ছবি - এআই দিয়ে বানানো।

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৭:২৫ পিএম

জ্বালানি তেল, এলপিজি ও নিত্যপণ্যের চড়া দামে এমনিতেই দিশেহারা সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই সাধারণ গ্রাহকদের ঘাড়ে চেপে বসেছে বিদ্যুতের বাড়তি বিলের বোঝা। গত জুনে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৬.৬৮ শতাংশ। আবাসিক গ্রাহকদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ছয় ধাপে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করায় সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক। স্লাব পরিবর্তন হওয়ায় একটি পরিবারের জন্য নিতান্ত প্রয়োজনীয় বাতি, ফ্যান ও আনুসঙ্গিক প্রয়োজন মেটাতে যেটুকু বিদ্যুৎ লাগে সেটুকু ব্যবহারেও এখন গ্রাহককে দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত চার্জ। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা প্ল্যাটফর্মে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিরক্ত হয়ে ফুঁসে উঠেছে মানুষ।


ইস্যুটি নিয়ে নওরোজের পক্ষ থেকে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। সাধারণ নাগরিকদের মনোভাব জানার চেষ্টা করেছেন। মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা নওরোজকে জানিয়েছেন তাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা। 


তারা জানিয়েছেন- বর্ধিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। সাধারণ পরিবারগুলো বলছে- ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন সেই ৫০ থেকে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার করে একই রেট নির্ধারণ করতে হবে। শতকরা ৯৫ শতাংশ মানুষ নওরোজের কাছে এমন প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে অন্যান্য অতিরিক্ত যেসব খরচ যুক্ত হয় যেমন ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সেগুলোও বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা। 


গ্রাহকদের বক্তব্য- ‘নিজের টাকায় বসানো মিটারে কেন ভাড়া গুণতে হবে আমাদের।’ তাদের ভাষ্য, দেশের বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত সংস্কার বিশেষ করে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো সংস্কার না করে উল্টো গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। 


গ্রাহকরা বলেন, সাধারণ মানুষ ২০০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ করে থাকে। এটিও যখন বাড়ানো হচ্ছে তখন আমাদের বিলাসিতার ওপর নয়, নিত্য প্রয়োজনীয় যে চাহিদা সেটার ক্ষেত্রে এই খরচ বাড়ানো হচ্ছে। 


মূল্যবৃদ্ধিতে ধাপ (স্ল্যাব) পরিবর্তন


ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মাথায় জুনে এসে বাড়িয়েছে বিদ্যুতের দাম। প্রথম ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করেছে বিইআরসি। এটি সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ধাপ যারা মূলত বাতি ও একটি ফ্যান চালান। এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। 


এরপর ৭৫ ইউনিট (০ থেকে ৭৫) পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের গ্রাহক। এই ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সা। এ শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। 


দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা; 


তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর জন্য দাম ৭ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ১০ পয়সা করা হয়েছে। 


চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ২ পয়সা থেকে ১৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬২ পয়সা, পঞ্চম ধাপে ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ব্যবহারকারী বিদ্যুতের দাম ১২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ টাকা ০১ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ১৪ টাকা ৬১ পয়সা থেকে ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা করা হয়েছে। 


এভাবে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকের ব্যবহৃত ইউনিটের পরিমাণ অনুযায়ী মাসিক বিলও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। 


চাপে প্রথম ৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকরা 


ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মাসে ২০০ থেকে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর। কারণ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা আগে যে হারে বিদ্যুৎ বিল দিতেন নতুন মূল্যবৃদ্ধির পর ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য অতিরিক্ত হার আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে কেউ যদি ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাহলে পুরো ইউনিটের বিলই উচ্চ হারে গণনা করা হচ্ছে। এ কারণে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। 


বিল বৃদ্ধির তুলনামূলক চিত্র


একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। আগে ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের জন্য (ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ ছাড়া) বিল আসতো ১ হাজার ২৯৫ টাকা। এর মধ্যে প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা এবং বাকি ১২৫ ইউনিটের জন্য ৭ টাকা ২০ পয়সা করে হিসাব করা হয়। এখন শুধু স্ল্যাব পরিবর্তন হওয়ায় একই পরিমাণ বিদ্যুতের বিল বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৪৪০ টাকায়। কারণ তখন পুরো ২০০ ইউনিটই উচ্চ হারে গণনা হবে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করায় ২০০ ইউনিট ব্যবহারের বিল দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৬৪০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। এতে গ্রাহকের মাসিক বিল বাড়বে ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এর বাইরে বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট যুক্ত হবে। 


প্রভাব ফেলেছে ১ কোটি ৫৩ লাখ গ্রাহককে 


পিডিবির হিসাব বলছে- শুধু স্ল্যাব পুনর্গঠনের কারণেই প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক বাড়তি বিলের চাপে পড়বেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪ কোটি ৩১ লাখের বেশি আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ লাইফলাইন গ্রাহক, যারা মাসে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। আরও ২২ শতাংশ গ্রাহক ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। অন্যদিকে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ গ্রাহক মাসে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। বাকি চারটি ধাপ যথাক্রমে ২০০ থেকে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ শতাংশ।


স্ল্যাব পরিবর্তনে সে কারণে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এই শ্রেণির ওপর; যারা বিলাসিতা নয় নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও কিন্তু অতিরিক্ত চার্জে বিল দিচ্ছেন। এমন গ্রাহকদের বেশিরভাগই সাধারণত বাসায় নিয়মিত একাধিক বাতি, ফ্যান, ফ্রিজ ও টিভি চালাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।


কী বলছেন গ্রাহকরা


রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মোখলেসুর রহমান নওরোজকে বলেন, আমার পরিবারের চারজন সদস্য। শুধু ফ্যান, লাইট ও ফ্রিজ ব্যবহার করি। এতেই আগে যে বিল আসতো সেই তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি টাকা এখন মাসিক বিলে গুণতে হচ্ছে আমাকে। অথচ আয় বাড়েনি। তাহলে কীভাবে এই অতিরিক্ত খরচ বহন করবো?


রাজশাহীর গৃহিণী লাবণী আক্তার বলছেন, বিদ্যুৎ খরচ দিন দিন লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মাসিক চার্জ যেভাবে বাড়ছে তাতে আমাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। এই অবস্থা থেকে আমরা নিষ্কৃতি চাই। আমাদের সামর্থের কথা ভেবে প্রথম ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিলে অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার করা উচিত সরকারের। 


দিনাজপুরের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিলের হিসাব দেখে আমরা দিশেহারা। একদিকে বাড়ির বিদ্যুৎ খরচ, অন্যদিকে জমিতে সেচের জন্য বিদ্যুতের খরচ সব মিলিয়ে যে টাকা আসে তা জোগাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে আমাদের। এটি আমাদের ওপর এক ধরনের জুলুম। সরকারের উচিত বিদ্যুৎ বিলের লাগাম টেনে ধরা। 


নীলফামারীর ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, আমার একটি তেলের মিল আছে। সরিষাসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের যে দাম সে তুলনায় তেলের যে দাম তাতে কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না আগে থেকেই। এখন বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি বাসার বিলও বেড়ে যাচ্ছে প্রতি মাসে। জানি না- ভবিষ্যতে এই মিল চালিয়ে যেতে পারবো কিনা। বিদ্যুৎ খরচ আমাদের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এই বিল কমানো উচিত সরকারের।       


প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ‘অযৌক্তিক’


এদিকে প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না বলে জোরালো দাবি জানিয়েছেন রাজনৈতিক ও বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনের বক্তারা। এ ব্যাপারে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) এর নেতা, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক মেঘমল্লার বসু বলেন, প্রথম ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না। দেশের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা ভেবে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সাধারণ মানুষ ২০০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ করে থাকে। এটিও যখন বাড়ানো হচ্ছে তখন তাদের বিলাসিতার উপর খরচ বাড়ানো হচ্ছে না, নিত্য প্রয়োজনীয় যে চাহিদা সেটার ক্ষেত্রে এই খরচ বাড়ানো হচ্ছে। 


তিনি বলেন, নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে প্রথম ২০০ ইউনিটে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে প্রথম ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের দাম এক টাকাও না বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জীবনযাত্রার খরচ কমানোর জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার মূল্য সহনশীল রাখতে হবে। 


বিদ্যুতের বিলাসী ব্যবহারের ওপর এক ধরনের কর আরোপ করা যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এই ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেবে না এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে দুই থেকে তিনশ’ ইউনিটের পর প্রতি ইউনিটের জন্য বিদ্যুতের ব্যয়ের হার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। ৪০০ ইউনিট ক্রস করলে আরও বেড়ে যাবে তাতে সমস্যা নাই। কিন্তু নিত্যান্ত সামান্য যে প্রয়োজন সে বিদ্যুৎটুকুতেও যদি বাড়তি মূল্য বসানো হয় সেটি জনগণের জন্য একটি জুলুম। 


নাগরিক সমাজের তীব্র বিরোধিতা


বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসির গণশুনানিতে লিখিত বক্তব্যে সংস্থাটি বলেছে, দাম বাড়ানো হলে মাসের খরচ বাড়বে, একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে। এ কারণে মানুষের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হবে। তবে তাদের আপত্তির দিকে কর্ণপাত করেনি সরকার।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, কী কী করলে বিদ‍্যুতের দাম কমানো যেতে পারে, এ পরিকল্পনা কেন নেই। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়। ক‍্যাপাসিটি চার্জ কমানোর কথা বলে না। 


ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, সরকার যেন মুনাফাখোর না হয়, সেটাই জনগণের প্রত‍্যাশা। কল‍্যাণের অর্থনীতি থেকে বিবেচনা করলেও বিদ‍্যুতের দাম কমানো যায়। 


সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী মানুষকে স্বস্তি দিতে চান, আর এখানে হচ্ছে উল্টোটা। সরকার মুনাফাভোগী হতে পারে না, ব্যবসা করতে পারে না। বিইআরসির আইন সংশোধন করতে হবে। লুটপাটের বাংলাদেশ থেকে বের হতে হবে। 


ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, খরচ না কমিয়ে লুণ্ঠনের সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে সরকার। আর ঘাটতির সংকট দেখিয়ে ভোক্তার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। তিনি বলেন, পিডিবি দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দিতে পারে, ঘাটতি পূরণের কৌশল বলে দিতে পারে না। বিদ্যুৎ বিলের ধাপ পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। এর মানে হলো- নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা।


অধ্যাপক শামসুল আলম বিতরণ সংস্থাগুলোর এই ‘অযৌক্তিক ব্যয়’ গ্রাহকদের ওপর চাপানোর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, গত ১০-১৫ বছর ধরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দাম নিয়ে সংস্থাগুলো যে মুনাফা করেছে, তার হিসাব কোথায়? তাদের জবাবদিহিতার আওতায় না এনে খরচের দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।


বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য প্রফেসর ম. তামিম বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কেবল বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর। বিশেষ করে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।


বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিস্টেম লস, ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলো বন্ধ করার দাবি ছিল ভোক্তাদের। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর খড়্গ নামানো হলো, যা খুবই দুঃখজনক। যেখানে বিভিন্ন দেশ ক্ষুদ্র প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য বিল মওকুফের কথা বলছে, সেখানে ভর্তুকি কমানোর কথা বলে ক্ষুদ্র গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হলে স্বাভাবিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে।’


৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব


গণশুনানিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স)। 


তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সাংবিধানিক অধিকার। এটি সেবা খাত, লাভজনক বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মানুষের পকেট কেটে টাকা নেওয়ার নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে পিডিবি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বোবা কান্না দেখার কেউ নেই, ধাপ বদল করে আরও টাকা নিতে চায়। এমন প্রস্তাব যারা দেয়, তাদের মধ্যে জনস্বার্থ নেই। তাই দাম বাড়ানো অনৈতিক। 


জানা গেছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন এই কৌশল নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ধাপ (স্ল্যাব) বদল করে আয় বাড়াতে চায় সংস্থাটি। এতে কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা হারাচ্ছেন গ্রাহকদের একটি বড় অংশ। এ ছাড়া বছরে দুবার দাম সমন্বয় চায় পিডিবি। 


দাম বাড়ানোর আগমুহূর্তে পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেছিলেন, আর্থিক ঘাটতির কারণে জ্বালানি (তেল, কয়লা) কেনা যাচ্ছে না, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল দেওয়া যাচ্ছে না। খরচ কমিয়েও ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। কয়েক বছরে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। জ্বালানির দাম বাড়তি। তাই বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘাটতি কমাতেই আবাসিকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধাপ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। 


বিইআরসি বলছে, উৎপাদন, সঞ্চালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ বৃদ্ধি ও অনিয়ম-দুর্নীতি দেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। যার দায়ভার বছরের পর বছর বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাকে। 


এসব বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দাম বাড়ানোর ফলে মানুষের ব্যয় বাড়বে, তবে অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এটা করার সুযোগ আছে।


পাঠকের প্রতি নওরোজের ঘোষণা


অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ নানা প্ল্যাটফর্মে প্রতিবাদে সরব হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে এ নিয়ে নানা পোস্ট করছেন, কমেন্টস করছেন। জনমত বলছে- মানুষ এ থেকে নিষ্কৃতি চাচ্ছে। 


আপনাদের দুর্ভোগের বিষয়টি উপলব্ধি করে নওরোজ এ ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। 


আপনারা নওরোজের পেজটি লাইক দিন, শেয়ার করুন এবং আপনাদের মতামত কমেন্টে আমাদের জানান। পরবর্তীতে আমরা এ ব্যাপারে ধারাবাহিক প্রতিবেদন আপনাদের সামনে তুলে ধরবো এবং আপনাদের দাবির প্রতি সোচ্চার থাকবো।   



সর্বশেষ সব খবর

ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:৩৫ পিএম

বাংলাদেশের শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা বৃদ্ধি ও দুদেশের মধ্যকার ব্যবসা ও বিনিয়োগ আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক (Sarah Cooke) রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান।


রাষ্ট্রপতি বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার। তিনি বলেন, ব্রিটেনে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা ব্রিটেন ও বাংলাদেশের মধ্যকার বন্ধন জোরদার ও উন্নয়নে প্রভূত অবদান রাখছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি কমনওয়েলথের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়ন ও অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে।


এ সময় সারাহ কুক (Sarah Cooke) রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের পক্ষ থেকে একটি অভিনন্দনপত্র হস্তান্তর করেন। রাষ্ট্রপতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনপত্রের জন্য রাজা তৃতীয় চার্লসের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনারের মাধ্যমে রাজার প্রতি শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন।


রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক আগামী দিনে আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ হবে।


রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারণ, কমনওয়েলথ এর শিক্ষাবৃত্তি বৃদ্ধি, দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা কামনা করেন।


রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এসেছে। এ ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ সময় ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির গণতন্ত্র চর্চায় যুক্তরাজ্যের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি দুই দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক সফর ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেন।


হাইকমিশনার এ সময় জানান, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ পণ্য এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আরো তিন বছর যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত অবাধ প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে। রাষ্ট্রপতি এ সুবিধাকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।


ব্রিটিশ হাইকমিশনার বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ডিজিটাল ক্লাইমেট ডাটা বিনিময়ের উদ্যোগের বিষয়েও রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। দুই দেশের মধ্যে আবহাওয়া ও জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে এ উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে রাষ্ট্রপতি সন্তোষ প্রকাশ করেন।


সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রেস সচিব, ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার ও উন্নয়ন পরিচালক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ সব খবর

হাওড়া ফিশ মার্কেটের ইলিশ

  • প্রকাশ : সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৫:৩৯ পিএম

বাংলাদেশের ইলিশের জন্য মুখিয়ে থাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে তৈরি হয় আগ্রহ। অথচ এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো। দেশের বাজারের ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকেই ইলিশ আসছে ‘ইলিশের দেশে’। 


চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টেই এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি। জুলাইয়ে এসেছিল ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি। আমদানি করা এসব ইলিশের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।


বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বে মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বাংলাদেশে হয় বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। দেশের নদনদী ও বঙ্গোপসাগর ইলিশের অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। সেই বাংলাদেশের বাজারেই এখন ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ইলিশের জোগান কমে যাওয়ায় চাহিদা মেটাতে আমদানি করতে হচ্ছে।


ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা ও হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই মাসে ভারত থেকে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে। হাওড়া পাইকারি ফিশ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদকে উদ্ধৃত করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে এবার ইলিশের ঘাটতি থাকায় প্রথমবারের মতো হাওড়া বাজার থেকেও ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। সাধারণত হাওড়া থেকে বাংলাদেশে রুই, পারসে, ট্যাংরাসহ বিভিন্ন মাছ যায়।


গুজরাটের ইলিশের ক্ষেত্রেও এবার ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গুজরাটে এবার ইলিশের জোগান ভালো হওয়ায় তুলনামূলক কম দামে মাছ পাওয়া যাচ্ছে। ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা থাকায় এসব মাছ বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ইলিশের ডিম আলাদা করে বিক্রি এবং কিছু মাছ নোনা ইলিশ হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে। আরও ১০০ থেকে ১৫০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।


বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট মাসে মোট ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ইলিশ এনেছে। জুলাইয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। আমদানি করা এসব মাছের ঘোষিত মূল্য ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা।


জুলাইয়ে আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা। বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম বলেন, প্রথম দুই মাসে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। মাছ পরীক্ষা করে কোয়ারেন্টাইন সনদ দেওয়া হয়েছে। 


বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, জুলাইয়ে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ভারতীয় ইলিশ আমদানি হয়েছে। কাস্টমসের ছাড়পত্র ও বন্দরের শুল্ক আদায়ের পর আমদানিকারকরা বাংলাদেশি ট্রাকে করে এসব মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গেছেন।


বেনাপোল, যশোরের বড় বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে এখন আমদানি করা ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। এসব মাছের বড় অংশ ভারতীয় ইলিশ বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানালেও স্থানীয় বাজারে কিছু ব্যবসায়ী এগুলোকে মিয়ানমারের ইলিশ বলছেন। আবার ক্রেতাদের অভিযোগ, ভারত বা মিয়ানমার থেকে আসা মাছকে পদ্মা, চাঁদপুর, বরিশাল কিংবা চট্টগ্রামের ইলিশ বলে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।


ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, ১ কেজি ২০০ থেকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ বর্তমানে কেজিপ্রতি ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিপরীতে একই ধরনের আমদানি করা ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। কম দামে বড় মাছ পাওয়ায় অনেক ক্রেতা আমদানি করা ইলিশের দিকে ঝুঁকছেন। এতে দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন তারা।


যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, আমদানি করা মাছ দেশি বলে বিক্রি করার বিষয়টি মৎস্য আইনের আওতায় সরাসরি পড়ে না। ফলে আমরা এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। 


বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। মৎস্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, বাংলাদেশের নদীগুলোতে দূষণ ও নাব্য সংকট দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় ইলিশের আবাস ও চলাচলের ওপর চাপ বাড়ছে। 


বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে গিয়ে যদি বাজারের চাহিদা পূরণে প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে এটি ইলিশের জন্য বড় হুমকি।

