তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদনে ধস নেমেছে। যন্ত্রপাতি চলছে না
দেশে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। এর ফলে বাসাবাড়ির রান্না থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পকারখানা- সব খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে ভারী শিল্পে। গ্যাস এবং এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় স্টিল, সিরামিক, কাচের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোর উৎপাদনক্ষমতা শূন্যে নেমেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের সব শিল্পাঞ্চলের ভারী শিল্পের বেশির ভাগ কলকারখানা বন্ধ ছিল। স্থানীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহকারী বড় কয়েকটি শিল্প গ্রুপের প্রায় সব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতি গভীর সংকট তৈরি করতে পারে। রপ্তানি আয় কমে আসবে। স্থানীয় পণ্য সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হতে পারে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের সব কারখানা গত বুধবার থেকে বন্ধ রয়েছে। এতে সারাদেশে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল গতকাল বলেন, গ্রুপের কারখানাগুলোতে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার মতো ন্যূনতম গ্যাস মিলছে না। নতুন করে বিদ্যুৎ সংকটও যুক্ত হয়েছে। এ কারণে গ্রুপের সব মিল-কারখানা বন্ধ রয়েছে।
মোস্তফা কামাল জানান, উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার মতো গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদিরের কাছে চিঠি লিখেছেন তিনি। বিদ্যুৎমন্ত্রী একটু অপেক্ষা করতে বলেছেন।
খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য হিসেবে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, চিনি উৎপাদন ও বাজারজাত করে থাকে মেঘনা গ্রুপ। এ ছাড়া সিমেন্ট, পেপার, এলপিজি, ফিড, কেমিক্যালসহ গ্রুপের মালিকানাধীন শিল্প ইউনিট রয়েছে ৫৭টি। ফ্রেশ, নাম্বার ওয়ান, অ্যাক্টিফিট, পিউর ইত্যাদি নামে এসব পণ্য বাজারে পাওয়া যায়।
এর বাইরে সেবা খাতে শিপিং, বীমা ও রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা রয়েছে মেঘনা গ্রুপের। মেঘনা গ্রুপ বলছে, দেশের মোট পরিবারের অর্ধেকের কাছে এসব পণ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের বাইরে ৫২টি দেশে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে থাকে তারা।
মোস্তফা কামাল আরও বলেন, জ্বালানি সংকটে তারা পণ্য উৎপাদন করতে পারছেন না, কিন্তু সরবরাহকারী ও গ্রাহকরা তাদের কাছে পণ্যের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সারাদেশে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হতে পারে।
এক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে গ্রুপের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত হতে পারে- এ প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা কামাল জানান, সঠিক তথ্য এ মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব নয়, তবে ক্ষতির পরিমাণটা বেশ বড়। বর্তমানে গ্রুপের কর্মকর্তা ও কর্মীর সংখ্যা ৬৫ হাজারের বেশি।
কাঁচামাল সহজে আনা-নেওয়ায় সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে অনেক ভারী শিল্প ইস্পাত, সিমেন্ট ও কাচ কারখানা গড়ে ওঠে। গ্যাস সংকটের কারণে সেগুলোও বিপদে পড়েছে। নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল ঘিরে গড়ে ওঠে ভারী শিল্পেও একই পরিস্থিতি। জানতে চাইলে ফতুল্লা স্টিল রি-রোলিং মিলসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী বলেন, ভারী শিল্পের অবস্থা ভালো না। তাঁর কারখানায় উৎপাদন প্রায় এক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে।
টি কে গ্রুপের উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল
টি কে গ্রুপের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাদের কেমিক্যাল, ভোজ্যতেল ও সিমেন্ট কারখানাগুলো পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গজারিয়ায় তাদের এসব কারখানায় দুই দিনের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সার আমদানির সুযোগ আছে। আমদানিও হয়ে আসছে। তাহলে কয়েকটি সার কারখানা চালাতে গিয়ে সরকার কেন শত শত কারখানায় গ্যাস সংকট তৈরি করছে?
আরএফএল গ্রুপের উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে
আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, তাদের কারখানাগুলোতে উৎপাদন বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে, যেখানে তাদের মোট উৎপাদনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়, সেখানে গ্যাসনির্ভর পাওয়ার সিস্টেম অচল হয়ে পড়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা পল্লী বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এই সংকটের প্রভাব নন-ফুড আইটেম যেমন- প্লাস্টিক, পিভিসি পাইপ, ফুটওয়্যার ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ
দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল এখন হবিগঞ্জ। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, ট্রান্সকম গ্রুপ, বাদশা গ্রুপ, সায়হাম গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপসহ বড় শিল্পগোষ্ঠীর ১৭১টি কারখানা রয়েছে এখানে।
গত বুধবার থেকে কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক অলস সময় পার করছেন।
গাজীপুরে ৫২৫টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ
৫ আগস্টের এক দিন সরকারি ছুটির সঙ্গে বাড়তি ছুটি মিলিয়ে টানা চার দিন পর গাজীপুরের শিল্পকারখানায় ফেরেন শ্রমিকরা। কিন্তু কর্মস্থলে ফিরেও কাজে ফিরতে পারছেন না অনেকেই। গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন। কোথাও অর্ধেক, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম।
ফলে অলস সময় পার করছেন কোনো কোনো কারখানার শ্রমিকরা। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মালিকরা। তৈরি হচ্ছে বায়ার হারানোর আশঙ্কাও।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, গাজীপুর জেলা ও মহানগরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিল্পকারখানা আছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে ১২-১৫ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সে হিসাবে গাজীপুরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ৫২৫টি কারখানায়। বড় কারখানাগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সেসব কারখানাতেও উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
শিল্প এলাকার কারখানাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও মেশিন বন্ধ, কোথাও সীমিত পরিসরে চলছে উৎপাদন। কর্মস্থলে উপস্থিত থেকেও অনেক শ্রমিককে কাজ না থাকায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে।
শফিপুর আনসার একাডেমির ৩ নম্বর গেট এলাকায় অবস্থিত গোমতী টেক্সটাইল কারখানাটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, বুধবার থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
একই এলাকার এস এ স্পিনিং মিলস লিমিটেডেও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কারখানাটির ডিজিএম আজিজুল হক বলেন, বুধবার বিকেল ৫টার পর থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
বিপর্যয়ের মুখে বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্প
শিল্পে গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে দেওয়ায় লোডশেডিং কমলেও কারখানায় শুরু হয়েছে গ্যাসের সংকট। শিল্পোৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় চিন্তিত ব্যবসায়ীরা। তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক ভয়াবহ গ্যাস সংকটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের পর বিদ্যুতের অভাবে শিল্পের উৎপাদন ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। সংগঠনের সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান জানান, এফএসআরইউ বয়লার সিস্টেমে অগ্নিদুর্ঘটনার পর যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিল তা কিছুটা কমে এসেছিল। গত দুই দিন ধরে আবার একই সমস্যা শুরু হয়েছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। অনেক কারখানাই গতকাল উৎপাদন করতে পারনি।
তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম আহসান বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে গতকালই বিদ্যুতের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিকেএমইএর সদস্য কারখানাগুলো বেশির ভাগই বন্ধ ছিল। তাঁর নিজের ফতুল্লা গ্রুপের কারখানাটিও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
তিনি জানান, ফেব্রিক্সের অভাবে বিদ্যুৎ থাকলেও কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে না। তিনি জানান, ২০২৩ সালে একবার এ রকম সমস্যা হয়েছিল। তবে এত লম্বা সময় ধরে সংকট এর আগে কখনও হয়নি।
তৈরি পোশাকের ফেব্রিক্সের বড় অংশের জোগান দেয় দেশের বস্ত্রকলগুলো। বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনের সদস্য বেশির ভাগ বস্ত্রকলই গতকাল বন্ধ ছিল। যে কয়েকটি কারখানা খোলা ছিল সেগুলোতেও ৩০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি।
তীব্র গ্যাস সংকট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে দেশের বড় বড় টেক্সটাইল কারখানাগুলো এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। গত কয়েক দিন ধরে হা-মীম গ্রুপ, নোমান গ্রুপ, স্কয়ার ফ্যাশনস এবং বাদশা স্পিনিংয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ডেনিম ও ডাইং খাতের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ।
কারণ ডাইং, ফিনিশিং, স্ট্যান্টিং ও সাইজিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলো গ্যাস ছাড়া পরিচালনা করা সম্ভব নয়। স্পিনিং মিলগুলো কোনোমতে বিদ্যুৎ দিয়ে চালানোর চেষ্টা করা হলেও, গ্যাস সংকটে চিলার বন্ধ থাকায় কারখানার অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, যা উৎপাদিত সুতার গুণগত মান কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে অনেক কারখানা মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় কোনোমতে টিকে আছে।
পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ একটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, এ সংকটময় মুহূর্তে বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে কারখানা চালানোর চেষ্টা করা হলেও তা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। একটি বৃহৎ শিল্প গ্রুপে প্রতিদিন গড়ে ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল লাগছে, যার দৈনিক খরচ প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে মুনাফা করা তো দূরে থাক, কারখানা টিকিয়ে রাখাই এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সার কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করে সেই গ্যাস শিল্প খাতে দেওয়া উচিত। সাগরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া মাত্রই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হবে। যদি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে উদ্যোক্তাদের পক্ষে এই লোকসান টানা সম্ভব হবে না, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে দেশের রপ্তানি আয়ে। সরকারকে এখনই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্প খাতকে বাঁচাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমতে পারে
গ্যাসের মধ্যে বিদ্যুতে ৬৮ কোটি ঘনফুট থেকে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে এখন দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। সার উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস। বাকি ৮৫ ঘনফুটের মতো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে কারখানা, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে। অথচ তিন সপ্তাহ আগেও এসব খাতে দেওয়া হতে ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জনরোষ সামাল দিতে বিদ্যুতের পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। ফলে সব মিলে গড়ে শিল্পে ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে এখন। এই সরবরাহ আরও কমতে পারে।
জামালপুর-ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সড়ক অবরোধ
জামালপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে জামালপুর-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন গাড়ির চালকরা। গতকাল সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির কারণে মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও কর্মস্থলগামী মানুষ।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন জামালপুরের ম্যানেজার দুর্জয় বকসী বলেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বুধবার রাত ৮টা থেকে জামালপুরে পাইপলাইনে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা। গতকাল দুপুর ১টার দিকে সরাইল উপজেলা সদরের কুট্টাপাড়া এলাকায় এই অবরোধ করেন তারা। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে হাইওয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপে অবরোধ তুলে নেন তারা।
শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীরা (ফাইল ছবি)
৩৫ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে ইতালি থেকে ১৯ জন, গ্রিস থেকে ১০ জন এবং সাইপ্রাস থেকে ছয়জন বাংলাদেশি দেশে ফিরছেন।
ইমিগ্রেশন পুলিশ ও বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল সোয়া আটটায় একটি বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে (পিভিজি ৯৪৪৫) তারা ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটি ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহযোগিতায় ফেরত আসা বাংলাদেশিদের জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, একটি বিশেষ বিমানে করে ৩৫ বাংলাদেশি শুক্রবার সকালে ঢাকায় এসেছেন। এর মধ্যে ইতালি থেকে ১৯ জন, গ্রিস থেকে ১০ জন এবং সাইপ্রাস থেকে ছয়জন বাংলাদেশি দেশে ফিরছেন।
তাদের সবাইকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রত্যাশা-২ প্রকল্প থেকে বিমানবন্দরে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে কাউন্সিলিং ও প্রশিক্ষণ শেষে সবাইকে অর্থনৈতিক সহায়তা করা হবে।
বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দোকানপাট ও শপিং মল রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার বিশেষ অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে আজ শুক্রবার থেকে আগের সময়সূচি অনুযায়ী সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে দোকানপাট, মার্কেট ও বিপণিবিতান।
এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর খোলা থাকার সময় দুই ঘণ্টা কমছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখতে চলতি বছর কয়েক দফায় দোকানপাট খোলা ও বন্ধের সময় পরিবর্তন করেছে সরকার। সর্বশেষ গত ৫ অক্টোবর দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ।
সেই সময়সীমা শেষ হওয়ায় আজ থেকে পুরোনো নিয়ম কার্যকর হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সকাল ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শপিং মল, মার্কেট ও দোকানপাট খোলা রাখা যাবে। ২৩ অক্টোবর থেকে আগের নিয়মে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে।
এ বছর জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দোকানপাট বন্ধের সময় একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়। এপ্রিলের শুরুতে শপিং মল ও দোকানপাট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সময় বাড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা করা হয়। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গত ১২ মে সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
এরপর জুনে বন্ধের সময় রাত ৯টা নির্ধারণ করা হয়। পরে ১২ আগস্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সময় আরও এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা করা হয়। সেই অনুযায়ী সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার নিয়ম চালু হয়, যা আজ থেকে আবার কার্যকর হলো।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে নিসচার র্যালি ও সমাবেশ
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর উদ্যোগে আজ সকাল ১১টায় রাজধানীর কাকরাইলে নিসচার কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত এক বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। র্যালিতে নিসচার উপদেষ্টা, আজীবন সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, সবার জন্য বাংলাদেশ, নিসচা মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখা, নিসচা ঢাকা জেলা, বাংলাদেশ সাইকেল লেন, নিসচা ধামরাই উপজেলা,নিসচা পলাশ উপজেলা শাখা, নিসচা নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা, নিসচা লৌহজং উপজেলা শাখা, নিসচা শিবপুর উপজেলা শাখা, নিসচা সাভার উপজেলা শাখা, নিসচা ঠাকুরগাঁও জেলা শাখা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ অনেকে অংশ নেন।
