ছবি : সংগৃহীত
যুদ্ধ নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করাকে রোববার নিজেদের ইতিহাসের ‘উজ্জ্বল মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খানের মূল্যায়নও একই রকম।
তার ভাষায়, “আমার দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে পাকিস্তানকে এত উঁচু অবস্থানে কখনও দেখিনি।”
পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের অতীত টানতে গিয়ে এই কূটনীতিক বলেন, “২০২২ সালে আমি যখন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ওয়াশিংটনে যাই, তখন পরিস্থিতি ছিল খুব কঠিন। অথচ এখন পাকিস্তান সেই কাজটি করছে, যা করার কথা জাতিসংঘের।”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ড্রপ সাইট’ লিখেছে, ইরান যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হাজির হওয়াটা অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। কিন্তু দেশটি এখন বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে বড় ধরনের ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসলেও তেহরান অবশ্য ইসলামাবাদকে খুব একটা ভরসা করে না।
রোববার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই টুইটারে লেখেন, “পাকিস্তান আমাদের ভালো বন্ধু ও প্রতিবেশী। কিন্তু আলোচনার জন্য উপযুক্ত মধ্যস্থতাকারী নয়। মধ্যস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বাসযোগ্যতাও তাদের নেই।
“তারা সবসময় ট্রাম্পের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলে না।”
পাকিস্তান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভালোবাসার পাত্র হয়ে উঠল, সেই আলোচনায় ‘ড্রপ সাইট’ লিখেছে, এটা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক চাপ ও নানা কৌশলের গল্প। একই সঙ্গে তা পাকিস্তানের রাজনীতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর আধিপত্য ধরে রাখার দক্ষতার প্রমাণও।
ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের কাছে আসার ঘটনাক্রম হিসেবে ২০২২ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া; ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ‘কারচুপি করা’ এবং দেশটির সামরিক শক্তিকে আরো ক্ষমতাবান করার বিষয়গুলো সামনে এনেছে ‘ড্রপ সাইট’।
তবে নতুন এই সম্পর্ক আঞ্চলিক রাজনীতির অবয়বে পরিবর্তনের আশা জাগালেও তা দুর্বল ভিত্তির কারণে ধসে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পাকিস্তানকে নিয়ে এখন যেসব প্রশংসা সংবাদমাধ্যমে আসছে, সেগুলোর কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে ইরান যুদ্ধে তাদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকে। কিন্তু এই গল্পের বুনন শুরু হয়েছে অনেক আগেই।
ইসলামাবাদে বার্নস
২০২১ সালের জুনে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইসলামাবাদ সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা— সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নস।
ওই সময়ের খবর অনুযায়ী, তিনি ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার জন্য পুরো একটা দিন অপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু সেই বৈঠক আর হয়নি।
ইমরান খানের কার্যালয় ফোনে বার্নসকে জানিয়ে দেয়, কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী কেবল তার সমপর্যায়ের নেতার সঙ্গেই কথা বলবেন।
ওই সময় ইমরান খানের সমপর্যায়ের ব্যক্তি ছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যিনি ওই বছরের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর ইমরান খানের ফোনালাপের অনুরোধ একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
বাইডেনের এই অস্বীকৃতি ছিল তার আগের প্রশাসনের অবস্থান থেকে অনেকটাই ভিন্ন।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ইমরান খানকে হোয়াইট হাউজে সংক্ষিপ্ত বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও সেই বৈঠক চলে দেড় ঘণ্টার বেশি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইমরান খানের মধ্যে তখন উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। বেশ কিছু বিষয়ে মিলও ছিল তাদের মধ্যে।
দুজনই রাজনীতির বাইরের মানুষ হিসেবে আশি ও নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এছাড়া দুজনই প্রায় একই সময়ে রাজনীতিক পরিচয়ে হাজির হন।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্প ও ইমরান খান আবার দেখা করেন। পরের বছরের জানুয়ারিতে তাদের আরেক দফা সাক্ষাৎ হয় হোয়াইট হাউজে।
কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের কাছে ইমরান খান ছিলেন ‘পাকিস্তানের ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মাত্র।
দুই দশক ধরে মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছিলেন, পাকিস্তান একদিকে তালেবানকে আশ্রয় দেয়, অন্যদিকে উপরে উপরে মিত্রতা দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার সামরিক সহায়তা নেয়।
২০১১ সালে পাকিস্তানের সামরিক একাডেমির শহর অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে। ওই ঘটনার পর পাকিস্তাননের সামরিক বাহিনী বেশ সমালোচনায় পড়ে যায়। কারণ সেই অভিযান চালানো হয় ইসলামাবাদকে না জানিয়েই।
২০২০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহল বলতে থাকে, ওয়াশিংটনের আফগানিস্তান ছেড়ে দেওয়া এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা উচিত।
ড্রপ সাইট লিখেছে, একই সময়ে সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু ইমরান খানের সরকার সেটি প্রত্যাখ্যান করে।
নীতিগতভাবে ইমরান খানের সরকার ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ— উভয়ের সঙ্গেই একটা কূটনৈতিক সীমারেখা টেনেছিল। কিন্তু ইমরানের খানের এই নীতির কারণে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ভাবতে শুরু করেছিল, দেশটি হয়ত আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
এমন মনোভাবের কারণেই ২০২১ সালের জুলাইয়ে ইমরানের অজান্তেই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সিআইএর ইসলামাবাদ স্টেশনের সাবেক প্রধানকে ওয়াশিংটনে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়।
পাকিস্তানের জেনারেলরা যে নির্বাচিত সরকারের বাইরে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করেছে, এ ঘটনা ছিল তার প্রাথমিক ইঙ্গিত।
‘সবই ক্ষমা করে দেওয়া হবে’
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ও ইউক্রেইনের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। ওই সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে মোকাবেলা করাই ছিল তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
মার্কিন কূটনীতিকরা বিভিন্ন দেশকে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন।
রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ ঘিরে বিশ্ব যখন বিভক্ত হতে শুরু করে, তখন পাকিস্তান অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেকে এই বিভক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে আবিষ্কার করে।
ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি, যেদিন রুশ বাহিনী ইউক্রেইনে প্রবেশ করে, সেদিন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত একটি বৈঠক করতে মস্কোতে অবস্থান করছিলেন ইমরান খান।
সেই বৈঠকের কয়েক দিন আগে বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে ফোন করে ইমরান খানকে রাশিয়া সফর বাতিল করার অনুরোধ জানান।
ফাঁস হওয়া সেই ফোনালাপ থেকে জানা যায়, সুলিভান সেদিন ইমরান খানের সফরের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন এবং ইউক্রেইন যুদ্ধে ইসলামাবাদকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইমরান খান সেই সতর্কতা তোয়াক্কা করেননি।
ওই বৈঠকের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়ার নিন্দা জানিয়ে আনা একটি প্রস্তাবে পাকিস্তান ভোটদানে বিরত থাকে।
ড্রপ সাইট লিখেছে, সবকিছু মিলিয়ে ক্ষুব্ধ মার্কিন কূটনীতিকরা গোপনে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের এই বার্তা দেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
২০২২ সালের ৭ মার্চ ওয়াশিংটনে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর সঙ্গে দেখা করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান।
সেই কথোপকথন পরে ফাঁস হয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
ফাঁস হওয়া সেই কথোপকথন অনুযায়ী, লু সেদিন রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, একটি অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে যদি ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে ইমরান খানের সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের ক্ষোভ প্রশমিত করা যাবে, অর্থাৎ ‘সব ক্ষমা করে দেওয়া হবে’ (এই বাক্যটি পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের মুখ থেকে এসেছিল)।
এরপর ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সমর্থনে একটি অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার ওয়াশিংটনকে এমন সব সুবিধা দিতে থাকে, যা ইমরান খান প্রত্যাখ্যান করেছিল।
কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তান ইউক্রেইনের জন্য কামানের গোলাসহ বিভিন্ন সামরিক রসদ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ফাঁস হওয়া নথিপত্র থেকে জানা যায়, এসব অস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার এবং তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতায় পাঠানো হয়েছিল। পাকিস্তানের এসব রসদ ইউক্রেইনের অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী যখন ব্যাপকভাবে নির্বাচনে কারচুপি করে ইসলামাবাদে পছন্দের সরকার বসায়, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র, কেউই কোনো কথা বলেনি।
পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র
২০২২ সালের ৯ এপ্রিল, যেদিন ইমরান খানের সরকারের পতন ঘটে, সেদিনই একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায় পাকিস্তান। ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল 'শাহীন-৩’। এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভারতকে মাথায় রেখে পরিচালিত হয়। কিন্তু সেদিন যে ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়, সেটি ইসরায়েলেও আঘাত হানতে সক্ষম।
ক্ষেপণাস্ত্রের এই পরীক্ষার সূত্র ধরে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে আবার সামনে আনা হয়।
যে সেনাপ্রধানের হাতে ইমরান খানের পতন ঘটে, সেই কামার জাভেদ বাজওয়ার ২০২২ সালের অক্টোবরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন সফর করেন। সফরটি হয় সেনাপ্রধান হিসেবে তার মেয়াদের শেষ মাসে।
সফরকালে বাজওয়া মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানসহ বাইডেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সেসব বৈঠকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেন, পাকিস্তান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সীমা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, যা ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের আরো বেশি সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টায় বাজওয়া এই আশ্বাসও দেন, চীনের কাছ থেকে পাকিস্তান দূরে সরে আসতে চায়।
২০২২ সালের অক্টোবরে দেশে ফেরার পরেই জেনারেল বাজওয়া ‘স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের’ (এসপিডি) প্রধানকে ফোন করেন। এসপিডি মূলত পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র তদারকি করে থাকে।
বাজওয়া ও এসপিডি প্রধানের কথোপকথনের বিবরণ সম্পর্কে জানা যায়, জেনারেল বাজওয়া সেদিন তাকে দেশের কিছু পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন প্রতিনিধিদের পরিদর্শন ও পরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেন।
পাকিস্তানে এসপিডি প্রধান সরাসরি জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ (জেসিএসসি) কমিটির কাছে জবাবদিহি করেন। এই কমিটি আবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করে, সেনাপ্রধানের অধীনে নয়।
এই যুক্তি দেখিয়ে এসপিডি প্রধান সেদিন সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করেন। অমান্য করার কারণে এটা স্পষ্ট হয় যে, সামরিক বাহিনীর প্রধান দেশের পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন না।
একই মাসের শেষ দিকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একটি বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, "পাকিস্তান সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক দেশ। কারণ এই দেশটির কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও অভ্যন্তরীণভাবে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।"
হুট করে আসা এই বিবৃতি অনেক পর্যবেক্ষককে অবাক করেছিল। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য, এই বিবৃতির সঙ্গে পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার না দেওয়ার সম্পর্ক ছিল।
এই ঘটনার এক মাস পর বাজওয়া পদত্যাগ করেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে তার স্থলাভিষিক্ত হন জেনারেল আসিম মুনির, যিনি ২০২৫ সালে নিজেকে 'ফিল্ড মার্শাল' পদে উন্নীত করেন। নিজের জন্য 'চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস' নামে একটি নতুন পদও তৈরি করেন।
এছাড়া সংবিধানে সংশোধনী এনে জেসিএসসির ভূমিকা বিলুপ্ত করেন তিনি, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি আসিম মুনিরকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও দেয়।
আসিম মুনিরের দ্বিতীয় অধ্যায়
আসিম মুনির হলেন ট্রাম্পের ভাষায় ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’। মুনির নিজেও এই উপাধি বেশ উপভোগ করেন। তবে মুনির যে এমন পদে আসীন হবেন, তা কখনোই হিসাবে ছিল না।
২০১৯ সালের এপ্রিলে মুনির যখন দেশের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন, তখন তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তা এবং ইরানের রেভলুশনারি গার্ড কোরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তেহরান সফর করেছিলেন।
ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মতে, ইরান-পাকিস্তান সীমান্তের বেলুচ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ নিয়ে ইরানিদের সঙ্গে বিবাদে জড়ান আসিম মুনির।
কিন্তু বেলুচ অঞ্চলের বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তান ও ইরানের পারস্পরিক সহযোগিতা দুই দেশকে আরো কাছে টানতে পারত। কিন্তু সেটা হতো ইরানকে একঘরে করার মার্কিন পরিকল্পনার পরিপন্থি।
মার্কিন নির্দেশে হোক, কিংবা নিজের সহজাত প্রবৃত্তির কারণে হোক, আসিম মুনির সেই সম্ভাবনা নস্যাৎ করে মার্কিনিদের মস্ত বড় উপকার করেছিলেন।
আসিম মুনিরের এই আচরণ নিয়ে ইরানের কর্মকর্তারা ইমরান খানের কাছে নালিশ জানান। সেই নালিশের জেরেই ২০১৯ সালের জুনে ইমরান খান তাকে সরিয়ে দেন বলে ধারণা করা হয়।
আইএসআই প্রধান হিসেবে আসিম মুনিরই সবচেয়ে কম সময় দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া বাজওয়া তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে যাদের তালিকা করেছিলেন, সেখানে আসিম মুনিরের নামই ছিল না।
ইমরান খান পরে অভিযোগ করেন, চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর মুনির লন্ডনে যান এবং নওয়াজ শরিফের সঙ্গে দেখা করেন।
ইমরান খানের মতে, ওই বৈঠক ছিল সেই ষড়যন্ত্রের সূচনা, যাকে তিনি পরে ‘লন্ডন প্ল্যান’ বলে অভিহিত করেন।
বলা হয়, ওই পরিকল্পনাটি ছিল আসিম মুনির, নওয়াজ শরিফ এবং পাকিস্তানের উচ্চ আদালতের কিছু বিচারপতির মধ্যকার একটি সমঝোতা, যার অধীনে ইমরান খানের সরকার ও তার দলকে ধ্বংস করার বিনিময়ে আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধানের পদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কয়েক মাসের মাথায় ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুর্নীতি, আদালত অবমাননা ও জাতীয় নিরাপত্তার একগুচ্ছ মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার দণ্ড বাতিল হয়ে যায়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে তার ছোট ভাই শেহবাজ শরিফ আবারও প্রধানমন্ত্রী হন এবং আসিম মুনির হয়ে যান দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ইমরান খান এখনো কারাগারেই আছেন।
চীনকে ঠেকানো
