ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, সময় : ১১:৫৫ এএম

‘তওবা’ একটি আরবি শব্দ, যার অভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। ইসলামের পরিভাষায় তওবা মানে হলো মহান আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ চিরতরে ছেড়ে দিয়ে তাঁর নির্দেশিত পথ ও ধর্মের দিকে ফিরে আসা। অনেক সময় মানুষ তওবা করার পরও শয়তানের প্ররোচনায় কিংবা প্রবৃত্তি তাড়িত হয়ে আবার পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বারবার তওবা ভেঙে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে অনেকে লজ্জা ও হতাশায় তওবা করাই ছেড়ে দেয়।


তাবেয়ি হাসান বসরিকে (রহ.) একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘বান্দা পাপ করে আবার তওবা করে, এরপর আবার পাপ করে আবার তওবা করে—এতে কি তার লজ্জিত হওয়া উচিত নয়?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘শয়তান তো এটাই চায়! তোমরা কখনোই তওবা করা ছাড়বে না।’ (ইবনে রজব আল-হানবালি, জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/৪১৫, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০১)


একইভাবে অনেক সময় খাঁটি মনে তওবা করার পর মানুষের জীবনে সাময়িক কষ্ট, পরীক্ষা কিংবা রিজিকের অভাব দেখা দিতে পারে।


ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যাহ উল্লেখ করেছেন, তওবার পর সংকট আসা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমানের এক বিশেষ পরীক্ষা; আল্লাহ দেখতে চান বান্দা বিপদেও তাঁর ওপর অবিচল থাকে নাকি আবার পাপাচারের দিকে ফিরে যায়। (ইবনুল কাইয়িম, আল-ফাওয়াইদ, পৃষ্ঠা ৯৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৭৩)


শতবার প্রতিশ্রুতি ভাঙলেও পরম আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার পথ সবসময় খোলা থাকে। বান্দার অনুশোচনায় আল্লাহ এতটাই আনন্দিত হন, যা মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট ও রশদ খুঁজে পাওয়ার পর মালিকের আনন্দের চেয়েও অনেক বেশি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৮)


শুধু মুখে স্বীকার নয়


তওবা শুধু মুখের কিছু প্রথাগত শব্দ উচ্চারণ নয়। শুধু ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বা ‘হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করো’ বলাটাই তওবার মূল কথা নয়, যদি না এর পেছনে অন্তরের গভীর অনুশোচনা থাকে।


পবিত্র কোরআনে ধোঁকাবাজিমুক্ত ও খাঁটি তওবার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো—খাঁটি তওবা। (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৮)


একজন মুমিন ও একজন দুরাচারী মানুষের মধ্যে পাপকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পার্থক্য থাকে।


মহানবী (সা.) বলেছেন, একজন মুমিন তার পাপকে এত বড় মনে করে যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় পাচ্ছে যে পাহাড়টি যেকোনো মুহূর্তে তার ওপর ভেঙে পড়বে; অন্যদিকে একজন দুরাচারী লোক তার পাপকে মাছির মতো মনে করে, যা তার নাকের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৮)


তওবা কবুলের আবশ্যকীয় ৫ শর্ত


ইসলামের বিধান অনুযায়ী, একজন মানুষের তওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট পাঁচটি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক:


১. একনিষ্ঠ তওবা: তওবা হতে হবে শুধুই পরম আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। কোনো সামাজিক লোকলজ্জা, দুনিয়াবি ক্ষতি এড়ানো কিংবা মানুষের কাছে ধার্মিক হিসেবে প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তওবা করলে তা কবুল হবে না।


কোরআনে বলা হয়েছে, আর তাদের শুধু এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে তারা যেন একনিষ্ঠ হয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে। (সুরা বাইয়িনা, আয়াত: ৫)


২. কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ: অতীতের করা অন্যায় ও পাপের জন্য অন্তরে গভীর লজ্জা ও অনুশোচনা থাকতে হবে। আল্লাহর অবাধ্যতা করা এবং তাঁর আদেশ অমান্য করার কারণে নিজের ভেতর যে আত্মগ্লানির জন্ম হয়, সেটাই হলো তওবার মূল আত্মিক রূপ।


৩. পাপ কাজ বর্জন: যে পাপে মানুষ লিপ্ত ছিল, তা তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিতে হবে। যদি পাপটি কোনো ফরজ ইবাদত (যেমন নামাজ বা জাকাত) ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে তা কাজা বা আদায় করার উদ্যোগ নিতে হবে।


আর যদি পাপটি মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, যেমন কারও ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা বা কাউকে গিবত বা অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি, তবে মালিকের সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিষ্কৃতি পেতে হবে।


৪. ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প: মনে মনে আবার পাপে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা রেখে মুখে তওবা করা এক ধরনের উপহাস। তওবা কবুল হওয়ার জন্য অন্তরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে যে সুযোগ পেলেও ভবিষ্যতে আর এই পাপে লিপ্ত হওয়া যাবে না।


তবে দৃঢ় সংকল্প থাকা সত্ত্বেও মানবিক দুর্বলতার কারণে পরবর্তীকালে আবার ভুল হয়ে গেলে আগের তওবা বাতিল হবে না; কিন্তু নতুন ভুলের জন্য নতুন করে আবার তওবা করতে হবে।


৫. সময় পার হওয়ার আগেই তওবা করা


তওবার দরজা সবসময় খোলা থাকলেও দুটি বিশেষ সময় পার হয়ে গেলে তওবা আর কবুল হয় না:


১. মৃত্যুর গলার কাছে প্রাণ আসার পূর্বে। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে নিশ্চিত বিনাশ দেখে তওবা করলে তা কবুল হয় না। কোরআনে বলা হয়েছে, আর তাদের জন্য তওবা নেই, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে যায়, অবশেষে যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন সে বলে: আমি এখন তওবা করছি। (সুরা নিসা, আয়াত: ১৮)


প্রাচীন মিসরের ফেরাউন সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে ইমান আনার ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তার শেষ মুহূর্তের অনুশোচনা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯০-৯১)


২. পশ্চিম দিকে সূর্য উদয় হওয়ার পূর্বে। কেয়ামতের অন্যতম প্রধান আলামত হিসেবে পশ্চিম আকাশে সূর্য ওঠার পর সমগ্র মানবজাতি ইমান আনলেও সেদিনকার তওবা আর গ্রহণযোগ্য হবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৩৬)


তওবা মুমিনের সারাজীবনের অভ্যাস


তওবা কোনো সাময়িক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একজন মুমিনের সারাজীবনের নিত্যদিনের অভ্যাস।


নবীজিও প্রতিদিন আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করতেন। তিনি বলেছেন, হে মানবজাতি, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, নিশ্চয়ই আমি দিনে ১০০ বার আল্লাহর কাছে তওবা করি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০২)


অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি দিনে ৭০ বারেরও বেশি ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৭)


পাপ যত বড় বা যত বেশিই হোক না কেন, আল্লাহর রহমতের মহাসমুদ্রের সামনে তা অত্যন্ত তুচ্ছ। সততা, আত্মশুদ্ধি এবং শর্ত সাপেক্ষে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মাধ্যমেই মানুষ অর্জন করতে পারে পরম প্রতিপালকের ভালোবাসা ও ক্ষমার অফুরন্ত সুসংবাদ।




  • প্রকাশ : শুক্রবার ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, সময় : ৯:৩০ এএম

মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার জন্য সময় বের করে। তার গুরুত্ব উপলব্ধি করে, তার কথা পালনে সচেষ্ট হয়। আল্লাহ–তাআলার নৈকট্য লাভের বিষয়টি এমনই। আল্লাহর পরিচয়, তাঁর অসীম অনুগ্রহ জানা থাকলে অন্তরে তাঁর প্রতি আগ্রহ বাড়ে। ফলে বান্দার সঙ্গে তার রবের সম্পর্ক তৈরি হয়।


এই সম্পর্ক যত গভীর হয়, বান্দা ততই আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার সুযোগ পায়। সুতরাং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য মুমিনের জীবনে এই ১০টি বিষয়ের চর্চা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


১. আল্লাহর পরিচয় ও মহত্ত্ব উপলব্ধি করা


ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা তৈরির অন্যতম উপায় হলো আল্লাহকে চেনা। তাঁর অসীম ক্ষমতা, দয়া, অনুগ্রহ ও মহত্ত্ব সম্পর্কে যত বেশি জানা যায়, অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য তত গভীর হয়। মানুষ যখন উপলব্ধি করে, তার জীবন, জীবিকা, সুস্থতা ও প্রতিটি নিশ্বাস আল্লাহর দান, তখন তাঁর সামনে সিজদাবনত হতে মন আগ্রহী হয়।


সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করা, আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে জানা এবং তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করা অভ্যাসে পরিণত হলে ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিকতা না থেকে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হয়ে উঠবে।


আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০)


২. ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত জানা


যে কাজের মর্যাদা ও প্রতিদান সম্পর্কে মানুষ জানে, সে কাজের প্রতি তার আগ্রহও বাড়ে। নামাজ, রোজা, কোরআন পাঠ, জিকির ও সদকার ফজিলত সম্পর্কে জানা থাকলে তা মুমিনকে ইবাদতে উৎসাহিত করবে এবং আমল করার ক্ষেত্রে নতুন উদ্যম তৈরি হবে।


রমজানের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮)


৩. নামাজে যত্নবান হওয়া


মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো নামাজ। এর মাধ্যমে বান্দা প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পায়।


যে ব্যক্তি নামাজের প্রতি যত্নবান, তার ইবাদতজীবন সুশৃঙ্খল। তাই নামাজকে দিনের অন্যান্য কাজের ফাঁকে নয়, বরং দিনের কাজগুলোকে নামাজের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সাজানোর অভ্যাস করতে হবে।


আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ সফলকাম, যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)


৪. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা


কোরআন আল্লাহ–তাআলার কালাম। এটি মুমিনের জীবনে সর্বোত্তম পথনির্দেশক। এর তিলাওয়াতে ইমান বৃদ্ধি পায়, অন্তর প্রশান্ত হয়।


আল্লাহ–তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য আমাদের উচিত নিয়মিত কোরআন পাঠ করা, যেন কোরআন থেকে আমাদের দূরত্ব তৈরি না হয়।


আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন তো তারাই, (যাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পড়া হয়, তখন তা তাদের ইমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)


৫. জিকির ও দোয়ায় অভ্যস্ত হওয়া


আল্লাহর স্মরণ অন্তরকে জীবিত রাখে। দুনিয়ার নানা ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন তার অন্তরে প্রশান্তি আসে। সকাল-সন্ধ্যার জিকির, নামাজের পর তাসবিহ-তাহলিল এবং বিভিন্ন সময়ে দোয়া করার অভ্যাস মুমিনের জীবনকে আল্লাহমুখী করে তোলে। 


তাই কাজের ফাঁকে, চলার পথে কিংবা অবসর সময়ে জিকিরের অভ্যাস করা, যাতে প্রতিদিনের জীবনে আল্লাহর স্মরণ অব্যাহত থাকে।


আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)


রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের জিকির করে আর যে ব্যক্তি জিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৭)


৬. পুণ্যবান মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা


মানুষের চিন্তা, আচরণ ও অভ্যাস গঠনে সঙ্গের প্রভাব অনেক বেশি। ভালো মানুষের সাহচর্য ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তাদের ইবাদত, আচার-আচরণ ও জীবনযাপন অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে।


তাই একজন মুমিনের উচিত এমন মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা, যার সঙ্গে থাকলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, ইবাদতে উৎসাহ পাওয়া যায় এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার প্রেরণা তৈরি হয়।


রাসুল (সা.) সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের সঙ্গে। বলেছেন, ‘আতর বিক্রেতার কাছ থেকে সুগন্ধি পাওয়া যায়, আর কামারের হাপর কাপড় জ্বালিয়ে দেয় কিংবা তার কাছ থেকে শুধু দুর্গন্ধই পাওয়া যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৫৩৪)


৭. পাপ থেকে দূরে থাকা


পাপ মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে এবং ইবাদতের প্রতি অনীহা তৈরি করে। বারবার পাপের কাজে লিপ্ত হলে আস্তে আস্তে অন্তরের সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে নেক আমলের প্রতি আগ্রহও হ্রাস পেতে থাকে। তাই দৃষ্টিকে সংযত রাখা, মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকা, হারাম উপার্জন পরিহার করা এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে।


কোনো ভুল হয়ে গেলে দ্রুত তওবা করতে হবে। কারণ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই। (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)


৮. নফল ইবাদতের অভ্যাস করা


ফরজ ইবাদত মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। এর পাশাপাশি নফল ইবাদত আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাহাজ্জুদ, চাশতের নামাজ, নফল রোজা, সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর আরও কাছে পৌঁছাতে পারে।


তাই ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়তে হবে।


হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)


৯. মৃত্যু ও পরকালের  কথা স্মরণ করা


দুনিয়ার মোহ মানুষকে আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয়। অথচ মৃত্যু জীবনের অবধারিত সত্য। একদিন সব ব্যস্ততা, আয়োজন ও অর্জন পেছনে ফেলে মানুষকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।


এই উপলব্ধি মানুষকে ইবাদতের প্রতি সচেতন করে। ফলে আল্লাহ–তাআলার নৈকট্য লাভের পথ সুগম হয়।


রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা স্বাদ বিনষ্টকারী বিষয়কে বেশি বেশি স্মরণ করো। অর্থাৎ মৃত্যুকে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৭)


১০. আমলের হিসাব নেওয়া


আত্মসমালোচনা মানুষের জীবন সংশোধনের অন্যতম উপায়। প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করলে ভুলত্রুটি চিহ্নিত করা যায় এবং পরবর্তী দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা যায়। আজ কতটুকু ইবাদত হলো, কোন কাজে অবহেলা হয়েছে, কোন কাজটি করা উচিত হয়নি—এভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।


আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আল্লাহ পুরোপুরি অবগত।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ১৮)


শেষ কথা


আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা খুবই সহজ। এর জন্য প্রয়োজন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর ভয়, আখিরাতের চিন্তা এবং নিয়মিত আমলের চর্চা।


রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হচ্ছে, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮৩)


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, সময় : ৯:৩২ এএম

নামাজ বা নামাজ ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এটি শুধু একটি শারীরিক ইবাদত বা কিছু নির্দিষ্ট রীতিনীতি পালনের সমষ্টি নয়; বরং এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার এক পবিত্র আত্মিক কথোপকথন কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা, মানসিক অস্থিরতা ও জাগতিক চিন্তার কারণে নামাজে একনিষ্ঠতা বা ‘খুশু-খুজু’ ধরে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। নামাজকে জীবন্ত ও কার্যকর করতে হলে এতে একাগ্রতা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।


নামাজে মনোযোগ ধরে রাখার ৫টি কার্যকর উপায় আলোচনা করা হলো।


১. নামাজের অর্থ অনুধাবন করা


আমরা নামাজে যে সুরা, তাসবিহ ও দোয়াগুলো তেলাওয়াত করি, সেগুলোর অর্থ না বুঝলে মন সহজেই অন্য চিন্তায় হারিয়ে যায়। আরবি উচ্চারণের পাশাপাশি অর্থ ও মর্মার্থ জানলে সুরা তেলাওয়াতের সময় মনে গভীর প্রভাব পড়ে।


পবিত্র কোরআনে মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা নিজেদের নামাজে বিনীত ও নম্র।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)


অর্থ বুঝে পাঠ করলে নামাজের প্রতিটি বাক্যে অন্তরে সৃষ্টিকর্তার ভয় ও ভালোবাসা জাগ্রত হয়।


২. প্রতিটি নামাজকে জীবনের শেষ নামাজ মনে করা


মানুষ যখন নিশ্চিত হয় যে একটি কাজ সে শেষবারের মতো করছে, তখন সেখানে তার সর্বোচ্চ মনোযোগ ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। নামাজের ক্ষেত্রেও এই মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন।


রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, তখন এমনভাবে নামাজ আদায় করো, যেন এটিই তোমার জীবনের শেষ নামাজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১৭০)


প্রতিবার নামাজের তাকবিরে তাহরিমা বাঁধার সময় যদি ভাবা হয়—হয়তো আর কোনো নামাজের সুযোগ জীবনে আসবে না, তবে দুনিয়াবি সমস্ত চিন্তা নিমেষেই তুচ্ছ হয়ে যায়।


৩. ধীরস্থিরতা বজায় রাখা


তাড়াহুড়ো করে নামাজ আদায় করা মনোযোগ নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। রুকু, সেজদা ও কেয়ামের মতো রুকনগুলো ধীরস্থিরভাবে ও প্রশান্তির সঙ্গে সম্পন্ন করা নামাজের ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় বিধান।


হাদিস শরিফে এক সাহাবিকে দ্রুত নামাজ পড়তে দেখে রাসুল (সা.) তিনবার পুনর্বার নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, যতক্ষণ না তুমি স্বস্তির সঙ্গে রুকু ও সিজদা সম্পন্ন করো, ততক্ষণ তোমার নামাজ পূর্ণ হবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫৭)


ধীরগতিতে প্রতিটি তাসবিহ আদায় করলে মন স্থির হয়।


৪. আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা


নামাজে মনোযোগ ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি হলো ‘ইহসান’-এর অনুভূতি।


রাসুল (সা.) ইহসানের সংজ্ঞায় বলেছেন, এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো, যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; আর যদি দেখতে না পাও, তবে নিশ্চিত মনে করো যে তিনি তোমাকে দেখছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০)


ইমাম গাজালি লিখেছেন, নামাজে অন্তরের উপস্থিতি (হুজুরে কলব) অর্জনের জন্য রাজাধিরাজ আল্লাহর মহানুভবতা ও নিজের হেয়তা উপলব্ধি করা আবশ্যক; যখন বান্দা বুঝতে পারে সে কার সামনে দাঁড়িয়েছে, তখন তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনম্র হয়ে যায়। (আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ১/২০৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ২০০২)


৫. শয়তানের প্ররোচনা থেকে আত্মরক্ষা


নামাজে দাঁড়ালেই শয়তান মানুষকে পুরোনো বা অপ্রাসঙ্গিক কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। হাদিসে এই বিশেষ শয়তানের নাম বলা হয়েছে ‘খিনজাব’।


