আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া
ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।
নাসীরুদ্দীনের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের আজ শুক্রবার রাতের মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, আপনারা যদি ভায়োলেন্স (সহিংসতা) বেছে নেন, তাহলে আমাদেরকেও ভায়োলেন্স বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে।’
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে হুঁশিয়ার করে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘বিরোধী দল থেকে বারবার সদিচ্ছা দেখানো হলেও সরকারি দল ভায়োলেন্স চাচ্ছে। আমাদের রক্ত গরম এবং বয়স কম হলেও আমরা বুঝি যে কখন কী করতে হবে, কখন দেশ গড়ার দিকে কাজ করতে হবে। কিন্তু যদি সরকারি দল ভায়োলেন্স চায়, সেটাকেই একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিতে চায়, তাহলে এটা যে আমাদের থেকে বেশি কেউ পারবে না, সেটা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি।’
আজ বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আসিফ মাহমুদ এ কথা বলেন। এই অনুষ্ঠানে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের উদ্যোগে গঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইউনাইটেড পিপল’স বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) ঢাকার দুই মহানগরের ২২৯ জন নেতা–কর্মী এনসিপিতে যোগ দেন।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানান এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে, কিন্তু তারা প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে মোকাবিলার একধরনের কৌশল নিচ্ছে। এটা বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বিরোধী দল বারবার সরকারকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দল এনসিপির নেতা আসিফ মাহমুদ। এরপর একসঙ্গে একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানও বিরোধী দল জানাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল থেকে বারবার এই সদিচ্ছা দেখানো হলেও সরকারি দল ভায়োলেন্স চাচ্ছে।’
সংঘাতের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে যদি এটা করতে চান, এই লড়াইটা কোনো রাজনৈতিক দল, নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা আদর্শের সঙ্গে হবে না; এই লড়াইটা হবে পুরো একটা প্রজন্মের সঙ্গে। এই প্রজন্মের সঙ্গে লড়াই করার ভুলটা শেখ হাসিনা করেছিলেন। আশা করি, এই ভুলটা তারেক রহমান করবেন না। আমাদের সহযোদ্ধাদের ওপর যাঁরা হামলা করেছেন, ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে সবার পরিচয় এসেছে। আজ রাতের মধ্যে তাঁদের সবাইকে অবশ্যই গ্রেপ্তার করতে হবে। যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, আপনারা যদি ভায়োলেন্স বেছে নেন, আমাদেরকেও ভায়োলেন্স বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে।’
বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ করেন জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর থেকে খুন, ধর্ষণ ও নাগরিকের নিরাপত্তার সংকট চরমভাবে বেড়েছে। আজ আমাদের মা–বোনেরা ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে মাঝেমধ্যে প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতি বলে মনে হয় উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন না কিংবা করতে তাঁর মধ্যে একধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। এভাবে দেশ চলতে থাকলে বাংলাদেশের জনগণ সামনের দিনে বাধ্য হবে এই সরকার ও ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসতে।’
‘দমনের চেষ্টা করলে তাদেরও খারাপভাবে পতন হবে’
অনুষ্ঠানের আরেক বিশেষ অতিথি এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ঝিনাইদহের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে জুমার নামাজের পর মতবিনিময় করবেন। তখন তাঁর ওপর ছাত্রদল–যুবদলের নেতা–কর্মীরা সন্ত্রাসী কায়দায় আক্রমণ চালান। সেখানে জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক থেকে শুরু করে সেখানকার সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদলের আহ্বায়কেরা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। কিছুদিন আগে শাহবাগ থানার ভেতরে ঢুকে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা সাংবাদিক ভাইদের পিটিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সেই হামলার কোনো ধরনের বিচার হয়নি।
ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা সম্পর্কে এনসিপি নেতা সারজিস বলেন, ‘আমাদের বোনকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যার পর গতকাল আমরা দেখলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়ে সহমর্মিতা জানিয়েছেন। আমরা ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু এই সহমর্মিতা যদি শুধু এক দিনের ইস্যু ধামাচাপা দেওয়ার খেলা হয়, পরের ছয় মাসেও বিচারের কোনো দিশা খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে এই সহমর্মিতার কার্ড আগামীর বাংলাদেশের জনগণ আর মেনে নেবে না।’
বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে সারজিস আলম বলেন, ‘আপনার ছাত্রদল–যুবদলের নেতা–কর্মীরা অভ্যুত্থানে আমাদের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা–সম্মান দেখাতে চাই। কিন্তু তাঁরা যদি আগের ছাত্রলীগ–যুবলীগের মতো সন্ত্রাসী কায়দায় রাজনৈতিক আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা করেন, তাহলে তার চেয়ে খারাপভাবে তাদের পতন হবে, ইনশা আল্লাহ। আমরা স্পষ্ট করে বলছি, আগামীর বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে অন্য কোনো দলমতের ওপর দমন–পীড়ন আর মেনে নেওয়া হবে না।’
এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ। সঞ্চালক ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব শাহরিন সুলতানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যারা ১৫ বছর ধরে গুম, খুন ও নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের আশকারা দিচ্ছেন কেউ কেউ। সাপ নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন না, সেই সাপই ছোবল দিয়ে শেষ করে দেবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর শহিদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ কখনো স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন শেষে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারেনি। দলটি সব সময় লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে বিদায় নিয়েছে। কেউ যদি আবার সেই পথ অনুসরণ করতে চান, তা হলে তাদের পরিণতিও ভিন্ন হবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা কোনো প্রতিহিংসার বিচার চাই না, ন্যায়বিচার চাই। অন্যায়ভাবে কাউকে ফাঁসি দেওয়া তো দূরের কথা, কারও একটি লোম ধরে টান দেওয়া হোক তাও আমরা চাই না। তবে ন্যায়বিচার হলে প্রতিটি অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে। এই বাংলাদেশ আমাদের সবার। কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তির হাতে বাংলাদেশকে ইজারা দেব না। আমরা আমাদের বাংলাদেশকে দেখে-শুনে রাখব, পাহারা দিয়ে রাখব।
জামায়াতের নেতাদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, জীবন একটাই— এ জীবন আল্লাহর জন্য ও মানবতার জন্য উৎসর্গ করতে আমরা প্রস্তুত। তবে কোনো অন্যায়ের কাছে আমরা মাথানত করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমার দলের নেতাদের পা কাঁপেনি, ঠোঁট কাঁপেনি। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, তাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে এবং তারা শহিদ হয়ে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
বিগত সময়ে গুম ও হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার দলের অনেক সহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের কারও কারও কবর এখনও পরিবারের সদস্যরা খুঁজে পাননি। অনেক মা-বাবা এখনও জানেন না, তাদের সন্তান বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। মারা গিয়ে থাকলে তার কবর কোথায়, সেটিও তারা জানেন না। গত ১৫ বছরে এসব ঘটনা ঘটেছে, এরপরও কেউ কেউ সেই শক্তিকে আশকারা দিচ্ছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, রাজনীতি যদি মানুষ হত্যা করার নাম হয়, তা হলে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারে। কিন্তু রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণে দেশ গড়া, দেশকে এগিয়ে নেওয়া, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্য দূর করার নাম হয়, তা হলে আওয়ামী লীগের সেই যোগ্যতা নেই। এ কারণে বাংলাদেশে দলটির রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ওই দলের মধ্যে যারা ভালো মানুষ এবং দেশকে ভালোবাসেন, তারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক ঠিকানা খুঁজে নেবেন। তবে ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশে আবার ফিরে আসবে, এমন কল্পনা কাউকে না করার আহ্বান জানান তিনি।
হামিদুর রহমান আযাদ
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার নৃশংস হামলায় নিহতদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ২৮ অক্টোবর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রক্ত, কান্না ও নির্মমতার এক কলঙ্কিত অধ্যায়। সেদিন মানুষের জীবনের ওপর যেভাবে বর্বরতা চালানো হয়েছিল, তা সভ্য সমাজের বিবেককে আজও নাড়া দেয়।
তিনি বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সেদিন দেশব্যাপী তাণ্ডব চালায়। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামায়াতে ইসলামীর জনসভায় লগি-বৈঠা, লোহার রড ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে ঢাকাসহ সারাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ১৪ জন নেতাকর্মী নিহত এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হন। নিহতদের নিথর দেহের ওপর নৃত্য করে উল্লাসের যে পৈশাচিক দৃশ্য দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল, তা জাতির বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সন্তানহারা মা-বাবা, স্বামীহারা স্ত্রী এবং স্বজনহারা পরিবারগুলোর বুকফাটা আর্তনাদ আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় দায়ের করা মামলা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রত্যাহার করে বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিন ধরে বিচার না হওয়া নিহতদের পরিবারের প্রতি চরম অবিচার। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ক্ষমতার দাপট হত্যাকাণ্ডের বিচার আটকে রাখার অজুহাত হতে পারে না। আমরা প্রতিশোধ চাই না, আমরা ন্যায়বিচার চাই; আমরা প্রতিহিংসা চাই না, আমরা হত্যাকারীদের আইনের আওতায় দেখতে চাই।
ড. হামিদ আযাদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল- দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। অতীতের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে। তাই ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো পুনরায় সচল করে নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায়, তাঁদের পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান যেন ঘটে- তাই আজ জাতির নৈতিক দায়িত্ব।
পরিশেষে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে ২৮ অক্টোবর নিহতদের শহীদ হিসেবে কবুল করার দোয়া করেন। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ব্যক্তিদের এবং তাঁদের পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি নিহতদের রুহের মাগফিরাত এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর সদস্যদের ধৈর্য ধারণের তাওফিক কামনা করেন।
ডা. তাসনিম জারা ও নুসরাত তাবাসসুম
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম বলেছেন, আমি তাসনিম জারা আপাকে অনেক সম্মান করি, উনি জোট ঘোষণার পরপর পদত্যাগ করেন। তিনি তখন পিসি (এনসিপির সর্বোচ্চ পরিষদের অংশ) মেম্বার ছিলেন। আমি তখন এক্সিকিউটিভ বোর্ডের মেম্বার ছিলাম। আমি রাগান্বিত ছিলাম কারণ, তার পদত্যাগ নিয়ে কখন কী হয়েছে, সেটি আমাদের কাছে পরিষ্কার করা হয়নি।
সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাতকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
নুসরাত তাবাসসুম বলেন, জারা আপু জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের আলোচনার অংশ ছিলেন। তিনি আলোচনার পর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তার এ সিদ্ধান্তের পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলছি- এই জিনিসটা নিয়ে তার রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা, উচ্চাকাঙ্খা ও পরিকল্পনা- যে কারোর থাকতে পারে।
‘তিনি শুধু জামায়াতের সঙ্গে জোটের জন্য পদত্যাগ করেছে- এটা বলা ভুল। আরও অসংখ্য কারণ এখানে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ত্রয়োদেশ জাতীয় নির্বাচনের আগে এনসিপিতে ভাঙন দেখা দেয়। তরুণ মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল কিছু নেতা বেরিয়ে যান।
দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীনসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে দূরে সরে যান। তখন সামান্তা শারমিনসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতার দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তারা দল ছাড়েননি। নির্বাচনের পর থেকেই পদত্যাগীদের দলে ফেরানোর চেষ্টা করে আসছে এনসিপি।
সম্প্রতি এনসিপি বেশ কিছু নেতার বক্তব্যে তাদের দলে ফেরানোর বিষয়ে আগ্রহ শোনা যায়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, দেশে এখন কায়দা করে মাদ্রাসাগুলোকে সাধারণ স্কুলে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সমাজের একটি পক্ষ চায় না দেশে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটুক। কারণ নৈতিক শিক্ষা না থাকলে খুব সহজেই চাঁদাবাজ ও লুণ্ঠনকারী তৈরি করা যায়।
মেধা ও চরিত্রের সঠিক সমন্বয় না হলে সমাজ জঙ্গলে পরিণত হয়। এ জন্য তিনি দেশের সামগ্রিক সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়ও বাধ্যতামূলকভাবে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন আয়োজিত দিনব্যাপী ‘১৪তম হিফজুল কোরআন অ্যাওয়ার্ড ও কোরআন উৎসব ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাগুলো এখন ভূতুড়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এমপিওভুক্ত যেসব মাদ্রাসা আছে, সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। সিলেবাসকে সংকুচিত করা হয়েছে। মাদ্রাসা নিয়ে এ ধরনের ষড়যন্ত্র যারা করছে, তারা কি আমাজনের জঙ্গল থেকে এসে করছে? না, এ দেশের মানুষেরাই, সন্তানেরাই করছে।
