ছবি : সংগৃহীত
ইরানের কেশম, কিশ ও আবু মুসা দ্বীপে সম্প্রতি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তাদের চলমান ব্যাপক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়।
অভিযানের আওতায় বন্দর আব্বাসসহ ইরানের দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন বন্দরনগরীতেও ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ হামলার পর পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের প্রথম দিক থেকেই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছিল। আর তা হলো, ওয়াশিংটন কি ইরানের ভূখণ্ড দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
যুদ্ধের এক মাস পর গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে একটি তথ্য দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, ইরানের খারগ দ্বীপে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপ দিয়ে হয়ে থাকে। মার্কিন কর্মকর্তাদের এমন মন্তব্যের পর সেখানে স্থল অভিযানের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছিল।
গত ১৭ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর দ্বীপ দখলের আলোচনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
তবে গত সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেননি। এরপর বিষয়টি আবার নতুন করে সামনে এসেছে। এ ধরনের কোনো অভিযানের পরিকল্পনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাকে এটি বলতে পারব না। কারণ, আমি যদি বলি, তবে তা বোকামি হবে।’
তাহলে প্রশ্ন জাগে, এটি কি কেবলই যুদ্ধংদেহী কথাবার্তা, নাকি সত্যিই এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে?
ইরানের দ্বীপ দখলে মার্কিন সক্ষমতা
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড্রিয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সীমিত কৌশলগত দিক’ বিবেচনা করলে ইরানের দ্বীপগুলো দখল করার মতো সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত আকাশ, নৌ ও উভচর সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ছোট কোনো দ্বীপ দখল করতে পারে।
তবে এর ফলে যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে, তা সামাল দেওয়ার সদিচ্ছা তাদের থাকতে হবে।
বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। বড় ও স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি ছোট ছোট অগ্রবর্তী ঘাঁটিতেও এসব সেনা অবস্থান করছেন।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমিও আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানান, শুধু দ্বীপ দখল করাই নয়; বরং সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মতো সামরিক ও লজিস্টিক (রসদ সরবরাহ) সক্ষমতাও যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কারণ, বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে সামরিক দিক থেকে তারা এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে নাদের হাশেমি মনে করেন, আসল প্রশ্ন হলো, এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা মূল্য চোকাতে হবে।
কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ বলেন, ‘সাময়িকভাবে একটি দ্বীপ দখল করা এক জিনিস। কিন্তু সেখানে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, রসদ সরবরাহ করা এবং সেখান থেকে কৌশলগত সুবিধা আদায় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।’
ক্রিগ আরও উল্লেখ করেন, কেশম দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ কঠিন হবে। কারণ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; বরং বেশ বড় একটি দ্বীপ, যা ইরানের মূল ভূখণ্ডের ঠিক গায়েই অবস্থিত।
হেঙ্গামের মতো ছোট ছোট দ্বীপ হয়তো সহজেই দখল করা যাবে। তবে এগুলো ইরানের গোলন্দাজ বাহিনী, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌকার বহরের নাগালের মধ্যেই থাকবে।
সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ বলেন, একসঙ্গে কয়েকটি দ্বীপ দখল করতে গেলে তা আর ‘সীমিত অভিযান’ থাকবে না। তখন এটি বড় ধরনের একটি উভচর সামরিক অভিযানে রূপ নেবে।
দ্বীপগুলো দখল করলেই যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বাধা দেওয়া বন্ধ করবে, এমন নয়। উল্টো এর ফলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়বে এবং সেগুলোতে টানা হামলা হতে থাকবে। একই সঙ্গে এ ঘটনা তেহরানের হাতে একটি বড় যুক্তি তুলে দেবে। তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘দখলদার শক্তি’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারবে।
অত্যন্ত ব্যয়বহুল অভিযান
এ ধরনের পদক্ষেপে প্রচুর জনবলের প্রয়োজন হবে। সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ ধারণা করেন, একটি সীমিত অভিযানের জন্যও শুরুতে ৫–১০ হাজার সেনার একটি বাহিনীর প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে লড়াকু সেনা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, প্রকৌশলী, রসদ সরবরাহ, চিকিৎসাসেবা ও কমান্ড শাখার সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
যদি একসঙ্গে কয়েকটি দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে সেনার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু দখল নয়, এর পরের লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে গেলেও অতিরিক্ত সেনার প্রয়োজন হবে বলে ক্রিগ জানান।
ক্রিগ বলেন, ‘ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ধেয়ে আসা সরাসরি হামলার মুখে মার্কিন সেনাদের কাজ করতে হবে। এ ছাড়া রসদবাহী জাহাজ, ল্যান্ডিং ক্রাফট ও হেলিকপ্টারগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন ও কামানের গোলার ঝুঁকির মধ্য দিয়েই সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হবে।’
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের কিংস কলেজের এই শিক্ষক আরও যোগ করেন, ‘ইরানকে যে তাৎক্ষণিক দ্বীপগুলো পুনর্দখল করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তারা শুধু অবিরাম হামলা চালিয়ে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এতে ওই অঞ্চলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর অবস্থানে পরিণত হবে।’
ক্রিগ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই ওই সেনাদের রসদ সরবরাহ করতে পারে। তবে এ জন্য তাদের নিরবচ্ছিন্ন নৌ নিরাপত্তা ও আকাশপথে আধিপত্য বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যবস্থাও চালু রাখতে হবে। তখন সেখানে টিকে থাকাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল মিশন হয়ে দাঁড়াবে। নৌপথ সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া একটি অভিযান খুব দ্রুতই ভূখণ্ড দখলের এক অন্তহীন যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্র আসলেই দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনো দ্বীপ, বিশেষ করে খারগ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করবে কি না, তা নিয়ে ‘যথেষ্ট সন্দেহ’ প্রকাশ করেছেন জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক হাশেমি।
অধ্যাপক হাশেমি বলেন, এর ফলে মার্কিন সেনাদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে। দেশের ভেতরেও এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী ‘মাগা’ (আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলো) ঘাঁটিতে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এটি এমন এক রাজনৈতিক ঝুঁকি, যা নিশ্চিতভাবেই ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করলে যুক্তরাষ্ট্র আরও অনেক দূর যেতে পারে, এমনকি তারা ইরানের মূল ভূখণ্ডও দখল করতে পারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে তারা পাঁচ লাখ সেনা পাঠিয়েছিল। সেই সক্ষমতা তাদের আজও আছে। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে এমন কিছু ভাবাও অসম্ভব। এর বাইরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল প্রভাব তো পড়বেই। আরব বিশ্বের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও ব্যাপক ফাটল ধরবে।
হাশেমি বলেন, ‘এসবই কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা। বাস্তবে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’
শুরুতেই কি ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে হবে
ক্রিগ বলছেন, ইরানের যেকোনো দ্বীপ দখল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করে দিতে হবে। তবে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে সেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
ইরানের অনেক রাডার সিস্টেম, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাটারি, ড্রোনঘাঁটি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কমান্ড সেন্টারগুলো স্থানান্তরযোগ্য। এগুলোর অনেক কিছুই লুকানো অবস্থায় বা মূল ভূখণ্ডের একেবারে ভেতরে অবস্থিত। ফলে দ্বীপে সেনা নামানোর সময় মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো হয়তো সাময়িকভাবে সেই হুমকি দমিয়ে রাখতে পারবে।
তবে সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হলে তাদের টানা সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।
ক্রিগ দাবি করেন, দ্বীপ দখলের এ ধারণার মূল দুর্বলতা এখানেই। নৌপথে হুমকি তৈরির জন্য ইরানের আসলে এই দ্বীপগুলোর কোনো প্রয়োজনই নেই। তারা মূল ভূখণ্ড থেকেই অনায়াসে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা যদি সত্যিই পুরোপুরি নষ্ট করতে হয়, তবে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের একটি বড় অংশে হামলা চালাতে হবে। এমনকি সম্ভাব্য দখলদারত্বও কায়েম করতে হতে পারে। তিনি বলেন, ‘তেমন পরিস্থিতিতে এ অভিযান আর শুধু দ্বীপ দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বরং আরও বড় পরিসরের একটি স্থলযুদ্ধের সূচনা করবে।’
মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক হাশেমি উল্লেখ করেন, এমন দৃশ্যপট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। এর জন্য এত দিন ধরে চলা হামলার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণের প্রয়োজন হবে। এ কারণেই ওয়াশিংটন আদৌ সেই পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।
নৌপরিবহন, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব
কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনো দ্বীপ দখল করলে তেহরান বিষয়টিকে চরম উসকানি হিসেবেই নেবে। এর জবাবে তারা হরমুজ প্রণালিতে আরও বেশি মাইন পুঁতে রাখতে পারে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ, মার্কিন ঘাঁটি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বাড়িয়ে দিতে পারে তারা।
ক্রিগ আরও জানান, দ্বীপগুলো যার দখলেই থাকুক না কেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলবে। জাহাজের বিমা খরচ তখন বহুগুণ বেড়ে যাবে। আর পানিতে থাকা মাইন সরাতেও অনেক সময় লাগবে। পাশাপাশি এমন কোনো দখলের ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। কারণ, এসব দেশ চায় হরমুজ প্রণালি খোলা থাকুক। কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘাঁটি বা ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে চায় না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ক্রিগের চূড়ান্ত উপসংহার হলো, দ্বীপ দখলের বিষয়টি হয়তো একটি চমকপ্রদ সামরিক ভাবমূর্তি তৈরি করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি ‘নৌ চলাচলের স্বাধীনতা’ রক্ষার লড়াইকে ‘ভূখণ্ড দখলের এক যুদ্ধে’ পরিণত করবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাধ্য হয়ে কোনোভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এমন বড় কোনো স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে, যা তারা যেকোনো মূল্যেই এড়াতে চায়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকছেন, নাকি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটছে তা নির্ধারণে ভোট দিচ্ছেন দেশটির নাগরিকেরা। গাজায় যুদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ নির্বাচন। প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
মঙ্গলবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনে ভোটগ্রহণ চলছে। দেশটিতে প্রায় ৭৩ লাখ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণ।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; বরং পছন্দের রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। প্রতিটি দল নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে। নেসেটে আসন পেতে একটি দলকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১২০টি আসন বণ্টন করা হয়। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
এর আগের জনমত জরিপে দেখা গেছে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোটের সঙ্গে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। তবে ভোটে নেতানিয়াহুকে হারালেই যে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে, বিষয়টা এমন নয়। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) নির্বাচনী ব্যবস্থায় পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে দলগুলোকে জোট গঠন নিয়ে আলোচনা করতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। দেশটির ইতিহাসে এখনো কোনো দল এককভাবে এই ‘ম্যাজিক ফিগার’ স্পর্শ করতে পারেনি।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জোট পেতে পারে ৫০টি। ফলে কারা সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে অন্য কয়েকটি দল। এরমধ্যে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোও আছে।
জনমত জরিপে কিছুটা পিছিয়ে আছে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। কিন্তু বর্তমান মিত্র ও নতুন জোটসঙ্গীদের কাছে থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে পারেন। নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে আছে- কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওতজমা ইহুদিত ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি।
অতি-কট্টর ইহুদিদের দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দল দুটি অতীতে একাধিকবার নেতানিয়াহুর জোট সরকারে যোগ দিয়েছে। তবে পরে জোট ছেড়েও গেছে। সবশেষ ২০২৫ সালে তারা জোট থেকে বেরিয়ে যায়।
সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে চারটি বিরোধী দল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। সেগুলো হলো ইয়াশার পার্টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস, ইসরায়েল বেইতেনু ও টুগেদার পার্টি। দলগুলোর জোট জানায়, ইসরায়েলকে একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এই জোটটি সরকার গঠন করলে কে নেতৃত্ব দেবেন তা এখনো ঘোষণা করেনি। তবে ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটকে প্রধানমন্ত্রী পদের সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও সম্ভাব্য প্রার্থী। তিনি ইয়ার লাপিদের সঙ্গে টুগেদার জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। তাদের প্রতিনিধিত্ব করে রাজনৈতিক দল রাআম ও জয়েন্ট লিস্ট নামের একটি জোট। তারা প্রায় ১৩টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাআম ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ নামেও পরিচিত। ২০২১ সালে তারা নাফতালি বেনেটের জোট সরকারে যোগ দিয়েছিল। ইসরায়েলের কোনো সরকারে অংশ নেওয়া প্রথম আরব নেতৃত্বাধীন দল এটি।
রাআমের নেতা মানসুর আব্বাস ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরকার গঠন করতে বিরোধীদের নেতৃত্বাধীন জোটের যদি অতিরিক্ত আসনের প্রয়োজন হয়, তাহলে তিনি সমঝোতায় রাজি হতে পারেন। তবে আইজেনকোটসহ বিরোধী নেতাদের অধিকাংশই এ ধরনের জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
জোট সরকার চাইলে প্রয়োজনীয় ৬১ আসন পূরণের জন্য বাইরের দলের কাছে থেকে সমর্থন নিতে পারবে। এক্ষেত্রে ওই দলকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি নয়। ঠিক এ জায়গাতেই নির্ধারক হতে পারে আরব ও ফিলিস্তিনপন্থি দলগুলো। হাদাশ, তাআল ও বালাদ নামের তিনটি গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহু বিরোধী জোটে যোগ না দিলেও তারা সমর্থন দেবে। বিনিময়ে দলটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনসহ কিছু শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে। তবে এ ধরনের সমঝোতা হলে দলত্যাগ এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতির বিষয়ে মতবিরোধের কারণে সরকার টিকে থাকার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের নিয়ম আছে। সাধারণত যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক সংকটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে এ ধরনের সরকার গঠন করা হয়। তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করতে দেখা গেছে। ২০২০ সালের মে মাসে পরপর তিনটি নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়। তখন নেতানিয়াহু ও ‘ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট’ দলের নেতা বেনি গান্তজ ঐক্যের সরকার গঠন করেন। তবে এক বছরের মধ্যে তাদের সমঝোতা ভেঙে যায়।
২০২৩ সালে হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গান্তজ ও তাঁর দলের সদস্যরা নেতানিয়াহুর জোটে যোগ দেন। এটিকেও জরুরি পরিস্থিতিতে গঠিত ঐক্যের সরকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। ক্ষমতা ভাগাভাগির সমঝোতার আওতায় দুই রাজনৈতিক নেতা পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে সম্মত হতে পারেন। ২০২০ সালে নেতানিয়াহু ও গান্তজ এ ধরনের সমঝোতায় রাজি হয়েছিলেন। তবে গান্তজ দায়িত্ব নেওয়ার আগে জোট ভেঙে যায়।
২০২১ সালের জুনে নাফতালি বেনেট প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ইয়ার লাপিদের সঙ্গে একই ধরনের সমঝোতা করেন। চুক্তি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পর তাঁদের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু ২০২২ সালের জুনে বেনেটের জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়।
পরে জুলাই মাসে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন লাপিদ। ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন নেসেটের সদস্যদের সমর্থনে। কিন্তু সরকার গঠন নিয়ে দলগুলো অচলাবস্থায় পড়লে এমন কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হতে পারে যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট জোটের বিরোধী শিবিরের সদস্যও হতে পারেন।
কোনো জোটই যদি সরকার গঠনে পর্যাপ্ত সমর্থন জোগাড় করতে না পারে তাহলে ইসরায়েল আবারও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়বে। যা নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের দিকে গড়াবে। স্থিতিশীল সরকার গঠনে বারবার ব্যর্থতার কারণে দেশটিতে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচবার নির্বাচন হয়। এবারও তেমনটা হলে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তত্ত্ববধায়ক প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
ভোটগ্রহণ শেষে ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভোট-পরবর্তী জরিপের ফল প্রচার করবে। জরিপ থেকে ফলাফল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে। এরপর আসতে শুরু করবে প্রকৃত ভোটের ফল। নির্বাচনে কারা বিজয়ী হতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে আভাস পাওয়া যাবে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। তবে পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে কয়েকদিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লাগতে পারে।
কোনো একক দল বা জোট পার্লামেন্টে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পরিস্থিতি পরিষ্কার হতে আরও সময় লাগতে পারে। আশা করা হচ্ছে আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্ত ভোট গণনা শেষ হবে। আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করা হবে ৪ নভেম্বর।
স্টারলিংক
ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের ওপর বিশ্বজুড়ে নজরদারি চালাতে বড় আকারের ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ফাঁদ পেতেছিল ইসরায়েলি এক বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি কোম্পানি। জাপানের এক ডিজিটাল ডিফেন্স বা সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানির অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত ছয়টি ভিন্ন সূত্রের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্র ও টোকিওভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ‘ট্রেন্ড মাইক্রো’র অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘ট্রেন্ডএআই’-এর গবেষকরা বলছেন, স্পেসএক্সের স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন দেখানোর ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছিল ইসরায়েলি কোম্পানি ‘ডিসকভার-টেক’।
এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্তকরণসহ অন্যান্য উপায়ে নজরদারি চালানো হচ্ছিল।
নিজের নেটওয়ার্ক ডেটা বিশ্লেষণ করে ‘ট্রেন্ডএআই’ বলেছে, স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞাপন নিলামে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা বড় কোম্পানিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে ডিসকভার-টেক।
বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে স্টারলিংক ট্রাফিকের ওপর শীর্ষ দরদাতা ছিল কোম্পানিটি। যার মধ্যে এমন বেশ কয়েকটি দেশও রয়েছে, যেখানে স্টারলিংক সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
বিডিং হচ্ছে একটি জটিল ডিজিটাল নিলাম ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতারা ব্যবহারকারীর ব্রাউজার ও অ্যাপের ভেতরের বিজ্ঞাপনের জায়গা দখল করে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি স্পেসএক্স। বিষয়টি নিয়ে ডিসকভার-টেক ও এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি তারা।
১৫ অক্টোবর স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের ওপর এমন নজরদারি নিয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ট্রেন্ডএআই। তবে প্রতিবেদনে সরাসরি ডিসকভার-টেকের নাম উল্লেখ না করে এর পেছনে দায়ী পক্ষকে ‘একটি বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি’ কোম্পানি হিসেবে বর্ণনা করে কোম্পানিটিকে ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’ ছদ্মনামে চিহ্নিত করা হয়।
সূত্রগুলো বলেছে, ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’ ডিসকভার-টেকের জন্য ব্যবহৃত ট্রেন্ডএআই-এর নিজস্ব কোডনেইম।
প্রতিবেদনে ডিসকভার-টেকের নাম প্রকাশ না করার কারণ সম্পর্কে সরাসরি কিছু না বললেও বিবৃতিতে ট্রেন্ডএআই বলেছে, ভুল তথ্যের ঝুঁকি এড়ানো ও হাইপ তৈরি করে এমন নাম ব্যবহার না করার নীতি থেকেই তারা এটা করেছে। যাতে ডিজিটাল নিরাপত্তারক্ষীরা বিভ্রান্ত না হন, ঝুঁকির অগ্রাধিকার ঠিক থাকে ও অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পদক্ষেপ তৈরি না হয়।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো যখন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনালের প্রসার নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছে তখনই স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের ট্র্যাকিং বা নজরদারি করার উপায় খুঁজে বের করা এক ধরনের লাভজনক শিল্পে রূপ নিয়েছে।
যেহেতু এসব টার্মিনাল স্থানীয় টেলিকম কোম্পানির পরিবর্তে সরাসরি স্পেসএক্সের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডেটা আদান-প্রদান করে ফলে এরা খুব সহজেই স্থানীয় ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা বা সেন্সরশিপ এড়িয়ে যেতে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ স্থাপন ও সমন্বয়েও বড় ভূমিকা রাখছে এ প্রযুক্তি, বিশেষ করে ইউক্রেইন যুদ্ধের সামনের সারির যোগাযোগ ও ড্রোন হামলার দিকনির্দেশনায় স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থান হয়ে উঠেছে।
এর আগে, মে মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎস’ ও ওয়েবসাইট ‘ইন্টেলিজেন্স অনলাইন’ আলাদা প্রতিবেদনে বলেছিল, ইসরায়েলি মালিকানাধীন বেশ কিছু কোম্পানি ক্লায়েন্টদের কাছে স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও ট্র্যাক করার বিভিন্ন কৌশল বিক্রি করছে।
হারেৎস প্রতিবেদনে লিখেছিল, বিজ্ঞাপন ডেটার সুযোগ নেওয়াই ছিল ট্র্যাকিং প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
ডিসকভার-টেকের বিরুদ্ধে ব্যাপক নজরদারির অভিযোগ
যেদিন ট্রেন্ডএআই ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’ সংক্রান্ত তাদের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ঠিক একই দিন কানাডীয় সাইবার ওয়াচডগ ‘সিটিজেন ল্যাব’ ও নিউ ইয়র্কের বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানি ‘কনফিয়েন্ট’ সরাসরি ডিসকভার-টেকের নাম উন্মোচন করেছে।
উভয় গোষ্ঠীই বলেছে, ইসরায়েলি কোম্পানিটি বিজ্ঞাপন নিলামের সুযোগটির অপব্যবহার করেছে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য পুনরায় নিলামে অংশ নেওয়া কোম্পানির কাছে গোপন সূত্রে পৌঁছে যেত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দরদাতারা এ ফাঁস হওয়া তথ্য সংগ্রহ ও একত্র করে অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহারকারীর পরিচয় প্রকাশ করতে পারে। ফলে ওয়েবজুড়ে তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নজরদারি সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।
সিটিজেন ল্যাব ও কনফিয়েন্ট বলেছে, গণমাধ্যম, সরকার ও প্রযুক্তি কোম্পানির মতো বেশ কিছু সংবেদনশীল নেটওয়ার্কের ভেতরেও এসব বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছিল।
এ তদন্তের মুখে গুগলের পাশাপাশি কমকাস্টসহ অন্যান্য প্রধান প্রযুক্তি কোম্পানি তাদের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে ডিসকভার-টেককে সম্পূর্ণ সরিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত একটি প্রধান প্রযুক্তি কোম্পানি ও একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা সম্প্রতি নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে যে ডিসকভার-টেকের তৈরি এ বিজ্ঞাপনী ফাঁদে তাদের কর্মীরাও পড়েছিলেন কি না।
ইয়েমেন ও দক্ষিণ সুদানে শীর্ষ বিজ্ঞাপনদাতা
ট্রেন্ডএআই-এর প্রতিবেদনে কিছু সন্দেহজনক বিডিং প্যাটার্ন উল্লেখ করে বলা হয়, ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’ কোনো স্বাভাবিক বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনী কার্যক্রম পরিচালনা না করে ‘নজরদারি ও ট্র্যাকিং অবকাঠামো’ চালাচ্ছিল।
স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের ওপর তাদের এ নজরদারির অতিরিক্ত ঝোঁক ছাড়াও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ও দক্ষিণ সুদানে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন কিনেছে ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’।
এ ছাড়া, আফগানিস্তানে তারা ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম বিজ্ঞাপন ক্রেতা। অথচ এসব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত বা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে পশ্চিমা বৈধ পণ্যের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের চাহিদা বলতে গেলে একেবারেই শূন্য।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাঙ্গেরি, ইসরায়েল, মিসর, আজারবাইজান ও ভেনিজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশে বিস্ময়কর রকম একক প্রাধান্য বিস্তার করে বিপুল পরিমাণ বিড জিতেছে ইসরায়েলি প্রযুক্তি কোম্পানিটি।
বিষয়টির সঙ্গে জড়িত একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ট্রেন্ডএআই-এর গবেষকরা নিশ্চিত ছিলেন, এ বিডিং কার্যক্রমের পেছনে ছিল ডিসকভার-টেক। তারা প্রতিবেদনে কোম্পানিটির নাম প্রকাশ করার বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা করেছিলেন।
তবে আইনি জটিলতা ও ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে ট্রেন্ডএআই-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত নাম প্রকাশের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়।
সাইবার নিরাপত্তা শিল্পে এ ধরনের ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ সাধারণ বিষয়, বিশেষ করে যখন নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করেন যে, কোনো বড় নজরদারি চক্রকে এভাবে উন্মোচন করলে তা তাদের ব্যবসার ওপর প্রতিশোধের হুমকি হতে পারে।
এ বছরের শুরুতে বৈশ্বিক এক সাইবার নজরদারি অভিযানের ওপর রিপোর্ট প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ‘পালো অল্টো’।
গবেষকরা চীনা হ্যাকারদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত থাকার পরও কৌশলগত কারণে প্রতিবেদনেটি থেকে চীনের সরাসরি নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চীনে কোম্পানিটির ব্যবসা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সুরক্ষার স্বার্থেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছিল পালো অল্টো।
তবে পালো অল্টো পরবর্তীতে এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, তাদের প্রতিবেদনে সরাসরি নাম না থাকাটা চীনের কোনো নীতি বা বাণিজ্যিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শীর্ষ ব্যবসায়ী গৌতম আদানের বিরুদ্ধে ‘স্বজনতোষী পুঁজিবাদে’র অভিযোগ তোলা একটি তথ্যচিত্র সোমবার (২৬ অক্টোবর) ইন্টারনেট থেকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। আদানি এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে দায়ের করা মানহানি মামলায় আদালত এই আদেশ প্রদান করেন।আদানি এন্টারপ্রাইজেস আদালতে দাবি করেছে, ওই প্রামাণ্যচিত্রে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য রয়েছে। এতে কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। আদালতও বলেছে, এটি কোনো সংবাদ প্রতিবেদন বা প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যভিত্তিক কাজ নয়; বরং একধরনের নাট্যরূপায়ণ বা ডিকনস্ট্রাক্টেড বিবরণ।
প্রামাণ্যচিত্রটি পোস্ট করেছেন হটমেইলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাবীর ভাটিয়া। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন উদ্যোক্তার পোস্ট করা ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ দেখেছেন। আদানি পক্ষ ৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়েছে বলে ভাটিয়া নিজেই এক্সে জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, সত্য আমার পক্ষেই আছে। এই প্রামাণ্যচিত্র আদানি এন্টারপ্রাইজকে নাড়া দিতে পেরেছে।
মোদির বিরুদ্ধে বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে আদানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগ তুলে আসছেন। তাদের দাবি, আদানি গ্রুপ নানা সরকারি সুবিধা পেয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ও আদানি গ্রুপ দু’পক্ষই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।আদানি এন্টারপ্রাইজেস আদালতে বলেছে, সরকারি নীতি বা ব্যবসায়িক কেন্দ্রীকরণ নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা বন্ধ করতে তারা চায় না। কিন্তু ভাটিয়া বস্তুনিষ্ঠ তথ্য গোপন করে মনগড়া অভিযোগ তুলেছেন বলে তাদের অভিযোগ।
এখনও পর্যন্ত আদানি এন্টারপ্রাইজেস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা সাবীর ভাটিয়ার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোও এ বিষয়ে এখনও কিছু বলেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সাবেক মিস সুইজারল্যান্ড ও মডেল বিয়াট্রিস কিউল
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন সাবেক মিস সুইজারল্যান্ড ও মডেল বিয়াট্রিস কিউল। ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তার ওপর এই নির্যাতন চালান বলে ডেমোক্র্যাটদের এক তদন্তকারী দলের কাছে তিনি দাবি করেন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
হোয়াইট হাউস এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে ভুয়া খবর বলে আখ্যা দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানান, ট্রাম্প অ্যাপস্টাইন সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের উন্মোচিত প্রতিবেদনটিকে ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক সাফল্যের ওপর ভর করে তৈরি হওয়া রিপাবলিকানদের ঊর্ধ্বমুখী গতি থেকে আমেরিকানদের মনোযোগ সরানোর জন্য উন্মাদ ডেমোক্র্যাটদের একটি মরিয়া চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে হোয়াইট হাউস।
ডেমোক্র্যাটিক কমিটির কর্মচারীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহের সাক্ষাৎকারে ২৪ বছর বয়সে ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের প্রথম সাক্ষাতের কথা জানান কিউল। তিনি জানান, ট্রাম্প তাকে ভিসা ও নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার যত্ন নেব।’ পরবর্তীতে ট্রাম্পের এক প্রতিনিধি তাকে প্লাজা হোটেলের ওপরের তলায় ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যান।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রবেশ মাত্রই ট্রাম্প কিউলকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেন এবং জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন; এই প্রক্রিয়ায় তার পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের একাধিক স্থানে রক্তপাত ও আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কিউল এই ধর্ষণকে ‘নৃশংস’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ঘটনার পর ট্রাম্প তাকে বিছানার ধারে বসিয়ে পুনরায় ভিসা ও ভর্তির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং চুপ থাকতে বলে বলেন, ‘শো চলতেই হবে।’
এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ডেইলিমেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিউল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি আমাকে ঠোঁটে ও ঘাড়ে চুমু খেয়েছিলেন। তিনি আমার পোশাক তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি আমার শরীরের সর্বত্র স্পর্শ করছিলেন।’ তবে সেই সময় কিউল জানান, তিনি কথা বলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং তার উচ্চতার কারণে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন।
২০ বছর আগেই কিউল তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে এই ঘটনার কথা জানিয়েছিলেন বলে ডেইলিমেইল উল্লেখ করে এবং তখন ট্রাম্পের তৎকালীন প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটের অভিযোগটি ভুয়া বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য জেমি রাসকিন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পাঁচজন নারী অ্যাপস্টাইনের উপস্থিতিতে বা তার সান্নিধ্যে সরাসরি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন; অন্যরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, অ্যাপস্টাইন বা ম্যাক্সওয়েল তাদের ট্রাম্পের কাছে পাচারের চেষ্টা করেছিলেন।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করতে ট্রাম্পের বিচার বিভাগ এই অপরাধগুলো ধামাচাপা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’
আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো। নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের অ্যাপস্টাইন সংক্রান্ত নথি ব্যবস্থাপনা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে দেখা দেওয়া মূল্যস্ফীতি রিপাবলিকান প্রার্থীদের রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলেছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
তেহরান সফরে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধি দল
সম্প্রতি গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় একযোগে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে ইরান। সোমবার রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয়ে মক্কা জোটের তিন মূল সদস্য দেশ সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতৈক্য প্রতাশ করে দেশটি।
বৈঠক শেষে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইরান এবং মক্কা চুক্তিভুক্ত দেশগুলো আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা এবং পারস্পরিক সংলাপ ও আলোচনা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে সম্পূর্ণ সম্মত হয়েছে। গতকালের তেহরান সফরে প্রতিনিধি দল ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানের সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপক্ষীয় সংলাপে মিলিত হন।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৈঠকে অংশ নিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপসচিব আলী বাঘেরি কানি, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান আল সৌদ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিভাগের উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলিও তাদের অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, চলমান সংকটে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানো, সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সফর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন দেবে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের মিত্র দেশগুলো।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে ক্রিমলি লিখেছেন, ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে অঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি এই সফর তুলে ধরছে।’
সংবাদ সংস্থা আনাদোলু দেশটির নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান তেহরানের বৈঠকে অংশ নেবেন। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার বিষয়ে আন্তরিক না হলেও ইরান কূটনীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি। তেহরানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘স্পষ্ট বিষয়টি হলো মার্কিন পক্ষ আলোচনা নিয়ে আন্তরিক নয়। গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছে, তারা আলোচনার সঙ্গে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলে।’
বাঘায়ি আরও বলেন, ‘আমরা কখনও কূটনীতির দরজা বন্ধ করিনি। নিজেদের জনগণ ও বিশ্বকে আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, কূটনীতির প্রতি আমাদের অঙ্গীকার আন্তরিক ও অবিচল।’
মধ্যপ্রাচ্যের আসন্ন বৈঠক সামনে রেখে নিজেদের স্বার্থ ও উদ্বেগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ায় আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রশংসা করেছে ইরান। তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসমাইল বাঘায়ি বলেন, ‘আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ ও উদ্বেগের ভিত্তিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, কিংবা অন্তত এ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করছে, এটি আমরা ইতিবাচক অগ্রগতি বলে মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘এই বৈঠক নিজস্ব সক্ষমতা ও উদ্যোগের ভিত্তিতে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। কয়েক দশক ধরে আমরা এই নীতির ওপর জোর দিয়ে আসছি। আমরা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছি, অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সেখানকার দেশগুলোর স্বার্থ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের ওপর নির্ভর করতে হবে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলে ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা বাহিনী। গতকাল সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক বাহিনী এরই মধ্যে ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। তবে অভিযান চালানোর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি ট্রাম্প। সম্ভাব্য এই অভিযান সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের সামরিক স্থাপনায় চালানো সীমিত হামলাগুলোর তুলনায় অনেক বিস্তৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ও পেন্টাগন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি বড় তালিকা তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামো।
আগের অভিযানগুলোতে মূলত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, রাডার স্থাপনা ও দ্রুত প্রতিস্থাপনযোগ্য অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তবে নতুন পরিকল্পনায় ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা ও অবকাঠামোর ওপর আরও ব্যাপক আঘাত হানার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি বড় ধরনের অভিযান হবে।’
পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, বছর শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প আবার বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিতে পারেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন মনে করেন, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলা চালানোর সম্ভাবনা বেশি।
তবে ট্রাম্প এখনও সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এর আগেও বড় ধরনের সামরিক অভিযান অনুমোদনের কাছাকাছি গিয়ে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। পেন্টাগনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, সামরিক অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা প্রতিরক্ষা বিভাগের দায়িত্বের অংশ। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা তৈরি করা মানেই প্রেসিডেন্ট হামলার নির্দেশ দিয়েছেন, এমন নয়। এদিকে ইরানে তাৎক্ষণিক সামরিক হামলার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন ট্রাম্প। গত রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ কোনো হামলা হবে না।’
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় অর্ণব আরও শক্তিশালী হয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এরপর আগামী বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সোমবার দুপুর ১২টায় ঘূর্ণিঝড়টি পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় অর্ণব পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে। সোমবার দুপুর ১২টায় এর অবস্থান ছিল ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এ সময় ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে সোমবার মধ্যরাত নাগাদ পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।
পরে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। আগামী বুধবার ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার। দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে এ গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ ছাড়া উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।