ইরানের রাজধানী তেহরানে ২০২৪ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ ভাহিদি
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) জেনারেল আহমেদ ভাহিদি তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন বলে অসমর্থিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে। এ খবরের পর ইরানের সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার তাঁর নিহত হওয়ার এ গুঞ্জনের কথা জানা গেছে। আহমেদ ভাহিদি ইরানের আধা সামরিক বাহিনী রেভোল্যুশনারি গার্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা এই জেনারেল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনার ক্ষেত্রে ইরানের কট্টর অবস্থান বজায় রাখতে প্রধান ভূমিকা রাখছিলেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনি বর্তমানে অজ্ঞাত স্থানে রয়েছেন বলে জানা গেছে। ভাহিদিকে তাঁর সরাসরি সংস্পর্শে থাকা একটি ছোট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য বলে মনে করা হয়। আর তাই এখন তাঁকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা গুঞ্জন চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসমর্থিত সব প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, তেহরানে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলায় ভাহিদি নিহত হয়েছেন। তবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা পর্যন্ত ইরান সরকারের পক্ষ থেকে ভাহিদির মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে বা জনসমক্ষে নিশ্চিত করা হয়নি।
এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন সূত্র থেকেও সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য বা নিশ্চিত করেননি।
এর আগেও ভাহিদির মৃত্যুর বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, যা পরে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের ওপর নজর রাখছেন, এমন বেশ কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকের অ্যাকাউন্ট থেকে এ দাবির সূত্রপাত হয়েছে।
আঞ্চলিক রাজনীতি ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে জেনারেল ভাহিদি দীর্ঘদিন ধরেই একজন বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ বলেছে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ ভাহিদি ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের ভেতরে থাকা তাঁর নিজস্ব ঘনিষ্ঠ বলয়টি বর্তমানে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনারেল ভাহিদির এই গোষ্ঠী ইরানের বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তাদের ‘কোণঠাসা’ করে রেখেছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আপস বা সমঝোতার বিরুদ্ধে একটি কট্টরপন্থী অবস্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য
জেনারেল ভাহিদি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে কঠোর আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, তাঁর এসব বক্তব্য ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতি ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের সংঘাতময় অবস্থানেরই বড় প্রমাণ। সামরিক বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভাহিদি নিহত হওয়ার খবর সত্য প্রমাণিত হলে তা ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে।
ইরানের সামরিক, গোয়েন্দা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চালানো সব ধরনের আঞ্চলিক অভিযান পরিচালনার মূল দায়িত্বে রয়েছে আইআরজিসি। ফলে এই আধা সামরিক বাহিনী দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।
জেনারেল ভাহিদির মৃত্যুর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর ইসরায়েলপন্থী ও ইরান সরকারের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে নতুন তৎপরতা দেখা গেছে। আইআরজিসির বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে ইউরোপের দেশগুলোর আরও জোরালো সমর্থনের দাবি তুলেছেন তাঁরা।
ইরানের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক নীতি নেওয়ার পক্ষে থাকা এই বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ‘স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী’ কর্মকাণ্ড রুখতে পশ্চিমা ও ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত তেহরানের ওপর চাপ আরও বাড়ানো। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
ছবি : সংগৃহীত
মিসরের বন্দরে ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন দুটি গ্যাস ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কাছের সুয়েজ খাল এবং এর সঙ্গে যুক্ত একটি পাইপলাইনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পাইপলাইন সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রপ্তানিতে অতিগুরুত্বপূর্ণ এক বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাইপলাইনটি লোহিত সাগর থেকে শুরু হয়ে মিসরের বুক চিরে ভূমধ্যসাগরের সিদি কেরির বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে।
ইরান ও তাদের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকার লক্ষ্য করে অনবরত হামলা চালিয়ে আসছিল। এমন পরিস্থিতিতেও লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের জ্বালানি পণ্য উত্তর দিকে রপ্তানির জন্য মিসরের সুয়েজ খাল ও সুমেদ পাইপলাইন এত দিন নিরাপদ রুট হিসেবে ভরসা জুগিয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি নীল নদের অববাহিকায় অবস্থিত মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে গত বুধবার ট্যাংকার দুটিতে ওই হামলা চালানো হয়। এ পর্যন্ত কোনো পক্ষ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি এবং সুয়েজ খালে সরাসরি হামলার কোনো হুমকিও দেওয়া হয়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি জ্বালানি বাজারে বড় উদ্বেগ যোগ করেছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এমএসটি মারকুই’-এর জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান সল কাভোনিক বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ ও ভূমধ্যসাগরের দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করেও তেল পরিবহন এখন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হুমকির মুখে পড়বে।’
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হতো পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। তবে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বর্তমানে এ রুট দিয়ে বলতে গেলে কোনো ট্যাংকারই চলাচল করছে না। এ যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব তাদের বেশির ভাগ তেল লোহিত সাগর এবং দেশটির ইয়ানবু বন্দরে পাঠাতে শুরু করে। হুতিদের নতুন হুমকি ও হামলার কারণে ট্যাংকারগুলো এখন এই বাব আল-মানদেব তথা লোহিত সাগরের রুটটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল ও সুমেদ পাইপলাইনের দিকে উত্তরমুখী চলাচলকারী সৌদি তেলবাহী জাহাজের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে এশিয়ার গ্রাহকদের জন্য এর অর্থ হলো, এডেন উপসাগর হয়ে দক্ষিণ দিকের সংক্ষিপ্ত পথ ছেড়ে এখন পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে জাহাজগুলোকে।
২০ জুলাই লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন হুতি বিদ্রোহীরা। এর আগে গত এপ্রিল মাসে ওই পাইপলাইন দিয়ে ১ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছিল। হুতিদের হুমকির পর জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেলে।
জাহাজ চলাচলের গতিবিধি নজরদারি প্ল্যাটফর্ম ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর গতকাল বৃহস্পতিবারের তথ্য, সুয়েজের ভূমধ্যসাগর প্রান্তের পোর্ট সাইড নোঙরখানায় প্রায় ৩০টি জাহাজ জড়ো হয়েছে। অথচ চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেও এ সংখ্যা ছিল ২০টির কাছাকাছি।
জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভোর্টেক্সা’-এর জর্জ মরিস বলেন, লোহিত সাগরে তেলবোঝাই করার পর ট্যাংকারগুলোর উত্তর দিকে; অর্থাৎ সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্টত বেড়েছে। আর এর মূল কারণ হুতিদের নতুন হুমকি (বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল সরবরাহ বন্ধের হুমকি)।
কেপলারের তথ্য বলছে, বাব আল-মানদেব দিয়ে দক্ষিণমুখী রুটে (এশিয়ার দিকে) তেলের প্রবাহ এখনো সচল থাকলেও তা চলতি মাসের শুরুর তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। জুনে সৌদির ইয়ানবু বন্দর থেকে বোঝাই করা তেলের ৮১ শতাংশ যেখানে দক্ষিণে গিয়েছিল, সেখানে জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩ শতাংশে। অনেক ট্যাংকার বাব আল-মানদেব সম্পূর্ণ এড়িয়ে চললেও চীনের মালিকানাধীন জাহাজসহ কিছু ট্যাংকার হুতিদের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে যাতায়াত করছে।
জর্জ মরিস জানান, হুতিদের হামলা আর নজরদারি এড়াতে এ দক্ষিণমুখী ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিজেদের অবস্থান লুকানোর চেষ্টাও বাড়ছে। ফলে ‘ট্র্যাকার’ বা অবস্থান শনাক্তকরণ যন্ত্র বন্ধ করে চলাচলকারী ট্যাংকারের সংখ্যা এখন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
তবে মিসরে দামিয়েত্তা বন্দরে হামলার ঘটনার মানে এ নয় যে সুয়েজ খাল এখনই কোনো তাৎক্ষণিক হুমকিতে পড়েছে, এমনটাই মনে করেন ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি’-এর আটলান্টিক এলএনজি বিভাগের প্রধান অ্যালি ব্লেকওয়ে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘বাজার এখন পর্যন্ত সুয়েজ খালের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার মতো কোনো ঝুঁকি বা আশঙ্কা তৈরি করেনি।’
এ ড্রোন হামলার পরও গতকাল বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। মূলত পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার খবরের দিকেই ব্যবসায়ীদের মূল নজর ছিল, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। সামগ্রিক এ পরিস্থিতি নিয়ে সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাজারে তেল পৌঁছানোর পথ আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হচ্ছে