সর্বশেষ সব খবর

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

  • প্রকাশ : সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৫:০৯ পিএম

‘ডোপ টেস্ট’-এ মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় পুলিশ অধিদপ্তরের পুলিশ সুপার (টিআর) আ ফ ম নিজাম উদ্দিনকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি রংপুর রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১০ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। 


প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মিরপুর সেনানিবাসে ‘ডিএসসিএসসি-২০২৬’ কোর্সে অংশ নিতে গত ৮ জানুয়ারি পুলিশ অধিদপ্তর থেকে যান নিজাম উদ্দিন। কোর্স চলাকালে গত ৭ জুন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়।


প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে আনুষঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে নিজাম উদ্দিনের ‘ডোপ টেস্ট’ করা হয়। পরীক্ষায় ‘পজিটিভ’ আসে, যা এই কোর্সের শৃঙ্খলা পরিপন্থী।


সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, নিজাম উদ্দিনকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।


প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সাময়িক বরখাস্তকালে নিজাম উদ্দিন বিধি অনুযায়ী খোরপোশ ভাতা পাবেন।


জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

সর্বশেষ সব খবর

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ

  • প্রকাশ : সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৩:৩৭ পিএম

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হবে। শিগগিরই ঘোষণা করা হবে নির্বাচনের তফসিল। এ কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তবে কবে নাগাদ তফসিল ঘোষণা করা হবে- সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা তিনি জানাননি। 


ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার ব্যাপারে ইসির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।


আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হবে। যদি এই সময়ের মধ্যে আইন পরিবর্তন না হয়, তবে আমরা বিদ্যমান আইন অনুযায়ীই স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা করব।’


স্থানীয় নির্বাচনের তফসিল সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ঘোষণা করা হবে কি না- এমন প্রশ্নের কোনো মন্তব্য না করে তিনি বলেছেন, শিগগিরই ইসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে।


এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছিলেন, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারের ভোটগ্রহণ শুরু হবে। চলতি মাসেই এ নির্বাচনের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে। 


আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আরও জানিয়েছিলেন, ‘আমরা আশা করছি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু হবে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন একটা পর্যায়ে গেলে আমরা সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো করব।’


ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তফসিল কবে হবে- সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই মাসের মধ্যেই আপনারা অনেক কিছু দেখবেন এবং অনেক কিছুই আমরা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারব। আমাদের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ খুব দ্রুত গতিতে চলছে।’ 


এ নির্বাচনের তফসিল এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বার্ষিক, বৃত্তি ও টেস্ট পরীক্ষাসহ নানা ব্যস্ততা থাকে। ভোটকেন্দ্র হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহৃত হয় এবং শিক্ষকরাই প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। তাই পরীক্ষার সময়গুলো বাদ দিয়ে, আগে বা পরে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা নির্বাচনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।


তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা এবার আরও সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছি। সব ভোটকেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুভমেন্ট দ্রুত করতে ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি বডি-ওর্ন ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো হবে। এছাড়া অপতথ্যের ঝুঁকি মোকাবিলাতেও আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।


আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও আচরণবিধিতে কিছু কড়াকড়ি থাকছে। ভিআইপিরা যেন সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে না পারেন, সেটির বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া পচনশীল নয় এমন দ্রব্য বা পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই এ সংক্রান্ত সংশোধিত আচরণবিধির প্রজ্ঞাপন জারি হবে।


এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিলে সহকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করেন, যা ভোটকেন্দ্রে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দেয়। শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে এবং শিক্ষকদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে তারা যেন নির্বাচনে অংশ না নেন, এমন একটি পর্যবেক্ষণ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে ইসি।

সর্বশেষ সব খবর

মেট্রোরেল

  • প্রকাশ : সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ১১:২৮ এএম

অবশেষে ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের লাইন-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট অনুমোদনের জন্য উঠছে। আগামী বুধবার অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি উপস্থাপন করছে পরিকল্পনা কমিশন। একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করবেন। 


প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাজধানীর পশ্চিম অংশ গাবতলী থেকে পূর্ব অংশ দাশেরকান্দিতে যাওয়া যাবে মাত্র ২৮ মিনিটে। পরিবহন ব্যয়ও কমবে। রুটে প্রতিদিন যাতায়াত করবেন ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী। প্রতিটি ট্রেনে যাত্রী ধারণক্ষমতা দুই হাজার ৩১২ জন। ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে। সড়কে গাড়ি চলাচল কমবে ১ হাজার ৪৯টি। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বাতাসে ২ লাখ ৮ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারবে এ প্রকল্প।


২০৩০ সালের জুনে এই মেট্রোরেল নগরবাসীর ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হবে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০৩২ সাল পর্যন্ত। এটি মেট্রো লাইন-৫ (উত্তর) ও মেট্রো লাইন-২-কে সংযুক্ত করবে। এর ফলে গোটা রাজধানীই মেট্রোরেল অবকাঠামোর আওতায় আসবে। 


মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ) লাইনের রুট পরিকল্পনায় দেখা যায়, মোট স্টেশন থাকছে ১৫টি। গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাছিরাবাদ ও সর্বশেষ স্টেশন হবে দাশেরকান্দি। দৈর্ঘ্য হবে ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার পাতালপথ। উড়ালপথ ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার। পাতাল স্টেশন হবে ১১টি। উড়াল স্টেশন চারটি। 


সূত্র বলছে, এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পটি অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে বর্তমান সরকার। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ ও পরিবহন খাত নিয়ে যে রূপরেখা দেওয়া হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, মৌলিক প্রকৌশল নকশা, দরপত্র, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন-সংক্রান্ত পরিকল্পনার কাজ শেষ করা হয়েছে আগেই। 


গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাদীউজ্জামান বলেন, প্রকল্পটি অবশ্যই গণমুখী। তবে অন্য মেট্রোরেল প্রকল্পের তুলনায় এ প্রকল্পে যাত্রী চাহিদা তুলনামূলক কম। প্রতিটি স্টেশনের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের বিষয়টি প্রকল্পভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রকল্পটি আরও বেশি গণমুখী হয়। প্রকল্পটির বড় অংশ পাতাল হওয়ায় নির্মাণ ও পরিচালনও চ্যালেঞ্জিং। সে বিষয়েও সতর্কতা প্রয়োজন।


পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির শুরুর দিকে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে প্রস্তাব পুনর্গঠন করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) এ প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে। আগের প্রাক্কলনে মোট ব্যয় ধরা হয় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এবার ব্যয় ধরা হচ্ছে ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। এই ব্যয়ে এডিবি ও ইডিসিএফ দিচ্ছে ৩২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব জোগান। 


প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়ন বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, আলোচনা ও চুক্তি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এস এম জাকারিয়া হক বলেন, এ বিষয়ে এডিবির সঙ্গে আগেই কাঠামো চুক্তি হয়েছিল। নতুন করে আবার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। 


গাবতলী থেকে আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ ‍সালে। ২০২২ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করা হয়। এ বাবদ এবং ডিটেইল্ড ডিজাইনে মোট ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির অনুমোদন আটকে যায়। পরে ব্যয় কমিয়ে একনেকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাড়া না পাওয়ায় একনেকে ওঠানো যায়নি। 


জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব বলেন, বর্তমান সরকার প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে চাইছে। উন্নয়ন সহযোগীরাও তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছে। নগরবাসীর যোগাযোগ উন্নয়ন এবং যানজট থেকে মুক্তির জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ।


রাজধানীতে যানজটের সমস্যা কমাতে সরকারি গণপরিবহন নেটওয়ার্ক হিসেবে পাঁচটি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। মেট্রোরেল-৬ এরই মধ্যে চালু হয়েছে, যা নগর যাতায়াতে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে।

সর্বশেষ সব খবর

আইজিপি আলী হোসেন ফকির

  • প্রকাশ : রবিবার ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় : ৮:৪০ পিএম

১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা যাকে হত্যা করে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিল, সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ ফকিরের রক্ত ও ত্যাগের উত্তরাধিকার আজ স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ আসনে।


অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে যাঁর পুত্র আলী হোসেন ফকির আজ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), তাঁকে ঘিরে শুরু হয়েছে বহুমুখী সংস্কার প্রচেষ্টা এবং সমান্তরালে তীব্র অপপ্রচার। 


এই লড়াই কেবল একজন ব্যক্তির পদ রক্ষার লড়াই নয়, বরং একটি স্বাধীন দেশের পুলিশ বাহিনীকে দল দাসত্ব থেকে মুক্ত করে 'জনগণের পুলিশ' হিসেবে গড়ে তোলার ঐতিহাসিক লড়াই।


বাবার মাথাবিহীন কবরের ছায়া থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বে 


১৯৭১ সালে শহীদ নূর মোহাম্মদ ফকিরকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তাঁর পরিবার একটি মাথাবিহীন মরদেহ দাফন করতে বাধ্য হয়েছিল। যে শিশুটি সেদিন পিতৃহীন শৈশব পার করেছিল, আজ তিনি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্বে। 


স্বাধীন দেশের মাটিতে বড় হওয়া সেই সন্তান আলী হোসেন ফকিরের কাঁধে এখন পুলিশ বাহিনীকে জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত করার বিশাল দায়। 


স্বাধীনতার মূল্য যে পরিবার রক্ত দিয়ে পরিশোধ করেছে, সেই পরিবারের উত্তরসূরির হাত ধরেই আজ রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কঠিন দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।


সংস্কারের চ্যালেঞ্জ ও জনগণের পুলিশ গড়ার অঙ্গীকার


বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় পুলিশ বাহিনীকে অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের করে আধুনিক, পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও জনগণবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা থানা হবে বিচার চাওয়ার নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না।


পুলিশ কোনো ব্যক্তি, দল বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত বাহিনী না হয়ে প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসেবে কাজ করবে এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর। কিন্তু দীর্ঘদিনের চর্চিত ক্ষমতা ও সুবিধার সংস্কৃতিতে যখন আঘাত লাগে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই স্বার্থান্বেশী মহল থেকে প্রতিরোধ ও ষড়যন্ত্রের সৃষ্টি হয়।


অপপ্রচার, কুৎসা ও সত্য উদঘাটনের দাবি


সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ও কুৎসা ছড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তথ্য-প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক বিদ্বেষ ও চরিত্রহননের উদ্দেশ্যে পরিচালিত এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে অতীতের সুবিধাভোগী ও পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চক্রের অর্থায়নের গুঞ্জন রয়েছে। 


সচেতন মহল মনে করেন, আলী হোসেন ফকির সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন এবং তাঁর কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি; তবে প্রমাণ ছাড়া অপপ্রচার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কখনো ন্যায়বিচার বা সাংবাদিকতা হতে পারে না।

 

প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে কে বা কারা অর্থ দিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে, তা জাতির সামনে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।


ব্যক্তি আলী হোসেন ফকিরকে টিকিয়ে রাখা এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য নয়; বরং পুলিশ বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কার এবং জনগণের পুলিশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আসল কথা। 


শহীদ মুক্তিযোদ্ধার রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো এমন একটি পুলিশ বাহিনী তৈরি করা, যার পোশাক দেখলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত নয়, বরং নিরাপদ বোধ করবে। মিথ্যা, কুৎসা ও ষড়যন্ত্রকে পেছনে ফেলে পুলিশ যেন সত্যিকার অর্থেই জনগণের প্রজাতন্ত্রের বাহিনী হয়ে উঠতে পারে এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সর্বশেষ সব খবর