ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য ক্রিস্টাল জিমারম্যান। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধ নিয়ে বেশ চিন্তিত। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিষয়ে আগে সমর্থন দিলেও বর্তমান পরিস্থিতি তাঁকে ভাবিয়ে তুলছে।
একের পর এক বোমা হামলা আর চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ট্রাম্পের হুমকির পর এখন একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি চলছে। এ পরিস্থিতি থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার কোনো পথ নেই। জিমারম্যানের আশঙ্কা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো নিজের অজান্তেই এক অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন।
বাগদাদ থেকে ফেরার পর বিষণ্নতা ও অনিদ্রায় ভুগছেন ৪০ বছর বয়সী জিমারম্যান। কলোরাডো স্প্রিংসের একটি ভেটেরানস অ্যাফেয়ার্স ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়া শেষে তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ আসলে সম্পদ ও অর্থের অপচয়। এতে আমাদের ভাবমূর্তি একজন উৎপীড়কের মতো হয়ে উঠছে।’
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সাত সপ্তাহে গড়িয়েছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প আবারও তার চিরায়ত বাগাড়ম্বর ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে ফিরে গেছেন।
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তিনি দেশটির বন্দর অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিকের মনেই ক্ষোভ, হতাশা ও বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রতি ১০ মার্কিন নাগরিকের মধ্যে প্রায় ৬ জনই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের বিরোধী। বলা বাহুল্য, ২০০০-এর দশকের শুরুতে ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণ বা ’৯০-এর দশকে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ে জনগণের জোরালো জনসমর্থনের তুলনায় এটি এক বড় পরিবর্তন।
অনেকের মতে, এই যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রশাসন বিভ্রান্ত। তাদের ধারণা, প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধের জন্য জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেননি এবং যুদ্ধের কারণও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। উত্তর ক্যারোলাইনার ফেয়্যাটভিল শহরে কফিতে চুমুক দিতে দিতে ১৯ বছর বয়সী এমেলিয়া লরেঞ্জেন বলেন, ‘আমার মনে হয় না ট্রাম্প কোনো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।’
ফেয়্যাটভিল শহরটি ফোর্ট ব্র্যাগ সেনাঘাঁটির জন্য বিখ্যাত। এখানে সেনাবাহিনীর স্পেশাল অপারেশনস এবং থার্ড স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপের সদর দপ্তর অবস্থিত। তবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই বিরোধিতার সুর এখনো বেশ মৃদু। ক্যাফের আড্ডা কিংবা সাবেক সেনাসদস্যদের সভায় আলাপচারিতার মধ্যেই মূলত এই অসন্তোষ দানা বাঁধছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বা ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের প্রাক্কালে যেমন বিশাল গণবিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল, এবার তার পরিবর্তে শুধু ছোটখাটো সমাবেশ হচ্ছে।
আমি অবাক হচ্ছি যে আরও বেশি মানুষ কেন রাস্তায় নামছে না। তবে সত্যি বলতে, তিনি (প্রেসিডেন্ট) এখন যা-ই করুন না কেন, তাতে অবাক হওয়াটাও কঠিন।
৬৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক মাইক কিফ
অরেগনের পোর্টল্যান্ডে একটি অভিবাসন আটক কেন্দ্রের বাইরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ৬৪ বছর বয়সী মাইক কিফ বলেন, ‘আমি অবাক হচ্ছি, আরও বেশি মানুষ কেন রাস্তায় নামছে না। তবে সত্যি বলতে, তিনি (প্রেসিডেন্ট) এখন যা-ই করুন না কেন, তাতে অবাক হওয়াটাও কঠিন।’
ইরান যুদ্ধের বিরোধিতার বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক দলের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাট ভোটারদের বড় অংশ এই যুদ্ধের বিরোধী। অন্যদিকে রিপাবলিকান ভোটারদের বেশির ভাগই প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে সমর্থন জানাচ্ছেন। জরিপটি সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির আগে করা হয়েছিল।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়তে থাকা রিপাবলিকানদের জন্য অশনিসংকেত দিচ্ছে পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ। এতে দেখা গেছে, রিপাবলিকানঘেঁষা নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধের সমর্থন নিয়ে স্পষ্ট বিভক্তি রয়েছে। ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলের প্রতি ৫২ শতাংশ ভোটার সমর্থন জানালেও ৪৫ শতাংশই এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
সিএনএনের মার্চ মাসের এক জরিপ অনুযায়ী, রিপাবলিকান দলের ভেতরের এই ফাটল মূলত ট্রাম্পের গতানুগতিক কট্টর সমর্থকদের বাইরে থেকে তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যারা নিজেদের ‘মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) রিপাবলিকান’ হিসেবে পরিচয় দেন না, তাদের মধ্যে যুদ্ধের সমর্থনের হার কট্টর সমর্থকদের তুলনায় অনেক কম।
এই জরিপে আরও দেখা গেছে, ৪৫ বছরের বেশি বয়সী রিপাবলিকানদের তুলনায় তরুণ রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের এই সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্তকে অনেক কম সমর্থন করছেন। সামগ্রিকভাবে নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া ভোটাররা এই যুদ্ধের জোরালো বিরোধিতা করছেন।
এমনকি যেসব রিপাবলিকান এই যুদ্ধ সমর্থন করছেন, তাঁরাও এ পরিস্থিতিকে খুব একটা সন্তোষজনক মনে করছেন না। পিউ জরিপ বলছে, এই রিপাবলিকানদের মাত্র অর্ধেক মনে করেন যে যুদ্ধ ঠিকঠাক এগোচ্ছে।
কলোরাডো স্প্রিংস, সান আন্তোনিও এবং ফিয়্যাটভিলের মতো সামরিক শহরগুলোয় নেওয়া এসব সাক্ষাৎকারে ভোটাররা তাঁদের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ট্রাম্প ‘বোকামিপূর্ণ যুদ্ধবিরোধী’ এবং শান্তির পক্ষে প্রচার চালিয়ে ক্ষমতায় এলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আরও একটি ইরাক বা আফগানিস্তান যুদ্ধের দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন।
যুদ্ধ শুরুর ছয় সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও মার্কিনদের অনেকেই জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধে প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য কী, কিংবা কেন তিনি এ সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে হামলায় যোগ দিলেন-সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। তাঁদের মতে, সবকিছুই খুব দ্রুত এবং অসংলগ্নভাবে ঘটেছে।
মার্কিন নাগরিকেরা বলছেন, জর্জ ডব্লিউ বুশ বা তাঁর বাবা জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের মতো সাবেক প্রেসিডেন্টরা আফগানিস্তান বা ইরাক হামলা এবং কুয়েত থেকে সাদ্দাম হোসেনকে হটানোর অভিযানের আগে মাসের পর মাস এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তখন আন্তর্জাতিক জোট গঠন করা হয়েছিল এবং কংগ্রেসেও বিতর্ক হয়েছিল।
অথচ এবার ইরানে হামলার আগে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। এর ওপর সাংবাদিকদের সঙ্গে ফোনালাপে এবং ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ গভীর রাতে ট্রাম্পের দেওয়া একের পর এক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্চের শুরুর দিকের এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার এবং ৭১ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার মনে করেন, যুদ্ধের আগে ট্রাম্প কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। বিপরীতে ইরাক যুদ্ধের আগে বুশ যেসব যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, তা জনসাধারণের বড় একটি অংশের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল বলে জরিপে দেখা গেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া লরেঞ্জেন তাঁর একটি হুমকিতে বিশেষভাবে বিচলিত। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে তিনি দেশটির পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দেবেন। শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় সেই ভয়াবহ ঝুঁকি আপাতত এড়ানো গেছে।
লরেঞ্জেন বলেন, ‘ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান দিক ছিল তিনি নিজেকে একজন যুদ্ধবিরোধী মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। অথচ সেই কথা বলার পর এখন আমরা তাঁকে এত দ্রুত যুদ্ধের দিকে পা বাড়াতে দেখছি। বিষয়টি আসলে মোটেও বোধগম্য নয়।’
ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে এই ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’ ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে। ওই দুই যুদ্ধে ৭ হাজারের বেশি মার্কিন সেনাসদস্য ও ঠিকাদার প্রাণ হারিয়েছেন।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ভোটাররা ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সেই মিথ্যা দাবি এবং আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের রক্তাক্ত বিদায়ের কথা টেনে আনছেন। তাঁদের মনে এখন একটাই সংশয়, আবারও কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে?
৫৫ বছর বয়সী সাবেক মেরিন সেনা কুয়েতা রদ্রিগেজ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সময় ভার্জিনিয়ার কোয়ান্টিকোতে এক ঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি সে সময়কার সম্মিলিত শোক এবং মার্কিন নাগরিকদের একতাবদ্ধ হওয়ার কথা মনে করেন। ইরাক আক্রমণের বিষয়ে বুশের যুক্তির সঙ্গে তিনি একমত না হলেও রদ্রিগেজ মনে করেন, বুশ অন্তত জনগণকে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
সান আন্তোনিওর বাসিন্দা রদ্রিগেজ এখন ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ। কারণ, ট্রাম্প দেশকে এমন এক অঞ্চলে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন, যেখানে অনেক সেনা ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন। প্রেসিডেন্টকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় তিনি কংগ্রেসের ওপর হতাশ এবং অনেক নাগরিককে এই যুদ্ধ নিয়ে নির্লিপ্ত দেখে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
রিপাবলিকানপন্থী অন্যান্য সাবেক সেনা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাঁরা এখনো ট্রাম্প ও এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া এবং শত শত মার্কিন সেনা হত্যায় সহায়তা করা একটি ‘ধর্মতাত্ত্বিক স্বৈরতন্ত্রের’ ওপর হামলা চালানোর জন্য তাঁরা ট্রাম্পের প্রশংসা করছেন।
ট্রাম্পের সমালোচকেরা যেখানে ইরান হামলাকে অগোছালো বলছেন, সেখানে তাঁর গোঁড়া সমর্থকেরা মনে করেন এই হামলা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।
ইরাকে দায়িত্ব পালন করা ৫৮ বছর বয়সী গ্যারি ফ্রিস বলেন, ‘ইরান একটা হুমকি, একে নির্মূল করা দরকার।’ বর্তমানে নিজের হার্লে ডেভিডসন মোটরসাইকেল নিয়ে রকি মাউন্টেন চষে বেড়ানো এই সাবেক সেনা বলেন, ইরান আক্রমণ করে ট্রাম্প দেখিয়েছেন, ‘তাঁর মেরুদণ্ড আছে।’
পশ্চিম আইওয়ার গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও ট্রাম্পের যুদ্ধের প্রতি জোরালো সমর্থনও রয়েছে। গত তিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এ অঞ্চলে ট্রাম্পের জয়ের ব্যবধান ক্রমাগত বেড়েছে।
নিজের খামারের গরুর মাংস বিক্রি করেন ৫১ বছর বয়সী কেলি গ্যারেট। তিনি এমন একজন কৃষক, যিনি সরকারের এই ইরান আক্রমণের যৌক্তিকতা পুরোপুরি না বুঝলেও তাতে সমর্থন দিচ্ছেন। মূলত অনেক রিপাবলিকানেরই প্রেসিডেন্টের ওপর অটুট বিশ্বাস রয়েছে।
ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক ও কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে আগে থেকেই বিপর্যয়ের মুখে আছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলো। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার ও ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। ঠিক যে সময় কৃষকেরা বীজ বপনের জন্য জমি ও যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করছিলেন, তখনই অর্থনীতির ওপর এই নতুন আঘাত এল।
তবু আইওয়ার অনেক রিপাবলিকান কৃষক এই উচ্চমূল্যের জন্য ট্রাম্পকে নয়, বরং করপোরেট মুনাফাখোরদের দায়ী করছেন।
অবসরপ্রাপ্ত কৃষক কট্টর রিপাবলিকান সমর্থক ওয়েইন ব্রিঙ্কস (৭২) মনে করেন, যদি এই যুদ্ধের ফলে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা যায়, তবে বর্তমানের এই সাময়িক কষ্ট মেনে নেওয়া সার্থক হবে।
ইরানের নেতৃত্ব সম্পর্কে ব্রিঙ্কস বলেন, ‘ওরা চরম ধর্মীয় উগ্রপন্থী। আমার মনে হয় প্রেসিডেন্ট ভেবেছেন পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়। পরে কখনোই তা সম্ভব হবে না। আমাদের কিছু একটা করতেই হতো।’
তবে কট্টর রিপাবলিকান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আইওয়াতেও এখন সন্দেহ আর উদ্বেগ দানা বাঁধছে। উডবেরি কাউন্টির কৃষক ও রিপাবলিকান সুপারভাইজার মার্ক নেলসন (৩৫) ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এই আক্রমণ প্রেসিডেন্টের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বার্তাকেই ক্ষুণ্ন করছে।
ট্রাম্পপন্থী প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন, অ্যালেক্স জোনস এবং মেগিন কেলিদের মধ্যেও এমন সমালোচনা এখন জোরালো হচ্ছে।
নেলসন বলেন, ‘এই যুদ্ধে যে পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ ব্যয় হচ্ছে, তা হাস্যকর।’ যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রভাব কতটা ছিল, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। নেলসনের মতে, ‘আমার মনে হয় না, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কোনো আসন্ন বিপদ ছিল।’
ছবি : সংগৃহীত
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চলছে।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানির সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে নদীর পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে।
বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতে আটকা পড়া ৫৫৫ জন পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বন্যা আঘাত হানার পর তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চীনের কঠোর সংবাদনিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসছে ধীরে ধীরে।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া ৫৫৫ পর্যটকের জাতীয়তা জানায়নি সিনহুয়া। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যটকদের সংখ্যা নেপালে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
পাহাড় থেকে হুড়মুড় করে নেমে এলো কাদা, বরফ আর পাথরের ঢল। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন শুধুই স্বজনহারাদের আর্তনাদ। আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ দুর্যোগ ছিল না। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে এক ‘স্থলভাগের সুনামি’।
গতকাল বৃহস্পতিবারও ঘটনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকেই। এই দুর্যোগের হাত থেকে যারা রেহাই পেয়েছেন, তারাও একেকজন বেঁচেছেন একেকভাবে। তাদের ঘটনাও অবাক করে দেওয়ার মতো।
যেমন- নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল গত বুধবার নবনির্মিত একটি বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন। সেই সময় মাটি ও কাদামিশ্রিত সেই জলপ্রবাহ ধেয়ে আসতে শুরু করে। গর্তের বাইরে থাকা তাঁর চার সহকর্মী চিৎকার করে বিবেককে বাইরে আসতে বলেন।
বিবেক কুমাল পাঁচ ফুট গভীর গর্ত থেকে বের হয়ে দেখেন তাঁর সঙ্গীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। এর পর উঁচু পানি এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’
বিবেক জানান, তিনি ভেসেই যেতেন। হঠাৎ একটি আমগাছে আটকে যাওয়ায় তাঁর প্রাণ বেঁচে যায়। বিবেকের পাশাপাশি আরও তিনজনকে গতকাল চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। তারাও বিভীষিকাময় সেই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, বেঁচে ফেরাদের অনেককে গতকাল বৃহস্পতিবার একা হাঁটতে দেখা যায়। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এ রকমই আরেক বেঁচে ফেরা ব্যক্তির নাম ওমকার জোশি। তিনি আগের দিন কাছের এক পাহাড়ে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি এএফপিকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে।
তিনি জানান, সেখানের ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জোশি বলেন, এটি এখন সুবিশাল এক কবর। শুধু মানুষের রক্তে রঞ্জিত বালু আর পাথরের টুকরো পড়ে আছে।
জোশির দেওয়া তথ্যানুসারে, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে কোনো রকমে উঠে জীবন বাঁচান। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন তারা।
এদিকে, এখনও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের যেতে হচ্ছে আরেক দুর্বিষহ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। এ রকমই একজন সীতা বিকে। তিনি তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন, যিনি পেশায় তিমুরের একজন স্কুলশিক্ষক।
সীতা বলেন, ‘আমি খবর শোনার আগে সকালে তার সঙ্গে কথা বলেছি। তবে ঘটনার সময় থেকেই তার ফোন বন্ধ।’
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের (কর্মকর্তাদের) প্রথম অগ্রাধিকার হলো যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’
কাছেই এক কোনায় বসে কাঁদতে দেখা যায় আনিশা নেপালি নামে একজনকে। ২৪ বছর বয়সী আনিশা খবর শুনে গত বুধবারই কাঠমান্ডু থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাননি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনও কিছু শুনতে পাইনি।’
ত্রিশূলি নদীতীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। বাসিন্দারা জানান, মাত্র একটি বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটি রক্ষা পেয়েছে, সেটিও একটি চারতলা বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কাদামাটির জলপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সময় সাত বয়োবৃদ্ধ সেটিতে তলিয়ে যান। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে আছেন।
তিমুর শহরের এক বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন তারা। ওই সতর্কবার্তায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। তবে বাদ বাকি সব ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’
ভূমিধসের সময় বড়ালের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বড়াল বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির আচমকা এভাবে চলে আসার বিষয়টি অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো।
ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে আকস্মিক ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ওমরাহযাত্রীরা। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই মক্কার বিখ্যাত ক্লক টাওয়ারের চূড়ায় একটি শক্তিশালী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। পবিত্র কাবা শরিফের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই বিশাল ক্লক টাওয়ার। ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে একটি তীব্র আলোকচ্ছটা সরাসরি টাওয়ারের ওপর আছড়ে পড়ে।
বজ্রপাতের তীব্র আলোয় পুরো মক্কা নগরী মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে ওঠে। এই রোমহর্ষক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পর তা নেট দুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সৌদি আরবের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাত থেকে মক্কা এবং এর আশপাশের এলাকায় তীব্র বাতাস ও ভারী বজ্রঝড় শুরু হয়। ঝড়ের কারণে কাবা শরিফের মাতাফে (তাওয়াফের স্থান) অবস্থানরত ওমরাহযাত্রীরা তীব্র বাতাসের মুখোমুখি হন। ঝোড়ো হাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মক্কা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আবহাওয়া অফিস আগামী কয়েকদিন এই এলাকায় আরও ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
মক্কার ক্লক টাওয়ার বা আবরাজ আল-বাইত বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন। এর চূড়ায় উন্নত বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা বা লাইটনিং রড বসানো রয়েছে। এই ব্যবস্থার কারণে বিশাল বজ্রপাতের পরও টাওয়ারের কোনো বড় ক্ষতি হয়নি এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে পবিত্র এলাকাটি রক্ষা পেয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
ছবি : সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত ৭ আগস্ট চুক্তিতে সই করেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। মুসলমানদের পবিত্র শহর মক্কায় এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি এর তাৎপর্য নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ-ই এই তিনটি দেশ এই ধরনের চুক্তিতে একমত হয়নি। ২০২৩ সালে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীত সময়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পারিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সাক্ষর করেছিল। তারই ধারাবাহিকতাই এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি।
এই চুক্তি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।
তবে, এই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়া নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের বক্তব্যই পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশে যুক্ত হলে সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে, এই বাংলাদেশ যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কী?
গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নানা সংকট চলছে। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের পর ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এই পরিস্থিতিতে আরো জটিল করে তোলে। এমন অবস্থায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
কেননা, এই চুক্তিতে বলা হয়েছে জোটভুক্ত কোনো একটি দেশ সামরিক হামলার শিকার হলে তা সকল দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে।
গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো সবাই এখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। তারই ধারাবাহিকতা এই মক্কা চুক্তি।
এই জোট গঠনের অন্যতম লক্ষ্য হলো- চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্যদেশ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ এই চুক্তি বা জোটভুক্ত দেশগুলো একীভূত হয়ে তারা তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একত্রে কাজে লাগবে।
এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই চুক্তিতে একই সঙ্গে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অঞ্চল ও তার বাইরের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে, কোনো এক দেশ বিপদে পড়লে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা, যুদ্ধবিমান বা অস্ত্র মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা কিংবা আক্রান্ত হলে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটি নির্ধারিত হয়নি চুক্তিতে।
এক দেশ আক্রমণের শিকার হলে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশের এগিয়ে আসার বিষয়টিকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার সঙ্গে ‘কার্যত একই’ বলে বর্ণনা করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ।
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, যতক্ষণ না এটি বাস্তবে পরীক্ষিত হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ- সৌদি আরবের ওপর যে কোনো আক্রমণের জবাবে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে- ততক্ষণ পর্যন্ত এই চুক্তিটিকে একটি বাধ্যতামূলক ন্যাটো ধাঁচের অঙ্গীকারের পরিবর্তে একটি ‘অভিপ্রায়ের ঘোষণা’ হিসেবে দেখা উচিত।
চলতি বছরের ১৯ মার্চ ইসলামি সম্মেলনের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে তুরস্ক-পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। সেখানে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি কী রকম হতে পারে সেটি নিয়েও আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট এই চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়েছে মক্কায়।
এই চুক্তি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু এই তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়, বরং আরও বিস্তৃত হওয়া সম্ভব হলে এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি করা, যাতে একদিন এই অঞ্চলের সব দেশ এই ছাতার নিচে একত্রিত হতে পারে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণ কী?
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান এবং মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক। হঠাৎ কেন এই তিনটি দেশ এমন একটি চুক্তিকে যুক্ত হলো সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হামলা নিয়ে নানা উদ্বেগ রয়েছে গত কয়েক মাস ধরে।
বিশেষ করে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করার কথা বলে ইসরায়েল দেশটির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা দখলে নিয়েছে।
এদিকে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে, এসব গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক শক্তির দিক থেকে তুরস্ক অনেকটা এগিয়ে রয়েছে, শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব ও পাকিস্তান বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সেদিক থেকে তিন দেশ একে অপরের পরিপূরক।
অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই মুহূর্তে আমরা যদি দেখি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের শত্রুদের মধ্যে রয়েছে ইরান কিংবা হুথির মতো বিদ্রোহীরা। কারণ এই জটিলতা শেষ না হলে হুথি জটিলতা শেষ হবে না। সুতরাং সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্যাক্টটা খুব জরুরি ছিল।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ধরা হয় ইসরায়েলকে। সেই দিক থেকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দেশ দুটিকে একসঙ্গে পেলে সেটি তুরস্কের জন্যও লাভবান বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
গবেষক আলতাফ পারভেজ বলছিলেন, সৌদি আরবের অর্থ, পাকিস্তানের সামরিক কৌশল ও অভিজ্ঞতা আর তুরস্কের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের দক্ষতা। এই দেশগুলো ভেবেছে তারা তিনটি দেশ যদি একত্রিত হয়, সেটি তাদের নিরাপত্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ধর্মীয় দিক থেকেও এই চুক্তির বিশেষ একটি তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই চুক্তিকে মুসলিম দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরতে বার হিসেবে শুক্রবার ও স্থান হিসেবে মক্কাকে বাছাই করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কেন যুক্ত হতে চায়?
আগস্টের শুরুতে তিন দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও সামনে আসছে।
বাংলাদেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমে গত সপ্তাহে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার (২৪ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এটির জবাব দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সেখানে এই জোটে বা চুক্তি যেতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানান তিনি।
সেখানে হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মধ্যপ্রাচ্যে যদি এমনও হয় যে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে যাওয়াটা তো অস্বাভাবিক না। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব একটা নেই। সেদিক থেকে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি আর তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও কৌশল আছে। সেদিক থেকে ওই তিন দেশ সাথে একসঙ্গে থাকলে তাতে বাংলাদেশই উপকৃত হবে।
অধ্যাপক খান বলছিলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। যেহেতু বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাচ্ছে। সেদিক বিবেচনায় পাকিস্তান-তুরস্ক ও চীন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ।
যদিও ইতিবাচক দিকও যেমন আছে, সেই সঙ্গে এর ঝুঁকির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যখনই যুক্ত হবে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। যেটি একদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবেও দেখছেন তিনি।
তিনি বলেন, এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাব পারে সে অনিরাপদ। তখনই সে ইসরায়েলে শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা।
‘এ উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে ঝুঁকলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না ঝুঁকলেও থাকবে আরেক ধরনের ঝুঁকি।’
মিশরও অনানুষ্ঠানিক এই জোটে যোগ দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, মিশর সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, কারণ এতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে সেই দেশগুলোর মধ্যে ইরান, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতও রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বে প্রথমবারের মতো সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের এক রোগীর মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ করেছেন চিকিৎসকেরা। চিকিৎসকেরা বলেছেন, এই অস্ত্রোপচার না করা হলে ওই ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারতেন। ৪৮ বছর বয়সী রিস হিবার্ট দুই সন্তানের বাবা। তিনি যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সরাসরি এআইয়ের সহায়তায় তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেন।
অস্ত্রোপচারের সময় এআইয়ের একটি ব্যবস্থা সরাসরি ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকদের সহায়তা করে। মস্তিষ্কের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাইরে থেকে দেখা যায় না—এমন রক্তনালি ও স্নায়ুগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করে চিকিৎসকদের সতর্ক করে দেয় এআই–ব্যবস্থা। ফলে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই টিউমারটি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।
হিবার্ট বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তার দিক থেকে এআইয়ের সহায়তার বড় সুবিধা রয়েছে। কারণ, আমাদের মাথার ভেতরে তো আর পথ চেনার কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না।’
কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ৪৮ বছর বয়সী হিবার্ট ১৮ মাস আগেও সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন। প্রতিদিন দুপুরে তিনি প্রায় দুই মাইল হাঁটতেন। এমনই এক দুপুরে হাঁটার সময় রাস্তায় হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ে যান তিনি এবং তাঁর খিঁচুনি শুরু হয়।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় হিবার্টের মস্তিষ্কে ১১ মিলিমিটার আকারের একটি টিউমার ধরা পড়ে। টিউমারটিতে ক্যানসারের ঝুঁকি ছিল না। এটি বেড়ে উঠেছিল পিটুইটারি গ্রন্থিতে। মস্তিষ্কের নিচের দিকে থাকা মার্বেলের মতো ছোট একটি গ্রন্থি পিটুইটারি। এটি শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া এবং রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে।
পিটুইটারি গ্রন্থির খুব কাছেই রয়েছে ক্যারোটিড ধমনি। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী এই রক্তনালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর কাছেই রয়েছে দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অপটিক স্নায়ু।
হিবার্টের টিউমারটি বড় হতে থাকায় তাঁর অপটিক স্নায়ুর ওপর চাপ পড়তে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছিল।
শুরুতে হিবার্টের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু পরে ঝাপসা দেখার কারণে তিনি হাঁটার সময় বিভিন্ন জিনিসে হোঁচট খেতে শুরু করেন। একই সঙ্গে প্রচণ্ড ক্লান্তি ও মাথা ঘোরার সমস্যাও দেখা দেয়।
হিবার্ট বলেন, ১৮ বছর ধরে দাম্পত্য জীবনে তিনি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীর জন্য এক কাপ কফি বানাতেন। তিনি ঠিক করেছিলেন, এই টিউমার তাঁকে সেই কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
অস্ত্রোপচারের আগে হিবার্টের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মানসিক ও আবেগজনিত। তাঁর ভাষায়, অনেকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলেও তিনি কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাননি।
চিকিৎসকেরা হিবার্টকে তাঁদের তৈরি এআই–ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রথম রোগী হিসেবে অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হন।
হিবার্ট বলেন, রোগীরা গবেষণায় অংশ নিতে প্রস্তুত না হলে চিকিৎসকেরা কীভাবে শিখবেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কীভাবে হবে?
অস্ত্রোপচারের সময় হিবার্টের নাক দিয়ে একটি সরু ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে খুলির নিচের অংশে নেওয়া হয়। সেখানে টিউমারটি হাড় ও শক্ত একটি আবরণের আড়ালে ছিল। টিউমারটি বের করার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা শনাক্ত করা সহজ ছিল না। কারণ, প্রত্যেক মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ গঠন কিছুটা আলাদা।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এ ধরনের অস্ত্রোপচারে টিউমারের পুরোটা অপসারণ করতে না পারার আশঙ্কা ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ। আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ।
এখানেই এআই–ব্যবস্থা চিকিৎসকদের সহায়তা করেছে। অস্ত্রোপচারের সময় অন্য একটি পর্দায় এআই–ব্যবস্থা সরাসরি ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করেছে এবং মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ু যেখানে থাকার সম্ভাবনা বেশি, সেসব জায়গা চিহ্নিত করেছে। কোন অংশ দিয়ে টিউমার অপসারণ করা তুলনামূলক নিরাপদ, সেটিও দেখিয়েছে।
মুঠোফোনে মুখ শনাক্ত করার প্রযুক্তির মতোই কাজ করেছে এআই–ব্যবস্থা। তবে মুখের পরিবর্তে এটি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক সময় আড়ালে থাকা শারীরিক গঠন শনাক্ত করেছে।
যুক্তরাজ্যের একজন চিকিৎসক বছরে এ ধরনের ১০ থেকে ২০টি অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের আগে করা স্ক্যান দেখে রোগীর মস্তিষ্কের গঠন সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তাঁরা অস্ত্রোপচার করেন।
গবেষকেরা পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার অপসারণের শত শত অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে এআই–ব্যবস্থাটিকে প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা করেছেন। প্রতিটি ভিডিওতে রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান আলাদাভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে এআই–ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক গঠনগুলো শনাক্ত করতে শিখেছে।
অস্ত্রোপচারে যুক্ত অধ্যাপক হানি মার্কাস বলেন, একজন চিকিৎসক সারা জীবনে যত অস্ত্রোপচার দেখেন বা করেন, তার চেয়েও বেশি অস্ত্রোপচারের তথ্য দিয়েছে প্রশিক্ষিত এই এআই–ব্যবস্থা। তাই এটি একজন বিশেষজ্ঞের মতো কাজ করতে পারে।
হানি মার্কাস বলেন, পরীক্ষামূলক অন্য অনেক এআই–ব্যবস্থার সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এটি অস্ত্রোপচারের সময় সরাসরি কাজ করতে পারে।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এআই চিকিৎসকদের শুধু সহায়তা করেছে। অস্ত্রোপচারের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল চিকিৎসকদের হাতেই।
অধ্যাপক মার্কাস বলেন, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো চিকিৎসকদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা অনেকটা চ্যাটজিপিটির মতো কাজ করবে। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা চাইলে এর কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারবেন। আবার পরামর্শের সঙ্গে একমত না হলে তা উপেক্ষাও করতে পারবেন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ এবং গুগলের অর্থায়নে গবেষকেরা কয়েক বছর ধরে পরীক্ষাগারে এআই প্রযুক্তিটি নিয়ে কাজ করেছেন। প্রথমবার বাস্তব অস্ত্রোপচারে এর ব্যবহার নিয়েও তাঁরা সন্তুষ্ট। এখন বড় পরিসরে এর পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অস্ত্রোপচারের পর হিবার্ট বলেন, চোখ খোলার পর তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যেন চারপাশের সবকিছু খুব ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি এতটা পরিষ্কার দেখতে পাননি।
অস্ত্রোপচারের পর আট সপ্তাহে হিবার্টের দৃষ্টিশক্তি অনেক উন্নত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর কর্মশক্তিও ফিরে এসেছে। অস্ত্রোপচারের আগে থাকা অন্যান্য সমস্যাও চলে গেছে। তিনি বলেন, অস্ত্রোপচার তাঁকে তাঁর জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরুর উদ্যোগ হিসেবে বৃহস্পতিবার তেহরান সফর করবেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি। ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন ঘোষণা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। খবর রয়টার্সের
ইরানের উপসাগরীয় প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কাতার দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে পর্দার আড়ালে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে আসছে। গত জুনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সময় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায়ও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে গড়ালেও বর্তমানে সংঘাত অনেকটাই স্তিমিত। তবে কূটনৈতিক অগ্রগতির স্পষ্ট কোনো লক্ষণ নেই। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে তেহরান দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সরু এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। তবে সর্বশেষ জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সোমবার এ পথে দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল।
বুধবার ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস জানায়, হরমুজ প্রণালী ও এর আয় কীভাবে ভাগাভাগি করা হবে, সে বিষয়ে ইরান ও ওমান একমত হয়েছে। তবে পরে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দুই দেশ এখনও চুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।
এদিকে সংঘাতের শুরুতে বিমান হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখনও যথেষ্ট রয়েছে। এসব অস্ত্রের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারের যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপের বদলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে দীর্ঘমেয়াদি এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীর নৌ চলাচলেও। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালীতে ৭০টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৯ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।