নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, এই আলোচনার মধ্যেই শনিবার বৈঠকে বসছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। এদিন সন্ধ্যা ৭টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বৈঠকটি হবে বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি বলেছেন, “স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠক ডাকা হয়েছে।
“বৈঠকে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তেল, গ্যাসের দামসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।”
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে কোনো আলোচনা হবে? জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজমন্ত্রী টুকু বলেন, “এটা আগে থেকে বলার সুযোগ নেই।”
তবে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, “রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়েছে। কে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, এ ব্যাপারে আলোচনা হওয়া খুবই স্বাভাবিক।”
“কিন্তু সিদ্ধান্ত যেভাবে হবে, সেটা না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করার কোনো সুযোগ নাই,” বলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিনকে অপরসারণের দাবি ওঠে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। অভ্যুত্থানের পক্ষের কয়েকটি সংগঠনের তুমুল আন্দোলনেও সে সময় তিনি পদত্যাগ করেননি।
নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর গেল ২২ জুলাই গুঞ্জন ওঠে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। এর দুই দিন পর ২৪ জুলাই ‘শারীরিক ও মানসিক’ সক্ষমতা না থাকার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
মেয়াদের পৌনে দুই বছর বাকি থাকতে মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংবিধান অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে। এটি সর্বোচ্চ সময়সীমা; তার আগে যেকোনো সময় নির্বাচন হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে ছয়জনের নাম আলোচনায় থাকার কথা জেনেছে।
তারা হলেন- স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আব্দুল মঈন খান ও ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী।
অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও আছে আলোচনায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুইজন সদস্য সঙ্গে বলেছেন, যাদের নাম এসেছে গণমাধ্যমে, এরমধ্যে দুই জন বেশি ‘বিব্রতবোধ’ করছেন।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “ইতোমধ্যে দেশ, বিদেশ থেকে অনেকে ফোন করে অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, টেক্সট পাঠাচ্ছেন, এতে বিব্রত হচ্ছেন দুই-একজন নেতা।”
ত্রয়োদশ সংসদে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসেছে। দলটির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭ আসন। অন্যদিকে বিএনপির আসন ২১০টি। আনুপাতিক হারে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনেও বিএনপি ও মিত্রদের সদস্য বিরোধী দলের চেয়ে বেশি। ফলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
শুক্রবার বিকালে বিএনপির একজন নেতা বলেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা নাও হতে পারে।
“স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিগত সময়ে যেভাবে খালেদা জিয়ার ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব ভার দিতেন, এবারও সেই পথে যাবেন তারা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে কোনো-কোনো সদস্য হয়তো কথা তুলতে পারেন।”
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “নির্বাচন কমিশন থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে নাম প্রস্তাব করবে। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জানার সুযোগ কম।”
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সমন্বয় করে। বর্তমানে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন কায়সার কামাল।
মঙ্গলবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
দুই জনের এই সাক্ষাৎ ‘আইনগত রুটিন সাক্ষাৎ’ ছিল বলে জাতীয় সংসদের দায়িত্বশীল একজন বলেছেন।
সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে ১৫ জুলাই। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের এক অধিবেশন সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি দেওয়া যাবে না। সে হিসেবে সেপ্টেম্বর বা তার আগে পরবর্তী অধিবেশন বসবে। সেই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে পারে, বিএনপির কয়েকজন নেতা মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর এমন কথা বলেছিলেন।
তবে জাতীয় সংসদের দায়িত্বশীল এই ব্যক্তি বলেছেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য কোনো ধরনের অধিবেশন আহ্বান করা লাগে না। অধিবেশনের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করবে, যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী হবেন রাষ্ট্রপতি পদে, তারা মনোনয়ন ফরম জমা দেবেন। সেখান থেকে তালিকা যাচাই-বাছাই করে বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। তারপর যদি নির্বাচনের প্রয়োজন হয় তখন সংসদের ৩৫০ জন সদস্য (এখন ৩৪৯ এমপি), তাদের ভোটের দিন ধার্য করা হবে। সেদিন তারা আসবেন এবং ভোট দেবেন।”
জাতীয় সংসদের অধিবেশনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের ভোটের আইনগতভাবে কোনো সম্পর্ক নেই, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে বৈঠক করার পর সিইসি নাসির উদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে দিনক্ষণ ঠিক করার কথা বলা আছে। সেজন্য ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রাথমিকভাবে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
“তবে নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি চূড়ান্ত হলে জানানো হবে। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে থাকলে এ নির্বাচন একভাবে হবে, আর না থাকলে আরেক ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে নাসির উদ্দিন বলেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। সংসদ সচিবালয় এ নির্বাচনের ভোটার তালিকা দেবে। এজন্য নির্বাচন কমিশন চিঠিও দিয়েছে।”