ছবি: সংগৃহীত।
শান্তিনগরের মুদি দোকানি জাহিদ হাসানের দোকানে সব পণ্য পাওয়া গেলেও তিনি নিজের তিন বছরের কন্যাশিশুর জন্য খাদ্যদ্রব্য কেনেন ‘একটু উন্নত’ ডিপার্টমেন্ট-স্টোর থেকে। তার বিশ্বাস, ভালো ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর। দাম একটু বেশি হলেও তিনি সেখান থেকেই সন্তানের জন্য গুঁড়া দুধ, চকলেট, চিপস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য কেনেন।
পরীবাগের বাসিন্দা সালেহা চৌধুরী জানান, বাচ্চারা চকলেট, চিপস প্রভৃতি পছন্দ করে।
একটু বেশি দাম হলে ব্র্যান্ডের পণ্য কিনে থাকেন তিনি। শুধু তারাই নন, প্রত্যেক বাবা-মা সন্তানের জন্য একটু নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার খোঁজেন। ভালো ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্যকে নিরাপদ মনে করেন তারা। কিন্তু ‘ভালো ব্র্যান্ডের’ খাবারেও এখন ক্ষতিকর উপাদান মিলছে।
যেসব পণ্য মানুষ চোখ বন্ধ করে বাচ্চাদের জন্য কিনছেন তাতেও ভেজাল উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে। বাচ্চাদের প্রিয় গুঁড়া দুধ তৈরি হচ্ছে ভেজাল ‘হয়ে পাউডার’ দিয়ে (এক ধরনের সাদা পাউডার)। সেসবে ‘দুগ্ধ উপাদান’ খুবই সামান্য। সম্প্রতি ল্যাব টেস্টে গোয়ালিনী নামের গুঁড়া দুধে মাত্র ১৭ শতাংশ দুগ্ধ উপাদান পাওয়া গেছে। বাকি অন্তত ৬৭ শতাংশ ভেজাল উপাদান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সস্তার ‘হয়ে পাউডার’ মিশিয়ে চকচকে মোড়কে বাজারে বিক্রি হচ্ছে বাহারি মিল্ক পাউডার। আদালতে প্রমাণ হওয়ার পরও আইনের ফোকর গলে সামান্য শাস্তিতেই পার পেয়ে যাচ্ছে জড়িতরা। ক্রেতাদের বোঝার উপায় নেই যে, গুঁড়া দুধের নামে তারা বাচ্চাদের ‘হয়ে পাউডার’ খাওয়াচ্ছেন। এরকম অনেক মানহীন শিশুখাদ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। ভেজাল খাদ্যের ব্যাপারে সরকারের তৎপরতা খুবই সামান্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পণ্য সরকার নির্ধারিত মান নিশ্চিত না করেই বাজারজাত করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় আইন থাকলেও কার্যকরী হচ্ছে না। যারা এসব করে তারা সহজেই ফোকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক, বিক্রেতা কাউকে উল্লেখযোগ্য শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে ভেজাল খাদ্য তুলে দিতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের মুখে। এমনকি আমদানি করা ‘উন্নত’ মানের পণ্যেও ভেজাল ধরা পড়ছে।
সম্প্রতি বেশ কিছু শিশুখাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা হয়েছে। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হয়। বিদেশি পণ্যের আমদানিকারকদের শাস্তি দেওয়া হলেও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণহীন। ভেজাল প্রমাণিত হওয়ার পরও পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ অনুসন্ধানের জন্য যে ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট ও জনবল দরকার, তা এ খাতে নেই। বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
গুঁড়া দুধে দুগ্ধ উপাদান ১৭ শতাংশ
কয়েক মাস আগে ‘গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’ গুঁড়া দুধের নমুনা সংগ্রহ করেছিল ডিএসসিসির খাদ্য পরিদর্শকরা। গোয়ালিনীর পণ্য রাসায়নিক ও ভৌত দুই পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়নি।
পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা গেছে, তাতে দুগ্ধ উপাদান আছে মাত্র ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। বাকি ৫৮.৯২ শতাংশ ভেজাল উপাদান। অন্যন্য উপাদানেও ভেজালের পরিমাণ ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৬৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভেজাল উপাদানে তৈরি হচ্ছে গোয়ালিনীর গুঁড়া দুধ।
গোয়ালিনী গুঁড়া দুধে দুগ্ধ চর্বির পরিমাণ থাকার কথা ছিল ৪২ শতাংশ বা তার কমবেশি। কিন্তু রাসায়নিক পরীক্ষায় এর পরিমাণ পাওয়া গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ ৩৪ দশমিক ৪২ শতাংশ ভেজাল উপাদান। দুগ্ধ প্রোটিন কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। এখানে ভেজালের পরিমাণ ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।
গুঁড়া দুধ বলে বিক্রি হওয়া পণ্যটিতে দুগ্ধ উপাদানের পরিমাণ থাকার কথা ছিল অন্তত ৭৬ শতাংশ। অম্লতা থাকার কথা ছিল অনূর্ধ্ব ১৮ শতাংশ, গোয়ালিনীতে পাওয়া গেছে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। লেডের নির্ধারিত মান শূন্য দশমিক ০২ থাকলেও এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ৫ শতাংশ আর্দ্রতার জায়গায় পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ১১ শতাংশ।
প্যাকেটের গায়ে পুষ্টিগুণের তালিকা দেওয়া আছে। এসব পণ্য ল্যাবে পরীক্ষা করে তালিকার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি স্ট্যান্ডার্ড মানের সঙ্গেও উপাদানের অনেক ফারাক পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
‘গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’ নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় পণ্যগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহার ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত। গত ১০ ডিসেম্বর স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বীথি ওই আদেশ দেন। নিম্নমানের গুঁড়া দুধ সরবরাহের দায়ে এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল একই আদালত। পরে আদালতে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি এবং তাদের ভেজাল পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। গত ডিসেম্বর মাসে গোয়ালিনী গুঁড়া দুধের কিছু প্যাকেট ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলার বাদী এবং প্রসিকিউটিং অফিসার মোহা. কামরুল হাসান বলেন, ‘দোষ স্বীকার করায় আদালত পণ্য ধ্বংসের আদেশ দেয়।’
এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। কোম্পানির অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি দেশের বাইরে গেছেন। তবে এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি কর্মকর্তারা।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু গোয়ালিনীই নয়, আসলাম টি কোম্পানির ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, একই কোম্পানির পূর্ণ ননিযুক্ত গুঁড়া দুধ, ডানো ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, ড্যানিশ ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, ইনস্ট্যান্ট ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার (নেসলে) ও স্টারশিপ গুঁড়া দুধ ল্যাব টেস্টে উত্তীর্ণ হয়নি। এসব গুঁড়া দুধের আমদানিকারকদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে।
ভেজাল পণ্যের বিএসটিআই লোগো : বাজারজাত করা বেশ কয়েকটি গুঁড়া দুধের প্যাকেটে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) লোগো এবং কিউআর কোড দেখা গেছে। অন্যান্য পণ্যেও এই লোগো পেয়েছেন খাদ্য পরিদর্শকরা। তারা বলছেন, পণ্যের নমুনা নির্ধারিত মান পূর্ণ করলেই বিএসটিআই লোগো ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী গুঁড়া দুধ, চকলেট, বিস্কুট বা শিশুখাদ্যে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
বিএসটিআই-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইনে বাধ্যবাধকতা থাকায় ভেজাল অনেক পণ্যের প্যাকেটের গায়ে নকল লোগো এবং কিউআর কোড দেওয়া থাকে।
বিএসটিআইয়ের সমন্বয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘মানহীন অনেক পণ্যে বিএসটিআইয়ের নকল লোগো দেওয়ার অভিযোগ আছে। বিষয়টি মাথায় রেখে লোগোর সঙ্গে এখন কিউআর কোড দিয়ে দেওয়া হয়। গ্রাহকরা কিউআর কোড স্ক্যান করলে ওই পণ্য নিবন্ধিত কি না, নিশ্চিত হতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘বিএসটিআই নিবন্ধিত কোনো পণ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযোগ পেলে মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হয়।’
মানহীন কিটক্যাট চকলেট : পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমদানি করা কিটক্যাট চকলেট অনেক শিশু-কিশোর, এমনকি বড়দেরও প্রিয়। কিন্তু এ চকলেটেই মান রক্ষা করা হচ্ছে না। ক্ষতিকর উপাদানসহ এ চকলেট ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ পণ্য শিশু-কিশোরদের না দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরো জোরালো করার তাগিদ দিয়েছেন।
সম্প্রতি, শিশু খাদ্যে ভেজাল সন্দেহে রাজধানীর ফকিরাপুলের আমানিয়া বেকারি অ্যান্ড সুইটস থেকে এক বক্স কিটক্যাট সংগ্রহ করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-২-এর নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মোহা. কামরুল হাসান। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, নমুনা জনস্বাস্থ্য খাদ্য পরীক্ষাগার এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরীক্ষার করে কিটক্যাট চকলেট মানসম্মত নয় বলে সনদ দেওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ম্যানেজারদের নোটিস দেয় ডিএসসিসি। এরপর নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর ২৬, ৩৭, ৩৯ ও ৪০ ধারা লঙ্ঘনের জন্য ওই আইনের ৫৮ ধারায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে অভিযোগ করা হয়। গত বছর ৩ নভেম্বর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পুরান ঢাকার চকবাজারের সুমাইয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক মোজাম্মেল হোসাইনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। তাছাড়া কোকোলা ওয়েফার নামক একটি শিশুখাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় পণ্যটি তুলে নেওয়ার আদেশ দিয়েছিল আদালত।
শিশুস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি : এ নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ কার্যালয়ের উপপরিচালক (পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও গবেষণা) ডা. মো. আকতার ইমামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভেজাল পণ্যে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিডনিতে সমস্যা হতে পারে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্রেন ডেভেলপমেন্টে সমস্যা হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘এজন্য সরকারের আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, ‘শিশু খাদ্য খুবই স্পর্শকাতর। এটার মান নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে থাকি। আমাদের ল্যাবে প্রতি বছর দেড় থেকে দুই হাজার নমুনা পরীক্ষা করার সক্ষমতা আছে। ল্যাবের সক্ষমতা আরো বাড়াতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব পণ্যে সন্দেহ হয় বা অভিযোগ পাওয়া যায় সেসব পণ্যের ব্যাপারে আমরা অভিযান পরিচালনা করি। অনেক সময় ভালো ব্র্যান্ডের মোড়কেও ভেজাল পণ্য পাওয়া যায়।’ কারও গোপন কারখানা থাকলে, কোনো পণ্যে সন্দেহ হলে প্রশাসনকে অবহিত করার আহ্বান জানান তিনি।
মঙ্গলবার দুপুর সোয়া একটার দিকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ করা হয়
সুপ্রিম কোর্টের সড়কসংলগ্ন মূল ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে। কে বা কারা এই ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আজ মঙ্গলবার বেলা সোয়া একটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে আজ দুপুরে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এই রায় ঘোষণার পর ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটল।
শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বেলা ১টা ১৫ থেকে ১টা ২০ মিনিটের মধ্যে মোটরসাইকেলে করে দুজন ব্যক্তি আসেন। তাঁরা মূল ফটকের সামনে সড়কে ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যান। ককটেল বিস্ফোরিত হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছেন বলে জানান ওসি মো. মনিরুজ্জামান।
ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ দেখে এ ঘটনায় জড়িত দুই ব্যক্তিকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না—স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এ মন্তব্যের বিষয়ে কোনো পাল্টা মন্তব্য করতে রাজি নন নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে ‘নো কমেন্টস’। তবে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠকের পর স্থানীয় নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, ‘উনি যেটা বলেছেন সেটা শিরোধার্য। তবে এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।’
ইসি সচিব বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে গত দুইদিন ধরে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এর ধারাবাহিকতায় গতকাল (সোমবার) একটি টেন্টেটিভ (প্রাথমিক) সময়সূচি করা হয়েছে। সেখানে পাঁচটি ধাপে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দু’টি ধাপ রিজার্ভ রাখা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি।’
ইসি সচিব বলেন, ‘আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ইনপুট নেওয়া হবে। এরপর এসব মতামতের ভিত্তিতে কমিশন নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।’
তিনি বলেন, ‘১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের জন্য প্রয়োজনীয় উপাত্ত হিসেবেই প্রাথমিকভাবে পাঁচ ধাপ ও দু’টি রিজার্ভ ধাপের ধারণা দেওয়া হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের প্রস্তুতির বিষয়গুলো গুছিয়ে কমিশনকে জানাতে পারেন।’
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর প্রয়োজনীয় ইনপুট পাওয়ার ভিত্তিতে কমিশনই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবে।’
আলোচনা হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব জানান, আলোচনা তো একটা চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন, কীভাবে আলোচনা হয়েছে, এ বিষয়ে এই মুহূর্তে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন বলেও জানান তিনি।
ছয় মাস ধরে নির্বাচন হলে প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে কিনা—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৭ সেপ্টেম্বর এ বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে। এরপর কমিশন এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে জানাবে।’
ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিলের মতো অন্য স্থানে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পুলিশকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জোরদার করতে বলা হয় বিট ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম। এ ছাড়া ঢাকার আবাসিক হোটেলেও নজর বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদরদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আগস্ট মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় এসব নির্দেশনার কথা উঠে আসে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নানা বিষয়ে নির্দেশনা দেন। সভায় রাজধানীর সব অপরাধ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ও ৫০টি থানার ওসি উপস্থিত ছিলেন। গত শুক্রবার গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করেছে। গতকাল পর্যন্ত ওই মিছিলে অংশগ্রহণের অভিযোগে ৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকাতে সব গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টি গতকালের বৈঠকে উঠে আসে। প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশি কার্যক্রম আরও জোরদার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
ছিনতাই প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানোর কথা আলোচনায় উঠে এসেছে। ওসিরা এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় অপারেশনাল কার্যক্রম মাঠে থেকে তদারক করবেন। এ ছাড়া নিবন্ধন ছাড়া কোনো বার রাজধানীতে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে খোঁজ নেবে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ জানায়, রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার। অপরাধীরা যাতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় এসে অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে, সে জন্য আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি সন্দেহভাজনদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরেও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
অপরাধ প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে সিটিটিসি, ডিবি ও থানা পুলিশকে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে ডিউটি করতে হবে, যাতে কোনো এলাকায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শূন্যতা সৃষ্টি না হয় এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি না থাকে।
প্রতীকী ছবি
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ৬০টি নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে গতকাল সোমবার ভর্তি ছিলেন ১৮৭ জন। শয্যা না পেয়ে অনেকে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই চিত্র রাজধানীর আরও কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে। এর মধ্যেই দেশে ডেঙ্গুতে এক দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রেকর্ড হয়েছে। সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৩৩ জন। চলতি বছর এক দিনে এটাই সর্বোচ্চ হাসপাতালে ভর্তি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। অক্টোবরে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কীটতত্ত্ববিদরা।
ডেঙ্গুতে এ বছর মৃত্যু ১৫৭: চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৫৭ জন। ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৩ হাজার ৫৭০ জন। শুধু সেপ্টেম্বরের ১৪ দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৬০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া আটজনের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের তিনজন, ঢাকা বিভাগের চারজন ও ময়মনসিংহ বিভাগের একজন।
গতকাল মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত শয্যাগুলোর পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দাতে রোগীদের চিকিৎসা চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শয্যায় একাধিক রোগীকে রাখতে হচ্ছে। এতে রোগীদের পর্যবেক্ষণ, ওষুধ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালটির উপপরিচালক ডা. নূরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর চাপ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত শয্যা, চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন।
শয্যা না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন রোগী ও স্বজনরা। রাজধানীর মাতুয়াইলের বাসিন্দা নুরজাহান বেগমের ২০ বছর বয়সী নাতনি জাহিন এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গুতে ভুগছেন। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন স্বজনরা। তিন-চারটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরে শয্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালে ভর্তি করা হয় জাহিনকে। শয্যা না থাকায় মেঝেতেই চলছে তাঁর চিকিৎসা। নুরজাহান বলেন, অনেক হাসপাতালে ঘুরেছেন, কোথাও শয্যা পাননি।
ঢাকার বাইরেও বাড়ছে চাপ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৭৩৩ জনের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯১, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ৩৮৮, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭০, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৩, খুলনা বিভাগে ৩০২, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০, রাজশাহী বিভাগে ১৪৫, রংপুর বিভাগে ৮৬ ও সিলেট বিভাগে সাতজন রয়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৩ হাজার ৫৭০ জনের মধ্যে ৪৯ হাজার ৩৭৫ জন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ২৮২ জন। দেশে চলতি বছর ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছিল গত আগস্ট মাসে। ওই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬। আগস্টে মারা গেছেন ৪৩ জন। চলতি বছর ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির হার দ্রুত বাড়ছে। এতে সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীর চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক হাসপাতালে নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় শয্যা বা সুযোগ-সুবিধার সংকট হলে প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। সক্ষমতা অনুযায়ী হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। শুধু রাজধানীতে নয়; ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন এলাকাগুলোতে উপজেলা পর্যায়েও চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য।
অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপের আশঙ্কা
অক্টোবরে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার। গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক সেমিনারে তিনি বলেন, তাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এডিস মশা রাতেও কামড়ায়।
শীতে কিউলেক্স মশা বেশি দেখা গেলেও এডিস মশা তুলনামূলক কম চোখে পড়ে। এ কারণে মানুষ এডিস মশাকে অবহেলা করে। তাই মশার আচরণ সম্পর্কে মানুষকে জানতে হবে। বাংলাদেশকে ‘মশার দেশ’ উল্লেখ করে অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, দেশের ঘাড়ে ডেঙ্গু চেপে বসেছে। দেশে ১২৬ প্রজাতির মশা আছে। এর মধ্যে সাত থেকে আট প্রজাতির মশার কলোনি রয়েছে।
একই অনুষ্ঠানে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই সহজ নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো রোগ। এ রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা কঠিন।
‘শুধু শয্যা বাড়ালেই হবে না’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়ে সাময়িকভাবে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও ডেঙ্গুর মূল উৎস এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। ওই বছর মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা দেখা যায়। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবারের মতো সিলেট সফরে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমান সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির আগমন ঘিরে সিলেটে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি চলে যাবেন সার্কিট হাউসে। সেখান থেকে বের হয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় হযরত শাহজালাল (রহ.) ও বেলা ১টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহপরাণ (রহ.) -এর মাজার জিয়ারত করবেন। বিকেল সাড়ে ৩ টায় তিনি নগরভবনের সামনে সিসিক আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নিবেন। তারপর রাত ৮টায় ওসমানী বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে সিলেটজুড়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। নগরীর বিভিন্ন স্থানে তোরণ নির্মাণ ও আলোকসজ্জার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকা পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কর্মসূচির স্থান, যাতায়াতের পথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, সফরের দিন এক হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আরও ২০০ সদস্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। এর বাইরে পুলিশের বিশেষ ইউনিটগুলোও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।
সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘সিলেট একটি পর্যটননগরী। রাষ্ট্রপতি যাতে সিলেটের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন এবং সফরকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতিকে বরণ করতে প্রস্তুত। তার সফর উপলক্ষে সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নাগরিক সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে আমরা রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে চাই।’
ছবি : সংগৃহীত
বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে প্রবেশ করছে দেশ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে যুক্ত করে নারায়ণগঞ্জ সদর থেকে জয়দেবপুর রুটে চলবে এই ট্রেন। এতে রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী দুই জেলা নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মধ্যে যোগাযোগ অবকাঠামো সহজ, সাশ্রয়ী হবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রেন পরিচালনার খরচ এবং ভ্রমণের সময় উভয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। এই ট্রেন চলাচল শুরু করবে ২০৩০ সালের মধ্যে।
এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্পটি অনুমোদনের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। আগামীকাল বুধবার অনুষ্ঠেয় একনেক বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই উদ্যোগটি অবশেষে আলোর মুখ দেখছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ডিপিপি অনুসারে, ঢাকা ও দুই শিল্পঘন অঞ্চল গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে যানজট ও পরিবহনের চাপ কমাতে এ প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। পুরোনো ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের কারণে বর্তমানে ট্রেনগুলো কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারে না। যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ট্রিপও দেওয়া সম্ভব হয় না।
এ বাধাগুলো দূর করতে রেলওয়ে প্রকল্পটির প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক ট্রেনে ৪০ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী হবে। বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে এখনকার তুলনায় পরিচালনা ব্যয় ৩৫ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমবে। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমবে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ট্রেন চলবে তিন জেলাকে কেন্দ্র করে। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক ট্রেন অর্থনীতি ও পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। ডিজেল ইঞ্জিনের চেয়ে বৈদ্যুতিক ট্রেন অনেক দ্রুতগতিতে চলতে ও থামতে পারে। ফলে স্টেশনে থামার পর দ্রুত সর্বোচ্চ গতিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে যাতায়াতের সময় অর্ধেকের বেশি কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি)। বাকি প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন।
প্রকল্পের আওতায় ট্রেনের পরিচালনা ব্যবস্থা পুরোপুরি ডিজেল থেকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হবে। রেললাইনের ওপর দিয়ে ‘ওভারহেড ওয়্যার’ বা বিদ্যুতের তার স্থাপন করা হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট দূরত্বে বিশেষায়িত ‘ট্রাকশন সাবস্টেশন’ নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ডিজেলচালিত ইঞ্জিন ব্যবহার হয়। নিরাপদ ও মসৃণ চলাচল নিশ্চিত করতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) ট্রেন, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন এবং কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ একজন কর্মকর্তা গতকাল সোমবার বলেন, রেলের পরিচালন ব্যয় দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বছর বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসানের পরিমাণ বাড়ছিল। ফলে এ ধরনের ট্রেন অনেক দিন ধরে অত্যন্ত প্রয়োজন। গত ছয় বছর ধরে বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও এ পদক্ষেপটি স্থগিত হয়ে ছিল।
ডিপিপি থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ১ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা, যেখানে পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের মাধ্যমে ট্রেন পরিচালিত হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণের জন্যও দায়ী। এছাড়া ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে একাধিকবার ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৩ হাজার ৯৩ কিলোমিটার নেটওয়ার্কে ডিজেলচালিত ট্রেন পরিচালনা করছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, বৈদ্যুতিক ট্রেনে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হলেও এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক কম। এ ব্যবস্থা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব।
অন্য পরিবহন মাধ্যমের তুলনায় বিদ্যুৎচালিত ট্রেন অনেক বেশি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং দ্রুত ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদার উপযোগী। এটি ট্রেনের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্রমণের সময় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনবে।