্তি বা জনমতের চেয়ে নিছক পেশিশক্তিকেই সার্বভৌমত্বের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিশ্বাস করতাম।’
কিন্তু অধ্যাপক প্রেস বলেন, ‘জোর যার মুল্লুক তার—এমন পেশিশক্তির রাজনীতির বাইরে গ্রিনল্যান্ড দখল করা কিংবা এর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করার কোনো আইনি অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না।’
১৯৫১ সালেও তৎকালীন ট্রুম্যান প্রশাসন গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একটি সামরিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আবার দ্বীপটির ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়, যার বিনিময়ে তারা সেখানে কেবল সামরিক ঘাঁটি তৈরির সুযোগ পায়।
অধ্যাপক প্রেস বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বই সেখানে অতীত ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির আইনি ভিত্তি দিয়েছে।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘আমি (ক্ষমতায়) আসার আগ পর্যন্ত ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর (প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির) ২ শতাংশ ব্যয় করার কথা ছিল; কিন্তু তারা তা করত না। এমনকি বেশির ভাগ দেশ কোনো অর্থ ব্যয় করত না। বলতে গেলে ন্যাটোর শতভাগ ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হতো। আমি সেটি বন্ধ করেছি। আমি বলেছি, এটা অন্যায্য। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমি ন্যাটোর দেশগুলোকে ৫ শতাংশ ব্যয় করতে রাজি করিয়েছি এবং এখন তারা তা দিচ্ছে।’
ট্রাম্পের এই দাবিও বিভ্রান্তিকর। কয়েক বছর ধরেই তিনি ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সামরিক ব্যয়ের বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করে আসছেন। মূলত সদস্যদেশগুলো তাদের জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে সরাসরি এই জোটে অর্থ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া দেশগুলো তাদের জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজেদের সামরিক খাতে ব্যয় করতেও রাজি আছে।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের চাপের কারণে ন্যাটোর সাধারণ তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান কিছুটা কমেছে। আগে এই জোটের কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ দিত যুক্তরাষ্ট্র, যা ২০১৯ সালে ১৬ শতাংশে এবং এই মাসে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
২০১৪ সালে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে তাদের সামরিক ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছিল। ২০১৬ সালে ৩০টির বেশি দেশের মধ্যে মাত্র চারটি দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছিল। ২০২০ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটটিতে।
তবে ২০২৪ সালে ১৮টি এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ৩১টি দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। ন্যাটো কর্মকর্তারা সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পকে কিছুটা কৃতিত্ব দিলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণই দেশগুলোকে ব্যয় বাড়াতে বেশি বাধ্য করেছে।
এ ছাড়া গত বছর ট্রাম্পের জোরাজুরিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক ব্যয় ৫ শতাংশে উন্নীত করতে সদস্যদেশগুলো সম্মত হলেও ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো দেশই সেই লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘ইউরোপকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এখন রাশিয়ার কবল থেকে রক্ষা করা ছাড়া ন্যাটোর কাছ থেকে আমরা কিছুই পাইনি।’
এটি মিথ্যা। ন্যাটো তাদের ইতিহাসে মাত্র একবারই ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা’ (আর্টিকেল ৫) কার্যকর করেছিল, আর তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেন হামলার পর।
ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর আক্রমণের অর্থ তা জোটের সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারার অধীন ন্যাটোর মিত্রদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় রাডার বিমান মোতায়েন থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরে নৌবাহিনীর টহল—সবখানেই মিত্ররা পাশে ছিল।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে যুদ্ধ করতে মিত্র দেশগুলো হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিল। শুধু ডেনমার্কই ১৮ হাজার সেনা পাঠিয়েছিল, যাদের মধ্যে ২০০২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ৪৩ জন নিহত হন।
ট্রাম্পের অন্যান্য মিথ্যা দাবি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও কিছু ভুল ও ভিত্তিহীন দাবি করেছেন, যা ইতিপূর্বে নিউইয়র্ক টাইমস যাচাই করেছে—
১. ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে এসেছেন, যা সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এই অঙ্ক তাঁর নিজের হোয়াইট হাউসের হিসাবের চেয়েও দ্বিগুণ এবং এর বড় অংশই কেবল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ‘প্রতিশ্রুতি’, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
২. ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত গ্রীষ্মে তাঁর স্বাক্ষরিত রিপাবলিকান কর ও অভ্যন্তরীণ নীতি বিলে ‘সামাজিক নিরাপত্তার ওপর কোনো কর রাখা হয়নি’। এটি বিভ্রান্তিকর। কারণ, ওই আইনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা আয়ের ওপর কর কিছুটা কমানো হলেও তা পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়নি।
৩. ট্রাম্পের দাবি, চীনে কোনো বায়ুকল নেই। অথচ বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে চীনের সবচেয়ে বেশি বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
৪. জো বাইডেনের প্রশাসন ইউক্রেনকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তবে সরকারি ও স্বতন্ত্র বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত অঙ্কটি ট্রাম্পের দাবি করা অর্থের প্রায় অর্ধেক।
৫. ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন বলে দাবি করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং অন্যগুলোতে এখনো যুদ্ধ থামেনি।
৬. ট্রাম্প দাবি করেন, বাজারে মুদিপণ্যের দাম ‘কমে আসছে’। অথচ বাস্তবে এখনো নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।
৭. ট্রাম্প বলেছেন, ওষুধের দাম ৫০০ থেকে ৮০০ শতাংশ এমনকি ২০০০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সরকারি ও স্বতন্ত্র পরিসংখ্যান বলছে, ওষুধের দাম উল্টো বেড়েছে।
৮. বাইডেন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ১১ হাজার ৮৮৮ জন খুনিকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে বলে ট্রাম্প দাবি করেছেন। তাঁর এ দাবি ভুল ও বিভ্রান্তিকর। এই সংখ্যার মধ্যে এমন অভিবাসীও রয়েছেন, যাঁরা ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে দেশটিতে ঢুকেছেন।
৯. কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প দাবি করেছেন, জাহাজে তাঁর সামরিক হামলার ফলে সমুদ্রপথে মাদক পাচার ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনটি ঘটার কোনো আশঙ্কা নেই।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির
গত আগস্টের শেষের দিকে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট একটি নতুন আইন পাস করেছে। তড়িঘড়ি করে পাসকৃত এই আইনের মাধ্যমে দেশটির সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদের ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। গত বছরের নভেম্বরে সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, এই আইনের মাধ্যমে তা আরও এক ধাপ এগোল।
গত ২০ আগস্ট দেশটির জাতীয় পরিষদ ‘ডিফেন্স ফোর্সেস অব পাকিস্তান অ্যাক্ট, ২০২৪’ এবং ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১০’-এর একটি সংশোধনী অনুমোদন করে। এই দুটি আইন যৌথভাবে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ (সিডিএফ) পদের আইনি কাঠামো নিশ্চিত করেছে। গত বছরের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই পদ তৈরি করা হয়।
বিল দুটি জাতীয় পরিষদের মূল কার্যসূচিতে ছিল না। তবু সেদিন সকালে মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয়ার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা পাস হয়ে যায়। গত বছরের নভেম্বরে ২৭তম সংবিধান সংশোধনীও একইভাবে সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়ায় পাস করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের চার দিনের সংঘাতের ঠিক এক বছর পর এই আইনি পরিবর্তনগুলো আনা হলো। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৬ সালে তিন বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) মধ্যে সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে ‘চেয়ারম্যান অব দ্য জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’ (সিজেসিএসসি) পদ তৈরির পর এটিই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর উচ্চতর কমান্ড কাঠামোর সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন।
পুরোনো সিজেসিএসসি পদটি এখন বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে ‘ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স’ (ডিএফএইচকিউ), যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিডিএফ। বর্তমানে এই পদে রয়েছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, একই সঙ্গে সেনাপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
এই পরিবর্তনের পেছনে মূল যুক্তি কী এবং নতুন সদর দপ্তরে নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এ বিষয়ে সামরিক বাহিনীর তথ্য শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠালেও কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা কোনও জবাব পায়নি।
পাকিস্তানের সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই কাঠামোতে দেশটির সেনাবাহিনী এবং সেনাপ্রধান ও সিডিএফ আসিম মুনিরের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানের গুরুত্ব অনেকাংশে কমে গেছে। এ ছাড়া সামরিক বাহিনী সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সিভিল প্রশাসনের ভূমিকাও বহুলাংশে খর্ব হবে।
বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাওয়ালপিন্ডিভিত্তিক একজন অবসরপ্রাপ্ত থ্রি-স্টার জেনারেল এই ব্যবস্থাকে একটি বিধিবদ্ধ ‘চেইন অব কমান্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এখন থেকে চেইন অব কমান্ড হবে—প্রধানমন্ত্রী, তারপর সিডিএফ ও তার নতুন সদরদপ্তর, এরপর সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধানগণ এবং সবশেষে মাঠপর্যায়ের ফরমেশনগুলো।
তবে অন্যান্য কর্মকর্তাদের মতে, আদেশ প্রয়োগের ক্ষমতা না থাকলে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বিশেষ অর্থ থাকে না। অবসরপ্রাপ্ত থ্রি-স্টার জেনারেল ও সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব নাঈম খালিদ লোধি বলেন, ‘কমান্ডার যদি পুরস্কার বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে না পারেন, তবে সেই কমান্ড কার্যকর হয় না। ডিফেন্স ফোর্সেসের কমান্ডার এখন একজন প্রকৃত কমান্ডার এবং এই আইনের মাধ্যমে তা যথাযথভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপ পেয়েছে।’
লোধি আল জাজিরাকে জানান, আগের ব্যবস্থায় ‘নৌ বা বিমানবাহিনীর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আইনি সুযোগ প্রধান কর্মকর্তার ছিল না। তিনি কেবল সেনাবাহিনীর ভেতরে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, কিন্তু এখন এটি সর্বাত্মক রূপ নিয়েছে।’
সিডিএফ ও তার দপ্তরকে দেয়া নতুন এই ক্ষমতা তিন বাহিনীর মধ্যকার ভারসাম্য নষ্ট করছে কি না—তা নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
নতুন আইনের অধীনে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের’ (এনএসসি) প্রধান পদের কর্মকর্তাকে অবশ্যই সেনাবাহিনী থেকে আসতে হবে। সিডিএফ-এর সুপারিশেই নিযুক্ত হবেন তিনি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে জেনারেল সৈয়দ আমের রেজাকে প্রথম সিএনএসসি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। পূর্বে চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে দায়িত্বরত এই কর্মকর্তাকে লেফট্যানেন্ট জেনারেল থেকে পদোন্নতি দিয়ে এ পদে বসানো হয়। নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা আর এই পদে বসতে পারবেন না।
সামরিক বাহিনীর সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই পরিবর্তন নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলতে পারে। ইসলামাবাদভিত্তিক এই কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেন, ‘যেহেতু তিন বাহিনীর সব জ্যেষ্ঠ পদের পদোন্নতি ও নিয়োগ এখন সিডিএফ অনুমোদন করবেন, তাই এটি কালক্রমে অন্য দুটি বাহিনীর স্বতন্ত্র সত্তাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।’ অন্য বাহিনীর কারও মাধ্যমে নিজস্ব পদোন্নতি নির্ধারিত হলে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অবসরপ্রাপ্ত ভাইস অ্যাডমিরাল আহমেদ সাঈদের মতে, এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি নৌবাহিনীর জন্য।
এই আইনি পরিবর্তনের ফলে সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাচ্ছে কি না—তা নিয়েই সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমান আইনজীবী কর্নেল ইনাম রহিম বলেন, নতুন আইনটি নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তা সামরিক বাহিনীর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি জানান, আগে কোনও কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা অবসর দিতে হলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার কাছে সামারি পাঠাতে হতো। এখন সেই ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে সিডিএফ-এর একক এখতিয়ারে।
রহিম আল জাজিরাকে বলেন, ‘তাকে আর কোথাও কোনো ফাইল পাঠাতে হবে না। তিনি কেবল একটি চিঠি ইস্যু করবেন, আর সেই কর্মকর্তা বরখাস্ত বা অবসরে চলে যাবেন।’
ইসলামাবাদভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক যুক্তি দেন, নতুন এই আইনটি সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ড থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে’—যা গত বছরের সংবিধান সংশোধনীতেও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘সিডিএফ-কে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর অপারেশনাল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে রাজনৈতিক সরকার মূলত ২৪৩ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করছে।’
আসিম মুনির সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করার চেষ্টায় লেগেছিলেন। এই আইনের মাধ্যমে তার সেই মিশন পূর্ণতা পেল বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানে এখন প্রধানমন্ত্রীর পরেই সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয় তাকে।
এমনকি ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যখন দৌড়ঝাঁপ করছিলেন–তখন তার পাশে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার নন, বরং বেশিরভাগ সময়ই সেখানে দেখা গেছে আসিম মুনিরকে। কূটনৈতিক সার্কেলে তার এমন উপস্থিতি প্রমাণ করে, সিডিএফ-এর হাত আসলে কতদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে।
আর তিন বাহিনীর ওপর এক অর্থে তার সর্বময় ক্ষমতা পেয়ে যাওয়ার পর নৌ ও বিমানবাহিনীতে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে বলেও ধারণা বিশ্লেষকদের। সামরিক ক্ষমতাকে এভাবে কেন্দ্রীভূত করা হলে ভবিষ্যতে তা তিন বাহিনীর স্বতন্ত্র সক্ষমতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতি সিডিএফ নির্ভরতা বাহিনীগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বশূন্য করতে পারে, যা হবে ধ্বংসেরই নামান্তর।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত ও বড় আকারে কমে যাবে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৩ ডলারে নেমে আসবে। শেষ পর্যন্ত তা ২ ডলারের নিচেও নামতে পারে। এক গ্যালনে প্রায় ৩ দশমিক ৮ লিটার।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তেলের দাম দ্রুত কমবে।’ একই সঙ্গে তিনি পুনরায় সতর্ক করে বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
তবে ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩৪ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক ৩৪ ডলারে উঠেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১৫ ডলার বা ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এতে প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৬৩ ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ড বা সম্পদে নতুন করে হামলা চালালে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
এ পরিস্থিতিতে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় তেলের দামে ঝুঁকিমূল্য যুক্ত হয়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে ব্রেন্ট তেলের দাম ২৪ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্বের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে এই নৌপথে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম আরও বড় ব্যবধানে এগিয়েছে। ভলিউম ও পোশাকের ইউনিটপ্রতি মূল্য দুই দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম। কয়েক বছর ধরেই ক্রমে এ ব্যবধানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি এখন বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। তৈরি পোশাক দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশই আসে এ পণ্য থেকে।
চলতি পঞ্জিকা বছরের প্রথম সাত মাস, অর্থাৎ গত জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশ। ভিয়েতনামের কমেছে মাত্র ১ শতাংশ। বাংলাদেশের রপ্তানি কমে ৪৬৬ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৪৯৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ, সাত মাসের ব্যবধানে প্রধান বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩২ কোটি ডলার।
অন্যদিকে জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি কম হয়েছে মাত্র ১১ কোটি ডলার। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৯৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে দেশটি। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৪৬ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
অটেক্সার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে চীনের অবস্থান তৃতীয় প্রধান রপ্তানিকারক দেশের। গত আলোচ্য সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশটির পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪৫৬ কোটি ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৬৯২ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। আলোচ্য সময়ে দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ৩ শতাংশের মতো। রপ্তানি হয়েছে ২৭৪ কোটি ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে কম্বোডিয়া। রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ২৬২ কোটি ডলারের পোশাক, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৩৭ কোটি ডলার।
বছরের প্রথম সাত মাসে সারাবিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৯ শতাংশের মতো। মোট চার হাজার ১৮৩ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে দেশটি। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল চার হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। অটেক্সার তথ্য উপাত্ত বলছে, সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের দর ইউনিটপ্রতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের পোশাকের দর কমেছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ভিয়েতনামের পোশাকের কমেছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। চীনা পোশাকের কমেছে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। কেবল মেক্সিকো ও হন্ডুরাসের পোশাকের ইউনিটপ্রতি দর বেড়েছে ১৪ ও ৬ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ভারতের অবস্থান ষষ্ঠ। সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশটির পোশাক রপ্তানি কমেছে ২৬ শতাংশের মতো। রপ্তানি হয়েছে ২৪৫ কোটি ডলারের পোশাক। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৩০ কোটি ডলার।
শেখ হাসিনা ও শেখ সেলিম
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
তার মতে, শেখ সেলিম এখন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য। তাই শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিমই দলীয় সভাপতির দায়িত্ব পালনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
ছোট বোন শেখ রেহানা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন বলেও জানিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে নিজের দেশে ফেরা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বাংলাদেশের পরিস্থিতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।
এ সময় দেশে ফেরার আগ্রহ রয়েছে বলে জানান ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তবে দেশে ফিরলে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে তার। শেখ হাসিনার দাবি, দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেও তাকে হত্যা করা হতে পারে।
তার দেশে ফেরার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, প্রত্যেকেরই জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। তাই তিনি দেশে ফেরার নির্দেশনা দিয়ে কাউকে বিপদে ফেলতে চান না।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গে নয়াদিল্লির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।
তার মতে, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আঞ্চলিক বোঝাপড়া গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের জন্য জরুরি। কোনো সামরিক জোটের পরিবর্তে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ভিডিওবার্তায় কথা বলছেন মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (প্রেস) মো. তরিকুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বৈধ কাজের ভিসাহীন কর্মীদের দ্রুত দেশে ফিরে যেতে আহ্বান জানিয়েছে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশন। অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশটিতে ইমিগ্রেশন বিভাগের অভিযানের মধ্যেই হাইকমিশন বলেছে, সরকারি সুযোগ কাজে লাগিয়ে গ্রেপ্তার এড়িয়ে বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফিরে যেতে হবে। স্থানীয় সময় রোববার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে অনিয়মিত বা বৈধ নথিপত্রহীন বাংলাদেশিদের নিজ দেশে ফেরার এ আহ্বান জানানো হয়।
ভিডিও বার্তায় কথা বলেন বাংলাদেশ হাইকমিশন মালয়েশিয়ার প্রথম সচিব (প্রেস) মো. তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আপনারা হয়তো জানেন, অনিয়মিত বা ডকুমেন্টবিহীন বিদেশি অভিবাসীদের জন্য বর্তমানে মালয়েশিয়ার সরকারের মাইগ্রেশন বিভাগের একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু রয়েছে, যার নাম- মাইগ্র্যান্ট REPATRIATION PROGRAMME 2 তথা BRM 2.0।
এই কর্মসূচির আওতায় মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বা ডকুমেন্টহীন বিদেশি নাগরিক বা কর্মীরা আইনসম্মতভাবে ও নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা এই কর্মসূচির আওতায় দেশে ফিরতে চান তাদের সহজ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রথমত বৈধ ও মেয়াদযুক্ত বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকতে হবে। যাদের বৈধ পাসপোর্ট নেই বা পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে তারা বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে একটি ট্রাভেল পারমিট বা টিপি নেবেন।
এরপর দেশে ফেরার জন্য বৈধ ও নিশ্চিত বিমান টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। মালয়েশিয়ার সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, টিকিটের যাত্রার তারিখ ইমিগ্রেশনে অ্যাপয়েন্টমেন্টের কমপক্ষে পাঁচ দিন পর এবং ১৪ দিনের মধ্যে হতে হবে।
আবেদনকারীকে নির্ধারিত ইমিগ্রেশন অফিসে নিজে উপস্থিত হয়ে আবেদন করতে হবে। কোনো প্রতিনিধি বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে না।
আবেদনের সময় সঙ্গে রাখতে হবে মূল পাসপোর্ট অথবা ট্রাভেল পারমিট, পাসপোর্টের বায়োডাটা পৃষ্ঠার কপি, সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন পাসের কপি, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন উভয় পাসপোর্ট, বাংলাদেশে ফেরার বৈধ ও নিশ্চিত বিমান টিকিট।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত ফি ও প্রযোজ্য জরিমানা ইমিগ্রেশন বিভাগের অনুমোদিত পেমেন্ট পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে হবে। আবেদন করার আগে সর্বশেষ ফি ও শর্তাবলি ইমিগ্রেশন বিভাগের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নিতে হবে।
তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘মনে রাখবেন, BRM 2.0-এর আবেদন করতে কোনো দালাল, প্রতিনিধি বা তৃতীয় পক্ষকে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলে টাকা চাইলে সতর্ক থাকুন। নিজের আবেদন নিজেই করুন এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।’
প্রেস সচিব আরও বলেন, ভাই ও বোনেরা, আপনারা যদি এই কর্মসূচির আওতায় আইনসম্মতভাবে ও নিরাপদে দেশে ফিরতে চান, তাহলে শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন অফিস ও বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সর্বশেষ তথ্য জেনে নিন।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের রাজধানী দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় শিক্ষার্থীদের একটি হোস্টেল ভবন ধসে পড়ে অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছেন আরও ১৫ থেকে ২০ জন। রোববার দুপুর দেড়টার দিকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে অবস্থিত ছয়তলা ওই ভবনটি ধসে পড়ে। বেসমেন্ট ও ওপরের দিকে পাঁচতলা বিশিষ্ট ভবনটি মূলত শিক্ষার্থীদের পেয়িং গেস্ট (পিজি) হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমস)-এ নিয়ে আসার পর চারজনকে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং গুরুতর আহত অপর এক শিক্ষার্থী পরে মারা যান।
চিকিৎসার জন্য আরও তিন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একজনের হাত ও পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে, আর অন্যজন সামান্য আঘাত পেয়েছেন যাকে পর্যবেক্ষণের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া আনুমানিক ১৫-২০ জনের সন্ধানে কর্তৃপক্ষের একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত উদ্ধার অভিযান রাত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বেসমেন্ট এবং ওপরের দিকে পাঁচটি তলা বিশিষ্ট ওই ভবনটি পেয়িং গেস্ট (পিজি) থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। দুপুর দেড়টার দিকে ভবনটি ধসে পড়ার সময় বেসমেন্টে মেরামতের কাজ চলছিল।
এনডিআরএফ-এর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জীবিতদের সন্ধানে ৭০ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের (এনডিআরএফ) দুটি দল এবং একটি ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়েছে। আটকে পড়া ব্যক্তিদের শ্বাস নিতে সাহায্য করার জন্য ধ্বংসস্তূপের নিচে অক্সিজেন সিলিন্ডারও নামানো হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হোস্টেলে থাকা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই কেরালা, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা এবং তারা কাছের কলেজগুলোতে পড়াশোনা করতেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে কাজ করছে এবং ভবন ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান করছে।