ছবি : সংগৃহীত
গত ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে যখন একটি গণকবরের সন্ধান মেলে, সেটি পরিকল্পিতভাবে খুঁড়ে তোলা কোনও কবরস্থান ছিল না। সে সময় জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশানের পরিধি বাড়াতে খননকাজ করছিলেন শ্রমিকরা, আর তখনই তারা সেখানে হঠাৎ মানব দেহাবশেষ খুঁজে পেতে শুরু করেন। এরপর ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।
অগাস্টের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ করেন। এ সময় তারা শিশু ও নবজাতকসহ মোট ৫৭২ জন মানুষের হাড়গোড় খুঁজে পান। সেখানে মৃতদের সঙ্গে তাদের নানা ব্যবহার্য জিনিসও পাওয়া যায়; যেমন: চুড়ি, স্কুলব্যাগ, দুধের বোতল।
এটি শ্রীলংকায় এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে। এই গণকবরের অস্তিত্ব নিয়ে আগে কিছু গুঞ্জন ছিল।
শ্রীলংকায় কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সময় একজন তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে বিচারের মুখে পড়া এক সেনাসদস্য এমন একটি গণকবরের কথা বলেছিলেন, যেখানে শত শত মরদেহ ছিল।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, সেখানকার মরদেহগুলো নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক মানুষদের। তবে এতদিন পর্যন্ত এর কোনও প্রমাণ ছিল না।
গণকবরের এই স্ন্ধান বিপর্যয়কর হলেও এটি জেয়ারুবি জেয়াবালানের মতো মানুষের মনে নিখোঁজদের খোঁজ পাওয়ার ব্যাপারে আশার সঞ্চার করেছে। জেয়াবালানের বাবা ছিলেন সেই হাজার হাজার মানুষের একজন, যারা কয়েক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন।
জেয়াবালান এবং তার মতো স্বজন হারানো পরিবারগুলো আশা করছে, তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তার জবাব হয়ত এই মৃতদেহগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
বহু তামিলের বিশ্বাস, এই গণকবরে রয়েছে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার মানুষদের দেহাবশেষ। তারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে।
তবে চেম্মানিতে খনন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগিয়েছে, যেন এই পরিবারগুলোর ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে,যারা নিখোঁজ স্বজনের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল তার উত্তর খুঁজে ফিরছেন।
ওদিকে, আগে শনাক্ত করা একটি গণকবরের কাছে শত শত দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়ায় তামিলদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলোর পূর্ণ তদন্ত দাবি করে আসছিলেন।
অনেকের আশঙ্কা, সত্য উদঘাটনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে শেষ পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া গণকবরটি জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবে। ফলে গণকবরটি শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে নতুন করে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জবাবের অপেক্ষা
শ্রীলংকায় বিশেষ করে তামিল অধ্যুষিত উত্তর ও পূর্বাঞ্চল কয়েক দশক ধরে সংঘাত জর্জরিত ছিল। ওই অঞ্চলে ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধ দেশটিকে জাতিগত বিভাজনের রেখায় ভাগ করেছে।
তামিল টাইগার বিদ্রোহীরা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে লড়াই করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, বছরের পর বছর ধরে সিংহলী-প্রধান সরকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তারা।
২৬ বছর ধরে চলা সংঘাতে আনুমানিক এক লাখ মানুষ নিহত হয়। নিখোঁজ হয় প্রায় ২৩ হাজার মানুষ, যাদের বেশিরভাগই তামিল। নিরাপত্তা বাহিনী এবং তামিল টাইগার দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই নৃশংসতা ও অপরাধের অভিযোগ আছে।
১৯৯৫ সালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর শ্রীলংকার সেনাবাহিনী লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই)-এর কাছ থেকে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করে। আর সেটিই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ২০০৯ সালে টাইগারদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
৯০ এর দশকের শেষদিকে সেনাবাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ালে পুরো চেম্মানি এলাকাজুড়ে একটি কঠোর নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে ওঠে। সেখানে সেনা শিবির, তল্লাশি চৌকি ও নিরাপত্তা ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়।
চেম্মানিতে কবরস্থানের কাছেও একটি সেনা শিবির ছিল। তখন কেউ কেউ জাফনাকে একটি উন্মুক্ত কারাগার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেইসঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে গুম করার অভিযোগ ওঠে, যদিও শ্রীলংকা সরকার সবসময় তা অস্বীকার করে এসেছে।
জাফনার বাসিন্দা জেয়ারুবি জয়পালান বিবিসি-কে বলেন, "১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি ১২ বছর বয়সী ছিলাম। সে সময় আমার বাবাকে চেম্মানি এলাকার কাছে একটি তল্লাশি চৌকি থেকে শ্রীলংকার সেনাবাহিনী আটক করে নিয়ে যায়। এরপর তার কী হয়েছিল, আমরা আজও জানি না।"
তিনি সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, তার বাবা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল এবং মরিয়া হয়ে তার খোঁজে জাফনার বিভিন্ন সেনা শিবির ও পুলিশ স্টেশনে ঘুরে বেড়িয়েছিল।কিন্তু বাবা আর কখনও ফিরে আসেননি।
জেয়ারুবির বাবা কান্দাইয়া জয়পালান ছিলেন সরকারি কর্মচারী। পাশাপাশি তিনি চেম্মানির কাছেই একটি সড়কের পাশে ক্যাফে চালাতেন।
জেয়ারুবি বলেন, "আমি অনেকের সঙ্গে চেম্মানির গণকবর দেখতে গেছি, এ আশায় যে কোনও উত্তর পাব। কিন্তু আমরা কোনও বস্তুগত প্রমাণ পাইনি। আমরা মানবদেহের অবশিষ্টাংশের বিস্তারিত ফরেনসিক বিশ্লেষণ চাই।"
কান্দাইয়া জয়পালান নিখোঁজ হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে একই এলাকায় ১৮ বছর বয়সী তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামী নিখোঁজ হয়েছিলেন।
১৯৯৮ সালে কলম্বোর এক আদালত কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধে এবং তার পরিবারের আরও তিন সদস্যকে হত্যার অভিযোগে পাঁচ সেনাসদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
সেসময় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মনোযোগ কেড়েছিল। পরে তাদের মরদেহ চেম্মানি এলাকায় সমাহিত করা অবস্থায় পাওয়া যায়। বর্তমানে যে গণকবর নিয়ে তদন্ত চলছে তা কুমারস্বামী ও অন্যদের দেহাবশেষ পাওয়া স্থানটির ১০০ মিটারের মধ্যেই অবস্থিত।
আদালতে দেওয়া এক সাক্ষ্যে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক সেনাসদস্য সোমারাত্নে রাজাপাক্ষে অভিযোগ করেন, ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিহত ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষকে চেম্মানিতে কবর দেওয়া হয়েছিল।
তার এই কথার সূত্র ধরেই এক বছর পর চেম্মানিতে প্রথম খননকাজ শুরু হয়। তখন তদন্তকারীরা ১০টিরও বেশি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করেন। মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, এসব দেহাবশেষ গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়াদের হতে পারে। তবে বিচারিক ব্যবস্থায় এ ধারণাকে তেমন আমল দেওয়া হয়নি।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ চলমান থাকায় তৎকালীন সরকার তদন্ত এগিয়ে নেয়নি এবং কেন নেয়নি তাও ব্যাখ্যা করেনি। একই এলাকাতেই আরেকটি গণকবরের সন্ধান পাওয়ায় এখন জবাবদিহিতার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে।
অতীতের তদন্ত কোনটিই বিচার পর্যন্ত পৌঁছায়নি
সংঘাতের সময় নিখোঁজ হওয়াদের পরিবারগুলো নতুন গণকবরের সন্ধান মেলার পর প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করেছে।
তাদের একজন ৬৫ বছর বয়সী সুসিলা। তিনি তার ছেলে জ্ঞানাসীলান রবির সন্ধান করছেন, যাকে ২০০৭ সালে ২৪ বছর বয়সে শ্রীলংকার সামরিক বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
তিনি বিবিসি-কে বলেন, "সে ছিল আমার একমাত্র ছেলে। তার কথা মনে করে আমি রোজ ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠি। তাকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য।"
তিনি চেম্মানির কবরস্থল পরিদর্শন করলেও তার ছেলে সেখানে আছে এমন কোনও প্রমাণ, অর্থাৎ পোশাক বা ব্যক্তিগত কোন ব্যবহার্য সামগ্রী, খুঁজে পাননি।
উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা এখনও করা হয়নি। চেম্মানি থেকে উদ্ধার হওয়া সব দেহাবশেষ আদালতের হেফাজতে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগে সংরক্ষিত রয়েছে।
গণকবরের প্রধান প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রাজ সোমদেব বিবিসি-কে বলেন, "আমরা একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন তৈরি করছি। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সেটি আদালতে জমা দেওয়া হবে।"
সম্প্রতি কয়েক দশকে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন স্থানে ২০টিরও বেশি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে জোর করে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টির কোনও যোগসূত্র নিশ্চিত হওয়া যায়নি, এবং কোনও ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি।
আগের গণকবরগুলোর তদন্তে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার কারণে নতুন গণকবর নিয়ে তদন্ত কী ফল বয়ে আনবে সে বিষয়ে অনেক তামিলেরই সংশয় আছে।
তারা ২০১৮ সালে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মান্নারে সন্ধান মেলা আরেক গণকবরের তদন্তের ফলের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ৩৫০টিরও বেশি কঙ্কালাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তদন্ত চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারায় বহু পরিবারকে হতাশ হতে হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান
অতীতের অপরাধ তদন্তে শ্রীলংকার সরকারি সংস্থাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে অধিকার গোষ্ঠীগুলো কঠোর সমালোচনা করেছে।
বহু বছরের আন্তর্জাতিক চাপের পর ২০১৮ সালে সরকার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তদন্তে স্বাধীন সংস্থা অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স (ওএমপি) গঠন করে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, তাদের নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে সংস্থাটি খুব বেশি এগুতে পারেনি।
এ মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, "জোর করে গুম, নির্যাতন ও হত্যার বহু মামলা স্থবির হয়ে আছে। আর ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মীরা হুমকি ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছেন।"
জাতিসংঘ শ্রীলংকাকে আহ্বান জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের পরিচয় শনাক্ত করে তাদের মৃত্যুর কারণ জানতে এবং কারা দায়ী তা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান রোরি মাঙ্গোভেন বিবিসি-কে বলেন, "পরিস্থিতিটা এমন যেখানে ভুক্তভোগীরা খুবই হতাশ, কয়েক দশক ধরে বেদনা নিয়ে বেঁচে আছেন এবং অতীতের তদন্তের ওপর আস্থা হারিয়েছেন।”
তিনি বলেন, "আমি মনে করি আন্তর্জাতিক সহায়তা যোগ হলে এসব তদন্তে আস্থা জোরদার হবে।"
তবে শ্রীলংকার সব সরকারই যুদ্ধকালে সংঘটিত নৃশংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
হরমুজে ৭ জাহাজে মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি ইরানের। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই জলপথে জাহাজ চলাচলে সহায়তা অব্যাহত রাখলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার রাতভর হামলার শিকার হওয়া সাতটি জাহাজের মধ্যে চারটি থেকে তেল স্থানান্তরের কাজ চলছিল। হামলার পর জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায়। অন্য তিনটি জাহাজ মাইনে আঘাত হানার পর চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে বলে দাবি করেছে ইরান। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হামলায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর কোন দেশের পতাকা ছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। তাদের বক্তব্য, ওয়াশিংটন যদি প্রণালির অন্যান্য অংশ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহায়তা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংঘাত এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।’ এটিকে তারা গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কিম জং উন। ছবি: সংগৃহীত
সীমান্তের নতুন সেতু অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন চীনের দানদং শহরে অত্যন্ত গোপনে এক ঝটিকা সফর সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘ ১২ বছর আগে নির্মিত ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এই প্রতীকী সফর অনুষ্ঠিত হলো। শনিবারের (২৪ অক্টোবর) এই একদিনের ঝটিকা সফর শেষে তিনি ইতোমধ্যেই স্বদেশে ফিরে গেছেন।
সফরকালে কিম জং উনের সঙ্গী ছিলেন চীনের চতুর্থ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ওয়াং হুনিং। তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের পক্ষ থেকে উত্তর কোরীয় নেতার কাছে আন্তরিক শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। দুই নেতা একসঙ্গে স্থানীয় একটি অটোমোবাইল কারখানা পরিদর্শন করেন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। এসময় কিম জানান, চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব রক্ষা এবং ব্যবহারিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত রয়েছে পিয়ংইয়ং।
বিশেষ এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যা ১৯৫০-১৯৫৩ সালের কোরিয় যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণের বর্ষপূর্তির ঠিক আগের দিন। সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দানদং-এর কোরিয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে যান কিম ও ওয়াং। সেখানে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করে প্রাণ উৎসর্গকারী চীনা সৈন্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কিম জং উন। সফর শেষে নতুন সেতুর গোড়ায় এসে কিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান ওয়াং হুনিং।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন চার লেনের সেতু চালুর মাধ্যমে চীন ও উত্তর কোরিয়ার বাণিজ্যের বড় বাধা দূর হলো। তবে কেবল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থেকে নিজের অবস্থান শক্ত করার কৌশল হিসেবেই কিম জং উনের এই হঠাৎ ও রহস্যময় চীন সফরকে দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র:আল-জাজিরা
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আবারও বড় ধরনের হামলা বা কড়া অবরোধের চিন্তাভাবনা করছেন। তবে এতে একটুও দমে না গিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পারস্য উপসাগরে তারা কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ঘেঁষতে দেবে না।
ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আবদুল্লাহি কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরে আবার মার্কিন সৈন্য পাঠানোর স্বপ্ন ট্রাম্পকে কবরে নিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে তারা নাকি ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করেছে, অথচ নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের সীমানার কাছে পাঠাতে তারা ভয় পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
চীনে কিম জং উনের ২৪ ঘন্টার ‘রহস্যজনক’ সফর
এই সংঘাতের আতঙ্কে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু-হু করে বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ১১৭ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’-তে একের পর এক তেলবাহী জাহাজে হামলা চলছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌদি আরবের লড়াইও নতুন করে বেড়ে চলেছে।
সংঘাত থামাতে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় দেশগুলো বৈঠক করলেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান উপস্থিত ছিল না। তুরস্ক সতর্ক করেছে, ইরানে নতুন হামলা পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। তবে ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন হামলা ও অত্যাচার না থামলে তারা কোনো আলোচনায় বসবে না এবং হরমুজ প্রণালিও মুক্ত করবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
মেগান মার্কেল ও তার বাবা থমাস মার্কেল। ছবি: সংগৃহীত
ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূ ও প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী মেগান মার্কেলের বাবা থমাস মার্কেলের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের আপত্তিকর ছবি জমানোর এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরম ক্ষোভ ও গভীর মানসিক কষ্ট প্রকাশ করেছেন ডাচ অব সাসেক্স মেগান। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এমন বিভৎস খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিপর্যস্ত। ঘটনার শিকার হওয়া নিরীহ শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ‘দ্য সান’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেগানের সৎ ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপাইনে তাদের বাবার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এই আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করেন। তার দাবি, বাবার ড্রয়ার ও কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভে শত শত শিশু নির্যাতনের ছবি ছিল। এরপরই তিনি ফিলিপাইন পুলিশ, যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থায় গিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন। ফিলিপাইন প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই বর্তমানে যৌথভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে। তবে মেগানের বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়র তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বর্তমানে ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন ৮২ বছর বয়সি থমাস জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। মেগানের বোন সামান্থা মার্কলও বাবার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, এই কম্পিউটারগুলো দুই বছর ধরে অন্য মানুষদের হাতে ছিল এবং তার ভাই বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এই ঘটনার পর মেগান মার্কেল তার বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্বের আসল কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, আজ থেকে আট বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালেই পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাবার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তিকর অভিযোগের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল।
মেগান বলেন, এতদিন সংবাদমাধ্যমে নানা কথা ছড়ানো হলেও, মূলত সন্তানদের সুরক্ষার কথা ভেবেই তিনি বাবাকে নিজের পরিবার থেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবার অন্তত মানুষ বুঝতে পারবে যে কেন তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তিনি আশা করেন ভুক্তভোগী শিশুরা যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য সামনে এক বড় ধরণের ‘চমক’ অপেক্ষা করছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলার ঘটনার পর সেখানে বড় ধরণের সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এই মন্তব্য করেন।
ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানান, ফিলিস্তিনকে কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে না দেওয়া তাদের নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের সোজা উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, হঠাৎ এবং আচমকা পদক্ষেপ নেওয়াই তার বেশি পছন্দ। নেতানিয়াহু আরও জানান, ফিলিস্তিন থেকে আসা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় কিছু গোপন কৌশল ব্যবহার করা হবে, যা এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের জন্য খুব শীঘ্রই এক বড় ধাক্কা আসতে চলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি তুলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়াই তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় আরও কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি বাড়াবেন। অন্তত দুটিরও বেশি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো শর্ত দেবে না, কারণ তারা ভালো করেই জানে যে ইসরাইল তা কখনোই মেনে নেবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
সুলতান আল-কাহতানি। ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের এক হামলার সময় অন্য যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে সুলতান আল-কাহতানি নামের এক বিমানবন্দর কর্মী বীরের মতো প্রাণ হারিয়েছেন।
গত ২১ অক্টোবর বিমানবন্দরে হামলার পরপরই প্রস্থান গেটের কাছে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুন যাতে রানওয়েতে থাকা অন্য কোনো বিমানে ছড়িয়ে না পড়ে এবং যাত্রীদের কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য সুলতান ও তার সহকর্মীরা দ্রুত আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে তারা আগুন নেভাতে প্রাণপণে চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন নেভাতে গিয়ে তিনি এতটাই অতিরিক্ত ধোঁয়া গ্রহণ করেন যে, তার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা ও তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
পরবর্তীতে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে আর বাঁচাতে পারেননি। নিহত সুলতানের ছয়টি সন্তান রয়েছে। তার বাবা ছেলের এই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, দেশ ও মানুষের সেবা করতে গিয়েই তার ছেলে শহীদ হয়েছে। চরম বিপদের মুখে নিজের জীবনের পরোয়া না করে অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে সুলতানের এই অসাধারণ সাহসিকতা এখন পুরো দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।