দুর্ঘটনাকবলিত বাস
সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে বাসচাপায় ব্যাটারিচালিত ভ্যানে থাকা স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ভ্যানে থাকা ওই দম্পতির মেয়েসহ বাসের অন্তত ১০ যাত্রী আহত হয়েছেন। শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে বেলকুচির মেঘুল্লা এলাকায় বাসস্ট্যান্ডের কাছে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন— বেলকুচি উপজেলার আজুগড়া হিজলতলা এলাকার মৃত বাছের সরকারের ছেলে মো. মোতালেব সরকার (৪০), তার স্ত্রী ফজিলা খাতুন (৩৫) ও জামতৈল গ্রামের মৃত সোনাউল্লাহ মুদির ছেলে অটোভ্যানের চালক মো. নুরু (৪৫)। আহত তামান্না খাতুন (১৬) মোতালেব সরকারের মেয়ে।
বেলকুচি থানার ওসি ইমাম জাফর বলেন, সকাল ৬টার দিকে বেলকুচির মেঘুল্লা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মুকুন্দগাতীগামী যাত্রীবাহী চলন্ত একটি ভ্যানের এক্সেল ভেঙে ভ্যানটি সড়কের ওপর পড়ে যায়। এ সময় এনায়েতপুর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী যাত্রীবাহী ঢাকা এক্সপ্রেসের একটি দ্রুতগামী বাসটি ভ্যানটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই স্বামী-স্ত্রী ও ভ্যানের চালক মারা যায়। তবে বাসটিও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে গাছের সাথে আটকে যায়। এ ঘটনায় ওই দম্পতির মেয়ে তামান্না খাতুনসহ বাসের অন্তত ১০ জন যাত্রী আহত হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। আহত তামান্নাকে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
তিনি আরও বলেন, বাসটিকে আটক করা হলেও এর চালক-হেলপার পালিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
হাসপাতালে জেলা পরিষদের উদ্যোগে একটি ইসিজি মেশিন প্রদান
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে জেলা পরিষদের উদ্যোগে একটি আধুনিক ইসিজি (ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম) মেশিন প্রদান করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ১০টায় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই চিকিৎসা সরঞ্জামটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মমতাজ আলো।
এ সময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মমতাজ আলো বলেন, গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ সময় হাসপাতালের বিদ্যমান সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি। মেশিন হস্তান্তর পর্ব শেষে হাসপাতালের নতুন ভবন চত্বরে একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধান অতিথি।
জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহামুদুন নবী টিটুল। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে সিভিল সার্জন ডা. মো. রফিকুজ্জামান, গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. শহিদুল্লাহসহ জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে হামলা হয়েছে
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে শহরের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা এই হামলা চালান। হামলার মুখে সারজিস আলম সোনালী ব্যাংকের কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। তখন প্রায় এক ঘণ্টা সেখানে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখেন ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা।
পরে পুলিশ গিয়ে সারজিস আলমকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে আসে। এখনো তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। বাইরে বিক্ষোভ করছেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। আর নাসীরউদ্দিন পাটোয়ারী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হামলার মুখে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সার্কিট হাউসে আসেন। এক পর্যায়ে সেখান থেকে তিনি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেছেন।
দুই নেতার গাড়িতে হামলার খবর পেয়ে প্রতিরোধ করতে যাওয়া এনসিপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটে। তাতে প্রায় ১৫ জন আহত হয়েছেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আজ বিকেল পাঁচটার দিকে হবিগঞ্জ শহরের টাউনহলের সামনে এনসিপি সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশ শেষে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী একটি জিপ গাড়িতে চড়ে সমাবেশস্থল থেকে হবিগঞ্জ সার্কিট হাউসের দিকে রওনা হন। তাঁর গাড়িটি শহরের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় পৌঁছলে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। গাড়িটি দ্রুত বেগে চালিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের সার্কিট হাউসে এসে আশ্রয় নেয়।
এরপর নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর গাড়ির পেছনে থাকা সারজিস আলমের গাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া করেন ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা। তখন সারজিসের গাড়ি দ্রুত গতিতে এসে হবিগঞ্জ সোনালী ব্যাংকে আশ্রয় নেয়। এ সময় এনসিপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে জেলা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এতে শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সারজিস আলম সোনালী ব্যাংকে অবস্থান করছেন খবর পেয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এসে ব্যাংকটি ঘেরাও করে রাখেন। পরে পুলিশ এসে রাত আটটার দিকে ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের সরিয়ে দিয়ে সারজিস আলমকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যান।
এ ঘটনার জন্য বিএনপিকে দোষারোপ করেছেন এনসিপি নেতারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান বলেছেন, এনসিপি নেতারা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে এই পরিবেশ তৈরি করেছেন। তাঁদের ওই বক্তব্যের কারণে নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
ছবি : সংগৃহীত
‘সকালে মোবাইলে কল আইছে। মনে করছি পোলায় ফোন দিছে, কথা কইবো। কিয়ের কথা..দেহি আগুন আর আগুন। ভালোর লেইগা পাঠাইছিলাম বিদেশ। এমুন জানলে কহনও পাঠাইতাম না’- কথাগুলো বলতে বলতে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন আলী আহমদ।
দক্ষিণ আফ্রিকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছেলে আপন আহমেদকে হারিয়েছেন তিনি। ছেলের একটি ছবি বুকে জড়িয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেহেন আমার পোলাডা কত সুন্দর আছিলো। কত লম্বা। নায়কগো মতন। এহন আর নাইগো নাই।’
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কোমানি (সাবেক কুইন্সটাউন) শহরের কাছে একটি দোকানে আগুন লেগে ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তাদের পাঁচজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে, একজনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। তবে দুই জেলার এই চরাঞ্চলের গ্রামগুলো পাশাপাশি হওয়ায় শোক যেন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জনপদে।
মঙ্গলবার নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি উঠোনেই স্বজন আর প্রতিবেশীদের ভিড়। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ নীরবে বসে আছেন। কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনার সামনে কোনো কথাই যেন কাজে আসছে না।
আলীরটেক ইউনিয়নের মধ্য ক্রোকের চরের আপন আহমেদ চার বছর আগে সংসারের অভাব ঘোচাতে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। সেখানে একটি দোকানে কাজ করতেন।
বাবা আলী আহমদ বলেন, ‘ছেলেটা খুব কষ্ট করে সংসার চালাইত। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, রোজা রাখত। এখন আমার ঘরটাই অন্ধকার হয়ে গেল।’
একই আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন একই এলাকার ফাহিম, নুর মোহাম্মদ, তৈলখিরার চরের ফয়সাল, বক্তাবলী ইউনিয়নের শাহীন এবং মুন্সিগঞ্জের রাজ্জাক।
শাহিনের চাচা মোক্তার হোসেন বলেন, ‘নয় বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিল। কয়েক দিন ধরেই বলত, ওখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না। দেশে ফিরতে চাচ্ছিল। কিন্তু আর ফেরা হলো না।’
পুড়ে যাওয়া দোকানটির অন্যতম মালিক এবং আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রওশন আলী বলেন, দোকানের আবাসিক কক্ষে সাতজন ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ছয়জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা তদন্ত করছে স্থানীয় পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বার্তা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ ছোট দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই কর্মস্থলেই রাত কাটান।
স্বজনদের ভাষ্য, জীবিকার তাগিদে হাজারো মাইল দূরে গিয়ে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এসব তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষ। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল একটি আগুনে।
বয়স ৯০ ছুঁইছুঁই। জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে অন্তত ১৫ বার প্রমত্তা তিস্তার ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তফেল উদ্দিন। সর্বশেষ আট বছর আগে সব হারিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় ঠাঁই নিয়েছিলেন ছাতুনামা কেল্লাপাড়া গ্রামে। কিন্তু তিস্তা ছাড়েনি তাঁকেও।সেখানেও তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়েছে তাঁর শেষ আশ্রয়টুকুও। গেল শুক্রবার দুপুরে তাঁর চোখের সামনেই শেষ আশ্রয়টুকুও বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে।
যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ছিল বসতভিটা, সেখানে এখন বয়ে চলেছে ঘোলা জলের তীব্র স্রোত। ভিটার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে তফেল উদ্দিন বলেন, ১৩ বার ভিটাবাড়ী নদী ভাঙিল, ৬০ বিঘা আবাদি জমিও তিস্তাত গ্যাল। ৮ শতক জমি কিনি ৬টা ছাওয়াক নিয়্যা সংসার তুলি এটে ছিনু, শেষ বয়সেও তিস্তা মুক্তি দিল না। এখন নদীত ঝাঁপ দিয়া মরা ছাড়া হামার উপায় নাই।
তফেল উদ্দিনের বাড়ি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের কেল্লাপাড়া গ্রামে। ২০১৬ সালে তিস্তার ভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে বসতি গড়েছিলেন পাঁচ শতাধিক পরিবার। গত এক সপ্তাহের ভাঙনে তফেলের মতো এই গ্রামের দুই শতাধিক বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। শতাধিক বাড়ি ও ফসলি জমি এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে। কিন্তু গত সাত দিনের টানা ভাঙনে তফেল উদ্দিনের মতো ওই গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে আরও শতাধিক বাড়ি ও ফসলি জমি তীব্র ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
মোর ভিটা না, কলিজা ভাঙছে- সরজমিনে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে নদীতীরের বিশাল অংশ প্রতিনিয়ত ধসে পড়ছে। শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে স্থানীয় বাসিন্দারা তড়িঘড়ি করে ঘরবাড়ি ভেঙে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ নৌকায় আসবাবপত্র ও গবাদিপশু সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ স্থানে। ভিটামাটি হারিয়ে অনেক পরিবার গৃহস্থালির মালামাল নিয়ে খোলা আকাশের নিচে নিরাশ্রয় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
২০১৬ সালে ধারদেনা করে ছয় শতক জমি কিনে ভিটা বেঁধেছিলেন জামাল হোসেন। চার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। আজ সেই ভিটার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। নদীর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাত তুলে জামাল হোসেন আকুতি জানিয়ে বলেন, ওইটা মোর ভিটা ছিল, সব শেষ হয়া গেল! এই তিস্তাই হামার জীবনটা শেষ করি দিল। শেষ বয়সে আইসা পরিবার নিয়ে কোনটে দাঁড়ামু, তার কোনো পথ নাই!
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তিস্তার পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি কমার কারণে নদীতীরে স্রোতের টান বেড়েছে। ফলে ভাঙন আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।
ধ্বংসের মুখে ২ কোটি টাকার মুজিব কিল্লা---চরাঞ্চলবাসীর দুর্যোগকালীন আশ্রয়ের সুবিধার্থে ২০২৩ সালে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে কেল্লাপাড়ায় নির্মাণ করা হয়েছিল একটি 'মুজিব কিল্লা' (বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র)। তবে অপরিকল্পিতভাবে নদী তীরের একেবারে কাছে এটি নির্মাণ করায় ভবনটি এখন চরম ধ্বংসের মুখে। নদীর তীর থেকে মাত্র ৮০ থেকে ৯০ মিটার দূরে অবস্থান করায় যেকোনো মুহূর্তে কিল্লাটি তিস্তায় তলিয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মজিদ আক্ষেপ করে বলেন, নদীর একবারে মুখের ওপর কিল্লা বানাইছে কিন্তু বাধ না দিলে তো সেটা টিকবে না। এ্যালা নদী ভাঙতে ভাঙতে কিল্লার কাছে আসি গেছে। যেকোনো সমায় কিল্লাটা নদীত ধসি পড়বে। অযথাই সরকারের কোটি কোটি টাকা পানিতে গেল, আর হামার আশ্রয়ের আশাও শেষ হয়া গেল।
ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী বলেন, নদীর ভাঙতে ভাঙতে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রের কাছে চলে এসেছে। দ্রুত ব্যাবস্থা না নিলে যে কোন মুহর্তে আশ্রয়কেন্দ্র টি বিলীন হয়ে যাবে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি---দুর্ভোগের এই চরম মুহূর্তে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাাউবো) কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে না আসায় নদীপাড়ের মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপদের সময় কাউকেই পাওয়া যায় না। নদী যখন সব কেড়ে নেয়, তখন নামমাত্র দু-এক বস্তা জিও ব্যাগ ফেলে পানি উন্নয়ন বোর্ড লোকদেখানো দায়িত্ব শেষ করে। ভোট এলে প্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও এখন দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কোনো খোঁজ নিচ্ছেন না কেউ। ক্ষতিগ্রস্ত নদীপাড়ের মানুষের এখন একটাই দাবি, ত্রাণ বা অনুদান নয়, দ্রুত টেকসই জিও ব্যাগ ও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে তিস্তার এই তাণ্ডব থেকে কেল্লাপাড়াকে রক্ষা করা হোক।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, পানি কমার সময় নদীতে ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়, যার কারণে নদীতীর দ্রুত ধসে পড়ছে। ছাতুনামা কেল্লাপাড়া এলাকার ভাঙন পরিস্থিতির খবর আমরা পেয়েছি। ভাঙ্গন রোধ ও আশ্রয়কেন্দ্রটি রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তার ভাঙনে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর তালিকা প্রণয়ন করতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুরের কালীগঞ্জে ভ‚মিদস্যু ওমর ফারুক গংয়ের বিরুদ্ধে বিধবা মাসুমা বেগমের বসত বাড়ীতে সন্ত্রাসী হামলা ও লুট শেষে সম্পত্তি জবরদখল করে মার্কেট, কিন্ডার গার্টেন স্কুল ও অফিস নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়ার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও গ্রামের মৃত মো. সিরাজুল ইসলামের বিধবা স্ত্রী মাসুমা বেগম সংবাদ সম্মেলনে জানান, বড়গাঁও গ্রামের মৃত নুরুল ইসলাম শেখের পুত্র আব্দুল আউয়াল শেখ ও তার পুত্র ওমর ফারুক শেখ, আলমগীর হোসেন শেখ বকুল ও জাইদুল ইসলাম শেখ স্থাণীয় সন্ত্রাসী, চিহ্নিত ভূমিদস্যু এবং জবরদখলকারী। দীর্ঘদিন যাবৎ ওমর ফারুক শেখ তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সারা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে গবীর, অসহায় ও নিরীহ মানুষের জমিজমা জবরদখল করে আসছে। তাদের এসব সন্ত্রাসী কাজের কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে বিভিন্ন নির্যাতন, পুলিশি হয়রানী ও হামলা মামলার স্বীকার হতে হয়। ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে মূখ না খুলে নীরবে সহ্য করে নেয়।
আমার স্বামী গত ৮ জুলাই ২০১০ইং তারিখে ৬০৩৯নং হেবার ঘোষণাপত্র রেজিষ্ট্রি দলিলমূলে আমাকে ২৭.৫০শতাংশ সম্পত্তি প্রদান করেন। আমি উক্ত সম্পত্তি নিজ নামে নামজারী ও জমাভাগ করে ১৫৩৯নং হোল্ডিং খোলে ১৪৩২ সন পর্যন্ত খাজনাদি পরিশোধ করে শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোগদখল করে আসছি। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর ওমর ফারুকগং আমার সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলের উদ্দেশ্যে আমাদের সাথে শক্রতা শুরু করে। আমি সম্পত্তি রক্ষার্থে বিগত সময়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, কালীগঞ্জ থানা ও গাজীপুরের পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করেও অদৃশ্য কারণে কোন আইনী সহযোগীতা পাইনি। বরং ওমর ফারুক শেখ গং গত ২০২২ সনের ২১ অক্টোবর সকাল ১১ টায় ওমর ফারুক গং আমার বাড়ীতে প্রবেশ করিয়া বিভিন্ন প্রজাতির ৩৫/৪০টি গাছ কাটিয়া নিয়া যায়। সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীর সময়ে ভাড়াটিয়াদের দোকান ঘর থেকে ভয়ভীতি দেখাইয়া দোকান ভাঙ্গিয়া নিয়া যায়। ৩১ অক্টোবর ২০২২ইং সকাল ৭ ঘটিকায় পূনরায় ওমর ফারুক গং অজ্ঞাতনামা ৪০/৫০ জন সন্ত্রাসী নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করে ইটের পাকা বাউন্ডারী ওয়াল ভাঙ্গিয়া আমার ঘর হইতে আমাকে ও আমার সন্তানদের মারধর করিয়া বাহির করিয়া দেয়।