সাহাবি ওসমান ইবনে আবিল আস (রা.) নবীজির কাছে নামাজে মনোযোগ ছুটে যাওয়ার অভিযোগ করলে তিনি পরামর্শ দেন, যখনই এরূপ অনুভবে মন বিচলিত হবে, তখন বাঁ দিকে মৃদু থুতু ফেলার মতো ইশারা করে আল্লাহর কাছে শয়তানের প্ররোচনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা বা ‘আউজুবিল্লাহ’ পড়বে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০৩) 


নামাজে মনোযোগ এক দিনে অর্জিত হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।


দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে উল্লিখিত বিষয়গুলো চর্চা করতে পারলে নামাজ শুধু বাহ্যিক অনুষ্ঠান থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠবে অন্তরের প্রশান্তি ও আত্মিক উন্নতির চূড়ান্ত মাধ্যম।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : মঙ্গলবার ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, সময় : ১০:৩৭ এএম

পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত জীবনের গভীর এক দর্শনের দিকে ইঙ্গিত করে। আল্লাহ বলেছেন, “আমি তোমার ওপর আমার পক্ষ থেকে ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি আমার চোখের সামনে গড়ে ওঠো।” (সুরা তোয়াহা, আয়াত: ৩৯)


পৃথিবীতে মানুষের আগমনই ঘটে সফলতার সন্ধানে। মানুষ সহজাতভাবেই সুখ চায়, আর সেই সুখের আকাঙ্ক্ষা তাকে নিরন্তর ছোটাছুটি বা চেষ্টার দিকে ঠেলে দেয়।


কোরআনের দৃষ্টিতে এই সফলতা কেবল বৈষয়িক প্রাপ্তি নয়, বরং এটি একটি সুসংহত ও দ্বিমুখী প্রক্রিয়া।


জাগতিক সফলতার নিয়ম


ইসলাম আমাদের শেখায় যে জীবন চলে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে। এই নিয়মগুলো মহান আল্লাহ এমনভাবে নির্ধারণ করেছেন যা মুসলিম-অমুসলিম, ছোট-বড় সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর। এটি হলো কারণভিত্তিক সফলতা।


অনেকটা গাণিতিক সূত্রের মতো—এক যোগ এক সমান দুই। যে পরিশ্রম করবে, সে ফল পাবে; যে বীজ বপন করবে, সে ফসল কাটবে।


আজকের আধুনিক সভ্যতা প্রযুক্তি, স্থাপত্য বা চিকিৎসাশাস্ত্রে যে অভাবনীয় উন্নতি করেছে, তা মূলত এই জাগতিক কারণগুলো (কসমিক ল) ব্যবহারেরই ফল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা যে বিজ্ঞান, প্রকৌশল বা অর্থনীতি পড়ি, তা মূলত মহাজাগতিক এই নিয়মগুলোর রহস্য উদ্ঘাটনেরই নামান্তর।


ইসলাম একজন মুমিনকে এই পথে সফল হতে উৎসাহিত করে। তবে পার্থক্য হলো, একজন মুমিন এই সফলতার কৃতিত্ব নিজের মেধা বা শ্রমকে না দিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।


ইসলামের দৃষ্টিতে এটি চরম ঔদ্ধত্য যে কেউ বলবে, “এসব তো আমি আমার জ্ঞানবলে পেয়েছি।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৮)


বরং মুমিনের ভাষা হবে, “আল্লাহর শুকরিয়া, যিনি আমাদের এই পথ দেখিয়েছেন।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৪৩)।


অলৌকিক সফলতা


কোরআন আমাদের সফলতার আরেকটি অদৃশ্য জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যাকে বলা যায় খোদায়ি অভিভাবকত্ব। এটি কোনো ভৌত বা বস্তুগত নিয়মের তোয়াক্কা করে না। একে আমরা খোদায়ি সফলতা বলতে পারি। এটি অর্জিত হয় ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংযোগের মাধ্যমে।


এই খোদায়ী সফলতা দুইভাবে আসতে পারে:


১. সরাসরি হস্তক্ষেপ: যখন জাগতিক সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন আল্লাহর বিশেষ সুরক্ষা মুমিনকে উদ্ধার করে। যেমনটি ঘটেছিল হিজরতের সময় সওর গুহায়। যখন আবু বকর (রা.) শঙ্কিত হয়ে বলেছিলেন, শত্রুরা পায়ের নিচে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে, তখন মহানবী (সা.) বলেছিলেন, “সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী, যাদের তৃতীয়জন স্বয়ং আল্লাহ?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩)


হজরত মুসা (আ.)-কেও আল্লাহ অভয় দিয়ে বলেছিলেন, “ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি, আমি সব শুনি ও দেখি।” (সুরা তোয়াহা, আয়াত: ৪৬)


২. সঠিক পথের দিশা: অনেক সময় আল্লাহ সরাসরি উদ্ধার না করে মানুষকে এমন বুদ্ধি বা পথ বাতলে দেন, যা তাকে সফলতার দিকে নিয়ে যায়। যেমন উত্তাল সমুদ্রের সামনে যখন মুসা (আ.)-এর সঙ্গীরা নিশ্চিত পরাজয় দেখছিলেন, তখন ওহি এল—লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করার। (সুরা শুয়ারা, আয়াত: ৬৩)


একইভাবে মারয়াম (আ.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নাড়া দিতে। (সুরা মারিয়াম, আয়াত: ২৫)


খোদায়ি মদদ পাওয়ার চাবিকাঠি


আল্লাহর এই বিশেষ নজর পাওয়ার জন্য কিছু চাবিকাঠি রয়েছে যা একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে:


দোয়া ও জিকির: দোয়া হলো ইবাদতের মগজ। মহানবী (সা.) বলেছেন, “দোয়া ছাড়া আর কিছুই ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৩৯)


তওবা ও দরুদ: ব্যবসায়িক চেষ্টা যেমন মুনাফা আনে, তেমনি তওবা ও দরুদ পাঠ খোদায়ি সফলতা ত্বরান্বিত করে।


তাকওয়া ও সদাচার: নিজের উত্তরসূরিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা চিন্তিত, তাদের জন্য কোরআনের দাওয়াত হলো—তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সঠিক কথা বলে। (সুরা নিসা, আয়াত: ৯)


মানুষের সেবা: অন্যের বিপদে এগিয়ে এলে আল্লাহ সেই ব্যক্তির সাহায্যে এগিয়ে আসেন। এটি আল্লাহর এক অমোঘ প্রতিশ্রুতি। এমনকি কেউ যদি উপকারের বদলে অপকারও করে, তবুও মুমিনের উচিত নিজের গুণ ত্যাগ না করা।


পরিশেষে বলা যায়, প্রকৃত সফলতা হলো জাগতিক চেষ্টার সঙ্গে খোদায়ি সাহায্যের অপূর্ব সমন্বয়। আমরা যেন কেবল উপকরণের ওপর নির্ভর না করি, আবার উপকরণ ত্যাগ করে হাত গুটিয়েও বসে না থাকি।


ছবি : সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শুক্রবার ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১১:১৭ এএম

প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসায় গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করার সুযোগ সবার থাকে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ চাইলেই ঘরে বসে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও প্রামাণ্য গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমে গভীর ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন না।


নিজের ধর্ম ও জীবন পরিচালনার জন্য যতটুকু জ্ঞান অর্জন করা ওয়াজিব, সঠিক পদ্ধতিতে চেষ্টা করলে তা ঘরে বসেই অর্জন করা অসম্ভব নয়। তবে একটা নির্ভরযোগ্য, দক্ষ ও খোদাভীরু আলেমের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে হবে।


ঘরে বসে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের জন্য একটি রূপরেখা তুলে ধরা হলো।


প্রথম ধাপ: সহিহ-শুদ্ধ কোরআন পাঠ


ঘরে বসে কোরআন শিক্ষার যাত্রাটি শুধু পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর মর্মার্থ অনুধাবনের দিকে নিয়ে যেতে হবে।


কী পড়বেন:


তেলাওয়াত ও তাজবিদ: শুরুতেই কায়দা বা তাজবিদের কোনো নির্ভরযোগ্য বই নিয়ে কোনো দক্ষ কারির সহায়তায় বা অডিও-ভিডিও অ্যাপের মাধ্যমে হরফের মাখরাজ ও সিফাত ঠিক করে নিতে হবে।


অনুবাদ: পড়ার জন্য প্রামাণ্য ও সহজবোধ্য অনুবাদ নির্বাচন করতে হবে।


তাফসির: কোরআনের আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝতে সংক্ষিপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তাফসির পড়া যেতে পারে। আধুনিক যুগের সহজবোধ্য কোনো তাফসির গ্রন্থ।


নামাজ ও ইবাদতের শর্ত হিসেবে ন্যূনতম কোরআনের কিছু অংশ সহিহ করে পড়া এবং তার মূল বিধান জানা প্রতিটি মুমিনের ওপর ব্যক্তিগত ফরজ। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া, ১/৬২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)


২. দ্বিতীয় ধাপ: আকাইদ


ধর্মীয় শিক্ষার দ্বিতীয় ও সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো সঠিক আকিদা বা বিশ্বাস গঠন করা। ভুলের বেড়াজাল থেকে ইমানকে রক্ষা করতে শরিয়তের মৌলিক বিশ্বাসগুলো পরিষ্কার থাকা জরুরি।


কী পড়বেন: তাওহিদ, রিনামাজ, ফেরেশতাকুল, আসমানি কিতাবসমূহ, পরকাল এবং তকদিরের ওপর ইমান আনার বিষয়টি বিস্তারিত জানতে হবে। এ ক্ষেত্রে আকাইদ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য ও সহজ গ্রন্থ, বা আলেমদের লেখা আকিদা বিষয়ক সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা অধ্যয়ন করা উচিত।


কেন আকিদা শিক্ষা: ইমানের মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো প্রকার সন্দেহ বা ভ্রান্তি দূর করার জন্য এবং সঠিক আকিদা লালন করার জন্য সমকালীন আকিদাহ বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ১/১২৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)


৩. তৃতীয় ধাপ: দৈনন্দিন মাসআলা


ঘরসংসার ও কর্মব্যস্ত জীবনে একজন মানুষের হালাল-হারাম, পবিত্রতা, নামাজ, রোজা এবং লেনদেনের যেসব মাসআলা প্রতিদিন প্রয়োজন হয়, তা নিখুঁতভাবে জানা ফিকহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


কী পড়বেন:


পবিত্রতা ও নামাজ: অজু, গোসল, তায়াম্মুম এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঠিক নিয়ম নির্ভরযোগ্য লেখকের নামাজ ও মাসআলা বিষয়ক বই পড়া যেতে পারে।


হানাফি ফিকহের আলোকে মাসআলা শেখার জন্য ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বজনস্বীকৃত এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ গ্রন্থ মুফতি কেফায়েতুল্লাহ দেহলভি রচিত ‘তা’লিমুল ইসলাম’ (৪ খণ্ডে সমাপ্ত) অথবা মাওলানা আশরাফ আলী থানবি রচিত ‘বেহেশতী জেওর’ (বিশেষ করে প্রথম দিকের অংশগুলো) অধ্যয়ন করা কার্যকর।


এই কিতাবগুলোতে ঘরে বসে দৈনন্দিন জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ মাসআলা শেখার সব উপাদান রয়েছে।


৪. চতুর্থ ধাপ: হাদিস অধ্যয়ন


নবীজির সুন্নাহ ও চারিত্রিক গুণাবলি নিজের জীবনে ফুটিয়ে তোলার জন্য হাদিস অধ্যয়ন অপরিহার্য।


কী পড়বেন: শুরুতেই বিশাল বুখারি বা মুসলিম শরিফ নয়; বরং চরিত্র ও আখলাক সংশোধনের জন্য ইমাম নববি সংকলিত হাদিসগ্রন্থ ‘রিয়াদুস সালেহিন’ দিয়ে শুরু করতে পারেন।


এই গ্রন্থে ইখলাস, সবর, সততা, তাকওয়া এবং সদাচরণের ওপর চমৎকার সব হাদিস সাজানো রয়েছে।


ঘরে বসে পড়ার কর্মপরিকল্পনা


নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ: প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পর ফজরের পরের সময়টি অথবা রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় নির্দিষ্ট করে নিন। এই সময়ে কোনো মোবাইল বা অন্য ব্যস্ততা রাখবেন না।


নোট নেওয়ার অভ্যাস: পড়ার সময় খাতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা, নতুন শব্দ বা না-বোঝা বিষয়গুলো লিখে রাখুন।


মাসআলা যাচাই: ঘরে একা পড়তে গিয়ে যদি কোনো বিষয়ে ধন্দ তৈরি হয় বা ফিকহি মাসআলা বুঝতে সমস্যা হয়, তবে নিজে মনগড়া ফায়সালা না করে স্থানীয় কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির শরণাপন্ন হয়ে তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।

  • প্রকাশ : রবিবার ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:২২ এএম
  • আপডেট : রবিবার ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ১০:০৩ এএম

এ সম্পর্কিত আরও খবর


কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা

  • প্রকাশ : রবিবার ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:২২ এএম

কোজাগরী পূর্ণিমা আজ। এ দিন হিন্দু সম্প্রদায় শ্রীশ্রী কোজাগরী লক্ষ্মী দেবীর পূজা করেন। শারদীয় দুর্গোৎসবের পর প্রথম পূর্ণিমা তিথিতে ভক্তরা বিনিদ্র থেকে দেবী লক্ষ্মীর পূজা করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমা ছাড়াও কেউ কেউ প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর বিশেষ পূজা করে থাকেন। কোনো কোনো অঞ্চলে দীপান্বিতা অমাবস্যায় সন্ধ্যাবেলা লক্ষ্মীপূজার রীতি প্রচলিত আছে। ঘটে বা মূর্তিতে লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। এ পূজা ব্যক্তিগত বা সার্বজনীনভাবে অনুষ্ঠিত হয়।


শাস্ত্রমতে, দেবী লক্ষ্মী ধনসম্পদ তথা ঐশ্বর্যের প্রতীক। উন্নতি, আলো, জ্ঞান, সৌভাগ্য, উর্বরতা, দানশীলতা, সাহস ও সৌন্দর্যের দেবী হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মী। তাই লক্ষ্মী ঐশ্বর্যের দেবী।


লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা। বিষ্ণু রাম ও কৃষ্ণরূপে অবতার গ্রহণ করলে, লক্ষ্মী সীতা ও রাধারূপে তাদের সঙ্গিনী হন। কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষ্মী ধনধান্যে ভরিয়ে দিতে ভক্তগৃহে আসেন। প্রাচীনকাল থেকেই রাজা-মহারাজা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ সবাই দেবী লক্ষ্মীর পূজা দিয়ে আসছেন।


বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা পালিত হবে ২৫ অক্টোবর রোববার। পূর্ণিমা তিথি শুরু হবে আজ রোববার বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে। পূর্ণিমা তিথি শেষ হবে ২৬ অক্টোবর সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে।


লক্ষ্মীকে নিয়ে বাংলার জনসমাজে বিভিন্ন জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্পগুলো পাঁচালি আকারে লক্ষ্মীপূজার দিন পাঠ করা হয়। একে লক্ষ্মীর পাঁচালি বলা হয়।


লক্ষ্মীপূজার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো- সিঁদুর, ঘট, ধান, মাটি, আম্রপল্লব, ফুল, দূর্বা, তুলসীপাতা, হরীতকী, চন্দন, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, আতপচাল ও জল। লক্ষ্মীপূজায় মঙ্গলঘট, ধানের ছড়ার সঙ্গে গৃহস্থের আঙিনায় শোভা পায় চালের গুঁড়ার আলপনায় লক্ষ্মীর ছাপ। এ উপলক্ষে রমণীরা উপবাস ব্রত পালন করেন।


লক্ষ্মীপূজায় রাত্রি জাগরণ করা হয়। কোজাগরী অর্থাৎ কে জাগরী বা কে জেগে আছো। শাস্ত্র মতে, এই রাতে লক্ষ্মী সবার বাড়িতে যান। যে গৃহের দরজা বন্ধ থাকে ও গৃহস্থরা ঘুমিয়ে থাকেন, সেখান থেকে লক্ষ্মী ফিরে আসেন। এ কারণে এই লক্ষ্মীপূজাকে কোজাগরী বলা হয়। লক্ষ্মীপূজায় অনেকে উপবাসব্রত পালন করেন। পূজা অর্চনার পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের আলপনা আঁকা হয়।


দুর্গাপূজা। ছবি: সংগৃহীত

  • প্রকাশ : শনিবার ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, সময় : ৯:১৬ পিএম

একই বছরে দুইবার শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন হতে যাচ্ছে ২০২৮ সালে। পঞ্জিকার তিথি গণনার পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে প্রায় ১৫ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় দুর্গোৎসবে মাতবেন বাঙালিরা। বিরল এই ঘটনা নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে।


ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জোড়া সপ্তমী এবং ২০২৭ সালে জোড়া মহাঅষ্টমীর পর ২০২৮ সালে তিথি গণনার ভিন্নতার কারণে দুই সময়ে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।


হিন্দু শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলায় মূলত দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। একটি হলো বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত, অন্যটি সূর্য সিদ্ধান্ত। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তে দৃকসিদ্ধ গণনাপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। অন্যদিকে সূর্য সিদ্ধান্তে মহাজাগতিক অবস্থানের ভিত্তিতে তিথি ও নক্ষত্র গণনা করা হয়। এই দুই পদ্ধতির হিসাবের পার্থক্যের কারণেই ২০২৮ সালে দুর্গাপূজার সময় এক হবে না।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুসারে ২০২৮ সালের দুর্গাপূজা সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হবে। আর সূর্য সিদ্ধান্ত মেনে পূজার আয়োজন করা হলে তা হবে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে। ফলে দুই দফার পূজার মধ্যে ১৫ দিনের বেশি ব্যবধান থাকবে। বেলুড় মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো বিভিন্ন মঠ, মন্দির ও আশ্রমে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুসারে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। অন্যদিকে বনেদি বাড়ি, বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজার ক্ষেত্রে সূর্য সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


তবে এক বছরে দুইবার দুর্গাপূজার এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৮০ সালেও দুই পদ্ধতি অনুসারে দুই সময়ে দেবী দুর্গার পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উভয় পদ্ধতিতেই পূজার আয়োজন শুদ্ধ বলে বিবেচিত হয়।


এক বছরে দুই দফায় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলেও সরকারি ছুটি দুইবার ঘোষণা করা হবে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অফিস, স্কুল ও কলেজে ছুটি থাকবে একবারই। বারোয়ারি পূজার সময়ের সঙ্গে মিল রেখে ছুটি নির্ধারণ করা হবে।

বিষয় :