ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার প্রচারণা শেষ। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে দীর্ঘ প্রচারণা শেষ হয়। এবার শুরু হিসেব নিকেশ। দীর্ঘ প্রচারণা শেষে এবার হিসেবে বসছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। সিলেট জেলার মোট ছয়টি আসন রয়েছে। বিএনপি নেতাদের দাবি, সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে এগিয়ে আছেন তাদের প্রার্থীরা।
তবে জামায়াতের নেতাদের দাবি, কেবল সিলেট-২ আসন ছাড়া আর কোথাও এগিয়ে নেই বিএনপি। একটিতে এগিয়ে রয়েছে জামায়াত। আর বাকীগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। স্থানীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে সব আসনে নীরব ভোট বেশি। তারাই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই রাজনৈতিক নেতারা তাদের জয়-পরাজয়ের হিসাব কষছেন।
প্রচার প্রচারণায় ভোটের মাঠ অনেকাংশেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থক ও তাদের নেতা-কর্মীদের দখলে ছিল। এই দুই দলের প্রার্থীরাই ৫ অগাস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনসংযোগ, সভা-সমাবেশের মাধ্যমে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে সিলেট-৫ ও সিলেট-৬ আসনে ভালো অবস্থানে রয়েছেন দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
সিলেট -১ঃ ‘মিথ ও মর্যাদার’ লড়াই
সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিকে সিলেট বিভাগের চার জেলার ১৯টি আসনের মধ্যে সবসময় ‘মর্যাদার’ মনে করা হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করেন, সেই দলই সরকার গঠন করে- এটা মিথে পরিণত হয়েছে।
এই আসনে আট প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে থাকলেও মূল লড়াই হবে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের হাবিবুর রহমানের মধ্যে। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া খন্দকার মুক্তাদির দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে প্রচারে থাকায় এগিয়ে থাকলেও ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে হাবিবুর রহমানও লড়াইয়ের আলোচনায় রয়েছেন। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বাবা খন্দকার আবদুল মালিক সিলেট বিএনপি প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম।
তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৮ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হন। তার কনিষ্ঠ ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ২০১৮ সালেও বিএনপির হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন।
এদিকে, বিএনপির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, সিলেট জেলা আমির হাবিবুর রহমান। তাকে নিয়ে দলে কোনো কোন্দল নেই, নেই কোনো অসন্তোষ। ইসলামী ছাত্রশিবির দিয়ে রাজনীতির পথ চলা শুরু হাবিবুরের। ১৯৮২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। তিনি সিলেট জেলা শাখার আমির থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এর আগে হাবিবুর রহমান সিলেট-৬ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন। এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন- সিপিবির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (কাস্তে), বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল (মই), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়া (আ্যাপেল), গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), বাসদ-মার্কসবাদীর সঞ্জয় কান্তি দাস (কাঁচি)।
সিলেট-২ঃ ‘ইলিয়াস-স্মৃতিতে নির্ভার’ লুনা
বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসনের এক সময় সংসদ সদস্য ছিলেন বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা বিএনপির রাজনীতিতে আসেন। এবার তিনি ধানের শীষ নিয়ে লড়াই করছেন। তার সঙ্গে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসির আলীর লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্থানীয় ভোটারদের ধারণা।
তারা মনে করেন, ইলিয়াস আলীর কারণে এখানে ব্যাপক জনপ্রিয় তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি ভোটের প্রচারে ইলিয়াস আলীর সময়ে হওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। এদিকে, এই আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও শুরু থেকেই মাঠে ছিলেন। এ নিয়ে দুই নেতার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।অবশেষে হুমায়ুন কবিরকে দলের যুগ্ম মহাসচিব (পররাষ্ট্র) হিসেবে মনোনীত করায় লুনা ‘ঝামেলা মুক্ত’ হন বলে মনে করেন সমর্থকরা।এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন-গণফোরামের মুজিবুল হক (উদীয়মান সূর্য), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী (লাঙ্গল)।
সিলেট-৩ঃ জোটের সুবিধা-অসুবিধা
ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিক। তার সঙ্গে মূল লড়াইয়ে থাকবেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজু। এ আসনে মুসলেহ উদ্দিন রাজু তার বাবা ইসলামি পণ্ডিত মাওলানা নুরুদ্দিন গহরপুরীর পরিচয়ে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। তবে বিএনপি শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকলে এবং ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে পারলে ফল এম এ মালিকের পক্ষে যেতে পারে।
তবে মালিকের জন্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ দলের ঐক্য। আর এই আসনে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এম এ সালাম দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন; তারাও ধানের শীষকে বিজয়ী করতে মাঠে নেমেছেন। তবে তাদের অনুসারীরা শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেন তার উপরই নির্ভর করবে রাজুর ভাগ্য। এ ছাড়া এই আসনে বিএনপি প্রার্থীর বিপক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের প্রার্থী ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ। জোটের সিদ্ধান্তে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন।
ভোটাররা বলছেন, বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থী লোকমান আহমদ থাকলে নির্বাচনি লড়াই হত হাড্ডাহাড্ডি। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন। তবে মূল লড়াইয়ে থাকবেন রিকশা প্রতীকের মুসলেহ উদ্দিন রাজু। এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আনওয়ারুল হক (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা (ফুটবল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মাইনুল বাকর (কম্পিউটার)।
সিলেট-৪ঃ ‘মেয়র-চেয়ারম্যানের’ লড়াই
কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সিলেট সিটি করপোরেশনের দুইবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এখানে ধানের শীষের প্রার্থী। আর জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন জয়নাল আবেদীন। আরিফ ও জয়নালের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। আরিফুল হক সিলেট-১ আসনে মনোনয়র প্রত্যাশী ছিলেন। আর জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন আরিফুল হককে ‘বহিরাগত’ বলে প্রচার চালান।
তবে সিলেট-৪ আসনের বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েচেনন আরিফুল। এদিকে, দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এলাকায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন। তিনি জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের দুই বারের সাবেক চেয়ারম্যান। এলাকায় তার শক্তিশালী অবস্থান রয়েছেন। এই আসন থেকে জামায়াত কখনও নির্বাচিত হতে পারেনি।
আর নির্বাচনের ‘ম্যাজিক ম্যান’ হিসেবে আরিফুলের খ্যাতি রয়েছে। তার সমর্থকদের ভাষ্য, জাতীয় নির্বাচনে স্থানীয়, বহিরাগত কোনো বিষয় নয়। এখানে উন্নয়নই মূল লক্ষ্য।এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন- জাতীয় পার্টির মুজিবুর রহমান (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সাঈদ আহমদ (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম (ট্রাক)।
সিলেট-৫ঃ ‘ফুলতলী হুজুর ফ্যাক্টর’
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৫ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মামুনুর রশিদ; যিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘চাকসু মামুন’ নামে পরিচিত। ভোটের মাঠে তার ‘ফুটবল’ হিসাব পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন কর্মী-সমর্থকরা। দলের শৃঙ্খলা না মানায় এরই মধ্যে তাকে সিলেট জেলা বিএনপির প্রথম সহসভাপতি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার সঙ্গে কাজ করছেন এমন আরও কয়েক নেতা বহিষ্কার হয়েছেন।
বিএনপি এই আসনটি তার জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দিয়েছে। তিনি খেজুর গাছ প্রতীকে লড়ছেন। ২০১৮ সালেও তিনি বিএনপি জোট থেকে এই আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষে এখানে প্রার্থী হয়েছেন খেলাফত মজলিসের মুফতি আব্দুল হাসান। তিনি দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে লড়ছেন।তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে এসেছেন আরেক আলোচিত রাজনীতিক ‘চাকসু মামুন’।
তার গুরুত্ব অনুধাবন করে জেলা বিএনপির নেতারা ঘন ঘন জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট সফর করছেন। জোট প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন। সবশেষ এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন ‘ফুলতলী হুজুর’ হিসেবে পরিচিত আব্দুল লতিফ চৌধুরীর ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী। ভোটারদের অভিমত, এই আসনে ‘ফুলতলী হুজুরের’ ব্যাপক সমর্থক রয়েছেন। অতীতের নির্বাচনে দেখা গেছে, ফুলতলী হুজুরের সংগঠন ‘আনজুমানে আল ইসলাহের’ ভোট যেদিকে গেছে সেদিকেই ভোটের বাতাস তৈরি হয়েছে।
এই ‘ভোট ব্যাংক’ সবসময় জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখে। ভোটারদের ধারণা, ‘ফুলতলী মসলকের’ একটা বড় ভোট ‘চাকসু মামুনের’ বাক্সে যেতে পারে। সেটা হয়ত মামুনের ব্যক্তি ইমেজ, দলীয় একাংশের সমর্থনের সঙ্গে বাড়তি শক্তি দেবে। এ আসনে চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার জাতীয় পার্টি, বিএনপি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একবার করে এবং দুবার স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
সিলেট-৬ঃ
ত্রিমূখী লড়াইয়ের আভাস গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া এই আসনে নিজস্ব ‘ভোট ব্যাংক’ রয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মাওলানা ফখরুল ইসলামের। তিনি লড়াইয়ের ময়দানে জোরেশোরে ছুটছেন। গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলার বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, এখানে বিএনপির মূল সমস্যা দলীয় বিভক্তি।
২০১৮ সালে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ফয়সল আহমদ চৌধুরী, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ডা. এনামুল হক চৌধুরী, বিএনপি নেত্রী সৈয়দা আদিবা হোসেন, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল কাহের চৌধুরী এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। বিশেষ করে ফয়সল আহমদ চৌধুরী বিএনপির বিকল্প প্রার্থী ছিলেন। পরে দলের চূড়ান্ত টিকেট পান এমরান আহমদ চৌধুরী। ভোটের মাঠে এরা কেউ হয়ত প্রকাশ্যে ‘বিদ্রোহী’ হননি। আর জামায়াতে ইসলামীর দুই উপজেলাতেই শক্ত ভিত্তি রয়েছে।
দলে কোনো কোন্দল নেই, সেটি সেলিম উদ্দিনকে সুবিধা দিচ্ছে।তবে কেউ কেউ এই আসনের এলাকাভিত্তিক ভোটের প্রভাবকে একেবারে নাকচ করে দিতে চান না। কারণ, জামায়াতের সেলিম উদ্দিন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী ফখরুল ইসলামের বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলাতে। এটা কাজে লাগলে বিএনপির প্রার্থী গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ভালো অবস্থানে থাকবেন বলেও মনে করছেন তার নেতাকর্মীরা।
নেতারা যা বলছেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনের কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ী করতে নেতাকর্মীরা এক হয়ে কাজ করছেন। আমাদের নির্বাচনি এলাকায় কিছু ছোটখাটো সমস্যা ছিল, সেটা আমরা সমাধান করেছি। যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি বলেন, সিলেটের সব আসনে বিএনপি ও জোটের প্রার্থীরা ভালো অবস্থানে রয়েছেন। আশা করছি, সবকটি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সংসদে যাবেন।জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর শাখার আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, “আমরা দেখতেছি, মানুষজন একটা পরিবর্তন চাচ্ছে, পুরাতন বন্দোবস্ত আর চাচ্ছে না। বিশেষ করে সমাজের তরুণ ভোটারদের একটা বড় আকাঙ্ক্ষা হল পুরাতন বন্দোবস্ত যেন আর ফিরে না আসে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ও সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) রুমিন ফারহানা ও সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওসির কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
রুমিন ফারহানার কর্মী-সমর্থকেরা জানান, কয়েক দিন ধরে সংসদ সদস্যের সঙ্গে সরাইল থানার ওসির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্য ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জাকির হোসেন ফোন করলেও ওসি সাড়া দেন না। এমনকি তাঁদের ফোনও ধরেন না। ওসির কাছে নিরাপত্তা চেয়েও পাননি সংসদ সদস্য। এ পরিস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সরাইল থানায় যান রুমিন ফারহানা।
থানার ওসির কক্ষে দুই পক্ষের উত্তপ্ত কথোপকথনের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়া তিনটি ভিডিওর একটি ৭ মিনিট ৮ সেকেন্ডের, আরেকটির ৫৭ সেকেন্ড এবং অন্যটির ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ড।
ভিডিওগুলোয় দেখা যায়, ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া তাঁর কক্ষে বসে আছেন। তাঁর পাশেই বসা ছিলেন রুমিন ফারহানা। ওসির টেবিলের চারপাশে সংসদ সদস্যের নেতা-কর্মীরা ঘিরে ছিলেন।
সংসদ সদস্য, তাঁর পিএস ও নেতা-কর্মীরা একসঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ওসিকে প্রশ্ন করছিলেন। বারবার ফোন করেও সংসদ সদস্যের ফোন না ধরা এবং তাঁকে কেন নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি, এসব বিষয় নিয়ে ওসির সঙ্গে ওই সংসদ সদস্য ও তাঁর নেতা-কর্মীদের বিতণ্ডা হয়।
একপর্যায়ে রুমিন ফারহানা অভিযোগ করে বলেন, ওসি ইটভাটা, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন থেকে টাকা নেন। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত কথোপকথন চলতে থাকে। একপর্যায়ে ওসি পুলিশ সুপারকে ফোন করে বিষয়টি জানান। তিনি মব সৃষ্টির কথা বলেন এবং ভিডিও কলে কক্ষে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের এসপিকে দেখান। এ সময় সংসদ সদস্য এসপির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ওসি কোনো সাড়া দেননি।
পরে কথোপকথনের একপর্যায়ে ওসিকে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আপনি (ওসি) যখন বলতেছেন, ওনার নিরাপত্তা ওনার লোকজন দিবেন। তার মানে আমি দিব না।’ উত্তরে ওসি বলেন, ‘এটাই তো স্বাভাবিক। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাস্তাঘাটে হাঁটি বেড়ায়...।’ তখন রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। জি স্যার, আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি।’
ওই ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘নানান অভিযোগ ওনার (ওসি) বিরুদ্ধে। এসব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলাম। আমি একটা তালিকাও নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি কোনো মন্তব্যও করেন নাই। দুই পাতার তালিকা ছিল যে এই তারিখে এই অপরাধ, ওই তারিখে ওই অপরাধ। উনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।’
মবের অভিযোগ প্রসঙ্গে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘মব সাধারণত যায় থানায় আসামি ছিনাইয়া আনতে। আমি কি কোনো আসামি ছিনাইয়া আনছি, এক। আমি কি ওনার কাছে টাকা দাবি করেছি, দুই। আমি কি বলেছি আমাকে কিছু দিতে হবে, তিন। আমি তিনটার একটাও বলিনি। তাহলে মব হলো কোথা থেকে।’
ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘দুর্গাপূজার সময় আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে আমাকে পুলিশ নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে কোনো নিরাপত্তা দেয়নি। আমার পিএস ১২ বার ফোন দিলেও তিনি (ওসি) ধরেননি। উনি বলেছেন, আমার নিরাপত্তা আমাকে ব্যবস্থা করতে হবে। আমি আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। এখন থেকে ১০ হাজার লোকজন নিয়েই চলব।’
ঘটনার বিষয়ে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, ‘সংসদ সদস্য মহোদয় এসেছিলেন। তিনি শত শত লোক নিয়ে থানার মধ্যে হইচই করে একটি অস্থিরতা তৈরি করে আমার কক্ষে। একটা বিব্রতকর অবস্থা।’
নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়ে ওসি বলেন, ‘আমরা পূজাকেন্দ্রিক সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা করেছি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য উনি গানম্যান চাইবেন। সেটা আলাদা বিষয়। একটা দল ওই সময় তাঁর সঙ্গে রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল।’
ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মব তৈরির অভিযোগ তুলে ওসি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের লোকজনকে গ্রেপ্তার না করার জন্য আমাকে সব সময় চাপ প্রয়োগ করেন তিনি (রুমিন ফারহানা)। আমি নোটডাউন করে রেখেছি। উনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে এখানে এসেছেন। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সব মিথ্যা।’
ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেছেন অটোরিকশাচালকরা। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে তারা মহাসড়কটি অবরোধ করেন।
অবরোধের কারণে এ মহাসড়ক দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে মহাসড়কের পাশাপাশি আশপাশের সড়কগুলোতেও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ওই এলাকায় যান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
অবরোধের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন এ পথে চলাচলকারী যাত্রীরা। তবে কী কারণে অটোরিকশাচালকেরা এ অবরোধ করেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নোয়াখালীর চাটখিলে ইতালি প্রবাসী মো.সোলায়মানকে হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা, নির্যাতন ও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে ফারুক, আজাদ ও শাহপরান নামে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তারা মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে পরিবারটি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের শংকুর গ্রামের নিজ বাড়িতে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সোলায়মানের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস অভিযোগ করেন, ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে তার স্বামীকে ২০২৩ সালে লিবিয়ায় আটকে রেখে স্থানীয় আজাদ. শাহপরানের যোগসাজশে লিবিয়ায় জিম্মি করে নির্যাতন চালায় মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য প্রবাসী ফারুকসহ তার সাঙ্গপাঙ্গরা। এ সময় কয়েক ধাপে তার কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ইতিমধ্যে আজাদ নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরে অন্য মাধ্যমে ইতালি গিয়ে গত মাসে দেশে ফেরেন সোলায়মান। দেশে ফেরার পর ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় উপজেলার খিলপাড়া বাজারের যুবরত্ন ক্লাবের সামনে তার ওপর অস্ত্রের মুখে হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় তার স্বামীর স্বর্ণের চেইন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং চাঁদা দাবি করা হয়। এরপর প্রাণভয়ে তার স্বামী দেশ ছেড়ে ইতালি চলে গেছেন। বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
এ সময় ভুক্তভোগী প্রবাসীর বোন মোবাশারা বেগম সোহাগী, কন্যা নাবিলা সুলতানা নোবা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাহপরানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
চাটখিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মোন্নাফ বলেন, প্রবাসীর ওপর হামলা, চাঁদা দাবি এবং ২০২৩ সালে বিদেশে আটকে রেখে টাকা আদায়ের ঘটনায় মানব পাচার আইনে মামলা নেওয়া হয়েছে। ওই মামলার আসামিদের মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চার আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিনে রয়েছেন। আরেক আসামি আত্মগোপনে রয়েছেন। তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলা আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের ৩১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদ পঞ্চগড় জেলা শাখার সভাপতি মো. বেনাজির হাবিব তপন মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক মো. আনছারুল ইসলাম (হিমু) স্বাক্ষরিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত কমিটিতে অ্যাডভোকেট আলহাজ মো. ফজলে রাব্বীকে আহ্বায়ক এবং মো. নওশাদ আলমগীরকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।
জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাজিউর রহমান দীপকের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিকে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন ও সম্মেলন আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া একই সময়ের মধ্যে পঞ্চগড় সদর উপজেলার অধীন ১০টি ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নবগঠিত কমিটির নেতৃবৃন্দকে সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করা এবং সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।
বাঁ থেকে নিহত পর্যটক রোহান, জিসান ও আকাশ। ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হওয়া নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী এসএম নাফিসুর রহমান নিবিড়ের (২৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে এই ঘটনায় পাঁচ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হলো।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে কলাতলী ভাঙার মোড় এলাকার সৈকত পয়েন্টে সাগরের জোয়ারের পানিতে মরদেহটি ভেসে আসে। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও সৈকতের উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা তা উদ্ধার করেন।
নিহত নাফিসুর রহমান নিবিড় রাজধানীর আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা থেকে আসা একদল পর্যটক হিমছড়ির পেঁচারদ্বীপ জাদুঘর সংলগ্ন সৈকত পয়েন্টে সাগরে গোসল করতে নামেন। এ সময় সাগরের উত্তাল ঢেউ ও প্রবল স্রোতের তোড়ে তারা ভেসে যান। ঘটনার দিনই তাৎক্ষণিকভাবে ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন উদ্ধারকারীরা। তবে সে সময় আরও দুই পর্যটক নিখোঁজ ছিলেন। পরবর্তীতে নিখোঁজদের মধ্যে হারুন নামের এক তরুণের মরদেহ বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিখোঁজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নিবিড়ের মরদেহ ভেসে উঠলে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত হয়।
কক্সবাজারের কলাতলী ও হিমছড়ি এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্তের জন্য তা উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতদের স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
বেলাভূমি ভিলা অ্যান্ড রিসোর্ট। ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিনড্রাইভ সড়কের পাশে উখিয়ার ইনানী সৈকতের প্রায় ৮০০ মিটার অংশ দখল করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে ‘বেলাভূমি ভিলা অ্যান্ড রিসোর্ট’-এর বিরুদ্ধে। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে চিহ্নিত সৈকতের এই অংশকে নিজেদের ‘প্রাইভেট বিচ’ বা ব্যক্তিগত সৈকত হিসেবে প্রচার করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বুধবার (২২ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, রিসোর্টটির সামনের বালিয়াড়ি থেকে সৈকতে যাওয়ার জন্য অতিথিদের সুবিধার্থে দুটি পথ তৈরি করেছে কর্তৃপক্ষ। সেখানে কয়েকটি মাছ ধরার ট্রলার সাজিয়ে জায়গাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাম্পান বিচ’।
প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে ‘আওয়ার প্রাইভেট বিচ, আওয়ার স্কেপ’ শিরোনামে ওই স্থানের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘জাস্ট মালিহা থিং’ নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার একটি প্রচারমূলক ভিডিওতে জায়গাটিকে বেলাভূমির ‘প্রাইভেট বিচ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ভিডিওটি রিসোর্টটির ফেসবুক পেজেও শেয়ার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুরুতে ওই স্থানে ‘স্যালমন রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি খাবারের দোকান চালু করা হয়। পরে এর পেছনে গড়ে তোলা হয় রিসোর্ট। গত দুই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, ‘প্রাইভেট বিচ’ পরিচয় দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বিচ ক্যাম্পিংয়ের নামে বালিয়াড়িতে তাবু স্থাপন করে ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, সৈকতের পরিবেশ নষ্ট করে সংকটাপন্ন এলাকাকে নিজেদের বলে চালিয়ে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ হাসান আল মারুফ বলেন, সৈকত কারও প্রাইভেট বিচ বা ব্যক্তিগত বলে প্রচার করার অর্থ হলো ভোক্তাসাধারণের সঙ্গে সুকৌশলে প্রতারণা করা। এমন বিভ্রান্তিকর প্রচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, মেরিনড্রাইভে যেসব অনুমোদনহীন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, সেগুলো ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সতর্কীকরণ নোটিশ পাঠানোসহ এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রম চলমান আছে।
সংস্থাটির কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আইন না মানায় গত এক বছরে কক্সবাজারের ৫৫টি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁকে মোট ১ কোটি ২৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৮ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, নিয়ম না মেনে ইসিএভুক্ত এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণ এবং সৈকত দখলে নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করার তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। আমরা এসব ক্ষেত্রে জরিমানা ও মামলা করে থাকি। বিধিলঙ্ঘন দেখলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
হলিডে ট্যুরিজম লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ‘বেলাভূমি ভিলা অ্যান্ড রিসোর্ট’। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আরিফুল ইসলাম আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি মাত্র কিছুদিন হলো এখানে যোগ দিয়েছি। আমাদের অতিথিদের কেউ কেউ সামনের সৈকতকে ভিডিওতে ‘প্রাইভেট বিচ’ বলেন। সেটি তাদের ব্যাপার।
রিসোর্টটির মালিকানা ও অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে এটি গড়ে তুলেছেন। অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।