প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে গেছেন। তার এ সফর নিয়ে ভারতীয় মিডিয়াগুলোতে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তবে তারেক রহমানের সফর নিয়ে ভারতে এত মাতামাতির প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করেছে চীনের সরকারি মিডিয়া গ্লোবাল টাইমস।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, তারেক রহমান কেন তার প্রথম সরকারি সফরে ভারতে গেলেন না, সেটি নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া সরগরম। কিন্তু এমনটি হওয়া উচিত নয়। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে চীন সফর করেছেন মিয়ানমার, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপ্রধানরা। তারেক রহমানের সফরও এটির অংশ।
এছাড়া চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক, ভারত-চীনের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলা হয়েছে নিবন্ধে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, তারেক রহমান ভারত না গিয়ে চীনে গিয়ে ভারতকে উপেক্ষা করেছেন— কিছু ভারতীয়ের এমন মন্তব্য তাদের দাদাগিরি বা বড় ভাইসুলভ আচরণ প্রকাশ করে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশ চীনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে চায়। বাংলাদেশও একই পথে হাঁটছে। তাই তারেক রহমান চীন সফর করছেন। এছাড়া তার এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিচে গ্লোবাল টাইমসের নিবন্ধটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
“গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চীনে একটি সরকারি সফর করবেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম চীন সফর। সফরকালে তিনি ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৭তম 'অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স' (সামার ডাভোস ফোরাম)-এ অংশ নেবেন। তার এই ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সফরসূচি থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের নতুন সরকার চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই সফরে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সহযোগিতা চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। এটি দুই দেশের মধ্যকার গভীর রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনাকে পুরোপুরিভাবে প্রমাণ করে।”
“২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাইরের আঞ্চলিক সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য প্রধান অগ্রাধিকারগুলো হলো—আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থান তৈরি করা, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি দূর করা।”
“গত ১৬ বছর ধরে চীন ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। যা কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চীন বাংলাদেশের জন্য শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে, যা চীনে বাংলাদেশের কৃষি রপ্তানি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।”
“বাংলাদেশি মিডিয়ার খবর অনুযায়ী—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপ করা।”
বহু দেশ চীনের উন্নয়ন সুযোগকে কাজে লাগাতে চায়, তারেক রহমানের সফর তারই অংশ
“এই সফরটি আসলে চীনের সাথে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর গভীর সম্পর্কের একটি ছোট প্রতিফলন মাত্র। চলতি মাসেই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাই চীনে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন। বেইজিং, সাংহাই এবং হাংঝু সফরের পর দুই দেশ একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে তারা দুই দেশের স্বার্থে কাজ আরও দ্রুত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। গত মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চীন সফর করেন এবং দুই দেশের নেতারা সম্পর্ক আরও গভীর করার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হন।”
“এছাড়াও তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন এবং ব্রুনাইয়ের যুবরাজ হাজি আল-মুহতাদী বিল্লাহ পরপর চীন সফর করে জ্বালানি ও ডিজিটাল অর্থনীতি খাতে সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছেন। গত এপ্রিল মাসে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি ও প্রেসিডেন্ট তো লাম চীন সফর করেন। সে সময় দুই দেশ আন্তঃসীমান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং ডিজিটাল শিল্পের মতো বিষয়ে বেশ কিছু সমঝোতায় পৌঁছায়।”
“ডালিয়ানে গ্রীষ্মকালীন ডাভোস সম্মেলনে চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতারা একত্রিত হবেন। উচ্চপর্যায়ের নেতাদের চীন সফর বার্তা দেয় যে— বহু দেশ চীনের উন্নয়নের সুযোগকে কাজে লাগাতে কতটা আগ্রহী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরও সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।”
ভারতের দাদাগিরির মনোভাব
“বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের সাথে চীনের সম্পর্ক উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়, কিংবা এটি কোনো তৃতীয় পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হওয়াও উচিত নয়। এটি সবসময়ই চীনের একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট অবস্থান। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের নেতার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে বাদ দিয়ে চীনকে বেছে নেওয়ায় কিছুটা অসন্তুষ্ট। কিছু ভারতীয় বিশ্লেষক দাবি করেছেন যে, দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে ‘প্রতিবেশী ভারতকে এড়িয়ে চীন যাচ্ছেন’। তারা বাংলাদেশ ভারতকে অগ্রাধিকার না দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। অন্য কয়েকজন আবার সতর্ক করে বলেছেন যে, তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা ‘নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল’।
এই ধরনের মন্তব্যগুলোর পেছনে কিছু ভারতীয়দের মধ্যে কাজ করা ‘দাদাগিরি’ বা ‘বড় ভাই সুলভ’ মানসিকতা ফুটে ওঠে। তারা মনে করেন, প্রতিবেশী দেশের কোনো নেতার প্রথম বিদেশ সফর মানেই তা আঞ্চলিক অভিভাবকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের একটি মাধ্যম। তারা অন্য দেশের স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে নিজেদের জন্য একটি অপমান হিসেবে গণ্য করেন।
“প্রকৃতপক্ষে চীন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে যেমন অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, তেমনি ভারতের সাথেও বাস্তবমুখী সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। চীন ও ভারতের উচিত একে অপরের বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং অংশীদার হওয়া, যা তাদের একে অপরকে সফল হতে সাহায্য করবে। একে প্রায়শই চীন ও ভারতের যৌথ উন্নয়ন বলা হয়ে থাকে। একই সাথে, ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করার প্রচেষ্টাকে চীন স্বাগত জানায়। এই সম্পর্কগুলো একে অপরের পরিপন্থী নয়। বরং এগুলো একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। পুরো দক্ষিণ এশিয়াই এমন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম, যা সব পক্ষের জন্য সুফল বয়ে আনবে।”
“চীন সবসময় একটি উন্মুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতিতে বিশ্বাসী। চীন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা চীন-বাংলাদেশ কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব হোক— এইসব ব্যবস্থার কোনোটিই কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়। এগুলো এই অঞ্চলের সবার জন্য উন্মুক্ত ও পারস্পরিক সুবিধাজনক বহুপাক্ষিক সহযোগিতা হিসেবে মনে করে বেইজিং।”
“উদাহরণস্বরূপ তিস্তা নদী প্রকল্পের সহযোগিতার কথাই ধরা যাক। ভারত ও বাংলাদেশ হলো এই নদীর উজান ও ভাটির দেশ। অন্যদিকে চীন ও বাংলাদেশ পানি সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। আবার চীন ও ভারতের মধ্যে বয়ে নদীর পানির অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার মতো বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। এটি দেখায় যে এই ক্ষেত্রে তিন দেশের সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।”
দেশ বড় বা ছোট হোক, সবাই সমান— এ নীতিতে বিশ্বাসী চীন
আজকের দিনে নিজেদের উন্নয়নের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মূল অগ্রাধিকার হলো—মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ শক্তিশালী করা। চীন সবসময় 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতি' এবং ‘দেশ বড় হোক বা ছোট, সবাই সমান’—এই নীতিতে বিশ্বাসী। যা দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মঙ্গলের জন্য সহযোগী হবে।”
সূত্র: গ্লোবাল টাইমস
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের রাজস্থানের জয়সলমেরে উটের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটি এসইউভির সংঘর্ষে এক মেজর নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুই সেনা কর্মকর্তা। শুক্রবার (৩১ জুলাই) পুলিশের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুলিশের বরাতে এনডিটিভির খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জয়সলমের শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে থাইয়াত সেনা এলাকার কাছে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ওই সময় তিন সেনা কর্মকর্তা এসইউভিটিতে করে সেনা ঘাঁটিতে ফিরছিলেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী মেজর হামজা আরিফ গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি উট সড়কে উঠে এলে গাড়িটি সেটিকে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের পর চার থেকে পাঁচবার উল্টে যায় ওই এসইউভি এবং প্রায় ১০০ মিটার দূরে গিয়ে থামে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী মেজর হামজা আরিফ গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি উট সড়কে উঠে এলে গাড়িটি সেটিকে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের পর চার থেকে পাঁচবার উল্টে যায় ওই এসইউভি এবং প্রায় ১০০ মিটার দূরে গিয়ে থামে।
দুর্ঘটনার পর তিন সেনা কর্মকর্তাকেই দ্রুত সেনা হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা মেজর হামজা আরিফকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত হামজা আরিফের বিয়ে হয়েছিল মাত্র এক মাস আগে। দুর্ঘটনায় আহত দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট আয়ুষ্মান ও লেফটেন্যান্ট অভিনব রাঠোর বর্তমানে সেনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ছবি : সংগৃহীত
মিসরের বন্দরে ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন দুটি গ্যাস ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কাছের সুয়েজ খাল এবং এর সঙ্গে যুক্ত একটি পাইপলাইনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পাইপলাইন সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রপ্তানিতে অতিগুরুত্বপূর্ণ এক বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাইপলাইনটি লোহিত সাগর থেকে শুরু হয়ে মিসরের বুক চিরে ভূমধ্যসাগরের সিদি কেরির বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে।
ইরান ও তাদের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকার লক্ষ্য করে অনবরত হামলা চালিয়ে আসছিল। এমন পরিস্থিতিতেও লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের জ্বালানি পণ্য উত্তর দিকে রপ্তানির জন্য মিসরের সুয়েজ খাল ও সুমেদ পাইপলাইন এত দিন নিরাপদ রুট হিসেবে ভরসা জুগিয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি নীল নদের অববাহিকায় অবস্থিত মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে গত বুধবার ট্যাংকার দুটিতে ওই হামলা চালানো হয়। এ পর্যন্ত কোনো পক্ষ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি এবং সুয়েজ খালে সরাসরি হামলার কোনো হুমকিও দেওয়া হয়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি জ্বালানি বাজারে বড় উদ্বেগ যোগ করেছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এমএসটি মারকুই’-এর জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান সল কাভোনিক বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ ও ভূমধ্যসাগরের দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করেও তেল পরিবহন এখন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হুমকির মুখে পড়বে।’
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হতো পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। তবে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বর্তমানে এ রুট দিয়ে বলতে গেলে কোনো ট্যাংকারই চলাচল করছে না। এ যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব তাদের বেশির ভাগ তেল লোহিত সাগর এবং দেশটির ইয়ানবু বন্দরে পাঠাতে শুরু করে। হুতিদের নতুন হুমকি ও হামলার কারণে ট্যাংকারগুলো এখন এই বাব আল-মানদেব তথা লোহিত সাগরের রুটটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল ও সুমেদ পাইপলাইনের দিকে উত্তরমুখী চলাচলকারী সৌদি তেলবাহী জাহাজের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে এশিয়ার গ্রাহকদের জন্য এর অর্থ হলো, এডেন উপসাগর হয়ে দক্ষিণ দিকের সংক্ষিপ্ত পথ ছেড়ে এখন পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে জাহাজগুলোকে।
২০ জুলাই লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন হুতি বিদ্রোহীরা। এর আগে গত এপ্রিল মাসে ওই পাইপলাইন দিয়ে ১ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছিল। হুতিদের হুমকির পর জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেলে।
জাহাজ চলাচলের গতিবিধি নজরদারি প্ল্যাটফর্ম ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর গতকাল বৃহস্পতিবারের তথ্য, সুয়েজের ভূমধ্যসাগর প্রান্তের পোর্ট সাইড নোঙরখানায় প্রায় ৩০টি জাহাজ জড়ো হয়েছে। অথচ চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেও এ সংখ্যা ছিল ২০টির কাছাকাছি।
জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভোর্টেক্সা’-এর জর্জ মরিস বলেন, লোহিত সাগরে তেলবোঝাই করার পর ট্যাংকারগুলোর উত্তর দিকে; অর্থাৎ সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্টত বেড়েছে। আর এর মূল কারণ হুতিদের নতুন হুমকি (বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল সরবরাহ বন্ধের হুমকি)।
কেপলারের তথ্য বলছে, বাব আল-মানদেব দিয়ে দক্ষিণমুখী রুটে (এশিয়ার দিকে) তেলের প্রবাহ এখনো সচল থাকলেও তা চলতি মাসের শুরুর তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। জুনে সৌদির ইয়ানবু বন্দর থেকে বোঝাই করা তেলের ৮১ শতাংশ যেখানে দক্ষিণে গিয়েছিল, সেখানে জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩ শতাংশে। অনেক ট্যাংকার বাব আল-মানদেব সম্পূর্ণ এড়িয়ে চললেও চীনের মালিকানাধীন জাহাজসহ কিছু ট্যাংকার হুতিদের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে যাতায়াত করছে।
জর্জ মরিস জানান, হুতিদের হামলা আর নজরদারি এড়াতে এ দক্ষিণমুখী ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিজেদের অবস্থান লুকানোর চেষ্টাও বাড়ছে। ফলে ‘ট্র্যাকার’ বা অবস্থান শনাক্তকরণ যন্ত্র বন্ধ করে চলাচলকারী ট্যাংকারের সংখ্যা এখন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
তবে মিসরে দামিয়েত্তা বন্দরে হামলার ঘটনার মানে এ নয় যে সুয়েজ খাল এখনই কোনো তাৎক্ষণিক হুমকিতে পড়েছে, এমনটাই মনে করেন ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি’-এর আটলান্টিক এলএনজি বিভাগের প্রধান অ্যালি ব্লেকওয়ে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘বাজার এখন পর্যন্ত সুয়েজ খালের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার মতো কোনো ঝুঁকি বা আশঙ্কা তৈরি করেনি।’
এ ড্রোন হামলার পরও গতকাল বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। মূলত পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার খবরের দিকেই ব্যবসায়ীদের মূল নজর ছিল, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। সামগ্রিক এ পরিস্থিতি নিয়ে সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাজারে তেল পৌঁছানোর পথ আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হচ্ছে
ইরান হুমকি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি ট্যাংকার অবরুদ্ধ করে রাখে, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো জ্বালানি রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে হুতিরা সৌদি আরবের সব ধরনের জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছেন। এর আওতায় ইয়ানবু থেকে তেল বোঝাই করে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাওয়া জাহাজও পড়তে পারে।
হুতিরা এরই মধ্যে দেখিয়েছেন, তাঁদের ড্রোন ও রকেটের পাল্লার মধ্যে সুয়েজ খাল অঞ্চলও রয়েছে। তাঁরা একাধিকবার ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও রকেট ছুড়েছেন। যদিও দীর্ঘ দূরত্বের কারণে সেগুলো ভূপাতিত করার সুযোগও বেশি।
জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক দর নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান ‘আর্গাস’-এর এলএনজি মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান মার্টিন সিনিয়র বলেন, শুধু এ একটি কারণেই এখন জাহাজের বিমা খরচ বেড়ে যেতে পারে। মিসরে সাম্প্রতিক হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলে জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিমাকারীরা সুয়েজ খালের জন্য বাড়তি “যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম” দাবি করতে পারেন।’ অবশ্য তিনি উল্লেখ করেন যে ইরান এখনো (সুয়েজ নিয়ে) সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি দেয়নি।
একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানায়, সুয়েজ খালের কাছাকাছি মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলোয় চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা ইতিমধ্যে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো।
যদিও মিসরের ভেতরে এ হামলাকে সুয়েজ খালের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের সাবেক বোর্ড সদস্য ওয়ায়েল কাদ্দুর বলেন, ‘খালটি সার্বক্ষণিক কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়।’
এ হামলার আগেই মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে আগের তুলনায় আরও দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল পথ ব্যবহার করতে হচ্ছিল।
জর্জ মরিস বলেন, ‘জুনে এশিয়ায় সমুদ্রপথে আমদানি হওয়া অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের প্রায় ১৫ শতাংশই ইয়ানবু থেকে এসেছে। এ সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে এশিয়ার পরিশোধনাগারগুলো বড় প্রভাবের মুখে পড়বে। বাব আল-মানদেবের বদলে সুয়েজ খাল ব্যবহার করলে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছাতে সময় দ্বিগুণেরও বেশি লাগে। ফলে জাহাজ পৌঁছাতে প্রায় এক মাস বাড়তি লাগছে।’
অন্যান্য কারণেও সুয়েজ খাল দিয়ে বিশাল পরিমাণ তেল পরিবহন করা বেশ জটিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলোর নিচের অংশ অনেক বেশি গভীর বা ভারী হওয়ায় তারা পুরোপুরি তেলবোঝাই অবস্থায় সুয়েজ খাল পার হতে পারে না। ফলে এ জাহাজগুলোকে প্রথমে সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল খালাস করতে হয়। এরপর ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর পর সেই তেল আবার জাহাজে তুলতে হয়।
হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় বর্তমান সংকটে সুয়েজের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে এর কার্যক্রমে যেকোনো বিঘ্নের প্রভাবও হবে ব্যাপক।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান ড্রায়াড গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কোরি র্যান্সলেম বলেন, ‘সুয়েজ খাল অঞ্চলের যেকোনো স্থানে হামলা হলে যুদ্ধঝুঁকির বিমার প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সেই সঙ্গে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির মূল্যায়নও বদলে যাবে।’
ক্লেপলারের প্রধান ফ্রেইট বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইট বলেন, ‘সুয়েজ খালের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দামে পড়বে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে, তার প্রভাব খুব দ্রুত ভোক্তাদের ওপর পড়বে।’
ছবি : সংগৃহীত
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশের একটি কয়লাখনিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৩২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। উদ্ধার অভিযান চললেও জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। খবর আলজাজিরার।
বৃহস্পতিবার প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটার কাছে দুর্গম সোরাঞ্জ এলাকার একটি কয়লাখনিতে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খনির ভেতরে মিথেন গ্যাস জমে বিস্ফোরণটি ঘটেছে।
প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা শুক্রবার জানান, এখন পর্যন্ত ২৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। খনির ভেতরে আরও তিনটি মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলো উদ্ধারের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পরও উদ্ধারকর্মীরা আটকে পড়া শ্রমিকদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে জীবিত কাউকে উদ্ধার করার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
এর আগে বেলুচিস্তানের প্রধান খনি পরিদর্শক মুহাম্মদ আতিফ জানান, বিস্ফোরণের সময় খনির ভেতরে মোট ৩৬ জন শ্রমিক ছিলেন।
এদিকে জ্যেষ্ঠ খনি কর্মকর্তা আবদুল গনি বেলুচ জানান, শক্তিশালী বিস্ফোরণে পাশাপাশি থাকা দুটি কয়লাখনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা
ছবি : সংগৃহীত
নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আর নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিবদমান অঞ্চলে জারি করা হয়েছে কারফিউ। খবর আলজাজিরার।
মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন শাহ। তিনি নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে অস্থিরতার কালো মেঘ দূর করতে হবে।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার ভারত সীমান্তবর্তী সুনসারি জেলার একটি গ্রামে হিন্দুদের একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রায় উচ্চ স্বরে গান বাজানো এবং ধর্মীয় পতাকা নিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিরোধের জেরে সংঘর্ষ শুরু হয়।
পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি চালালে দুই ব্যক্তি নিহত হন বলে জানান পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে । পরে বৃহস্পতিবার কারফিউ চলাকালেও পাশের সিরাহা জেলায় বিক্ষোভের সময় আরও একজনের মৃত্যু হয়।
নতুন করে সহিংসতা ঠেকাতে সুনসারি ও আশপাশের জেলাগুলোতে কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।
প্রধানমন্ত্রী শাহ বলেন, সরকার, নাগরিক সমাজ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যম সবার প্রতি তার আহ্বান, ধৈর্য ও সংযম বজায় রেখে শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি ঘটনার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আশ্বাস দিয়ে বলেন, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ করে জননিরাপত্তা ও সরকারি সম্পদ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দু হলেও, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
লেখিকা তসলিমা নাসরিন
দীর্ঘ ১৯ বছর পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ফিরলেন আলোচিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শুক্রবার (৩১ জুলাই) দুপুরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর লেখিকাকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে স্বাগত জানান তার অনুরাগী এবং বেশ কিছু সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সেক্যুলার মিশন এবং পশ্চিমবঙ্গের জন্য নামের দুটি সংগঠনের আমন্ত্রণে কলকাতায় ফিরেছেন লেখিকা। ওই দুই সংগঠনের নেতৃত্ব ওসমান মল্লিক এবং মোহিত রায় ছাড়াও এনসিপি দলের পক্ষে শিউলি সাহা এবং তসলিমার অনুরাগীদের একাংশ তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।
শনিবার রবীন্দ্র সদনে তসলিমাকে সংবর্ধনা জানানোর অনুষ্ঠান রয়েছে। পরদিন রোববার পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে একটি অনুষ্ঠানে তার যোগ দেওয়ার কথা।
এর আগে ২০০৭ সালে তার আত্মজীবনী বই ‘দ্বিখণ্ডিত’-কে কেন্দ্র করে কলকাতায় তীব্র বিক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাকে রাতারাতি শহর ছাড়তে বাধ্য করেছিল।
জানা গেছে, ২০০৭ সালের নভেম্বরে তীব্র আন্দোলনের মুখে কড়া নিরাপত্তায় তসলিমা নাসরিনকে তড়িঘড়ি করে রাজস্থানের জয়পুরে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে একটি হোটেলে তিনি অত্যন্ত গোপনে অবস্থান করেন। তবে খবর জানাজানি হতেই স্থানীয় কট্টরপন্থি সংগঠনগুলো বিক্ষোভ শুরু করে, যার ফলে তিনি মাত্র কয়েকদিন পরই জয়পুর ছাড়তে বাধ্য হন। অত্যন্ত গোপনীয়তায় তাকে নয়াদিল্লিতে এনে একটি সরকারি সেফ হাউসে কঠোর নিরাপত্তায় রাখা হয়েছিল। এই সময়টা কার্যত তার জন্য গৃহবন্দিত্বের মতো ছিল, যেখানে বাইরের কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ করার অনুমতি ছিল না।
পরে প্রবল বিতর্ক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখে ২০০৮ সালের ১৯ মার্চ তিনি ভারত ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। ভারত ছেড়ে তিনি প্রথমে তার নাগরিকত্ব থাকা সুইডেনে চলে যান। এরপর নিরাপত্তা ও সাহিত্যিক কাজের সুবিধার্থে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছুকাল অবস্থান করেন।
২০০৯ সালের প্রথম দিকে প্যারিস শহর কর্তৃপক্ষ তাকে বিশেষ আবাসনের সুযোগ দিলে তিনি ফ্রান্সে চলে যান। ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের একটি বড় অংশ তিনি প্যারিসে বসবাস করেন এবং সেখানে বসেই ইউরোপের বিভিন্ন সাহিত্য সভায় যোগ দেন।
পশ্চিমবঙ্গে ফেরার তীব্র ইচ্ছা থেকে তিনি ২০১১ সালে আবারও ভারতে ফিরে আসেন। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারগুলোর অনীহার কারণে কলকাতায় তার ঢোকার অনুমতি মেলেনি। তবে ভারত সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ও রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে নয়াদিল্লিতেই পরবর্তীতে নিজের স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে একের পর এক মুক্তমনা ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগাররা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে ভারতে তার নিরাপত্তা নিয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুক্তচিন্তা বিষয়ক সংগঠন ‘সেন্টার ফর ইনকোয়ারি’-এর সহায়তায় তিনি জীবন রক্ষার্থে জরুরি ভিত্তিতে আমেরিকায় চলে যান এবং সেখানে বেশ কিছু মাস কাটান।
উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর ইউরোপ-আমেরিকায় থাকলেও, তসলিমা সবসময়ই বাংলা সংস্কৃতির টানে কলকাতার কাছাকাছি থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু ২০০৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকারগুলোর অনীহার কারণে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার পথ বন্ধ ছিল।
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকার অনুরোধ নয়াদিল্লির ‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে’। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে এ কথা জানানো হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সংসদীয় কমিটি তাঁদের প্রতিবেদন লোকসভায় উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনে পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির নবম প্রতিবেদনের সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়। এ কমিটির চেয়ারপারসন কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুর।
‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যমান আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসারে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে।
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাঁকে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ যে অনুরোধ করেছে, সে বিষয়টি জানার পর বিষয়টি পর্যালোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিল পার্লামেন্টারি কমিটি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এর পর থেকে তিনি সেখানেই রয়েছেন। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পরও দিল্লিকে একই অনুরোধ জানানো হয়েছে।
‘ভারত থেকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ পাননি শেখ হাসিনা’
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন, নানা বিবৃতিও আসছে তাঁর নামে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে তিনি সাক্ষাৎকারও দিচ্ছেন।
তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটি বলেছে, ‘চরম সংকট বা অস্তিত্বের হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার ভারতের মানবিক ঐতিহ্য ও সভ্যতাগত মূল্যবোধের অংশ’ হিসেবে শেখ হাসিনাকে সেখানে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ভারত সরকার স্পষ্ট করেছে, কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।
অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার যে নীতি ভারত অনুসরণ করে আসছে, তা উল্লেখ করেছে সংসদীয় কমিটি।
পাশাপাশি সুপারিশ করেছে, সে বিষয়ে ভারত সরকার যেন নীতিনিষ্ঠ ও মানবিক অবস্থান বজায় রাখে। একই সঙ্গে যথাযথ সংবেদনশীলতা ও ভারতের আন্তর্জাতিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।