কিম জং–উন , মা কো ইয়ং–হুই ও বাবা কিম জং–ইল
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের জীবনের অনেকটাই রহস্যে ঘেরা। তার মধ্যেই রহস্যময় হলো মাকে নিয়ে তাঁর নীরবতা। ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় উন, কিন্তু কখনো প্রকাশ্যে নিজের মায়ের নাম উচ্চারণও করেননি তিনি। কিম জং–উনের শাসনক্ষমতার ভিত্তি অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে তথাকথিত ‘মাউন্ট পেকতু’ বংশধারার ওপর ভিত্তি করে। পৌরানিক কাহিনিতে আছে, এই বংশধারার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে কোরীয় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা দানগুনের।
উত্তর কোরিয়ায় বংশপরিচয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। তাই কিম জং–উনের মায়ের পরিচয় শুধু যে গোপনীয়ই নয়; এটি এমন একটি বিষয়, যা শাসকগোষ্ঠীর জন্য হুমকির কারণ হতে পারে।
পুরাণের জন্মস্থান
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কোরিয়ার ইতিহাস শুরু হয়েছে মাউন্ট পেকতু নামে একটি পর্বত থেকে। চীন ও উত্তর কোরিয়ার সীমান্তের এ পর্বতকে দানগুনের জন্মস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দানগুন হলেন কোরিয়ার প্রথম রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।
কয়েক হাজার বছর পর উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল–সাং জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় মাউন্ট পেকতুকে আস্তানা বানিয়েছিলেন বলে জানা যায়। মনে করা হয়, তাঁর ছেলে কিম জং–ইলের (কিম জং–উনের বাবা) জন্মও হয়েছিল এই পর্বতেরই ঢালে।
কিম জং–ইল হয়তো রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন, এমন দাবিও রয়েছে। তারপরও কয়েক দশক ধরে মাউন্ট পেকতুকে কিম পরিবারের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
উত্তর কোরিয়ার নির্বাসিত কূটনীতিক রিয়ু হিয়ুন উন তাঁর বই ‘কিম জং উন’স সিক্রেট ভল্ট’–এ লিখেছেন, ‘কিম জং–উনের বয়স যখন বিশের কোঠায়, তখনই তিনি উত্তরসূরি নির্বাচিত হন। তখনো তাঁর উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন ছিল না। তিনি শুধু পেকতু বংশধারার সদস্য হওয়ার কারণেই সে মর্যাদা পেয়েছিলেন।’
তবে কিম জং–উনের মায়ের দিকের পারিবারিক বংশপরিচয়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে।
কিম জং–উনের মা কো ইয়ং–হুই মাউন্ট পেকতু থেকে শত শত মাইল দূরে জাপানের ওসাকা শহরে জন্মেছিলেন বলে মনে করা হয়।
জীবনীকারদের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, কো ইয়ং–হুই ১৯৫২ সালে ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা–বাবা এসেছিলেন জেজু দ্বীপ থেকে। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ উপকূলের কাছের একটি দ্বীপ।
জাপানে বসবাসকারী তাঁদের পরিবারটি ছিল ‘জাইনিচি কোরিয়ান’। ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সালের ঔপনিবেশিক শাসনামলে কোরিয়া থেকে জাপানে চলে যাওয়া বা সেখানে বসতি গড়া কোরীয় বংশোদ্ভূত মানুষদের একটি অংশকে জাইনিচি কোরিয়ান বলা হয়ে থাকে।
কো ইয়ং–হুইয়ের বয়স যখন প্রায় ১০ বছর, তখন তাঁর পরিবার জাপান ছেড়ে উত্তর কোরিয়ায় যায়। ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যাওয়া আনুমানিক ৯৩ হাজার কোরীয় অভিবাসীর মধ্যে তাঁর পরিবারও ছিল। একটি পুনর্বাসন কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এ পরিবারগুলো উত্তর কোরিয়ায় গিয়েছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় তাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা, শিক্ষা, চাকরিসহ একটি সুখী ও সচ্ছল জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
প্রথম দিকে উত্তর কোরিয়ায় আসা এসব অভিবাসীকে অনেকেই ঈর্ষার চোখে দেখত। কারণ, তারা জাপান থেকে নগদ অর্থ, উন্নত মানের পোশাক ও বিভিন্ন গৃহস্থালিসামগ্রী নিয়ে এসেছিল। তবে উত্তর কোরিয়ায় এসব অভিবাসীকে ‘জ্যেপো’ নামে ডাকা হতো, যা একটি অবমাননাকর শব্দ। এই শব্দ এমন মানুষদের বোঝাতে ব্যবহার করা হতো, যাদের বিদেশি ও বিপজ্জনক মতাদর্শের প্রভাবে প্রভাবিত বলে মনে করা হতো।
উত্তর কোরিয়ার সমাজব্যবস্থা বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত। অনেক বিশ্লেষক এই ব্যবস্থাকে বর্ণপ্রথার সঙ্গে তুলনা করেন। দেশটিতে বিদ্যমান কঠোর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতিটি ‘সংবুন’ নামে পরিচিত। সেখানে জ্যেপোদের স্থান ছিল ‘দোদুল্যমান শ্রেণি’-তে, অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠীর অনুগত মূল শ্রেণি ও শত্রু শ্রেণির মাঝামাঝি অবস্থানে। এ কারণে জ্যেপোদের কড়া রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে রাখা হতো। পাশাপাশি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা মর্যাদাপূর্ণ চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা প্রায়ই বৈষম্যের শিকার হতো।
কো ইয়ং–হুইয়ের এই ইতিহাস কিম পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রচারিত ‘পেকতু বংশধারা’র গল্পের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক।
নর্দার্ন রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক কিম হিয়ুং সু বলেন, ‘শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পেকতু বংশধারার যোগসূত্রকে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই দেশের নেতা একজন “জ্যেপো”র সন্তান হতে পারেন—এমন ধারণাই অনেকের কাছে অকল্পনীয়।’
‘সিন্ডারেলার মতো’ জীবন
কো ইয়ং–হুইকে অন্য অনেক জাইনিচি কোরিয়ানের মতো একই পরিণতির শিকার হতে হয়নি। কারণ, তাঁর প্রেম এবং তা কিম জং–ইলের মতো ব্যক্তির সঙ্গে। কিম জং–ইল তখন ছিলেন শাসনক্ষমতার উত্তরসূরি।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কো হুইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের আগেই কিম জং–ইল বিয়ে করেছিলেন। তাঁর সেই স্ত্রী কিম ইয়ং–সুক ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার মেয়ে। সেই বিয়ে হয়েছিল কিম জং–ইলের বাবা তৎকালীন শাসক কিম ইল–সাংয়ের পছন্দে।
কিম জং–ইলের আরও দুজন প্রেমিকা ছিলেন বলেও জানা যায়।
কো ইয়ং–হুই উত্তর কোরিয়ার অভিজাত সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য ছিলেন। তাঁর সৌন্দর্য ও নাচের দক্ষতায় মোহিত হয়েছিলেন কিম জং–ইল। জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি ২০২৫ সালে কো ইয়ং–হুইকে নিয়ে লেখা একটি বইয়ে এ কথাগুলো লিখেছেন।
বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, কিম জং–ইল গভীরভাবে কো ইয়ং–হুইয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। তাঁদের তিনটি সন্তানও হয়।
উত্তর কোরিয়ায় বিয়ে ছাড়া জন্ম নেওয়া সন্তানদের সামাজিকভাবে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাই কিম জং–ইলের আনুষ্ঠানিক স্ত্রী ইয়ং–সুক পিয়ংইয়ংয়ে বসবাস করলেও কো ইয়ং–হুই ও তাঁর সন্তানদের রাজধানী থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরের উপকূলীয় শহর ওনসানে রাখা হয়েছিল।
কিম জং–ইলের সঙ্গে সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না পেলেও কো হুই এমন এক জীবন যাপন করেছিলেন, যাকে সাংবাদিক ইয়োজি গোমি তুলনা করেছেন ‘সিন্ডারেলার মতো জীবন’–এর সঙ্গে।
বিভিন্ন সূত্রের মতে, কো ইয়ং–হুই ছিলেন কিম জং–ইলের সবচেয়ে প্রিয় প্রেমিকা।
তবে একটি বাস্তবতা কখনো বদলায়নি। নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিয়ু হিউন-উ লিখেছেন, কো ইয়ং–হুইকে কখনোই পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি দেননি কিম ইল–সাং। তাঁকে কখনো প্রকাশ্যে কো ইয়ং–হুইয়ের সন্তানদের সঙ্গেও দেখা যায়নি।
সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক চং সঙ-চাংয়ের মতে, কিম ইল–সাং যদি হুইকে স্বীকৃতি দিতেন, তাহলে তাঁর নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কিম ইল–সাংয়ের ছবি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হতো।
কিম ইল–সাংয়ের মৃত্যুর পর কিম জং–ইল উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা হন। তখন কো ইয়ং–হুই অঘোষিত ফার্স্ট লেডির ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। তিনি কিম জং–ইলের সঙ্গে সামরিক পরিদর্শনে যেতেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।
কিম জং–ইলের সাবেক ব্যক্তিগত রাঁধুনি কেনজি ফুজিমোতোর বর্ণনা অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেও ইল প্রায়ই হুইয়ের মতামত চাইতেন।
২০১১ সালে নির্মিত একটি সরকারি প্রামাণ্যচিত্রে কিম জং–ইলের সঙ্গে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে যেতে দেখা যায় কো ইয়ং–হুইকে। তবে সেখানে তাঁর নাম বা সামাজিক শ্রেণিগত পরিচয় সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রামাণ্যচিত্রটি সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশ করা হয়নি। গবেষক চং সঙ-চাংয়ের মতে, ২০১২ সালের জুন মাসে এটি শুধু জ্যেষ্ঠ দলীয় কর্মকর্তাদের দেখানো হয়েছিল। পরে সেটি ফাঁস হয়ে যায় এবং চোরাই পথে আনা ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ে।
চং সঙ-চাং বলেন, ‘এটি ছড়িয়ে পড়ার পর কো ইয়ং–হুইকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। ফলে সরকার দ্রুত প্রামাণ্যচিত্রটি প্রত্যাহার করে নেয়।’
চং সঙ-চাংয়ের মতে, কো ইয়ং–হুইয়ের পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি প্রকাশ্যে এলে শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রামাণ্যচিত্রটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
বিতর্কিত বংশপরিচয় ও ক্ষমতার উত্তরাধিকার
২০০৪ সালে কো ইয়ং–হুই স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্যারিসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর খবর কোনো গুরুত্বই পায়নি।
তবে প্রেমিকার দ্বিতীয় ছেলে এবং কিম জং–ইলের সবচেয়ে ছোট ছেলে কিম জং–উন কীভাবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হয়ে গেলেন?
কিম জং–ইলের ঘোষিত স্ত্রী কিম ইয়ং–সুকের দুটি সন্তান ছিল। কিন্তু দুজনই মেয়ে হওয়ায় উত্তরসূরি হিসেবে তাঁদের কথা বিবেচনা করা হয়নি।
কো ইয়ং–হুই ছাড়াও কিম জং–ইলের আরও দুজন প্রেমিকা ছিলেন। তাঁরা হলেন সং হে-রিম ও কিম ওক। ইলের সঙ্গে কিম ওকের কোনো সন্তান ছিল না।
একসময় মনে করা হতো, সং হে-রিমের গর্ভে জন্ম নেওয়া কিম জং–ইলের বড় ছেলে কিম জং–নাম উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তবে বহু বছর বিদেশে পড়াশোনা করা কিম জং–নাম শুরু থেকেই শাসকগোষ্ঠীর অপছন্দের ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তিনি এক দশকের বেশি সময় বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সাবলীল ছিলেন।
সাংবাদিক ইয়োজি গোমি বছরের পর বছর ধরে কিম জং–নামের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তিনি বলেন, কিম জং–নাম উত্তর কোরিয়ার বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যবস্থার সমালোচনা করতেন এবং সংস্কারের পক্ষে মত দিতেন। এ কারণেই তিনি ক্ষমতাকেন্দ্রের সমর্থন হারান। এ ছাড়া ঘন ঘন ক্যাসিনোতে যাওয়া এবং বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপনের কারণে তাঁর সম্পর্কে একজন আনন্দপ্রিয় ও ভোগবিলাসী ব্যক্তির ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছিল।
ম্যাকাউতে কয়েক বছর ধরে নির্বাসিত জীবনযাপনের পর ২০১৭ সালে কিম জং–নামকে মালয়েশিয়ায় হত্যা করা হয়। বিমানবন্দরে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল।
নির্বাসিত কূটনীতিক রিয়ু হিউন–উ বলেন, কিম জং–উনের বড় ভাই কিম জং–চুলও উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। তবে গুরুতর আফিম-আসক্তির কারণে তাঁকে উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
ধারণা করা হয়, কো ইয়ং–হুই নিজেই তাঁর দ্বিতীয় ছেলে কিম জং–উনকে ক্ষমতার উত্তরসূরি করার জন্য সক্রিয় হয়েছিলেন।
সাংবাদিক অ্যানা ফিফিল্ড তাঁর ‘দ্য গ্রেট সাকসেসর: দ্য সিক্রেট রাইজ অ্যান্ড রুল অব কিম জং–উন’ বইয়ে লিখেছেন, কো ইয়ং–হুই তাঁর বোনের পরামর্শে এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর বোন তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমার ছেলেকেই পরবর্তী নেতা হতে হবে, নইলে আমাদের পুরো পরিবার ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতা কিম জং–উনকে খুব দ্রুতই তাঁর বাবা কিম জং–ইলের প্রিয়পাত্র করে তুলেছিল।
কিম জং–উন কিছু সময়ের জন্য সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনা করেছেন। তবে বলা হয়, বিদেশে থাকলেও তাঁকে তাঁর সৎভাই কিম জং–নামের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও বিচ্ছিন্ন পরিবেশে রাখা হয়েছিল।
২০১১ সালে কিম জং–ইল যখন মারা যান, তখন মাত্র ২৭ বছর বয়সী কিম জং–উন উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন।
এরপর কিম জং–উন বোন কিম ইয়ো–জংকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেন। তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রভাবশালী প্রচার বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে ধারণা করা হয়।
তবে কিম জং–উনের পারিবারিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন আজও তাঁর পিছু ছাড়েনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই উনের জন্মদিনকে এখনো জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। কারণ, তাঁর জন্ম ও শৈশব নিয়ে বেশি আলোচনা শুরু হলে তাঁর মায়ের পরিচয় এবং কেন তিনি পিয়ংইয়ংয়ের বাইরে বড় হয়েছেন—এসব স্পর্শকাতর প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে। অথচ উনের দাদা কিম ইল–সাং ও বাবা কিম জং–ইলের জন্মদিন উত্তর কোরিয়ায় জাতীয়ভাবে উদ্যাপন করা হয়।
কিম জং–উনের পারিবারিক পরিচয় ঘিরে যে গোপনীয়তা রয়েছে, সেটিই সম্ভবত তাঁকে দ্রুত তাঁর স্ত্রী রি সল–জুকে জনসমক্ষে পরিচয় করিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রি সল–জু পিয়ংইয়ংয়ের একটি উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছেন বলে মনে করা হয়। তিনি একটি স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক দলের গায়িকা ছিলেন। এ ছাড়া তরুণ বয়সে রি সল–জুকে চীনে ধ্রুপদি সংগীত শেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল, যা উত্তর কোরিয়ার সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা সংবুনে ভালো পারিবারিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।
জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি বলেন, ‘মায়ের পারিবারিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে কিম জং–উন যে বৈধতাজনিত সংকোচ ও ক্ষোভ অনুভব করতেন, সেটিই তাঁকে শুরুতেই স্ত্রী রি সল–জু এবং মেয়ে জু আয়েকে সামনে আনার জন্য শক্তিশালী প্রেরণা জুগিয়েছিল।’
এখন প্রশ্ন হলো, যদি কোনো দিন কিম জং–উনের মায়ের প্রকৃত বংশপরিচয় ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে চলে আসে, তাহলে কী হতে পারে?
নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিয়ু হিউন–উর মতে, ‘যদি জানা যায় যে তাঁর (কিম উন) মা জাপানে বসবাসকারী কোরীয় বংশোদ্ভূত পরিবারের সদস্য ছিলেন, তাহলে তা শুধু কিমের শাসনের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে না; বরং উত্তর কোরিয়ায় বংশানুক্রমিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো ব্যবস্থাকেই নাড়িয়ে দেবে।’
হিউন–উর মতে, উত্তর কোরীয় সমাজে এর প্রভাব হবে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের মতো।
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিরোধ ও ধ্বংস করেছে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি এই সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
হামলার ঘটনার পর সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছিল দেশটির সিভিল ডিফেন্স বিভাগ। তবে নিরাপত্তার হুমকি কমে আসায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় সংস্থাটি বাসিন্দাদের নিরাপদ নির্দেশনা মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আবহা এবং পার্শ্ববর্তী খামিস মুশাইত এলাকায় প্রচারিত জরুরি সতর্ক বার্তার পর বর্তমানে সেসব স্থানেও বিপদ কেটে গেছে। ন্যাশনাল আর্লি ওয়ার্নিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আলাদা পোস্টে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি জানানো হয়।
আক্রান্ত স্থানগুলোতে অপ্রয়োজনীয় জটলা না করা এবং কোনো ধরনের ভিডিও বা ছবি ধারণ করা থেকে বিরত থাকতে সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: আল জাজিরা
ছবি : সংগৃহীত
চীনের তিব্বত অঞ্চলে ৭.০ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ভূগর্ভের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে সৃষ্ট এই ভূমিকম্পটি তিব্বতের নাখু শহরের ১৯০ কিলোমিটার পূর্বে আঘাত হানে বলে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এনডিটিভি নিউজের এক প্রতিবেদনে এক খবর জানানো হয়েছে।
চীন সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) স্থানীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, এই ঘটনায় ৪৬ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ভূমিকম্পের ফলে অন্তত ৩৩৯টি বাড়িঘর ধসে পড়েছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকাজ চালাতে অবিলম্বে তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের আঘাত হানার সময় সুপারমার্কেটের শেলফ থেকে জিনিসপত্র পড়ে যাওয়া এবং আতঙ্কিত মানুষকে রেস্তোরাঁ ছেড়ে বাইরে বের হতে দেখা গেছে। এর আগে তিব্বতের এই অঞ্চলে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক ভূমিকম্পে ১২৬ জন নিহত হয়েছিলেন এবং আগস্টে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় এক হাজার চারশরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
মূল ভূমিকম্পের পর ওই দিনই ভারতের অরুণাচল প্রদেশের পঙ্গিন থেকে উত্তর-উত্তরপশ্চিমে চীন সীমান্তে ৫.২ মাত্রার আরও একটি ভূকম্পন রেকর্ড করেছে ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস)।
সূত্র: এনডিটিভি
চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।
চায়না আর্থকোয়েক নেটওয়ার্কস সেন্টার (সিইএনসি) বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে এ ভূমিকম্প হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
সিইএনসির তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল তিব্বতের উত্তরাঞ্চলের নাগচু এলাকার একটি উচ্চ পার্বত্য কাউন্টিতে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থলের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে ভূমির গড় উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ৮৬৪ মিটার।
চীনে ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে জানিয়েছে সিইএনসি। স্থানীয় এলাকায় কম্পনটি স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে। এর আগে ২০১০ সালে প্রতিবেশী ছিংহাই প্রদেশের ইউশু এলাকায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। ওই ঘটনায় অন্তত ২ হাজার ৬৯৮ জন নিহত হন এবং প্রায় ৩০০ জন নিখোঁজ ছিলেন।
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের রাজধানী তেহরানের উত্তরে তাজরিশ স্কয়ারে মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ব্যতিক্রমী এক শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। ব্যস্ত সড়কের পাশে স্থাপন করা ওই শিল্পকর্মে ট্রাম্পের আদলে এক অভিনেতাকে কারাগারের পেছনে দেখা যায়। বিলবোর্ডের মতো দেখতে শিল্পকর্মটিতে একটি কৃত্রিম কারাগার তৈরি করা হয়েছে। ট্রাম্পের ভূমিকায় অভিনয় করা ওই ব্যক্তি কারাগারের চারপাশে হাঁটেন এবং মাঝেমধ্যে ভেতরে বসেন।
শিল্পকর্মটিতে লেখা রয়েছে, ‘এই দৃশ্য না দেখা একটি অপরাধ।’ এর পাশে থাকা অন্যান্য বার্তায় দক্ষিণ ইরানের সিরকি এলাকায় সেপ্টেম্বরের শুরুতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, ওই হামলায় দুই নারী ও দুই শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ৬০ জনেরও বেশি মানুষ।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কারাগারে বন্দি অবস্থায় দেখিয়ে প্রতীকীভাবে তার প্রতি প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ
আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’-এ ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম।
উন্নতি সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে দেশটি। সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০ দশমিক ৩৯, যেখানে বৈশ্বিক গড় ০ দশমিক ৫৫। তবে এ বছর আইনের শাসন সূচকে বিশ্বের ১৫তম শীর্ষ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অগ্রগতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে দেশটি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে নেপাল।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে শুধু পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশও সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ঘানা ৬২তম, কেনিয়া ১০০তম, লাইবেরিয়া ১০৩তম, সিয়েরা লিওন ১১০তম, নাইজেরিয়া ১২০তম এবং জিম্বাবুয়ে ১২২তম স্থানে রয়েছে।
বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। সূচকের শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ।
সূচকে আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে দেশগুলোর আইনের শাসন মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো- সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-বিধানের প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার।
আটটি মানদণ্ডের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-বিধানের প্রয়োগ। বাকি পাঁচটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে।
মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ খাতে ০ দশমিক ৩১ স্কোর নিয়ে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে ১৩৩তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর সবচেয়ে ভালো অবস্থান মুক্ত সরকার মানদণ্ডে। এ খাতে ০ দশমিক ৪২ স্কোর নিয়ে ১২৮তম স্থানে রয়েছে দেশটি।
মোহাম্মদ সাদিক
আফগানিস্তানে বড় পরিবার এবং সন্তানের সংখ্যা অনেক এমন দম্পতির দেখা পাওয়া সাধারণ ঘটনা। তবে উরুজগান প্রদেশের মোহাম্মদ সাদিকের পরিবার সম্ভবত দেশটির অন্যতম বড় একটি পরিবার। মোহাম্মদ সাদিকের চার স্ত্রীর ঘরে ৫৮টি সন্তান রয়েছে এবং তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের জন্ম হয়েছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। এত বড় পরিবার চালানো তার জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, তার সমস্ত প্রচেষ্টা প্রতিদিন সন্তানদের খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবারের ছোট সন্তানরাও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
এই পরিবারের চার নারীও বছরের পর বছর গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব বহন করে আসছেন। মোহাম্মদ সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের সময় তার চার স্ত্রীর বয়সই খুব অল্প ছিল, ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ছিলেন তারা।
মোহাম্মদ সাদিক হাসতে হাসতে বলেন, কখনও কখনও তিনি তার সব সন্তানের নামও মনে রাখতে পারেন না। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি সন্তানদের গুনে দেখেন, সবাই বাড়িতে আছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য।
উৎসবের' আবহ
মোহাম্মদ সাদিকের মতে, ছোট সন্তানরা যখন তাকে ঘিরে জড়ো হয়, তখন তাদের বাড়ি কোলাহল, হাসি আর ব্যস্ততায় ভরে ওঠে, যেন সেখানে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। তবে এই পরিবারের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে গুরুতর আর্থিক সংকট। দারিদ্র্য কখনও কখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে কিছু সন্তানকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়।
পরিবারটিতে দিনে মাত্র দুইবার রান্না হয়, সকালে এবং সন্ধ্যায়। পরিবারের দুই জন নারী রান্নার দায়িত্ব পালন করেন।
৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি বলেন, আরও সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল "নবীর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো"।
তার এক মেয়ের বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মজার ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, "যে মৌলভি সাহেব বিয়ে পড়িয়েছিলেন, তিনি আমাকে আমার মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুলবশত আমার অন্য এক মেয়ের নাম বলে ফেলি। তখন মৌলভি সাহেব হেসে বললেন, আপনি বাড়ি গিয়ে আবার দেখে আসুন, ভুল নাম বলেছেন কি না।"
'নামটাও মনে থাকে না'
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এত বেশি সন্তান থাকার কারণে সবার নাম মনে রাখা তার জন্য প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি অধিকাংশকেই "বাবা" বা "আমার সন্তান" বলে ডাকেন।
মোহাম্মদ সাদিক একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, "এক রাতে আমরা সবাই খাবারের টেবিলের চারপাশে বসেছিলাম। আমি সন্তানদের গোনা শুরু করি এবং দেখি একজন নেই। আমি এটাও জানতাম না যে অনুপস্থিত সন্তানটি ছেলে না মেয়ে। পরে আমি তাদের মায়েদের জিজ্ঞেস করি। তখন একজন জানান, তিনি তার সন্তানকে তার নানির বাড়িতে পাঠিয়েছেন এবং সে রাতটা সেখানে কাটাবে।"
মোহাম্মদ সাদিকের প্রথম বিয়ে হয়েছিল যখন তার বয়স ছিল ২০ বছর। তরুণীদের বিয়ে করার কারণ সম্পর্কে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি বিয়ের জন্য তাকে কয়েক বছর ধরে কনের পরিবারকে দেওয়া অর্থ জমাতে হয়েছে।
এত বড় পরিবার ও সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার স্ত্রীরা খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন। শৈশব ও কৈশোরেই তারা বিয়ে, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান পালনের বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তাদের জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে। মোহাম্মদ সাদিক এবং তার স্ত্রীরা জীবনে আরেকটি বড় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে তারা ১৪ সন্তান হারিয়েছেন, যা যেকোনো বাবা-মায়ের জন্য গভীর বেদনার বিষয়।
স্বাস্থ্য সংকট ও আর্থিক অনটন
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে বিয়ে এবং গর্ভধারণ মা ও অনাগত শিশু উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। বারবার গর্ভধারণ নারীদের জন্য আরও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ হতে পারে।
আফগানিস্তান এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে, যেখানে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় নারীদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে এখনো বেশি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে, যেখানে মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে, দারিদ্র্যও এই পরিবারের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে খাবার খান এবং গ্রীষ্মকালে উঠানে খান, কিন্তু মৌলিক সুবিধাগুলোরও তাদের সীমিত প্রাপ্যতা রয়েছে।
যে জায়গায় তারা গোসল করেন, সেটিই কাপড় এবং বাসন ধোয়ার জন্যও ব্যবহৃত হয়। একই স্থান শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে শুধু মোহাম্মদ সাদিক নন, তার অনেক সন্তানও কাজ করে। কেউ কেউ কাগজ, প্লাস্টিক এবং অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ করে, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় অথবা বিক্রি করে পরিবারের খরচে অবদান রাখা হয়।
সব কষ্ট সত্ত্বেও এই পরিবার প্রতিদিনের চাহিদা মেটানোর জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি দিনই নতুন একটি চ্যালেঞ্জ, খাবার, আশ্রয় এবং সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর চ্যালেঞ্জ।
শীতের রাতে কখনও কখনও ছয় বা সাতজন মানুষ একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমান। সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে। জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়।
মোহাম্মদ সাদিকের দুই ইচ্ছে
শীতের রাতে কখনও কখনও ছয় বা সাতজন মানুষ একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমান। সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, মজবুত দরজাও নেই। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে।
জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়।
এসব কষ্টের মধ্যেও নিজে পড়াশোনা করতে না পারা মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তিনি তার সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তবে সীমিত আয়ের কারণে তাদের শিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মোহাম্মদ সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি বলেন, প্রতি একটি গাড়ি বিক্রির জন্য তিনি মাত্র এক হাজার আফগানি কমিশন পান।
কিন্তু এত বড় পরিবারের চাহিদা তাদের সম্মিলিত আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। তাই মোহাম্মদ সাদিক সরকার, সহায়তা সংস্থা এবং আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান, যাতে তিনি তার সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন।
নিজের ইচ্ছের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ সাদিক বলেন, তার জীবনে মাত্র দুটি বড় ইচ্ছে রয়েছে।
"আমার প্রথম ইচ্ছা, আমার সন্তানরা শিক্ষা লাভ করুক, ধর্ম এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক। দ্বিতীয়ত, তাদের যেন কখনও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং তাদের পেট যেন ভরা থাকে।"