ছবি : সংগৃহীত
ইরানের কেশম, কিশ ও আবু মুসা দ্বীপে সম্প্রতি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তাদের চলমান ব্যাপক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়।
অভিযানের আওতায় বন্দর আব্বাসসহ ইরানের দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন বন্দরনগরীতেও ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ হামলার পর পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের প্রথম দিক থেকেই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছিল। আর তা হলো, ওয়াশিংটন কি ইরানের ভূখণ্ড দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
যুদ্ধের এক মাস পর গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে একটি তথ্য দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, ইরানের খারগ দ্বীপে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপ দিয়ে হয়ে থাকে। মার্কিন কর্মকর্তাদের এমন মন্তব্যের পর সেখানে স্থল অভিযানের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছিল।
গত ১৭ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর দ্বীপ দখলের আলোচনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
তবে গত সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেননি। এরপর বিষয়টি আবার নতুন করে সামনে এসেছে। এ ধরনের কোনো অভিযানের পরিকল্পনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাকে এটি বলতে পারব না। কারণ, আমি যদি বলি, তবে তা বোকামি হবে।’
তাহলে প্রশ্ন জাগে, এটি কি কেবলই যুদ্ধংদেহী কথাবার্তা, নাকি সত্যিই এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে?
ইরানের দ্বীপ দখলে মার্কিন সক্ষমতা
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড্রিয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সীমিত কৌশলগত দিক’ বিবেচনা করলে ইরানের দ্বীপগুলো দখল করার মতো সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত আকাশ, নৌ ও উভচর সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ছোট কোনো দ্বীপ দখল করতে পারে।
তবে এর ফলে যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে, তা সামাল দেওয়ার সদিচ্ছা তাদের থাকতে হবে।
বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। বড় ও স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি ছোট ছোট অগ্রবর্তী ঘাঁটিতেও এসব সেনা অবস্থান করছেন।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমিও আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানান, শুধু দ্বীপ দখল করাই নয়; বরং সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মতো সামরিক ও লজিস্টিক (রসদ সরবরাহ) সক্ষমতাও যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কারণ, বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে সামরিক দিক থেকে তারা এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে নাদের হাশেমি মনে করেন, আসল প্রশ্ন হলো, এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা মূল্য চোকাতে হবে।
কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ বলেন, ‘সাময়িকভাবে একটি দ্বীপ দখল করা এক জিনিস। কিন্তু সেখানে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, রসদ সরবরাহ করা এবং সেখান থেকে কৌশলগত সুবিধা আদায় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।’
ক্রিগ আরও উল্লেখ করেন, কেশম দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ কঠিন হবে। কারণ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; বরং বেশ বড় একটি দ্বীপ, যা ইরানের মূল ভূখণ্ডের ঠিক গায়েই অবস্থিত।
হেঙ্গামের মতো ছোট ছোট দ্বীপ হয়তো সহজেই দখল করা যাবে। তবে এগুলো ইরানের গোলন্দাজ বাহিনী, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌকার বহরের নাগালের মধ্যেই থাকবে।
সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ বলেন, একসঙ্গে কয়েকটি দ্বীপ দখল করতে গেলে তা আর ‘সীমিত অভিযান’ থাকবে না। তখন এটি বড় ধরনের একটি উভচর সামরিক অভিযানে রূপ নেবে।
দ্বীপগুলো দখল করলেই যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বাধা দেওয়া বন্ধ করবে, এমন নয়। উল্টো এর ফলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়বে এবং সেগুলোতে টানা হামলা হতে থাকবে। একই সঙ্গে এ ঘটনা তেহরানের হাতে একটি বড় যুক্তি তুলে দেবে। তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘দখলদার শক্তি’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারবে।
অত্যন্ত ব্যয়বহুল অভিযান
এ ধরনের পদক্ষেপে প্রচুর জনবলের প্রয়োজন হবে। সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ ধারণা করেন, একটি সীমিত অভিযানের জন্যও শুরুতে ৫–১০ হাজার সেনার একটি বাহিনীর প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে লড়াকু সেনা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, প্রকৌশলী, রসদ সরবরাহ, চিকিৎসাসেবা ও কমান্ড শাখার সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
যদি একসঙ্গে কয়েকটি দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে সেনার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু দখল নয়, এর পরের লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে গেলেও অতিরিক্ত সেনার প্রয়োজন হবে বলে ক্রিগ জানান।
ক্রিগ বলেন, ‘ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ধেয়ে আসা সরাসরি হামলার মুখে মার্কিন সেনাদের কাজ করতে হবে। এ ছাড়া রসদবাহী জাহাজ, ল্যান্ডিং ক্রাফট ও হেলিকপ্টারগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন ও কামানের গোলার ঝুঁকির মধ্য দিয়েই সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হবে।’
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের কিংস কলেজের এই শিক্ষক আরও যোগ করেন, ‘ইরানকে যে তাৎক্ষণিক দ্বীপগুলো পুনর্দখল করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তারা শুধু অবিরাম হামলা চালিয়ে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এতে ওই অঞ্চলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর অবস্থানে পরিণত হবে।’
ক্রিগ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই ওই সেনাদের রসদ সরবরাহ করতে পারে। তবে এ জন্য তাদের নিরবচ্ছিন্ন নৌ নিরাপত্তা ও আকাশপথে আধিপত্য বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যবস্থাও চালু রাখতে হবে। তখন সেখানে টিকে থাকাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল মিশন হয়ে দাঁড়াবে। নৌপথ সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া একটি অভিযান খুব দ্রুতই ভূখণ্ড দখলের এক অন্তহীন যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্র আসলেই দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনো দ্বীপ, বিশেষ করে খারগ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করবে কি না, তা নিয়ে ‘যথেষ্ট সন্দেহ’ প্রকাশ করেছেন জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক হাশেমি।
অধ্যাপক হাশেমি বলেন, এর ফলে মার্কিন সেনাদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে। দেশের ভেতরেও এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী ‘মাগা’ (আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলো) ঘাঁটিতে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এটি এমন এক রাজনৈতিক ঝুঁকি, যা নিশ্চিতভাবেই ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করলে যুক্তরাষ্ট্র আরও অনেক দূর যেতে পারে, এমনকি তারা ইরানের মূল ভূখণ্ডও দখল করতে পারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে তারা পাঁচ লাখ সেনা পাঠিয়েছিল। সেই সক্ষমতা তাদের আজও আছে। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে এমন কিছু ভাবাও অসম্ভব। এর বাইরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল প্রভাব তো পড়বেই। আরব বিশ্বের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও ব্যাপক ফাটল ধরবে।
হাশেমি বলেন, ‘এসবই কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা। বাস্তবে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’
শুরুতেই কি ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে হবে
ক্রিগ বলছেন, ইরানের যেকোনো দ্বীপ দখল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করে দিতে হবে। তবে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে সেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
