কেমন হবে ভোট- এই প্রশ্ন রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রে
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিনেও প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জানিয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবারের সংসদ নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত, এমন কথা বলছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ। কেমন হবে ভোট- এই প্রশ্নও রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। সেখানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতন ও এরপর রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের বিষয়টি রয়েছে। একইসঙ্গে দেড় দশকে পর পর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবার মানুষের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মোটাদাগে এই দুটি কারণে এই নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচন করেছে একতরফাভাবে। এখন বিএনপি, জামায়াতসহ যে দলগুলো নির্বাচনে প্রধান অংশগ্রহণকারী, তাদের ওই নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হয়েছিল।
আর এর মাঝে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতসহ সব দলই অংশ নিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সেই ভোট পরিচিতি পায় 'রাতের ভোট' হিসেবে। এসব নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচনী ব্যবস্থাই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। এমন প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন ভোটারদের কাছে গুরুত্ব বহন করছে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন। তবে তারা মনে করেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে শঙ্কাও কাজ করছে।
মেরুকরণ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি অন্যতম প্রধান দলের অবস্থানে রয়েছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী পাল্টেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'পার্শ্ব চরিত্রে' ছিল জামায়াত। এখন দলটি সামনে চলে এসেছে।
নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, রাজনীতিতে ডানপন্থি দলগুলোর প্রভাব বেড়েছে। এমন পটভূমিতেই এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন আলোচনায় আসছে। নির্বাচনে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে ১১ দলীয় জোট করেছে জামায়াত। এই জোটে ইসলামী দলের সংখ্যা বেশি। গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিও জামায়াতের জোটে রয়েছে। বিএনপি আসন ভাগাভাগি করেছে তাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও ইসলামপন্থি কয়েকটি দলের সঙ্গে।
আগের দিনেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
এতদিন সাধারণ ভোটার, এমনকি রাজনীতিকদেরও অনেকের মাঝে শঙ্কা ছিল, নির্বাচন হবে কি না। শেষপর্যন্ত যখন নির্বাচন হচ্ছে এবং পুরো দেশ ভোটের অপেক্ষায়, এমন প্রেক্ষাপটেও বিএনপি ও জামায়াত সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জানিয়েছে। জামায়াতের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার আমির ধরা পড়েছেন ৭৪ লাখ টাকা নিয়ে। তিনি ঢাকা থেকে বিমানে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে এই বড় অংকের অর্থসহ ধরা পড়েন।
এটি একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এই অর্থের বিষয়টি অস্বীকার না করলেও জামায়াত সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, ভোটের আগের দিনে তাদের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমির শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লিখেছেন, "জামায়াতের জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থনে ভীত হয়ে একটি গোষ্ঠী ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য এ ধরনের অপচেষ্টায় লিপ্ত।"
জামায়াত জোটের অন্যতম শরিক এনসিপিও ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে অর্থ্যাৎ বুধবার মধ্যরাতের পর সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছে। এদিকে, বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, "বিএনপি'র অনিবার্য বিজয়ের বিপরীতে একটি গোষ্ঠী নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।"
জামায়াতের ঠাকুরগাঁও জেলা আমিরের কাছে বড় অংকের টাকা উদ্ধারের ঘটনাও উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তিনি অভিযোগ করেন, "জামায়াতে ইসলামীর আমিরের নির্বাচনী আসন ঢাকা-১৫'সহ কুমিল্লা, নোয়াখালী, খুলনায়ও একই অবস্থা চলছে।" সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ঘটনা ছাড়াও শরিয়তপুর ও কুমিল্লায় জামায়াত নেতার কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের অভিযোগ উঠেছে।
গত মধ্যরাতে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খানও এক সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে, লক্ষ্মীপুরে যৌথবাহিনীর তল্লাশীচৌকিতে একটি গাড়ি থেকে ১৫ লাখ টাকা উদ্ধার ও তিনজনকে আটকের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় আটকরা বিএনপি প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সমর্থক বলে স্থানীয় পুলিশ জানায়। এ্যানি দাবি করেন, ঘটনাটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা হচ্ছে। দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে টাকা উদ্ধারের ঘটনাগুলোই বড় বিষয় হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, দুই পক্ষই একে অপরকে সন্দেহ করছে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রশ্নে।
কেমন হবে ভোট
সারাদেশে সেনাপুলিশসহ সব বাহিনী বেশ সক্রিয় রয়েছে। ভোটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ একটা বড় ইস্যু হয়ে রয়েছে। এমন পটভূমিতে ভোটের নিরাপত্তার প্রশ্নে ভোটারদের পাশাপাশি দলগুলোর মধ্যেও শঙ্কা কাজ করছে।
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব বেশি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। এ প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরকে সন্দেহ করছে বলে মনে হয়েছে। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসি বাংলাকে বলেন, শেষপর্যন্ত ভোট শান্তপূর্ণ হবে বলে তারা আশা করছেন।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও একইরকম আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। দল দুটির শীর্ষ নেতারা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করছেন। কিন্তু ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে দুই দলই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে এবং তাতে তাদের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ্বাসের বিষয়ই প্রকাশ পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো সতর্ক থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে বলে তার প্রত্যাশা।
নির্বাচনের পরে চ্যালেঞ্জ
বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, ভোটের পরই বড় চ্যালেঞ্জ। যে দল ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য আইনশৃঙ্খলা এবং অর্থনীতি প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। বিশ্লেষকেরাও একইভাবে দেখেন পরিস্থিতিটাকে। তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত আঠারো মাসে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আর অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ স্থবির হয়েছে। যদিও বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার কথা বলছে সরকার। কিন্তু বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা এবং দেশের অর্থনীতির স্থবিরতাই নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকে ভোগাতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পর এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান আলোচ্য বিষয়- নতুন সরকার গঠন ও সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে। ৩০০ আসনের সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসন। ইতোমধ্যে দুই শতাধিক আসনে জয় নিশ্চিত করে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।
দলীয় ঘোষণানুযায়ী, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের আগেই দলীয়ভাবে তার নেতৃত্বে সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
কেমন হবে নতুন মন্ত্রিসভা?
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটায় অনির্বাচিত বিশেষজ্ঞ ও জোটসঙ্গীদেরও অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে।
দলীয় কার্যালয় ও শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায় ইতোমধ্যে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নাম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই দৌড়ঝাঁপ করছেন, যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে।
স্থায়ী কমিটির সম্ভাব্য সদস্যরা
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বলে জানা গেছে। আলোচনায় যাদের নাম ঘুরছে, তারা হলেন—
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
মির্জা আব্বাস
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়
ড. আব্দুল মঈন খান
সালাউদ্দিন আহমেদ
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু
ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ
আলোচনায় আরও যেসব নাম
এছাড়াও সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন- খন্দকার মোক্তাদির, অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, রেজা কিবরিয়া, এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আসাদুল হাবীব দুলু, আফরোজা খানম রিতা, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, জয়নুল আবদীন ফারুক, মিজানুর রহমান মিনু, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, আ ন ম এহসানুল হক মিলন, জহির উদ্দিন স্বপন, আলী আজগর লবী, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, রকিবুল ইসলাম বকুল, শরীফুল আলম, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, নজরুল ইসলাম আজাদ, জিকে গউছ, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, জাকারিয়া তাহের সুমন, অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, শহিদুল ইসলাম বাবুল, ফজলুল হক মিলন, অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, রফিকুল ইসলাম মজনু, ডা. মাহবুবুব রহমান লিটন, সাইদ আল নোমান, হাবিবুর রশিদ হাবিব, এসএম জিলানী, খন্দকার আবু আশফাক, ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এবং দীপেন দেওয়ান।
টেকনোক্র্যাট ও জোটসঙ্গীদের সম্ভাবনা
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বেগম সেলিমা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, হুমায়ন কবির এবং মাহদী আমিন টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ এবং জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান বর্ষীয়ান নেতা মোস্তফা জামাল হায়দারকেও (টেকনোক্রেট কোঠায়) মন্ত্রীসভায় দেখা যেতে পারে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বৃহস্পতিবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক পার করল বাংলাদেশ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট; নারী ও তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পক্ষে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত রচনা করেছে।
দলগুলোর প্রাপ্ত ফলাফল বলছে, স্থিতিশীলতা ও নতুন রাজনৈতিক পরিবেশের আকাঙ্ক্ষা এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা পর্যন্ত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক ফল অনুযায়ী ২৯৯ আসনের মধ্যে বিএনপি ২১৩টিতে জয়ী হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ৬৮, এনসিপি ৬, গণঅধিকার ১, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে জয়লাভ করেছে। এ ছাড়া ১০টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।
সরকারি সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ২০২, জামায়াত ৬৪, এনসিপি ৫, গণঅধিকার ২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১ এবং ১২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ের পথে রয়েছেন।
ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাদের দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী। ৩০০ আসনের বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে এককভাবে সরকার গঠন করতে ১৫১ আসন প্রয়োজন। পাশাপাশি দুই শতাধিক আসন পাওয়া দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সংসদে সংবিধান পরিবর্তনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
যদিও এবারের সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে’ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এক কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এবারই প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি নিজেও এবার প্রথম প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনের মাসখানেক আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে তাঁর নেতৃত্বেই দলের নির্বাচনী প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগেই জানিয়েছেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারেক রহমানই হবেন প্রধানমন্ত্রী।
ভোটের ফলের এই প্রবণতাকে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, ভোটার মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন এবং সংগঠনগত সক্ষমতার সমন্বিত ফল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই নির্বাচনে মূল যে চিত্র উঠে এসেছে তা হলো একমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর কারণ ক্ষমতার শূন্যতা। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোট ছিল কার্যত একমুখী। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত থাকায় বিরোধী ভোট একত্রিত হয়েছে এবং বিএনপি এর বড় সুবিধা পেয়েছে। আবার জামায়াত ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভোট ও আসন পেতে যাচ্ছে। ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে জামায়াতের এমন ফল বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটার অংশ নেওয়ায় তা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তরুণরা দলীয় ঐতিহ্যের চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীর উপস্থিতিও ছিল বরাবরের মতো ভালো, যা মোট ভোটারের ৪৯ শতাংশ।
একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটাররা আওয়ামী লীগহীন এই নির্বাচনে কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। সারাদেশে সংখ্যালঘু ভোটার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক ক্ষেত্রে তারা সম্ভাব্য জয়ী প্রার্থী বা স্থানীয়ভাবে নিরাপদ মনে হওয়া প্রার্থীর দিকে ঝুঁকেছেন, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
এর বাইরে বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন পর ভোটের মাঠে সংগঠিতভাবে সক্রিয় ছিল। জামায়াত আওয়ামী লীগহীন ভোটের মাঠকে তার জন্য ঐতিহাসিক করে তুলতে দলের তৃণমূলকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, সংসদ এবং গণভোটে ৬১ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। চূড়ান্ত হিসাবের পর এই সংখ্যা বাড়তে পারে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া এবং সহিংসতার শঙ্কা ছিল।
বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ছাড়াও কেন্দ্র দখলের চেষ্টা, জাল ভোটসহ নানা অনিয়মও হয়েছে কিছু স্থানে। তবে বিএনপি, জামায়াতসহ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ জানিয়ে ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের বিরুদ্ধে। এগিয়ে রয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা-১৫ আসনে এগিয়ে রয়েছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রাথমিক ফলাফলে হেরে গেছেন খুলনা-৫ আসনে। ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে বিএনপির প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছিল। সদস্য সচিব আখতার হোসেন কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে এগিয়ে রয়েছেন রংপুর-৪ আসনে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়ে। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে যথাক্রমে ভোট পড়ে ৭৫ ও ৭৬ শতাংশ। ২০০৮ সালে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৭ শতাংশ। পরের তিনটি নির্বাচনে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখালেও যা নিয়ে সন্দেহ ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে কম একজনের প্রাণহানি হয়। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের দিনে আটজন নিহত হন। অন্য নির্বাচনের দিনেও ১০ থেকে ২০ জন নিহত হয়েছিলেন। এবারই প্রথম কারও প্রাণহানি হয়নি সংঘাত-সহিংসতায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। দেড় বছরে নানা ধাপ পেরিয়ে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় বহুল কাঙ্ক্ষিত সংসদ নির্বাচন। একসঙ্গে চলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট। সাদা ব্যালটে সংসদ নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোট দেন ভোটাররা।
সহিংসতা কিংবা ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে অথবা কোনো অনিয়ম ঘটলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় ভোটের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জাতীয় হোক বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন—যেকোনও কেন্দ্রের ভোট বাতিল হওয়া মানেই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হওয়া। ভোটারদের নিরাপত্তা, প্রার্থীদের অভিযোগ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা—সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে তখন কমিশনকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রয়োজনে পুরো আসনের ভোটও স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে।
নির্বাচন আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে কোনও কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত বা বাতিল ঘোষণা করার ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের। নির্বাচন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ‘ভোটের স্বচ্ছতা নষ্ট হলে বা ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার মতো অনিয়ম প্রমাণিত হলে, ভোট বাতিল ছাড়া বিকল্প থাকে না।’
ভোট বাতিল হতে পারে যেসব কারণে
ভোট সংশ্লিষ্টরা জানান, ভোটকেন্দ্র দখল, মারামারি, ককটেল বা বোমা হামলা, গুলিবর্ষণ, ব্যালট ছিনতাই কিংবা ভাঙচুরের মতো সহিংসতার ঘটনা ঘটলে ভোটগ্রহণ অব্যাহত রাখা সম্ভব হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রিসাইডিং অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে ভোট স্থগিত করতে পারেন। পরে তদন্ত শেষে অনেক ক্ষেত্রে কমিশন পুনরায় ভোটের সিদ্ধান্ত দেয়।
ভোটের ব্যালট পেপার নষ্ট বা হারিয়ে গেলে ভোটের সঠিকতা নিশ্চিত করা যায় না। আইন অনুযায়ী, এমন অবস্থায় ওই কেন্দ্রের ফলাফল গ্রহণযোগ্য থাকে না। এছাড়া বুথ দখল করে একযোগে জালভোট প্রদান, একজনের একাধিকবার ভোট দেওয়া কিংবা সংঘবদ্ধ কারচুপি ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ নির্বাচনের পরিপন্থি। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফলাফল বাতিল করা হয়।
এছাড়া ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া, হুমকি বা জোরপূর্বক ভোটদানে প্রভাব বিস্তার করাও ভোট বাতিলের কারণ হতে পারে। এসব পরিস্থিতি ভোটারদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এবং ভোটগ্রহণের পরিবেশ নষ্ট করে।
প্রিসাইডিং অফিসার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কখনও কখনও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, ইচ্ছাকৃত ত্রুটি, ফলাফল পরিবর্তন বা নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনাও সামনে আসে। কর্মকর্তার কারচুপি প্রমাণিত হলে সেই কেন্দ্রের ভোট বাতিল হতে পারে।
আরেকটি বড় কারণ হলো প্রযুক্তিগত ত্রুটি। ব্যালট পেপার ভুল ছাপা, সিল বা সরঞ্জামের সমস্যা, ইভিএম বিকল হওয়া কিংবা ডেটা গরমিলের মতো ঘটনায় ভোট স্থগিত বা বাতিলের নজির রয়েছে।
কোনো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ভোটার ও কর্মকর্তাদের জীবন-ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন অবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে ভোটগ্রহণ বন্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কর্মকর্তাদের। এছাড়া কোনও প্রার্থীর অভিযোগ বা রিটের ভিত্তিতে আদালত ভোট বা ফলাফল স্থগিতের নির্দেশ দিলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বা আসনের ভোটও বাতিল বা স্থগিত করা হয়।
বাড়তি সতর্কতা
আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে বাড়তি নিরাপত্তা, সিসিটিভি নজরদারি, পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় জোরদারের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্র যেন বাতিলের বদলে স্বচ্ছ, নিরবচ্ছিন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য থাকে—সে লক্ষ্যেই সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার ৮ লাখের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচন কমিশনার কী বলছেন
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া যদি কোনও কারণে বাধাগ্রস্ত বা ‘ইন্টারাপ্টেড’ হয়ে যায় এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়—যেখানে স্বাভাবিকভাবে ভোট পুনরায় শুরু করা সম্ভব নয়, তাহলে প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব হলো তাৎক্ষণিকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা। সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা বা কারিগরি সমস্যার কারণে যদি দীর্ঘ সময়, যেমন- একঘণ্টা বা তার বেশি সময় ভোট বন্ধ থাকে এবং পরিবেশ স্বাভাবিক করা না যায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে ভোটের ধারাবাহিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়। তখন ভোট চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সেটি বন্ধ করে দিতে হয়।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রিসাইডিং অফিসার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করবেন। পরে রিটার্নিং অফিসার তদন্ত ও প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। কমিশন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে ওই কেন্দ্রে পুনরায় ভোট বা নতুন তারিখে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবেন।
ইন্টারাপশনের কারণ বিভিন্ন হতে পারে উল্লেখ করে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, কিংবা এমন কোনও অস্বাভাবিক অবস্থা, যেখানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে ভোটের পবিত্রতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে সেটিকে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি সিচুয়েশন’ হিসেবে বিবেচনা করে ভোট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আমাদের দায়িত্ব শুধু ভোট চালু রাখা নয়, বরং সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। তাই পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে ভোট বন্ধ করা এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনকে জানানোই হলো সঠিক ও আইনসম্মত পদক্ষেপ।
এই বাড়িতেই পাশার কার্যালয়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম ভোট উৎসব পর্যবেক্ষণ করার আগ্রহ দেখিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংস্থা। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বেসরকারি সংস্থা পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)। এনজিওটিকে ১০ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের মাত্র চার দিন আগে সেই পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছে কমিশন। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিব আখতার আহমেদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার। এর আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় ইসি সচিবও উপস্থিত ছিলেন। আবুল কালাম বলেন, ‘পাশা’ নামে একটি এনজিও ১০ হাজার নির্বাচন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করবে বলে বলেছিল। নির্বাচন কমিশন থেকে তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছে। খোঁজ খবর নিয়ে তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে ইসি নিশ্চিত হতে পারেনি। এ জন্য তাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কার্ড বিতরণ স্থগিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সংস্থাটির ব্যাপারে অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের ব্যাপারে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। এর আগে শুক্রবার পাশার সক্ষমতা নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। এরপর এমন সিদ্ধান্তের কথা জানাল সরকার।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, সরকার গঠিত হলে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। আজ শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকালে এসব কথা বলেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, আমরা আমাদের ৩১ দফার মাধ্যমে একটি প্রস্তাব জাতির সামনে অনেক আগেই উপস্থাপন করেছিলাম। সেই প্রস্তাবটি হচ্ছে- যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তার পদে মেয়াদ ১০ বছরের বেশি হবে না। এটি নথিভুক্ত, তাই এই কৃতিত্ব অবশ্যই আমরা গ্রহণ করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে। বিএনপি ৩১ দফা উপস্থাপনের সময় জানিয়েছিল, এটি ধীরে ধীরে যৌক্তিক অবস্থানে আনা হবে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ভোটাধিকার ও নির্বাচনের বিষয়টি সুরক্ষিত রাখতে হবে। নিরপেক্ষ ভোটই দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক।
৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের মতো নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিতে পারে। তাই আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
ইংলিশ কিংবদন্তি নাসের হুসেইন
বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত এবং আইসিসিকে এক হাত নিলেন ইংলিশ কিংবদন্তি নাসের হুসেইন। তার সাফ কথা, ভারত যদি এমনটা করতো, আইসিসি কি তাদের বাদ দিতে পারতো? স্কাই স্পোর্টস ক্রিকেট-এর এক পডকাস্টে নাসের হুসেইন বলেন, ‘ভারত যদি কোনো টুর্নামেন্টের এক মাস আগে বলতো যে তাদের সরকার বিশ্বকাপের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশে খেলতে চায় না। তাহলে কি আইসিসি এতটা কঠোর হতো এবং বলতো, ‘নিয়ম তো নিয়মই-দুঃখিত, আমরা তোমাদের বাদ দিচ্ছি?’
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মনে করেন, সবার সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে আচরণ করা হচ্ছে না। তার কথা, ‘সব পক্ষ আসলে একটাই জিনিস চাইছে-ধারাবাহিকতা ও ন্যায্যতা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত-এই তিন দেশকে একইরকম দেখা উচিত। হ্যাঁ, ভারতীয় সমর্থকেরা বলতে পারেন, ‘আরও কাঁদো, আমাদের কাছেই টাকা আছে।’ ‘কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে। বারবার বাংলাদেশ বা পাকিস্তানকে পাশে সরিয়ে রেখে তাদের ক্রিকেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। এ কারণেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দুর্দান্ত ম্যাচগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই একপেশে হয়ে উঠেছে।’
নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দেখিয়ে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ। পরবর্তীতে আইসিসি বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করলে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়। এই সিদ্ধান্তকে ‘অসম ও অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ’ বলে সমালোচনা করে পাকিস্তানসহ একাধিক পক্ষ। যার জেরে ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান।