বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু
সব যুদ্ধ একভাবে শুরু বা শেষ হয় না। মূলত প্রতিকূল একটি অঞ্চলে অবস্থিত একটি ছোট দেশ হিসেবে ইসরায়েলের ৭৮ বছর টিকে থাকার অন্যতম কারণ হলো- এর নেতারা অনেক আগেই এই সত্য উপলব্ধি করেছিলেন। তারা দেখেছিলেন, যুদ্ধ প্রতিরোধ করে কীভাবে বড় সাফল্য আসে। কিন্তু প্রয়োজনে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত যুদ্ধ করতে হয়।
তারা বিশ্বাস করতেন, স্বল্পমেয়াদী সংঘাতগুলো আরও অনেক মূল্যবান কিছুর ভূমিকা হওয়া উচিত। শান্তির সময়েই একটি দেশ তার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি গড়ে তুলে সবচেয়ে ভালোভাবে বিকশিত হতে পারে।
এসব কারণে, কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের সামরিক মতবাদ বিচক্ষণতার সঙ্গে (যদিও সবসময় সফলভাবে নয়) এই নীতি নির্ধারণ করেছে যে, যুদ্ধ সীমিত হওয়া উচিত এবং তা প্রতিরোধ, আগাম সতর্কতা ও চূড়ান্ত পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। তাই এটা হতাশাজনক যে ইসরায়েলের বর্তমান নেতারা সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করেছেন।
চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলিরা যখন তাদের স্বাধীনতার বার্ষিকী উদযাপন করছে তখন তারা বিভিন্ন মাত্রার তীব্রতার এমন অনেক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যা গত আড়াই বছর ধরে চলছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী চারটি রণাঙ্গনে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকা, দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ায় ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ দখল করেছে এবং পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান নির্মম দখলদারিত্বে লিপ্ত রয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে মিলে তারা সম্প্রতি ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে, যা এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় বার ঘটেছে। তাদের এই স্বল্পমেয়াদী অভিযানিক সাফল্যের পরেও, এই সংঘাতগুলো দীর্ঘায়িত করার ফলে কী সুফল আসবে তা স্পষ্ট নয় এবং এর ক্ষয়ক্ষতি বেড়েই চলেছে।
ইসরায়েল যেভাবে যুদ্ধ করে তা রক্তাক্ত ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায় এবং তার পরের দিন হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইসরায়েল কঠোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাল্টা হামলা চালায়। কিন্তু এরপর গাজা উপত্যকা এবং দক্ষিণ লেবাননে দেশটি যে কৌশল ব্যবহার করেছে, তা হাজার হাজার মানুষকে অন্যায় ভাবে হত্যার কারণ হয়েছে এবং গৃহহীন লাখ লাখ বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত রেখেছে। বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ সত্ত্বেও ইসরায়েল তার সীমান্তে থাকা হুমকিগুলো নির্মূল করতে ব্যর্থ হয়েছে। হামাস এবং হিজবুল্লাহ উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়লেও তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
এই মানবিক ও সামরিক ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৌশলগত ব্যর্থতা। ৭ অক্টোবরের ঘটনায় মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ইসরায়েল পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক বিজয় অর্জনের এক অসাধ্য লক্ষ্য খুঁজেছে। ফলস্বরূপ, দেশটি আরও সীমিত লক্ষ্যগুলো এড়িয়ে গেছে, যা অর্জনযোগ্য ছিল এবং যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ও একটি আরও স্থায়ী সমাধান গড়ে তুলতে পারতো।
এটি গাজায় হামাসকে সরিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে প্রতিষ্ঠা করার বাইডেন প্রশাসনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। হিজবুল্লাহর ক্ষমতা সীমিত করতে লেবাননের সরকারকে সাহায্য করার পরিবর্তে, এটি দেশটিকে আরেকটি যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে। সিরিয়ায় এটি নতুন সরকারের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ নষ্ট করছে। এবং আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান ও অনিয়মিত আলোচনার ওপর ইসরায়েলের কোনো প্রভাব আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েলের সমর্থকরা সঠিকভাবেই যুক্তি দেন যে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সহজ কূটনৈতিক সমাধান নেই এবং ইহুদি রাষ্ট্রটি চিরকাল সতর্ক থাকার অধিকার অর্জন করেছে। কিন্তু ইসরায়েলের অপ্রতিরোধ্য সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিজেই কোনো সমাধান নয়। এর একটি পরিণতি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন গণতন্ত্রে, বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায়, যারা একসময় ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তারা এর প্রতি ক্রমশ বৈরী হয়ে উঠেছে।
বেন-গুরিয়নের প্রসঙ্গে ফেরা
এর পেছনে বহুলাংশে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর হাত রয়েছে। তার পূর্বসূরিদের মতো তিনিও একসময় যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। আজ সম্ভবত ৭ অক্টোবরের আগে নিজের ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিতা এড়াতে উদ্বিগ্ন হয়ে, তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার’ আশায় বারবার সংঘাত বাড়িয়ে যাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে। ইসরায়েলের জেনারেলরা, যারা একসময় অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রধানমন্ত্রীদের সংযত করতে পারতেন, তারা এখন মুখ খুলতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
অক্টোবরের শেষ নাগাদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এই নির্বাচন কি কোনো নতুন কৌশল নিয়ে আসতে পারে? নির্বাচনী প্রচারণা ইসরায়েলিদের এই বিষয়ে বিতর্ক করার সুযোগ দেবে যে, এতগুলো রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা বুদ্ধিমানের কাজ কি না। তবুও ২০২৩ সালের গণহত্যার পর অনেকেই নিজেদের অনিরাপদ মনে করছেন এবং তাদের নেতাদের কাছ থেকে আসা সংযত বার্তা শুনতে নারাজ।
ভোটার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নেতানিয়াহুর মুখোমুখি হতে ভয় পান না। তারা প্রায়ই আক্রমণাত্মকভাবে সাংবিধানিক বিষয়, দুর্নীতি এবং উগ্র-ধর্মীয় স্বার্থের প্রতি তার জোটের অধীনতা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করেন। কিন্তু খুব কম লোকই এই প্রশ্ন করতে প্রস্তুত বলে মনে হয় যে, ইসরায়েলের এতগুলো যুদ্ধ এত দীর্ঘ সময় ধরে বা এত নিষ্ঠুরভাবে চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি না। প্রধান বিরোধী নেতারা কোনো জোরালো বিকল্প প্রস্তাব দেন না, বরং সামরিক অভিযানগুলো যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার মধ্যেই নিজেদের সমালোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে পছন্দ করেন।
ইসরায়েলের রাজনীতিবিদরা তাদের জনগণকে হতাশ করছেন। ভোটারদের কঠিন সত্যগুলো শোনা প্রয়োজন। ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্ম উপলব্ধি করেছিল যে যুদ্ধের অবশ্যই একটি সীমা থাকতে হবে। ইসরায়েলিদের এটা স্বীকার করতে হবে যে, ৭ অক্টোবরের ভয়াবহতার পরেও সেই সীমাগুলো এখনো বিদ্যমান।
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক মাস ধরেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত সংকুচিত হয়ে আছে। এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ-লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী বাব আল-মান্দাব প্রণালিও হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ইরানের বিধিনিষেধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথ ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা এবং লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানির পথ।
কিন্তু ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা সেই বিকল্প পথেও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে গড়ে মাত্র ১৯টিতে। বৃহস্পতিবার জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, ওই দিন মাত্র ৯টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।
ওমানের কাছাকাছি সমুদ্রপথ দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করছে মার্কিন নৌবাহিনী। তবে এ পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। জুলাই ও আগস্টে ওমানের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলে অভ্যস্ত জাহাজ মালিকদের অনেকেই এখন ওই পথে যেতে অনাগ্রহী।
এর প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানিতেও। বিশ্লেষক মিশেল ভিসে বকমানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আগস্টে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
সৌদির বিকল্প পথও চাপে
হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানিতে সৌদি আরবের একটি বড় সুবিধা হলো-দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে তেল লোহিত সাগরের বন্দরগুলোতে নেওয়া যায়।
ইরান হরমুজে চলাচল সীমিত করার পর এই পথের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। লোহিত সাগরের বন্দর থেকে জাহাজ দক্ষিণে বাব আল-মান্দাব হয়ে এশিয়ায় যেতে পারে। আবার উত্তর দিকে গিয়ে সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরেও পৌঁছানো যায়।
কিন্তু এখন বাব আল-মান্দাব নিয়েই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে হুতিরা। ইয়েমেন সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ পেরিমও দখল করেছে। এর ফলে প্রণালিটির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরির সক্ষমতা বেড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দাব পেরিয়ে মাত্র দুটি সৌদি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে।
পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও বন্ধ
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাইপলাইনটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফলে হরমুজ এড়িয়ে সৌদি তেল বিশ্ববাজারে নেওয়ার যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, সেখানেও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে তেল পরিবহনের আরেকটি পথ এখনো খোলা আছে। লোহিত সাগর থেকে জাহাজ বাব আল-মান্দাব হয়ে দক্ষিণে না গিয়ে উত্তরে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকে যেতে পারে।
সমস্যা হলো, সৌদি আরবের বড় তেল ক্রেতাদের অনেকেই এশিয়ায়। তাদের কাছে তেল পাঠাতে সুয়েজ হয়ে যাওয়ার পথ অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল।
তেলের দাম ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে
পরিবহনপথ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রভাব এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে পড়েছে। শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারেই নয়, জ্বালানির দাম বেড়েছে অন্য ক্ষেত্রেও। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে। ডিজেলের দামও ৬ ডলারের ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জন্য বিশ্ববাজারে যাওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং যেসব পথ এখনো খোলা আছে, সেগুলো ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কয়েক মাস ধরে চলা সংকট তাই এখন আর শুধু একটি নৌপথের সমস্যা নয়। বাব আল-মান্দাবেও যদি পরিস্থিতির অবনতি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ‘ব্রিকস’-এ যোগ দিতে পাকিস্তান ২০২৩ সালে আবেদন করলেও ভারতের বিরোধিতার কারণে তা আটকে রয়েছে। জোটটি গেল বছর মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নতুন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে ‘ব্রিকস প্লাস’রূপ নিলেও দিল্লির অনড় অবস্থানের কারণে ব্রিকসের বাইরেই রয়েছে ইসলামাবাদ।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, বর্তমানে যে ২৯টি দেশ ব্রিকসের সদস্য হতে চায়, তাদের মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম। মূলত তীব্র অর্থনৈতিক সংকট কাটানো এবং অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করার লক্ষ্যেই এ জোটে যোগ দিতে চায় পাকিস্তান।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।
জাপানি সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্রিকস সমর্থিত ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’-এ (এনডিবি) ৫৮ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থের শেয়ার কিনেছে পাকিস্তান।
দক্ষিণ বিশ্বের প্রভাবশালী প্লাটফর্ম হিসেবে ব্রিকসের পরিচিতি যখন বাড়ছিল, ঠিক সেই সময়েই জোটের সদস্যপদের আবেদন করে পাকিস্তান।
ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পিপিপি) নিরিখে সম্প্রসারিত এ জোট এখন বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং মোট জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে।
এনডিটিভি লিখেছে, ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের নিজস্ব বাণিজ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জোটভুক্ত দেশগুলোতে ভারতের রপ্তানি ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৬৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৯৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মুমতাজ জাহরা বালোচ জানিয়েছিলেন, পাকিস্তান বৈশ্বিক দক্ষিণের এ প্রধান জোটে যোগ দিতে চায়। তিনি বলেছিলেন, ব্রিকসের ‘বেশিরভাগ’ সদস্যের সঙ্গে পাকিস্তানের উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছে জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, ব্রিকসে যোগ দিয়ে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয়তাকে পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।”
তিনি বলেন, “আমরা এও আশা করি যে অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয়তার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার অনুযায়ী ব্রিকস পাকিস্তানের আবেদনের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।”
রাশিয়ায় নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ খালিদ জামালি রুশ সংবাদ সংস্থা তাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাকিস্তানকে সদস্যপদ পেতে সমর্থন দেওয়ার জন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়ায় রয়েছে দেশটি। বিশেষ করে রাশিয়ার কাছে সমর্থন চাওয়া হয়েছে।
এনডিটিভি লিখেছে, মস্কো ও বেইজিংয়ের সমর্থন থাকার পরও ব্রিকসে পাকিস্তানের যোগদান এখনও আটকে আছে। কারণ জোটের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়মে ভারতের বিরোধিতাই ‘দুর্ভেদ্য বাধা’ হিসেবে কাজ করছে।
ব্রিকসের নিয়ম অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ সদস্য বা অংশীদার দেশ হিসেবে নতুন কাউকে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে বর্তমান সব সদস্য দেশের সর্বসম্মত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনের এ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে বিশ্বের কয়েকটি দেশের নেতার সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
সম্মেলন ঘিরে ভূরাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি নজর কাড়ছে দুই নেতার সরকারি গাড়ি। বাইরে থেকে দেখতে দুটিই রাজকীয় লিমোজিন।
তবে নিরাপত্তার দিক থেকে এগুলো যেন চলন্ত দুর্গ। পুতিনের জন্য রয়েছে রাশিয়ায় তৈরি ‘অরুস সেনাত’, আর শি জিন পিংয়ের জন্য আনা হয়েছে চীনের ‘হংছি এন৭০১’। দুটি গাড়িই শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বিশেষভাবে তৈরি।
পুতিনের ‘অরুস সেনাত’
পুতিনের অরুস সেনাত বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় ও সুরক্ষিত সরকারি গাড়িগুলোর একটি। এটি শুধু একটি বিলাসবহুল লিমোজিন নয়; গুলির আঘাত ও বিস্ফোরণ থেকে প্রেসিডেন্টকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য গাড়িটিকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বিদেশ সফরে গেলে তার নিরাপত্তা বহরের সঙ্গে অরুস সেনাতও নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রিকস সম্মেলনের জন্যও গাড়িটি মস্কো থেকে বিশেষ বিমানে করে দিল্লিতে আনা হয়েছে।
অরুস সেনাত তৈরি করেছে রাশিয়ার অরুস মোটরস। গাড়িটির উন্নয়নের সঙ্গে দেশটির রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনএএমআই, সোলার্স জেএসসি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তাওয়াজুন হোল্ডিং যুক্ত ছিল। ২০১৮ সালে এটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। গাড়িটির নকশায় সাবেক সোভিয়েত আমলের জেডআইএস–১১০ লিমোজিনের ছাপ রয়েছে।
গুলি ও বিস্ফোরণ ঠেকানোর ব্যবস্থা
পুতিনের ব্যবহৃত অরুস সেনাতের প্রকৃত নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তবে গাড়িটিতে ভারী বর্ম, গুলিরোধী কাচ এবং বিস্ফোরণ প্রতিরোধী কাঠামো রয়েছে বলে জানা যায়।
গাড়িটির বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা শুধু গুলির আঘাত ঠেকানোর জন্য নয়, বিস্ফোরণের অভিঘাত থেকেও ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য তৈরি। এ ছাড়া গাড়িটিতে রয়েছে উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি। এর মধ্যে সক্রিয় ক্রুজ নিয়ন্ত্রণ, লেন থেকে গাড়ি সরে গেলে সতর্কবার্তা, ট্র্যাকশন নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত ব্রেকিং ব্যবস্থা রয়েছে।
সাধারণ ক্রেতার জন্যও অরুস
অরুস সেনাতের একটি বেসামরিক সংস্করণও রয়েছে। তবে সেটির উৎপাদন সীমিত। বছরে প্রায় ১২০টি গাড়ি তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলে বিভিন্ন তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি সংস্করণের তুলনায় সাধারণ সংস্করণে নিরাপত্তাব্যবস্থা কম হলেও বিলাসিতা ও প্রযুক্তির দিক থেকে এটি রাশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গাড়িগুলোর একটি।
শি জিন পিংয়ের ‘হংছি এন৭০১’
পুতিনের অরুসের মতোই সি চিন পিংয়ের হংছি এন৭০১-ও চীনের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক।
চীনা ভাষায় ‘হংছি’ শব্দের অর্থ ‘লাল পতাকা’। গাড়িটি তৈরি করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এফএডব্লিউ গ্রুপ। ১৯৫৮ সাল থেকে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য হংছি ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরি হয়ে আসছে।
হংছি এন৭০১ প্রায় ৫ দশমিক ৫ মিটার বা ১৮ ফুট দীর্ঘ। এর প্রকৃত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বেশির ভাগই গোপন রাখা হয়েছে।
হংছিতেও ভারী বর্ম
হংছি এন৭০১-এর বহিরাবরণে ভারী বর্ম এবং গুলিরোধী কাচ ব্যবহারের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গাড়িটির বিশেষ চাকা ও টায়ারও হামলার পর চলতে সক্ষম করার জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে জানা যায়।
গাড়িটির কেবিনে বাইরের রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থের আক্রমণ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব ব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য চীনা কর্তৃপক্ষ বা নির্মাতা প্রকাশ করেনি।
চীনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক দশকে এ মডেলের মাত্র প্রায় ৫০টি গাড়ি তৈরি করা হতে পারে। অর্থাৎ এটি সাধারণ বাজারের গাড়ি নয়; মূলত রাষ্ট্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যবহারের জন্যই তৈরি।
বিদেশ সফরে নিজের গাড়ি
আগে বিদেশ সফরে চীনের শীর্ষ নেতারা অনেক সময় আয়োজক দেশের সরবরাহ করা গাড়ি ব্যবহার করতেন। শি জিন পিং সেই রীতিতে পরিবর্তন এনেছেন। এখন তিনি বিদেশ সফরে গেলে নিজের সাঁজোয়া গাড়ি বিমানে করে সঙ্গে নিয়ে যান।
রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর সফরেও তার সরকারি গাড়ি সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল। দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনেও হংছি এন৭০১ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
দুই গাড়ি, দুই দেশের বার্তা
পুতিনের অরুস সেনাত ও সি চিন পিংয়ের হংছি এন৭০১-দুটি গাড়ির মধ্যেই একটি মিল স্পষ্ট। দুটিই শুধু রাষ্ট্রপ্রধানের যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং নিজেদের দেশের প্রযুক্তি, শিল্প সক্ষমতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রদর্শনী।
রাশিয়ার অরুস যেমন পশ্চিমা বিলাসবহুল গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের রাষ্ট্রীয় গাড়ি তৈরির সক্ষমতার প্রতীক, তেমনি হংছি এন৭০১ চীনের নিজস্ব প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি।
ব্রিকস সম্মেলনে একই শহরে যখন পুতিনের অরুস ও সি চিনের হংছি পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, তখন দুটি গাড়িই যেন দুই পরাশক্তির নীরব কূটনৈতিক বার্তা-নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় তারা নিজেদের শক্তি দেখাতে প্রস্তুত।
ব্রিকস সম্মেলনের আগে শুক্রবার নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৈঠক করেন
নয়া দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকট নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একইসঙ্গে সমুদ্রপথে অবাধ জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি।
শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের আগে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা করেন মোদী।
এনটিভি লিখেছে, দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল দুই নেতার দ্বিতীয় বৈঠক।
এর আগে ৩১ অগাস্ট কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে তাদের বৈঠক হয়েছিল।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নাবিকদের নিরাপত্তা এবং নিরাপদ সমুদ্রপথ নিশ্চিত করাও দেশটির অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
এনটিভি লিখেছে, বৈঠকে মোদী ইরানের ব্রিকস-সংক্রান্ত বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর এবং ব্রিকস কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছে নয়াদিল্লি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ হিসেবে ভারত শুরু থেকেই ‘সংলাপ ও কূটনীতি’র ওপর জোর দিয়ে আসছে।
একইসঙ্গে দেশটির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের বিষয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়। এর জবাবে পশ্চিম এশিয়ার যেসব দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটি রয়েছে সেখানে হামলা চালায় ইরান।
পশ্চিম এশিয়ার এ সংঘাতের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে উল্লম্ফন ঘটে।
ছয় মাস ধরে চলা এ সংঘাত বন্ধে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইরানের ওপর। পাল্টা অবরোধ করেছে হরমুজ প্রণালি।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ভারতসহ এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোও জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিতে পড়ে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ভারতীয় নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনাও নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ কারণেই মোদী বৈঠকে নাবিকদের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
ব্রিকসে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের আহ্বান পেজেশকিয়ানের
এর আগে শুক্রবার ব্রিকস বিজনেস ফোরামে পেজেশকিয়ান সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিশ্ব বর্তমানে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কোনো একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে ব্রিকসকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, বৈধ বাণিজ্য যেন কোনো একটি দেশ আর্থিক ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে ধরনের একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কাছাকাছি মদিনার মরুভূমি থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে স্যাটেলাইট ছবিতে। (ছবি- এএফপি)
ইরাক থেকে চালানো ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব তাদের একটি প্রধান তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের বিস্তারের মধ্যে শুক্রবার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনটি বন্ধের ঘোষণা দেয় রিয়াদ।
ইরাক স্বীকার করেছে, প্রতিবেশী সৌদি আরবের এই পাইপলাইনে চালানো ড্রোন হামলাটি ইরানের সীমান্তবর্তী মায়সান প্রদেশ থেকে শুরু হয়েছিল। এ ঘটনায় ইরাকের একজন সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে।
১ হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দিয়ে আসছিল। জাহাজ ট্র্যাকিংকারী কোম্পানি ও বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ৪ থেকে ৫ শতাংশ এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবাহিত হতো।
ঘটনার আগে ওই পাইপলাইনের কাছাকাছি এলাকায় পুড়ে যাওয়া মাটি ও ধোঁয়ার উপগ্রহ চিত্র প্রকাশ পায়। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা হচ্ছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা আপাতত কোনো পাল্টা ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে চালানো হামলা প্রতিরোধে ইরাকি সরকারের প্রচেষ্টাকেও সৌদি আরব সমর্থন করবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা, স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পৃথক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান-সীমান্তবর্তী মায়সান প্রদেশের অপারেশনস কমান্ডারকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই অঞ্চল থেকেই ড্রোন হামলাটি চালানো হয়েছিল—এমনটি নিশ্চিত হওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, কাতার ও কুয়েতের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল’ (জিসিসি) এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই বলেছেন, ‘এই হামলা পরিস্থিতিকে বিপজ্জনকভাবে উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর জন্য একটি অগ্রহণযোগ্য হুমকি সৃষ্টি করেছে; পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালারও চরম লঙ্ঘন।’
এদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বড় ধরনের অগ্রগতির মধ্যেই এ ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সপ্তম মাসে গড়ানোর সময় এ হামলা বিশ্বজুড়ে তেল পরিবহনের রুটগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, এই সপ্তাহে ইয়েমেনে দ্রুত অভিযানের মাধ্যমে হুথি বিদ্রোহীরা দেশটির উপকূলরেখার বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়েছে। গোষ্ঠীটি দাবি করেছে, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত ‘বাব আল-মানদাব প্রণালী’ এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে তারা জানিয়েছে, ‘সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য সব কোম্পানির জন্য’ সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদ।
আরব উপদ্বীপের উভয় প্রান্তে উদ্ভূত এই পরিস্থিতির চাপে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গেছে। জুলাই মাসের পর প্রথমবারের মতো তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। খবর-বিবিসি
ছবি : সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালির পূর্বদিকে ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সাগরের পানিতে তেলের ছড়িয়ে পড়ার চিহ্ন দেখা গেছে। ইউরোপীয় কপারনিকাস প্রোগ্রামের স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
বুধবার ধারণ করা একটি ছবিতে পানির উপরিভাগে বাদামি রঙের লম্বা রেখা দেখা যায়। একই স্থানের বৃহস্পতিবারের আরেকটি কপারনিকাস ছবিতেও একই ধরনের দৈর্ঘ্যের আঁকাবাঁকা রেখা দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় স্যাটেলাইটের ছবিগুলো বিশ্লেষণ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এগুলো হরমুজ প্রণালির কাছে পানিতে ছড়িয়ে পড়া তেলের স্তর বা ‘অয়েল স্লিক’।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এসব তেলের স্তর দেখা গেছে।