পরে আমার ঘরের আসবাবপত্র, টাকা-পয়সা, গহনা সহ সকল কিছু লুটপাট করিয়া নিয়া শেষে বসতবাড়ী ও টিনসেট বিল্ডিং দখল করিয়া ঘরের মালামাল আগুনে পোড়াইয়া ফেলে। আমাদের সম্পত্তি জবরদখলে ওমর ফারুক গংদের বাধা দিলে তারা সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমাদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি প্রদান করে। মো. ওমর ফারুক শেখ গং আমাদের জমি জবর দখল করে তাতে ৭টি দোকান ঘর, একটি অফিস ও একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুল নির্মাণ করিয়া ভাড়া দিয়া নিজেদের দখলে রাখিয়াছে। বর্তমানে আমি আমার এক প্রতিবন্ধী সহ চারজন সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। এছাড়াও ওমর ফারুক শেখগং বড়গাঁও গ্রামের পাচু শেখের পুত্র ফিরোজ আলী, আসমত আলী, সুলতান উদ্দিন, হেকমত আলী ও মুসকত আলীর জমি জবর দখল করে নুরে মদিনা কওমী মাদ্রাসার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমতি প্রদান করে প্রতিমাসে ভাড়া আদায় করে নিজেরা ভোগ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে ওমর ফারুক শেখ গংয়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ পূর্বক আমাদের সম্পত্তি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হক মিলন এর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এ সময় অন্যান্যের মাঝে মাসুমা বেগমের পুত্র মো. মেহেদী হাসান শেখ, মো. আনা নুর ইসলাম শেখ সাকিল, মো. মিনহাজুর রহমান শেখ ও মো. মাজহারুল ইসলাম শেখ, মাসুমা বেগমের বোন মোসা. হালিমা বেগম, মোসা. আলেয়া বেগম ও মোসা. সালমা বেগম উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্যতম হলো সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের জমি দখল হয়ে যায়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান তার তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাস্তবায়নাধীন ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’ কর্মসূচির আওতায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মাঝে ঘরের বরাদ্দপত্র, সেলাই মেশিন, বাইসাইকেল ও শিক্ষাবৃত্তির চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, শুধু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণই নয়, দেশের সকল জনগোষ্ঠীকে সমান মর্যাদায় এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম বিভিন্ন সংসদীয় আসনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো জাতি-গোত্রের বিভেদ দূর করে সকল শ্রেণি-পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসা।”
তিনি আরও বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বর্তমান সরকারকে অনেক কিছু নতুন করে গড়ে তুলতে হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য পরিচালিত এই সহায়তা কর্মসূচিও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা সকল ধরনের জাতিগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।”
অনুষ্ঠানের শেষে ১০ জনের মাঝে বসতঘরের বরাদ্দপত্র, ৪৯ জনকে বাইসাইকেল, ৩৩ জনকে সেলাই মেশিন এবং ৩২৬ জন শিক্ষার্থীকে মোট ১৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তির চেক বিতরণ করা হয়। সব মিলিয়ে ৪১৮ জন উপকারভোগীর মাঝে প্রায় ৬৯ লাখ ৭৪ হাজার ১ টাকা মূল্যের ঘর, বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন ও শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক, পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন, সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন, সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।