গত দশকের প্রায় পুরোটা সময় পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্ক ছিল। বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প হিসেবে ২০১৫ সালে চালু হয় ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানে শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ এসেছিল, যারা কিনা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে হিমশিম খাচ্ছিল।
ইসলামাবাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সম্পর্ককে কখনো কখনো ‘সবচেয়ে গভীর সমুদ্রের চেয়েও গভীর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আসিম মুনিরের অধীনে সেই সম্পর্ক প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
চীনের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যে ৯০টি প্রকল্প ছিল, তার মধ্যে মাত্র ৩৮টি সম্পন্ন হয়েছে। ২৩টি এখনো নির্মাণাধীন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাজই শুরু হয়নি।
কাজ শেষ হওয়া সর্বশেষ বড় প্রকল্প ছিল ‘গোয়াদার ইস্ট বে এক্সপ্রেসওয়ে’। এটি শেষ হয় ২০২২ সালে। এরপর থেকে পাইপলাইনে নতুন কোনো বড় প্রকল্প যুক্ত হয়নি।
নতুন অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে চীন সফর করার পর প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ খালি হাতে বেইজিং ছাড়েন।
চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া পরিশোধ না করায় পাকিস্তানের দেনা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে, যা দুই দেশের দ্বন্দের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পর্দার আড়ালের সম্পর্ক ছিল আরও শীতল। পাকিস্তান বেইজিংকে গোপনে আশ্বস্ত করেছিল যে, তারা চীনকে গোয়াদারের গভীর সমুদ্র বন্দরে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানানোর অনুমতি দেবে। সেই ঘাঁটির বিনিময়ে বেইজিংয়ের কাছে একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরে পাকিস্তান।
তারা চীনের কাছে দাবি করে, এই অনুমোদনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রতিশোধ হিসেবে কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেয়, তবে চীন যেন তার ক্ষতিপূরণ বা সুরক্ষা দেয়।
তারা ভারতের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতায় পাল্লা দিতে চীনের সহায়তাও চান। সবচেয়ে বড় দাবি ছিল, তারা বেইজিংয়ের কাছে পাকিস্তানের জন্য একটি সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক 'সেকেন্ড-স্ট্রাইক' সক্ষমতা অর্জনের দাবি তুলেছিল। তবে চীন তাতে রাজি হয়নি।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের বিষয়ে ২০২৫ সালের অগাস্টে এক সাক্ষাৎকারে আসিম মুনির বলেছিলেন, "আমরা এক বন্ধুকে অন্য বন্ধুর জন্য কোরবানি দেব না।"
তবে নিজেদের স্বার্থে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত ঠিক সেটাই করেছে।
জোটের জাল
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে পাকিস্তান। তিন বছর আগে ইমরান খানের সরকার এই চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের নতুন সামরিক নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে তৎপর হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প পরিবার যখন ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসায় নামে, ইসলামাবাদও তা অনুসরণ করে ‘পাকিস্তান ক্রিপ্টো কাউন্সিল’ গঠন করে।
এই কাউন্সিল গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্স’ এর শীর্ষ কর্তারা ইসলামাবাদে যান।
২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল পাকিস্তানে পা রাখা সেই প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ওয়ার্ল্ড লিবার্টির প্রধান নির্বাহী এবং স্টিভ উইটকফের ছেলে জ্যাচ উইটকফ এবং এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাক ফোকম্যান ও চেজ হিরো।
সফরের শেষ দিকে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এই স্মারকের মাধ্যমে পাকিস্তান তার বার্ষিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের একটি অংশ ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন ফার্মের মাধ্যমে লেনদেন করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
যখন চীনের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মার্কিন নির্ভরতা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছিল, পাকিস্তান তখন মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে একটি ‘বিরল খনিজ’ চুক্তি ঘোষণা করে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই চুক্তিটি হয় সামরিক বাহিনী পরিচালিত ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন এবং মিসৌরি-ভিত্তিক ফার্ম ‘ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস’-এর মধ্যে।
এই চুক্তির অধীনে, পাকিস্তানি অ্যান্টিমনি, তামা, টংস্টেন এবং বিরল খনিজ উপাদানের বিনিময়ে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসে।
এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন যখন গাজায় তার প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাহিনীর জন্য একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সন্ধান করছিল, তখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী স্বেচ্ছায় সেখানে সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দেয়।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পুরোটা সময় পাকিস্তান প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টায় তারা প্রতিশ্রুতি অনেক দিয়েছে, বাস্তবায়ন করেছে খুবই কম।
ইসলামাবাদ থেকে অনবরত প্রচার চালানো হলেও ইরান যুদ্ধের শান্তি আলোচনা অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা থেকে বাদ দিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে চাপ দেওয়া শুরু করেছে।
তবে ট্রাম্প এখনো পাকিস্তান নিয়ে বিরক্ত নন। সম্প্রতি এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “তারা চমৎকার। আমি মনে করি পাকিস্তানিরা দারুণ কাজ করেছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল এবং প্রধানমন্ত্রী এক কথায় অসাধারণ।”
ইসরায়েলি হামলার পরে গাজার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১০ জন, যাদের মধ্যে পাঁচজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রোববার (২৫ অক্টোবর) উপত্যকাটির বিভিন্ন এলাকায় এসব হামলা চালানো হয়। চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু।
সূত্র জানায়, গাজা নগরীর ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ইসরায়েলি হামলায় তিন ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, এর কিছুক্ষণ আগে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের একটি জমায়েত লক্ষ্য করে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হন। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। হামলার পর গাজা নগরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্রম-সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার পর বাস্তুচ্যুত অনেক ফিলিস্তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
উত্তর গাজায় উপত্যকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আল-রশিদ উপকূলীয় সড়কে বেসামরিক মানুষের একটি জমায়েত লক্ষ্য করে ইসরায়েলি হামলায় কয়েকজন আহত হন। তবে আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ ছাড়া জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরের পশ্চিমে আল-ফালুজা এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে পায়ে আঘাত পাওয়া এক ফিলিস্তিনিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্র। খান ইউনিসে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে এক নারীও মাঝারি মাত্রায় আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা আনাদোলুকে জানান, খান ইউনিস শহরের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলের দিকে গুলি ও গোলা ছুড়েছে ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ।
মধ্য গাজায় দেইর আল বালাহ শহরের পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় ৩৩ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার ভোরে গাজা নগরীর পূর্বাঞ্চলীয় আল তুফাহ এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন স্থানে দুটি দফায় বাড়িঘর ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে দুটি বড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ১ হাজার ৫৫১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া উপত্যকাটির বেসামরিক অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণের পর ফ্রান্সে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খারাপ পরিবেশের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন লাখো মানুষ। শনিবারের (২৪ অক্টোবর) এসব বিক্ষোভে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দিনের শুরুতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
প্যারিসে শান্তিপূর্ণ মিছিল শেষে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। কিছু বিক্ষোভকারী অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। কয়েকজন মুখোশধারী তরুণ গাড়ির শোরুমের জানালাও ভাঙচুর করেন। রাজধানীতে শনিবার ১৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দক্ষিণের বন্দরনগরী মার্সেইয়ে ময়লার পাত্রে আগুন দেওয়া হয় এবং সড়কে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। বোর্দো শহরেও সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরির জন্য ভবনের কাঠের পাটাতন খুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। লিওঁ শহরে নিষিদ্ধ এলাকায় জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সংঘর্ষে ৫৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তুলুজ ও ক্লেরমঁ-ফেরাঁ শহরে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। তুলুজে ২০ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর হাতে বিস্ফোরণের ঘটনায় কয়েকটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। এর আগে গত সপ্তাহের বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। ওই বিক্ষোভের পর সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হন। দেশজুড়ে দুই হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছে ফ্রান্সের বাণিজ্য ও শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনের মধ্যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ পরিস্থিতিতে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা বাড়ছে।
সৌদি আরবের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত
আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এক সপ্তাহে ৭ হাজার ৯৩৪ জনকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি আরব। একই সময়ে দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে ১৩ হাজার ৯০৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। খবর গালফ নিউজের।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, গত ১৫ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে তল্লাশি ও অভিযান চালিয়ে এসব আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৬ হাজার ৫৫৪ জনের বিরুদ্ধে আবাসন আইন, ৩ হাজার ৮৬৫ জনের বিরুদ্ধে সীমান্ত নিরাপত্তা আইন এবং ৩ হাজার ৪৮৬ জনের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধভাবে সৌদি আরবে প্রবেশের চেষ্টার অভিযোগে ১ হাজার ৮৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনুমোদনহীন সীমান্তপথে দেশ ছাড়ার চেষ্টায় আটক হয়েছেন আরও ২২ জন। আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনকারীদের পরিবহন, আশ্রয়, কর্মসংস্থান বা অন্য কোনোভাবে সহায়তার অভিযোগে আরও ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে অভিবাসন ও শ্রম আইন লঙ্ঘনসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন ৩৭ হাজার ৬১৮ জন প্রবাসী। তাদের মধ্যে ৩৫ হাজার ৪৪৯ জন পুরুষ এবং ২ হাজার ১৬৯ জন নারী। বিবৃতিতে বলা হয়, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি সংগ্রহের জন্য ২০ হাজার ২৫২ জনকে নিজ নিজ দেশের কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ভ্রমণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে আরও ৬ হাজার ৫৫৫ জনকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনভুক্ত সময়ে মোট ৭ হাজার ৯৩৪ জনকে সৌদি থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
তবে বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা কোন কোন দেশের নাগরিক, তা বিবৃতিতে উল্লেখ করেনি মন্ত্রণালয়।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, অবৈধভাবে কাউকে দেশে প্রবেশে সহায়তা করা, দেশের ভেতরে পরিবহন করা, আশ্রয় দেওয়া কিংবা অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
এ ধরনের অপরাধে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। অপরাধীদের পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন এবং তাদের আশ্রয় দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে। পাশাপাশি অপরাধীদের পরিচয় প্রকাশ করার বিধান রয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের অপরাধ গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, যার জন্য গ্রেপ্তার করা যায় এবং যা সম্মান ও বিশ্বাসের পরিপন্থী কাজের অন্তর্ভুক্ত।
সন্দেহজনক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা জানাতে বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মক্কা, মদিনা, রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে ৯১১ নম্বরে এবং সৌদি আরবের অন্যান্য এলাকায় ৯৯৯ অথবা ৯৯৬ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানানো যাবে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পক্ষে প্রচারে নেমে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধ এবং চড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন।
গতকাল শনিবার ওহাইওতে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ওবামা বলেন, “এই প্রশাসনের কিছু বোকামি অন্তত কিছুটা হলেও লাগাম টেনে ধরার জন্য এই নির্বাচনই আমাদের শেষ সেরা সুযোগ।"
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ক্ষমতা দখলের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে বারাক ওবামা নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। এই প্রচারে তিনি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দুর্নীতির নিন্দা করেছেন, ইরান নিয়ে তার কৌশলের সমালোচনা করেছেন এবং হোয়াইট হাউজ সংস্কারে ট্রাম্পের জাঁকজমক নিয়ে খোঁচা দিয়েছেন।
ওবামা ক্লিভল্যান্ড ও ডেট্রয়েটের সমাবেশে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছেন।
মিশিগানে মার্কিন সেনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের পক্ষে প্রচার চালানোর সময় ওবামা আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনকে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির কিছু বোকামিকে অন্তত কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার একটি 'সার্কিট ব্রেকার' বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “আমাদের এই অচলাবস্থা বা চলমান ধারা ভাঙতে হবে এবং এই সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
ওদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে জর্জিয়ার এক সমাবেশে তার প্রশাসনের অভিবাসন এবং শুল্ক নীতির প্রশংসা করে সমর্থকদের বলেছেন, “আমরা আমেরিকার সুবর্ণ যুগে আছি।”
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির মেয়াদের বাকি সময়ের জন্য কংগ্রেস কোন দল নিয়ন্ত্রণ করবে তা ঠিক করবে, আর তাই প্রেসিডেন্টের জন্য তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা কতটা সহজ হবে সেটিও এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারণ হয়ে যাবে।
আগাম ভোটগ্রহণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং ট্রাম্প শনিবার ফ্লোরিডায় তার স্ত্রী ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে একসঙ্গে নিজের ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যেই ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে প্রচারে নেমে শনিবার ওহাইও এবং মিশিগানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওবামা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিশানা করে সমালোচনা করেছেন। এক পর্যায়ে তিনি হোয়াইট হাউজ পুনর্সজ্জা করার জন্য ট্রাম্পের চেষ্টা নিয়ে উপহাসও করেন।