র্যালিটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে নির্ধারিত পথ অতিক্রম করে জাতীয় প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হয়। অংশগ্রহণকারীরা সড়কে শৃঙ্খলা, আইন মানা, চালক ও যাত্রীর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁদের হাতে থাকা ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডে নিরাপদ সড়কের দাবিতে নানা বার্তা তুলে ধরা হয়। র্যালি থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমাতে সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত, গণমাধ্যম এবং নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
জাতীয় প্রেসক্লাবে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে নিসচার নেতৃবৃন্দ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য ঘটনা নয়। পরিকল্পিত ব্যবস্থা, বিদ্যমান আইন ও বিধির যথাযথ প্রয়োগ, দক্ষ চালক তৈরি এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন আচরণের মাধ্যমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এজন্য সড়ক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে না দেখে নিয়মিত ও সমন্বিত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে চালকের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস, সড়কের নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণ, পথচারীর নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তাঁরা বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, আইন বাস্তবায়ন, তদারকি, তথ্য সংগ্রহ এবং অনিয়মের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
নিসচার দাবি ও সুপারিশ
র্যালি ও সমাবেশ থেকে নিসচার পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কয়েকটি দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়:
সড়ক নিরাপত্তা আইন ও বিধির কার্যকর প্রয়োগ: ট্রাফিক আইন ভঙ্গ, বিপজ্জনক গতিতে গাড়ি চালানো, ভুল পথে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অতিরিক্ত যাত্রী বা মাল বহন এবং যানবাহনের কাগজপত্র ও ফিটনেসসংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
চালকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিশ্চিত করা: পেশাদার চালকদের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষার মান এবং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে হবে। চালকের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা, বিশ্রাম এবং কর্মঘণ্টার বিষয়েও নজর দিতে হবে, যাতে ক্লান্তি বা অদক্ষতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি না বাড়ে।
যানবাহনের ফিটনেস ও নিরাপত্তা তদারকি: যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানসহ সব ধরনের যানবাহনের নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ, অনুপযোগী বা অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী যান চলাচল বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধারাবাহিক নজরদারি করতে হবে।
সড়ক ও অবকাঠামো নিরাপদ করা: ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত সাইন-সিগন্যাল এবং বিপজ্জনক প্রবেশপথ চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার করতে হবে। সড়ক নির্মাণ ও মেরামতের পরিকল্পনায় চালক, যাত্রী, পথচারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বিবেচনায় রাখতে হবে।
পথচারী ও যাত্রী সুরক্ষা: ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনীয় স্থানে জেব্রা ক্রসিং ও ট্রাফিক সংকেত স্থাপন এবং বাসস্টপ ও যাত্রী ওঠানামার স্থান সুশৃঙ্খল করা জরুরি। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও জনবহুল এলাকায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
গতিসীমা ও ঝুঁকিপূর্ণ চালনা নিয়ন্ত্রণ: সড়কের ধরন ও পরিবেশ অনুযায়ী গতিসীমা নির্ধারণ করে তা দৃশ্যমানভাবে জানাতে হবে। দ্রুতগতির যান শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং নিয়মিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করার সুপারিশ করা হয়।
দুর্ঘটনার তথ্য ও গবেষণা: দুর্ঘটনার স্থান, সময়, ধরন ও কারণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে নিয়মিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করতে হবে। তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত সেবা: দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার, জরুরি চিকিৎসা এবং উপযুক্ত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
নিরাপত্তা শিক্ষার বিস্তার: বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত শিক্ষা ও প্রচার চালাতে হবে। চালক, হেলপার, যাত্রী, পথচারী এবং পরিবহন মালিক—সবার জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি প্রয়োজন।
সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ: সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সরকারি দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিসচার নেতৃবৃন্দ বলেন, নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। চালককে দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালাতে হবে, যাত্রীকে নিরাপত্তাবিধি মানতে হবে, পথচারীকে সতর্ক থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়ম প্রয়োগ ও নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং জনসচেতনতামূলক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁরা আরও বলেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং আহত ব্যক্তিদের যথাযথ সহায়তা দেওয়া মানবিক দায়িত্ব। দুর্ঘটনার কারণ নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান, প্রতিরোধমূলক সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং একই ধরনের দুর্ঘটনা যেন পুনরায় না ঘটে সে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের কর্মসূচি থেকে নিসচা দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সড়ক আইন মেনে চলা, নিরাপদ গতিতে যানবাহন চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ পরিহার করা এবং সড়কে অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বাস্তবসম্মত, ধারাবাহিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য হলো – ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। আর নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য নিরাপদ নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
প্রতীকী ছবি
দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত রোগটিতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৫১২ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৮ জনে। আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক হালনাগাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ময়মনসিংহের এবং একজন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।
গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি নতুন রোগীদের মধ্যে ডিএসসিসির এলাকায় ১১১ জন ও ডিএনসিসির এলাকায় ১৪৬ জন রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৫৫ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি ২৯৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছে চট্টগ্রামে। এ ছাড়া বরিশালে ২৩১ জন, খুলনায় ২০৬, রাজশাহীতে ১৬২, ময়মনসিংহে ৬০, রংপুরে ৪৪ ও সিলেটে আটজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ডেঙ্গুতে দুজন করে মারা যায়। মে মাসে মারা যায় একজন। এরপর জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ ও সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়। অক্টোবরে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ১২৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১১১ জন।
চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ নারী ও ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ। অন্যদিকে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী ও ৬২ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ।
প্রতীকী ছবি
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সময়ে নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি। আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। এই হিসাব বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে হাম ও হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ২০৭। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০৪ জন ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক হাজার ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া দুইজনই ঢাকা বিভাগের। একই সময়ে ৩৬ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ২৩ হাজার ২৪৮ জন।
এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় ৯৯৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এতে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ১৭ হাজার ৭৬০ জনে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাঊদ আলীকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আগামী ২৬-২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকালে তিনি ঢাকাতেই থাকবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এক কর্মকর্তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর সফর চলাকালে দাঊদ আলীকে টোকিও থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এদিকে, এই সফরের কূটনৈতিক বিষয়াবলী তদারকি এবং সার্বিক আয়োজন সমন্বয়ের বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক বিষয়ক সচিব এম নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ১৯ অক্টোবর বিকেলে নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'রাষ্ট্রদূতকে তলব বা প্রত্যাহার সংক্রান্ত আদেশে সই হয় ১৫ অক্টোবর। তাকে দুই দিনের মধ্যে ঢাকায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।'
'প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রদূতকে ঢাকাতেই অবস্থান করতে হবে,' বলেন তিনি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, নজরুল ইসলাম ইতিমধ্যে জাপানে পৌঁছে গেছেন। পুরো সফরের সময় তিনি টোকিওতে অবস্থান করবেন এবং দ্বিপাক্ষিক সমন্বয় ও কূটনৈতিক কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনার জন্য দাঊদ আলীকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরামর্শের জন্য ডেকে পাঠানো হলেও রাষ্ট্রদূতকে সফরের প্রস্তুতির কাজে রাখা হয়নি।
দাঊদ আলী ১৫তম বিসিএসের পররাষ্ট্র ক্যাডার। জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি রোমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর তার অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা।
ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। এ বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের ওপর আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী।
দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। সফরে বেশ কিছু সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য এ সফর সময়োপযোগী সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সুযোগ বৃদ্ধি, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করার ওপর বিশেষ আলোচনা হবে।
এছাড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পাবে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন।
তার খসড়া সফরসূচিতে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
এছাড়া, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাকাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রধানদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, একটি পারমাণবিক কেন্দ্র এবং নাগোয়ায় টয়োটার উৎপাদন প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনা পরিদর্শন করতে পারেন।
মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ির মতো বৃহৎ অবকাঠামো ও পরিবহন প্রকল্পে সহায়তার মাধ্যমে জাপান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।
এ সফরের ফলে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত করার পাশাপাশি নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়ে দুই নেতা আলোচনা করবেন।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে এশিয়া জুড়ে জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ।