ছবি: সংগৃহীত।
চলতি বছরের হজযাত্রীদের ভিসার আবেদন শুরু হবে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি, যা করা যাবে ২০ মার্চ পর্যন্ত। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ২৯ জানুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের হজের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় মাধ্যমে নিবন্ধনকারী সব যাত্রীর সরকারি হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সৌদি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা নেওয়া সম্পন্ন করে ফিটনেস সনদ নিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ মার্চের মধ্যে সৌদি নুসুক মাসার ব্যবস্থায় ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে নিবন্ধিত প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সব হজযাত্রীকে বাংলাদেশের যে কোনো সরকারি হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নির্ধারিত টিকাকেন্দ্র থেকে টিকা নিয়ে ফিটনেস সনদ গ্রহণ এবং ২০ মার্চের মধ্যে ভিসার আবেদন করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
এ বছর ফিটনেস সনদ ছাড়া কোনো হজযাত্রী হজে যেতে পারবেন না বলেও ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।
সৌদি আরবে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৬ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে চলতি বছরের হজ ফ্লাইট।
ছবি : সংগৃহীত
সারাদিন কাজ আর কাজের চিন্তায় আমরা সব শক্তি শেষ করে ফেলি। দিনশেষে যখন ইবাদত করার সময় আসে, তখন শরীর আর সায় দিতে চায় না। মনে হয়, ইবাদতও বুঝি সারাদিনের কাজের তালিকার আরও একটা দায়িত্ব।
তাই আমরা চেষ্টা করি যত দ্রুত সম্ভব নামাজটা পড়ে শেষ করে দায়মুক্ত হতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নামাজ আর ইবাদত কি সত্যিই আমাদের জন্য কোনো বোঝা? নাকি আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে শান্তির সবচেয়ে বড় জায়গা এটিই হতে পারত?
আসুন, নতুন করে ৫টি উপায় চর্চা করি, যা ইবাদতের স্বাদ ফিরিয়ে দেবে।
১. ভাবনাটা একটু বদলে নেওয়া দরকার
কেন আমাদের কাছে ইবাদত অনেক সময় কঠিন মনে হয়? কাজের ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়ার জন্য আমরা যতখানি মনোযোগ দিই, ইবাদতের বেলায় অতখানি দিতে পারি না। কেন এমন হয়? কারণ সংসারের কাজের ফল আমরা সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পাই, আর ইবাদতের সুফল বা মানসিক শান্তিটা আমরা চট করে চোখে দেখতে পাই না।
তাই প্রথমেই আমাদের চিন্তাভাবনাটা একটু বদলে ফেলতে হবে। নামাজ কেন পড়ি? কেবল হুকুম মানার জন্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই মহান আল্লাহ এটি দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, নামাজ মানুষকে অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, দিন ও রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করো, নিশ্চয়ই ভালো কাজ খারাপ কাজকে দূর করে দেয়। (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৪)
দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আসলে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা কেন এই পৃথিবীতে এসেছি। মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য। (সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)
এই সহজ কথাটা মনে লালন করতে পারলে নামাজকে আর কোনো কঠিন দায়িত্ব মনে হবে না। সারাদিনের বিশৃঙ্খলা ও মানসিক চাপের মধ্যে নামাজ আমাদের মনকে এনে দেবে অদ্ভুত এক শান্তি ও স্থৈর্য। তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোকেই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা বলে মনে করবে।
২. মনকে এক জায়গায় আনা
আমাদের জীবনটা এখন এমন হয়ে গেছে যে, আমাদের মন কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকে না। মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, নানা চিন্তা—সব মিলিয়ে মন অলস বসে থাকার সুযোগ পায় না।
এমনকি যখন আমরা নামাজে দাঁড়াই, তখনও মাথার ভেতরে সংসারের নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। ফলে রুকু-সেজদা তো আমরা করি ঠিকই, কিন্তু অন্তরে আল্লাহর সঙ্গে সেই গভীর যোগাযোগটা তৈরি হয় না।
এই যান্ত্রিকতা দূর করার সহজ উপায় হলো সেজদা। সেজদাই হলো মানুষের জন্য তার স্রষ্টার সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার সময়। রাসুল (সা.) বলেছেন, বান্দা সেজদার অবস্থাতেই তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছায়, তাই তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া কোরো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)
তাই নামাজে সেজদার সময় তাড়াহুড়ো না করে কিছুটা বেশি সময় থাকুন। নিজের মনের সব কথা ও অনুভূতি নীরব ভাষায় আল্লাহর কাছে খুলে বলুন। সেজদার এই কয়েকটা মুহূর্তই আপনার নামাজকে একটি নিয়মমাফিক অভ্যাসের বদলে হৃদয়ের সুগভীর ভালোবাসায় বদলে দেবে।
৩. সংসারের দায়িত্বও তো ইবাদত
ইবাদতকে গুরুত্ব দেওয়ার মানে কিন্তু এই নয় যে আপনি সংসারের কাজ বা অন্যান্য দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। ইসলাম আমাদের কাজ ফেলে ঘরকুনো হয়ে বসে থাকতে বলে না। পরিবার, সন্তান, মা-বাবা কিংবা সহকর্মীদের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।
সত্যি বলতে কি, সঠিক নিয়তে পরিবারের যত্ন নেওয়া বা নিজের দায়িত্ব পালন করাও এক ধরনের ইবাদত। মহানবী (সা.) বলেছেন, একজন মুমিন যা ভালো কাজ করে এবং পরিবারের জন্য যে খরচ করে, সেটাও তার জন্য সদকা বা ইবাদত হিসেবে লেখা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫)
কাজের পাশাপাশি যদি অন্তরে এই চিন্তা থাকে যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাজগুলো করছি, তবে আপনার পুরো দিনটাই ইবাদতে পরিণত হবে। প্রতিদিন সকালে কাজের শুরুতেই মনে মনে আল্লাহকে স্মরণের নিয়ত করে নিন।
কাজের চাপে মন যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন আবার নতুন করে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন। ইবাদত জীবন থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং সুন্দর জীবনযাপনেরই পথ।
৪. নিজের সাধ্য জানা ও মধ্যপন্থা
আত্মিক উন্নতির পথে আরেকটি বড় বাধা হলো নিজের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করতে যাওয়া। ধর্মের ক্ষেত্রে সবার ক্ষমতা সমান নয়। ইসলাম মানুষের ওপর অসাধ্য কিছু চাপিয়ে দেয় না। যেমন, কারও যদি নফল রোজা রাখা সহজ মনে হয়, তবে তিনি রোজা রাখতে পারেন।
কিন্তু যদি রোজা রাখলে শরীর বেশি খারাপ হয়ে যায় বা দৈনন্দিন কাজে বড় ব্যাঘাত ঘটে, তবে নিজেকে জোর না করে অন্য কোনো আমল বেছে নেওয়া উচিত।
আপনি সাধ্যমতো দান-সদকা করতে পারেন, রাতে একটু তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন কিংবা আল্লাহর রাসুলের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে পারেন।
মহানবী (সা.) ইবাদতের ব্যাপারে সবসময় সহজ পথ ও মধ্যপন্থা বেছে নিতে বলেছেন। তিনি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি ধর্মের ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা করে, ধর্ম তার ওপর বিজয়ী হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯)
তাই নিজের শরীর ও মনকে জানুন। আপনার জন্য যে আমলটি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়, সেটির মাধ্যমেই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. কারো তুলনা নয়, নিজের উন্নয়ন
ইবাদতকে দীর্ঘস্থায়ী ও আনন্দময় রাখার শেষ উপায় হলো, নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা না করা। কে কত বেশি নামাজ পড়ছে বা কে কতটা ইবাদত করছে, তা দেখে নিজের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করা ঠিক নয়। প্রত্যেকের পরিস্থিতি ও শক্তি আলাদা।
অন্যের দেখাদেখি হঠাৎ এমন কোনো কঠিন কাজ শুরু করা উচিত নয়, যা পরে ধরে রাখা যায় না। বরং নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে আজকের অবস্থার তুলনা করুন।
যেমন—আপনি যদি এখন প্রতিদিন কোরআনের একটি পৃষ্ঠা পড়েন, তবে আস্তে আস্তে তা বাড়িয়ে দুটি পৃষ্ঠা করার চেষ্টা করুন। সেই নিয়মটি নিজের অভ্যাসে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত সেটুকুই ধরে রাখুন।
ইসলামে খুব বেশি আমল একবারে করার চেয়ে নিয়মিত ছোট ছোট আমল করাকে বেশি পছন্দ করা হয়েছে। নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি উত্তরে বললেন, যে আমল নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)
সাধ্যের বেশি করতে গেলে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সব আমল একবারে ছেড়ে দেয়। তাই নিজেকে সময় দিন এবং অল্প হলেও নিয়মিত ইবাদত চালিয়ে যান।
পরিশেষে বলা যায়, ইবাদত কোনো যান্ত্রিক শারীরিক অভ্যাস নয়, এটি হলো স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার এক মধুর আত্মিক সম্পর্ক। ক্লান্তি আর ব্যস্ততায় ভরা জীবনে ইবাদতকে যদি একটু বিরতি ও শান্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে তা আমাদের মন ও জীবনের গতি পুরোটাই বদলে দেবে।
দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ, কিন্তু সেটাকে বছরের পর বছর সুন্দর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য লাগে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ আর একটু প্রজ্ঞা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের অভিমান আর রাগ সংযত করতে হয়।
একজন স্বামীর ভূমিকা তখন হয়ে ওঠে কৌশলী আর স্নেহশীল একজন অভিভাবকের মতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে, কখনো কখনো তা গড়ায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত।
অথচ কিছু সহজ, প্রতিদিনের অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা আর বিশ্বাস অনেক গভীর হয়ে ওঠে। স্ত্রীর ভুল হলে অপমান নয়, ভালোবাসা দিয়েই তা সংশোধন করা উচিত। তাঁকে অনুভব করাতে হয় যে পৃথিবীতে আপনিই তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষ।
১. নিজের যত্ন নেওয়া, তাঁর যত্ন নেওয়া
স্ত্রীর সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকাটা ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব গভীর। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) নিজে এ অভ্যাসের কথা বলেছেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)
স্ত্রী যেভাবে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকার চেষ্টাটা আসলে সম্মানেরই একটা প্রকাশ।
পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও এ যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর এখানে কার্পণ্য না করাই ভালো।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)
ঘরের কাজে সুযোগ পেলে সহযোগিতা করা আর ছোট ছোট ভালো কাজেরও আন্তরিক প্রশংসা করা—এসবও একই সুতোয় গাঁথা। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)
এমনকি খাদিজার মৃত্যুর পরও নতুন স্ত্রীর সামনেই প্রশংসা করতেন। প্রশংসা কখনো পুরোনো সম্পর্ককে খাটো করে না; বরং ভালোবাসা বাড়ায়।
২. সম্মান কখনো হারাতে দেওয়া যাবে না
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতেই পারে। প্রয়োজনে কিছু সময় দূরে থাকা যায়, বিছানা আলাদা করা যায়, কিন্তু গায়ে হাত তোলা কখনোই নয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
এ সতর্কতা এতটাই স্পষ্ট যে এখানে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
সম্মান রক্ষার আরও কিছু দিক আছে, যেগুলো চোখে কম পড়ে, কিন্তু প্রভাব ফেলে গভীরভাবে। খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, স্ত্রীর মা–বাবাকে নিয়ে কটূক্তি—এসব সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য; যৌতুকের দাবি বা ইঙ্গিতও তা-ই।
স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করাটাও একধরনের অসম্মান। তাঁকে বরং অনুভব করানো উচিত যে তিনি অনন্য, প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। তাঁর ভুল সবার সামনে প্রকাশ না করে আড়ালে ভালোবাসার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করাই ভালো, আর পুরোনো ভুল বারবার মনে করিয়ে দেওয়াও একধরনের নিষ্ঠুরতা।
ক্ষমা করতে শেখা আর সামনে এগিয়ে চলাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।
৩. সময় দেওয়া: নবীজি যা মনে রাখতেন
দাম্পত্য জীবনে হালকা, খেলাচ্ছলে সময় কাটানোকে অনেকে গুরুত্বহীন মনে করেন, অথচ নবীজির নিজের জীবনেই এর স্পষ্ট নজির আছে।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক সফরে নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা জিতে যান। বছর কয়েক পর, যখন আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেছে, আবার প্রতিযোগিতা হলো, এবার নবীজি (সা.) জিতলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)
এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, স্ত্রীর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল।
এ বিষয়ে নবীজি (সা.) একটা সাধারণ নীতিও বলে দিয়েছে, মানুষের অধিকাংশ বিনোদনমূলক কাজই অর্থহীন, তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)
অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে হালকা সময় কাটানোকে ইসলাম নিছক অপচয় নয়; বরং সময়োপযোগী ও অর্থবহ কাজ হিসেবে দেখে।
এর আলোকেই প্রতিদিন কিছুটা সময় মন খুলে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, একটু হাঁটা, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসব ছোট অভ্যাসকে বাড়তি বিলাসিতা না ভেবে বরং সুন্নাহরই একটা অংশ হিসেবে দেখা যায়।
নতুন দাম্পত্যে স্ত্রীকে একা না রেখে সান্নিধ্যে রাখা, আবার তাঁকে মাঝেমধ্যে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া—দুটোই এই একই নীতির বাস্তব প্রয়োগ: সম্পর্কটাকে জীবন্ত রাখা।
৪. রাগের মুহূর্তই আসলে পরীক্ষা
ওপরের প্রতিটি অভ্যাসের আসল পরীক্ষা হয় রাগের মুহূর্তে। নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
দাম্পত্য জীবনের ঝগড়া-বিবাদে এ নীতিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে—রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সারা জীবনের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেখানে একটু থেমে শান্ত হওয়াটাই বড় শক্তির পরিচয়।
সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা আর আল্লাহভীতির ওপর। অভিমান, রাগ, অহংকার আর অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথি হওয়ার চেষ্টাই আসল কাজ।
সুন্দর সংসার হঠাৎ তৈরি হয় না, এটা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরপুর দাম্পত্য জীবন দান করুন।
ছবি : সংগৃহীত
দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ, কিন্তু সেটাকে বছরের পর বছর সুন্দর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য লাগে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ আর একটু প্রজ্ঞা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের অভিমান আর রাগ সংযত করতে হয়।
একজন স্বামীর ভূমিকা তখন হয়ে ওঠে কৌশলী আর স্নেহশীল একজন অভিভাবকের মতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে, কখনো কখনো তা গড়ায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত।
অথচ কিছু সহজ, প্রতিদিনের অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা আর বিশ্বাস অনেক গভীর হয়ে ওঠে। স্ত্রীর ভুল হলে অপমান নয়, ভালোবাসা দিয়েই তা সংশোধন করা উচিত। তাঁকে অনুভব করাতে হয় যে পৃথিবীতে আপনিই তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষ।
১. নিজের যত্ন নেওয়া, তাঁর যত্ন নেওয়া
স্ত্রীর সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকাটা ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব গভীর। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) নিজে এ অভ্যাসের কথা বলেছেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)
স্ত্রী যেভাবে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকার চেষ্টাটা আসলে সম্মানেরই একটা প্রকাশ।
পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাও এ যত্নেরই অংশ। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আয়োজন করা যায়, আর এখানে কার্পণ্য না করাই ভালো।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)
ঘরের কাজে সুযোগ পেলে সহযোগিতা করা আর ছোট ছোট ভালো কাজেরও আন্তরিক প্রশংসা করা—এসবও একই সুতোয় গাঁথা। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)
এমনকি খাদিজার মৃত্যুর পরও নতুন স্ত্রীর সামনেই প্রশংসা করতেন। প্রশংসা কখনো পুরোনো সম্পর্ককে খাটো করে না; বরং ভালোবাসা বাড়ায়।
২. সম্মান কখনো হারাতে দেওয়া যাবে না
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতেই পারে। প্রয়োজনে কিছু সময় দূরে থাকা যায়, বিছানা আলাদা করা যায়, কিন্তু গায়ে হাত তোলা কখনোই নয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)
এ সতর্কতা এতটাই স্পষ্ট যে এখানে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
সম্মান রক্ষার আরও কিছু দিক আছে, যেগুলো চোখে কম পড়ে, কিন্তু প্রভাব ফেলে গভীরভাবে। খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, স্ত্রীর মা–বাবাকে নিয়ে কটূক্তি—এসব সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য; যৌতুকের দাবি বা ইঙ্গিতও তা-ই।
স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করাটাও একধরনের অসম্মান। তাঁকে বরং অনুভব করানো উচিত যে তিনি অনন্য, প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। তাঁর ভুল সবার সামনে প্রকাশ না করে আড়ালে ভালোবাসার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করাই ভালো, আর পুরোনো ভুল বারবার মনে করিয়ে দেওয়াও একধরনের নিষ্ঠুরতা।
ক্ষমা করতে শেখা আর সামনে এগিয়ে চলাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।
৩. সময় দেওয়া: নবীজি যা মনে রাখতেন
দাম্পত্য জীবনে হালকা, খেলাচ্ছলে সময় কাটানোকে অনেকে গুরুত্বহীন মনে করেন, অথচ নবীজির নিজের জীবনেই এর স্পষ্ট নজির আছে।
আয়েশা (রা.) বলেন, এক সফরে নবীজি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার আয়েশা জিতে যান। বছর কয়েক পর, যখন আয়েশার শরীর কিছুটা ভারী হয়ে গেছে, আবার প্রতিযোগিতা হলো, এবার নবীজি (সা.) জিতলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)
এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, স্ত্রীর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল।
এ বিষয়ে নবীজি (সা.) একটা সাধারণ নীতিও বলে দিয়েছে, মানুষের অধিকাংশ বিনোদনমূলক কাজই অর্থহীন, তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)
অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে হালকা সময় কাটানোকে ইসলাম নিছক অপচয় নয়; বরং সময়োপযোগী ও অর্থবহ কাজ হিসেবে দেখে।
এর আলোকেই প্রতিদিন কিছুটা সময় মন খুলে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, একটু হাঁটা, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—এসব ছোট অভ্যাসকে বাড়তি বিলাসিতা না ভেবে বরং সুন্নাহরই একটা অংশ হিসেবে দেখা যায়।
নতুন দাম্পত্যে স্ত্রীকে একা না রেখে সান্নিধ্যে রাখা, আবার তাঁকে মাঝেমধ্যে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া—দুটোই এই একই নীতির বাস্তব প্রয়োগ: সম্পর্কটাকে জীবন্ত রাখা।
৪. রাগের মুহূর্তই আসলে পরীক্ষা
ওপরের প্রতিটি অভ্যাসের আসল পরীক্ষা হয় রাগের মুহূর্তে। নবীজি (সা.) শক্তির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন এ প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
দাম্পত্য জীবনের ঝগড়া-বিবাদে এ নীতিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে—রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সারা জীবনের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেখানে একটু থেমে শান্ত হওয়াটাই বড় শক্তির পরিচয়।
সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা আর আল্লাহভীতির ওপর। অভিমান, রাগ, অহংকার আর অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথি হওয়ার চেষ্টাই আসল কাজ।
সুন্দর সংসার হঠাৎ তৈরি হয় না, এটা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, ত্যাগ আর আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ–তাআলা আমাদের সবাইকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরপুর দাম্পত্য জীবন দান করুন।
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ আগামী বছরের পবিত্র হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেন
বিমান ভাড়া কমিয়ে ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ এ ঘোষণা দেন।
তিনি জানান, এবার (২০২৭) সরকারি মাধ্যমে দুটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হজ প্যাকেজ-১-এর খরচ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ টাকা এবং হজ প্যাকেজ-২-এর খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা।
অন্যদিকে ‘বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ’ নামে একটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা যাবে। তবে সরকার ঘোষিত হজ প্যাকেজ-২ এ উল্লিখিত সেবা-সুবিধা কমিয়ে কোনো প্যাকেজ ঘোষণা করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
ধর্মমন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে এবার হজ ফ্লাইটের বিমানভাড়া গত বছরের তুলনায় ২৪ হাজার ৮৩০ টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যক্তিত্বহীন মানুষের কোনো মর্যাদা নেই।মানুষমাত্রই সমাজে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হতে চায়। এর জন্য প্রয়োজন এমন নীতি-অভ্যাস যা তাকে ব্যক্তিত্বের আসনে উন্নীত করবে। কারণ পোশাক-পরিচ্ছদ, সহায়-সম্পদ বা বাহ্যিক সৌন্দর্য ব্যক্তিত্বের মানদণ্ড নয়, বরং এটি ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ের নাম। সুতরাং যেসব অভ্যাস মুমিন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়, লোক সমাজে তার সম্মান-মর্যাদা ক্ষুন্ন করে তা পরিহার করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।
এখানে ১০ টি অভ্যাস উল্লেখ করা হলো-
১. বেশি কথা বলা
কথা যত কম বলা যায় ভুল ততই কম হয়। অতিরিক্ত কথায় গীবত ও মিথ্যা বেশি থাকে। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে চলা। তাই নিজের ব্যক্তিত্ব ঠিক রাখতে চাইলে স্বল্পভাষী হওয়া জরুরি।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)
২. অতিরিক্ত হাসি
মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা সুন্নত। এটা আন্তরিকতা ও ভালোবাসার পরিচায়ক। তবে অকারণে হাসা বা অতিরিক্ত হাসার কারণে ব্যক্তির গাম্ভীর্য নষ্ট হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘অতিরিক্ত হাসবে না। কারণ অতিরিক্ত হাসি অন্তরকে মৃত করে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৫)
৩. মিথ্যা বলা
মিথ্যা মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয় হয়। এ জন্যই পবিত্র কোরআনে সত্যবাদীর সাহচর্য গহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১৯)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সত্য পুণ্যের দিকে নিয়ে যায়, আর পুণ্য নেয় বেহেশতের দিকে... মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ নেয় দোজখের দিকে।’ সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৯৪)
৪. গীবত-পরনিন্দা করা
হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) গীবতকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে—তা-ই গীবত।’ সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)
অন্যের অনুপস্থিতিতে দোষ বর্ণনা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
৫. অনিয়ন্ত্রিত রাগ
রাগের সময় ধৈর্য ধারণ করা জরুরি। অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত রাগের কারণে মানুষ দিশেহারা হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় এবং অন্যায় কাজ করে ফেলে। এতে তার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয় মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্তও হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারায়; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)
৬. অহংকার করা
অহংকার মানুষকে মানুষের কাছে অপছন্দনীয় করে তোলে এবং আল্লাহর কাছে সে হয় নিন্দিত। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও দাম্ভিক ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৬)
হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ বলেছেন, ‘অহংকার আমার চাদর। যে তা নিয়ে আমার সাথে টানাহেঁচড়া করবে, আমি তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিব।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৯০)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)
৭. ওয়াদা খেলাফ করা
কথা দিয়ে কথা না রাখা মোনাফেকের চরিত্র। ওয়াদা ভঙ্গ করা মুমিনের কাজ হতে পারে না। এটি তাঁর চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মোনাফেকের লক্ষণ তিনটি, কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩)
৮. কটু ভাষা
কটু ভাষা রূঢ় স্বভাব ও কঠোর হৃদয়ের আলামত। মানুষ এমন স্বভাবের লোকজন সমাজে অবজ্ঞার পাত্র হয়। কথার মাধ্যমে কাউকে আঘাত করা, অশ্লীল কথাবার্তা বলা মুমিনের ইমান ও মর্যাদার পরিপন্থি। কোনো ইমানদার ব্যক্তির জন্য এই অভ্যাস শোভনীয় নয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিন ব্যক্তি দোষ দেয় না, অভিসম্পাত করে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষী হয় না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)
৯. কৃপণতা
সম্পদ আল্লাহ দেন। বিধান মোতাবেক তা উপার্জন ও ব্যয় করা কর্তব্য। কৃপণতা করলে মন সংকীর্ণ হয় এবং লোকসমাজে ওই ব্যক্তির সম্মান-মর্যাদা নষ্ট হয়। আর পরকালের কঠিন শাস্তি হচ্ছে তার কর্মের ফল।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে, এটা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং এটা তাদের জন্য অমঙ্গল। আজ যে সম্পদে তারা কৃপণতা করছে, কেয়ামতের দিন তা তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরানো হবে। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সত্ত্বাধিকার কেবল আল্লাহরই। আট তোমরা যাই কিছু করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮০)
১০. খেয়ানত
বিশ্বস্ততা মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। খেয়ানত মানুষের চরিত্র ও মর্যাদা ধ্বংস করে দেয়। এটি মুনাফিকের কাজ। মুমিনদের জন্য আমানত সংরক্ষণ করা এবং তা প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়া কোরআনে নির্দেশ।
কোরআনে আছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দেবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)
হেদায়েত আল্লাহ–তাআলার মহান নেয়ামত, যা মানুষকে সত্যের দিকে পরিচালিত করে। তবে কিছু নৈতিক ও আত্মিক ব্যাধি এ পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এসব প্রতিবন্ধকতার কথা স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কয়েকটি প্রধান কারণ সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।
১. হিংসা ও অহংকার
হিংসা-অহংকার হেদায়েত লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ কোনো অহংকারীকে হেদায়েত দান করেন না। কোরাইশ নেতাদের হেদায়েত না পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই হিংসা এবং সত্যের প্রতি বিদ্বেষ।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার করে আমি তাদের আমার নিদর্শনসমূহ থেকে বিমুখ রাখব। তারা আমার সব রকম নিদর্শন দেখলেও তাতে ইমান আনবে না। তারা হেদায়েতের সরল পথ দেখলেও সে পথ গ্রহণ করবে না। কিন্তু ভ্রষ্টতার পথ দেখলে সেটা গ্রহণ করবে। এটা এ কারণে, তারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তারা এ থেকে উদাসীন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪৬)
২. নেতৃত্ব বা পদমর্যাদার লোভ
নেতৃত্ব বা পদমর্যাদার লোভ হেদায়েত লাভের পথে বড় প্রতিবন্ধক। এ ক্ষেত্রে হিরাক্লিয়াসের অবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মদিনার দূত দাহিয়া কালবি (রা.) তাঁর নিকট নবীজির পক্ষ থেকে চিঠি পৌঁছান। তিনি পত্র পাঠ করে আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে নবীজির অবস্থা জানেন। কিন্তু ইমান আনার ইচ্ছা সত্ত্বেও নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার লোভের কারণে হেদায়েতের সরল পথ গ্রহণ করতে পারেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭)
এই ব্যাধিই ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের ইমানের পথে বাধা হয়েছিল। সত্যের আহ্বান তাদের কাছে আসার পরে সে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বিরূপ মন্তব্য করেছিল।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা বলল, আমরা কি আমাদের মতোই দুজন মানুষের প্রতি ইমান আনব, অথচ তাদের সম্প্রদায় (বনি ইসরাইল) আমাদের দাসত্ব করছে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৪৭)
বর্তমানেও বহু মানুষ হক জেনেও তা গ্রহণ করে না শুধু পদমর্যাদা বা নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে।
৩. প্রবৃত্তির অনুসরণ
প্রবৃত্তির পূজা মানুষকে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করে রাখে। তাকে হক ও সত্য থেকে বিচ্যুত করে দেয়। সে মিথ্যাকে তার সামনে সুশোভিত করে হাজির করে এবং সেও অন্ধভাবে তা বিশ্বাস করে নেয়।
আল্লাহ বলেন, ‘আর আপনি প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। তাহলে তা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৬)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি ওই ব্যক্তির আনুগত্য করবেন না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি এবং সে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে এবং তার কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ২৮)
কোরআন, সুরা মায়েদা: ১০৪
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘প্রবৃত্তিপূজারিকে তার খেয়াল-খুশি অন্ধ ও বধির করে দেয়। ফলে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য তার করণীয় কী তা ভুলে যায় এবং তা সে অনুসন্ধানও করে না। বরং আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের রাজি-খুশির প্রতি সে সন্তুষ্ট হয় না এবং তাঁদের অসন্তোষের বিষয়ে তার মনে কোনো অনুশোচনা জাগে না। বরং প্রবৃত্তির চাহিদায় সে খুশি হয় এবং নিজের খেয়াল-খুশির বিরোধিতা করাটা তার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে যায়।’ (ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ, ৫/২৫৬, জামিয়াতুল ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ, ১৯৮৬)
৪ ও ৫. স্বজন ও সম্পদের সীমাহীন ভালোবাসা
পরিবার-পরিজন, ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ ইত্যাদির ভালোবাসা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের ভালোবাসা যদি সীমা অতিক্রম করে তাহলে এগুলোই হেদায়েত বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী! আপনি মুসলমানদের) বলে দিন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, গোত্র ও ধনসম্পদ যা তোমরা উপার্জন করো, ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা করো এবং বসবাসের সেই ঘর যা তোমরা পছন্দ করো (এগুলো যদি) আল্লাহ তাঁর রাসুল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা করো, তাহলে আল্লাহর ফয়সালা আসার অপেক্ষা করো। আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ২৪)
৬. পূর্বপুরুষের অজুহাত
পূর্বপুরুষের অনুসরণ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে দেয়। ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে এবং বাপ-দাদার কর্মনীতিই তাদের কাছে শ্রেয় মনে হয়। রাসুল (সা.) যখন মুশরিকদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন, তখন তারা বাপ-দাদার কথা বলে তার আহ্বান এড়িয়ে যেত।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তোমরা সেদিকে এবং রাসুলের দিকে এসো, তখন তারা বলে আমাদের জন্য তা-ই যথেষ্ট, যার ওপর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি। যদিও তাদের পূর্বপুরুষেরা কিছু জানত না এবং তারা সুপথপ্রাপ্তও ছিল না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০৪)
আবু তালেব সম্পর্কে হাদিস এসেছে, ‘তার মৃত্যু নিকটবর্তী হলে, রাসুল (সা.) তার কাছে এসে কালেমার দাওয়াত দিতে থাকলেন। সেখানে উপস্থিত ছিল আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়া। তারা বারবার বলছিল, তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে? তখন আবু তালিব বললেন, আমি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের ওপর আছি, এবং তিনি কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৭২)
৭. শয়তানের অনুসরণ
শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করার জন্য আল্লাহর সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেছে। সে মানুষকে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। তার অনুসরণ যে করবে সে কখনো হেদায়েতের সরল পথ পাবে না।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ করো। সে তার অনুসারীদেরকে এ জন্যই দাওয়াত দেয়, যাতে তারা জাহান্নামবাসী হয়ে যায়।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ৬)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি তাদেরকে ওই ব্যক্তির ঘটনা পড়ে শোনান, যাকে আমি আমার নিদর্শনাবলি দিয়েছিলাম, কিন্তু সে তা সম্পূর্ণ বর্জন করে। ফলে শয়তান তার পিছু নেয়। পরিণামে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৫)
সারকথা হলো, আল্লাহর দিকনির্দেশনা এবং নবী-রাসুলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলে মানুষ হেদায়েত লাভে ধন্য হবে। এর বিপরীত হলে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হবে।