ইরানের অনেক রাডার সিস্টেম, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাটারি, ড্রোনঘাঁটি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কমান্ড সেন্টারগুলো স্থানান্তরযোগ্য। এগুলোর অনেক কিছুই লুকানো অবস্থায় বা মূল ভূখণ্ডের একেবারে ভেতরে অবস্থিত। ফলে দ্বীপে সেনা নামানোর সময় মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো হয়তো সাময়িকভাবে সেই হুমকি দমিয়ে রাখতে পারবে।
তবে সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হলে তাদের টানা সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।
ক্রিগ দাবি করেন, দ্বীপ দখলের এ ধারণার মূল দুর্বলতা এখানেই। নৌপথে হুমকি তৈরির জন্য ইরানের আসলে এই দ্বীপগুলোর কোনো প্রয়োজনই নেই। তারা মূল ভূখণ্ড থেকেই অনায়াসে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা যদি সত্যিই পুরোপুরি নষ্ট করতে হয়, তবে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের একটি বড় অংশে হামলা চালাতে হবে। এমনকি সম্ভাব্য দখলদারত্বও কায়েম করতে হতে পারে। তিনি বলেন, ‘তেমন পরিস্থিতিতে এ অভিযান আর শুধু দ্বীপ দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বরং আরও বড় পরিসরের একটি স্থলযুদ্ধের সূচনা করবে।’
মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক হাশেমি উল্লেখ করেন, এমন দৃশ্যপট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। এর জন্য এত দিন ধরে চলা হামলার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণের প্রয়োজন হবে। এ কারণেই ওয়াশিংটন আদৌ সেই পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।
নৌপরিবহন, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব
কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনো দ্বীপ দখল করলে তেহরান বিষয়টিকে চরম উসকানি হিসেবেই নেবে। এর জবাবে তারা হরমুজ প্রণালিতে আরও বেশি মাইন পুঁতে রাখতে পারে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ, মার্কিন ঘাঁটি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বাড়িয়ে দিতে পারে তারা।
ক্রিগ আরও জানান, দ্বীপগুলো যার দখলেই থাকুক না কেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলবে। জাহাজের বিমা খরচ তখন বহুগুণ বেড়ে যাবে। আর পানিতে থাকা মাইন সরাতেও অনেক সময় লাগবে। পাশাপাশি এমন কোনো দখলের ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। কারণ, এসব দেশ চায় হরমুজ প্রণালি খোলা থাকুক। কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘাঁটি বা ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে চায় না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ক্রিগের চূড়ান্ত উপসংহার হলো, দ্বীপ দখলের বিষয়টি হয়তো একটি চমকপ্রদ সামরিক ভাবমূর্তি তৈরি করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি ‘নৌ চলাচলের স্বাধীনতা’ রক্ষার লড়াইকে ‘ভূখণ্ড দখলের এক যুদ্ধে’ পরিণত করবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাধ্য হয়ে কোনোভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এমন বড় কোনো স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে, যা তারা যেকোনো মূল্যেই এড়াতে চায়।
নেপালে ভয়াবহ বন্যায় জল ও কাদায় ডুবে যাওয়া একটি সুড়ঙ্গে টানা নয় দিন আটকে ছিলেন সঞ্জয় সাহা। খাবার ছিল না। চারপাশে ছিল অন্ধকার, ভাঙা যন্ত্রপাতি ও ধ্বংসস্তূপ।
বেঁচে থাকতে তিনি পাহাড়ের শিলা চুইয়ে পড়া পানি ও বন্যার পানি পান করেছেন। উদ্ধার হওয়ার পর শুক্রবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৩০ বছর বয়সী এই নেপালি।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় বলেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে ধ্বংসস্তূপের আঘাতে চোখে চোট লাগার ভয়েই দিনের পর দিন চোখ বন্ধ করে রাখতেন। এত বেশি সময় চোখ বন্ধ রাখার পর একসময় চোখ মেলাও কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
সঞ্জয় সাহা নেপালের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির আওতাধীন আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে তিন বছরের বেশি সময় ধরে যন্ত্রকৌশল বিভাগের ফোরম্যান হিসেবে কাজ করছিলেন। জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটির বহুতল পাওয়ারহাউসটি পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত।
গত আগস্টের শেষ দিকে হিমবাহ ধসে নেপালের বিভিন্ন উপত্যকায় ভয়াবহ বন্যা ও ধসের সৃষ্টি হয়। এতে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ১ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৩০০ জনের বেশি।
‘হাল ছেড়ে দেওয়ার কী দরকার’
সঞ্জয় জানান, হতাশা তাকে গ্রাস করতে চাইলে তিনি ভগবান কৃষ্ণের ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত মহামন্ত্র জপ করতেন-‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, হরে হরে’। এতে তার মনে একধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতি তৈরি হতো এবং ভয় অনেকটা কেটে যেত।
সঞ্জয় বলেন, ‘আমার যদি মরতেই হয়, তাহলে এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দেওয়ার কী দরকার? তাই আমি ঈশ্বরের নাম জপ করতে থাকি।’
তিনি জানান, সুড়ঙ্গের ভেতর খাবার ছিল না। পাহাড়ের শিলা চুইয়ে পড়া পানি ও বন্যার পানি পান করেই বেঁচে ছিলেন।
সুড়ঙ্গের ষষ্ঠ তলার একটি অংশে এমন একটি জায়গা ছিল, যেখান থেকে নিচের দিকে তাকানো যেত। সেখান থেকে তিনি চিৎকার করে জানতে চাইতেন, আর কেউ বেঁচে আছেন কিনা। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি।
সঞ্জয় বলেন, শুরুতে তার বিশ্বাস ছিল উদ্ধারকারী দল আসবে। দিন যত গড়িয়েছে, সেই বিশ্বাসও ধরে রেখেছিলেন। বাইরে তার পরিবার অপেক্ষা করছে- এই চিন্তাই তাকে শক্তি দিয়েছে। তার দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।
সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলেন
সুড়ঙ্গে আটকে থাকার সময়ের হিসাব একেবারেই হারিয়ে ফেলেছিলেন সঞ্জয়। তার ধারণা ছিল, হয়তো দুই বা তিন দিন কেটেছে। কিন্তু উদ্ধার হওয়ার পর জানতে পারেন, তিনি প্রায় ১০ দিন সেখানে ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছিল আমি যেন অন্য একটি জগতে বাস করছি।’
বন্যার পানিতে সুড়ঙ্গটি কাদা ও ধ্বংসাবশেষে পুরোপুরি বদলে যায়। আগে যে সুড়ঙ্গের প্রতিটি অংশ তার পরিচিত ছিল, পরে সেখানে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যন্ত্রপাতি ও বাক্স, ভেঙে পড়া দেয়াল এবং জমে থাকা ধ্বংসাবশেষে তৈরি হয় গর্ত ও উঁচু ঢিবি।
সঞ্জয় জানান, প্রথম দিকে তিনি সুড়ঙ্গের ভেতরে চলাচলের চেষ্টা করেছিলেন। পরে বুঝতে পারেন, অন্য জায়গায় গেলে আরও বিপজ্জনকভাবে আটকে পড়তে পারেন। তাই তুলনামূলক নিরাপদ মনে হওয়া একটি জায়গায় ফিরে গিয়ে সেখানেই অবস্থান করেন। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা তাকে সেখান থেকেই উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে বুঝতে পেরেছিলেন
উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে বাইরে থেকে বিভিন্ন শব্দ শুনতে পান সঞ্জয়। খননযন্ত্রের শব্দ, মইয়ের ধাতব শব্দ- এসব শুনে তার মনে আশা জাগে। তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়ার প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আগে বাইরের মানুষের কাজ করার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। তখন তার মনে হয়েছিল, উদ্ধারকারী দল তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
সঞ্জয়ের সঙ্গে একই সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছিলেন ৪৫ বছর বয়সী কবির মহার্জন। বন্যার সময় দুজনই সুড়ঙ্গের ওপরের দিকে উঠেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, বড় ধরনের বন্যা হলেও এত ওপরে পানি পৌঁছাবে না।
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নিচ থেকে পানি ঢুকতে শুরু করে। প্রথমে বাতাসের চাপ অনুভূত হয়, পরে পানি ঢুকে পড়ে। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে দুজন আলাদা হয়ে যান। সঞ্জয়ের মোবাইল ফোনও পানিতে ভেসে যায়। কবির কোথায় গেছেন, তিনি জানেন না।
কবির পরে উদ্ধার হন এবং সঞ্জয়ের চেয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
সঞ্জয় জানান, তিনি নিজে বেঁচে ফিরলেও সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে আসার পর কয়েকজনকে বন্যার পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ওই ব্যক্তিদের তিনি সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটাই সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।’
সূত্র: রয়টার্স
ছবি : সংগৃহীত
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দিল্লির পথে রওনা হওয়ার মধ্যে গুয়াংজু-নয়াদিল্লি রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছে ‘চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স’।
কোম্পানিটির বরাতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, দীর্ঘ ছয় বছর বাদে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা নিয়মিত ফ্লাইট চালু করবে।
ফ্লাইট পুনরায় চালুর পর দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের আটটি যাওয়া-আসার রুটে প্রতি সপ্তাহে ১০০টির বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে জানিয়েছে এয়ারলাইন্সটি।
এনডিটিভি লিখেছে, কোভিড মহামারী এবং সীমান্ত এলাকা ডোকলাম ও গালওয়ান উপত্যকায় সংঘাতের পর ভারত ও চীনের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
চলতি বছর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার মধ্যে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। প্রায় ছয় বছর পর গত ফেব্রুয়ারিতে চীন ও ভারতের মধ্যে পুনরায় ফ্লাইট চালু করে ভারতীয় উড়োজাহাজ সংস্থা ‘এয়ার ইন্ডিয়া’।
এরপর এপ্রিলে বেইজিং-দিল্লি রুটে সরাসরি ফ্লাইট শুরু করে ‘এয়ার চায়না’। এর আগে কুনমিং থেকে কলকাতার মধ্যে ফের ফ্লাইট চালু করে ‘চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স’। অন্যদিকে ভারতের উড়োজাহাজ সংস্থা ‘ইন্ডিগো’ গত ৩০ মার্চ কলকাতা ও সাংহাইয়ের মধ্যে তাদের প্রথম সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে, যা দুই দেশের আকাশ যোগাযোগ জোরদারে বড় ভূমিকা রাখছে।
এনডিটিভি লিখেছে, চীনে ইন্ডিগোর কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর আগে কোম্পানিটি কলকাতা থেকে গুয়াংজু রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালু করে, পরে দিল্লি থেকেও কার্যক্রম শুরু করে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। শনিবার বিকালে তাদের বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে ইরাক
সৌদি আরবে সর্বশেষ ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ইরাক। আজ শনিবার দেশটির দুটি নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, সৌদি আরবে হামলার ঘটনায় জড়িতদের ধরতে ইরাকে ব্যাপক অভিযান চলছে। এর মধ্যেই শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইরাক ও ইরানের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলসীমান্তপথ শালামচেহ। ইরান থেকে ইরাকে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনে এই সীমান্তপথটি গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। হামলার পেছনে কারা জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। ইরাকের সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্তকে তাই সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় বাগদাদের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার সৌদি আরব জানায়, ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত ড্রোন দিয়ে তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে’ হামলা চালানো হয়। এরপরই সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন।
হরমুজ প্রণালিতে তেল বাণিজ্যের জট কমাতে এই পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। যুদ্ধ প্রশমনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থমকে থাকার এমন সময়ে পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় তেল সরবরাহের ওপর আরও চাপ তৈরি হলো।
খবর: রয়টার্স
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক মাস ধরেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত সংকুচিত হয়ে আছে। এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ-লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী বাব আল-মান্দাব প্রণালিও হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ইরানের বিধিনিষেধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথ ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা এবং লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানির পথ।
কিন্তু ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা সেই বিকল্প পথেও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল কমেছে
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে গড়ে মাত্র ১৯টিতে। বৃহস্পতিবার জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, ওই দিন মাত্র ৯টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।
ওমানের কাছাকাছি সমুদ্রপথ দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করছে মার্কিন নৌবাহিনী। তবে এ পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। জুলাই ও আগস্টে ওমানের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলে অভ্যস্ত জাহাজ মালিকদের অনেকেই এখন ওই পথে যেতে অনাগ্রহী।
এর প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানিতেও। বিশ্লেষক মিশেল ভিসে বকমানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আগস্টে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
সৌদির বিকল্প পথও চাপে
হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানিতে সৌদি আরবের একটি বড় সুবিধা হলো-দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে তেল লোহিত সাগরের বন্দরগুলোতে নেওয়া যায়।
ইরান হরমুজে চলাচল সীমিত করার পর এই পথের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। লোহিত সাগরের বন্দর থেকে জাহাজ দক্ষিণে বাব আল-মান্দাব হয়ে এশিয়ায় যেতে পারে। আবার উত্তর দিকে গিয়ে সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরেও পৌঁছানো যায়।
কিন্তু এখন বাব আল-মান্দাব নিয়েই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে হুতিরা। ইয়েমেন সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ পেরিমও দখল করেছে। এর ফলে প্রণালিটির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরির সক্ষমতা বেড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দাব পেরিয়ে মাত্র দুটি সৌদি পণ্যবাহী জাহাজ গেছে।
পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও বন্ধ
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাইপলাইনটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফলে হরমুজ এড়িয়ে সৌদি তেল বিশ্ববাজারে নেওয়ার যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, সেখানেও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে তেল পরিবহনের আরেকটি পথ এখনো খোলা আছে। লোহিত সাগর থেকে জাহাজ বাব আল-মান্দাব হয়ে দক্ষিণে না গিয়ে উত্তরে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকে যেতে পারে।
সমস্যা হলো, সৌদি আরবের বড় তেল ক্রেতাদের অনেকেই এশিয়ায়। তাদের কাছে তেল পাঠাতে সুয়েজ হয়ে যাওয়ার পথ অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল।
তেলের দাম ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে
পরিবহনপথ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রভাব এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে পড়েছে। শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারেই নয়, জ্বালানির দাম বেড়েছে অন্য ক্ষেত্রেও। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে। ডিজেলের দামও ৬ ডলারের ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জন্য বিশ্ববাজারে যাওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং যেসব পথ এখনো খোলা আছে, সেগুলো ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কয়েক মাস ধরে চলা সংকট তাই এখন আর শুধু একটি নৌপথের সমস্যা নয়। বাব আল-মান্দাবেও যদি পরিস্থিতির অবনতি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ‘ব্রিকস’-এ যোগ দিতে পাকিস্তান ২০২৩ সালে আবেদন করলেও ভারতের বিরোধিতার কারণে তা আটকে রয়েছে। জোটটি গেল বছর মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নতুন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে ‘ব্রিকস প্লাস’রূপ নিলেও দিল্লির অনড় অবস্থানের কারণে ব্রিকসের বাইরেই রয়েছে ইসলামাবাদ।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, বর্তমানে যে ২৯টি দেশ ব্রিকসের সদস্য হতে চায়, তাদের মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম। মূলত তীব্র অর্থনৈতিক সংকট কাটানো এবং অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করার লক্ষ্যেই এ জোটে যোগ দিতে চায় পাকিস্তান।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।
জাপানি সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্রিকস সমর্থিত ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’-এ (এনডিবি) ৫৮ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থের শেয়ার কিনেছে পাকিস্তান।
দক্ষিণ বিশ্বের প্রভাবশালী প্লাটফর্ম হিসেবে ব্রিকসের পরিচিতি যখন বাড়ছিল, ঠিক সেই সময়েই জোটের সদস্যপদের আবেদন করে পাকিস্তান।
ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পিপিপি) নিরিখে সম্প্রসারিত এ জোট এখন বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং মোট জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে।
এনডিটিভি লিখেছে, ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের নিজস্ব বাণিজ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জোটভুক্ত দেশগুলোতে ভারতের রপ্তানি ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৬৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৯৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মুমতাজ জাহরা বালোচ জানিয়েছিলেন, পাকিস্তান বৈশ্বিক দক্ষিণের এ প্রধান জোটে যোগ দিতে চায়। তিনি বলেছিলেন, ব্রিকসের ‘বেশিরভাগ’ সদস্যের সঙ্গে পাকিস্তানের উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছে জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, ব্রিকসে যোগ দিয়ে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয়তাকে পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।”
তিনি বলেন, “আমরা এও আশা করি যে অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয়তার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার অনুযায়ী ব্রিকস পাকিস্তানের আবেদনের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।”
রাশিয়ায় নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ খালিদ জামালি রুশ সংবাদ সংস্থা তাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাকিস্তানকে সদস্যপদ পেতে সমর্থন দেওয়ার জন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়ায় রয়েছে দেশটি। বিশেষ করে রাশিয়ার কাছে সমর্থন চাওয়া হয়েছে।
এনডিটিভি লিখেছে, মস্কো ও বেইজিংয়ের সমর্থন থাকার পরও ব্রিকসে পাকিস্তানের যোগদান এখনও আটকে আছে। কারণ জোটের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়মে ভারতের বিরোধিতাই ‘দুর্ভেদ্য বাধা’ হিসেবে কাজ করছে।
ব্রিকসের নিয়ম অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ সদস্য বা অংশীদার দেশ হিসেবে নতুন কাউকে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে বর্তমান সব সদস্য দেশের সর্বসম্মত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনের এ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে বিশ্বের কয়েকটি দেশের নেতার সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
সম্মেলন ঘিরে ভূরাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি নজর কাড়ছে দুই নেতার সরকারি গাড়ি। বাইরে থেকে দেখতে দুটিই রাজকীয় লিমোজিন।
তবে নিরাপত্তার দিক থেকে এগুলো যেন চলন্ত দুর্গ। পুতিনের জন্য রয়েছে রাশিয়ায় তৈরি ‘অরুস সেনাত’, আর শি জিন পিংয়ের জন্য আনা হয়েছে চীনের ‘হংছি এন৭০১’। দুটি গাড়িই শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বিশেষভাবে তৈরি।
পুতিনের ‘অরুস সেনাত’
পুতিনের অরুস সেনাত বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় ও সুরক্ষিত সরকারি গাড়িগুলোর একটি। এটি শুধু একটি বিলাসবহুল লিমোজিন নয়; গুলির আঘাত ও বিস্ফোরণ থেকে প্রেসিডেন্টকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য গাড়িটিকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বিদেশ সফরে গেলে তার নিরাপত্তা বহরের সঙ্গে অরুস সেনাতও নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রিকস সম্মেলনের জন্যও গাড়িটি মস্কো থেকে বিশেষ বিমানে করে দিল্লিতে আনা হয়েছে।
অরুস সেনাত তৈরি করেছে রাশিয়ার অরুস মোটরস। গাড়িটির উন্নয়নের সঙ্গে দেশটির রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনএএমআই, সোলার্স জেএসসি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তাওয়াজুন হোল্ডিং যুক্ত ছিল। ২০১৮ সালে এটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। গাড়িটির নকশায় সাবেক সোভিয়েত আমলের জেডআইএস–১১০ লিমোজিনের ছাপ রয়েছে।
গুলি ও বিস্ফোরণ ঠেকানোর ব্যবস্থা
পুতিনের ব্যবহৃত অরুস সেনাতের প্রকৃত নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তবে গাড়িটিতে ভারী বর্ম, গুলিরোধী কাচ এবং বিস্ফোরণ প্রতিরোধী কাঠামো রয়েছে বলে জানা যায়।
গাড়িটির বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা শুধু গুলির আঘাত ঠেকানোর জন্য নয়, বিস্ফোরণের অভিঘাত থেকেও ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য তৈরি। এ ছাড়া গাড়িটিতে রয়েছে উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি। এর মধ্যে সক্রিয় ক্রুজ নিয়ন্ত্রণ, লেন থেকে গাড়ি সরে গেলে সতর্কবার্তা, ট্র্যাকশন নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত ব্রেকিং ব্যবস্থা রয়েছে।
সাধারণ ক্রেতার জন্যও অরুস
অরুস সেনাতের একটি বেসামরিক সংস্করণও রয়েছে। তবে সেটির উৎপাদন সীমিত। বছরে প্রায় ১২০টি গাড়ি তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলে বিভিন্ন তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি সংস্করণের তুলনায় সাধারণ সংস্করণে নিরাপত্তাব্যবস্থা কম হলেও বিলাসিতা ও প্রযুক্তির দিক থেকে এটি রাশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গাড়িগুলোর একটি।
শি জিন পিংয়ের ‘হংছি এন৭০১’
পুতিনের অরুসের মতোই সি চিন পিংয়ের হংছি এন৭০১-ও চীনের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক।
চীনা ভাষায় ‘হংছি’ শব্দের অর্থ ‘লাল পতাকা’। গাড়িটি তৈরি করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এফএডব্লিউ গ্রুপ। ১৯৫৮ সাল থেকে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য হংছি ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরি হয়ে আসছে।
হংছি এন৭০১ প্রায় ৫ দশমিক ৫ মিটার বা ১৮ ফুট দীর্ঘ। এর প্রকৃত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বেশির ভাগই গোপন রাখা হয়েছে।
হংছিতেও ভারী বর্ম
হংছি এন৭০১-এর বহিরাবরণে ভারী বর্ম এবং গুলিরোধী কাচ ব্যবহারের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গাড়িটির বিশেষ চাকা ও টায়ারও হামলার পর চলতে সক্ষম করার জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে জানা যায়।
গাড়িটির কেবিনে বাইরের রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থের আক্রমণ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এসব ব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য চীনা কর্তৃপক্ষ বা নির্মাতা প্রকাশ করেনি।
চীনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক দশকে এ মডেলের মাত্র প্রায় ৫০টি গাড়ি তৈরি করা হতে পারে। অর্থাৎ এটি সাধারণ বাজারের গাড়ি নয়; মূলত রাষ্ট্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যবহারের জন্যই তৈরি।
বিদেশ সফরে নিজের গাড়ি
আগে বিদেশ সফরে চীনের শীর্ষ নেতারা অনেক সময় আয়োজক দেশের সরবরাহ করা গাড়ি ব্যবহার করতেন। শি জিন পিং সেই রীতিতে পরিবর্তন এনেছেন। এখন তিনি বিদেশ সফরে গেলে নিজের সাঁজোয়া গাড়ি বিমানে করে সঙ্গে নিয়ে যান।
রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর সফরেও তার সরকারি গাড়ি সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল। দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনেও হংছি এন৭০১ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
দুই গাড়ি, দুই দেশের বার্তা
পুতিনের অরুস সেনাত ও সি চিন পিংয়ের হংছি এন৭০১-দুটি গাড়ির মধ্যেই একটি মিল স্পষ্ট। দুটিই শুধু রাষ্ট্রপ্রধানের যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং নিজেদের দেশের প্রযুক্তি, শিল্প সক্ষমতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রদর্শনী।
রাশিয়ার অরুস যেমন পশ্চিমা বিলাসবহুল গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের রাষ্ট্রীয় গাড়ি তৈরির সক্ষমতার প্রতীক, তেমনি হংছি এন৭০১ চীনের নিজস্ব প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি।
ব্রিকস সম্মেলনে একই শহরে যখন পুতিনের অরুস ও সি চিনের হংছি পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, তখন দুটি গাড়িই যেন দুই পরাশক্তির নীরব কূটনৈতিক বার্তা-নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় তারা নিজেদের শক্তি দেখাতে প্রস্তুত।