বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার চলমান। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎও আদালতেই নির্ধারিত হবে। এ বিষয়ে সংবিধানে সবকিছু বলা আছে। শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন মিলনায়তনে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) এ সভার আয়োজন করে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে এর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও আলোচনা হয়েছে। তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তারা ভুলে গিয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থান ছিল ছাত্র-জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সে সময় কেউ কেউ বিপ্লবী সরকার গঠনের কথাও বলেছিলেন, কিন্তু তা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘অনেকে অনেক রকম বক্তব্য দিতে পারেন। তবে আমাদের ঐক্য থাকতে হবে। বিতর্ক সংসদে হতে পারে, রাজপথেও হতে পারে। কেউ কেউ নতুন দল গঠন করে রাজনীতির কথা বলেন। কিন্তু চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার একাত্তরের চেতনার রাজনীতিও ব্যর্থ হয়েছে। রাজনীতির মাঠ অনেক কঠিন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উই হ্যাভ এ প্ল্যান। আমাদের স্বপ্ন আছে। যারা চেতনা বিক্রির রাজনীতি করছেন, তারা কেন যেন পতিত সরকারের পক্ষেই কথা বলছেন। সরকারের বয়স সাড়ে পাঁচ মাস। এখনই রাজপথে বলছেন সরকার ব্যর্থ। ব্যর্থ হতেও তো সময় লাগে।’
ওয়ান-ইলেভেন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সবচেয়ে বেনিফিশিয়ারি শেখ হাসিনা। এখন তিনি নিজ দেশে সঠিকভাবে প্রত্যাবর্তন করেছেন।’
ভারতে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভারত তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক থাকে না। বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন আর সম্পর্ক ঠিক রাখবেন—এটা চলবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই, দুঃখ প্রকাশও করেননি। আমরা শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে চাই। তা না হলে বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার আমাদের নেই। আজকে বলা হয়, জুলাই কার? জুলাই হলো আমাদের সবার।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভুমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে ও অনুষ্ঠান উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ইউট্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন অনুষ্ঠান উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, ইউট্যাবের যুগ্ম মহাসচিব ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক লুৎফর রহমান, ইউট্যাবের সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এসএম সোহাগ আওয়াল, ।
অনুষ্ঠানে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভুমিকা ও শহীদদের স্মরণে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের ভাই মো. আবু হোসেন, শহীদ ওয়াসিম আকরামের পিতা শফিউল আলম, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ও ইকরামুল হক সাজিদের মা নাজমা খাতুন লিপি। এসময় তাদেরকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননাও দেওয়া হয়।
এ ছাড়াও বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. কামরুল আহসান, প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মো. শামীম, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এসএম আব্দুর রাজ্জাক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছবিরুল ইসলাম হাওলাদার, ইউট্যাবের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল কালাম সরকার, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি, কোষাধ্যক্ষসহ অসংখ্য শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমাদের দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহ্য রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তারই চেতনার প্রতিফলন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সমস্ত প্রতিষ্ঠান আক্রমণের শিকার হয়েছে। শেখ হাসিনা যেভাবে চেয়েছে সেভাবেই চালাতে চেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তার বিপরীত হলেই নির্যাতনের খডগ নেমে এসেছে। যেমনটি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান একটি কলাম লেখার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্য কোনো কারণ দেখাতে পারেনি। এভাবে আরো অনেককেই ফ্যাসিবাদ আক্রমণ করেছে।
তিনি বলেন, আজকে জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে। অথচ সেসময় আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিতেন লন্ডন থেকে আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ভারত থেকে আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছাত্রদের প্রত্যেকটি আন্দোলন কর্মসূচিতে বিএনপির প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিলো। তা না হলে ছাত্রদলের ১৪২ জন শহীদ হলো কী করে? আমাদের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে ভরল কেন? পরে জেল থেকে বেরিয়ে শুনছি ১৪-১৫ শ’ মানুষকে হত্যা করেছে শেখ হাসিনা। কতো ভয়ংকর, আগ্রাসী ও রক্তপিপাসু হতো পারে শেখ হাসিনা! আজকে তার ব্যাপারে অনেকেই নরম সুরে কথা বলতে চেষ্টা করছেন কেনো?
রিজভী বলেন, বিরোধী দলের নেতার বাসায় জুলাই অভ্যুত্থানের একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়েছে। যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসহ বিভিন্ন বিষয় আছে কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কিছু নেই! এটা কেন? তারা যে বলেছিল সবাইকে ক্ষমা করে দিবেন তারই প্রমাণ!
দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত সরকার বলছে সে ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা নেই! এটা কিভাবে সম্ভব? আজকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েছে, মায়ানমার-চীন করিডোরের পরিকল্পনার কারণেই কি হাসিনা কার্ড খেলা হচ্ছে? পলাতক একজন ফ্যাসিস্টকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। এটা তো সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি মর্যাদা দেওয়া হলো না।
রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোর কথা বলেন রুহুল কবির রিজভী।
আরেক বিশেষ অতিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ইউট্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের দিনগুলো আমরা ভুলতে পারি না। তবে জুলাই একদিনে আসেনি। ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা ফ্যাসিবাদের চেহারা দেখেছি। আমরা মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারিনি, স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারিনি। ফ্যাসিবাদীরা চেয়েছিল তাদের মতো করে আমাদের পরিচালনা করতে। এ সময়ে আমাদের অনেক নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যখন জোরদার হয়, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউট্যাব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আমরা থেমে থাকিনি; বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছি।’
স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর আজ দেশে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। সরকারকে সময় দিতে হবে। রাতারাতি কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। আশা করি, তাঁর নেতৃত্বে আমরা একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাসিনা তাঁর অহংকারের কারণে জনরোষের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। অপরাধের একটি স্বাভাবিক পরিণতি থাকে।’
সভাপতির বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, তাহমিদসহ সব নাম না জানা শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তিনি বলেন, ‘এই বীর সন্তানদের অসীম সাহস, নিঃস্বার্থ ত্যাগ এবং অবিচল সংগ্রামের বিনিময়েই আজ বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি এই আয়োজনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। তাঁদের সন্তানদের তাজা রক্তের বিনিময়েই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমরা একটি নতুন বিজয়ের ইতিহাস অর্জন করেছি।’
বিগত ১৭ বছরের শাসনামলের নিপীড়নের কথা স্মরণ করে ড. মোর্শেদ হাসান খান বলেন, ‘প্রধান অতিথি সালাউদ্দিন আহমদের মতো দেশপ্রেমিক নেতাদের দীর্ঘ ১০ বছর পরিবার ও মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। বিশেষ অতিথি রুহুল কবির রিজভীও বিগত ১৭ বছরের চরম প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তির মধ্যেও একজন অভিভাবকের মতো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) আগলে রেখেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রদলের সোনালি ফসল হিসেবে পরিচিত এই নেতৃত্বই আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং বিএনপিকে মূলধারায় পরিচালিত করবে। আমাদের সবাইকে “জুলাই স্পিরিট” এবং “সবার আগে বাংলাদেশ” স্পিরিট ধারণ করে দেশ পরিচালনা করতে হবে। একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করতে হবে এবং তাঁর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।’
জিয়া উদ্যানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ছবি : সংগৃহীত
বিভিন্ন মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কথা বলার সুযোগ দিয়ে ভারত জুলাই শহীদদের রক্ত ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অপমান করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়া উদ্যানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
বিগত সরকারের সময়ে জুলুম-নির্যাতনের মধ্যেও সেবামূলক কাজ থেকে ড্যাবের চিকিৎসক কখনো বিরত থাকেননি বলে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, নানা ধরনের নিপীড়ন ও প্রতিকূলতার মুখেও চিকিৎসকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব ও রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে যাননি। অনেককে দুর্গম এলাকায় পদায়ন করা হলেও তারা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন।
তিনি বলেন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, বন্যা, করোনা, ডেঙ্গু ও হামসহ প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগে চিকিৎসকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। করোনা মহামারির সময়ও তারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সে সময় ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল পরিচালনার মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা তা করতে দেয়নি।
গ্লোবাল জার্নালিস্ট ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, এটি ভারতের নীতিনির্ধারকদের সহায়তায় আয়োজন করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বর্তমানে বাংলাদেশের পলাতক আসামি। বিভিন্ন হত্যা ও দুর্নীতির মামলায় তার বিচার চলছে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে চিঠিও দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই চিঠির কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন।
বিএনপির এই নেতা বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত চুক্তি থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অপমান আচরণ।
প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক প্রত্যাশা করে। তবে একজন পলাতক আসামিকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া সেই পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের পরিপন্থী। শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এক ধরনের হস্তক্ষেপ।
রিজভী বলেন, ৫ আগস্ট বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন ঘটে। অথচ সেই দিনেই দিল্লিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের একটি অংশ।
তিনি বলেন, যে গণআন্দোলনে বহু শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন, সেই আন্দোলনের স্মরণীয় দিনে শহীদদের আত্মত্যাগকে অপমান করার জন্যই শেখ হাসিনাকে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকার জনগণের কল্যাণ, গণতান্ত্রিক সংস্কার, সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জ্বালানি সংকট, ডেঙ্গু ও হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। ডেঙ্গু পরীক্ষাকে সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে করা এবং শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
রিজভী বলেন, যখন দেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের পথে এগোচ্ছে এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন শেখ হাসিনার মতো ‘পলাতক ফ্যাসিস্টকে’ বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি অসম্মানজনক আচরণ।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে অতীতের মতো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় পেশাজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল, কোষাধ্যক্ষ ডা. মো. মেহেদী হাসান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ডা. খালেকুজ্জামান দীপুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বলেছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে মিশে গেছে। এ কারণে তাসনিম জারাসহ গণতন্ত্র ও প্রগতিশীল চেতনার অনেক নেতা-নেত্রী এনসিপি ছেড়ে গেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে মূলত এনসিপি বলতে কিছু নেই, যা আছে তা জামায়াতের শিশু সংগঠন।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মুরারীদহ এলাকায় ঐতিহ্যবাহী মিয়ার দালান পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রাশেদ খান বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্রেডিটবাজি শুরু করেছে এনসিপি। নাহিদ ইসলাম ও মাহফুজ আলম দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে নিজেদের গণঅভ্যুত্থানের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। মাহফুজ আলম মূলত নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান যে মুখোশধারী ছিলেন, তা অভ্যুত্থানের পর আমরা দেখেছি। তিনি সর্বপ্রথম আওয়ামী লীগকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে তিনিই সর্বপ্রথম বেইমানি করেছেন।’
এনসিপির সমালোচনা করে রাশেদ খান বলেন, ‘এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী এবং জামায়াত দেশের সার্বভৌমত্ব চায় না। এসব কথা বলার পর তারাই আবার জামায়াতের পকেটবন্দি হয়েছে। এনসিপির যেসব প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তাদের সব খরচ জামায়াত দিয়েছে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এক দফার ঘোষণার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের ডাক বা এক দফার ঘোষণা দিয়েছিলেন নাহিদ ইসলাম—আমরা সেটা স্বীকার করি। কিন্তু এই এক দফা ঘোষণার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল এ দেশের জনগণ।’
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে রাশেদ খান বলেন, ‘বিরোধী দলের অনেক এমপি এখন সরকারি দলের এমপিদের সমান সুযোগ-সুবিধা চাচ্ছেন। তারা তো সরকারি দলের এমপিদের মতোই সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। অসুবিধা তো নেই। তারপরও তারা সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন বিরোধী দল কোনো সুযোগ-সুবিধা পেত না। সেই হিসেবে বিএনপি সরকার বিরোধী দলকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে এবং মূল্যায়ন করছে। তারপরও জামায়াত ও এনসিপির এমপিদের অবস্থা এমন—সুখে থাকতে যেন ভূতে কিলাচ্ছে।’
এর আগে সকালে ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী মিয়ার দালান পরিদর্শনকালে রাশেদ খানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সভাপতি আসিফ ইকবাল মাখন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের জেলা সভাপতি প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসেন, টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রাজিব হাসান এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতা সুলাইমান হোসেন। এ সময় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন এনসিপি ৫০ সদস্যের প্রতিনিধি দল
রাজধানীর গণভবনে স্থাপিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এ সময় তার সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতারা জাদুঘরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার বিভিন্ন স্মারক, ছবি, দলিল ও ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে নেতারা জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, নিদর্শন ও দলিল সংরক্ষণ, গবেষণা এবং প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে গণভবনে এই স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। এর আগে সর্বসাধারণের জন্য জাদুঘরটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন নাহিদ ইসলাম।
গত ১ জুলাই রায়েরবাজারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের গণকবর জিয়ারত শেষে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর জনসাধারণের জন্য খুলে দিতে হবে।
এনসিপির নেতারা মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে আন্দোলনের পটভূমি, ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণ এবং শহীদদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারে, সে জন্য জাদুঘরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়কে সামনে রেখে মাসব্যাপী ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচি পালন করেছে দলটি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে পুঁজি করে একটি মহল পকেট রাজনৈতিক দল বা ‘দোকান’ খুলে বসেছে বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে তিনি অভিযোগ করেন, তারা জুলাই শহীদদের কবরের টাকা ‘মেরে খেয়েছে’। জুলাই ফান্ডের সঠিক অডিট করা হলে তাদের ‘আসল রূপ বেরিয়ে আসবে’ বলেও মনে করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘শহীদ জুলাই স্মৃতি সংসদ’ কর্তৃক আয়োজিত জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শহীদ পরিবারের মাঝে অনুদান প্রদান ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টিকে (এনসিপি) উদ্দেশ্য করে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের আর্থিক অনিয়ম ও কবরের টাকা মেরে খাওয়া নিয়ে যে সত্য প্রকাশ করেছেন, আমরা তা বললে তাদের রাজনীতিই শেষ হয়ে যাবে। জুলাই ফান্ডের সঠিক অডিট করা হলে এদের আসল রূপ বেরিয়ে আসবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার শেষে এখন তারা ক্ষমতা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রতিটি কবরের জন্য ২ লাখ টাকা করে। কোনো কোনো জায়গায় ২০-৩০ হাজার টাকায় কোনোরকমে কবরগুলোকে করেছে। সেগুলো এখন ভঙ্গুর দশা। তারা যে কবরের টাকা মেরে খেয়েছে সে কথা যদি বলি তাহলে কি তাদের রাজনীতি থাকবে?’
এরকম অনেক তথ্য রয়েছে, কিন্তু বিভাজন সৃষ্টি করতে চান না বলে জনগণের সামনে তুলেন না বলেও জানান তিনি।
ইশরাক হোসেন বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় রাজনৈতিক বিদ্বেষবশত বহু প্রকৃত বিএনপি সমর্থিত জুলাই যোদ্ধাকে গেজেটভুক্ত করা হয়নি, যা চরম অন্যায়। বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে ১৪ হাজারের বেশি জুলাই যোদ্ধাকে গেজেটভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে ৮৪৩ জন তালিকাভুক্ত শহীদ পরিবারসহ আহতদের যথাযথ আবাসন, কর্মসংস্থান ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমানে আহতদের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ক্যাটাগরিভেদে প্রতি মাসে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
গতকাল জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উদ্ভূত পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘দেশি-বিদেশি কূটনীতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তথাকথিত জুলাই যোদ্ধাদের ব্যানার ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে মব কালচার সৃষ্টি করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার এক হীন চেষ্টা।’
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই স্মৃতিচারণ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মো. রুহুল কবির রিজভী, সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, মো. কামরুজ্জামান এবং অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিনসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেকে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল- এটি আমাদের প্রশ্ন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। সেই প্রসঙ্গে টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হলো।
‘বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই সুযোগ দিল’-এই প্রশ্নও রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়া দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সরকারি দল বিএনপির নেতৃত্বের মাঝেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন।
বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাইবেন কিনা, নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সেই প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন তিনি।ওই সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একপক্ষকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে; একপক্ষ দায়মুক্তি পেলে অন্যপক্ষেরও সে অধিকার আছে।
দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাদের কোনো অনুশোচনা না থাকায় বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে থেকে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ।’
দুই বছর আগে শেখ হাসিনার শাসনের পতন হলে সে সময় গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান এনে ওই অধ্যাদেশ যুক্ত করা হয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে পাস করে। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থেকে যায়। নয়া দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাদের দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির ব্যাপারে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা তো (আওয়ামী লীগ) আদালতে যায়নি। আদালত থেকেই যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।
একইসাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, ‘জনগণও বিচার করবে। জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের দীর্ঘ শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানষকে দমন-পীড়ণ চালিয়েছে; গুম, খুন করেছে। ফলে তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই এবং তাদের ব্যাপারে জনগণও বিচার করবে।
এদিকে, ভারতের নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে পারেন, এমন খবর যখন আলোচনায় আসে, তখনই বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দিল্লিতে শেখ হাসিনা যাতে রাজনৈতিক কার্যক্রম না চালায়, সেজন্য ভারত সরকারের সহযোগিতা চান।
একই দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারত সরকারকে এ বিষয়ে অবস্থান 'স্পষ্ট' করতে আহ্বান জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া এরপর মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশনা তুলে ধরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য বিবরণীতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করতে অনুরোধ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে 'আইনগত ব্যবস্থা' নেওয়ার কথাও বলেছিলেন। যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনটি বেসরকারিভাবে আয়োজন করা হচ্ছে। এরসাথে ভারত সরকারের সম্পর্ক নেই। এবং সেখানে যে বক্তব্য আসবে, তা ভারত সরকার সমর্থন করে না। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরও নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে এবং তাতে শেখ হাসিনা সরাসরি বক্তব্য ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্যই দেওয়া হোক না কেন, তাদের সমর্থন ছাড়া নয়া দিল্লিতে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন। আর সে কারণে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্য থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে।
ছবি: সংগৃহীত
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শাখা ছাত্রদল।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুপুরে ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচিতে এ ঘোষণা দেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল।
তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সুন্দর ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে এবং জবিয়ানদের সব অধিকার আদায়ে ছাত্রদল অতীতেও কাজ করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। সব প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন কোনো বাঁকা পথে বা মববাজির মাধ্যমে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না করে। সাধারণ শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এ ধরনের অপসংস্কৃতি মেনে নেবে না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদার, পরিচয়পত্র ছাড়া প্রবেশ বন্ধ
মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, গত দুদিন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। সামনের দিনেও সেই ধৈর্য বজায় রাখবে। তবে কোনো ধরনের ‘মববাজি’ বা শিক্ষার পরিবেশ নষ্টের চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি৷
এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘খুনি হাসিনার ফাঁসি চাই’, ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জিন্দাবাদ’, ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস-আমরাই গড়ব’ এবং ‘শিক্ষা, ঐক্য, প্রগতি ছাত্রদলের মূলনীতি’, ‘দিল্লি গেছে স্বৈরাচার, পিন্ডি যাবে রাজাকার’ এবং ‘রাজাকারের স্বৈরাচার, মিলে মিশে একাকার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলামসহ নির্বাচিত অন্য নেতারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। এরপর দুপুর ১টার দিকে তারা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে ক্যাম্পাসে অছাত্র-বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসহ ৯ দফা দাবিতে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেন। পরে জকসুর পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর করা হয়।