তারেক-রহমান
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার দিনই তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তখন আলোচনায় ছিল ভারত দিয়েই প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর শুরু হবে কি না।
এরপর এসেছে ভুটান, নেপাল, চীন, সৌদি আরব এবং সবশেষ মালয়েশিয়ার নাম। দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোন দেশে হবে- গত কয়েক মাস ধরেই তা ছিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায়।
চলতি মাসের শেষ দিকে চীন সফর যখন মোটামুটি চূড়ান্ত বলে শোনা যাচ্ছিল তখন আবার সামনে এসেছে মালয়েশিয়া সফর চূড়ান্ত হওয়ার তথ্য। তাহলে কি সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের গন্তব্য মালয়েশিয়া? একেক সময় একেক রকম আলোচনা ওঠায় বিষয়টি নিয়ে সব মহলই কিছুটা দ্বিধান্বিত। আবার দলের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতাও বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলছেন না।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে এসে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান। নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের প্রেক্ষাপটে ভারতকে প্রথম সফরের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছিল তখন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভারতকে ‘স্বাভাবিক কূটনৈতিক পছন্দ’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছিল, প্রথম সফরটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী কোনো ছোট রাষ্ট্র দিয়ে শুরু করা যায় কি না। সে ক্ষেত্রে ভুটানের নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আসে।
সার্কভুক্ত দেশ হিসেবে ভুটানে প্রথম সফর বাংলাদেশের প্রতিবেশীকেন্দ্রিক কূটনীতির ইতিবাচক বার্তা দেবে- এমন যুক্তিও আলোচনায় ছিল। কিছু কূটনৈতিক মহলে নেপালের নামও অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত হয়, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আমন্ত্রণের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
সরকার গঠনের সপ্তাহখানেকের মধ্যে আরেকটি সম্ভাব্য গন্তব্য সামনে আসে, সেটি সৌদি আরব। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল ওমরাহ পালন ও মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবে তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরব যেতে পারেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের কারণে সেই পরিকল্পনা আর এগোয়নি।
এপ্রিল মাস থেকে চীন সরকার তারেক রহমানকে বেইজিং সফরের জন্য আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। মে মাসে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফর আলোচনায় আসে। পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র ঢাকায় পৌঁছায়।
জুনের শেষ সপ্তাহে সম্ভাব্য চীন সফর নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতি সফরের মূল আলোচ্য হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যেই ভারত ও চীনের আমন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক বিবেচনায় পরিণত হয়।
নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা ছিল, প্রথম সফর যদি দিল্লি বা বেইজিংয়ে হয়, তাহলে সেটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে একটি বিশেষ বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। ফলে তৃতীয় কোনো বন্ধুরাষ্ট্রকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার চিন্তা গুরুত্ব পায়।
এই প্রেক্ষাপটে সামনে আসে মালয়েশিয়ার নাম। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম নির্বাচনের পরপরই তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পরে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ২১-২২ জুন কুয়ালালামপুর সফরের আমন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। সরকারও সেই আমন্ত্রণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
সূত্রমতে, মালয়েশিয়াকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া বাংলাদেশের ‘ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি’র প্রতিফলন। এর মাধ্যমে ঢাকা একদিকে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার মধ্যে নিরপেক্ষ অবস্থানের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের পথ খুলছে।
তবে মালয়েশিয়া সফর চূড়ান্ত হলেও ভারত ও চীন সফরের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, মালয়েশিয়া সফরের পর দিল্লি ও বেইজিং-দুই রাজধানীতেই প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ঘিরে আলোচনায় ভারত, ভুটান, নেপাল, সৌদি আরব, চীন ও মালয়েশিয়ার নাম উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়াই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের গন্তব্য হিসেবে এগিয়ে আছে। এই পুরো প্রক্রিয়া নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম বড় কূটনৈতিক পরীক্ষাও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে তারেক রহমানের সম্পর্ক পুরোনো
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিএনপি সূত্রে জানা যায়, তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবেও একাধিকবার মালয়েশিয়া সফর করেছেন। প্রথমবার তিনি ২০০৩ সালে মালয়েশিয়া সফর করেন।
এরপর ২০০৫ সালে আবারও দেশটি সফর করেন। সে সময় তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর লন্ডনে অবস্থানকালে ২০১৪ সালের ২ জুন মালয়েশিয়া সফর করেন তারেক রহমান। ওই সময় তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।
সূত্রমতে, আগামী ২১ জুন তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এটিই হবে তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফর, যা রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক- বিভিন্ন দিক বিবেচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জাগো নিউজকে জানান, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পর এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় নয় লাখ বাংলাদেশি কর্মী বৈধভাবে কাজ করছেন। এখনো লাখ লাখ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ফলে এ খাতে অনেক ক্ষতি হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে বলে মনে করেন শায়রুল।
দলীয় সূত্রে আরও জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে মালয়েশিয়ার পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও আবহাওয়া পছন্দ করেন। ২১ জুনের এ সফরের মাধ্যমে শুধু নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফরের অধ্যায়ই শুরু হচ্ছে না, একই সঙ্গে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসছে।
শেষ পর্যন্ত এ সূচি ঠিক থাকলে পরের গন্তব্য চীন না ভারত সেদিকেই থাকবে সবার নজর।
মাহফুজ আলম (ছবি: সংগৃহীত)
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, জুলাই আদর্শিক অক্ষ অনুযায়ী বিভক্ত হয়েছে। ডানপন্থি জুলাইয়ের সংগঠনে ডানবিরোধীরা জায়গা পাবেন না। অ-ডানপন্থিদের জুলাই সংগঠনে ডানপন্থিরা জায়গা পাবেন না। রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা লেখেন মাহফুজ আলম।
পোস্টে মাহফুজ আলম আরও লেখেন, এটাই জুলাই বন্দোবস্ত। ডান-বামের বাইরে যারা যেতে চাইবেন, তাদের জন্য এতে আছে শিক্ষা। দ্রুত ডান বা অ-ডান জুলাই বেছে নিয়ে গা বাঁচান। নিজস্ব মব না থাকলে মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না।
এই পোস্টের কমেন্টেই তিনি আবার লিখেছেন, ‘ডান ও অ-ডানের এ কুস্তি নাগরিক কমিটি প্রকল্পের সমাপ্তির মাধ্যমে পুরোদমে শুরু হইসে। এটা শেষ হবে জুলাইকে নিয়ে কুস্তিতে জিততে উভয় পক্ষের সব কোশেশ যখন লীগ আসাকে অনিবার্য করে তুলবে, সেদিন। সব কুস্তিগিরদের আগাম অভিনন্দন!’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার প্রাক্কালে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মাহফুজ আলম প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের পদত্যাগপত্র জমা দেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাহফুজ আলম।
‘৩৬ জুলাইয়ের অবদান বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত দিন জামায়াতে ইসলামী নাম নিয়ে রাজনীতি থাকবে, তত দিন আওয়ামী লীগও থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার।
তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর নাম নিয়ে রাজনীতি করার তিনি ঘোরবিরোধী। একই সঙ্গে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি ঔপনিবেশিক ‘অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বিদ্যমান ব্যবস্থার জায়গায় নতুন ‘গঠনতন্ত্র’ প্রণয়ন এবং গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করাই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের একমাত্র পথ।
আজ রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক ঐক্য এবং অর্জন-ব্যর্থতার মূল্যায়ন নিয়ে ‘৩৬ জুলাইয়ের অবদান বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংলাপে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে ফরহাদ মজহার এ কথা বলেন। এ সংলাপের আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি।
বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে ফরহাদ মজহার বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রথম একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই জাতীয় অর্জনের সঙ্গে কোনোভাবেই আপস বা দর-কষাকষি করা যাবে না, এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও নয়।
তিনি বলেন, ‘আমি বারবার একটা কথা বলেছি, যদিও তাঁরা অনেকে রাগ করেছেন—আমি বলেছি, যত দিন জামায়াতে ইসলামী থাকবে, তত দিন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ থাকবে। আমি জামায়াতে ইসলামী নাম নিয়ে রাজনীতি করার ঘোরবিরোধী। কারণ, ইসলাম আমাদের ধর্ম। তার নীতিগত ও নৈতিক দিক একটি নতুন রাষ্ট্র ও নতুন সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
গঠনতন্ত্রের পক্ষে যে যুক্তি দিলেন ফরহাদ মজহার
১৯৭২ সালের সংবিধান সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই।’ সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে এক বাক্যে জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক বলা হয়েছে, কিন্তু ঠিক পরের বাক্যে সংবিধান বা আইনি দলিলকে জনগণের ওপরে স্থাপন করে জনগণের সার্বভৌমত্বকে নাকচ করা হয়েছে।
ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস টেনে ফরহাদ মজহার বলেন, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে এলএফওর (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার) অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ীরা দেশে ফিরে এসে গণপরিষদ দাবি করে এই সংবিধান চাপিয়ে দিয়েছিল। ‘সংবিধান’ ও ‘গঠনতন্ত্র’-এর আইনি পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জনগণ সংবিধানের ঊর্ধ্বে, জনগণ সংবিধানের অধীন নয়। জনগণ চাইলে যখন খুশি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে পারে। কনস্টিটিউশন বা সংবিধান শব্দটি কলোনিয়াল শাসকেরা ব্যবহার করত লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণিকে দিয়ে গণবিরোধী শাসন চালাতে। অন্যদিকে গঠনতন্ত্র হলো জনগণ নিজেরা একত্র হয়ে সম্পদের মালিকানা, ব্যাংক, বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে তা স্থির করা।’
পূর্ণ শক্তির অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বাধা
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পরপরই রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় গুরুতর গলদ ছিল বলে মনে করেন ফরহাদ মজহার। তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) এবং বিএনপি—এই তিন শক্তি মিলে আমাদের একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে দেয়নি। সম্প্রতি প্রকাশিত কালের কণ্ঠে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর সাক্ষাৎকারেই তার প্রমাণ মিলেছে। ৮ আগস্ট পুরোনো সংবিধান ও রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখে যে সরকার গঠন করা হয়েছে, তা মূলত একটি সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব।’
গণমাধ্যমের ভূমিকারও সমালোচনা করে ফরহাদ মজহার বলেন, হাসিনাহীন কিন্তু হাসিনা-ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে গঠিত এই সরকারকে সাংবাদিকেরা ভুলভাবে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ বলে প্রচার করেছেন। বাস্তবে এটি ছিল পুরোনো সংবিধানের অধীন প্রেসিডেন্ট দ্বারা পরিচালিত একটি সেনাসমর্থিত উপদেষ্টা সরকার, যা দিয়ে মূল সংবিধান বদলানো অসম্ভব।
অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতার প্রশংসা করে ফরহাদ মজহার বিএনপি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করে বলেন, রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজে আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর যেন পুলিশি নির্যাতন না চালানো হয় এবং তারেক রহমান যেন তরুণদের সঙ্গে বেইমানি না করেন। বেগম খালেদা জিয়াও কখনো তরুণদের সঙ্গে বেইমানি করতে চাননি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ধর্মের নামে তাণ্ডব চালানো ও মাজার ভাঙচুরের ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘যাঁরা মাজার ভাঙছেন, ধর্মকে মানুষকে ভয় দেখানো বা অত্যাচার করার অস্ত্র বানাচ্ছেন, তাঁদের আমরা চিনি। গাজাকে ধূলিসাৎ করে রিয়েল এস্টেট বানানোর মতো এটাও একধরনের আগ্রাসন। পেট্রোডলারের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে কেউ দাবি করতে পারেন না যে তাঁরাই ইসলামের একমাত্র কর্তৃত্বের হকদার। ইসলামে কারও এই ধরনের একক কর্তৃত্ব দাবি করার সুযোগ নেই।’
গণ–অভ্যুত্থানের অর্জনকে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে তুলে ধরার তীব্র বিরোধিতা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘২০ বছর ধরে যেখানে কথা বলা যাচ্ছিল না, সেখানে এখন কথা বলা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে—এটা কোনো ব্যর্থতা হতে পারে না। ব্যর্থতার গল্প না বলে এখন দেখতে হবে আগামী দিনে আমাদের কী কী করা বাকি রয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তরুণেরা যে পথ দেখিয়েছে, সেখান থেকে পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।’
আলোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ১৯৭১ ও ২০২৪—উভয় চেতনাকেই ধারণ করে সামনে এগোতে হবে। তিনি বলেন, একটি সরকারের পতন ঘটানো এবং একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতার বিষয়। দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে কোনো সরকারই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।
সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান। এতে আরও সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, এ বি এম খালিদ হাসান, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক সুলতানা রাজিয়া প্রমুখ।
বিএনপির দলীয় মনোগ্রাম
নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, এই আলোচনার মধ্যেই শনিবার বৈঠকে বসছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। এদিন সন্ধ্যা ৭টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বৈঠকটি হবে বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি বলেছেন, “স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠক ডাকা হয়েছে।
“বৈঠকে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তেল, গ্যাসের দামসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।”
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে কোনো আলোচনা হবে? জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজমন্ত্রী টুকু বলেন, “এটা আগে থেকে বলার সুযোগ নেই।”
তবে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, “রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়েছে। কে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, এ ব্যাপারে আলোচনা হওয়া খুবই স্বাভাবিক।”
“কিন্তু সিদ্ধান্ত যেভাবে হবে, সেটা না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করার কোনো সুযোগ নাই,” বলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিনকে অপরসারণের দাবি ওঠে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। অভ্যুত্থানের পক্ষের কয়েকটি সংগঠনের তুমুল আন্দোলনেও সে সময় তিনি পদত্যাগ করেননি।
নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর গেল ২২ জুলাই গুঞ্জন ওঠে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। এর দুই দিন পর ২৪ জুলাই ‘শারীরিক ও মানসিক’ সক্ষমতা না থাকার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
মেয়াদের পৌনে দুই বছর বাকি থাকতে মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংবিধান অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে। এটি সর্বোচ্চ সময়সীমা; তার আগে যেকোনো সময় নির্বাচন হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে ছয়জনের নাম আলোচনায় থাকার কথা জেনেছে।
তারা হলেন- স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আব্দুল মঈন খান ও ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী।
অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও আছে আলোচনায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুইজন সদস্য সঙ্গে বলেছেন, যাদের নাম এসেছে গণমাধ্যমে, এরমধ্যে দুই জন বেশি ‘বিব্রতবোধ’ করছেন।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “ইতোমধ্যে দেশ, বিদেশ থেকে অনেকে ফোন করে অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, টেক্সট পাঠাচ্ছেন, এতে বিব্রত হচ্ছেন দুই-একজন নেতা।”
ত্রয়োদশ সংসদে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসেছে। দলটির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭ আসন। অন্যদিকে বিএনপির আসন ২১০টি। আনুপাতিক হারে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনেও বিএনপি ও মিত্রদের সদস্য বিরোধী দলের চেয়ে বেশি। ফলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
শুক্রবার বিকালে বিএনপির একজন নেতা বলেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা নাও হতে পারে।
“স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিগত সময়ে যেভাবে খালেদা জিয়ার ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব ভার দিতেন, এবারও সেই পথে যাবেন তারা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে কোনো-কোনো সদস্য হয়তো কথা তুলতে পারেন।”
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “নির্বাচন কমিশন থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে নাম প্রস্তাব করবে। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জানার সুযোগ কম।”
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সমন্বয় করে। বর্তমানে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন কায়সার কামাল।
মঙ্গলবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
দুই জনের এই সাক্ষাৎ ‘আইনগত রুটিন সাক্ষাৎ’ ছিল বলে জাতীয় সংসদের দায়িত্বশীল একজন বলেছেন।
সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হয়েছে ১৫ জুলাই। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের এক অধিবেশন সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি দেওয়া যাবে না। সে হিসেবে সেপ্টেম্বর বা তার আগে পরবর্তী অধিবেশন বসবে। সেই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে পারে, বিএনপির কয়েকজন নেতা মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর এমন কথা বলেছিলেন।
তবে জাতীয় সংসদের দায়িত্বশীল এই ব্যক্তি বলেছেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য কোনো ধরনের অধিবেশন আহ্বান করা লাগে না। অধিবেশনের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করবে, যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী হবেন রাষ্ট্রপতি পদে, তারা মনোনয়ন ফরম জমা দেবেন। সেখান থেকে তালিকা যাচাই-বাছাই করে বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। তারপর যদি নির্বাচনের প্রয়োজন হয় তখন সংসদের ৩৫০ জন সদস্য (এখন ৩৪৯ এমপি), তাদের ভোটের দিন ধার্য করা হবে। সেদিন তারা আসবেন এবং ভোট দেবেন।”
জাতীয় সংসদের অধিবেশনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের ভোটের আইনগতভাবে কোনো সম্পর্ক নেই, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে বৈঠক করার পর সিইসি নাসির উদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে দিনক্ষণ ঠিক করার কথা বলা আছে। সেজন্য ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রাথমিকভাবে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
“তবে নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি চূড়ান্ত হলে জানানো হবে। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে থাকলে এ নির্বাচন একভাবে হবে, আর না থাকলে আরেক ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে নাসির উদ্দিন বলেন, “রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। সংসদ সচিবালয় এ নির্বাচনের ভোটার তালিকা দেবে। এজন্য নির্বাচন কমিশন চিঠিও দিয়েছে।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেছেন, ‘তারেক রহমানের কাছে এত বড় গ্যাংস্টার বাংলাদেশে আছে। কি নাই তার কাছে? জিকে গউসের মত অস্ত্র আছে, আব্বাস সাহেবের মত অস্ত্র আছে, বুলু সাহেবের মত অস্ত্র আছে, সালাউদ্দিনের মতো অস্ত্র তার কাছে আছে। কে কার চেয়ে কোন র্যাংকিংয়ে কম? কারো কারো কাছে মাদক, কারো কাছে টেন্ডার, সালাউদ্দিনের সাহেবের ছেলেরা এক জায়গায় বসা, খসরু ভাই আছে। এগুলো র্যাংকিং করলে ইতালির যেকোনো মাফিয়াকেও হার মানাবে।’ শুক্রবার (৩১ জুলাই) দুপুরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই কথাগুলো বলেন।
কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘তারেক রহমান বাংলাদেশে যা করতেছে, সেটা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য লজ্জার। তিনি রাজনীতির সংস্কৃতিকে অসংস্কৃত ও সহিংসতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, তার রাজনীতি করা ইচ্ছা নাই। ইতালিতে বড় বড় মাফিয়া গ্যাং থাকে না উনি সেই গ্যাংবাজি করছেন। তাহলে উনি বলে দিক যে, আমি আজকে থেকে গ্যাংবাজি করব, আমি রাজনীতি করব না। রাজনীতিতে গ্যাংবাজি করার কি দরকার?
আপনি কি ভয় পাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভয় তো পাবোই। এত বড় গ্যাংস্টার বাংলাদেশে আছে। কি নাই তার কাছে? জিকে গউসের মত অস্ত্র আছে, আব্বাস সাহেবের মত অস্ত্র আছে, বুলু সাহেবের মত অস্ত্র আছে, সালাউদ্দিনের মতো অস্ত্র তার কাছে আছে। কে কার চেয়ে কোন র্যাংকিংয়ে কম? কারো কারো কাছে মাদক, কারো কাছে টেন্ডার, সালাউদ্দিনের সাহেবের ছেলেরা এক জায়গায় বসা, খসরু ভাই আছে। এগুলো র্যাংকিং করলে ইতালির যেকোনো মাফিয়াকেও হার মানাবে।’
তিনি আরও বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের এই ধরনের মাফিয়াগুলাকে ছেড়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসের রাজত্ব ছেড়ে দিয়েছে। আমার তো ভয় পাওয়া, মানুষও ভয় পাইতেছে, সবাই আমরা ভয় পাইতেছি । আমরা একটা টেরর রাজ্যে আসছি। মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে পাটওয়ারী বলেন, ‘মামলায় হামলা, হয়রানি ও ছিনতাইয়ের মতো অভিযোগ আনা হলেও সেসবের কোনো সত্যতা নেই।
তিনি বলেন, আমি যে মামলাগুলো দেখেছি, সেখানে অনেক ইন্টারেস্টিং বিষয় লেখা হয়েছে। বলা হয়েছে আমরা হামলা করেছি, হয়রানি করেছি, ছিনতাই করেছি। এসব কতটুকু সত্য, সেটা দেশবাসী দেখেছে।
মামলায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা বলছে আইফোন ছিনতাই হয়েছে। সেটি কি জি কে গাউসের আইফোন, নাকি তারেক রহমানের আইফোন ছিল? এসব অভিযোগ অত্যন্ত লজ্জাজনক।’
রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধী দলের নেতার বাসভবনে ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় কার্যকর, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের নিয়োগের প্রতিবাদসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে ৫ আগস্ট ঢাকার পল্টনে সমাবেশের ডাক দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধী দলের নেতার বাসভবনে ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকারি দল নির্বাচনের আগে জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালিয়েছিল। খোদ তারেক রহমান ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছিলেন। জনগণ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জয়যুক্ত করলেও সেটি এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। অর্থাৎ সরকার তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করছে।
আযাদ আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সরকার বিভিন্ন দপ্তর বা অধিদপ্তরে নজিরবিহীনভাবে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়েছে, যা জুলাই অভ্যুত্থান চেতনার বিপরীত। একই সঙ্গে সারাদেশে ফের নতুন করে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু করেছে সরকারের লোকজন। এসবের প্রতিবাদে ৫ আগস্ট বুধবার ঢাকার পল্টনে ১১ দল সমাবেশ করবে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, জাগপার সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান,বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীন, এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল মাজেদ আতহারী, বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান প্রমুখ।
এনসিপির কর্মসূচিতে হামলার নিন্দা: বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ৩ আগস্ট শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে কর্মসূচি চূড়ান্ত হবে। এছাড়া সম্প্রতি হবিগঞ্জে ‘জুলাই পদযাত্রা ২০২৬’ কর্মসূচিতে এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওপর বিএনপির হামলার তীব্র নিন্দা এবং এর সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বিএনপি। রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা থাকলেও দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনার মধ্য দিয়ে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। এ লক্ষ্যে আগামীকাল শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে।
নতুন রাষ্ট্রপতি কে হতে যাচ্ছেন- তা নিয়ে তুমুল আলোচনার মধ্যেই বৈঠকটি ডাকল বিএনপি। সভায় দলের শীর্ষ নেতারা নিজেদের মতামত তুলে ধরবেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের কয়েকজন নেতা জানান, রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচনা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে। তবে দলের ভেতরের কিছু নেতা এ বিষয়ে বিরোধিতা করছেন।
নীতিনির্ধারকদের অনেকে মনে করেন, অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নজর মাথায় রেখে প্রার্থী বাছাইয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান। তিনি এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করতে চান, যিনি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে দক্ষ এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি হোক, সেটা আমরা চাই না। তাই সবকিছু খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ জন্যই দলীয় নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল নেতাদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, যেন স্পর্শকাতর এই ইস্যুতে কোনো অসংলগ্ন বক্তব্য না দেওয়া হয়।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই নেওয়া হবে। স্থায়ী কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রেখেই দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বে দেখতে চান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একই বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির অন্য নেতারা জানান, রাষ্ট্রপতি শুধু আনুষ্ঠানিক পদ নয়; রাজনৈতিক সংকটের সময় এই পদটির গুরুত্ব বেড়ে যায়। তাই ব্যক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভুলের সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি পদে এমন কাউকে চাই, যার সততা নিয়ে প্রশ্ন নেই। যিনি সংবিধানের রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। দলীয় পরিচয় থাকলেও রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন।
বিএনপি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খানের নাম আগেই আলোচনায় ছিল।
তবে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও। দলের বাইরে অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও আছে আলোচনায়। এ ছাড়া একজন সচিব ও রাজনীতির বাইরে কয়েকজনের নামও শোনা যাচ্ছে।
দলটির নেতারা বলছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এড়িয়ে চলতে চায় বিএনপি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের যে ভারসাম্য, তা রক্ষা করা অত্যন্ত সংবেদনশীল। এমন কাউকে নির্বাচন করা হবে না, যিনি সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি করবেন, আবার একই সঙ্গে এমন কাউকে আনা হবে না, যিনি বঙ্গভবনের সাংবিধানিক পদের গুরুত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হন।
বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, এমন একজনের রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত, যিনি রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারবেন। দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখবেন। আরেক নেতা বলেন, দলীয় আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২৪ জুলাই বিকেলে মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েন। সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
জানা গেছে, বিএনপির ৩১ দফা কিংবা ঘোষিত জুলাই সনদ অনুযায়ী সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের যৌথ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে পদ্ধতির কথা ছিল, সেটা এবার হচ্ছে না। ফলে আগের নিয়মেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীরাই নির্বাচনে জিতে আসবেন। আর জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।