ইরান হুমকি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি ট্যাংকার অবরুদ্ধ করে রাখে, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো জ্বালানি রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে হুতিরা সৌদি আরবের সব ধরনের জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছেন। এর আওতায় ইয়ানবু থেকে তেল বোঝাই করে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাওয়া জাহাজও পড়তে পারে।
হুতিরা এরই মধ্যে দেখিয়েছেন, তাঁদের ড্রোন ও রকেটের পাল্লার মধ্যে সুয়েজ খাল অঞ্চলও রয়েছে। তাঁরা একাধিকবার ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও রকেট ছুড়েছেন। যদিও দীর্ঘ দূরত্বের কারণে সেগুলো ভূপাতিত করার সুযোগও বেশি।
জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক দর নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান ‘আর্গাস’-এর এলএনজি মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান মার্টিন সিনিয়র বলেন, শুধু এ একটি কারণেই এখন জাহাজের বিমা খরচ বেড়ে যেতে পারে। মিসরে সাম্প্রতিক হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলে জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিমাকারীরা সুয়েজ খালের জন্য বাড়তি “যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম” দাবি করতে পারেন।’ অবশ্য তিনি উল্লেখ করেন যে ইরান এখনো (সুয়েজ নিয়ে) সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি দেয়নি।
একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানায়, সুয়েজ খালের কাছাকাছি মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলোয় চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা ইতিমধ্যে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো।
যদিও মিসরের ভেতরে এ হামলাকে সুয়েজ খালের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের সাবেক বোর্ড সদস্য ওয়ায়েল কাদ্দুর বলেন, ‘খালটি সার্বক্ষণিক কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়।’
এ হামলার আগেই মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে আগের তুলনায় আরও দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল পথ ব্যবহার করতে হচ্ছিল।
জর্জ মরিস বলেন, ‘জুনে এশিয়ায় সমুদ্রপথে আমদানি হওয়া অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের প্রায় ১৫ শতাংশই ইয়ানবু থেকে এসেছে। এ সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে এশিয়ার পরিশোধনাগারগুলো বড় প্রভাবের মুখে পড়বে। বাব আল-মানদেবের বদলে সুয়েজ খাল ব্যবহার করলে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছাতে সময় দ্বিগুণেরও বেশি লাগে। ফলে জাহাজ পৌঁছাতে প্রায় এক মাস বাড়তি লাগছে।’
অন্যান্য কারণেও সুয়েজ খাল দিয়ে বিশাল পরিমাণ তেল পরিবহন করা বেশ জটিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলোর নিচের অংশ অনেক বেশি গভীর বা ভারী হওয়ায় তারা পুরোপুরি তেলবোঝাই অবস্থায় সুয়েজ খাল পার হতে পারে না। ফলে এ জাহাজগুলোকে প্রথমে সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল খালাস করতে হয়। এরপর ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর পর সেই তেল আবার জাহাজে তুলতে হয়।
হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় বর্তমান সংকটে সুয়েজের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে এর কার্যক্রমে যেকোনো বিঘ্নের প্রভাবও হবে ব্যাপক।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান ড্রায়াড গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কোরি র্যান্সলেম বলেন, ‘সুয়েজ খাল অঞ্চলের যেকোনো স্থানে হামলা হলে যুদ্ধঝুঁকির বিমার প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সেই সঙ্গে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির মূল্যায়নও বদলে যাবে।’
ক্লেপলারের প্রধান ফ্রেইট বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইট বলেন, ‘সুয়েজ খালের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দামে পড়বে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে, তার প্রভাব খুব দ্রুত ভোক্তাদের ওপর পড়বে।’
ছবি : সংগৃহীত
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশের একটি কয়লাখনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৩২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। উদ্ধার অভিযান চললেও জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। খবর আলজাজিরার।
বৃহস্পতিবার প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটার কাছে দুর্গম সোরাঞ্জ এলাকার একটি কয়লাখনিতে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খনির ভেতরে মিথেন গ্যাস জমে বিস্ফোরণটি ঘটেছে।
প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা শুক্রবার জানান, এখন পর্যন্ত ২৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। খনির ভেতরে আরও তিনটি মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলো উদ্ধারের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পরও উদ্ধারকর্মীরা আটকে পড়া শ্রমিকদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে জীবিত কাউকে উদ্ধার করার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
এর আগে বেলুচিস্তানের প্রধান খনি পরিদর্শক মুহাম্মদ আতিফ জানান, বিস্ফোরণের সময় খনির ভেতরে মোট ৩৬ জন শ্রমিক ছিলেন।
এদিকে জ্যেষ্ঠ খনি কর্মকর্তা আবদুল গনি বেলুচ জানান, শক্তিশালী বিস্ফোরণে পাশাপাশি থাকা দুটি কয়লাখনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা
ছবি : সংগৃহীত
নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আর নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিবদমান অঞ্চলে জারি করা হয়েছে কারফিউ। খবর আলজাজিরার।
মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন শাহ। তিনি নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে অস্থিরতার কালো মেঘ দূর করতে হবে।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার ভারত সীমান্তবর্তী সুনসারি জেলার একটি গ্রামে হিন্দুদের একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রায় উচ্চ স্বরে গান বাজানো এবং ধর্মীয় পতাকা নিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিরোধের জেরে সংঘর্ষ শুরু হয়।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি চালালে দুই ব্যক্তি নিহত হন বলে জানান পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে । পরে বৃহস্পতিবার কারফিউ চলাকালেও পাশের সিরাহা জেলায় বিক্ষোভের সময় আরও একজনের মৃত্যু হয়।
নতুন করে সহিংসতা ঠেকাতে সুনসারি ও আশপাশের জেলাগুলোতে কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।
প্রধানমন্ত্রী শাহ বলেন, সরকার, নাগরিক সমাজ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যম সবার প্রতি তার আহ্বান, ধৈর্য ও সংযম বজায় রেখে শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি ঘটনার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আশ্বাস দিয়ে বলেন, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ করে জননিরাপত্তা ও সরকারি সম্পদ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দু হলেও, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
লেখিকা তসলিমা নাসরিন
দীর্ঘ ১৯ বছর পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ফিরলেন আলোচিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শুক্রবার (৩১ জুলাই) দুপুরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর লেখিকাকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে স্বাগত জানান তার অনুরাগী এবং বেশ কিছু সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সেক্যুলার মিশন এবং পশ্চিমবঙ্গের জন্য নামের দুটি সংগঠনের আমন্ত্রণে কলকাতায় ফিরেছেন লেখিকা। ওই দুই সংগঠনের নেতৃত্ব ওসমান মল্লিক এবং মোহিত রায় ছাড়াও এনসিপি দলের পক্ষে শিউলি সাহা এবং তসলিমার অনুরাগীদের একাংশ তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।
শনিবার রবীন্দ্র সদনে তসলিমাকে সংবর্ধনা জানানোর অনুষ্ঠান রয়েছে। পরদিন রোববার পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে একটি অনুষ্ঠানে তার যোগ দেওয়ার কথা।
এর আগে ২০০৭ সালে তার আত্মজীবনী বই ‘দ্বিখণ্ডিত’-কে কেন্দ্র করে কলকাতায় তীব্র বিক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাকে রাতারাতি শহর ছাড়তে বাধ্য করেছিল।
জানা গেছে, ২০০৭ সালের নভেম্বরে তীব্র আন্দোলনের মুখে কড়া নিরাপত্তায় তসলিমা নাসরিনকে তড়িঘড়ি করে রাজস্থানের জয়পুরে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে একটি হোটেলে তিনি অত্যন্ত গোপনে অবস্থান করেন। তবে খবর জানাজানি হতেই স্থানীয় কট্টরপন্থি সংগঠনগুলো বিক্ষোভ শুরু করে, যার ফলে তিনি মাত্র কয়েকদিন পরই জয়পুর ছাড়তে বাধ্য হন। অত্যন্ত গোপনীয়তায় তাকে নয়াদিল্লিতে এনে একটি সরকারি সেফ হাউসে কঠোর নিরাপত্তায় রাখা হয়েছিল। এই সময়টা কার্যত তার জন্য গৃহবন্দিত্বের মতো ছিল, যেখানে বাইরের কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ করার অনুমতি ছিল না।
পরে প্রবল বিতর্ক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখে ২০০৮ সালের ১৯ মার্চ তিনি ভারত ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। ভারত ছেড়ে তিনি প্রথমে তার নাগরিকত্ব থাকা সুইডেনে চলে যান। এরপর নিরাপত্তা ও সাহিত্যিক কাজের সুবিধার্থে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছুকাল অবস্থান করেন।
২০০৯ সালের প্রথম দিকে প্যারিস শহর কর্তৃপক্ষ তাকে বিশেষ আবাসনের সুযোগ দিলে তিনি ফ্রান্সে চলে যান। ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের একটি বড় অংশ তিনি প্যারিসে বসবাস করেন এবং সেখানে বসেই ইউরোপের বিভিন্ন সাহিত্য সভায় যোগ দেন।
পশ্চিমবঙ্গে ফেরার তীব্র ইচ্ছা থেকে তিনি ২০১১ সালে আবারও ভারতে ফিরে আসেন। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারগুলোর অনীহার কারণে কলকাতায় তার ঢোকার অনুমতি মেলেনি। তবে ভারত সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ও রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে নয়াদিল্লিতেই পরবর্তীতে নিজের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে একের পর এক মুক্তমনা ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগাররা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে ভারতে তার নিরাপত্তা নিয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুক্তচিন্তা বিষয়ক সংগঠন ‘সেন্টার ফর ইনকোয়ারি’-এর সহায়তায় তিনি জীবন রক্ষার্থে জরুরি ভিত্তিতে আমেরিকায় চলে যান এবং সেখানে বেশ কিছু মাস কাটান।
উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর ইউরোপ-আমেরিকায় থাকলেও, তসলিমা সবসময়ই বাংলা সংস্কৃতির টানে কলকাতার কাছাকাছি থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু ২০০৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকারগুলোর অনীহার কারণে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার পথ বন্ধ ছিল।
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকার অনুরোধ নয়াদিল্লির ‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে’। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে এ কথা জানানো হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সংসদীয় কমিটি তাঁদের প্রতিবেদন লোকসভায় উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনে পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির নবম প্রতিবেদনের সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়। এ কমিটির চেয়ারপারসন কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুর।
‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যমান আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসারে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে।
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাঁকে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ যে অনুরোধ করেছে, সে বিষয়টি জানার পর বিষয়টি পর্যালোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিল পার্লামেন্টারি কমিটি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এর পর থেকে তিনি সেখানেই রয়েছেন। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পরও দিল্লিকে একই অনুরোধ জানানো হয়েছে।
‘ভারত থেকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ পাননি শেখ হাসিনা’
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন, নানা বিবৃতিও আসছে তাঁর নামে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে তিনি সাক্ষাৎকারও দিচ্ছেন।
তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটি বলেছে, ‘চরম সংকট বা অস্তিত্বের হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার ভারতের মানবিক ঐতিহ্য ও সভ্যতাগত মূল্যবোধের অংশ’ হিসেবে শেখ হাসিনাকে সেখানে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ভারত সরকার স্পষ্ট করেছে, কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।
অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার যে নীতি ভারত অনুসরণ করে আসছে, তা উল্লেখ করেছে সংসদীয় কমিটি।
পাশাপাশি সুপারিশ করেছে, সে বিষয়ে ভারত সরকার যেন নীতিনিষ্ঠ ও মানবিক অবস্থান বজায় রাখে। একই সঙ্গে যথাযথ সংবেদনশীলতা ও ভারতের আন্তর্জাতিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।
ছবি : সংগৃহীত
গাজায় নিরস্ত্রীকরণের রূপরেখা সম্বলিত একটি সমঝোতা চুক্তিতে সম্মত হয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস এবং অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতাকে শান্তি ও নিরাপত্তার পথে ‘একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির একটি অনুলিপি হাতে পেয়েছে তারা। চুক্তিতে বলা হয়েছে, আগামী ১৪ দিনের মধ্যে নিরস্ত্রীকরণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা রোডম্যাপ প্রস্তুত করতে হবে। তবে ‘আন্তর্জাতিক যাচাইকরণ সংস্থা’ এবং সব পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে এই সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ আলজাজিরাকে বলেন, “এই আলোচনা অত্যন্ত কঠিন ও জটিল ছিল। আমরা সম্ভাব্য সেরা এবং বাস্তবায়নযোগ্য একটি ফর্মুলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি।”
তবে হামাদ স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে হামাস এই চুক্তির কোনো অংশই বাস্তবায়ন করবে না। গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পুনর্গঠনের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া।
আলজাজিরা লিখেছে, এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প এই চুক্তিকে গাজার শাসনভার তদারকির জন্য তার গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের একটি ‘বড় সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, “অবশেষে গাজায় একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকারের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সরকার ফিলিস্তিনি জনগণকে সহায়তার জন্য বোর্ড অব পিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।”
তিনি আরও লেখেন, “একই সময়ে ইসরায়েল তার কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা পাবে এবং গাজা আর কখনও সন্ত্রাসী হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।”
চুক্তিতে যা আছে
আলজাজিরা লিখেছে, তাদের হাতে আসা চুক্তির অনুলিপি অনুযায়ী, গাজায় একটি ‘ন্যাশনাল কমিটি’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ প্রবেশের মধ্য দিয়ে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ন্যাশনাল কমিটি অস্ত্র ‘তালিকাভুক্ত ও মজুদ’ করার প্রক্রিয়া তদারকি করবে। আন্তর্জাতিক যাচাইকরণ কমিটি এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে এবং ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলো তাতে অংশ নেবে। নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াটি গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর পর্যায়ক্রমিক সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল বা ফিলিস্তিন-বহির্ভূত কোনো সংস্থার কাছে অস্ত্র হস্তান্তর করা হবে না এবং গাজায় একমাত্র ন্যাশনাল কমিটিই এসব অস্ত্রের নিয়ন্ত্রক হবে।
আলজাজিরা লিখেছে, বোর্ড অব পিসের একজন কর্মকর্তা তাদের নিশ্চিত করেছে যে, গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে যাওয়া ন্যাশনাল কমিটির কাছেই হামাস এবং অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠন অস্ত্র সমর্পণ করবে।
ওই কর্মকর্তা জানান, শুরুতে পুলিশের হাতে থাকা অস্ত্রগুলো হস্তান্তর করা হবে, এরপর পর্যায়ক্রমে ভারী অস্ত্রগুলো নিষ্ক্রিয় করা হবে। এই পরিকল্পনার আওতায় গাজায় সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। তবে প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নে বেশ কিছুটা সময় লাগবে।
যুদ্ধবিরতি ও বর্তমান পরিস্থিতি
ট্রাম্প এই নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে গত অক্টোবরে তার মধ্যস্থতায় হওয়া ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর ওই ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি হয়েছিল। তবে ইসরায়েল বারবার এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১২ শর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের আরও ভূমি ইসরায়েল দখল করে নিয়েছে।
গাজায় মানুষ ও পণ্য চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবারও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশুসহ ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্প বলেছেন, নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হওয়ার পর ইসরায়েল গাজা থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করবে এবং তাদের জায়গা নেবে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স, যারা ‘নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর’ সঙ্গে মিলে কাজ করবে।
কায়রোতে আলোচনা ও আন্তর্জাতিক চাপ
যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে মিশর, কাতার এবং তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করতে গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকেই কায়রোতে অবস্থান করছেন হামাস নেতারা।
আলজাজিরা লিখেছে, হামাসের এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার তাদের বলেন, আলোচনা ‘ইতিবাচক’ এবং সামনের দিকে এগোচ্ছে।
মিশরের সম্প্রচারমাধ্যম আল-কাহেরা নিউজ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি রূপরেখার দ্বিতীয় ধাপের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে মিশর শিগগিরই কায়রোতে আবারও বৈঠকের আয়োজন করবে।
আন্তর্জাতিক বাহিনীর মোতায়েন এবং ন্যাশনাল কমিটির কাজ শুরুর প্রস্তাবটি হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ‘আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে’ বলে আল-কাহেরা নিউজের খবরে বলা হয়। তবে গাজার আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী প্যালেস্টিনিয়ান ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) দাবি করেছে, চুক্তির খবরটি ‘পুরোপুরি সঠিক নয়’। চুক্তির যে খসড়াটি ছড়ানো হচ্ছে, তার শব্দচয়ন নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষক নিদাল আবু জাইদ আল-জাজিরাকে বলেছেন, চুক্তিতে ‘নিরস্ত্রীকরণ’ শব্দের বদলে অস্ত্র ‘তালিকাভুক্ত ও মজুদ’ করার যে কথা বলা হয়েছে, তার সূক্ষ্ম সামরিক তাৎপর্য রয়েছে।
তিনি বলেন, “সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তালিকাভুক্ত ও মজুদের কাজটি একটি তৃতীয় পক্ষ করে থাকে। তবে সেই পক্ষ যে শত্রু বাহিনেই হতে হবে, এমন নয়।
“অন্যদিকে নিরস্ত্রীকরণের কাজটি সাধারণত শত্রু বাহিনেই করে থাকে। আর ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো কখনোই সেই ধরনের নিরস্ত্রীকরণে রাজি হবে না।”