জাপানে ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত শক অ্যাবজরবার
‘ঢাকায় কি আজ ভূমিকম্প হয়েছে?’ এমন প্রশ্ন লিখছেন অনেকে; কেউবা আবার ইংরেজিতে 'আর্থ কোয়েক টুডে' লিখে গুগলে সার্চ করছেন।
গত ২১ নভেম্বর সকালে ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে গোটা বাংলাদেশে যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে সপ্তাহ পেরিয়েও তা থেকে বের হতে পারেননি অনেকে। এক সপ্তাহের মধ্যে ছয়বার কম্পন অনুভূত হওয়ায় বলতে গেলে আতঙ্ক ফিরে ফিরে এসেছে। ফলে ভূমিকম্প নিয়ে নানা প্রশ্ন জানতে চাইছে মানুষ।
তবে বাংলাদেশের কাছাকাছিই এমন দেশ রয়েছে, যেখানে ভূমিকম্প প্রায় নিত্যদিনের ব্যাপার। দেশটি বাংলাদেশের পূর্বদিকের একটু দূরবর্তী প্রতিবেশী জাপান। সে দেশে বছরে প্রায় দেড় হাজারের মতো ভূমিকম্প হয়, সুনামির সতর্কতাও দেওয়া হয় বিভিন্ন সময়।
তাহলে জাপান কীভাবে ভূমিকম্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে?
দেশটিতে অসংখ্য বহুতল ভবনও রয়েছে। নিয়মিত ভূমিকম্পের মধ্যে থাকা একটি দেশ আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিংবা কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখে? এবং এক সপ্তাহের মধ্যে কয়েকটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠা বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে কী শিখতে পারে?
তার আগে জেনে নেওয়া যাক, জাপানে এত ভূমিকম্প কেন হয়।
জাপানি দ্বীপপুঞ্জ প্রশান্ত মহাসাগরের 'রিং অব ফায়ার'-এর ওপর অবস্থিত। যেখানে ইউরেশিয়ান, ফিলিপাইন ও প্যাসিফিক টেকটোনিক প্লেট মিলিত হয়েছে। অর্থাৎ জাপান তিনটি মিলিত টেকটোনিক প্লেটের ওপর অবস্থান করছে। এটিকে পৃথিবীতে ভূতাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চল বলা হয়।
এই ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার কারণেই জাপানে এত ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
এর মধ্যে অনেক ছোট ভূমিকম্প সাধারণ মানুষ হয়তো টেরই পায় না, আর মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প দেশটিতে একরকম স্বাভাবিক ঘটনা। তবে, অনেকবার বড় ভূমিকম্পের সাক্ষীও হয়েছে জাপান।
জাপান থেকে শেখার যা আছে
বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায় প্রতিবছরই আবির্ভূত হয়। আর তা হয় এখানকার আবহাওয়া ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। দুর্যোগ হিসেবে ভূমিকম্প এখানে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো নিয়মিত নয়।
দেশটিতে সরকারি ও নাগরিক পর্যায়ে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় নিয়ে যতটুকু প্রস্তুতি থাকে, ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ততটুকুও নেই। বাংলাদেশে ভূমিকম্পে ঝাঁকুনির মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা ছাড়া এ নিয়ে আর কোনো ধারণা পাওয়া যায় না সাধারণ আলাপচারিতায়।
এমন প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভূমিকম্পের বিষয়ে জাপানের কাছ থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে।
জাপানের সঙ্গে আর্থসামাজিক পার্থক্যকে বিবেচনায় রেখেও তারা বলছেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করার মতো কিছু বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশটিকে অনুসরণ করতে পারে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের একজন ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ূন আখতার বলেন, গত ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প বাংলাদেশে যেভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, জাপানের নাগরিকরা সাধারণত সেভাবে ভয় পান না।
তার জন্য, প্রতিনিয়ত ভূমিকম্পের মুখোমুখি হওয়াকেই একমাত্র কারণ বলে মনে করেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের এই অধ্যাপক। বরং 'সচেতনতা ও প্রস্তুতি'র কারণেই সেটি সম্ভব হয়েছে, যোগ করেন তিনি।
অধ্যাপক আখতার যে ‘প্রস্তুতি’র কথা বলছিলেন, একেবারে অল্প বয়স থেকেই প্রত্যেক জাপানি নাগরিক তার মধ্য দিয়ে যায় বলে জানান বাংলাদেশি স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব।
তিনি বলেন, ‘জাপানে একটা বাচ্চা জন্মের পর থেকেই ভূমিকম্পের বিষয়ে শেখা শুরু হয়। নিয়মিত মহড়ার মধ্য দিয়ে তারা জানে তাৎক্ষণিক কী করতে হবে।’
শৈশবে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির জন্য স্কুলগুলোতেও নিয়মিত মহড়া হয়। শিশুরা মহড়ায় ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়ার অনুশীলন করে। ভূমিকম্পের পরপর তার নিরাপদ আশ্রয়ের স্থান কোথায় হবে তা সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয় তাদের। সাধারণত ১৫ দিন পরপর এ ধরনের অনুশীলন হয় বলে জানা যায়।
নিয়মিত ড্রিল (মহড়া) করতে বিশেষ অর্থের প্রয়োজন নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য জায়গায় সেটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা যেতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক হুমায়ূন আখতার।
জাপানে নিকটতম আশ্রয়কেন্দ্র যেমন পার্ক বা খেলার মাঠ কোথায় অবস্থিত, সে সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা থাকে, যাতে তারা ভবন থেকে নিরাপদ জায়গায় সরে আসতে পারে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ অন্য বড় শহরগুলোতে তেমন নিরাপদ জায়গা নিশ্চিত করা ও সেটি সম্পর্কে সবাইকে অবগত করার কথা বলছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব।
জাপানে অবকাঠামোগত নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। বড় শহরের উঁচু ভবনগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে ভূমিকম্পের সময় সেগুলো কাঁপে না, বরং দুলতে থাকে, যা এগুলোকে নিরাপদ করে তোলে।
বাংলাদেশে তেমন সুউচ্চ ভবন অপেক্ষাকৃত কম।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, বাংলাদেশেও সাধারণত সুউচ্চ ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে ভূমিকম্প সহনীয় হিসেবে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু, অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনগুলোর ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড মানা হয় না এবং ভূমিকম্পের আঘাত সামলানোর মতো নির্মাণশেলী প্রয়োগ করা হয় না।
এই ভবনগুলোই অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। এ ক্ষেত্রেও জাপানকে অনুসরণ করে 'অবকাঠামোগত নিরাপত্তা কার্যকর' করার ওপর জোর দেন তিনি।
এ ছাড়া রেজিলিয়েন্স প্ল্যান বা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা কার্যকর করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
জাপানে আকাশচুম্বী ভবনগুলো কীভাবে ভূমিকম্পে টিকে থাকে
বছরজুড়ে শত শত কম্পন সহ্য করার পরও জাপান কী করে বিশ্বের সবচেয়ে 'স্থিতিস্থাপক' ভবনগুলোর আবাসস্থল, তা একটি কৌতূহলের বিষয়।
স্থিতিস্থাপকতার মানে হলো, কোনো আঘাত বা চাপের ফলে কিছুটা সরে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসার ক্ষমতা। জাপানের ভবনগুলোর স্থিতিস্থাপকতার রহস্য লুকিয়ে আছে মূলত মাটির নিচে 'নেচে ওঠার' ক্ষমতায়।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও সহযোগী অধ্যাপক জুন সাতো বলেন, ‘জাপানের টাওয়ার ব্লকগুলো সাধারণ ভবন নয়। দেশটিতে সব ভবন, ছোট বা অস্থায়ী হলেও, ভূমিকম্প-সহনশীল হতে হয়।’
প্রকৌশলীরা দুটি প্রধান পর্যায়ে স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে কাজ করেন বলে জানা যায়—প্রথম পর্যায় হলো স্বল্প মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করা। তেমন ভূমিকম্পে মেরামত করার মতো কোনো ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। ভবনের নকশা এমনভাবে করা হয়, যাতে এসব ভূমিকম্পে কোনো ক্ষতি না হয়। দ্বিতীয় পর্যায় হলো, ভয়াবহ ভূমিকম্প সহ্য করা, যা অপেক্ষাকৃত বিরল।
এ ক্ষেত্রে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয় জাপানের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ংকরী গ্রেট কান্তো ভূমিকম্পকে। ১৯২৩ সালের ৭ দশমিক ৯ মাত্রার এই ভূমিকম্পে টোকিও ও ইয়োকোহামা বিধ্বস্ত হয় এবং এক লাখ ৪০ হাজারের এর বেশি মানুষ নিহত হয়।
এই মাত্রা বা তার চেয়ে বড় ভূমিকম্পে ভবনকে সম্পূর্ণ অক্ষত রাখা আর লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয় না। প্রাণহানি এড়ানোই মূল লক্ষ্য।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ জিগি লুবকোভস্কি বলেন, ‘আপনি ভবনগুলো মানুষের জীবন রক্ষার জন্য নকশা করেন। এটাই এক্ষেত্রে ন্যূনতম শর্ত।’
আর সাতোর মতে, ‘যখন কোনো কাঠামো ভূমিকম্পের সব শক্তি সহ্য করতে বা শুষে নিতে পারে, তখনই আর এটি ধসে পড়বে না।’
সিসমিক আইসোলেশন নামে একটি প্রক্রিয়া এ ক্ষেত্রে কাজ করে।
ভবনগুলোকে এমন একধরনের বিয়ারিং বা শক অ্যাবজরবার (আঘাত সহনীয় বস্তু) এর ওপর বসানো হয়, যা ভূমিকম্পের প্রভাবে নড়াচড়া প্রতিরোধ করে।
কখনো কখনো ৩০ থেকে ৫০ সেমি পুরু রাবারের ব্লক ব্যবহার করা হয়। যেখানে ভবনের কলাম ফাউন্ডেশন বা ভিত্তির সঙ্গে জুড়ে থাকে, সেখানে এই রাবার প্যাড বসানো হয়।
এ ছাড়া মোশন ড্যাম্পার ও মেশ স্ট্রাকচারের মতো বিভিন্ন প্রযুক্তিও প্রয়োগ করা হয় ভূমিকম্প সহনশীলতা বাড়াতে। মোশন ড্যাম্পারগুলো দেখতে অনেকটা সাইকেলের পাম্পের মতো, তবে এতে বাতাসের বদলে তরল থাকে।
লুবকোভস্কি বলেন, ‘একটি উঁচু ভবন হয়তো দেড় মিটার বা পাঁচ ফুট নড়তে পারে। কিন্তু যদি নির্দিষ্ট স্তরে, প্রতি দ্বিতীয় তলায় ড্যাম্পার বসানো হয়, তবে সেই নড়াচড়া অনেক কমে যায়। ফলে সুপারস্ট্রাকচারের (ওপরের কাঠামোর) ক্ষতি রোধ হয়।’
আর মেশ স্ট্রাকচার ব্যবহার ভবনের সাপোর্টগুলোকে বাঁকানো থেকে রক্ষা করে। যদি একটি অংশ বাঁকতে শুরু করে, কাছাকাছি থাকা অন্য অংশ তা ঠেকায়। এসব প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের কাজে লাগিয়েই দিনের পর দিন ভূমিকম্পের সঙ্গে বসবাস করে আসছে জাপানিরা।
যদিও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় সুউচ্চ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির চেয়ে প্রস্তুতিমূলক মহড়া ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই সঙ্গে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান যাতে সবাই মেনে চলেন তা নিশ্চিত করার তাগিদ তাদের। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিমত, এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।
ছবি : সংগৃহীত
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া একটি লঘুচাপ গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টি তৈরি হলে এর সম্ভাব্য লক্ষ্যস্থল হতে পারে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ বা তামিলনাড়ু উপকূল। এর প্রভাবে আগামী মঙ্গলবার দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। রাজধানী ঢাকাতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টি তৈরি হলে এর নাম হতে পারে ‘অর্ণব’।
আগামী সোমবার এটি উপকূলে আঘাত হানতে পারে। তবে বাংলাদেশে এর প্রভাব খুব বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা নেই। এর প্রভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। ঢাকায় বৃষ্টি হতে পারে মঙ্গলবারের দিকে। তবে বৃষ্টির পরিমাণ খুব বেশি নাও হতে পারে।
এদিকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণাধীন ৫১টি স্টেশনের কোনো স্টেশনেই শুক্রবার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়নি।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, গত কয়েক দিনে বঙ্গোপসাগরে একের পর এক লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব বেশি থাকায় বাতাস সাগরমুখী হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের স্থলভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা কমে যায়। দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য বাড়ছে। দিনের বেলায় গরম থাকলেও রাত ও ভোরের দিকে তাপমাত্রা কমে আসছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে শীতের আমেজ অনুভূত হতে শুরু করেছে।
শুক্রবার সৌদি আরবে নিহত বাংলাদেশি শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ ঢাকায় ফেরার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বিভিন্ন অভিযোগে প্রায় সাড়ে সাত হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন। এ তথ্য জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। একই সঙ্গে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেশটির সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ। শুক্রবার সৌদি আরবে নিহত বাংলাদেশি শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ ঢাকায় ফেরার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের কারাগারে বর্তমানে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বন্দিদের তালিকা পাঠিয়ে বাংলাদেশকে তাঁদের কারাবাস ও দণ্ডের বিষয়ে অবহিত করে। বিভিন্ন কারণে এসব প্রবাসী দণ্ডিত হয়েছেন।
সম্প্রতি মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই দুই বাংলাদেশির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে দুই বাংলাদেশির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে। পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, সৌদি সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। সেটি পাওয়া গেলে ঘটনার বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। সৌদি আরবও তাদের বিচারিক কাঠামো অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তবে কোনো বিদেশি নাগরিক নিহত হলে বা দণ্ডিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের তা জানার প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে। বিষয়টি সমাধানে ধৈর্য ধরতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ওই দুই নাগরিকের বিষয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চায়। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যেই সরকার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায় রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে যাদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঘটেছিল ২০২৩ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেছে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং বর্তমান সরকারের ছয় মাসের সময়কালেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, ২০২৩ সালে ঘটনা ঘটে থাকলে তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করেছে এবং এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। বর্তমান সরকার যখনই এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানতে পারবে, তখনই বাংলাদেশি নাগরিকদের রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
তিনি বলেন, সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে দেশে ফিরে আটকে পড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, দেশে ফিরে আটকে পড়া প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনগুলো কাজ করছে। এ ছাড়া সংঘাতের কারণে যারা চাকরি হারাচ্ছেন, তাদের দেশে পুনর্বাসন কিংবা নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অব্যাহত হামলায় আবারও নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। এসব হামলায় বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও বেশ কয়েকজন হতাহতের ঘটনাও রয়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নিন্দা জানানো হয়। দাম্মামের বাদশা ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি আহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরে মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় দাম্মামের বাদশা ফাহাদ বিমানবন্দরে হামলা হয়। হামলায় এক ভারতীয় ও একজন সৌদি নাগরিক নিহত হওয়ার খবর বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
আহতদের মধ্যে ২ বাংলাদেশি ছাড়াও দুই ভারতীয়, দুই ইয়েমেনি, এক সৌদি ও এক নেপালি নাগরিক রয়েছেন বলে সৌদি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা সঙ্কটজনক।
বাংলাদেশ সব ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে সব ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ এবং কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানেরও আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।
এর আগে গত ১০ অক্টোবর বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত হন। এর পরদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হামলার তীব্র নিন্দা জানায়।
ছবি : সংগৃহীত
আসছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে তাপমাত্রা কমে ঢাকাসহ সারাদেশে শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এরইমধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির শুক্রবার বলেন, “উত্তরের দিকে তাপমাত্রা কিছুটা কমছে। রংপুর বিভাগের কথা চিন্তা করলে তেঁতুলিয়ায় দিন ও রাতের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রয়েছে। রাজারহাট ও দিনাজপুরেও তাপমাত্রা ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আছে। রাজশাহী ও ঈশ্বরদীতেও তাপমাত্রা কমেছে।
“সামনের সপ্তাহে আবহাওয়ার বর্তমান ব্যবস্থাটি কেটে গেলে তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমতে পারে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে তাপমাত্রা আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন ঢাকাসহ সারাদেশে শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে।”
এদিকে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে তথ্য দিয়ে এই আবহাওয়াবিদ বলেন, “পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি আরও ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শনিবার এটি নিম্নচাপে এবং পরে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে।
“এই মুহূর্তে এর কোনো প্রভাব আমাদের ওপর নেই। তবে ২৫ অক্টোবরের পর উপকূলীয় এলাকায় কিছুটা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।”
আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, “আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দেশে বৃষ্টিপাতের তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। পুরো দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে।”
প্রতীকী ছবি
সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ২৯৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু-বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) দুজন ও ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজনের মৃত্যু হয়েছে।
এতে চলতি বছর মশাবাহিত রোগটিতে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ৩৭১ জনে দাঁড়াল।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাহিরে) সবচেয়ে বেশি ২৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পাশাপাশি এই সময়ে বরিশাল বিভাগে ১৫৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১৯, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১১৬, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৩১, খুলনা বিভাগে ১৪৭, ময়মনসিংহ বিভাগে ১০০, রাজশাহী বিভাগে ১১৩ ও রংপুর বিভাগে ৩৮ ও সিলেট বিভাগে দুইজন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সবমিলিয়ে চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে আজ শুক্রবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ৩৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ১৭৯ জন মারা গেছেন।
এ ছাড়া উল্লেখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ৬৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩০ জন, বরিশাল বিভাগে ২৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৩ জন, রংপুরে ৭ জন ও সিলেট বিভাগে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতীকী ছবি
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০৪ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৪ জনে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়।
বুলেটিনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেট বিভাগেই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ১৩৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৫৫৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১৯৪ জন, বরিশালে ১১৫ জন, সিলেটে ৯৪ জন, ময়মনসিংহে ৬৫ জন, খুলনায় ৬০ জন, রংপুরে ২৪ জন এবং রাজশাহীতে ২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৮ জন।
এদিকে, ১৫ মার্চ থেকে দেশে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৭০ জনে। তাদের মধ্যে ২৩ হাজার ২৭৩ জনের শরীরে হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে।