বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আবারও একটি অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। আওয়ামী লীগহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে দলটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে ১৫১টি জিতে নিয়েছে বিএনপি। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা পাচ্ছে তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে। জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় নতুন শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হওয়া ধর্মভিত্তিক দলটি পেয়েছে ৪২টি আসন।
এছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোটে থাকা বিজেপি ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসন পেয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক এনসিপি তিনটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে।
চারটি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ৯৪টি আসনের পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণা এখনো বাকি। সেখানেও বেশ কিছু আসনে বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এদিন সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও হয়। আর তাতে অনুমিতভাবেই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। এই ফলের অর্থ হল, জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮ দফা বাস্তবায়নের সম্মতি দিয়েছেন দেশের নাগরিকরা। অবশ্য গণভোটের প্রক্রিয়া ও প্রশ্নের গঠন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে; নাগরিকরা ভোট দিয়েছেন না বুঝেই।
তারেকের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন
১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার সরকারগঠন করেছিল তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আর এবার তাদেরই সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি চতুর্থবারের মত দেশ শাসনের ভার নিতে যাচ্ছে।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একানব্বইয়ের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল বিএনপি।
তার পরের তিন নির্বাচনে দুই বার সরকার গঠন করলেও মেয়াদ শেষ করতে পেরেছিল একবার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে দলটি চলে গিয়েছিল শাসন ক্ষমতার বাইরে।
আওয়ামী লীগের আমলে তিনটি নির্বাচনের দুটি বর্জন করেছিল বিএনপি, একটিতে হয়েছিল ভরাডুবি। এরপর চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর নতুন বাস্তবতায় বিএনপির সামনে সরকারে ফেরার পথ তৈরি হয়।
১৯ বছর পর বিএনপি যখন সরকারে ফিরছে, তখন নতুন মেরুকরণে বিরোধীর আসনে নেই তাদের ৩৫ বছরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞা আর নিবন্ধন স্থগিত থাকায় সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশ শাসন করা আওয়ামী লীগের এবার ভোট করার সুযোগ ছিল না।
বাংলাদেশের যে কোনো নির্বাচন সর্বোচ্চ ১৮ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী সেই সুযোগে এবার বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েছে বেশ। মায়ের ব্যাটন হাতে তুলে নেওয়ার ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে বাংলাদেশের ক্ষমতা কেন্দ্রে প্রায় তিন যুগের চেনা চেহারা বদলে যাবে।
এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে তার মা, বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঘিরে। প্রায় দেড় দশক টানা দেশ শাসন করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এখন ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। আর আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিয়েছেন।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুজনে একটা সময়ে পর্যায়ক্রমে সরকার প্রধান হয়ে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একজন যখন সরকার প্রধান হয়েছেন, অন্যজন তখন থেকেছেন বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকায় রাজপথে।
এক সময় তাদের বৈরি সম্পর্ককে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ হিসেবেও চিত্রিত করেছে।
২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার জন্য তখনকার বিএনপি সরকারকে দায়ী করে আওয়ামী লীগ। আবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলার সাজা নিয়ে কারাগাযে যেতে হয়েছিল। পরে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও অসুস্থতার কারণে তাকে একপ্রকার ঘরবন্দি জীবন কাটাতে হয়।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর খালেদা জিয়া পুরোপুরি মুক্ত হন, আদালতের রায়ে মুক্তি পান সাজা থেকেও।গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া যখন চিরবিদায় নেন, তার কয়েক সপ্তাহ আগে ঘোষিত হয়েছিল ত্রয়োদশ নির্বাচনের তফসিল।
তার মৃত্যুর পর বিএনপির এক শোকাহত কর্মী আক্ষেপ করেছিলেন, “ও আল্লাহ, আর কয়টা দিন বাঁচায় রাখতা, আমার ম্যডাম যাতে নির্বাচনটা দেইখা মৃত্যুবরণ করত।”
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে এই নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি ছোটবড় দল। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ভোটের মাঠে প্রার্থী ছিলেন ২০২৮ জন।
জামায়াতের একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে প্রচারের মাঝপথে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয় ২৯৯টি আসনে।
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে বিপুল সংবর্ধনায় দেশে ফিরে নির্বাচনি যাত্রায় নেমেছিলেন তারেক রহমান, যিনি মায়ের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। দেশ গঠনের ‘পরিকল্পনা’ নিয়ে দেশে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, এক্ষেত্রে দেশবাসীর সমর্থন তিনি চান।
তার দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান তার মা, খালেদা জিয়া; নির্বাচনি আমেজের মধ্যে তার এই বিদায়ে নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেন তারেক।
ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে যেতে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক কয়েকটি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে বিএনপি। তাদের জন্য আটটি আসন ছেড়ে দেয়।
২২ জানুয়ারি সিলেটের আলীয়া মাদ্রাসা থেকে নির্বাচনি প্রচার শুরু করে সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জনসভা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।ভোটের প্রচারে জামায়াতে ইসলামীকে নিশানা করে তীব্র আক্রমণ শানান তিনি। ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ও ধর্মের নামে রাজনীতি করা’ দলকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান।
তারেক রহমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলে এতদিন রাজনীতি করে আসা জামায়াতকে তিনি ভোটের প্রচারে নতুন রূপে দেখানোর চেষ্টা করেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রমের দল এলডিপির পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিকে সঙ্গী হিসেবে পাশে টেনে নেয় জামায়াত। প্রার্থী করা হয় একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকেও।
ক্ষমতায় গেলে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা জামায়াত বললেও ভোটের প্রচারের সময় নারীদের নিয়ে জামায়াত আমিরসহ কয়েক নেতার বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক।
জামায়াতের আমিরও ভোটের প্রচারে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন। বিএনপির অতীত মনে করিয়ে দিয়ে ‘দুর্নীতি ও চাঁদাবাজদের’ বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
ভোটের সকালে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে এসে বিএনপির জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, আন্দোলনের সময়কার সঙ্গীদের পাশাপাশি ‘কম-বেশি’ আরও রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে তারা দেশ পরিচালনা করতে চান।
ঢাকা সেনানিবাসের আদমজী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মহাখালী, পান্থপথ, ভাষাণটেক, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডির ২৭ নং সড়ক, সোহানবাগ ঘুরে নিজের কার্যালয়ে এসে তিনি দেশজুড়ে ভোটার উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘‘ভোটার উপস্থিতি আমি যতটুকু ঢাকা শহরে দেখেছি, আমার কাছে মনে হচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ মানুষ অত্যন্ত উৎসাহ ভরে তার ভোট প্রয়োগ করতে যাচ্ছে।”
“আমি বিশ্বাস করি, গত দুই দিনে যেভাবে দেখেছি মানুষজন লঞ্চ, স্টিমারে, ট্রেনে, বাসে করে বিভিন্ন উৎসাহ নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছে, যার যার এলাকায় ফিরে গিয়েছে, ভোট দেয়ার জন্য আমরা প্রত্যাশা করি যে, ইনশাআল্লাহ আজকে সেই প্রত্যাশা নিশ্চয়ই থাকবে।”
সকালে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের একটি কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর জামায়াত আমির শফিকুর রহমানও সরকার গঠনের ব্যাপারে আশাবাদের কথা বলেন ।
তিনি বলেন, “এই ভোটের মাধ্যমে আগামীতে এমন সরকার গঠিত হোক, যে সরকার কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দলের হবে না; বরং যে সরকার হবে ১৮ কোটি মানুষের জনগণের সরকার। আমরা সেই সরকার গঠনের ব্যাপারে আশাবাদী, আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”
নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা দেখছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর বলেছিলেন, “আমরা ছোটখাটো কোনো বিষয় হলে অবশ্যই এগুলোকে ইগনোর করব। কিন্তু বড় কোনো বিষয় হলে আমরা ছাড় দেব না এবং আমাদের যা করা প্রয়োজন, তাই করব। কারণ মানুষের ভোটের অধিকার হারিয়ে যাক, এটা আমরা কোনোভাবেই চাই না।”
২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে ঠাঁই পেয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতা। তবে নিজেদের সক্ষমতায় সরকার গঠন তো দূরে থাকা, প্রধান বিরোধী দলের আসনেও বসার সুযোগ তাদের হয়নি। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এবার তারা সে সুযোগ পেতে যাচ্ছে।
কেমন হল ভোট
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এদিন গণভোট হয়। মোটাদাগে শান্তিপূর্ণভাবেই দিনভর ভোটগ্রহণ চলে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও কোথাও বড় ধরনের কোনো গোলযোগের খবর পাওয়া যয়নি। কোনো কেন্দ্র বাতিল বা স্থগিতও করতে হয়নি।
ভোট চলাকালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, মানিকগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও গাইবান্ধায় ৬ জনের মৃত্যু হয়। তবে তাদের পাঁচজনই মারা যান হঠাত অসুস্থ হয়ে। আরেকজনকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট তিনটি আসনের কয়েকটি কেন্দ্রে ‘ভোটগ্রহণে বিশৃঙ্খলার’ অভিযোগ তোলে।
এনসিপি বলে, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোটগহণ ‘সন্তোষজনক’ হলেও তারপর থেকেই সারা দেশ থেকে তারা বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছে। ভোটের সময় বিভিন্ন স্থানে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এনেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলেছে, আশঙ্কাজনক কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, কোনো কেন্দ্র ভোট স্থগিতও হয়নি। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটে অংশগ্রহণ করায়, দেশবাসীকে ধন্যবাদও দিয়েছে তারা।
দুপুর ২টা পর্যন্ত সাড়ে ছয় ঘণ্টায় ৩৬ হাজার ৩১টি কেন্দ্রে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। মোট ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে পুরো ৯ ঘণ্টায় কত শতাংশ ভোট পড়েছে, সে তথ্য এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্রে গিয়ে ভোটে নাগরিকদের ‘অংশগ্রহণের আগ্রহকে ইতিবাচক’হিসাবে বর্ণনা করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইইয়াবস।
সারা দেশে ইউ মিশনের পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিশ্বাসযোগ্য পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তৈরির জন্য ইতোমধ্যে আমরা তথ্য গোছানোর কাজ করছি। দুপুর পর্যন্ত ভোটে বাংলাদেশের জনগণের অংশগ্রহণের আগ্রহ ইতিবাচক দেখতে পাচ্ছি।”
এদিকে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, বেশ কিছু আসনে রিটার্নিং অফিসাররা ফল ঘোষণা না করে ‘ঝুলিয়ে’ রেখেছেন। তবে তিনি এ বিষয়ে এখনি বিস্তারিত বলতে চাননি।
তিনি বলেন, “বেশকিছু আসনে আমাদের জানামতে আমরা এগিয়ে আছি। গণনাও কমপ্লিট। কিন্তু রিটার্নিং অফিসাররা ফল ঘোষণা করছেন না। ঝুলিয়ে রেখেছেন, আমরা বুঝছি না কেন। মাঝখানে আবার ওয়েবসাইটে দিয়ে উধাও করে দেওয়া হল। ওনারা একটু আগে একদম প্রথম পর্যায়ের ১০টা, ১২টা ফল দিচ্ছেন।
“আমাদের বুথ ফেরত যে শিট এসেছে সেখানে আমরা দেখেছি, এগিয়ে আছি। কিন্তু এটা নিয়ে লোকালি বিভিন্ন টালবাহানা করা হচ্ছে।”
রাতে ঢাকা-৮ আসনে ফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে যান জামায়াত জোটের শরিক এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। পরে পাল্টা অভিযোগ নিয়ে সেখানে যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ‘শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ায়’ জাতিকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
একইসঙ্গে ফল ঘোষণার পরও যেন রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম অব্যাহত থাকে, সেই আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে ভোটগ্রহণ শেষে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলসমূহের দায়িত্বশীল আচরণ, প্রার্থীদের সংযম ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব- এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই প্রমাণ করেছে যে, গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটুট। জনগণ তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন, পর্যবেক্ষক দল, গণমাধ্যমকর্মী ও ভোটগ্রহণে সম্পৃক্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।
“তাদের নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ফলেই এই বিশাল গণতান্ত্রিক আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানাই- চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পরও যেন গণতান্ত্রিক শালীনতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট থাকে। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আজ আবারও প্রমাণ করেছে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমরা সম্মিলিতভাবে একটি জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে এগিয়ে যাব।
“এই নির্বাচন আমাদের জন্য মহা আনন্দের ও উৎসবের। এর মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের এক অভূতপূর্ব যাত্রা শুরু হলো।
নোবেলজয়ী ইউনূস বিদায় বেলায় বলেন, “এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর ছিল। এই ধারা ধরে রাখা সম্ভব হলে আমাদের গণতন্ত্র উৎকর্ষের শিখরে যাবে। আসুন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার এই অভিযাত্রায় আমরা একসঙ্গে কাজ করি।”
সরাইল থানার ওসির সঙ্গে রুমিন ফারহানার বাদানুবাদ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ওসির সঙ্গে বাদানুবাদের ঘটনায় কোনো মামলা হলে প্রধান আসামি হিসেবে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে তার এ-সংক্রান্ত লিখিত বক্তব্য সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করেন ব্যক্তিগত সহকারী জাকির হোসেন।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে সরাইল থানা ভবনে ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার সঙ্গে তর্কে জড়ানোর ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রুমিন ফারহানা এ প্রতিক্রিয়া জানান।
লিখিত বক্তব্যে রুমিন ফারহানা উল্লেখ করেন, সরাইল থানার ওসির বিরুদ্ধে গত ২৩ অক্টোবর জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের প্রতি সম্মান রেখে তিনি অপেক্ষা করছেন, এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওসির বিরুদ্ধে কী ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে সরাইল থানা ভবনে ওসির সঙ্গে তার অনিয়ম-দুর্নীতি ও দুর্গাপূজায় মণ্ডপ পরিদর্শনের সময় পুলিশি নিরাপত্তা না পাওয়ার জেরে বাদানুবাদে জড়ান রুমিন ফারহানা। এছাড়া রুমিন ফারহানার সঙ্গে আসা এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন ওসি তার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। ওসি ঘুষ নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ওই ব্যক্তিকে রুমিন ফারহানা শিখিয়ে থানায় এনেছেন বলে উল্লেখ করেন।
এ নিয়ে বাদানুবাদের একপর্যায়ে রুমিন ফারহানা ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়াকে বলেন, ‘আপনি তো আওয়ামী লীগের চোর।’
তপন চন্দ্র দাস ও লিখন চন্দ্র দাস
গাজীপুরের টঙ্গীতে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় তপন চন্দ্র দাস (৫০), লিখন চন্দ্র দাস (২০) নামে বাবা ও ছেলের মৃত্যু হয়েছে। আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে টঙ্গী পূর্ব থানাধীন গাজীপুরা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, শনিবার ভোর আনুমানিক ৪টা ১০ মিনিট থেকে ৪টা ২০ মিনিটের মধ্যে গাজীপুরা বিআরটি লেনের পূর্ব পাশে কুটুমবাড়ি হোটেলসংলগ্ন মহাসড়কে বাবা ও ছেলে অজ্ঞাত একটি গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হন। খবর পেয়ে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ আহত দুজনকে উদ্ধার করে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ছেলে লিখন চন্দ্র দাসকে মৃত ঘোষণা করেন। এসময় তাঁর বাবা তপন চন্দ্র দাসকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে ৯ টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। নিহত বাবা ছেলে শেরপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ থানার কৈবর্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তারা টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন সাতাইস চৌরাস্তা এলাকায় জনৈক মিজানের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে টঙ্গী পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ মাকসুদুল আলম বললেন, যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।
খুলনায় পুলিশের আইজিপি
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি), বাংলাদেশ মোঃ আলী হোসেন ফকির বিপিএম বলেছেন, জন-আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) এবং খুলনা এলাকার মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও উগ্রবাদ বিরোধী কমিউনিটি পুলিশিং সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান শেষে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এ কথা বলেন।
কেএমপি কমিশনার মোঃ সাজ্জাদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ রেজাউল করিম এবং পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, খুলনার কমান্ড্যান্ট (ডিআইজি) এ কে এম মোশাররফ হোসেন মিয়াজী। অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সুধী সমাজের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
আইজিপি বলেন, বিগত সতেরো বছরে পুলিশ এবং জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসন করাই আমাদের লক্ষ্য। ৫ আগস্টের পর পুলিশ দৃঢ় মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, পুলিশ কাজ করছে। জনগণের সাথে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে আমরা মানবিক পুলিশ হতে চাই, জনবান্ধব পুলিশ হতে চাই। বর্তমান সরকার মাদক ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে "জিরো টলারেন্স" ঘোষণা করেছে; যাতে সমাজে কোন মাদক না থাকে, চাঁদাবাজ না থাকে, কিশোর গ্যাং না থাকে।
আইজিপি আশা প্রকাশ করে বলেন, আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এসব অপরাধ নির্মূল করবো। বর্তমানে কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ, মাদক ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চলছে। বর্তমান সরকার এ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও বেগবান করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বলে জানান। পরে আইজিপি খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে খুলনাস্থ বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় ও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
ঠাকুরগাঁও এর আকচা ও চিলারং ইউনিয়নে শুক্রবার থেকে বুড়ির বাঁধ এলাকায় চলছে মাছ ধরার মহৌউৎসব। ঠাকুরগাঁওয়ে বছরের পর বছর ধরে হেমন্তের শুরুতেই বুড়ির বাঁধে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরা উৎসব যেন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
সম্প্রীতি সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ খায়রুল ইসলাম এখানে তৈরি করেছেন একটি দৃষ্টিনন্দিত মৎস চত্বর। যা স্থানীয় অদূরান্তের দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে। এই বাঁধে অবৈধ কারেন্ট জাল ও রিং জালের বিরুদ্ধে নিয়েছেন ব্যবস্থা। অবমুক্ত করা হয়েছে মাছের পোনাও।ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ও চিলারং ইউনিয়নে আজ শনিবার থেকে বুড়ির বাঁধ এলাকায় পুরোদমে চলছে মাছ ধরার উৎসব। আর এখানকার শুক নদীর 'বুড়ির বাঁধ' এলাকায় প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছে ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার উন্মুক্ত উৎসব। রীতিমতো প্রতিযোগিতার আমেজে চলে এ মাছ শিকার, যা ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উদ্দীপনা। শীতের আগমনী বার্তায় বাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়ার পর সবার জন্য মাছ ধরার এ সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে এখানে বসেছে তিন দিনের এক গ্রামীণ মেলাও।
এর আগে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) থেকেই বাঁধের গেট খুলে দেওয়া হয়। এর পরেই শত সৌখিন শিকারি ও সাধারণ মানুষ বুড়ির বাঁধ এলাকায় মাছ ধরতে নামেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামীণ জনপদ ও শহর থেকে শত শত মানুষ বুড়ির বাঁধে ভিড় করেছেন। নারী, পুরুষ, শিশুসহ সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখরিত বাঁধের চারপাশ। সবাই যার যার মতো করে জাল, পলো (খলুই), খোচা ও লাফি জাল নিয়ে নেমে পড়েছেন কাদা-জলে। এমনকি সরঞ্জামহীন অনেকেই খালি হাতেও নেমেছেন মাছ ধরতে। সব মিলিয়ে বুড়ির বাঁধ এলাকায় চলছে মাছ ধরার মহা উৎসব।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মূলত ১৯৮২ সালে শুকনো মৌসুমে এ অঞ্চলের জমি চাষাবাদের জন্য ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে শুক নদীর ওপর বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে উজানের পানি এখানে আটকে রাখা হয় সেচের জন্য। এ সময়ে ঠাকুরগাঁও মৎস্য অধিদপ্তর বাঁধের পানিতে বিভিন্ন মাছের পোনাও অবমুক্ত করে। আর শীতের শুরুতেই যখন পানি ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন বাঁধের মাছ ধরার জন্য সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
এভাবেই প্রতি বছর বুড়ির বাঁধে চলে আসছে মাছ ধরার এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব।
ঠাকুরগাঁও সদরের চিলারং ইউনিয়ন অম্বারু থেকে আসা কামরুল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর বুড়ির বাঁধে মাছ ধরার জন্য এই দিনটির অপেক্ষায় থাকি।
অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ভালো মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য আমি খুব খুশি। কারণ দেশি মাছের স্বাদ আলাদা। এখানে রুই, পাবদা, ষোল ও বড় মাছ পাওয়া যাচ্ছে।
পীরগঞ্জের আমতলী থেকে আসা আলআমিন হকের মতে, বুড়ির বাঁধে মাছ ধরতে এসে মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল লোকমেলা, যেদিকে চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ।
মাছ শিকারি ছাড়াও মেলায় ভিড় বাড়ে মাছের ক্রেতাদেরও। শহর থেকে আসা মাছ ক্রেতাদের অভিযোগ, দেশি মাছ পাওয়ার আশায় তারা এখানে আসেন, কিন্তু এসে দেখেন শহরের বাজারের চেয়েও এখানকার মাছের অনেক সস্তা ও টাটকা।
ভুল্লী বাজার থেকে আসা সুজন ইসলাম জানান, এখানে টেংরা, গোচি, শিং, টুনা মাছ প্রতি কেজি ৪০০-৫০০ থেকে টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর শোল ও রুই-কাতলা মাছের দাম চাওয়া হচ্ছে ৫০০-৬০০ টাকা। পুঁটি মাছও বিক্রি হচ্ছে ১২০-২০০ টাকায়।
শহরের কলেজপাড়া থেকে আসা সৌখিন মাছ শিকারি রফিকুল ইসলাম বলেন, কত মাছ পেলাম সেটা বড় কথা নয়। সারা বছর অপেক্ষায় থাকি এই বুড়ির বাঁধে মাছ ধরতে আসার জন্য।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোঃ সভা আলী জানান, অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় বাঁধের গেট খুলে দেওয়া হয় এবং শীতের শুরুতেই মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
উৎসবে যোগ দেয়া ঠাকুরগাঁওয়ের রাজা শহিদুল আসলাম বলেন, মনে হচ্ছে যেন এক গ্রামীণ মেলায় এসেছি। মাছ ধরা এখানে উপলক্ষ মাত্র, আসলে এটা মিলনমেলা। এভাবেই প্রতি বছর বুড়ির বাঁধে চলে শত শত মানুষের মিলনমেলা ও মাছ ধরার এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব।
যুবদল নেতা রামিম
প্রতিনিয়ত খুলনায় সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসা কেন্দিক গুলি করে হত্যার খবর নতুন না হলেও এবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) খুলনা সফরের মধ্যেও প্রকাশ্যে রামিম (৩২) নামে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে আহত করার ঘটনা ঘটেছে।
আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে তেরখাদা উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের পারহাজী গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে রামিম বিশ্বাস (৩২) নামে এক যুবদল নেতা আহত হয়েছেন। মোটরসাইকেলে এসে তাকে গুলি করা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
আহত রামিম বিশ্বাস পারহাজী গ্রামের হাবিবুর বিশ্বাসের ছেলে। তিনি মধুপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মোহাম্মদ বিল্লাল মোল্লা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকালে ভ্যানে করে কোলাবাজারের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন রামিম। পথে গ্রামের আইনাল মোল্লার বাড়ির সামনে প্রধান সড়কে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার পিঠের ডান পাশে গুলি লাগে। পরে তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালের ৯ ও ১০ নম্বর সার্জারি ওয়ার্ডে তাকে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে তেরখাদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহমেদ আলী বিশ্বাস জানান, পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২২ অক্টোবর মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনা নগরীতে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই দিন ভোরে নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম তুষার (৩২) নামের এক যুবককে প্রতিপক্ষ গ্রুপের দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। একই দিন সন্ধ্যায় লবণচরার জিন্নাপাড়া বউবাজার এলাকায় খুশি বেগম (২৫) নামের এক গৃহবধূকে তার মায়ের সামনেই মাথায় গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
জৈন্তাপুর পৌরসভা
সিলেটের জৈন্তাপুরে পৌরসভা গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। উপজেলার ১ নম্বর নিজপাট ও ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের ১২টি মৌজার নির্ধারিত পল্লী এলাকাকে পৌরসভা ঘোষণা করেছে সরকার। এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন গত ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত জৈন্তাপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এর আগে পৌরসভা গঠনের উদ্যোগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও পত্র প্রদান এবং শহর এলাকা ঘোষণার অভিপ্রায় সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
জৈন্তাপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ডিও পত্র দেন। পরে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-২ শাখা থেকে ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে এস.আর.ও. নং ২৮১-আইন/২০২৬ নম্বরে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এটি ১৪ জুলাই বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত এলাকাগুলোকে শহর ঘোষণার অভিপ্রায় জানানো হয়েছিল।
পাশাপাশি, গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে লিখিত আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়।পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত আপত্তি নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৩-এর উপধারা (৪)-এর ক্ষমতাবলে ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এস.আর.ও. নং ৩৭০-আইন/২০২৬ নম্বরে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়।
এর মাধ্যমে তফসিলে উল্লেখিত পল্লী এলাকাগুলোকে শহর ঘোষণা করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনটি রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব আশফিকুন নাহার, পিএইচডি। সরকারি গেজেটের তফসিল অনুযায়ী, ১ নম্বর নিজপাট ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা হলো-ডিবি হাওর, ঘিলাতৈল, গৌরিশংকর, নিজপাট, পূর্ব লক্ষীপ্রসাদ ও গুয়াবাড়ী।
অন্যদিকে, ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা হলো-কেন্দ্রী হাওড়, মোয়াখাই, লামনীগ্রাম, মুক্তাপুর, বিরাইমারা হাওর ও ভিত্রিখেল। সব মিলিয়ে দুই ইউনিয়নের ১২টি মৌজার নির্ধারিত ভূমি পৌরসভা ঘোষণার আওতায় এসেছে। গেজেটের তফসিলে মৌজাভিত্তিক জে.এল. নম্বর ও দাগ নম্বরের পরিসরও উল্লেখ রয়েছে। পৌরসভা বাস্তবায়নের উদ্যোগে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা রয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর পৌরসভা বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষ থেকে মন্ত্রী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
পৌরসভা প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। পৌরসভা প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম চালু হলে পরিকল্পিত নগরায়ণ, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিক সেবার পরিধি বাড়ানো, স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং জনসেবার মান উন্নয়নের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবায়ন নির্ভর করবে পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক কার্যক্রম, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ওপর।