নতুন মহাতারকা হালান্ড
তিনি দেখতে অনেকটা নর্স পুরাণের চরিত্র থরের মতো। আবার গোল করার পর অনেক সময় যোগাসনের ‘লোটাস পজিশনে’ বসে পড়েন, যেন হিন্দুদের শিবের ধ্যানমগ্ন রূপ।
তবে আরলিং ব্রট হালান্ড আসলে নিজের মতো করেই এক বিস্ময়কর চরিত্র। তার পরিসংখ্যান যেন রূপকথা বা পৌরাণিক কাহিনির মতো। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই নরওয়ের এই স্ট্রাইকার এমন গতিতে গোল করে চলেছেন যে, অনেকেই মনে করছেন তিনি একদিন ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে উঠতে পারেন।
হালান্ডের উত্থান ও অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান
গত দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের মতোই বিস্ফোরক আবির্ভাব ঘটে হালান্ডের। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ব্রাইনের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তার। পরের বছর মোল্ডের জার্সিতে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন।
এরপর অস্ট্রিয়ার ক্লাব সালজবুর্গে নিজের একমাত্র পূর্ণ মৌসুমে ২২ ম্যাচে করেন ২৮ গোল। ২০১৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে নরওয়ের হয়ে হন্ডুরাসকে ১২-০ গোলে বিধ্বস্ত করার ম্যাচে একাই করেন ৯ গোল- যা এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স।
এরপর জার্মানিতে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে গোলবন্যা বইয়ে দেন তিনি। আরবি লাইপজিগকে হারিয়ে ডিএফবি-পোকাল (লিগ কাপ) জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন। ডর্টমুন্ডের হয়ে ৮৯ ম্যাচে করেন ৮৬ গোল।
পরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন হালান্ড। প্রথম তিন মৌসুমেই ক্লাবটিকে এনে দেন দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এবং প্রথম উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি। সে সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো হন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
জাতীয় দলেও চলছে তার গোলঝড়। মাত্র ৮ ম্যাচে ১৬ গোল করে নরওয়েকে পৌঁছে দিয়েছেন ২০২৬ বিশ্বকাপে। আর এর ফলে প্রথম রাউন্ডেই দেখা যেতে পারে বহুল প্রতীক্ষিত হালান্ড বনাম কিলিয়ান এমবাপে দ্বৈরথ।
হালান্ডকে নিয়ে তারকাদের মন্তব্য
আরলিং হালান্ডকে নিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা বলেন,‘ওর সঙ্গে খেলা মানে দলে মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো থাকার মতো। ওর প্রভাব বিশাল। সে দলকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। মেসি আর রোনালদো ১৫ বছর ধরে এটা করেছে। হালান্ডও এখন সেই স্তরে।’
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি গ্যারি নেভিলের ভাষায়, ‘সে এক বিস্ময়। অবিশ্বাস্য। দৌড় শুরু করার বিস্ফোরণ, শক্তি- অনেকটা ব্রাজিলিয়ান রোনালদোর মতো। জিদান, ব্রাজিলিয়ান রোনালদো, পর্তুগিজ রোনালদো- সে কাতারেই আছে হালান্ড। সে অসাধারণ। মনে হয় যেন এক শরীরে চারজন খেলোয়াড়।’
নরওয়ের স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সোরলথ বলেন, ‘আপনি ভাববেন সবই দেখে ফেলেছেন; কিন্তু সে প্রতিদিন আরও উন্নতি করছে। এমন কিছু নেই যা সে পারে না। তার পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য।’
সংগীতশিল্পী ও ম্যানচেস্টার সিটি সমর্থক নোয়েল গ্যালাঘারের মন্তব্য, ‘হালান্ড এমন এক খেলোয়াড়, যে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একাই পুরো ডিফেন্স ভেঙে ফেলতে পারে। সে হতে পারে সব দানবেরও দানব।’
লিভারপুল কিংবদন্তি জেমি ক্যারাঘার বলেছেন, ‘আমার মনে হয় আমরা ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসের সেরা গোলস্কোরারকে দেখছি। গ্যারি লিনেকার, অ্যালান শিয়ারার, হ্যারি কেইন, ইয়ান রাশ- সবাইকে ভাবুন। কিন্তু হালান্ড যা করছে, আমরা আগে কখনও দেখিনি। সার্জিও আগুয়েরোর মতো কিংবদন্তির ক্লাবে খেলেও সে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের।’
হালান্ড সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য
২০০৬ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে লং জাম্পে ১.৬৩ মিটার লাফিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন হালান্ড। তার মা গ্রি মারিতা ব্রট ছিলেন নরওয়ের জাতীয় হেপ্টাথলেট চ্যাম্পিয়ন। কৈশোরে নরওয়ের জাতীয় হ্যান্ডবল দল থেকেও ডাক পেয়েছিলেন তিনি। শৈশবে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন স্প্যানিশ ফুটবলার মিচু, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে দেখে।
নরওয়ের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের সতীর্থ এরিক বথেইম ও এরিক টোবিয়াস স্যান্ডবার্গকে নিয়ে ‘ফ্লো কিংজ’ নামে একটি র্যাপ ব্যান্ডও করেছিলেন হালান্ড। তাদের গান ‘কিগো জো’ ইউটিউবে প্রায় দেড় কোটি ভিউ পেয়েছে।
২০২০ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেওয়ার পর সতীর্থদের সামনে বব মার্লের বিখ্যাত গান ‘থ্রি লিটল বার্ডস’ গেয়েছিলেন হালান্ড।
রেকর্ড ভাঙার আরেক নাম হালান্ড
ডর্টমুন্ডের হয়ে প্রথম ৫ গোল করতে তার সময় লেগেছিল মাত্র ৫৬ মিনিট।
৫০ বুন্দেসলিগা গোল করতে খেলেন মাত্র ৫০ ম্যাচ- যা আগের রেকর্ডধারী টিমো কোনিয়েটস্কার ৫৯ ম্যাচের রেকর্ড ভেঙে দেয়।
ম্যানচেস্টার সিটিতে প্রথম মৌসুমেই প্রিমিয়ার লিগে করেন ৩৬ গোল- এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড।
সবচেয়ে দ্রুত ৫০ ও ১০০ প্রিমিয়ার লিগ গোলের রেকর্ডও এখন তার দখলে। ৫০ গোল করতে খেলেন মাত্র ৪৮ ম্যাচ এবং ১০০ গোল করতে ১১১ ম্যাচ। আগের রেকর্ড ছিল যথাক্রমে অ্যান্ডি কোলের ৬৫ ও অ্যালান শিয়ারারের ১২৪ ম্যাচ।
৬০ মিটার স্প্রিন্ট তিনি দৌড়েছেন মাত্র ৬.৬২ সেকেন্ডে। তুলনায় নরওয়ের জাতীয় রেকর্ড ৬.৫৫ সেকেন্ড এবং বিশ্বরেকর্ড ৬.৩৪ সেকেন্ড।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৫০ গোল করতে তার লেগেছে মাত্র ৪৯ ম্যাচ। আগের দ্রুততম রেকর্ড ছিল রুড ফন নিস্টেলরয়ের- ৬২ ম্যাচ।
নরওয়ের হয়ে ৪৬ ম্যাচে করেছেন ৫০ গোল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫০ গোল করতে ৫০ ম্যাচের কম লাগা ইতিহাসের মাত্র ষষ্ঠ ফুটবলার তিনি।
২০২৫ সালে জাতীয় দলের হয়ে ৯ ম্যাচে ১৭ গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন হালান্ড।
বিশ্বকাপে নরওয়ের ইতিহাস
১৯৩৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় নরওয়ে। অভিষেকেই তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে গিয়েছিল তারা।এরপর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে দীর্ঘ ৫৬ বছর পর ফিরেছিল নরওয়ে। নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড ও পোল্যান্ডকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় তারা।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে একই পয়েন্ট ও গোল ব্যবধান নিয়ে গ্রুপ থেকে বিদায় নিতে হয় গোলসংখ্যায় পিছিয়ে থাকায়।
১৯৯৮ সালে আবারও বিশ্বকাপে চমক দেখায় নরওয়ে। ব্রাজিলকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ওঠে তারা। তবে ইতালির ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরির গোলে থেমে যায় তাদের যাত্রা।
২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের স্বপ্ন
২১ শতকে এই প্রথম বিশ্বকাপে ফিরছে নরওয়ে। তবে অনেকেই তাদের ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখছেন। বাছাইপর্বে ইতালিকে হোম ও অ্যাওয়ে- দুই ম্যাচেই হারিয়েছে তারা। জিতেছে ৮ ম্যাচের সবগুলো। করেছে ৩৭ গোল, হজম করেছে মাত্র ৫টি।
স্টালে সোলব্যাকেনের দলে শুধু হালান্ডই নন, আছেন আর্সেনালের মার্টিন ওডেগার্ড, লাইপজিগের তরুণ উইঙ্গার আন্তোনিও নুসা, ফুলহ্যামের সান্দের বের্গে, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের আলেকজান্ডার সোরলথ এবং ক্রিস্টাল প্যালেসের ইয়ুর্গেন স্ট্রান্ড লারসেনের মতো তারকারাও।
যদিও তাদের গ্রুপে আছে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল, শক্তিশালী ফ্রান্স এবং এশিয়ার দেশ ইরাক। তবে হালান্ডের ভাষায়, ‘নরওয়ে কোনো দলকেই ভয় পায় না।’
কাজী সালাউদ্দিন
সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) কংগ্রেসে আবারও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন কাজী সালাউদ্দিন। বাংলাদেশের এই কিংবদন্তি ফুটবলার ২০০৯ সাল থেকে সংস্থাটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কংগ্রেস শনিবার ভুটানের থিম্পুতে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই সালাউদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
সাফের গঠনতন্ত্রে ৭০ বছরের বেশি কেউ কমিটিতে থাকতে পারবে না, এ রকম ধারা ছিল। তবে, গত বছর গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এগুলো প্রত্যাহার করা হয়। তখন, অনেকটাই নিশ্চিত ছিল সালাউদ্দিন আবার সভাপতি হচ্ছেন।
এদিনই আসছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ড্র অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৪ নভেম্বর ঢাকায় আসর শুরু হয়ে ১৭ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো
বিশ্বজুড়ে ফুটবল কর্মকর্তাদের তীব্র বিরোধিতার মুখে বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। আজ ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এ পরিকল্পনা বাতিলের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেন।
বিবৃতিতে ইনফান্তিনো বলেন, ‘ফুটবলকে ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত করার লক্ষ্য আমাদের সব সময়ই ছিল এবং থাকবে। যার ফলে এ প্রস্তাব আর সামনে এগোবে না।’
গত মঙ্গলবার ফিফা এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। প্রস্তাবিত ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামের বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গঠন করে এতে বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানের মূল্য আনুমানিক ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার ধরে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার তোলার পরিকল্পনা করেছিল ফিফা। সংস্থাটির মূল কাজ হতো বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্ট পরিচালনা করা।
ফিফা জানিয়েছিল, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে তাদের ২১১টি সদস্যদেশ এককালীন ২ কোটি ডলার করে পাবে। পাশাপাশি ২০২৭-২০৩০ মেয়াদের বরাদ্দ ৮০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
কিন্তু এফএফইতে ক্ষুদ্র পরিসরেও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার দেওয়ার প্রস্তাবটি শুরুর দিন থেকেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা সাফ জানিয়ে দেয়, ‘এ প্রস্তাব বহাল থাকা পর্যন্ত’ তাদের কোনো জাতীয় দল ফিফার কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নেবে না। পরবর্তী সময়ে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনফেডারেশনও (কনক্যাকাফ) এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
এক বিবৃতিতে উয়েফার পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘বিশ্বকাপকে কেবল কোনো বাণিজ্যিক বিনিয়োগ পণ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর কোনো অংশই কখনো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।’
গতকাল শুক্রবার ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়। এ পরিকল্পনাকে ‘ফিফা, ফুটবল এবং দীর্ঘমেয়াদে ফুটবল খেলার ভবিষ্যতের জন্য খারাপ প্রস্তাব’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবলের সভাপতি আলেহান্দ্রো ডমিনগুয়েজকে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে করা হয়। তিনিও এ প্রকল্পের পরিধি, কাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দাবি করেন।
পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণায় গভীর রাতে দেওয়া বিবৃতিতে ইনফান্তিনো বলেন, সদস্যদেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতেই এটি ভাবা হয়েছিল এবং সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থন পেলেই শুধু এটি কার্যকর হতো।
ইনফান্তিনো আরও বলেন, ‘সবার মতামত গুরুত্বের সঙ্গে শোনার পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে প্রস্তাবটি এমন বিভাজন তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে মেলে না।’
এএফসিও ( ৪৭টি সদস্যদেশ) উয়েফা ও কনক্যাকাফের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে। সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এমন একটি পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে যে ফিফা বিশ্বকাপ বয়কটের মতো বাস্তব বিষয় জনসমক্ষে আলোচনায় এসেছে। যাঁরা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই এতে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।’
‘ভুল ব্যক্তি’
গতকাল শুক্রবার সকালের বিবৃতিতে ফিফা দাবি করেছিল, সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না’। তবু ফিফার ওপর থেকে চাপ কমেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন উয়েফাকে ধন্যবাদ জানানোর এক দিন পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন, ইনফান্তিনো ফিফা পরিচালনার জন্য ‘ভুল ব্যক্তি’।
চাপের মুখে থাকা ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, তিনি এখন সব পক্ষকে নিয়ে ঐক্যে জোর দেবেন এবং ফুটবলের প্রসার ঘটাবেন।
বিবৃতিতে ইনফান্তিনো বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে ফুটবল–সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আবার এক টেবিলে আনাই আমার মূল লক্ষ্য। সবার যৌথ স্বার্থ রক্ষা করে এবং বিশেষ করে যাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য প্রয়োজন, সেই দেশগুলোতে ফুটবলের উন্নয়ন সাধন করে আমরা এগিয়ে যাব।’
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বকাপের মতো ফুটবল মহাযজ্ঞের মালিকানা বেসরকারি পুঁজির হাতে তুলে দেওয়ার এক বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে উত্তাল বিশ্ব ফুটবল। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ফিফার এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠেছে চারদিকে। ফুটবলপ্রেমী ও বিভিন্ন দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তোপের মুখে পড়ে অবশেষে জল মাপতে শুরু করেছে ফিফা।
আজ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সংস্থাটি জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তারা আপাতত আলোচনা ও পরামর্শের পথ খোলা রাখছে। তবে ফিফা স্বস্তিতে নেই একেবারেই। প্রস্তাবটির কড়া জবাব দিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক উয়েফা। বিবিসির প্রতিবেদন।
তাদের অধীন ৫৫টি দেশ একজোটে ভোট দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই পরিকল্পনা না গুটালে তারা সরাসরি বিশ্বকাপই বর্জন করবে! কম যায়নি উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও। তাদের ৪১টি সদস্য দেশ একবাক্যে এই প্রস্তাবকে ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছে।
চারদিক থেকে ধেয়ে আসা চাপের মুখে তড়িঘড়ি ব্যাখ্যা দিতে নেমেছে জুরিখে অবস্থিত ফিফা সদর দপ্তর। বিবৃতিতে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে উল্টো দায় চাপানো হয়েছে সংবাদমাধ্যমের ওপর। ফিফার দাবি, ‘মিডিয়ার ভুলভাল তথ্যের কারণে আমাদের পূর্বপরিকল্পিত আলোচনায় বিঘ্ন ঘটেছে। তবে সব সদস্য দেশ যেন সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের রায় দিতে পারে, সে জন্য উন্মুক্ত আলোচনা চালু রাখা হবে।’
একই সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সাফ করতে ফিফার দাবি, ‘ফুটবল বিক্রি করে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই আমাদের নেই। এমন চিন্তাকে ফিফা কখনো আমলেই নেয় না।’
গোপন পরিকল্পনাটি আসলে কী? জানা গেছে, বিশ্বকাপসহ নিজেদের বড় টুর্নামেন্টগুলো পরিচালনার জন্য ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি আলাদা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খুলতে চায় ইনফান্তিনো প্রশাসন।
আর সেই নতুন কোম্পানির শেয়ারই তুলে দেওয়া হবে বিভিন্ন বেসরকারি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে। তবে চাল চাললেও তা মেলাতে বেগ পেতে হচ্ছে ফিফা বসকে। প্রস্তাবটি পাস করাতে হলে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত ১০৬টির সমর্থন বা ভোট লাগবে। অথচ এরই মধ্যে উয়েফা ও কনকাকাফ মিলিয়ে একজোটে ৯৬টি দেশ আড়াআড়ি বাধা দিয়ে রেখেছে। ফলে ইনফান্তিনোর এই বাণিজ্যিক কার্ড খেলা শুরুতেই আটকে যাওয়ার পথে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফিফা এখন ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করছে। তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা সবার উদ্বেগ ও মতামতকে শ্রদ্ধা জানাই। একটি গণতান্ত্রিক আলোচনার জন্য আমাদের দরজা খোলাই আছে। মূলত সব অঞ্চলের ফুটবলে বাণিজ্যিক সুফল পৌঁছে দিতেই এফএফই গঠনের এই চিন্তা। এতে ফুটবলের মূল চেতনা বা পরিচালনায় কোনো আঘাত আসবে না।’
বিশ্বকাপের ১২ আয়োজক শহর চূড়ান্ত
নেইমার
ঠিক ১৬ বছর আগে ব্রাজিলের জার্সিতে এক তরুণ ফুটবলারের অভিষেক হয়। ২০১০ সালের ১০ আগস্ট নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ড স্টেডিয়ামে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রীতি ফুটবল ম্যাচে ১১ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছিলেন নেইমার। ১৮ বছরের সেই তরুণ সময়ের সঙ্গে নিজেকে নিয়ে নেন অনন্য উচ্চতায়। হলুদ জার্সিতে নানান গল্প লিখে হয়েছেন দেশটির হয়ে সর্বোচ্চ গোলস্কোরার।
১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল করা নেইমার বুধবার জানিয়ে দিয়েছেন, আর কখনও ব্রাজিলের জার্সি গায়ে জড়াবেন না। নিউইয়র্কের যে মাঠে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল, বিশ্বকাপ ফুটবলে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি একই মাঠে তাঁর শেষ। অর্থাৎ শুরু আর শেষের গল্প একই। মাঝে ফুটবলে এমন কিছু করেছেন নেইমার, যা ফুটবলভক্তদের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে। বিশ্ব ফুটবলে দ্যুতি ছড়ানো এই মহাতারকার নামের পাশে নেই ব্যালন ডি’অর, নেই বিশ্বকাপ, নেই কোপা আমেরিকা। ব্রাজিলের জার্সিতে শুধু জিতেছেন ২০১৩ সালে ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ।
অবসরের ইঙ্গিতটা বিশ্বকাপের সময়ই দিয়েছিলেন নেইমার। শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে পরাজয়ের পর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হয়ে বুট জোড়া তুলে রাখার কথা বলেছিলেন তিনি। গতকাল ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালের বিপক্ষে সান্তোসের ৪-২ গোলে জয়ের পর নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে ৩৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড অবসরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে আমার সময় শেষ। আমি ইতিহাস তৈরি করেছি। খুব সুখী ছিলাম। আমার রক্ত ও জীবন দিয়েছি, হলুদ জার্সির জন্য সব সময় লড়াই করেছি; কিন্তু এখন আর আমি এটা চাই না।’ এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্রাজিলীয় ফুটবলের একটি যুগের অবসান ঘটল এবং দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন থেকে তাঁর শৈশবের ক্লাব সান্তোসেই পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছেন।
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে করেছেন ৮০টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৫৮টি গোল। পরিসংখ্যানের পাশাপাশি ব্রাজিলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন তিনি। ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা, গতি ও গোল করার দক্ষতায় এক দশকের বেশি সময় ধরে সেলেসাওদের আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে জিতেছিলেন স্বর্ণপদক।
নিজ ক্লাব সান্তোসেও খুব একটা ভালো নেই নেইমার। ক্লাবের জুনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর বিবাদের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নেইমার দলের তরুণ খেলোয়াড়দের মানের সমালোচনা করেছেন এবং এমনকি বলেছেন, আগামী মৌসুমে তাদের দ্বিতীয় বিভাগে খেলতে হবে।
তবে এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড দাবি করেন, বিভাজন তৈরি করার জন্য একটি ‘কুচক্রী’ মহল এই মিথ্যা কাহিনি বানিয়েছে, ‘বিষয়টি দুঃখজনক এবং বিরক্তিকর। তবে এতে আমার কোনো দোষ নেই। এ ধরনের খবর অনেকের কাছেই পৌঁছে যায়। ম্যাচের পর আমি কথা বলেছিলাম, আরও ভালো পারফরম্যান্সের দাবি জানিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম যে আমরা এতটা গাফিলতি মেনে নিতে পারি না। চ্যাপেকোয়েনসের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, এভাবে ড্র উপহার দেওয়া যায় না। আমি শুধু এতটুকুই বলেছিলাম।’
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসছে স্পেন। অন্যদিকে ফাইনাল শেষে মাঠে ঘটে যাওয়া উত্তেজনাকর ঘটনার কারণে নতুন করে চাপে পড়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ-পরবর্তী সংঘর্ষের জেরে আর্জেন্টিনার চার খেলোয়াড়-কর্মকর্তাসহ স্পেনের এক ফুটবলারের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনেছে ফিফা। এখন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না, সেটিই দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষই চলে আসে আলোচনার কেন্দ্রে । ঘটনার পর তদন্ত শেষে কয়েকজন খেলোয়াড় ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে ফিফা।
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের বিরুদ্ধে ফিফার শৃঙ্খলা বিধির ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের ১(আই) ধারায় তিনটি হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিফেন্ডার নাহুয়েল মোলিনার বিরুদ্ধে রয়েছে দুটি হামলার অভিযোগ, এর একটি পরিপূর্ণ হামলা এবং অন্যটি হামলার চেষ্টা। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও আনা হয়েছে।
আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালার বিরুদ্ধে একটি হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। বদলি বেঞ্চে থাকা থিয়াগো আলমাদার বিরুদ্ধে অভিযোগ অসৌজন্যমূলক আচরণের। একই ধরনের অভিযোগের মুখে পড়েছেন স্পেনের মিডফিল্ডার গাভিও।
ফিফা জানিয়েছে, শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য পর্যালোচনার পর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
এর আগে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনাল জয়ের পরও বিতর্কে জড়ায় আর্জেন্টিনা। উদযাপনের সময় কয়েকজন খেলোয়াড় ‘Las Malvinas son Argentinas’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন। আর্জেন্টিনায় মালভিনাস নামে পরিচিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকায় ঘটনাটি রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি করে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ১৮৩৩ সাল থেকে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৮২ সালে দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়, যাতে ৯০০–এর বেশি মানুষ নিহত হন।
ব্যানার প্রদর্শনের পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মুখপাত্র বলেন, ‘বিশ্বকাপ হয়তো আমাদের নয়, কিন্তু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ অবশ্যই আমাদের।’ অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের ফিফা টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের সমর্থন জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে।
ফাইনালের ঘটনার পর স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও আর্জেন্টিনার আচরণের সমালোচনা করে বলেন, ‘এত বড় মাপের ফুটবলারদের কাছ থেকে এমন আচরণ আশা করা যায় না। এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’