অনুষ্ঠানে সারা দেশ থেকে আগত তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন শাখার কৃতী হাফেজদের মধ্যে বর্ণাঢ্য ‘১৪তম হিফজুল কুরআন অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পদক ও বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়। কৃতী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কোরআনে কারিম হিফজ সম্পন্ন করার পেছনে বাবা-মায়ের অপরিসীম ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনুষ্ঠানে উপস্থিত তাঁদের অভিভাবকদেরও বিশেষ ‘অভিভাবক সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক কামাল উদ্দীন আবদুল্লাহ জাফরী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম এবং গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান শাহ ওলীউর রহমান চিশতি, ডিরেক্টর আ. ন. মু. রাশিদুল ইসলাম সায়েম, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ড. মীম আতিকুল্লাহ প্রমুখ।
মানিকগঞ্জে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক যুবকের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার পর আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মো. তমাল মানিকগঞ্জ সদর থানা ও এনসিপির জেলা কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগে তমাল বলেন, মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সুপারভাইজার পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আরিফুল ইসলাম তাঁর কাছ থেকে জামানত হিসেবে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন। এ সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল প্যাডে একটি নিয়োগপত্রও দেওয়া হয়। তবে ওই নিয়োগপত্র নিয়ে হাসপাতালে যোগ দিতে গেলে তাঁর নামে কোনো নিয়োগ হয়নি বলে জানতে পারেন তমাল।
পরে টাকা ফেরত চাইলে আরিফুল নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে টাকা ফেরত না দেওয়ার পাশাপাশি গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তমাল।
মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের কাজ করছে কে এস এফ ট্রেড লিমিটেড। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মানিকগঞ্জ জেলার দায়িত্বে রয়েছেন আরিফুল ইসলাম। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. শামীম হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “অভিযোগটি সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন। যে কেউ অভিযোগ দিলেই তো হয় না। ঘটনার সত্যতা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।”
আরিফুল ইসলামের বাবা ও মানিকগঞ্জ জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম বলেন, তাঁর ছেলে চাকরি দেওয়ার মতো কোনো পদে নেই। এ ধরনের কোনো বিষয় তাঁর জানা নেই এবং অভিযোগ থাকলে আরিফুল নিজেই তা দেখবেন।
এনসিপির মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি তাঁরা পেয়েছেন। কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি যাচাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, ডিউটি অফিসারের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। অভিযোগ হাতে পাওয়ার পর তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এলিজা জামান
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির প্রার্থী এলিজা জামান। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও পিরোজপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।
পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মহিলা দলের বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আজ সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এই উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মঈন উদ্দীন খানের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন তিনি। পরে মঈন উদ্দীন খান সাংবাদিকদের জানান, সোমবার মনোনয়নপত্র জমার নির্ধারিত দিনে এলিজা জামান মনোনয়নপত্র জমা দেন।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এলিজা জামান। সংরক্ষিত আসনে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই হবে। বাছাইয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বুধবার আপিল করার সুযোগ থাকবে।
কেউ আপিল করলে তার নিষ্পত্তি হবে ২৯ অক্টোবর। ১ নভেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপর ২ নভেম্বর প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। পরবর্তীতে সব প্রক্রিয়া সেরে ১২ নভেম্বর ভোটের তারিখ রাখা হয়েছে তফসিলে।
সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের নিয়ম অনুযায়ী, এ আসনটি বিএনপিই পাবে। ফলে এ আসনে অন্য কোনো দলের প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ নেই। মনোনয়নপত্রে কোনো জটিলতা না থাকলে নিয়ম অনুযায়ী বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এলিজা জামানই নির্বাচিত হবেন। সেক্ষেত্রে ভোটের তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন হবে না, যাচাই বাছাই ও আপিল নিষ্পত্তির আনুষ্ঠানিকতা সেরেই তাঁকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে ১ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন। পরে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয় এবং উপ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।