ক্লিভল্যান্ডের প্রচার সমাবেশে ওবামা বলেন, “আধুনিক যুগে আমরা দেখিনি এমন বিশৃঙ্খলা, নিষ্ঠুরতা, দুর্নীতি এবং অযোগ্যতার দীর্ঘ দুই বছর পার করার পর, আপনার কাছে 'যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়' বলার সুযোগ এসেছে।”
ওবামা বলেছেন, তিনি সেইসব ভোটারদের প্রতি সহানুভূতিশীল যারা কোভিড মহামারীর পর অর্থনৈতিক এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২০২৪ সালে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে তিনি বলেন, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার জন্য ট্রাম্পের কেবল নিজেকেই দোষ দেওয়া উচিত।
“আপনি যদি ভেবে থাকেন যে 'আপনি কার কথা বলছেন' (নাম উল্লেখ না করে ট্রাম্পকে নির্দেশ করে) তার আসার আগে সবকিছু খুব ব্যয়বহুল ছিল, তবে এখন সবকিছু আরও বেশি ব্যয়বহুল।”
ওবামা মিশিগানের প্রচারসমাবেশে জনতার মনের মতো কথা বলে তাদের খুশি করেন। তিনি ডেমোক্র্যাটদের সেইসব সমালোচনার পুনরাবৃত্তি করেন, যা ট্রাম্প এবং তার সব কথায় রিপাবলিকানদের অন্ধ সমর্থন দেওয়াকে নিয়ে করা হয়।
ওবামা বলেন, “জনগণের করের অর্থ ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক ফায়দা লোটার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রেসিডেন্টের মতো এমন চতুর ও পারদর্শী কাউকে আগে কখনও দেখা যায়নি। এই প্রেসিডেন্টের মতো ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যকে বেশি বেশি সুবিধা দিতে কাউকে কখনও দেখিনি। এখন মনে হচ্ছে, দলটি হয় দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার, না হয় অযোগ্য সরকার, অথবা কোনও সরকার না থাকার পক্ষে অবস্থান করছে।”
এই সমালোচনার বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়ার অনুরোধে হোয়াইট হাউজ তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
তবে রোববার সকালে ট্রুথ সোশালে এক পোস্টে ট্রাম্প সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে চরম অযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন এবং আল-সায়েদকে মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন জিহাদি আখ্যা দিয়েছেন; যিনি ইহুদি, কৃষ্ণাঙ্গ, আমেরিকান এবং ট্রাম্পকে ঘৃণা করেন।
বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়াচ্ছে নিম্নচাপ। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় ভারতের পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূলীয় রাজ্যগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালের মধ্যে নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। আগামী ২৮ অক্টোবর সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা ও বিশাখাপত্তমের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে ঝড়টি স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে।সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার হতে পারে। দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি শুরু করেছে ওড়িশা সরকার। রাজ্যের পাঁচটি জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই দিনের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, কোরাপুট ও মালকানগিরি জেলায় আগামী ২৮ ও ২৯ অক্টোবর স্কুল, কলেজ এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। অন্যান্য জেলায় আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেবেন সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকেরা।
ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি প্রশাসনকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের প্রস্তুতি জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। উদ্ধারকাজের জন্য প্রায় ৬০টি ওড়িশা দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর দল, ১৭টি জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর দল এবং দমকলের ২২৫টি দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।আবহাওয়া দপ্তর ২৮ অক্টোবর গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, কোরাপুট ও মালকানগিরি জেলায় অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কায় লাল সতর্কতা জারি করেছে। এসব এলাকার কোথাও কোথাও ২০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টি হতে পারে। বজ্রপাতের পাশাপাশি ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির কয়েকটি এলাকায় টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন। পুদুচেরির কোস্ট রোড, কৃষ্ণনগর ও লাসপেট এলাকায় পানি জমে দুর্ভোগ বেড়েছে। চেন্নাই, নাগাপট্টিনম, কুড্ডালোর, কারাইকাল, পাম্বান ও তুতিকোরিনসহ একাধিক বন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলে ঝড়টির নাম হবে ‘অর্ণব’। নামটি প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। তবে ঝড়টির গতিপথ, শক্তি ও স্থলভাগে আঘাত হানার স্থান সম্পর্কে পরবর্তী পূর্বাভাসের ওপর নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যটিতে প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার এই ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভের সময় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কার্যালয়, একটি পুলিশ স্টেশন ও পুলিশের কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ ছাড়া স্থানীয় দুই বিধায়ক ও রাজ্য বিজেপি সভাপতির বাসভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা জোরদার এবং তিনটি শহরে মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট টুডে বলছে, অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্পের (এসইউএমপি) বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং এরপরই পূর্ব সিয়াং জেলার তিন শহরে পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন।
গত শুক্রবার জারি করা আদেশে শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিকেল ৫টা থেকে জেলার পাসিঘাট, মেবো ও রুকসিনে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা কার্যকর করা হয়।
চলমান আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় পূর্ব সিয়াং জেলা প্রশাসন এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর আগে পূর্ব সিয়াংয়ের পুলিশ সুপার পাসিঘাটে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের সম্ভাব্য পরিকল্পনার বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের আদেশে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আরও ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে’। শান্তি ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, সব ধরনের জনসভা, মিছিল, সমাবেশ এবং পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র, দা, ধনুক-তীর, ছোরা, ছুরি, কুঠার ও লাঠিসহ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে- এমন কোনো বস্তু বহন করা যাবে না। তবে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তাকর্মীরা এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন।
এছাড়া ভাঙচুর, সম্পত্তি ধ্বংস, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেয়ার মতো কাজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো মিছিল বা বিক্ষোভও করা যাবে না বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় নির্ধারিত এলাকার সব বাসিন্দাকে পুলিশ ও প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম অরুণাচল২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্পের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার রাতে পাসিঘাটে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। এ সময় জাতীয় জলবিদ্যুৎ নিগমের (এনএইচপিসি) একটি কার্যালয়, একটি পুলিশ স্টেশন এবং পুলিশের কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। এ ছাড়া দুই স্থানীয় বিধায়ক ও রাজ্য বিজেপি সভাপতির বাসভবনে ভাঙচুর চালানো হয়।
অবশ্য প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক তদন্ত ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশের উদ্বেগ, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হতে পারে, পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে এবং পূর্বপুরুষের জমি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে রাজ্য সরকার পানি ব্যবস্থাপনা এবং তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উজানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির বৃহত্তর গুরুত্ব তুলে ধরেছে। অরুণাচল প্রদেশে এই নদী সিয়াং নামে পরিচিত।
পূর্ব সিয়াংয়ের ডেপুটি কমিশনার জয়ন্তী পার্টিনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দিনের বেলায় পাসিঘাটে বন্ধ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে বিকেল ৫টায় আনুষ্ঠানিক বন্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েক শ বিক্ষোভকারী আন্দোলন চালিয়ে যান, মহাসড়ক অবরোধ করেন এবং স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট ও নিরাপত্তাকর্মীদের অনুরোধ সত্ত্বেও সরে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেও পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব হয়নি। এরপর জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরে বিক্ষোভকারীরা পুলিশ ও অন্য কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকেন। এতে কয়েকজন আহত হন।
রাত ১১টার দিকে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। শুরু হয় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর। আর শনিবার ভোর পর্যন্ত এই সহিংসতা চলে।
পাসিঘাটের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ টনি তাতাক নিজেও সহিংসতায় আহত হন। তিনি জানান, হাই রিজিয়ন এলাকায় এনএইচপিসির কার্যালয় এবং একই এলাকার একটি পুলিশ স্টেশনে আগুন দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের সাত থেকে আটটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
সহিংসতার সময় পাসিঘাট ওয়েস্টের বিধায়ক নিনং এরিং, মারিয়াং-গেকুর বিধায়ক ওনি পানিয়াং এবং অরুণাচল প্রদেশ বিজেপির সভাপতি কালিং ময়ংয়ের বাসভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়। আদি জনগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ সংগঠন আদি বানে কেবাংয়ের কার্যালয়ও তছনছ করা হয়েছে।
এমন অবস্থায় শনিবার সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বিক্ষোভকারীদের আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সহিংস বিক্ষোভের আমি তীব্র নিন্দা জানাই। এসইউএমপি প্রকল্প নিয়ে যাদের উদ্বেগ রয়েছে, তাদের এমন পথ বেছে না নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানাচ্ছি।’